উনি ছিলেন বাবার ঠাকুমার নিত্যসহচরী। তুমি মাঝে মাঝে পান চিবোও বলে তোমার অনারে ওঁকে আলমারির উচ্চাসন থেকে নামিয়ে আমাদের সমাসনে বসিয়েছি।
তুমিও তো ।
সে অতি কালে-কম্মিনে। নেমন্তন্নের ভোজে বড় বেশি ঘি-চর্বি থাকলে মুখটাকে পরিষ্কার করার জন্য। বাড়িতে একা একজনের জন্য পান রে, সুপুরি রে অত বায়নাক্কা সয় কে? হ্যাঁ, আগরতলা যাচ্ছ কবে?
বাইশ কিংবা তেইশে।
আমাকে ঠিক ঠিক জানিয়ো অন্তত একদিন আগে। তুমি আমাকে পিক আপ করবে, না আমি নিজে সোজা দমদমা যাব। উয়েদার খারাপ হলে কিন্তু আমার গা গুলোয়।
কীর্তি নির্বাক, স্তম্ভিত। সে তার প্রেমনিবেদন ভিন্ন অন্ন সব অনুভূতি– ভয়, বিস্ময় ঘৃণা কোনও অনুভূতিই তার চোখে-মুখে প্রকাশ করে না। কিন্তু আজ এখন তার বিস্ময় তাকে এমনি অভিভূত করল যে সে বিস্ময় যেন তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল।
শিপ্রা তো লক্ষ করবেই। তবু সহজ সুরে বলল, কেন, কী হল?
কীর্তি সহজ সুরের অন্য দিকপ্রান্তের শেষ সীমানায়। জাত ইডিয়টের মতো চি চি শব্দ করল, তুমি, তুমি যাবে?
শিপ্রা যথেষ্ট সচেতন–কীর্তির মগজে তখন কোন ভূতের নৃত্য আরম্ভ হয়েছে। তবু সুন্দুমাত্র বিস্ময় প্রকাশ করে বললে, বা, রে! তুমি ওটা ধরে নাওনি? অবশ্য তোমার সব ট্রিপে তোমার সঙ্গে সর্বত্র যাব তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। এবারের যাত্রায় রয়েছে খান। এরকম হোস্ট কোথায় পাব আমরা? একবার একটা ছোট স্টেশন থেকে গাড়ি বেরিয়ে পড়েছে এমন সময় ধরা পড়ল হুইস্কির ন্যাজ সোডা ফুরিয়ে গিয়েছে। অমনি হোস্ট খান লম্ফ দিল এলার্ম চেনের দিকে। সবাই চেঁচাল করো কী করো কী? সামনেই সিলেটের সবচেয়ে বড় জংশন কুলাউড়া। ততক্ষণ জল দিয়েই হবে। খান গাড়ি থামাল, চাকরকে ছোটাল স্টেশনে সোডার জন্য। গার্ডের হাতে কশ টাকা জমা দিয়েছিল সে নিয়ে মতভেদ আছে। বলেছিল, এই নাও, জরিমানার পঞ্চাশ টাকা, বাকিটা রইল আরও জরিমানার জন্য। যতক্ষণ না বেয়ারা সোডা নিয়ে ফেরে ততক্ষণের ভিতর তুমি গাড়ি চালালেই ফের চেন টানব। গেস্টদের মধ্যে ছিলেন, আসামের আই. জি একজন ডাঙর সেক্রেটারি, ল অ্যান্ড অর্ডারের হর্তাকর্তা। এরা গার্ডকে মুখ দেখান কী করে? সবাই নাকি উল্টো দিকের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারে মুখ ঢেকে ছিলেন।
হঠাৎ শিপ্রা টানটান সোজা হয়ে বসে স্থির দৃষ্টিতে কীর্তির দিকে তাকিয়ে এবারে যেন–ইংরেজিতে যাকে বলে থিক অব দি ব্যাটল, বিরাট রণক্ষেত্রের যে অংশে লড়াই চলছে প্রচণ্ডতম প্রতিযোগিতায় এবং ওইখানেই খুব সম্ভব জয়-পরাজয়ের মীমাংসা হবে– সে জায়গায় পৌঁছে বলল, শোনো শ্ৰীযুত কীর্তিমান রায়চৌধুরী, তুমি ভাবছ এ মেয়েটা এগিয়ে গিয়ে স্বেচ্ছায় লোকনিন্দা গায়ে মাখতে যাচ্ছে কেন? তবে শোনো। এক নম্বর বলে ফরাসি কায়দায় ডান হাতের তর্জনী বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের উপর রেখে বলল, আমি প্রথমদিনই তোমাকে স্পষ্ট বলেছি, সমাজের কুৎসা– আই কেয়ার এ ফিগ এ পিন, এ জট, এ টিটল–
বলে মারল তুড়ি। ফের তর্জনীটি অনামিকার উপর রেখে বললে, দুই নম্বর : আমরা যেমন যেমন ঘনিষ্ঠতর হব, কুৎসার নানারকম বেরকমের ধ্বনি জেগে উঠবে চতুর্দিক থেকে, যে রকম ফিলারমনিক অর্কেস্ট্রায় হয়। বেজে উঠবে আরও যন্ত্র, আরও ধ্বনি, বাড়তে থাকবে ধ্বনির বৈচিত্র্য, ভলুম, উচ্চতা এবং শেষটায় পৌঁছবে ক্রেসেন্ডো-তে– সর্বোচ্চস্তরে– যখন একসঙ্গে সবকটা যন্ত্র তীব্রতম তুমুল নাদে হল ভরে দেবে।
আমি আগরতলা গেলে ফিরে এসেই শুনব কনসার্ট ক্রেসেন্ডোতে। ফের মারল তাচ্ছিল্যের তুড়ি।
এবারে মধ্যমা। তোমার কি লোকনিন্দা হবে–
এতক্ষণে কীর্তির কিঞ্চিৎ চৈতন্যোদয় হয়েছে। বাধা দিয়ে বললে, সেটা আমাকে বলতে দাও, তোমার যদি আপত্তি না থাকে।
বিনীত কণ্ঠে আবার যেন শিপ্রা নিবেদন করল, তা হলে তোমার কোনও ইচ্ছা, কোনও নির্দেশে আমার কোনও আপত্তি থাকতে পারে না-না-না। আমি চলব তোমার আদেশে। আমার অভ্যাস– সেটা বিধিদত্ত– আমার বক্তব্য আমি স্পষ্ট ভাষায় জোরদার গলায় প্রকাশ করি। আসলে তুমি জোরদার, ঢের ঢের বেশি জোরদার।
এখন যদি বল, না তুমি আগরতলা যাবে না আমি নত মস্তকে সে আদেশ মেনে নেব এবং আমার অনুভূতির কোনও পরিবর্তন হবে না। তার পর বসে বসে প্রহর গুনব। কবে তুমি ফিরবে। তখন সেটা ধূমধামে করব সেলিব্রেট। তুমি নিজেই স্বীকার করবে, তোমার আদেশে আমার হৃদয়-মনে কোনও জায়গায় আঁচড়টি পর্যন্ত লাগেনি।
এবারে কীর্তি বললে, আমার সামাজিক নিন্দার কথা তুলেছিলে? তুমি বহুদর্শী– তোমার মুখে এটা আদৌ মানায়। পুরুষের কুৎসা রটনা তার আয়ু কদিন? জলের তিলক কপালে কাটলে শুকোতে যতক্ষণ লাগে– বরঞ্চ বলি জিন্-এর। ওটা স্পিরিট, উপে যায় তড়িঘড়ি। দেখতে পাও না, এদেশের নিত্য দিনের ট্র্যাজেডি এমন সব পাষণ্ড যাদের কোনও কুকীর্তি কারও অজানা নয় তাদের হাতে আমরা নিত্যনিয়ত সঁপে দিই না সদ্য ফোঁটা শিউলিফুলের মতো সরল নিষ্পাপ বধূদের?
আমার বদনাম! খতিয়ে দেখলে শুনবে, অনেকেই আমাকে হিংসে করছে, কেউ কেউ আভাসে ইঙ্গিতে তোমার কাছে আমার এমন সব বদ-অভ্যাস কুকর্ম কেচ্ছা– যেগুলোর সঙ্গে জীবনে আমার কখনও পরিচয়ই হয়নি দূর থেকে সন্তর্পণে এগিয়ে দেবে; সেখানে আমার চিন্তা করার কিছুই নেই। তুমি আমাকে ভালো করেই চেনো আমার কোনও দুর্বলতা তোমার অজানা নয়। ফারসিতে বলে, দুশমন কী করতে পারে, দোস্ত যদি মেহেরবান হয়? –দু চারজন বন্ধু আমার এমন আছে যাদের শরীরে-মনে যথেষ্ট বল আছে এবং দরকার হলে যারা সক্কলের সামনে দু পাঁচজনকে ঠ্যাঙাতে হামেহাল তৈরি– তা তারা তাদের সামনেই হোক্ আর আড়ালেই হোক, তোমার-আমার সম্বন্ধে অপছন্দসই কোনও মন্তব্য করলে। কিন্তু এ কথাটার উল্লেখ করলুম, নিতান্ত কথায় কথায়, এটা অবান্তর।
