খান বিয়ারে চুমুক দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে বিজ্ঞের মতো বললে, এ তো সবসময়ই হয়! অদেখা জিনিস তো কোনও ইঙ্গিত দিতে পারে না দেখা জিনিসই অদেখার ইঙ্গিত দেয়।
শিপ্রা বললে, যেমন সাহারার মাঝখানে দৃশ্যমান অন্তহীন বালুকা অদৃশ্য মৃত্যুর ইঙ্গিত দেয়, আষাড়ের ঘন বরিষণ অদেখা পাকা ধানের ইঙ্গিত দেয়।
হাজি বললে, একশো বার মানি। তুলনাহীনার অতুলনীয়া তুলনা দুটি শুনে আরও বেশি মানি। কিন্তু ব্যত্যয় এইখানে যে, দেখার জিনিসগুলো পরস্পর-বিরোধী অদেখার প্রতি ইঙ্গিত দিচ্ছে প্রতিপদে। একদিকে দেখুন ইমিগ্রেশন আইন মোটেই ঢিলে হয়নি; অন্যদিকে লক্ষ করবেন যেসব ফালতো লোক ইন্ডিয়ার দিকে আসছে– সবই হিন্দু তাদের কোনও চেক করা হচ্ছে না। এরা ঠিক রেফুজি নয়। এমনিতে হয়তো এ সময়টায় আগরতলায় মামাবাড়িতে আসত না, এখন জাস্ট টু বি অন্ দি সেফার সাইড়। আমার মনে কণামাত্র সন্দেহ নেই ইয়েহিয়ার বিস্তর গুপ্তচর কালো পথে এদিকে আসছে। ওদিকে দেখুন, ত্রিপুরা রক্ষা করার জন্য কী কী গোপন মিলিটারি ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিনে, কিন্তু পাবলিককে কি যথেষ্ট তৈরি করা হচ্ছে?
খান হেসে বললে, কিচ্ছু ভয় নেই, হাজি। অন্তত স্পাইদের নিয়ে চিন্তা নেই। পিণ্ডিতে আজ যা ঘটে দিল্লি কাল তা জেনে যায়। আমাদের খবর তারা জানতে পায় পরশু। স্টাইলটা একটু নবাবি কি না।
হাজি বললে, কিন্তু সব মিলিয়ে, ওভার অল পিকচার কারও আছে কি? এই যে আজ কীর্তিবাবু আমার সঙ্গে মোটরে গেলেন, এন্তের ক্ষেত চষলেন, দেখলেন কটুকুন? ত্রিপুরার তিন দিকে পা বর্ডার। বলতে গেলে পাকসমুদ্রের মাঝখানে যেন ইন্ডিয়া-দ্বীপাংশ। এর কতুটুকু দেখেছি আমিই-বা, আর কীর্তিবাবুই এক সকালে দেখবেন কতটুকু?
শিপ্রার কান পড়ে আছে কীর্তির পদধ্বনির তরে। এত দেরি কেন? ফ্যাশনেবল মেয়ের মতো তার কাছে বাথরুম ঠাকুরঘর, আর ঠাকুরঘর বাথরুম নয় তো।
হাজিকে সরাসরি শুধলে, কীর্তি এত উত্তেজিত– না, এত বিচলিত, জাস্ট, নট হিজ ওন সেলফ হল কেন?
আসমানের দিকে তাকিয়ে হাজি বললে, জানেন আল্লাপাক। আমাকে খান কতবার বলেছে, কীর্তির মতো হ্যাপি-গো-লাকি-ফেলো, হেল-ফেলা-উয়েল-মেট হয় না। দুনিয়ার হাল-হালত সম্বন্ধে আস্ত একটি পরমহংস। প্যাখনার উপর দুশ্চিন্তার ফোঁটাটি পর্যন্ত জিরিয়ে নেবার ফুরসত পায় না। আর আজ? বর্ডারে পৌঁছে কী হল, বুঝতে পারলুম না। আমি যা যা দেখেছি তিনিও ওইসব দেখেছেন, তবে হ্যাঁ, আমি যে অদৃশ্যের প্রতি অলক্ষ ইঙ্গিতের কথা বলছিলুম সেগুলোতে আমি, ওয়াটসন, দেখেছি চায়ের পিরিচ, উনি, হোস দেখেছেন ফ্লাইং সসার। তবে হ্যাঁ, মোটর মেরামতিতে আমি যখন ব্যস্ত তখন তিনি গামছা-পরা গামছা-কাঁধে কয়েকটা নিতান্ত দীনদুঃখীর সঙ্গে মিনিট কয়েক কথা কইলেন। কিন্তু কখন যে তার গায়ে অল্প অল্প কাঁপন লেগেছে সেও আমি বুঝতে পারিনি– মোটরের ঝাঁকুনিতে। কথা এমনিতেই তিনি বলেন কম, আর আমার নিজের বকর বকরের ঠেলায় নিজে আমি নিযুতি রাতে অন্য ঘরে গিয়েই শুই। কিন্তু এতে চিন্তিত হবার মতো কিছু নেই আয়েম শ্যোর। আর আপনাদের তো সবকিছু বলবেনই– একটু ঠাণ্ডা হলে পর। আমাকেও উনি কিছু পর ভাবেন না। আমাকেও বলবেন। নইলে আমাকেই-বা বেছে নিলেন কেন গাইড হিসেবে কোনওপ্রকারের লৌকিকতা না করে?
শিপ্রা বললে, এ কথাটা ঠিক। আপনাকে সে একটা অতি তালেবর খলিফে লোক ঠাউরেছে। আচ্ছা, আমি এখন উঠি। জয়েন ইউ লেটার– টা টা।
ঘরে গিয়ে খাটে শুতে না শুতেই চিরুনি নিয়ে আয়া হাজির। খানিকটে আঁচড়াবার পরই কীর্তি দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। আয়া বললে, একটু পরে আসছি মিসিবাবা।
কীর্তি সোজা ড্রেসিংটেবিলের টুলটা টেনে এনে বসল। শিপ্রার হাত-দুটি আপন দু হাতে তুলে নিয়ে বললে, তুমি আমার একটা অনুরোধ রাখবে?
শিপ্রা তার হাত ছাড়িয়ে তুলে নিল কীর্তির হাত। তার উপর ভেজা চুমো খেয়ে বললে, আমার তিন তিন বারের সত্য তুমি ভুলে যাওনি আমি জানি। বল।
তুমি কালই শিলঙ চলে যাও। সেখানে আমি আসছি সপ্তাহখানেকের ভিতর। শিলচরে একদিনের জন্য নেমে করিমগঞ্জ বর্ডারটা দেখে নেব। তার পর শিলঙ এসে তোমাকে নিয়ে ডাউঁকি বর্ডার দেখতে যাব। কাল যাবে শিলঙ? এখন ওই জায়গাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
নিশ্চয়ই। কিন্তু নিরাপদ বলে নয়। তোমার ইচ্ছে, তাই।
শিপ্রা লক্ষ করল, এখন কীর্তি আগের মতো একটানা কাঁপছে না। মাঝে মাঝে, যেন অল্প নড়ে উঠে। শিপ্রা স্থির করেছে কীর্তিকে এখন কোনও প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে না। সে নিজের থেকেই বলবে, একটু পরে।
আমি প্লেনের টিকিটের কথা হাজিকে বলে এখখুনি আসছি।
ফিরে এসে বললে, যা। বাঁচালে। ওরা অন্তত এটুকুন বুঝেছে, তোমার চলে যাওয়াই ভালো।
যেই না ওই কথাটি বলেছে অমনি তার মনের দরজা কে যেন হঠাৎ লাথি মেরে খুলে দিল।
প্রথমটায় দ্রুতগতিতে, যেন পাঠশালে ছেলে পাখি সব আবৃত্তি করছে, কারণ কীভাবে তার সমস্ত বক্তব্যটা শিকে গুছিয়ে বলবে সেটা সে ঘণ্টা তিনেক ধরে মুশাবিদা করেছে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বার বার বাথরুমেও খসড়াটা আদালতি ইস্টয়োর কাঠামোতে ঢোকাতে গিয়ে বিস্তর ধস্তাধস্তি করতে হয়েছে। সেটারও প্রথম ইমপর্টেন্ট হাফ হয়ে গেল আদালতের প্রিমা ফাশিতে উট্রা ভিরেস। ব্রিজ খেলায় যাকে বলে ভিয়েনা গ্যামবিট। কীর্তি ধরে নিয়েছিল, শিপ্রা তাকে ফেলে শিলঙ যেতে রাজি হবে না এবং সেটাকে নাকচ করার জন্য তাকে সত্য এবং অর্ধসত্য যুক্তিতর্ক পেশ করতে হবে। পয়লা হাফ বিলকুল বরবাদ হয়ে গেল– কারণ শিপ্রা প্রস্তাবনার সঙ্গে সঙ্গেই কেতাবের ইনডেক পর্যন্ত মেনে নিল। এতে করে হয়ে গেল তার কুল্লে মুশাবিদা টালমাটাল। কিন্তু ধুয়োটা রইল ঠিক। সেটা পাঠক চেনেন। কীর্তিনাশ এস্থলে কীর্তিমান। শব্দটি অপদার্থ।
