আর অগুনতি লোক তোমার রুচির খুব একটা প্রশংসা করবে না, তুমি আমার মতো অপদার্থকে বেছে নিয়েছ বলে।
শিপ্রা কোনও মন্তব্য করল না। সর্বশেষ কীর্তি বলল, কুকুর ঘেউ ঘেউ করে; কাফেলা এগিয়ে যায়। দি ডগ বার্কস, দি ক্যারাভান পাসেস।
.
১৬.
বাগডোগরা অ্যারপোর্ট পৌঁছবার পাঁচ মিনিট আগে হঠাৎ শিপ্রা দেখে, পালে পালে সাদা ছোট ছোট মেঘের টুকরো যেন তেড়ে আসছে তাদের প্লেনের দিকে। প্লেন ঢুকে গেল মেঘের রাজ্যে। আবার তেমনি হঠাৎ প্লেনটা ফাঁকাতে বেরুতেই শিপ্রা দেখে পূর্ব দিগন্ত থেকে পশ্চিম দিগন্ত জুড়ে শ্বেত-শুভ্র হিমালয়। কী বিরাট, কী মহান, কী গম্ভীর সে গিরিরাজ। অথচ অতি দূর থেকে দেখছে বলে মনে হল যেন মাত্র গজ তিনেক খাড়াইয়ের এবড়ো-খেবড়ো একটা দেয়াল, পৃথিবী ইসপার-উসপার হয়েছে। পাঁচিলের উপরের প্রান্ত যেন অসমান ঝালর-কাটা– উচ্চতায় শৃঙ্গে শৃঙ্গে বিশেষ তারতম্য চোখে পড়ছে না বলে পর্বত প্রাচীরের উপরের রেখা কাটা কাটা–নীল আকাশের পটভূমিতে পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত নিরবচ্ছিন্ন প্রসারিত হয়ে।
কিন্তু হায়, ভালো করে দেখতে না দেখতেই প্লেন রানওয়ের দিকে নামতে লাগল। দূরের এবং কাছের গাছপালার পিছনে বিরাট হিমালয় পর্যন্ত ঢাকা পড়ে অদৃশ্য হল।
শিপ্রার শরীর রোমাঞ্চিত। এরকম দৃশ্য সে জীবনে কখনও দেখেনি। তার দু চোখ হরিষে বিষাদে ভরে গিয়েছে। তখন হঠাৎ মনে এল কীর্তির কথা বিস্ময়ে উত্তেজনায় তার কথা মোটেই মনে পড়েনি, তার দৃষ্টি সে দিকে আকর্ষণ করেনি। গোটা দুই খোঁচা দিয়ে বার বার শুধাল, দেখলে, দেখলে?
তোমার মাথাটা যেভাবে জানালার উপর চেপে ধরে শার্সিটা চিবোচ্ছিলে সেটার মার্জিন ধরে আমি মাত্র একটা কোণ দেখেছি। কিন্তু এর আগে আরও কয়েকবার দেখেছি।
শিপ্রার উত্তেজনা তখনও পুরো মাত্রায়; আমি প্লেন থেকে আলপস দেখেছি অনেকবার। উপর দিয়ে ফ্লাই করার সময় জিনিভার বিরাট লেক থেকে ছোট ছোট ডোবাগুলোর নাম পর্যন্ত পিন্ ডাউন করতে পেরেছি। কিন্তু এরকম ওভারহুয়েলমিং দৃশ্য কখনও দেখিনি– যেটা মানুষের সর্বচৈতন্য আচ্ছন্ন করে তার সত্তা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে। দেয়। কিন্তু কী ট্র্যাজেডি। দু মিনিট দেখতে না দেখতে সবকিছু ঢাকা পড়ে গেল।
খান সান্ত্বনা জানিয়ে বললে, কিছু ভয় নেই, শোক করার নেই। বাগডোগরা থেকে আমরা যাব গৌহাটি– অনেকখানি পথ– হিমালয়ের সমান্তরাল রেখা ধরে। পুরো পথ ধরে বাঁ দিকে গিরিরাজকে যত প্রাণ চায় দেখবে আর পেন্নাম করবে। কিন্তু কালো চশমাটা পরে নিও। নইলে চোখ ড্যামেজড হতে পারে।
শিপ্রা বিপুল বিক্রমে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে বললে, কেন? পার্বতী কি তার পিতা হিমালয়ের মুখের দিকে তাকাতেন না– না তিনি গগলস পরতেন? আর হিমালয়ের শুভ্রতা যার তুলনায় মসীতুল্য, তার প্রাতঃসূর্যরুচি শ্বেতাম্বর বর শঙ্কর? শুভদৃষ্টির লগ্নেও কি তিনি গান্ধারীর মতো চোখে ফেটা বেঁধেছিলেন?
কীর্তি বললে, ওরকম অলৌকিক কর্ম শুধু মেয়েরাই পারে। আমরা তো নহি বধূ, নহি কন্যা।
শিপ্রা ব্যঙ্গ করে টিপ্পনী কাটল, অ। বধূর জন্য পাদপীঠ সগ্রহ করাতেই সর্ব সাধনা সর্ব কামনা শেষ? বলে দেব খানকে সব? কেন? চন্দ্রবংশের সংবরণ না কে যেন সূর্যের মেয়ে তপতাঁকে রানি করতে চেয়েছিলেন বলে শ্বশুরমশাই সূর্যের দিকে অপলক চক্ষে তাকাতে তাকাতে উপাসনা করে প্রার্থনা জানাননি?
শিপ্রা কান্নায় কান্নায় ভেঙে পড়ে আর কি! প্লেন ফের আকাশে ওঠামাত্রই ধরা পড়ল মেঘ আর কুয়াশা এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত হিমালয়ের রূপরেখা ঢেকে ফেলেছে। দেবতারা কী অকরুণ, কী নিষ্ঠুর!
খান পুনরায় সান্ত্বনা দিয়ে বললে, ওসব মেঘ-কুয়াশার নুইসেন্স যে কোনও সময় কেটে যেতে পারে। ততক্ষণ নিচের দিকে তাকাও না– ব্রহ্মপুত্র নদ। ইনিও তো হিমালয়ের জন্ম নিয়ে, বাপের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে না থেকে দেশের পর দেশ অতিক্রম করে যাচ্ছেন, পথিকের তৃষ্ণা নিবারণ করে, তার অংশাবতার জনপদবধূর কলসিতে ঢুকে তাদের কাঁখে আরামসে বসে আনন্দধ্বনি ছলাৎ ছলাৎ করছেন। তার পর তিনি আদর করে কোলে তুলে নেবেন গঙ্গাকে– দু পথ ধরে দুজনাই বেরিয়েছিলেন হিমগিরি থেকে।… শুধোইগে পাইলটকে ওই মেঘবাবুদের গাত্রোৎপাটন করার আশু সম্ভাবনা আছে কি না।
কামাখ্যার উপর দিয়ে যাবার সময় কীর্তি বললে, এ জায়গার মেয়েরা বিদেশি পুরুষদের মেড়া বানিয়ে রাখে।
শিপ্রা বললে, আমাকে এখানে নামিয়ে দাও। ভালো করে দেখে নিক সব্বাই, সত্য সত্য তিন সত্যের মেড়ি কাকে বলে।
কীর্তি বললে, আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, জোর গলায়, তোমার যা ইচ্ছার জোর, উইল-পাওয়ার আছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বয়ং ব্রহ্মা বিষ্ণু তোমার অনিচ্ছায় তোমাকে স্বর্গে ইন্দ্রাণী উর্বশীর আসনে বসাতে পারবেন না, মর্তে চার্মিং মার্লেনে ডিটরিষ, সুইট, লিলিয়ান হার্ভের মাধুর্য দিতে পারবেন না। নরকে যমরাজার পাটরানি যমীর কথা দূরে থাক। আর তোমার ইচ্ছা থাকলে তুমি মেড়ি, নেড়ি, ভেড়ি যা খুশি তাই হবার শক্তি ধরো– অর্থাৎ কারও তোয়াক্কা না করে। তুমি তো কলকাতাতে এখনও একপাল মেড়া পোযো=
শিপ্রা বাধা দিয়ে বললে, থ্যাঙ্ক ইয়ু। কিন্তু বল তো, আমি কী হতে চাই?
