শিপ্রা বললে, মফস্বলের লোকের আহারাদি হয় মৌসুমে যা পাওয়া যায় তাই দিয়ে। এখানে দেখি নেবুর দোসর আনারস।
তাই তো লোকে বলে বাঘের দুধও মেলে। বাঘিনীও দুধ দেয় বিশেষ অবস্থায়। এখানে সর্বাবস্থায় বাঘ তো পেটে বাচ্চা ধরে না– বাঘ ভি দুধ দেয়। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে অবস্থা বড়ই সঙ্গিন। বর্ডারে এখন আর রাইফেলধারী পুব বাঙলার পুলিশ নেই– তাদের স্থলে এসেছে মেশিনগান, নানাবিধ অটোমেটিক হাতে পাঞ্জাবি পাঠান আর্মিমেন– পশ্চাতে আর্মার্ড গাড়ি। কাছেই কুমিল্লা কেনটনমেন্ট, ময়নামতীর ঘাঁটি। হাজার হাজার সেপাই-অফিসার আবজাব করছে। পূর্বাঞ্চলে কুমিল্লাতেই পশ্চিমাদের সবচেয়ে ডাঙর কেনটনমেন্ট।
শিপ্রার আবছা আবছা মনে পড়ল, বাগডোগরা, এই আগরতলা এমনকি শিলচর কিছুটা দূরে হলেও সবকটাই ইন্ডো-পাক বর্ডারের কাছাকাছি বলে সর্বত্রই এমনকি প্লেনের ভিতরও তার কানে এসেছে মাত্র একটি টপিক। সেটা রহস্যময় ও প্রশ্নে প্রশ্নে কণ্টকিত। সুদ্দমাত্র লীগকেই যদি শায়েস্তা করতে হয় তবে কামান কেন, ট্যাঙ্ক কেন, সাঁজোয়া গাড়ি কেন? তবে কি ইন্ডিয়া অ্যাটা করার জন্য? তাই হবে। কারণ শেষ গুজব, লীগ-ইয়েহিয়াতে সমঝোতা হয়ে গিয়েছে। ভারত যদি আক্রান্ত হয়, চীন কি তবে ফের দুশমনি করবে?
আরও কতশত প্রশ্ন।
খেয়েই শিপ্রা মারল ছুট– অনন্তকাল ধরে সে ঘুমুবে।
নিদ্রা-রেকর্ডে কুম্ভকর্ণের নাসিকা-গর্জন গোল্ড মেডেল পেয়েছে কিন্তু রেকর্ড কৃত্তিবাস স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, ক্ষুদ্র নিদ্রাকৰ্মটি কিন্তু হেঁদো। রইলেন শ্রীবিষ্ণু। অনন্তশয্যা। কিন্তু অবতার এবংকিংবা অংশাবতার হয়ে যখন অবতীর্ণ হতেন। তন্দ্রাবস্থায়? হা, ধিক! শাস্ত্রাদির সম্যক অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ রাখার কুফল বক্ষ্যমাণ পুস্তক।
তবু, অন্তত এটুকু বলা যেতে পারে সেই দিন-যামিনীর শিপ্রা-নিদ্রা তার পূর্বতর রেকর্ড। তর্কাতীত ছ লেংথে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছিল।
ঘুম একটুখানি কেটেছে মাত্র। সঙ্গে সঙ্গে শিপ্রা অনুভব করল, দুটি ছোট কোমল হাত– মেয়েছেলেরই নিশ্চয় তার পা টিপে দিচ্ছে, কিন্তু চাপেতে যে জোর, সেটা যেন পুরুষের। একটুখানি চোখ মেলে ক্ষীণালোকে দেখল, পাহাড়ি মেয়ে। এখানকার পাহাড়িদের নাম কু কী– কিন্তু শিপ্রার মনে হচ্ছে, আর পাঁচজন বাঙালিদের মতো গারো, লুসাই, কুকি সবই বরাবর।
কণ্ঠে অত্যন্ত বিরক্তি মিশিয়ে শুধাল, তোমাকে পা টিপতে বলেছে কে?
কুণ্ঠিত কণ্ঠ : কেউ না। আমার মিসিবাবা হয়রান হয়ে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়লে আমি তখন পা টিপে দিতুম। সে আরামসে বেশি ওৎ ঘুমুত। আমি আরও দু মিনিট পরে চলে যেতুম– আপনার মালুম ভি হত না।
বাঁচালে, বাবা। পা টেপো আর যাই টেপো, চুলটা তো আঁচড়ে দেবে। নইলে হাতের নড়া খসে যেত– খুশি হল শিপ্রা।
কটা বেজেছে?
গ্যারহ সে জ্যাদা।
সর্বনাশ! ওদিকে কানে আসছে মফস্বলের বারান্দায় শ্যামবাজারি রকের তুফান।
হন্তদন্ত হয়ে উঠে বললে, আয়া, তুমি ওদের গিয়ে বল, আমি এখুনি আসছি, ওদের কেউ যেন না পালায়। মফস্বলি এটিকেটের বাড়াবাড়ি অম্লান বদনে মেনে নেওয়াটাও এটিকেট নয়। আর ফিরে এসে এখুনি চুলটা আঁচড়ে দাও। আলোটা জ্বালো।
সঙ্গে সঙ্গে অকস্মাৎ মাথার কোন অজানা কোণ থেকে একটা সুনিশ্চিত সিদ্ধান্ত তার মনে ভেসে উঠল, লারি যে মির্জাকে বলেছিল, তামাম পুব বাঙলার ওপর স্টিমরোলার চালানো হবে সেইটেই ঠিক। সে যখন গভীর নিদ্রায় অচেতন তখন তার অবচেতন মনে নানা গুজব নানা তথ্যের কাটাকুটি করে সিপ্লিফিকেশন অঙ্কের মতো এই সরল রেজালটে পৌঁছেছে। কিন্তু আশ্চর্য! এই নিয়ে এত যে বচসা, ভবিষ্যদ্বাণী ঘাঁটিতে ঘাঁটিতে সে শুনল, কেউ তো একবারের তরেও বলল না, ট্যাঙ্ক সাঁজোয়া গাড়ির ছয়লাপ, হয় ভারতকে ভয় দেখাবার জন্য কোনও গভীর কূটনৈতিক চাল, নয় সরাসরি ভারতকে আক্রমণ। সবাই বিনা চিন্তায় ধরে নিয়েছে, নিছক সেঁদরি কাঠের লাঠি নিয়ে লম্ফঝম্প করছে লীগ, যদি তাদের অন্য কোনওপ্রকারের অস্ত্রের ব্যবস্থা থাকত, তবে সেটা কস্মিনকালেও গোপন থাকত না। অতএব ট্যাঙ্ক-কামান ভারতের তরে কিউ. ইউ, ডি। শিপ্রার মনে হল, তারা ওজনের আঁকে ধুরন্ধর পোদ্দারের মতো অতখানি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যুক্তিতর্কের সিটিটাকে যাচাই করে দেখেনি। এরিথমেটিকের অঙ্ক কষেছে তার অবচেতন মন; এদের সচেতন মন যেন জিওমেট্রির স্বতঃসিদ্ধ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে চলে গেছে জিওমেট্রিক টেনজেনটে সরাসরি বিপরীত মুখে।
.
১৭.
আয়া খোঁপাটা বাধল কোন দূর বা নিকট পাহাড়িনী স্টাইলে সে সমস্যার সমাধান না করেই ছুটল বারান্দার হাইড পার্কি মিনি-মিটিঙের দিকে। দূর থেকেই লেডি-সুলভ মাঝারি গলায় বলল, আপনারা কোনও তকলিফ করবেন না, প্লিজ। আমি একপাশে বসে শুধু শুনব।
প্রথমটায় ওস্তাদি গানের অবতরণিকা আলাপের মতো বাক্যালাপ কিঞ্চিৎ মন্দ মধুর কৃচিৎ কাকলির সুর ধরেছিল বটে কিন্তু পেটের ভিতরকার তরল দ্রব্যগুণ যাবে কোথা? দ্রুত তেতালে স্থগিত দারুণ সংগ্রামে তারা ফিরে এলেন, দ্যাখ তো না দ্যাখ, ডার্বি ঘোড়া ধূলির ঝড় উড়িয়ে।
সুস্পষ্ট দুটি দল। মধ্যপন্থা জনশূন্য। স্বয়ং চেয়ারম্যান খান খনে ফ্রন্ট বেঞ্চার খনে চেয়ার আসীন।
