তাহলে গোড়া থেকেই আরম্ভ করি।
একদিন কথায় কথায় আমি তোমাকে আমার বাপ-মা সম্বন্ধে কী যেন সামান্য কিছু একটা বলি। তুমি সুযোগ পেয়ে এমন একটা প্রশ্ন শুধালে যার থেকে আমি আবছা
আবছা বুঝতে পারলুম, তুমি জানতে চাও আমি আমার রক্তে এমন কোনো দ্বন্দ্ব নিয়ে জন্মেছি কি না যার তাড়নায় আত্মবিস্মৃত হয়ে আমি অপরাধের পন্থা বরণ করলুম, এখানে বলে রাখি, সে স্থলে তুমি যে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলে আমিও ঠিক সেই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতুম। কারণ অপরাধী নিয়ে আমাদের কারবার। হয় তাদের গায়ে বদ-খুন,–না হয় তারা বড় হয়েছে বদ আবহাওয়ার ভিতরে। আজ আমার আর স্পষ্ট মনে নেই তবে এটুকু এখনো স্মরণে আছে যে, তুমি কিন্তু প্রশ্নটি করেছিলে এমন সুচতুরভাবে যে, আমি কোনো অফেনস্ নিইনি।
তাই বলে রাখি, আমি আমার বাবার যেটুকু দেখেছি তার থেকে এমন কিছুই মনে পড়ছে না যা দিয়ে আমার চরিত্র বিশ্লেষণ করা যায়। তিনি ছিলেন খাঁটি আইরিশম্যান, অর্থাৎ দু মুঠো অন্ন আর তিন পাত্তর মদের পয়সা হয়ে গেলেই কাজে ক্ষান্ত দিয়ে সোজা চলে যেতেন পাড়ার মদের দোকানে তারপর তাকে আর এক মিনিটের তরে কাজ করানো যেত না। তুমি আয়ারল্যাণ্ডের মদের দোকান কখনো দেখনি, তাই তুলনা দিয়ে বলছি, সে হল কাশীশ্বর চক্রবর্তীর বৈঠকখানার মতো। সেখানে কুঁড়েমি আর গালগল্প ছাড়া অন্য কোন জিনিস হয় না–মদ সেখানে আনুষঙ্গিক মাত্র। মেয়েদের সামনে এসব জিনিস ভালো করে জমে না বলে মেয়েরা পাবে’ যায় না, চক্রবর্তীর বৈঠকখানায়ও তাদের প্রবেশ নিষেধ।
আমার বাবা ছিলেন গল্প বলায় ওস্তাদ, তাই তিনি ছিলেন পাবের’ প্রাণচক্রবর্তীর বৈঠকখানায় শুনেছি সেই ব্যবস্থা।
তার কোনো প্রকারের চরিত্র দোষ ছিল না, তাকে কোনো প্রকারের উচ্ছখল আচরণ করতে আমি কখনো দেখিনি। অথচ তিনি আমাকে জীবনে একটি মাত্র যে উপদেশ লক্ষাধিকবার দিয়েছেন সেটি ডেভিড, যা খুশি তাই করবি, কারো পরোয়া করিসনি। কেন তিনি এ উপদেশ দিতেন জানিনে, এর ভিতর কোনো দ্বন্দ্ব আছে কি না সে তুমি ভেবে দেখো। মা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু, তিনি মৃদু আপত্তি জানাতেন। বাবা তখন অন্য কথা পাড়তেন, কিন্তু যেদিনই ঝড় দুর্যোগ পাবে যেতে পারতেন না, সেদিনই আমাকে মজাদার কেচ্ছা-কাহিনী শোনাতেন এবং তার সবগুলোতেই ইঙ্গিত থাকত,–যা খুশি তাই করো, এমন কি ‘যাচ্ছে তাই করো’।
এ উপদেশ কিন্তু আমার মনের উপর কোনো দাগ কাটতে পারেনি–অন্তত তাই আমার বিশ্বাস।
এ ধরনের পরিবার আয়ারল্যাণ্ডে বিস্তর-এর মধ্যে কোনো বিদঘুঁটে নূতনত্ব নেই। এর থেকে আমি কোনো হদিস পাইনি-দেখো, তুমি পাও কি না।
তবে কি বাইরের দুষিত আবহাওয়া? এমন কোনো পৈশাচিক ঘটনা যা দেখে আমি স্তম্ভিত হয়েছি, এবং সেই স্তম্ভনের সময় আমার অজানাতে সে ঘটনাতে আমার হৃদয়মনে ঢুকে দুষ্ট জীবাণুর মত বছরের পর বছর আমার সর্ব অচেতন সত্তা বিষিয়ে দিয়ে দিয়ে শেষটায় হঠাৎ একদিন আমার মগজে ঢুকে আমায় বিবেকবুদ্ধিহীন উম্মাদ করে দিয়ে কিংবা কোনো মারাত্মক প্রবঞ্চনা–ফেদেবীকে হৃদয়ের পদ্মাসনে বসিয়ে দিনযামিনী পুজা করেছি, হঠাৎ দেখি সে মায়াবিনী, পিশাচিনী আমার বুকের উপরে বসে আমারই হৃৎপিণ্ড ছিন্ন করে রক্ত শোষণ করছে। কিংবা প্রেমের দেউলের মমতা-প্রতিমা গোপনে গোপনে বারাঙ্গনার আচরণ করছে হঠাৎ একদিন ধরা পড়ে গেল, আমার বিশ্বসংসার অন্ধকার হয়ে গেল?
না। আমার চোখের সামনে ঘটেনি। শুনেছি। তা সে তুমিও শুনেছ, সবাই শুনে থাকে, বইয়ে পড়ে থাকে।
তবে কি উল্টোটা? আবিশ্বাস্য আত্মবিসর্জন, বহুযুগের বিরহদহনের পর মধুর পুনর্মিলন, সমরে লুপ্ত পথের গৃহ-প্রত্যাগমনে মাতার বিগলিত আনন্দাশ্রু সিঞ্চন?
না। তাও দেখিনি। সেখানেও ইউ উইল ড্র ব্লাঙ্ক।
তবে হ্যাঁ, আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা, মেবল্কে দেখা তাকে পেয়েও না পাওয়া।
.
১৫.
আমার বাবা মা দুজনই এক মাসের ভিতর মারা যান। আমি বৃত্তি পেয়ে লণ্ডনে পড়াশুনা করতে এলুম।
আমার মনে হয় বড় শহরে মানুষের জীবন বৈচিত্র্যহীন। অকস্মাৎ সাঙ্ঘাতিক সেখানে কিছু একটা ঘটে না। তার কারণ বড় শহরের জীবনম্নেত বয় অতিশয় তীব্র গতিতে। তুমি তার উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছ খরবেগে। সে বেগে চলার সময় ডাইনে বাঁয়ে মোড় নেওয়া অসম্ভব। আর ছোট শহর, কিংবা গ্রামে জীবনগতি শান্ত মন্দ। সে যেন গ্রামের নদী। তার উপর দিয়ে ভেসে যাওয়ার সময় সামান্য খড়-কুটোটি নানা চক্করে বহু প্যাঁচ খেয়ে খেয়ে এগিয়ে যায়। দেখে মনে হয় তার জীবনে স্বাধীনতা অনেক বেশী।
মানুষের জীবনের উপর লণ্ডনের চাপ জগদ্দল, তার দাবী বহুল-কিন্তু বৈচিত্র্যহীন। সকাল থেকে রাত বারোটা অবধি মানুষ যে কী বদ্ধ পাগলের মতো ছুটোছুটি হুটোপুটি করে সেই তুমি মধুগঞ্জের লোক বুঝবে কী করে? এবং যতদূর দেখতে পাচ্ছি, থ্যাঙ্ক গড়, মধুগঞ্জের কখনও বুঝতে হবে না।
কিন্তু জানো সোম, সেই খরস্রোতে ভেসে ভেসে হঠাৎ আমি একদিন শেষ সীমানায় পৌঁছে গেলুম। দেখি সমুখে ঘন নীল সমুদ্র আর তার উপর ফিরোজা আকাশের ঢাকনা। বিলেতের সমুদ্র আর আকাশ সচরাচর নীল রঙের বাহার ধরতে জানে না কুয়াশা, বৃষ্টি আর বরফ তাকে করে রাখে ঘোলাটে, তামাটে, পাংশুটে। আমার সঙ্গে সমুদ্রের চারি চক্ষের মিলন হ’ল নিদাঘ মধ্যাহ্নে নীলাম্বুজ আর নীলাকাশ সেদিন বর্ষণশেষে আতপ্ত কিশোর রৌদ্রে দেহখানি প্রসারিত করে দিয়েছেন।
