অর্থাৎ, সেই তন্বী, শ্যামা, শিখরদর্শনা এখানে কোথায়। এত মোটালো কবে। অর্থাৎ, আমি একে বিয়ে করব না।
মানুষমাত্রই যে প্রয়াস করে থাকে ও করে বারংবার ব্যর্থ হয়, এবং তবু তা করে যায় পর্দা তুলে সুমিতার সেই প্রথম আবির্ভাবের মুহূর্তটিকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিল হিরণ, এমন সময় ওঃ-হো-হো একবার মাত্র বলে সেই থেকে নিস্ফূপ ভূপেশবাবু এই প্রথম কথা বললেন, হিরণ, আমার মনে হয় তোমার ওখানে যাওয়া উচিত। ইউ শুড গো।
কিন্তু, মামাবাবু–
কথা দেওয়ার আগেরিটায়ার্ড ভদ্রলোক বোধহয় ভেবে দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আই উইল স্ট্যান্ড ফর দ্য প্যাসেজ-মানি। তুমি অঞ্জন, জীয়ন আর তোমার মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াও।
হিরণের চোখ থেকে বৃষ্টির জল তখনও শুকোয়নি। জামা-গেঞ্জি খুলে নিংড়ে সে পাখার হাওয়ায় শুকোতে দিয়েছে। মামিমা মনে করিয়ে দিলেন, কফিটা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
টাকার প্রশ্ন নয় মামাবাবু। বৃষ্টির ছাট চোখ থেকে হাত দিয়ে মুছতে মুছতে হিরণ বলল, সে আমি জানি হয়ত হয়ে যাবে। কিন্তু পাসপোর্ট ও ভিসা? এ-সব কিছুই তো আমার নেই!
ভূপেশবাবু চুপ করে গেলেন। সুমিতার মামা তাকে পছন্দ করেন খুবই, হিরণ জানে, তাকে স্নেহ করেন। সফদরজং হাসপাতালে ইন্টার্নি তখন সুমিতা। দিদির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা। বাম, মারা, প্রিয়তমা ভাগ্নীকে তিনিই আনিয়েছিলেন সদর দিল্লি থেকে— নট ভেরি রিসেন্ট ফোটোগ্রাফ-এর অজুহাতে রঞ্জন যাকে এককথায় বাতিল করে দেয়। সেই অনিচ্ছক ঘোড়াকে লাগাম ধরে, পেছন চাপড়ে জল পর্যন্ত টেনে এনেছিল এই হিরণই— এটা তিনি কৃতজ্ঞচিত্তেই মনে রেখেছেন।
কাল মধ্যরাত থেকে এই অতি-নাটক শুরু হয়েছে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ে চলেছে বিরতিহীন একটানা–তার ওপর এই সাইক্লোনের আবহাওয়া। এর শেষ কোথায়?
যখন, যেখান থেকে সম্ভব, হিরণ এর মধ্যে বারছয়েক টেলিফোন করেছে সল্টলেকে। তাদের বুক-করা কল ওরা রেসপন্ড করেছে। এছাড়া ওরা আরও দুবার ফোন করেছে। মার্সেদ থেকে ফোন করেছিলেন ডাঃ অরোরা নামে এক পাঞ্জাবি প্রতিবেশী। জানা গেছে, শুধু রঞ্জন-সুমিতা নয়, গাড়িতে পিছনের সিটে হয়ত ঘুমিয়েই পড়েছিল ৭ বছরের জীয়ন— সেও মারা গেছে, যদিও ভূপেশবাবুকে সে আর জীয়নের কথা বলেনি। ডাঃ গ্রেওয়াল আরও জানিয়েছেন, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা খুনও হতে পারে। অঞ্জন আর নন্দিনকে উনি তাঁর বাড়িতে এনে রেখেছেন। অঞ্জনকে একটা ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। খুন শোনার পর সে বারবার অ্যাক্সিডেন্ট-স্পটে ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইছে। তার মাথায় এখন প্রতিহিংসা ছাড়া কিছু নেই।
ভূপেশবাবু পাইপ ধরিয়েছেন পরনে সুমিতার দেওয়া বিদেশি স্লিপিংসুট। অনেকক্ষণ কথা বলেননি। হিরণ বলল, তাহলে উঠি মামাবাবু?
নো। ভূপেশবাবু উঠে দাঁড়ালেন, তুমি বোস। কী বলছ তুমি হিরণ! তোমার ছোটভাই, কত ভালবাসত সে তোমাকে, আমি তো জানি। আমি, আমি তো গেছি স্টেটসে। ওদের ওখানে থেকেছি। সুমিতা, রঞ্জন দুজনেই খালি নদ-নদা করত। আর কারও কথা তো বলত না। কতবার তোমাকে যেতে বলেছে বল তো? নন্দিনের সঙ্গে তোমার টিকিটও পাঠিয়েছিল। পাঠায়নি? তুমি গেলে না।
দেখুন, মামাবাবু, পারলে আমি নিশ্চয়ই যেতাম। যদি যেতে দিত। এ কি বলতে হত আমাকে। আমার মেয়ে নন্দিন ওখানে রয়েছে, আমার নাবালক ভাইপো— কিন্তু, আমাকে যেতে দিচ্ছে কে?
না হিরণ। অঞ্জন নয়, নন্দিনও নয়। তোমার ভাই! আমি রঞ্জনের কথা বলছি। বিদেশবিভুইয়ে তার অন্ত্যেষ্টি হবে, তার আত্মীয়স্বজন কেউ থাকবে না? ওখানকার লোকে জানাবে এ লোকটা হা ঘরে, এ পৃথিবীতে এর কেউ নেই, কেউ ছিল না! নিবে-যাওয়া পাইপ টেবিলে বিচারপতির হাতুড়ির মতো ঠুকতে ঠুকতে উনি বলে গেলেন, দিস ইজ নট হাউ ইট শুড বী। একি একটা কুকুর-বেড়াল মরেছে নাকি, যে টান মেরে ওরা ভাগাড়ে ফেলে দেবে? নো-ননা,ইউ মাস্ট বী দেয়ার হিরণ। ইফ নট ফর এনিথিং এলস, ফর দ্য ডেড সোলস অনার। ইউ মাস্ট অ্যাটেন্ড দেয়ার ফিউনারাল। আমি বড্ড বুড়ো হয়ে গেছি। নইলে আমি যেতাম। ইয়েস, টু আপহোল্ড দ্য অনার অব দা ডেড! বাট ইউ ক্যান। কান্ট ইউ? ইউ। মাস্ট। গো।
অনেকক্ষণ একটানা কথা বলে ভূপেশবাবু হাঁফাতে লাগলেন। প্রথমবারের কফি ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল। মামীমা দ্বিতীয়বার কফি আনলে হিরণ চুপচাপ কফি খেতে লাগল। ক্যালিফোর্নিয়ার বে-এরিয়ার সবচেয়ে নামকরা সার্জন ডাঃ রঞ্জন চ্যাটার্জির এ পৃথিবীতে কেউ নেই! ভারতবর্ষের থেকে তার ফিউনারাল অ্যাটেন্ড করতে কেউ এল না? কুকুর…… ভাগাড়……. মুখ তুলে সে হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল, আরে, বৃষ্টি হঠাৎ থেমে আসছে। সেই জোলো হাওয়াও আর নেই তো। একই সঙ্গে সে টের পেল, তার চোয়াল শক্ত হয়ে আটকে রয়েছে, তার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে, সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত দিক থেকে তার অস্তিত্ব জুড়ে নেমে আসছে এক অজানা আত্মপ্রত্যয়, তার সারা জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে যার দৃষ্টান্ত নেই। কখনও ছিল না।
হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি। যদিও তুই, রঞ্জু, বিদেশে বেঁচে ছিলিস নদা ছাড়া একা-একাই, এতগুলো বছর, কিন্তু মৃত্যুর পর তোকে একা থাকতে দেব না। তোর মৃতদেহের পাশে আমাকে গিয়ে দাঁড়াতেই হবে। সে তুই আমার জন্য যত টাফ কাজই রেখে গিয়ে থাকিস। আমি যাব। আমি গিয়ে দাঁড়াব। আমার ভাই-এর মৃতদেহের পাশে। কেউ, কোনও কিছুই এ অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করতে পারে না। পারবে না।
