তার সেই বিগলিত অনুরোধ শেষ হবার পূর্বেই সমস্বরে কোরাস গান উঠল :
নিশ্চয়, নিশ্চয়
সানন্দে, সানন্দে
মেহেরবানি কিজিয়ে,
সার্টেনলি, সার্টেনলি (কোরাস)
ক্লাবটা ইন্টারন্যাশনাল, মেম্বাররা কসমোপলিটান। এ হেন অভ্যর্থনা সাতিশয় স্বাভাবিক। গ্রাম্য কবির আপ্তবাক্য এই ফ্যাশন-ক্লাবে বেশভূষোয় ঠিক ফিট করবে না কিন্তু ভিতরের রস একই। শহুরে শ্যাম্পেন আর গাঁইয়া তাড়ির ধর্ম এক, বর্ণ ভিন্ন :
যে রসে মগন
তাহাতে তখন
হোক না কুজন
হল মহাজন।
শুধু খান আর কীর্তি উদ্বাহু হয়ে পাঞ্চজন্য আমন্ত্রণে যোগ দিল না।
মির্জা সেটা বোধহয় লক্ষ করেছিলেন। কিন্তু তাতেই-বা কী? ওভারহুয়েলমিং মেজরিটি তাঁর পক্ষে। যদিও জানা কথা, আজ স্পষ্টতর হল যে আওয়ামী লীগের থান্ডারিং মেজরিটির চেয়ে ঢের ঢের বেশি কবুল করেন ভুট্টোর হুইসপারিং মাইনরিটিকে।
চাটুয্যে ফিসফিসিয়ে খানের কানে কানে বললে, ব্যাটার হাড়কিপটেমি তার লোমে লোমে খাটাশের দুর্গন্ধ ছাড়ে। কখনও কোনও বন্ধুজনকে সঙ্গে আনতে দেখেছিস? তার সামনে চিচিং ফাঁক হয়ে যাবে যে। আজ শালাকে দু তিন রোদ খাওয়াতে হবে অন্তত। বেটা উড়ে স্নবস্য সুব। ওদিকে দোস্তটি খানদানি লখনওয়ি মনিষ্যি। জাতে ওঠবার তরে কোন না তিন পাত্তর খাওয়াবে? তুই অত মুখ গুমড়ো করেছিলি কেন রে, উল্লুক?
দ্যাখ, ও ব্যাটার দেওয়া শ্যামপেন আমার কাছে বিষ্ঠে। সত্যি বলতে কি, আল্লার কুদরতে ওই মির্জা সম্বন্ধী যদি কোনওদিন দরাজদিল হয়ে যায়, তবে তার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে আর্সেনিক খেয়ে মরতে রাজি আছি আমি একশো বার।
তুই বড্ড সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস। আর আজকের এই পুব বাঙলা নিয়ে ফ্যাশনেবল কথাবার্তার মাঝখানে হঠাৎ এরকম সিরিয়াস হয়ে গেলিই-বা কেন? এই দ্যাখ না তোর এক লেঙোটার ইয়ার শ্রীমান কীর্তিকে। চাঁদপারা মুখ করে কখনও কান দিল, কখনও দিল না।
কীর্তি উঠে দাঁড়াল। বলল, আমি এক্ষুণি আসছি। বলে এমন এক বিশেষ স্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হল যেখানে রাজাও ঘোড়ায় চড়ে যেতে পারেন না, লক্ষ মোটরের মালিক ফোর্ডকেও পায়ে হেঁটে যেতে হয়।
টয়লেট থেকে ফেরার সময় বারের পাশে আসতেই বেয়াত্রিচের চোখে চোখ পড়ল। ইঙ্গিতটা অস্পষ্টতমের চেয়েও এক বাও নিচে। তবু কীর্তি বারের সর্বশেষ দণ্ডাসনে বসতেই বেয়াত্রিচে কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, তোমার সঙ্গে কথা আছে, মনামি।
ডিউটির সময় খাওয়াটা আমার পছন্দ নয়। তবু তোমার সম্মানে। কিন্তু দুটো ড্রিংকই অন মি।
আস্তে বল। নইলে বার-এর বোতলগুলো হাসতে হাসতে ফেটে পড়বে। একে তুমি লেডি, তদুপরি অবিবাহিতা লেডি। তোমার আপন কেতাদুরস্ত দেশে কখনও কোনও সিরিনা নোংরা লিরা হাতে তুলে একটা হুনোর জন্য পে করে?
না, কিন্তু আমি তোমার বন্ধু, সেইটেই আমার পরিচয় নম্বর এক। সিন্নোরা না সিস্লোরিনা– সেটাকে ঘোড়ার রেসে বলে অলসো র্যান–মানে থার্ড প্লেসও পায়নি। এবারে মন দিয়ে শোনো। এখন ঘাড় ফিরিয়ে ডান দিকে তাকিয়ো না। পরে এক ঝলকে দেখে নিয়ে, কিন্তু ভালো করে চিনে নিয়ো। তোমাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে বসে ওই যে রামছাগল মির্জাটা, তার পাশে বসেছে তার এক ইয়ার-জান্ দিলের ইয়ার–একটা শয়তান ছাগল।
কেন যে তোমাকে বলছি, জানিনে। না, জানি।
তোমরা পাচো ইয়ারে বার-এর টেবিলের পাশে বসে কত না আজেবাজে কথা বল কে বা শোনে কে বা দ্যায় কান? কালেকস্মিনে অবশ্যি দু একটা সিরিয়াস আলোচনা করো বটে, কিন্তু কেউই সিরিয়াসলি ওসব গায়ে মাখো না। তোমাদের আলোচনা পিন টু এলিফেন্ট।
তিন দিন ধরে দেখছি, ওই মির্জেটা রোজ রোজ আসছে, সাঁঝের পয়লা ঝেকেই। রোজই কানে আসছে পুব পাকিস্তান নিয়ে আলোচনা এবং রীতিমতো সিরিয়াস। তিন দিন ধরে। কেমন যেন খটকা লাগল। কাল সন্ধ্যায় লক্ষ করলুম, তোমাদের অভ্যাসমতো এক ব্যাপার থেকে অন্য ঘটনায় তোমাদের কথাবার্তা চলে গেলে ওই মির্জেটা আবার সন্তর্পণে আলোচনাটার মোড় ফেরায় পাকিস্তানের দিকে। আমি তো বার-এর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত অবধি চৌকিদারি করি, সব কথা কানে যায় না, তবু আমার মনে হল মির্জা যত না নিজের কথা কয়, তার চেয়ে প্রশ্ন শুধিয়ে শুধিয়ে সব্বাইকে ওসকায়।
কীর্তি অবিশ্বাসের সুরে কিন্তু দরদি গলায় বলল, ওসব তোমার কল্পনা, বেয়াত্রিচে ডার্লিং।
বেয়াত্রিচে বললে, কাল বেলা তিনটে অবধি তোমার মন্তব্যটা মেনে নিতে আমার বিশেষ আপত্তি হত না।
কাল বেলা তিনটেয় মির্জা বারে এলেন ওই ইয়ারকে নিয়ে। বার তখন শূন্য, আমিও দুপুরের মিনি নিদ্রায় এক কোণে টুলছি। ওই দূরের কোণটায় বারের উঁচু টুলে বসে নিচু গলায় গুজুর গুজুর আরম্ভ করলেন, মির্জা কখনও ভাঙা ভাঙা উর্দু বলে সে উর্দু আমাদের এলিয়েট রোডের যমজ– ওটা আমার সড়গড়। কখনও বলে ইংরেজি– সেটা বুঝতে আমাকে বেগ পেতে হয় অবশ্য। কিন্তু সেইটে আসল কথা নয়। আসল কথা ওরা ভেবেছে আমি অতদূর থেকে তাদের কথা শুনতে পাব না, বুঝতে পারব না। আর আমি তো সামান্য বারু-মেড়। বুওনো দিও–গুড় লর্ড তোমাদের চোখের একটি চুলের কাঁপন থেকে একশো গজ দূরে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারি, কেউ এখন কন্যাকের বদলে উইস্কি চায়, কে একটা নোভালজিনের বড়ি চায়। আর দশ হাত দূরের থেকে ওদের ঠোঁটের করতাল বাজানো থেকে বুঝতে পারব না, ওদের খুলির ভিতর কী সব বদামি আবজাব করছে? জানো, শার্লক হোমস অন্ধকারে বেড়ালের চেয়ে দেখত বেশি!
