আর কীর্তি তবে গর্বভরে আসমানি ঘোড়ায় চেপে তামাম শহরটার উপর হাওয়াই চক্কর মারছে।
খান মিটমিটিয়ে হাসছে। একবার হাত কচলাতে কচলাতে বললও, আমার বৃথা প্রশংসা করবেন না। এঁকে আমি গড়িনি। ইনি আমার স্কুলে পড়েননি। হেঁ হেঁ! ফের সবিনয় ভাব, কেন মিছে লজ্জা দিচ্ছেন!
খানের প্যারা দোস্ত গোস্বামী সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তোমার প্রতি কোনও অবিচার হবে না; তোমার যা মগজের পরিমাণ সেটুকুন দিয়ে ওই সেই চাষার কবরেজি বড়িও হয় না। কিন্তু মোদ্দাটা হচ্ছে এই; আমরাও বই পড়ি, মাঝে মাঝে গুরুগম্ভীর ত্রৈমাসিক, বিলিতি লিটরারি সাপ্লিমেন্ট– অবরে সবরে। তার কিছুটা মনেও গাঁথা হয়ে যায়। কিন্তু কই, সঠিক মোকায় তো সেগুলো কাজে লাগাতে পারিনে। ওদিকে দেখ, বেগমসাহেবা যে দু চারটি কথা কইলেন তাতে তাঁর গভীর তত্ত্বজ্ঞান, গভীরতর স্বাধ্যায় তো ধরা পড়লই, কিন্তু কী অলৌকিক মোকা মাফিক সেগুলোর প্রয়োগ! দেশ– অর্থাৎ পার্টিতে গল্পগুজব হচ্ছে এটা রয়েল সোসাইটির মিটিং নয়। পাত্র– আমরা অর্ধশিক্ষিত, ফুর্তির চিড়িয়া, তদুপরি ভিন্ন ভিন্ন ধান্দায় চড়ে বেড়াই, আমরা রিসার্চ করিনে। এবং সর্বশেষে সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট কাল, অর্থাৎ টাইমিং। মিঞাসাহেব বা হাজির বক্তব্য শেষ হওয়ার বহু পূর্বেই তিনি ঠাহর করে নিয়েছিলেন, নলটা চলেছে কোন দিকে। যে কোনও মুহূর্তে ইন্টারাপ করে দেখেছ কোনও মেয়েছেলে কবে যার এ অভ্যাসটি নেই এবং সেটাতে তাদের হক্ক আছে তার বক্তব্য তিনি বলতে পারতেন। না, তিনি অপেক্ষা করে রইলেন। যতক্ষণ না আমাদের মন তৈরি হয়, তার প্রত্যেক শব্দ যেন আমাদের প্রত্যেকটি ব্রেন-সেলে পুরো মাত্রায় আঘাত দেয়। এই অসাধারণ গুণটি বড়ই দুর্লভ, হে খান, বড়ই দুর্লভ।
শিপ্রা চলে গেছে খাবার তদারকিতে আজ এদের সকলের দাওয়াত, তাদের ফ্রেন্ডস অ্যান্ড এনিমিজসহ।
আপন আপন গেলাস নিয়ে সবাই ডাইনিংরুমে এলেন।
শিপ্রা লক্ষ করল, হাজিকে সে তার পাশে বসাল এবং আর পাঁচজনের গালগল্পে কান না দিয়ে ডিনারের প্রায় অধিকাংশ সময়টা গম্ভীর মুখে গুজুর গুজুর করল। অবশ্য টেবিলের কায়দা মেনে মেনে। শিপ্রা তো প্রায় সেই ষোল বছর থেকে হোস্টেস। ওদিকে গল্প করছে, শুনছে মনপ্রাণ দিয়ে যে অন্য দিকে কোনও খেয়ালই নেই, ওদিকে তার চোখ তো চোখ নয়, বন্দুক। প্রত্যেকটি গেস্টের প্রতি বন্দুকের অব্যর্থ নিশানা। প্রত্যেকের মনে ধারণা হল শিপ্রা যেন একমাত্র তাকেই খেতে ডেকেছে আর সামনে বসে বাড়ছে। শ্রীহরি ও সখীগণসহ শ্রীরাধা যখন চক্রাকারে নৃত্য করতেন, তখন শ্রীরাধা তো কথাই নেই, প্রত্যেকটি সখী দেখতেন তারই পাশে পাশে কেষ্ট-ঠাকুর নেচে চলেছেন।
ডিনারের পর সবাই বিদায় নিলেন। রাত্রি তৃতীয় বামে পৌঁছেছে। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ উঠি উঠি করছে।
বিদায় নেবার সময় মিঞাসাহেব শিপ্রাকে বললেন, এটা মহরমের মাস। ইয়েহিয়া কট্টর শিয়া। সুন্নিরা মহরম মাস পবিত্র বলে স্বীকার করে বটে কিন্তু শিয়াদের কাছে মহরমের মাহাত্ম্য সর্বাধিক– এমনকি দুই ঈদের মাস বা রোজার মাসের সঙ্গেও তার তুলনা হয় না। এই পবিত্র মাসে ইয়েহিয়া খুন-খারাবি আরম্ভ করবে কী? কি জানি?
.
শিপ্রা শুয়ে পড়েছে। ঘরে আলো জ্বলছে দেখে দরজার সামনে একটুখানি সামান্য নড়াচড়া করতেই শিপ্রা ডাকল, এসো।
একটা চেয়ার টেনে পাশে বসতেই শিপ্রা বলল, আহ্! এই তোমাকে পেলুম এখানে আসার পর থেকে একলা। ভিড়ে তোমাকে আমি হারিয়ে ফেলি। কীই-বা ভিড় ছিল আজ! কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যেন হাজার হাজার লোকের মেলা– আর তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি, খুঁজছি বার বার।
শিপ্রার প্রসন্নতা দেখে কীর্তি সাহস সঞ্চয় করে বলল, হাজিকে শুধোচ্ছিলুম তিনি কুমিল্লা-আগরতলা এত ঘন ঘন মাকু মারেন কী করে। হাজি তুড়ি মেরে বললেন, ও তো ডালভাত। আমার তিনটে ভিন্ন ভিন্ন ন্যাশনালিটির তিনখানা পাসপোর্ট আছে। যখন যেটার দরকার হয় তাই দিয়ে চালাই। যদিস্যাৎ নিতান্তই আর্জেন্ট কাজ থাকে তবে বর্ডার চেকপোস্ট-এর লোকগুলোকে একটুখানি ইশারা দিই। ব্যস। বাতলটা বাতলটা, বউয়ের জন্য জবাকুসুমটা, ছেলের জন্য ইনস্ট্রমেন্ট বক্সটা এসব তো আমি প্রায়ই সওগাত দিই, পাসপোর্ট থাকলেও। আর তার চেয়েও জলদির মামেলা হলে কালোয়। যেসব পথ-বিপথ দিয়ে কেপাতা যায়, সুপুরি আসে, তার সবকটা আমার নখাঘদর্পণে। আমি শুধালুম, আমাকে বর্ডার অবধি দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারবেন? হেসে বলল, আমি রাতারাতি আপনার কাগজপত্র তৈরি করিয়ে কালই খাস কুমিল্লায় আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু এখন পাকিস্তানে যাওয়াটা নিরাপদ নয়। তবে বর্ডার অবধি সে তো হেসে-খেলে। কালো পথগুলোও দেখাতে পারি। তবে মোটর ছেড়ে এদিক-ওদিক খানিকটে হাঁটতে হবে।
তুমি যদি অনুমতি দাও, তবে একবার বর্ডার পর্যন্ত হয়ে আসি। প্লিজ।
খানকে বলেছ?
হ্যাঁ, সে সঙ্গে সঙ্গে বললে, তোমার অনুমতি নিতে।
শিপ্রা চিন্তা না করেই বললে, তবে যাও। তোমার কোনও ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি প্রতিবন্ধক হব এ পরিস্থিতিটা আমি কল্পনাই করতে পারিনে। এবং আমি জানি, তুমি গোঁয়ার নও খামাখা বিপদ ডেকে আনবে না। আমার মনে হল হাজি পাকা লোক। তুমি গাইড পেয়েছ সর্বোত্তম।
