শিপ্রা চুপ করে গভীর মনোযোগের সঙ্গে সব কথা শুনে যাচ্ছিল। তার মনে পড়ল ফ্রান্সের সেই বুড়ো জেনারেল তার পিতাকে বলেছিলেন, রাজনীতি যখন দেউলে হয়ে যায় তখন সে রাজনীতির উদ্দেশ্য সফল করতে হয় অন্য মাধ্যমে, অস্ত্রশস্ত্রের মাধ্যমে, অর্থাৎ পুরোপুরি সংগ্রাম চালিয়ে। তার মনে চিন্তা এল, ইয়েহিয়া ঢাকায় যে রাজনীতির চাল চালছে তাতে লীগ কিস্তিমাত হবে না। অতএব দমননীতি অনিবার্য। কীর্তিকে শুধাল, তোমাদের পকেট-ক্লাবে তোমাদের সঙ্গে বসে তো মাত্র একটি মাদ্রাজি রঙ্গনাথন। সে কী বলল?।
কীর্তি উৎসাহিত হয়ে বললে, তুমি সত্যি সত্যি অদ্ভুত একটা সিথ সেনসের মালিক। নানা প্রকারের ইঙ্গিত সত্ত্বেও যখন সদানীরব তামিল সন্তান রাম-গঙ্গা কিছুই বলল না, তখন সে যখন টয়লেট যাচ্ছে তখন লারি তার সঙ্গ নিয়ে তাকে করল ফ্রন্টেল অ্যাটাক কিন্তু ওর জিভের আর্তরাইটিস সারাবে, লারি! আমাকে অবশ্য লারি সম্বন্ধে তার মন্তব্য প্রকাশ করল দুটি শব্দে নোজি পার্কার।
শিপ্রা বললে, তার মানে টিকটিকি বিভীষণ, রঙ্গনাথন সেভেন্থ সেন্স্ ধরে। তোমার সম্বন্ধে তার কী ধারণা জানো? মাস তিনেক পূর্বে আমারই এক পার্টিতে ওর পাশে গিয়ে বসেছি এমন সময় তুমি লন ক্রস করছিলে তখন, অ অল থিংস, বলে কি না, আমি যদি মেয়েছেলে হতুম তবে ওই চ্যাপিটাকে নিশ্চয়ই বিয়ে করতুম।
কীর্তি বললে, শূর্পণখার দেশে মেয়েরাই পুরুষকে তাড়া লাগায়। আর্য রামচন্দ্র, আদিকবি বাল্মীকি এ তত্ত্বটা জানতেন না বলে মেয়েটাকে নির্লজ্জা, বেহায়া ঠাউরে তাকে নিয়ে মশকরা করেছেন। দাঁড়াও, আমি বেয়াত্রিচেকে একবার ফোন করি। আজ তার অফ ডে বটে, বাড়ি ফেরার পথে তবু একবার ঢু মেরে যাবে বলেছিল। আমাদের দুই ইয়েহিয়া-দাসের হালটা কী।
ফরাসি কেতার বেডরুমে রোমানসের মৃদু সুবাস। সেখানে ফোন।
শিপ্রা তাড়াতাড়ি জলচৌকিটা সরাল এ ঘর থেকে। পাতল একখানা ডবল সাইজের শেতল-পাটি, করভুরয়ের ওড়ওলা কুশন– ওগুলো অতটা পিছলোয় না– একপ্রান্তে ছোট্ট শ্বেত পাথরের রেকাবিতে দুটি চাপা ফুল, অন্য প্রান্তে মুরাদাবাদি পানদান। নিজে শুয়ে পড়ল ঠিক মাঝখানে। বাঁ হাতে লম্বা হান্ডিলওলা আভাশেপের মসৃণতম রুপোর হাত-আয়না– ফরাসি স্টাইলের, অন্য হাতে বাজু সোনার পাতে মোড়া হাতির দাঁতের সিলেটি চিরুনি।
কীর্তি ফিরে এক নজরে সব দেখে বললে, আহ! এই তো দিল-আরাম গুলিস্তান, আর তুমি পরী–
নীলবসনা সুন্দরী–
বল কী? ও-বই তো ছেলে-ছোকরারা পড়ে। মেয়েরাও?
অন্তত আমি। আর মনে হচ্ছে, তোমার ওই ভি-দেশি টিকটিকিটি পাঁচকড়ির অরিন্দম না কী যেন নাম–তার শাকরেদি করতে পারেন পাকা চুলে পৌঁছনো অব্দি।
ক্লাবে আমাদের পকেট-ক্লাব কেটে পড়েছে। ওদের সঙ্গ দিচ্ছে একমাত্র খান।
খান! বল কী?
সে আজই স্থির করেছে, সুপার টিকটিকির পার্ট নিয়ে দুই ঘুঘুকে পাম্প করবে। মুখে জানিনে জানিনে বললেও সে ইসলাম ও তার ইতিহাসের অনেক গভীরে ডুব মেরেছে। সেইটে ভাঙিয়ে বলবে কনফিডেন্স ট্রিকস্টার! তার পর অতিশয় গম্ভীর মুখে ধীরে ধীরে বলল, আজ সন্ধ্যায় কিন্তু বেয়াত্রিচে একটা মারাত্মক খবর দিয়েছে। সে নিজেই নাকি প্রথমটায় বিশ্বাস করতে পারেনি– ঘুঘু যখন মির্জাকে তার মরাল চড়াবার জন্য তাকে বলল, ইয়েহিয়া এসেছে লীগকে স্রেফ ধাপ্পা মারতে। সমঝোতার কথাবার্তার বাহানায় ইয়েহিয়া শুধু সময় নিচ্ছে, পাঞ্জাব-পাঠান সৈন্য আনতে। এবং শুধু তাই নয়, লীগ যদি-বা স্ট্রাটেজি হিসেবে কিংবা মঙ্গলের জন্য ইয়েহিয়ার সর্ব শর্ত মেনে নেয়, তবুও ইয়েহিয়ার জুন্টা স্থির সমস্ত পুব বাংলার ওপর দিয়ে মিলিটারি স্টিমরোলার চালাবে।
তার অর্থ?
সরল। যে পরিমাণে ট্যাঙ্ক, আর্মাড কার আনা হচ্ছে তার থেকে বোঝা যাচ্ছে তামাম দেশটাকে খাকছার করে দেবে। অবশ্য অতখানি সবিস্তার লারি বলেনি। তাই বেয়াত্রিচের মনে ধোকা, সে ঠিক ঠিক শুনতে পেয়েছে কি না, বুঝতে পেরেছে কি না।
শিপ্রা বহুক্ষণ হল আরশি-চিরুনি একপাশে রেখে দিয়ে পুরো মন দিয়ে প্রত্যেকটি শব্দ গ্রহণ করছিল।
উভয়েই অনেকক্ষণ ধরে আপন আপন মনে চিন্তা করছিল।
শেষটায় শিপ্রা বললে, ওখানে আন্দোলন হলে পশ্চিম বাঙলা নির্লিপ্ত থাকতে পারবে না।তার পর শুধাল, আচ্ছা, বেয়াত্রিচে এ ব্যাপারে অত উৎসাহী আর কৌতূহলী কেন?
ঠিক ওই প্রশ্নটাই আমি ওকে শুধিয়েছিলুম। বললে, সে তার মার কাছে ক্লাস টেন্ অবধি পড়েছিল। তখন তাদের ইতালিয়ান রচনা সঙ্কলনে ছিল মাদসিনির বক্তৃতা স্বাধীনতা সংগ্রামের যুবাদের উদ্দেশে। সেগুলো তার মনে এমনই গভীর দাগ কেটেছে। যে সেই সময় থেকে পৃথিবীর যেখানেই যে জাতই স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেয় তখনই তার প্রতিটি খবর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। রাত্রে নাকি আবার মাদসিনির ভাষণ পড়ে তার প্রতি তার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায়।
খানদানি রক্ত আছে তার শরীরে। ও ক্লাব-বার-এর রানি, কিন্তু তোমাদের বার-এট-লর বারের চেয়ে আভিজাত্যে কোনও অংশে কম নয়।… কিন্তু আজ এ আলোচনা এখানেই থাক। আমাকে চিন্তিত তো করেই, পীড়াও দেয়।
কীর্তি সঙ্গে সঙ্গে সায় দিল। হঠাৎ পানদানটার দিকে আঙুল তুলে শুধাল, ওই মুরাদাবাদি-তাজমহলটি পেলে কোথায়?
