সে সমুদ্র মেবল্।
তোমাকে বোঝানো অসম্ভব, সোম, কারণ এ জিনিস বোঝার জিনিস নয়। তোমার বহু সদগুণ আছে স্বীকার করি, কিন্তু প্রেম কী বস্তু তা তুমি জান না। কতবার দেখেছি, ছোঁড়াছুড়ী পালিয়ে গিয়ে কেলেঙ্কারী করেছে, তুমি সর্বদাই সমাজের হয়ে তাদের উপর কড়া শাসন করেছ, পুলিশের কুলিশ পাণি দিয়ে। তারা কিসের নেশায় পাগল হয়ে সমাজের সব বেড়া ভাঙল, সব দরাদরি ছিঁড়ল তুমি কখনো বুঝতে পারনি। অমি দু একবার ইঙ্গিত করে দেখেছি, তুমি অন্ধ, বরঞ্চ নৈতিক, সামাজিক ধর্ম রক্ষা করা যার সর্বপ্রধান কর্তব্য সেই পাদ্রী বুড়োবুড়ীর হৃদয়ে অনেক বেশী দরদ, তাদের চিত্ত বহুগুণে প্রসারিত।
মেব্ল্ সেই গ্রীষ্মের দুপুরে হাইড পার্কের গাছতলার বেঞ্চিতে বসে অলস নয়নে সার্পেন্টাইনের জলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন দেখছিল।
তুমি তাকে দেখেছ, বার বহু পরিবেশে দেখেছ, আমার চোখ দিয়ে দেখনি, কিন্তু তুমি জান সে সুন্দরী। অসাধারণ সুন্দরী।
হিন্দুধর্ম, হিন্দু দর্শনের অনেক কিছু আমি এদেশে এসে শুনেছি, পড়েছি; কিন্তু তার অল্প জিনিসই আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি। তার একটা, জন্মান্তরবাদ। না হলে কী করে বিশ্বাস করি সেই সামাজিক কড়াকড়ির যুগে বিনা মাধ্যমে কী করে আমাদের আলাপ হ’ল, প্রথম দর্শনেই কী করে দুজনার হৃদয়ে একে অন্যের জন্য ভালোবাসা জন্মাল। এ যুদ্ধ বিলেতের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছে, অজানা মানুষের সঙ্গে বিলেতের আলাপ পরিচয় করা এখন আর কঠিন নয়, তার ধাক্কা সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমাদের আণ্ডাঘরেও এসে পৌচেছে, সে খবর তুমি জান, কিন্তু সে যুগে দুদণ্ডের ভিতর এতখানি হৃদ্যতা পূর্বজন্মের সংস্কার ছাড়া অন্য কোনো স্বতঃসিদ্ধ দিয়ে বোঝানো যায় না।
মেবল্ আমার কাছে সমুদ্রের রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছিল।
সে সমুদ্র আমাকে নিদাঘে শীতল করেছে, শীতে আতপ্ত তৃপ্তিতে সর্ব সত্তা ব্যাপ্ত করে ভরে দিয়েছে।
বিলেতে বিয়ে করে ঘর বাঁধতে সময় লাগে। সংসার চালাবার মতো রোজগার করতে করতে বয়স প্রায় ত্রিশের কোঠায় পৌঁছে যায়। আমার কিন্তু একদিনও তর সইছিল না। তাই আমি চাকুরী নিলুষ ভারতবর্ষে। যে মাইনে প্রথম চাকরিতে ঢুকেই এখানে পাওয়া যায় তাই দিয়ে অনায়াসে দুটো সংসার পাতা যায়। কিন্তু মেবল্কে বললুম, দাঁড়াও, দেশটা প্রথম দেখে আসি, তোমার সইবে কি না। মেব্ল্ আপত্তি জানিয়েছিল, সে তখন আমার সঙ্গে নর্থ পোল, সেন্ট্রাল আফ্রিকা সর্বত্র যেতে তৈরী। আমি কিন্তু তখন তাকে দিতে চেয়েছিলুম এমন কিছু যার জন্য তাকে মাকে যেন পরে পস্তাতে না হয়। যদি দেখি ভারতবর্ষের বাতাবরণে আমাদের প্রেম তার পরিপূর্ণতা পাবে না, তবে ফিরে যাব বিলেতে, না হয় বছর কয়েক খেটে সেখানেই সংসার পাতব।
বোম্বাই কলকাতা দু-জাগাতেই আমার মন কিন্তু-কিন্তু করেছিল কিন্তু পাদ্রীর টিলার মোর ঘুরে মধুগঞ্জে পৌঁছতেই আমার মন থেকে সর্বদ্বিধা অন্তর্ধান করল। এযে আমার আয়ারল্যাণ্ডের পাড়াগাকেও হার মানায়। এই বকস্ওয়ালা কেন যে ভ্যানর-ভ্যানর করে মধুগঞ্জের নিন্দে করে আমি ঠিক বুঝতে পারিনে, বোধহয় করাটা ফ্যাশান, কিংবা হয়তো ভাবে, না করলে খানদানী সায়েবরা ভাববে ওরা বুঝি নেটিভ, কালো আদমি বনে গিয়েছে।
লণ্ডনে থেকে মধুগঞ্জ। এর চেয়ে দূরতর পরিবর্তন আমি কল্পনা করতে পারিনে।
সেই মধুগঞ্জে আমি অনেক কিছু পেলুম। ভগবান অকৃপণভাবে ঢেলে দিলেন তার সব দৌলত, তার তাবৎ ঐশ্বর্য। নৌকো বাচ থেকে আরম্ভ করে পাদ্রী টিলার মেয়েগুলি।
ভালোই। এদের কথা উঠল। তুমি জান আমি ওদের সঙ্গে ঢলাঢলি করার মতলব নিয়ে পাদ্রী-টিলায় যায় নি, কিন্তু এক জায়গায় আমার অজানাতে আমি একটি ভুল করে ফেলি। প্রাচ্যদেশের মেয়েরা যে এত স্পর্শকাতর হয় আমি অনুমান করতে পারিনি তাই আমি তাদের সামন্যতম গতানুগতিক হৃদতা জানাতেই হঠাৎ দেখি, ওরা দিচ্ছে তরুণীর অকুণ্ঠ প্রেম। আমার আপসোসের অন্ত নেই যে, সে ভালোবাসার ন্যায্য সম্মান আমি দেখাতে পারিনি। আশা করি ওরা জানতে পেরেছে যে আমি ওদের ফিরিঙ্গি বলে অবহেলা করিনি। আমি জানতুম, তুমি এই বিশ্বাসটি গুদের ভিতর জন্মাতে পারবে তোমার পাকা মুন্সিয়ানা দিয়ে, তাই তোমারই এটি সঁপে দিয়েছিলুম।
তারপর আমি বিলেতে গেলুম মেকে নিয়ে আসতে।
এই পৃথিবীর গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে সর্বত্রই প্রতি মুহূর্তে নরনারীর ভিতর প্রেম মুকলিত হচ্ছে, বিকশিত হচ্ছে, তার ফল কখনো মধুময় কখনো তিক্ত–এই হ’ল জীবনের দৈনন্দিন, গতানুগতিক ধারা। কিন্তু যদি প্রেমের মেলা দেখতে চাও, প্রেম যেখানে অন্য সবকিছু ছাপিয়ে উপছে পড়ছে তবে একটিবারের জন্য কোনো এক জাহাজে করে সপ্তাহ তিনেকের জন্য কোথায়ও চলে যেয়ো। দেখবে কী উম্মাদ অবন্ধন,মেলার ফুর্তি সেখানে চলে–ইচ্ছা করেই মেলা বলছি, কারণ এ জিনিস দৈনন্দিন নয়। জাহাজের অধিকাংশ নরনারী সেখানে সমাজের সর্বপ্রকার কড়া বন্ধন থেকে মুক্ত, প্রতিবেশীকে ডরিয়ে চলতে হয় না পাছে নে কেলেঙ্কারি কেচ্ছা সর্বত্র রটিয়ে দেয় জাহাজ মোকামে পৌঁছলেইতো সবাই ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত অবধি, কে কাকে জানাতে যাবে, কে কী করেছে? এবং সবচেয়ে বড় কথা এ তিন হপ্ত মানুষ জীবন-সংগ্রাম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, সর্বপ্রকার দায়িত্ব থেকে পূর্ণ মুক্ত। আহার হিদা আশ্রয়–এ তিন সমস্যার সমাধান হওয়া মাত্রই, তা সে যত সাময়িকই হোক না কেন,–তিন সপ্তাহ কি কম সময়?–মানুষের জাগে আসঙ্গলিপ্সা, যৌনক্ষুধা! সে যেমন বিরাট তেমনি বিকটস্থলবিশেষ। তাই এ রকম জাহাজে মানুষ এডনিস না হয়েও পায় কার্তিকের কদর মোনালিসা না হয়েও পায় ভিনাসের পূজা।
