বলছিল, পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তান অভিন্ন অচ্ছেদ্য রাষ্ট্র। এক রাষ্ট্রাংশ যদি কেটে পড়ে তবে দ্রাবিড়রা যে উত্তর ভারত থেকে কেটে পড়তে চায় সে আন্দোলন কি বলবান হবে না? সেপারেটিস মুভমেন্ট আরও আবোল-তাবোল কী সব। সে মুভমেন্ট ভারতকে দুর্বল করে দেবে। পুব বাংলার আন্দোলন দৃষ্টান্ত হয়ে, অপরোক্ষে ভারতের পক্ষে ক্ষতিকর হবে। সদানন্দ, সদানীরব রঙ্গনাথন শেষটায় বলল, নোজি চ্যাপ, শুক অঁক করছে সর্বক্ষণ! বেরুবার সময় বেয়ারা কীর্তির হাতে একখানা চিরকুট দিল। তাতে লেখা :
ডার্লিং কে,
কাল আমার অফ ডে। পাঁচটায় খানের ওখানে যাব। তুমি আসতে পারবে? বাকি সব-কথা ওর সামনে হবে।
—তোমার
বি।
.
১৫.
শিপ্রা ব্যালকনির উপর অর্ধশায়িত অবস্থায় তাকিয়ে আছে পার্কের সবুজ ঘাসের দিকে। এ সময়টায় কলকাতার ঘাস তার সবুজিমা অনেকখানি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে জন অল্পে সন্তুষ্ট হতে জানে, অল্পের ভিতর বৃহতের সন্ধান পায় সে যৎসামান্য উপাদান থেকে তার রসের খাদ্য সংগ্রহ করে নিতে পারে। কলকাতায় থাকার মধ্যে আছে কী? নিচে ঘাস, উপরে আকাশ। রসগ্রাহীর কাছে দুটোই সজীব। ঘাস তার রঙ বদলায় ঋতুতে ঋতুতে। গ্রীষ্মের প্রতাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবুজ পরী তার ডানা দুটির উপর যে ক্রিম আপন হাতে তৈরি করে মাখেন তাতে নীলের পরিমাণ দিতে থাকেন কম– রঙ প্রতিদিন হলদের দিকে চলতে থাকে।
এমন সময় হঠাৎ হয়তো একদিন অকাল বৃষ্টি হল। সঙ্গে সঙ্গে পরের দিনের সার্থক করার কথা স্মরণে ক্রিমে নীলের মেকদার বাড়িয়ে দেন।
কিন্তু যে জন প্রতিদিন ওই ঘাসের দিকে না তাকায়, সবুজের ধ্যানে অন্তত ক্ষণতরে নিমগ্ন না হয় সে এই প্রাণবন্ত পরিবর্তনের রস থেকে হয় বঞ্চিত। শিপ্রা যবে থেকে প্রকৃতি সম্বন্ধে সচেতন হয়েছে সেই থেকে সে এ রস চেখে আসছে। বিলেতে দুটো শীতকালে যখন মাঠ-বাট বরফে ঢেকে শ্বেতে শ্বেতে শ্বেতময়, তখন সে সেটার সৌন্দর্য উপভোগ করার সময় কিন্তু কলকাতার সে সময়কার হলদে-ঘেঁষা সবুজ ঘাসের বিরহ-বেদনা অনুভব করেছে।
কলকাতার আকাশ অতিশয় সজীব। তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয় কৈশোরে– যখন জ্বর-সর্দির ভয় কম ছাতে শুয়ে। শহরের প্রদীপ যেমন যেমন নিভতে থাকে লাজুক আকাশবধূ তারই সঙ্গে সঙ্গে তারার মালা, অলঙ্কার একটির পর একটি পরতে থাকেন। হয়তো সে ঋতুতে প্রথমেই দেখতে পাবেন কেসিয়োপিয়া, কৃত্তিকা সাতভাই চম্পা কিংবা হয়তো বধূ প্রথমেই পরবেন কালপুরুষের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রমণিটি, তার পরই সপ্তর্ষি। চক্ষু যদি নিদ্রাহীন হয় তবে স্পষ্ট দেখতে পাবেন অরুন্ধতী, তার স্বামী বশিষ্ঠের পাশে বসে ক্ষণতম মৃদুহাস্য করছেন মিটমিটিয়ে। হয়তো সে রাত্রে আকাশে তার রঙ বদলাতে বদলাতে পরে নেবেন তার মেখলা, নীবিবন্ধ আকাশ-গঙ্গা দিয়ে, দিগ্বলয়ের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তজুড়ে। সেই কটিবন্ধ থেকে ঝুলবে কত না অত্যুজ্জ্বল ক্ষীণ-জ্যোতি, মধ্যজ্যোতির মণিমাণিক্য। আর অভিসারিকার গতিবেগ এতই মৃদুমন্দ যে সেটা চোখেই পড়ে না। হঠাৎ দেখতে পাবেন পশ্চিমাকাশের একটি গয়না নেই– তার বদলে পূর্বাকাশে আর একটি উজ্জ্বলতর মণির স্তবক।
মর্ত্যের কোন রাজ-রাজ্যেশ্বরী অভিসারে যেতে যেতে এই ইন্দ্রপুরীর মণির মতো ক্ষণে ক্ষণে অলঙ্কার পরিবর্তন করতে পেরেছেন।
কিন্তু হায়, এ বধূ রাত্রিশেষে হয়ে যাবে বিধবা। উষস দেবীর আশীর্বাদ তার তরে নয়। তার আগমনের আভাস পাওয়ামাত্রই বধু সর্ব অলঙ্কার ধীরে ধীরে বর্জন করেন। সর্বশেষে সর্বোল শুকতারা মণিটি।
শিপ্রা এ সৌন্দর্য উপভোগ করেছে বহুবার। আর সব বিষয়ে সে ইংরেজের মতো কাঁটায় কাঁটায় চলে। নিত্যদিনের রুটিন কাজকর্মে কোনও কামাই দেয় না। শুধু ডাইরি লেখার বেলায় সে আর সর্ব বাঙালির মতো গাফিলিতে পরিপক। সেই অনিয়মের ডাইরিতে, যেখানে শূন্যতারই রাজত্ব বেশি– লেখা-পাতার ওয়েসিস সামান্য। সে কটির অধিকাংশে আছে আকাশের অভিসার যাত্রা।
হঠাৎ শিপ্রার মনে নতুন ভাবোদয় হল, হৃদয়-মনের এই নবজাতক, এর কথা ডাইরিতে বলতে হবে।
ইতোমধ্যে অকালবৃষ্টি নেমে শিপ্রার পায়ের উপর সে রাতের এবং প্রতি রাতের কীর্তির মতো চুমো খেতে লাগল। শিপ্রা চোখদুটি বন্ধ করল– আহ! পা সরাল না।
আর কীই-বা দরকার! সে নেপালিশ ব্যবহার করে না। আলতা মাখে কালেভদ্রে– নিতান্ত বুড়ি নাপতেনিটাকে নিরাশ না করার জন্য।
.
যেখানে মানুষ জানে, তার প্রিয়জন আসবেই আসবে, ঠিক সময়েই আসবে, এমনকি তার কিছু পূর্বেও আসতে পারে, সেখানে প্রতীক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত মধুময়। কিন্তু যে স্থলে স্থিরতা থাকে না, আসবে কি আসবে না, সেখানে সন্দেহের দোলা হৃদয়-মন অশান্ত বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তাই আরবি প্রবাদ বলে, আল-ইন্তিজারু আশাদু মিনাল মউৎ– মৃত্যুর চেয়েও অধিক শক্তি ধারণ করে প্রতীক্ষা। কিন্তু মৃত্যু বা প্রতীক্ষা শিপ্রা-হৃদয়ের চেয়ে বলবান নয়।
দেয়ালঘড়িতে ঢং ঢং করে সাতটা বাজল। বুকটা ধক করে উঠল শিপ্রার। এ তো অসম্ভব। কীর্তি এখনও এল না!
মিনিট পাঁচেক কেটে গেল। আশ্চর্য!
কিন্তু ওই তো হেডলাইটের জোর আলো গেটের উপরে পড়েছে। ছুটে গিয়ে গেট খুলে দেয় না কেন? দারওয়ানটা অতি নিষ্কর্মা। বৃথা পাঁচ মিনিটের ওপর অযথা আরও আধ মিনিট। নাঃ! ঐত্তো।
