শুধু একবার শুনল, মুজিব। সঙ্গে সঙ্গে এলেন হরতনের বিবি মুজিবের বিবি। তার বাদেই পরপর দুটো কালো গোলাম। ভেরি ব্যাড়, ভেরি ব্যাড়। উনি বন্দি অবস্থায় গোলামদের পাহারায় থাকবেন কয়েক মাস।
আয়া যখন শেষটায় সব তাস গুটিয়ে নিল তখন হাই তোলার আভাসটা হাত দিয়ে চেপে শিপ্রা শুধাল, হরেদরে কী দাঁড়াল?
আয়া ভদ্রতা জানে। বললে, বড় খারাব তাস এককে বাদ দুসরা। লেকিন এদের নসিব ঔরভি খারাব হত যদি না মিসিবাবা টোক দিতেন। স কে সব বদ কিস্যুৎ। সক্কলের কপালে দুঃখ। তসল্লি (সান্ত্বনা) বস ইয়েহ– দুঃখের শেষে সুখ বেশি আখেরে।
তা হলেই হল, আনমনে বলল সে।
আয়া শুধাল, আপনার নসিব দেখব?
প্লিজ ইয়োরসেলফ।
এবারে পুরো তাসে টোকা মারল আয়া নিজেই। শিপ্রা আবার তার বই-বাগানে হেথা-হোথা ঘুরতে লাগল। বাগানটা কিন্তু তেমন আ মরি আ মরি করার মতো নয়। যদি সিলেটি বান্ধবী বিলকিসের সঙ্গে দেখা হয় তবে বইটার কথা তাকে বলবে। কিন্তু কোথায় কোন গ্রামাঞ্চলের জমিদারবাড়িতে হল তার বিয়ে। আবার দেখা হবার সম্ভাবনা কতখানি? হায়, শিপ্রা জানত না, ত্রিপুরা পাহাড়ের উপর দিয়ে আসবার সময় সে যেসব হাওর দেখেছিল তারই একটার পারে বিলুকিদের বাড়ি, টিলার উপর, প্লেন থেকে ত্রিশ-চল্লিশ মাইল মাত্র। পুনরায় ডবল হায়, হায়। জানা থাকলেই-বা কী হত?
না, সে খুঁজত এলোপাতাড়ি এবং ডাউন করতে পারত না। কিন্তু তাতেও তো আছে সুখে-দুঃখে মেশানো ছোট্ট একটি অনুভূতির আবেশ।
আয়া যেন বসে বসে উল্লাসে নৃত্য করছে। এরকম একটার পর একটা নিরবচ্ছিন্ন খুশ- কিস্মতের তাস সে কভি ভি দেখেনি। আচ্ছি শাদি, আচ্ছে বাল-বাচ্চে–ভুরু কুঁচকে বলল, লেকি কম। মাত্র কটি এই কথাই তার কানে এসেছিল। বিলকুল বোগাস! মুচকি হেসে ভাবল, পাহাড়িদের ভিতরও তা হলে আর্যা গান্ধারী মাতুকুল শ্রেষ্ঠা!
অকস্মাৎ শিপ্রার খেয়াল গেল অকস্মাত্তর বেগে আয়া উপু হয়ে দু হাত দুবাহু দিয়ে সব তাস গুটিয়ে নিচ্ছে। শুধাল, কী হল?
নিশ্চুপ।
শিপ্রা একটুখানি কাত হয়ে আয়ার মুখের দিকে তাকাল। সে ইতোপূর্বে বিস্তর মঙ্গোলিয়ান টাইপের পাহাড়ি মেয়ে দেখেছে, এবং লক্ষ করেছিল, এদের ভাব-পরিবর্তন মুখের ওপর অতি সামান্য রেখা আঁকে, রঙ পালটায়। এখন দেখে, আয়ার মুখ যেন কালো হয়ে গিয়েছে ছোট্ট বাচ্চা কাঁদবার আগে যেরকম মুখ বিকৃত করে অনেকটা সেইরকম।
অবাক হয়ে শুধাল, কী হল তোমার? খারাপ কিছু একটা দেখেছ? তুমি বড় সিমল। এসব কখনও কি সত্যি সত্যি ফলে? না হয় আমাকে বলেই দেখো, আমি কীভাবে নিই।
না পুছিয়ে মিসিবাবা। বলা শেষ হওয়ার পূর্বেই, সেই কবেকার বাচ্চা বয়েস থেকে তার হাড়ে হাড়ে লোমে লোমে যেসব ভদ্রতম দেশি-বিলিতি এটিকেট ঢুকে গিয়েছে, সেগুলো এক লহমায় ভুলে গিয়ে খাস পাহাড়ি মেয়ের মতো দুই হাঁটুর উপর শাড়ি টেনে তুলে ছুট দিল বাবুর্চিখানার দিকে।
শিপ্রা একটু মুচকি হাসল। সামান্য তাসের হেরফের ভুলিয়ে দিল সরলা পাহাড়িনীর পূর্ণজীবনের অভ্যাস, শালীনতাবোধ অবশ্য আয়ারই মতে– সেটা অলক্ষ্মনীয় শালীনতা, সামান্য দু খানা তাস এক টানে তাকে নিয়ে গেল সেই দুর্গন্ধ অন্ধকার গিরিগুহায়, তার ভিতরটা এক লহমায় ভরে দিল যুগ যুগ সঞ্চিত তার পিতৃপিতামহ পূর্বপুরুষদের ভীতি দিয়ে হিংস্র জন্তুর ভয়, ঝঞ্ঝা-বিদ্যুতের ভয়, সভ্য বিদেশির বন্দুকের ভয় এবং সবচেয়ে বড় ভয়– পৈশাচিক প্রেত-দৈত্যের দানবিক অট্টহাস্যের বিভীষিকা।
সব জানে, সব বোঝে শিপ্রা কিন্তু তবু তার মনটা খচখচ করতে লাগল।
তুলনাহীনা – ২য় খণ্ড
০১.
কীর্তি কাঁপছে। অন্য কারও চোখে পড়ত না, কিন্তু শিপ্রার চোখ ভালোবাসার চোখ, সে তো সব দেখতে পায়।
কাঁপছ কেন?
কই আমি তো টের পাচ্ছিনে।
যাও, চান করে এসো, মাথার প্রত্যেকটি চুল পর্যন্ত ধুলোয় ধুলোয় সাদা, গেরুয়া।
কীর্তির যে যাবার ইচ্ছে নেই, শিপ্রা খুবই টের পেয়েছে। কিন্তু সে চুপ করে রইল। বলে কীর্তি বাধ্য হয়ে উঠল।
শিপ্রা হলঘরে এল। বাইরে রোদ তেতে উঠেছে বলে হাজি বসেছে খানের মুখোমুখি হয়ে। দুপুরের পূর্বেই কীর্তিরা ফিরে এসেছে। নির্ধারিত সময়ের অল্প পূর্বে অপ্রত্যাশিত এই আগমন মনে যে কী আনন্দ দিয়েছিল সেটা সকলের কাছে এতই অকিঞ্চিৎ যে সে সেটা কাউকে খুলে বলতে পারবে না– হয়তো একমাত্র কীর্তিই তার সামান্য কিছুটা অংশের মূল্য হৃদয় দিয়ে নিতে পারবে, কাঞ্চন যতই অকিঞ্চিৎ হোক না কেন, সে কাঞ্চন। হলবাইনের ছবিতে উল্লসিত ব্যক্তির মুক্ত অট্টহাস্যের চেয়ে মোনালিসার মৃদু হাসি ঢের বেশি অর্থধারী, রহস্যময়। মোটরের শব্দ শুনেই সে তাই দ্রুতপদে গিয়েছিল বারান্দায়, যদিও প্রাণ চেয়েছিল ছুটে যেতে। কীর্তির ধূলিধূসরিত অঙ্গ-বস্ত্র দেখে সে যত না বিস্মিত হয়েছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি হল তার চেহারার আকস্মিক এক অজানা পরিবর্তন দেখে। ইতোমধ্যে আয়ার পত্রলেখার ভাগ্যগণনাজনিত খচখচানিটা এক মুহূর্তেই পেয়েছে লোপ– তার অজানাতে, এবং আবার ফিরে এসে পূর্বাসনে বসবার জন্য সেটাতে রুমাল বেঁধে রিজভড হক্কের ইস্টাম্বো মেরে যায়নি।
কী কী দেখলেন বলুন।
হাজি বললে, দেখার মতো খুব বেশি একটা কখনও ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু এখন, আজ ক দিন যা দেখেছি সেটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে ভবিষ্যতের অদেখা অনেক কিছুর দিকে।
