উঠে গিয়ে সে সল্ট লেকে ডায়াল করল। আশ্চর্য, এক চান্সেই পেয়ে গেল। একটা নতুন খবর দিল চিন। সানফ্রান্সিসকো থেকে ভাইস-কনসাল আবার ফোন করেছিলেন। পাসপোর্ট অফিস ও কলকাতার আমেরিকান কনসালকে টেলেক্স পাঠানো হয়েছে। ডাঃ চ্যাটার্জির ফিউনারালে তার ফ্যামিলির কেউ যদি আসেন সব রকমে অন এমার্জেন্সি বেসিস মোস্ট সিমপ্যাথেটিক অ্যান্ড সিনসিয়ার সাহায্য করতে বলা হয়েছে। শুনে, হিরণ এতক্ষণে যেন একটা আশার আলো দেখতে পেল। তাহলে সে চেষ্টা করতে পারে। সে যেতে পারে।
তুমি ব্যাঙ্ক খুললেই আমাদের ফিক্সডটা ভাঙিয়ে ফেল। যা পার জোগাড় কর। কিন্তু ফিক্সে তো মাত্র দশ। আঃ! তার গলা ধরে গেছে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে, যা বলছি কর না। যা পার জোগাড় কর। যতটা পার, যেখান থেকে পার। যেভাবে পার। গয়না বাঁধা দাও। অন্তত পনের জোগাড় করে রাখ। আমি যখন যেখানে বলব, লেদুর হাতে পাঠিয়ে দেবে। আমি মার্সেদ যাচ্ছি। সম্ভব হলে আজই। লেদুকে দাও।
লেদু বলল, ন কাকা, আমার পাসপোর্ট আছে। আমিও যাব। তুমি আমার জন্যেও চেষ্টা কর। আমি হাজার তিরিশ পর্যন্ত পারব।
সুমিতার বড়মামাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে করতে, যেন সঙ্কল্প, হিরণ বলল, ঠিক আছে মামাবাবু। আমি যাচ্ছি। আর….চোখে চোখ রেখে, আজই।
সে ট্যাক্সি নিয়ে ছুটল জয়ন্তর কাছে। জয়ন্ত সেন আমেরিকান এক্সপ্রেসে আছে। সে ঢের সাহায্য করতে পারবে। সে বন্ধু।
০৫. ডাকোটা থেকে জাম্বো জেট-এ
ডাকোটায়, অ্যালুমিনিয়ামের বেঞ্চিতে বসে, কোমরে বেঁধে ক্যাম্বিসের বেল্ট, হিরণ একবার জোড়হাট গিয়েছিল। সেট লিগ্যাসিও লেদুর নেই। তবে, এয়ার ইন্ডিয়ার দোতলা জাম্বো জেট, শ দুয়েক নাকি প্যাসেঞ্জারই যাচ্ছে, এ-সম্পর্কে কোনওরকম পূর্ব-ধারণা তাদের দুজনের কারোরই ছিল না। দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত, হাতে অমন এক জবরদস্ত বিদেশ-রেখা থাকা সত্ত্বেও, গত বিশ-পঁচিশ বছর ধরে সহাস্যে হিরণ শুধু সি-অফই করে যাচ্ছিল। রান-ওয়ে ধরে ধীর ও গম্ভীরগতিতে, যেন কোথাও যাবার নেই এমনভাবে চলে সেই শান্ত, অননুমেয় ইউ টার্ন, তারপর যা ভাবতেও পারা যায়নি, সহসা স্পিড বাড়িয়ে ধোঁয়া এবং গর্জনের মধ্যে শেষ পদাঘাতে মাটি কাঁপিয়ে কেউ নীল আকাশে মিলিয়ে গেছে তীর হয়ে, কেউ ঢুকে গেছে মেঘের মধ্যে মেঘ হয়ে, যেদিন যা। গত সেপ্টেম্বরে নন্দিন ঢুকে গেল শরতের সাদা মেঘের মধ্যে। মেঘই হয়ে গেল। তখন সন্ধেবেলা, ফেব্রুয়ারির শীতের বিকেল, সেদিন আকাশ ঝকঝকে নীল, যেদিন, যখন, সুমিতা শেষবারের মতো মিলিয়ে গেল নীলিমা ও নৈরাজ্যে।
গত ২৬ বছরে শুধু রঞ্জনকেই সি-অফ করেছে তা বারপনের তো হবেই। প্রথমবার অবশ্য হাওড়া স্টেশনে, জাহাজ ছিল বোম্বে থেকে তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় ওরা চার বন্ধু, চুনী, অরুণেশ, বিষ্ণু আর রঞ্জন। বগির গায়ে টাঙানো লালু শালু: হরি সিং, ট্রাভেল এজেন্ট। এক গাড়ি লোক বিদেশ যাচ্ছে শুধু কলকাতা থেকেই। ওদের মধ্যে অরুণেশ আর রঞ্জন ফিরে এসেছিল একসঙ্গে, ৫/৬ বছরের মধ্যে। দুজনেরই তখন এফ-আর-সি-এস করা হয়ে গেছে।
রঞ্জন ফিরে গেল মাস দুই পরে। অরুণেশ গেল না।
আমার দাদা হবার কথা ছিল গাইনি। রঞ্জনই বলল, তোের আঙুল বেঁটে, তোর আঙুল বেঁটে, পদবী ধাড়া, ধাড়া; তুই অর্থোপিডিক্স কর। এবার পুজোর আগে অলিম্পিয়ায় দেখা, খুব মালটাল খেয়ে অরুণেশ একা বসে ছিল। মদ খেলে বড় বাক্যের মধ্যে অধীন ক্লজগুলো ও দুবার করে বলে, এক প্রিন্সিপালটি ছাড়া, এটা সে আগেও দেখেছে।
রঞ্জনরা এখন কোথায় দাদা? সে জানতে চায়।
মাস দুই আগের কথা, তখনও ওরা বহালতবিয়তে বেঁচে, হিরণ তাই বলেছিল, মার্সেদে। বলে মাসে কোথায় ওকে বোঝায়। আরও মদ খেয়ে অরুণেশ বলেছিল, আমার দাদা রোজগার, আনঅফিসিয়ালি বলছি আপনাকে, আনঅফিসিয়ালি বলছি, এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে, এ মাস থেকে ১০ হাজার ক্রশ করেছে।
মাসিক না দৈনিক? হিরণ ভেবে দেখল, কলকাতার বিখ্যাত অর্থোপিডিক্স সার্জন নিঃসন্দেহে দিনমজুরির কথাই বলেছে।
অথচ, অরুণেশ তার সত্যিই খুব বাঁটকুলে আর থ্যাবড়া আঙুলগুলোর দিকে অনেকক্ষণ সস্নেহে তাকিয়ে থেকে বোধহয় রঞ্জনের কথাই ভাবছিল, অথচ, দেখুন দাদা, আমি ধাড়া। আমি ধাড়া। আর রঞ্জন পড়ে আছে ধাড়ধাড়া মার্সেদপুরে। মার্সেদপুরে। তাই না? হাঃহাঃহাঃ। এবার প্রিন্সিপাল ক্লজটিতেও সে দ্বৈততা দেয়, হাঃ-হাঃ-হাঃ।
এই সেটেলাইট প্যাড থেকে মেঝেয় পদাঘাত করে, আমাকে লঞ্চ করতে আমার সাবপোস্টমাস্টার বাপের, বাপের, খরচা হয়েছিল কত জানেন দাদা? কত জানেন দাদা সাড়ে ৭০০ টাকা। জাহাজে বিস্কুট খেয়ে থাকতাম। বিস্কুট খেয়ে থাকতাম। রঞ্জনের কত লেগেছিল দাদা?
রঞ্জনের সেকালেই হাজার চারেক লেগেছিল। অরুণেশের মাত্র ৭৫০? রঞ্জন একটা স্যুট করিয়েছিল বটে মহম্মদালি থেকে হাজারখানেক তো হিরণই দিয়েছিল অফিস কো-অপারেটিভ থেকে ধার করে। তা, অরুণেশ কি ইজের পরে গিয়েছিল?
গত বছর নন্দিনীকে সি-অফ করতে যাওয়াটাও এ জীবনে ভোলার নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬। ফ্লাইট নং জিরো-জিরো-থ্রি। রাত ৯ টা। আত্মীয়-স্বজন সব ঝেটিয়ে এসেছে এয়ারপোর্টে। বিশেষ করে নন্দিনের মামার বাড়ির লোক। এয়ার ইন্ডিয়ার মূল ফ্লাইট বোম্বে থেকে। কাল সন্ধেবেলা। বোম্বে, লন্ডন, নিউইয়র্ক। সেখান থেকে ইন্টার্নাল ফ্লাইটে ক্যালিফোর্নিয়া। বেশ জটিল ভ্রমণ-সূচি। যাচ্ছে, একা। অবশ্য, এয়ার ইন্ডিয়া দায়িত্ব নিয়েছে। নিউইয়র্কে প্লেন ধরিয়ে দেবে বলেছে।
