শিপ্রা ব্যালকনি ছেড়ে সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়াল।
স্বভাবতই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে যে-উপরে দাঁড়িয়েছে তার পায়ের দিকে চোখ পড়ে। কীর্তি চেঁচিয়ে বললে, এ কী? তোমার পা ভেজা, শাড়ির অনেকখানি ভেজা। যাও, যাও। এখুনি পা মুছে ফেল–না আমি ভালো করে আচ্ছাসে রগড়ে রগড়ে বোন্ড্রাই করে দেব?
শিপ্রা শান্ত কণ্ঠে বললে, তুমি যখন রয়েছ—
বুদওয়ারে ঢুকে শিপ্রা ডিভানে বসে পা-দুটি প্রসারিত করল। বললে, বাথরুমে বড় টাওয়েল আছে।
সঙ্গে সঙ্গে দেখ তো না দেখ তো কীর্তি গেল আর এল।
পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বললে, যা ভেবেছিলুম ঠিক তাই। পেয়েছি একটি জলচৌকি– এই নাও। সেই মধুর চিন্ময় কবিতাটিকে এবারে সশ এ করা যাবে, এই সেই পাদপীঠ।
পাদপীঠ পরে চরণ প্রসারি শয়নে বসিলা বধূ।
কিন্তু কাপড় ছাড়ো, আগে কাপড় ছাড়ো। নইলে পা যে বার বার ভিজে যাবে।
কাপড় ছাড়ি কখন? তুমি যেরকম ক্ষিপ্রবেগে ঢুকলে আর ক্ষিপ্রগতিতে বেরুলে তাতে করে দোরের গোড়ার সঙ্গে তোমার কলিশন লাগল জোর। ফলে ছিটকে এসে পৌঁছলে আরও স্পিট সেকেন্ড পূর্বে। কাপড় ছাড়ি কখন? নিয়ে আসছি শাড়ি কোনটা আনব? এখানেই ছাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটের উপর দুষ্ট হাসির আবেশ।
কীর্তির মুখের রঙ একটু বদলাল বোধহয়।
শিপ্রা হাঁটু গেড়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে বললে, তুমি কি ভুলে গেলে, কীতা, মিতা আমি মমারত্রের মতো রদ্দি পাড়ার বদ্ধ পাগল মুক্ত পাগল আর্টিস্টদের পাঁচতলা ছ-তলার উপরকার স্টুডিওতে আনাগোনা করেছি পুরো একটি বছর। ওইসব আকাশ-ছোঁয়া চিলকুঠুরির থেকে বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে মুক্ত প্রকৃতি, নগ্ন আকাশ। কুঠুরির ভিতরেও তাই। তারা প্রকৃতাবস্থায় প্রকৃতিদত্ত রূপে কেউ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পোজ দিচ্ছে, কেউ পড়ি পড়ি সোফাটার উপর অঘোরে ঘুমুচ্ছে, কেউ এক কোণে কফি বানাচ্ছে। আমি যে শেষ পর্যন্ত অপ্রকৃতাবস্থায়ই রয়ে গেলুম তার একমাত্র কারণ, মডেল হয়ে পোজ দিতে গিয়ে ওরা সর্বপ্রথম ন্যুড হয়। দি রেস্ট ফলোজ। আমি কখনও পোজ দিইনি।… আচ্ছা কোন শাড়িটা পরে আসব।
তন্মুহূর্তেই অচিন্ত্য উত্তর সেই জরি পাড়ের নীলাম্বরী?
শিপ্রা চিন্তার ভান করে বললে, সেটা তো ভেজা নয়।
???
শিপ্রা বললে, ওহো, তুমি তো পদাবলী রসের সোয়াদ জানো না, তবু তোমার সহজিয়া রসানুসন্ধানবৃত্তি তোমাকে ঠিক পথেই নিয়ে গিয়েছে। বুঝিয়ে বলি : আমি যদি নীলাম্বরীই পরি, তবে তার মূল রসটি অপূর্ণ থাকবে কেন। সে শাড়ি ভেজা না হলে তুমি গাইতে শিখবে কী করে,
চলে নীল শাড়ি নিঙাড়ি নিঙাড়ি
পরাণ সহিত মোর
এই আটটি মাত্র শব্দের মাধুর্যবৈভব প্রথম শ্রবণে কে না বিচলিত হয়েছে!
শিপ্রা বৃথা বিনয়াসক্ত নয়। নীলাম্বরী পরে নিয়ে তবু বললে, নীলাম্বরী পরতে হলে যতখানি শ্বেতাম্বরী হতে হয় আমি ততখানি ফর্সা নই।
কীর্তি চোখ বন্ধ করে আটটি শব্দে মেশানো রসের ককটেল চুক চুক করে চাখছে।
ওরে কীর্তিনাশ, বুদ্ধিনাশ, এ আটটি শব্দের রস গ্রহণ করার তরে একটা মানুষের একটা যৌবন যথেষ্ট নয়। ক-বার কটা যৌবন-জ্বালা সইতে হয় কে জানে?
শিপ্রা বললে, মডেল হয়ে পোজ দিইনি, ভেবো না তাই আমি গঙ্গোত্রীর জলে ধোয়া তুলসীপাতাটি।… সেটা বোধহয় তুমি ইতোমধ্যে খানিকটে হৃদয়ঙ্গম করে। ফেলেছ। নইলে আজ তুমি পাকি পাঁচ মিনিট লেটে আসতে না। কিংবা আমি এরই মধ্যে বাসি ফুল।
কীর্তি চুপ করে শুনল। অভিযোগের জবাবে কোনও সাফাই গাইল না। হয়তো ভেবেছে, খুদ কোতোয়ালই যখন জানে তার মগজ গড়া ফরিয়াদ বিলকুল কুটমুট ঝুটা তখন বেকার তাবৎ বাৎ বজ্রসেনের।
শিপ্রা বললে, বেয়াত্রিচে কী জানাল।
অনেক কথা। খান আর আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই। এই ঘুঘু লারিটা ইয়েহিয়ার গুপ্তচর। মোটামুটি যে কটা তথ্য জানতে এসেছে তার প্রথম, ইয়েহিয়া-মুজিবে যদি সমঝোতা না হয়, এবং ইয়েহিয়া দমননীতি চালায় তবে পশ্চিম বাঙলার হিন্দু-মুসলমান পুব বাঙলার বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন জানাবে কি? জানালে কতখানি? নকশালপন্থিদের বন্দুক-বোমা আছে? তারা সেগুলো পুব বাঙলায় পাঠাবে কি? আর কোন কোন রাজনৈতিক দলের অস্ত্রশস্ত্র আছে? পশ্চিম বাংলার জনগণ কিংবা। এবং সরকার ভারত সরকারের ওপর চাপ দেবে কি– পুব বাঙলাকে অল্ আউট সাহায্য দেবার জন্য? দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান মতিগতি কী সে সম্বন্ধে লারি অলরেডি ওকিবহাল। লারি নাকি পি করে মির্জাকে বলেছে, বুদ্র পাল রাজত্ব করে দিল্লিতে। পুব পাকে বিদ্রোহ দেখা দিলে ওই তো তাদের আল্লার পাঠানো বেহেস্তি মোকা– পুব বাঙলাকে পুরো মদত দিয়ে বিদ্রোহ সফল করা, সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে পশ্চিম পাককে চিরতরে দুবলা কমজোর করে দেওয়া। এই সামান্য তত্ত্বটি তারা এখনও সমঝে উঠতে পারেনি। তবে একথাও সত্য, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল কল-এর মতো কিছু জঙ্গি আদমি বলছেন, পুব বাঙলার বিদ্রোহ একটুখানি ছড়িয়ে পড়লেই সেখানে বিনা বাক্যব্যয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ো। পুব বাঙলাকে স্বাধীন করে দাও। পশ্চিম পাক প্রান্তে আক্রমণ করবে না। সেখানে ডিফেনসিভ স্ট্র্যাটেজি।
দ্বিতীয় বৃহৎ প্রশ্ন, মির্জার মতো যথেষ্ট বাঙালি মুসলমান পশ্চিম বাঙলায় আছে কি, যারা দিল-জান্ দিয়ে অখণ্ড পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিরুদ্ধে জোর প্রপাগান্ডা চালাবে? তারা সন্তর্পণে অর্ধপ্রকাশ্যে হুইসপারিং প্রপাগান্ডা চালাবে তো, যে ভারতের স্বার্থ পুব বাঙলাকে সাহায্য না করা। পুব বাঙলা পাকিস্তান থেকে কেটে পড়লে দক্ষিণ ভারত ঠিক ওই নজির দেখিয়েই উত্তর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে কেটে পড়বে।
