প্রথম পক্ষের বক্তব্য : ঢাকাতে সমঝোতা হয়ে গিয়েছে। মারপিট হবে না।
দ্বিতীয় পক্ষের বক্তব্য : আদৌ হয়নি; হবেও না। ইয়েহিয়া জাত ঘুঘু। টালবাহানা দিয়ে সময় নিচ্ছে, শুধু আরও সৈন্যঅস্ত্রশস্ত্র জমায়েত করার জন্য।
শিপ্রা এসবের অধিকংশই শুনেছে। বেয়াত্রিচে যা বলেছিল সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছিল মাত্র।
তুমুল তর্কযুদ্ধের সময় হঠাৎ এক এক সময় সবাই একসঙ্গে চুপ মেরে যায়।
সে স্তব্ধতা ভাঙলেন একটি বয়স্ক মুসলমান। তিনি হংসমধ্যে বক। অবশ্য বকের মতো জল খাচ্ছিলেন না, চুষছিলেন একটা নিম্বু পানি। বললেন, একটা ঘটনা আমার কাছে বড় রহস্যময় ঠেকেছে। দিন কয়েক আগে দুটো পাঞ্জাবি সেপাই গিয়েছিল বাজারে। কী একটা সামান্য অজুহাত পেয়ে রাস্তার ছোঁড়ারা হয়তো-বা লীগের দু একজন ছিল করেছে ওদের ডাহা বেইজ্জত। শেষটায় দুজনার পাতলুন মিয়া সাহেব যেন বিষম খেয়ে আচমকা থেমে গেলেন।
শিপ্রাই বুঝেছে সক্কলের পয়লা। অভয়বাণী শুনিয়ে বলল, মৌলভি সায়েব, আপনার যা বলার অসঙ্কোচে বলে যান। আমি নাজুক, লজ্জাবতী লেডিদের একজন নই, যারা কারও মুখে বাচ্ছা বিইয়েছি শুনলে ভিরমি যান, তাঁরা জন্ম দেন ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার কাছে সর্বদাই প্রথমটাই প্রকৃতিসম্মত এবং ভিরাইল ঠেকেছে।
মৌলভি সায়েব কিন্তু সেদিক দিয়ে পাক্কা মডার্ন। ভদ্র রমণীর আদেশ অলঙ্। বললেন- পাতলুন কেড়ে নেয়। ভাগ্যিস অন্য হ্রস্বতর অঙ্গবস্ত্র পরনে ছিল, তাই মানে মানে ছাউনিতে ফিরতে পারল।
কেউ মৃদু হাস্য, কেউ-বা অট্টহাস্য করলেন। শিপ্রা প্রথম শ্রেণিতে।
সায়েব বললেন, কিন্তু আসল কথা, তারা ছাউনিতে ফিরে গিয়ে বন্দুক এবং ইয়ার-দোস্ত নিয়ে এসে বেধড়ক মার লাগাল না কেন, গুলি চালাল না কেন, দোষী নির্দোষীকে অবিচারে– বেধড়ক? যা আকছারই হয়ে থাকে পাকিস্তানে। সেইখানেই তো রহস্য। তার কিছু করল না, সেইটাই তো রহস্য।
এবারে শিপ্রা যেন আলোচনায় যোগ দিল। বলল, শার্লক হোমসের অন্যতম রহস্য গল্পে আছে তিনি পুলিশ ইনসপেকটরকে বললেন, রাত্রে কুকুরটার রহস্যময় আচরণের দিকে তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ইনসপেকটর আশ্চর্য হয়ে বলল, সে তো কিছু করেনি। হোমস হেসে বললেন, সেইখানেই তো রহস্য। শিপ্রা থেমে গেল।
খান আর কীর্তি ছাড়া আর সবাই কৌতূহলী নয়নে শিপ্রার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাল। এ সজ্জনদের মাঝখানে মাত্র ওরা দুজনাই জানে, শিপ্রা পয়েন্টলেস, উদ্দেশ্যহীন গল্প বা উদ্ধৃতি কখনও ছাড়ে না।
মিঞা সাহেব কিন্তু ধরে ফেলেছে। সে হোমস পড়েনি তবু। কারণ তার বক্তব্যের সঙ্গে এটা মিলে যাচ্ছে। হয়তো-বা তার এবং অন্য কিছুজনের গল্পটি স্মরণে এসেছে।
অন্য সবাই স্কুলবয়ের মতো পূর্বাপর সংযোগসহ সবিস্তার পূর্ণ বিবরণীর জন্য শুরু শিপ্রার দিকে তাকিয়ে আছে বলে সে বলল, আস্তাবল থেকে দামি ঘোড়া গিয়েছিল চুরি, গভীর রাত্রে, অথচ সেটাকে পাহারা দেবার জন্য যে কুকুরটা ছিল সেখানে, সে ঘেউ ঘেউ করে স্টেবল বয়গুলোকে জাগিয়ে তোলেনি। ডিটেকটিভ হোমস তার থেকে অনুমান করলেন, চুরি করেছে কুকুরের কোনও ঘনিষ্ঠজন। পরে ধরা পড়ল, চুরি করেছিল জমিদারের আস্তাবলরক্ষক স্বয়ং– অসদুদ্দেশ্যে।
মিঞা সায়েব সোৎসাহে বললে, বিলকুল সহি বাৎ! সেপাই দুটো তার ভাই-বেরাদর, ইয়ার-দোস্তকে অতি অবশ্যই তাদের বে-ইজ্জতির কাহিনী বলেছিল। তারা কিছু করল না, কমান্ডানটও কিছু করল না, এমনকি যেটা কম-সে-কম মিনিমামেসট সিভিল, পুলিশকে তদন্ত করার জন্য আদেশ করল না। অর্থাৎ কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করল না। বিগলিতার্থ যা স্বাভাবিক যা প্রত্যাশিত সেটা ঘটল না। কেন?
অন্য গুহ্য খবর আমার না থাকলেও আমি এর থেকে এই অর্থই বের করতুম, কর্নেল কর্তা ওদের বুঝিয়ে বলেছেন,
এখনও তোদের সময় হয়নি।
যেথায় চললি যাসনি কো ধনি।
অর্থাৎ এ তাবৎ প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও যে পরিমাণ সৈন্য পশ্চিম পাক থেকে জোগাড় করা হয়েছে সে-সংখ্যা দিয়ে লীগ এবং তাদের অন্ধ সমর্থক পাগলা পাবলিককে শায়েস্তা করা যাবে না। তোদেরও সময় আসবে, মোকা পাবি তোটা দিলসে জাসে দাদ নেবার।
ফিনফিনে ধুতি পাঞ্জাবি পরা ১৯২০/৩০-এর স্টাইলে চুলকাটা, ঘাড় কানের কাছে প্রায় কামানো এক ফুল-বাবু বললে, অর্থাৎ, স্যাকরার টুং টুং, কামারের এক ঘা।
মিঞাজি ভুরু কুঁচকে বললেন, এক ঘা নয়, চক্কোত্তি। একশো ঘা।
এক সিলেটি কারবারি ফ্রানস দেশে চালান দেয় কোলাব্যাঙ। কুমিল্লার আশেপাশে খুদ শহরের সর্বাঙ্গে এন্তের বিজ্ঞাপন সেঁটেছে, এখানে কোলাব্যাঙ ক্রয় করা হয়; কোলাব্যাঙের স্থলে কোনও কোনও বিজ্ঞাপনে আছে ঘাড় ব্যাঙ। এক খাস আগরতলি তাকে শুধাল, কিও হাজি, তুমি মুরগির চালান বন্ধ করে দিয়েছ? মিঞা হজ করার জন্য সুদূর মক্কা যাওয়া দূরে থাক, ঢাকা-চাটগা অবধি তার দৌড়। পরে এসেছে শার্ক স্কিনের পাতলুন, সিল্কের প্রিনকোট। এর অদ্ভুত হাজি ডাকনাম হল কী করে সে এক রহস্য এবং খাটো কান শুধাল, কিতা?
শিপ্রা কারও কথা কেটে আপন কথা কয় না। এস্থলে তার উত্তেজিত কৌতূহল ব্যত্যয় বাধাল। সঙ্গে সঙ্গে শুধাল, হাজি সায়েব, কিতা মানে কী?
এতাবৎ ভদ্রা শিপ্রা কাউকে উপেক্ষা করেনি, আবার কারও প্রতি বিশেষ দৃষ্টিনিক্ষেপও করেনি।
