হাজি তাই শিপ্রাবানুর নেকনজর পেয়ে বিগলিত। কোমরে দু ভাজ হয়ে, বাও করে, ঘন ঘন কুর্নিশ ছেড়ে বলল, জনাব বেগমসাহেবা খানম-বানু, যে কোনও অর্বাচীন সিলেটি আপনাকে বলবে, কিতা মানে কী
আলবৎ। কিন্তু সেখানেই শব্দটার শেষ অর্থ খতম হয়ে দাঁড়ি কাটেনি। ওটা অনেক রহস্য ধরে। তুমি কিতা? তার কতই না উত্তর হতে পারে
আর এক সিলেটি সেখানকার মদনমোহন কলেজের লেকচারার, বললে, শুরুর গানে যদি সামান্য পাঠান্তর করি–বলেই দু হাত দিয়ে দু কান ছুঁলেন, অপরাধী যে-রকম মাফ চায় এবং বলি।
ওগো মিতা সুদূরের মিতা
আমার কী বেদনা জানো কি তা?
তা হলে ওই শেষ কি তা সিলেটি কিতার রহস্য ধরে।
শিপ্রা খুশি হয়ে দুই সিলেটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার কীর্তি যাকে সে আদর করে কীতা ডাকে তার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল।
হাজি পূর্বতর প্রশ্নের খেই ধরে বললে, মুরগির ব্যবসার ঠ্যালাতেই তো, দাদা এখানে পালিয়ে এলুম। আমি লীগের রীতিমতো সম্মানিত সদস্য। ওদিকে খুদ লীগ হাইকমান্ডের হুকুম কি না জানিনে, পাঞ্জাবি-পাঠানদের খানাদানা সাপ্লাই বন্ধ করো। কিন্তু কার্যত গাঁয়ের লোকসুদু আমন ক্ষেপে গেছে, আমিও তাদের দলে, তাই ইচ্ছে থাকলেও মুরগি জোগাড় করতে পারি ক শো–ওই কেনটনমেন্টের তরে? ওটা তো অজানা থাকবে না। তার পর শা– সরি সরি বড়কর্তা কর্নেল আমায় এত্তেলা পাঠাল–
বাপস্!
সব্বোনাশা!
কিতা কিতা!
ইয়াল্লা! (কোরাস)
ধুকুপুকু মুরগিবাচ্চার জানটা নিয়ে গেলুম কর্নেল সমীপে- সুপুতুরের বাপ নিঝংশ হোক। আমাকে এই মারে কি তেই মারে। আন্দেশা করছি, হিন্দুদের মতো ধর্মপত্নীর সোনার কাঁকন-জোড়া খুলে আনলেই হত। বিক্কিরি করলে, এই মাগির বাজারেও এক কেস স্কচ কেনা যায়। তারই নাকি এক বোতল পেটে ঢেলে ডাচ্ কারেজ সঞ্চয় করে এলে হত। ব্যাটা– শিপ্রার দিকে ক্ষণতরে তাকিয়ে সেলাম ঠুকে বলল, ম্যাডাম। আপনি আমার এই অভদ্রস্থ কথাগুলো অ্যাটুকুন মাফ করে দেবেন প্লিজ। য ফলা শিখতে গিয়ে পাঠশালে পড়েছি,
অশ্লীল কুবাক্য সদা মুখে ফোটে যার।
লোক সনে ঐক্য সখ্য রহে না তাহার।
শিপ্রা : সাহেব, আপনি কি ভুলে গেলেন, আমি গোড়াতেই আপনাদের হুশিয়ার করে দিয়েছি, আমি লেডি নই। আপনি দিল্ জাম্ ভরপুর করে গালাগাল দেন, আপনার ওই কবিতার অশ্লীল কুবাক্য এস্তেমাল করুন। আমার কলিজাটা নেচে উঠবে। ওই হারামজাদারা আমার দু চোখের দুশমন।
হাজিকে তখন আর পায় কে? চেয়ার ছেড়ে উঠে অর্ধনৃত্য করে বললে, শাবাশ, শাবাশ, ম্যাডাম। এবার আমার সত্য জ্ঞানোদয় হল আপনি নিকষ্যি কুলিন লেডি। আপনি পরমহংসী। পাতিহাঁস, পাতি নেড়ের মতো পাতি লেডি এসব উত্তমোত্তম ভাবব্যঞ্জক কটুবাক্য শুনে কানে আঙুল– অবশ্য ফুটো দুটো পুরোপুরি বন্ধ করেন না, কারণ তাদের জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবলা– আর চোখে মুখে ছ্যা ছ্যা করেন। আমার মনে কোনও সন্দ নেই আপনি রিয়েল স্টাফ, খাঁটি স্কচ, ও স্যরি স্যরি, আই মিন আপনি পুরো পাক্কা লেডি। বিশেষ করে হারামির পরিবর্তে রূঢ়তর কিন্তু হাইলি কালচারড– জাদাটা যোগ করে।
কী বলব, ব্যাটা দেখি আমার হাঁড়ির খবরত রাখে। বললে, তার পাঁচশোর বদলে এখন থেকে হাজারটা মুরগির দরকার। আমি পাক্কা ইংরেজিতে বললুম, বাই দি লর্ড হ্যারি, পাব কোথায়? সম্বন্ধী ব্যাটা বলল, আমি জানি, তুমি রোজ ঢাকার হোটেলগুলোকে মুরগির চালান পাঠাও। আমিও কম যাইনে। ব্লাফ-মাস্টারের বেলুন। বললুম, তা হলে আপনি সেপাই মারফত সেগুলো স্টেশন থেকে পকড়কে আনিয়ে নিন। আমি জানতুম এখনও কামারের ঘায়ের লগন আসেনি।
তার পর কর্নেল হঠাৎ একদম খাদে নেমে বললে, মিস্টার মজুমদার, আমরা একটা পোলট্রি ফার্ম খুলতে চাই ময়নামতিতে। আপনি তো স্পেশালিস্ট। মেন্ পয়েন্টগুলো বাৎলে দিন। আপনার ব্যবসাতে চোট লাগবে না। আমার চাহিদা প্রতিদিন বেড়েই যাবে, কমবে না। তোমার থেকে আরও বেশি নেব। আমি অবশ্য হরবকৎ জেন্টেলম্যান আনাড়িতে নাড়ি-জ্ঞান শিখিয়ে বেহেস্ত যাব না কেন? সেইসব টিপসই দিলুম যেসব ঢাকা-কলকাতা দেয় তাদের রুরাল ব্রডকাস্টে পশুপক্ষী পালন বাবদে চাষাদের। শুনেছি, ওগুলো পালন করলে প্রতি তিন মাস অন্তর মুরগির মড়ক অনিবার্য। অবশ্য আল্লা যদি আমাদের প্রতি সদয় হন। কিন্তু এহ বাহ্য। দাদারা, বলুন ইয়েহিয়া-মুজিবে সমঝোতার সম্ভাবনা কতখানি? তা হলে আর্মির সংখ্যা কমত না?
শিপ্রা বললে, আমাকে এক বিদেশি জেনারেল বলেছিলেন, দেশের রাজধানী, বড় বড় শহরের পাকা পলিটিশিয়ান এমনকি আর্মির মধ্যস্তরের অফিসাররা বহুক্ষেত্রে যেসব টপ সিক্রেট জানতে পায় না, যেমন ট্রপ মুভমেন্ট, গ্রামের সাধারণ লোকের কাছ থেকে তা লুকিয়ে রাখা যায় না। হাজি সাহেব অবশ্য জবরদস্ত সাপ্লায়ার। কিন্তু তিনিও তো মুরগি-আণ্ডা কিনবেন গায়ের চাষা-ভূষোর কাছ থেকে। শাক-সবজি, এক কথায় যাবতীয় তাজা মাল ওরাই বেচে! জেনারেল বলছিলেন ইয়োরোপের যে কোনও কেন্টনমেন্ট থেকে মাত্র এক হাজার সৈন্য সরালে, সে-ও অতিশয় গোপনে, তবু আশপাশের গায়ের লোক সেই সন্ধ্যায় পাবৃ-এ বসে সঠিক নম্বরটি বলে দিত– একে অন্যের বিক্রির পরিমাণে খবর বদলাবদলি করে। এবং করেও।
হাজি তো তার মতের সমর্থন পেয়ে খুশি। বাকি পাঁচজনও তাজ্জব মানল। আর যেসব কলকাতার সোসাইটি লেডিজ দেখেছে তারা, খানের নিমন্ত্রণেই তারা এসেছেন আকছারই স্বামী বা ফিয়াসেসহ, তারা তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছেন গেলাস-ফিল্ডে। ইনি তো এক ঘণ্টা হয়ে গেল ছোট্ট একটা ব্রান্ডির আধখানাও শেষ করতে পারেননি, ওদিকে ইয়েহিয়া রাজার গল্প, যেসব গল্পের রাজা– সেটাতে দস্তুরমতো তাদের অজানা সব তত্ত্বও যোগ দিতে পারেন।
