সর্বক্ষণ তারা কথা কইছিল পুব আর পশ্চিম বাঙলার বাঙালিদের নিয়ে। দোস্তকে বোঝাবার চেষ্টা করছিল মির্জা উভয় বাঙলার বাঙালিদের মধ্যে কোনও দোস্তি নেই। বলল, জানেন না, ১৯৬৫-র লড়াইয়ের সময় যেসব পাঞ্জাবি পাঠান সেপাই বর্ডারে পাহারা দিচ্ছিল তাদের দিন কেটেছে বাদশাহি খানা খেয়ে, নবাবের হালে। গায়ের বাঙালি মেয়েরা বিরিয়ানি কোর্মা বেঁধেছে আর পুরুষগুলো বাঁকে করে সেগুলো ডেগ-ডেগচিতে নাকে নাকে ভরে নিয়ে গিয়েছে ওদের কাছে, আর–
হঠাৎ থেমে গিয়ে বেয়াত্রিচে বললে, বাকিটা এখন না। আমার মনে হল ওই বিদেশি ঘুঘুটি আমার দিকে একবার আড়নয়নে তাকাল যেন। তুমি এখন একটা চোটা পেগ পরিমাণ হেসে আমার গালে একটি মিষ্টিমধুর ঠোনা মারো। ভাবটা, যেন আমার সঙ্গে প্রেমালাপ করছিলে।
কীর্তি কিন্তু অকৃত্রিম হাসি হেসেই ঠোনা মেরে বললে, দান্তে তো তাঁর প্রিয়া বেয়াত্রিচের সঙ্গে কদাপি রসালাপ করেনি।
দণ্ডাবতরণ করে চলেছে মৃদুপদে কীর্তি পার্টির দিকে। বিদেশি ঘুঘুকে যেন শুনিয়ে দিয়ে একটুখানি উঁচু গলায় বললে, টেক কেয়ার! খান চটবে।
কীর্তি ঘাড়টা একটু পেছনবাগে বেঁকিয়ে আরেক গাল হেসে বলল, ও আমার আন্ডার স্টাডি।
তোমার হাফ ড্রিংকটা পাঠিয়ে দিচ্ছি! বাব্বা! রসে টইটম্বুর। প্রেমের বন্যা যেন। পেটে আর এক ফোঁটাও ধরবে না।
কীর্তি চেয়ারে বসতে না বসতে শুনতে পেল বিদেশি ইয়ার যেন যৎসামান্য ব্যঙ্গের সুরে টিপ্পনী কেটে বললেন, কোনও কোনও বার-এর ভিতরে-বাইরে দু দিকেই স্বরাজ। বন্দোবস্ত আচ্ছা হ্যায়।
সুদিন বেশ কঠিন গলায় বললে, সিন্রিনা বেয়াত্রিচের পরিবার বহু ক্লাবের বহু মেম্বারের চেয়ে প্রাচীনতর। আমাদের কলকাত্তাই কায়দা শিখতে অনেকেরই সময় লাগে, মিস্টার লারি।
মির্জার মুখ একটু বেগুনি হল। যদিও তার চামড়াটা গণ্ডারের বাটা কোম্পানি কিনতে চেয়েছিল দক্ষিণ মেরু অভিযানের বুট বানাবার তরে।
লারি কিন্তু সত্যই বেয়াত্রিচের ঘুঘুবর। যেন বিরাট প্রশংসা শুনে আনন্দের হাসিতে খান খান।
ইতোমধ্যে মির্জা দাঁড়িয়ে উঠে কীর্তির সঙ্গে লারির পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন, ইনি আমাদের চৌধুরী কীর্তি সাহেব, আর ইনি মি. লারি।
মি. লারি যে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়েছেন সেটা না-দেখার ভাব। ভান করে কীর্তি ওর দিকে ভালো করে না তাকিয়ে ছোটাসে ছোটা একটা নমস্কার বলে ঝপ করে বসে পড়ল।
চাটুয্যে গুনগুন করে খানকে শুনিয়ে বললে, ব্যাটাচ্ছেলে মির্জাটা অ্যাদ্দিন ধরে আমাদের সঙ্গে ওঠবস করছে অথচ এটিকেটের এ অক্ষরটিও তার রপ্ত হল না। পরিচয় করিয়ে দেবার সময় কার নাম আগে আর কার নাম পরে বলতে হয় অ্যাটুকুন হ্রস্ব-দীর্ঘ জ্ঞান হল না।
চাটুয্যের জ্যাঠামশাই তাঁর কচ্ছপের খোল ড্রেস শার্ট বিলেত থেকে স্টার্চ করিয়ে আনতেন, আর আইনের বই বাঁধিয়ে আনাতেন প্যারিস থেকে। চাটুয্যের মামা রসাল ঘোষালকুল যে পরিবারের গুরু তাঁরই একজন ইন্ডিয়ার প্রথম লর্ড। কায়দাকেতায় কেতাদুরস্ত।
কীর্তি দরদি কণ্ঠে বললে, মি. মির্জা, আমার নাম কীর্তি চৌধুরী। পাঞ্জাবি মহাখানদানিদের মতো চৌধুরী কীর্তি নই। আমি অতিশয় সাদামাটা বাঙালি– আল্লাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
মি. লারি বড়ই অমায়িক ব্যক্তি। মৃদুহাস্যে শুধোলেন, পাঞ্জাবি হতে কি আপনার ঘোরতর আপত্তি?
কীর্তি বুড়বকের মতো মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, পাঞ্জাবি পাঞ্জাব পঞ্চ + আব– পাঁচ রকমের জল। ওরে বাবা!
লারি কীর্তির চেয়ে অধিক বুড়বকের মতো প্রশ্নভরা মুখে এর-ওর দিকে তাকালেন।
আমাদের ক্লাব-মেম্বার চাটুয্যেরই পূর্বপুরুষগণ অম্মদেশীয় শাস্ত্ররাজির ভূরি ভূরি টীকাটিপ্পনী রচনা করে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন। বক্ষ্যমাণ চাটুয্যের কাছে সংস্কৃত গোমাংস রাহমাংসবং বলা চলে না, কারণ উভয় মাংসেই তার ঔদরিক নীতি উদার, তবে সেটাকে সে মহামাংস অর্থাৎ মানুষের মাংস হিসেবে গণ্য করে। তাই এস্থলে টীকাকারের রক্ত কার গায়ে তার চেয়ে বেশি।
লারির দিকে প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে জ্ঞানদান করে বললে, শব্দার্থে অর্থহীন, ভাবার্থে মহা মূল্যবান। পাঁচ ঘাটের জল খাইনে এ-ইডিয়ামের অর্থ আমি যত্রতত্র সর্বত্র থেকে আমার পানীয় সঞ্চয় করিনে। আমার রুচি আছে। অর্থাৎ কীর্তিবাবু ফেসটিডিয়াস, বাছেন, চুস্ করেন, অর্থাৎ ভেরি choosy।
লারিকে ঘায়েল করা কঠিন কর্ম।
বললেন, বাঙালি আর্যের পূর্বপুরুষ তো পাঞ্জাব থেকে এসেছেন। তারা তো পাঞ্জাবি।
অতিশয় মৃদুকণ্ঠে সুদিন বলল, এবং তাদের পূর্বপুরুষ বাঁদর- ডারউইন বলেছে। বলেই একটি কৃত্রিম হাই চাপতে চাপতে বললে, ভেরি সরি, মিস্টার লারি। আমি অত্যন্ত ক্লান্ত, গুড নাইট। সকলের দিকে তাকিয়ে আরেকটা হাই চেপে, আরেকটা গুড নাইট হেঁকে বারের দিকে চলল।
সঙ্গে সঙ্গে সবাই উঠে দাঁড়ালেন। লারি আর মির্জা ছাড়া।
কীর্তি মনে মনে বললে, বেয়াত্রিচের সন্দটা বোধ হয় ঠিক। বাবুদের সব প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি বলে সভা ভঙ্গে ক্ষুণ্ণমনা।
তার সঙ্গে চলল মাদ্রাজি রঙ্গনাথন। সমস্ত সন্ধ্যা মুখ খোলেনি।
কীর্তি তাকে শুধাল, তুমি আর লারি যখন একসঙ্গে টয়লেট যাচ্ছিলে তখন আসতে-যেতে কী গুজুর গুজুর করছিলে?
