বৃথা বিনয় করব না। আমি জানি আমি কুরূপ কুচ্ছিত নই। তাই আমার কাছে তখন বহু হৃদয় অবারিতদ্বার, বহু যুবতী আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘন ঘন সাপ খেলাবার বাঁশি বাজাতে আরম্ভ করেছে। আর দু-চারটি ভীরু লাজুক তরুণী নির্জনে পেলে ফিক করে একটুখানি হেসে কিশোর-সুলভ নীতিস্ফীত নিতম্বে সচেতন ঢেউ তুলে দিয়ে জাহাজের নির্জনতর কোণের দিকে রওয়ানা দিত।
কিন্তু আমি তো চলেছি আমার বধুর সন্ধানে। আমার ফিয়াসে, যে আমার ব্রাইড হতে যাচ্ছে, আমার বঁধু যে আমার বন্ধু হতে চলেছে। প্রপেলারের প্রতি আঘাত আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারই কাছে, এই লক্ষ লক্ষ টাকার জাহাজ, হাজার হাজার টাকার বেতন ভোগী কর্মচারীরা এরা সবাই অহোরাত্র খাটছে আমাকেই, শুধু আমাকেই, আমার রানীর কাছে নিয়ে যাবার জন্যে। ঝড়-ঝঞ্ঝায় এ জাহাজ ডুবতে পারে না, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লোপ পেলেও এ জাহাজ পৌঁছবে মার্সেলেস বন্দরে, যেখানে জাহাজ থেকে দেখতে পাব, আমাদের প্রথম পরিচয়ের দিন যে যে পোশাক পরে হাইড পার্কে বসেছিল সেই পোশাক পরে বন্দরের পারে দাঁড়িয়ে তার মভ রঙের রুমাল দোলাচ্ছে।
ভগবান কোথায়?–নাস্তিক জিজ্ঞেস করেছিল সাধুকে কৃচ্ছসাধনাসক্ত দীর্ঘতপস্যারত-চিরকুমার সাধু বলেছিলেন, তরুণ-তরুণীর চুম্বনের মাঝখানে থাকেন ভগবান। আমার হৃদয় আমার মেবলের রুমাল-নাড়ার মাঝখানে থাকবেন স্বয়ং
থাক, সোম। আগই বলেছি তোমাকে এ-সব বলা বৃথা। তবু বলছি, কেন জান? হয়তো বুঝতে পারবে, হয়তো হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারবে। অবিশ্বাস্য তো কিছুই নয়, অসম্ভবই বা কোথায়?
৪. সত্যকার শিক্ষিত লোক
১৬.
তুমি যে-সব ইংরেজদের চিনেছ তাদের ভিতর সত্যকার শিক্ষিত লোক কম। এবং যে দু-একটি লোক সাহিত্য বা অন্য কোনো রসের সন্ধান কোনো কালে বা হয়তো রাখত তারাও আণ্ডাঘরের আবহাওয়ায় পড়ে এবং রসকষহীন সরকারী-বেসরকারী কাজ করে স্কুল এবং অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে। শেলী, কীট পড়ে যে আনন্দ পাওয়া যায় তার জন্য বহু বৎসর ধরে মনে মনে হৃদয়ের অন্তস্থলে এক বিশেষ ধর্মসাধনা করতে হয়। অল্প ইংরেজই সেটা করে থাকে, এবং করলেও সে আর পাঁচজনকে সে সম্বন্ধে কোনো খবর দেয় না। তাই ইচ্ছে করেই ধর্মসাধনা’ সমাসটা ব্যাবহার করলুম, কারণ তোমারা ঐ জিনিসকে করে থাক গোপনে গোপনে। আমার মনে হয় দুটো একই জিনিস, ধর্মসাধনা এবং কাব্যসাধনার শেষ রস একই।
ফরাসীরা তোমাদের মতো শক্ত সোমখ জোয়ান যদি গালগপের মাঝখানে হঠাৎ কবিতা আবৃত্তি আরম্ভ করে তবে আর পাঁচটা ফরাসী হকচকিয়ে ওঠে না, কিংবা বিষম খায় না। ফ্রান্সে তাই কাব্যজীবন এবং ব্যবহারিক জীবনের ভিতর কোনো দ্বন্দ্ব নেই। তাদের প্রেম যে রকম অনেকখানি খোলাখুলি, সে প্রেমকে, তারা তেমনি কবিতা আবৃত্তি করে গান গেয়ে আর পাঁচ জনের সামনে রূপ দিতে, প্রকাশ করতে লজ্জিত হয় না। তাই ইংরেজ হনিমুন করতে যায় ফ্রান্দেজীবনের অন্তত ঐ কটা দিনের জন্য সে খোলাখুলি প্রেম করতে চায়। তার জীবনের এ কটাদিন তোমাদের হোলির মতো! মাতব্বর কাশীশ্বর চক্রবর্তীকেও সেদিন আমি রং মেখে সং সেজে ঢং করতে দেখেছি। মুরব্বী রায় বাহাদুর যদি প্যারিসে হনিমুনম করতে যেতেন (ভাবতেই কি রকম হাসি পায়–প্যারিসে রাস্তায় চোগা চাপকান পরা রায়বাহাদুরের সঙ্গে নোলক-পরা চেলিতে জড়ানো আট বছরের বউ!) তবে তিনি অতি অবশ্য রাস্তার পাশের গাছতলায় পঁড়িয়ে খনে গলায় ঝুলানো হারমোনিয়াম প্যা প্যার সঙ্গে ভাটিয়ালী ধরতেন,খনে বউয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে ধেই ধেই করে খেমটা কি পাকা নাচ জুড়তেন। ফ্রান্স দেশের বোতলেই শ্যাম্পেন নয়, তার আকাশে বাতাসে শ্যাম্পেন ছড়ানো।
মার্সেলেস থেকে দশ মাইল দূরে ছোট্ট শহর অ্যাকস-আঁ-প্রভাসে আমরা বিয়ে করব বলে স্থির করলুম। বিয়ের ব্যবস্থা করতে করতে যে তিনদিন লাগল সে সময়টা আমরা মার্সেলেসের সেরা হোটেলে কাটালুম আলাদা কামরায় তখনো বিয়ে হয়নি, এক ঘর করি কী করে?
ফরাসীরা তাই দেখে কত না চোখ টিপে মুচকি হাসি হাসলে। একেই বলে ইংরেজের ‘লেফাপা-দুরস্তমি’, ব্রিটিশ ডারি, তোমাদেরে ভাষায় এদিকে ঘোমটা,ওদিকে খেমটা।
সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তার ঘরে যে যেতে পারতাম না তা নয়। এমন কি হোটেলওয়ালা বুদ্ধি করে আমাদের যে দুখানা ঘর দিয়েছিল তার মাঝখানে একটি দরজা ছিল। সে দরজাটি ওয়ালপেপারের সঙ্গে এমন নিখুঁত কারিগরিতে মেশানো যে, আমাদের কারো নজরেই পড়েনি। যে লিফট-বয় আমাদের সুটকেশ ঘরে নিয়ে এসেছিল তার বুঝতে বাকি রইল না যে, প্রেমের মন্দিরে আমরা একদম গাইয়া ভক্ত,আর ফরাসীরা সেখানে আমাদেরে তুলনায় বিদগ্ধ নাগরিক পাণ্ডা। অর্থাৎ ফরাসী লিফটবয় পর্যন্ত বিলেতের ডন জুয়ানকে প্রেমের মুশায়েরায় দু-চারখানি মোলায়েম বয়েত শুনিয়ে দিতে পারে। একবাক্য ইংরিজি না বলে ছোকরা; অতিশয় সংস্কৃত কায়দায় শুধু মুদ্রা দিয়ে বুঝিয়ে দিলে দূরজাটা, কোন জায়গায় এবং সেইটেই যেন আসল কথা নয়, যেন আসল দুদিক থেকেই বন্ধ করা যায়, মেলের মুখ একটুখানি রাঙা হয়ে গিয়েছিল।
.
যে দরজা বন্ধ করা যায়, সেটা খোলা যায়। বাঙলা কথা।
জানিনে, মেব্ল্ তার দিকটে খোলা রেখেছিল কি না।
