কীর্তি চিন্তিত মনে আসমান-জমিন অনুসন্ধান করতে লাগল।
শিপ্রা ডান দিকে একটু সরে বসে কীর্তির উরুতে হাত রেখে বললে, কীর্তি-প্রিয়া।
পেটুক গাণ্ডেপিণ্ডে খেতে খেতে মারা গিয়েছে তবু ভোজনকর্মে বিরতি দিতে পারেনি, এ দৃশ্যটি প্রাচীন দিনের বন্নভোজনের একাধিক পরিবেশক চোখের সামনে দেখেছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু স্পর্শকাতর রূপের পূজারি, সুন্দরের পিয়াসীদের সামনে প্রকৃতি অকৃপণ হস্তে ছবির পর ছবি, দৃশ্যের পর দৃশ্য, রূপের পর রূপ ঢেলে দেন তবে সে বেশিক্ষণ সেদিকে তাকাতে পারে না। তার হৃদয় তখন আকুলিবিকুলি করে প্রত্যেকটি দৃশ্যের রস দিয়ে সে যেন তার হিয়া রাঙিয়ে নিতে পারে– শ্রীকৃষ্ণ যে রকম সুন্দরী রাধাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, রাধে, তোমার চোলির রঙ দিয়ে আমার মস্তকাভরণ রাঙিয়ে দাও, (রাধা কি তবে ভ্রমবশত, না স্বেচ্ছায়, বুক চিরে তারই রক্ত দিয়ে কানুর মস্তকের চূড়া লালে লাল রঙিয়ে কৃষ্ণচূড়ার জন্ম দিলেন?)– যাতে করে দুর্দিনে প্রাণের রসধারা যখন শুকিয়ে যায় সেই দারুণ দহনবেলায় এসব দৃশ্যের একটি একটি স্মরণে এনে নিজের ভাগ্যকে ক্ষমা করতে পারবে।
নিশ্চল হিমালয়, সচল ব্ৰহ্মপুত্র, বুকের উপর কত শত দ্বীপ শিশুর মতো প্রতিদিন বেড়ে বেড়ে বড় হয়ে উঠছে, জলের উপর ফোলা পালের স্ফীতবক্ষ বিশাল নিতম্ব মহাজনি নৌকার সারি যেন ডিমের খোসার সাইজ আর ওদেরই মতো হেলেদুলে নির্ভয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, চরের পরিবর্তে হঠাৎ জেগে উঠছে, মাথা উঁচু করে ক্ষুদ্রায়তন উমানন্দ পাহাড় কিন্তু তার আকস্মিক অপ্রত্যাশিত আবির্ভাব বুকে লাগায় চমক, গোয়ালপাড়ার ঘন সবুজ বাঁশ বেত আম-কাঁঠালের মাঝখান থেকে দাঁড়িয়ে উঠেছে হাজার হাজার অবঙ্কিম ঋজু গুবাকবৃক্ষের শুভ্রতা। কত দেখবে পিয়াসী শিপ্রা!
সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
গৌহাটি, শিলচর শেষটায় আগরতলা। টসটসে ভেজা ব্লটিঙের মতো তার সৌন্দর্য গ্রহণশালার ভাণ্ডারী আর কোনও নবীন রস নিতে সম্মত হয়নি। শুধু শিলচর থেকে ত্রিপুরা পাহাড়ের উপর দিয়ে প্লেন যাচ্ছে তখন কীর্তি ডান দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, এই তোমার বাল্যসখী বিকিস্-এর দেশ, সিলেট।
ধড়মড়িয়ে উঠে দেখে, বিকি সত্যি বলেছিল, ফ্ল্যাট পুব বাঙলার মতো সবুজে সবুজ তো বটেই, মাঝে মাঝে উঁচু-নিচুর টিলাটালি, ক্ষুদে ক্ষুদে পাহাড়, আর সমস্ত দেশটা আঁকা-বাকা নদী-নালায় ভর্তি– সবুজ জেব্রার উপর ফালি ফালি ঘোলাজল স্বচ্ছ জলের ডোরা। মাঝে মাঝে আবার দিঘিও তো। না, স্মরণে এল বিলকিস্ বলেছিল ওগুলো হাওর, লম্বা-চওড়ায় অনায়াসে পাঁচ-সাত মাইল জুড়ে জল– মোস্ট ডেঞ্জারাস। শুধু দেখতে পেল বিকিসের বর্ণনার ময়ূরের মতো পেখম-মেলা বিরাট বিরাট কৃষ্ণচূড়ার নিচে, টিলার উপরে চা-বাগানের কলঘর, সানুদেশে চা গাছের ঝোঁপ, পাশের টিলার উপর ম্যানেজারের নির্জন নিঃসঙ্গ ছিমছাম বাঙলো– প্লেন যাচ্ছিল খুবই উঁচু লেভেলে।
আগরতলায় যে বাঙলোতে তারা উঠল সেটা উঠবার সিঁড়ি থেকে বাথরুমে জমাদার ঢোকবার দরজা পর্যন্ত সবকিছু মেগনাম সাইজের। বাড়িটা বানিয়েছিল এক ইংরেজ– ত্রিপুরা থেকে বিশ্বের জুগুলোতে একদা সে হাতি সাপ্লাই করত পাইকিরি হিসেবে, অন্য লোক যে রকম ভেড়া-ছাগল বিক্রি করে। নীলকরদের কুঠির মতো এক একটা কামরা আস্ত এক-একটা জলসাঘর– ছাত যে কোন উঁচুতে দেখতে হলে দুরবিনের প্রয়োজন। তাবৎ বাড়িটা জুড়ে যেন হাঁ করে সবকিছু গিলে ফেলে বিশাল বিস্তীর্ণ হলঘর। প্রটেস্টান্ট ইংরেজ যেন ক্যাথলিক পোপের ভাটিকানকে পরাস্ত করতে চেয়েছিল। দেশে ফেরার সময় বাড়িটা বিক্রি করতে গিয়ে দেখে, ত্রিপুরার লোকের কাছে হাতি ঘরকি মুরগি বরাবর বলে তারা বর্মার রাজদত্ত উপহার শ্বেতহস্তী পোষার খরচটা সম্বন্ধে আগাপাশতলা ওকিবহাল। অতএব শেষটায় এই শ্বেতোত্তর হস্তী ক্রয় করলেন আমাদের কলকাত্তাই খানের আব্বাসাহেব, বড়া খান।
শিপ্রা প্রথম পদার্পণের সময় এসব কিছুই লক্ষ করেনি। স্বপনচারিণীর মতো বাথরুমে ঢুকল। বেরিয়ে সোজা ডাইনিংটেবিলে। সেখানে ইতোমধ্যে এসে গেছেন দুই ইয়ারের স্থানীয় ইয়ারের দু পাঁচজন। সামনে গেলাস। শিপ্রা দেবীকে পরম ভক্তিভাবে নমস্কার জানিয়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আপন আপন গেলাস একটানে শেষ করে ফের নমস্কার জানিয়ে প্রসেশন-পদ্ধতিতে ইয়াররা বেরিয়ে গেলেন।
ক্লান্ত কণ্ঠে শিপ্রা শুধাল, এরা পালাল কেন? আমি কি বাঘ?
খান তাড়াতাড়ি বলল, তুমি বাঘ না, তুমি ক্লান্ত। আর এরা যাবে কোথায়? বললেই আসবে, না বললেও আসবে। ওরা মফস্বলের লোক। তাদের দুশ্চিন্তা, বেগানা লোগের সাক্ষাতে বেগমসাবের সেবার (আহারাদি) তুরু (ত্রুটি) হইতে পারে। বাদে তেনার লগে লগে আরাম করন লাগবো (শুতে যেতে হবে)।
সীমান্তপারের পাকিস্তান থেকে এসেছে একাধিক বর্ণগোত্রের মাছ। কে বলে ভারত-পাকের সাধারণ জন জন্তু-জানোয়ারের প্রতি নির্দয়? ওপারযাত্রী মা চিরতরে বিদায় নিচ্ছেন– পুত্র যেতে পারল না তার কাছে পাসপোর্ট-ভিসার অভাবে। এ পারের চাষা গিয়েছিল বর্ডার ক্রস করে ওপারে তার গুটি কবরেজের কাছে দাদিজানের জন্য কফ নিবারণের গুটি চারেক বড়ি আনতে। খুঁজে রেখেছিল পরনের দু হাতি লুঙ্গির তাঁকে। পড়ল ধরা। কাস্টমসের ছোটবাবু তার বিলিতি ফার্মাকপিয়ার ফিরিস্তিতে এই অসভ্য ওষধির নাম হল ডবল ফাইন। কিন্তু মাছের বেলা সদয়তর ব্যবস্থা তার পাসপোর্ট লাগে না, তার ট্যাক কেউ খোলে না। কালোতে এলেও ইলিশের রঙ কালো হয় না, কই ধরা পড়ার ভয়ে, পাঙাশ হয় না। দুটো বর্ডার ক্রস করে এসেছে খাসি পাহাড়ের কমলানেবু।
