কীর্তি বললে, আর ঘণ্টা দু ত্তিন পরেই হাজি গাড়ি নিয়ে আসবে। তুমি কিন্তু তোমার কাঁচা ঘুমটি নষ্ট করো না। আমরা দুপুরের আগেই ফিরব।
আমাকে একটা চুমো দাও।
চিরকালই শিপ্রার ঘুম ভাঙে পাশের মসজিদের ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে সারারাতের পার্টি থেকে ফিরে যত ভোরের মুখেই শুতে যাক না কেন। আজও দেখতে পেল হাজির মোটরের হেডলাইট, শুনতে পেল বারান্দা দিয়ে কীর্তির এগিয়ে যাওয়া, কিন্তু বেরুল না।
সকালে খানের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে শুধাল, আজ তোমার পার্টি কখন শুরু হবে– মোটামুটি?
খান ইতস্তত করে বললে, তুমি যদি অনুমতি দাও তবে আমি একটু কাজ সেরে আসি। মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের কাজ। এই ডামাডোলের বাজারে কিছুটা ব্যবসা গুটোতে হবে কিছুটা গুছোতে। নইলে যেতুম না।
বা রে, যাবে না কেন?
আরাম পেল খান। বললে, আর শোনো, যে ইংরেজ বাড়িটা বিক্রি করে সে তার বেশিরভাগ বই-ম্যাগাজিন রেখে গিয়েছে। বিলিয়ার্ড রুমের পাশের কামরায়। ইট্রেসটিং কিছু পেয়েও যেতে পারো।
কামরায় ফিরে দেখে, আয়া জরাজীর্ণ এক প্যাকেট তাসের প্রায় সব ক-খানা কার্পেটের উপর পেতে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছে, কী যেন হিসাব করছে আর বিড়বিড় করছে আপন মনে।
হঠাৎ শিপ্রাকে দেখে চরম লজ্জা পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে তাসগুলো এক ঝটকায় তুলে নিল। মাথা নিচু করে বার বার মাফ চাইল।
শিপ্রা সেদিকে যেন কানই দিল না। বরঞ্চ বলল, তা থামলে কেন? কী খেলছিলে, পেশেন্স?
একটু হিম্মত পেয়ে তার খিচুড়ি ভাষায় বললে, না, মিসিবাবা। আমি তার থেকে দেখছিলুম, কী কী হবে, মানে কী সব ঘটবে–
ফিউচার?
রাইট, মিসিবাবা। আর ভাগ্যগণনা। দুটো প্রায় একই। আমি যে মেমসায়েবের কাছে বাচ্চা বয়েস থেকে জোয়ানি ত নোকরি করেছি, তিনি আমায় তাসের বহুত কুছ থেল শেখান। আমার সঙ্গে রোজ দুপুরে খেলতেন। আমি ভেবেছিলুম, আপনার পায়ের শব্দ শুনতে পেলেই তাস ঝটপট তুলে নেব। বেয়াদবি মাফ করুন। আমি একদম মশগুল হয়ে গিয়েছিলুম।
কাট দ্যাট আউট। কোনও বেয়াদবি হয়নি। তা মশগুল হবার মতো কী পেয়েছিলে?
গম্ভীর স্বরে ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝাতে চেষ্টা করল। বলল, এই যে সবাই ভাবছে ফিনসে লড়াই শুরু হবে কি না, এক দফা জেসা হুয়া, সেইটে হবে কি না? মেমসাহেব বলত, আমি পাহাড়ি– সাদা-দিল-ঔরৎ। আমরা নাকি ওদের চেয়ে ঢের ভালো ফিউচার দেখতে পারি।
শিপ্রা একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অলস কৌতূহলে শুধাল, কী দেখলে?
পাহাড়িনী কুঞ্চিত করে বললে, সব আন্ধেরা, আন্ধেরা। এসা বড় একটা হয় না। ফিসে দেখি। তাস শাফ করে শিপ্রার কাছে নিয়ে এসে বলল, টোকা দিজিয়ে। তা হলে উয়োঠো হোগা আপকা গিননা। শিপ্রা লক্ষ্মী মেয়ে। তুরন্ত টোকা দিল।
ইংরেজের ছেড়ে যাওয়া বইয়ের ভিতর সে পেয়েছে ইংরেজ লেখক উইলিয়ম মেকপিস থ্যাকারে ও সিলেট নিয়ে একখানা মোটা বই। তার জানা ছিল থ্যাকারের জন্ম হয়েছিল কলকাতায়। এই বইয়ের যে ক-খানা পাতা উল্টিয়েছে তাতে মনে হল লেখকের অন্য কোনও একটা নতুন গবেষণাপ্রসূত মতবাদ আছে। অবশ্য এটা ধ্রুব সত্য, থ্যাকারের পিতা সিলেটের সর্বময় কর্তা ছিলেন কিছুকাল। শিপ্রার চিন্তাধারা চলল অন্যদিকে। থ্যাকারে কি এসব মামোজাম্বোতে বিশ্বাস করতেন? কিপলিং। আজকাল তো বিস্তর হিপি করে।
আয়া গভীরতম মনোযোগ সহকারে এক-একখানা করে তাস ফেলে, আর আপন মনে বিড়বিড় করে। এমনই বাহ্যজ্ঞানশূন্য যে শিপ্রার প্রশ্ন প্রথমটায় তার কানেই ঢোকেনি। সংবিতে ফিরে বলল, ঘোটালা, ফিসে ঘোটালা! এই তো দেখুন, বার বার পরপর তিনবার পাঞ্জা এসেছে। তো নিকলা, এক তরফমে পাঁচঠো আদমি। তার বাদে দেখিয়ে, দুটো দস্সা এসেছে। লাখ লাখ আদমি লেকিন মুশকিল আছে ইনকা। বোহ মুশকিল দোঠাই কালা দসসা। লেকিন উয়ো পাঁচঠো কিয়া? তিন বার আয়া। পেহলাই।
শিপ্রা অনুমান করল, দশের তাসগুলোকে আয়া জনতা হিসেবে নিয়েছে। কথায় বলে দশের মুখ খোদার তবল, এরই হুবহু লাতিন ভ পপুলি, ভস্ দেই; দশজনের গলা ঈশ্বরের গলা অতএব দশের তাস পপুলি, পাবলিক, জনারণ্য অর্থাৎ আওয়ামী লীগ। কিন্তু তাদের বিপক্ষে আয়া প্রত্যাশা করেছে টেক্কা, কিংবা বাদশা অর্থাৎ ইয়েহিয়া। এসেছে পাঞ্জা। পঞ্চ আবৃ? পাঞ্জাব? হঠাৎ তার মনে পড়ল, লারি বলেছিল মির্জাকে, অনেকেরই বিশ্বাস, ইয়েহিয়ার তথাকথিত সমর্থক যে মিলিটারি জুন্টা আছে তারা সংখ্যায় পাঁচ এবং আসলে ওদের আদেশে ইয়েহিয়া ওঠবস করে। শিপ্রা আপন মনে হেসে উঠল। ধর্মরাজের পশ্চাতে পঞ্চপাণ্ডব। না তা হলে ইয়েহিয়াটা সাইফার। আয়াকে এই পাঞ্চজন্য তাসের মাহাত্ম্য বোঝাতেই সে আনন্দে ফেটে পড়ে আর কি! বার বার বলল, পুরানা মেমসায়েবের চেয়ে মিসিবাবার নজর বহু দূর দূর যায়, কাঁহা কাহা মুলুকে। বেরুল পরপর রুইতন আর ইস্কাপনের টেক্কা।
শিপ্রা, আয়া দু জনাতেই একই ওয়াটারলুতে। পরাজয়। কোনও অর্থ বেরয় না।
ভারত, পূর্ব বাঙলার কটা লোক তখন জানত, ইয়েহিয়া হারেমের পাটরানি হবার জন্য চলেছে তখন জোর লড়াই। একজন ফর্সা পশ্চিম পাকি– লোকে তার নাম দিয়েছে। জেনারেল রানি; অন্য জন পুব বাঙলার শ্যামা, ডাকনাম ব্ল্যাক বিউটি।
এসব হোকাস পোকাসে শিপ্রার মতো মেয়ের কৌতূহল দুরন্ত বাচ্চার হাতে বেলুনের মতো দীর্ঘজীবী। শিপ্রা পুস্তকের সুগন্ধি বাগিচায় ডুব মারল। আরব কবি বলেছেন, পুস্তক সে যেন একটি বাগান, যেটাকে পকেটে পোরা যায়। তার পর আয়ার ভবিষ্যৎ দৃষ্টির ফলাফল শিপ্রার কানে আর যায়নি।
