গড় গড় করে বলে যেতে লাগল, সবচেয়ে ভালো করে তুমি জানো, আমি অপদার্থ। আমি নিজেই জানি সেটা তোমার চেয়েও বেশি। আজ হঠাৎ, দয়াময়ের অসীম করুণায় দাঁড়াও ঠিক হল না, নিষ্ঠুর সম্মানসহ, এই অপদার্থের সামনে বিদ্যুল্লেখার সর্বোজ্জ্বল, আলোক উদ্ভাসিত করে দিলেন, এবং শিশু যেরকম মাকে খুঁজে পায় এ তুলনাটা তোমার কাছ থেকে শিখেছি, গুরু– অন্ধকারের শিশুর নৈসর্গিক জ্ঞান পন্থাসহ আমি সবকিছু স্বচক্ষে আলোকিত প্রকৃতির সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার মাকে খুঁজে পেলুম এবং দেখে নিলুম।
কাল রাত্রে যেসব আলোচনা হচ্ছিল সেটা সম্পূর্ণ ভুল আশঙ্কা নিয়ে নয়। সেটার প্রধান এবং যার চেয়ে অধিক গুরুত্ব ধরে তার অসম্পূর্ণতা– সর্পকে তারা মানবিক বুদ্ধির অক্ষম চন্দ্রালোকে রজু বলে ভ্রম করেছে, স্বয়ং যমকে যমদূত বলে ধরে নিয়েছে এবং সেই সম্পূর্ণ ভ্রান্তিমূলক স্বতঃসিদ্ধ থেকে যাত্রারম্ভ হয়েছে বলে তাদের আলোচনার দিক নির্ণয় করা হল যে সত্য স্বয়ং প্রত্যক্ষ তার সঙ্গে সমান্তরাল রেখা ধরে নয়, আলোচনার পথে চলে গেল টেজেনট-এ, কোণা কেটে এবং আলোচনা যতই অগ্রসর হতে লাগল তার দূরত্ব প্রত্যক্ষ সত্যের দৃঢ়ভূমি থেকে বাড়তে বাড়তে বাস্তবতাহীন অন্তরীক্ষে অদৃশ্য হল।
কারণ এরা যমকে যমদূত, মহামারীকে ছিটেফোঁটা পেটের ব্যামো, ইয়োরোপীয় ব্ল্যাক ডেথকে সাময়িক মূৰ্ছা বলে ধরে নিয়েছে।
শিপ্রা বললে, তোমার কাছে যেটা সত্যরূপে আবির্ভূত হয়েছে, তুমি সেটাকে স্বয়ং প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করেছ, সেটা আমি উপলব্ধি না করেও সর্বান্তকরণে স্বীকার করে নিচ্ছি– যে কর্ম ইতোপূর্বে আমি কখনও করিনি– কারণ এখন তোমার ধর্ম আমার ধর্ম। তোমার এ উপলব্ধি ধর্মজাত। সত্যকার কৌতূহলসহ উঠে বসে শুধাল, তোমার কথা থেকে মনে হল শুধু ইনসটিন বা ইনটুইশন দিয়ে তুমি তোমার সত্য উপলব্ধিতে পৌঁছওনি। খুলে বল অন্য কিছু আছে কি?
আছে। কিন্তু সেটা খুদ প্রত্যক্ষ উপলব্ধি নয়, কী যেন, কে যে আমাকে ধাক্কা মেরে সেই দিকে এগিয়ে দিল।
গামছা-পরা গামছা-কাঁধে আপাতদৃষ্টিতে গরিব দুটি চাষার সঙ্গে আজ আমার আলাপ হল।
শিপ্রা বললে, হাজি বলছিল বটে।
হাজি সত্যই সব কাজের, সন্ধিসুড়কের কাজী। কিন্তু আজ সে-ও ভুল করেছে– অবশ্য সেটা যমদূতে-যমে ঘুলিয়ে ফেলার মতো অতখানি দূর পার্থক্য ধরে না। ওরা দুজনাই উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপার্জনক্ষম শিক্ষিত যথেষ্ট সচ্ছল, শিক্ষিত ভদ্রসন্তান। একজন হিন্দু, অন্যজন তার প্রতিবেশী মুসলমান। রাজশাহী থেকে ওদের নামধাম বর্ণনাসহ মিলিটারি হুলিয়া বেরিয়েছে মোটা পুরস্কারের প্রলোভনসহ। যদিও মিলিটারি পুব বাঙলার পুলিশকে আর বিশ্বাস করে না– এ তত্ত্বটা এই আমি প্রথম শুনলুম– তাদের ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে ও ব্যত্যয় হিসেবে ওদের নামের হুলিয়া পাঠাচ্ছে। আর খুদ মিলিটারি তো জিপে করে ওদের সন্ধানে উত্তর বাঙলাটা চষে বেড়াচ্ছেই।
অপরাধ? কাল রাত্রে আমাদের পার্টিতে যে সিদ্ধান্ত স্বীকৃত হয়েছিল সেটা ঠিক। ছোট-বড় সব মিলিটারি ঘাঁটিতেই কমান্ডাটরা সেপাইদের ঠেকিয়ে রেখেছে লুটপাট, অবিচারে যাকে তাকে গুলি করে মেরে বাদবাকিজনদের হৃদয়-মনে আতঙ্কের বিভীষিকা সৃষ্টি করে তাদের ক্লীব করে দেওয়া, এবং নারীহরণ করে ঘাঁটির ভিতর এনে ব্রথেল নির্মাণ করা।
রাজশাহী একমাত্র ব্যত্যয়। কেন, সে কথা শুধোবার কথা মনে ছিল না।
এই মার্চের প্রথম সপ্তাহে সেখানে দিবাদ্বিপ্রহরে পাঞ্জাবি সেপাই তাদের ভদ্রলোক প্রতিবেশীর দুটি মেয়েকে ধরে নিয়ে যায় ছাউনিতে, বাড়িতে ফেরত দেয় অন্যান্য অত্যাচার করার পর। এই দুই পলাতকের একজন তখন অন্যজনকে ডাক দেয়। একজন বাইসাইকেল চালাল, অন্যজনের হাতে মার্কিন ডিজপোজেলের ক্যাম্পকটের খোল– মোস্ট হামলেস লুকিং।
ভাবতে গায়ে কাঁটা দেয়, কী দুঃসাহস! এ তো সজ্ঞানে অবশ্য মৃত্যুর মুখের দিকে ধাবমান হওয়া। এগোলো ছাউনির দিকে, পুরো স্পিডে সেপাইগুলো যাচ্ছিল পয়দল। শিগগির দূর থেকে ওদের দেখতে পেল– সবসুদ্ধ ছ জন। যতখানি অনুমান হল, সংজ্ঞাহীন মেয়ে দুটিকে রিকশায় বসে ধরে রেখেছে দুজন সেপাই। রাজশাহীর প্রত্যেকটি গলি, প্রত্যেকটি কুঁড়েঘরও তারা চেনে আপন বসতবাড়ির গলির মতো। একটুখানি ঘুরতি পথে জোরসে সাইকেল চালিয়ে তারা একটা অতি সরু আঁকাবাঁকা গলির মুখে পজিশন নিয়ে অপেক্ষা করল। শয়তানগুলোর জন্য। কী আশ্চর্য! অবস্থার ফেরে দুই শতাধিক বৎসর ধরে সংগ্রামে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ শ্রেণিও কীরকম হঠাৎ ইনসটিকটিভলি সর্বোত্তম মিলিটারি টেকটিক এস্থলে কী হবে সেটা সরাসরি উপলব্ধি করে ফেলেছে।
রিকশা দুটোকে তো এগিয়ে যেতে দেবেই। তার পর গেল আরও কয়েকজন। সক্কলের পিছনের দুই না-পাকিকে এদের একজন দুটো কার্তুজ দিয়ে ঘায়েল করল। প্রথম দুজনকে গুলি করলে পিছনের সবাই গলিটার মুখের দিকে এগিয়ে আসছে বলে সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যেত ফায়ারিং হয়েছে কোন জায়গা থেকে। কিন্তু এই কূট পদ্ধতির ফলে সামনের সবকটা সেপাইকে ঘাড় ফিরিয়ে, সন্ধান করতে হল, ফায়ারিং কোনও বাড়ি থেকে, পাঁচিলের আড়াল থেকে গলিটার এ মুখ থেকে, না রাস্তা ক্রস করার পর গলির ও-মুখ থেকে। ওরা সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকে গিয়েছে দুটো বাসাবাড়ির টাটির মাঝখানের মেথরের পথ দিয়ে, খাটা পাইখানা চড়ে উসপার হয়ে, আরেক আঁকাবাঁকা গলি দিয়ে ঢুকল একটা জীর্ণ বাসাবাড়ির খিড়কির দরজা দিয়ে।
