৮টার সময় চেকিং-এ ডাকল। ৮টার সময় সবাই ভেতরে চলে গেল। থেকে গেল শুধু হিরণ, আর লেদু। লেদু বলল, প্লেন উড়ে যাওয়া পর্যন্ত দেখে যাবে।
ভাগ্যিস ছিল। বোম্বে নিয়ে যাবার জন্যে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স-এর প্লেনটা, প্রথমে বলতে লাগল, লেট। তারপর রাত ১২টা নাগাদ নন্দিন সুটকেস-বোঝাই ট্রলি ঠেলে সিকিউরিটি-বেড়া পেরিয়ে হাজির। বলল, বাবা, প্লেন আসবে কাল ভোরে। আমাদের আজ এয়ারপোর্ট হোটেলে রাখবে। যান্ত্রিক গোলযোগ। বলে হাসল।
আমাদের? ওর পাশের ভদ্রমহিলা বললেন, নমস্কার। আমি সূলতা সরকার। আমিও সানফ্রান্সিসকো যাচ্ছি। খুব ভাল লেগেছে আপনার মেয়েকে। আমি ওকে নিয়ে যাব। হোটেলে আজকের রাতটা দুজনে একসঙ্গে থাকব। আপনি চিন্তা করবেন না। বাড়ি চলে যান।
লেদু আর হিরণ সারারাত এয়ারপোর্টে থেকে গেল। লেদুর মোটর সাইকেল আছে। কোথা থেকে একটা রাম কিনে আনল। সেটা শেষ করতে বার-কয়েক টয়লেটে যেতে যেতেই রাত কেটে গেল।
যান্ত্রিক গোলযোগ বলে যে মেয়ে অমন সাহসী হাসি হাসতে পারে, পরদিন ভোরে সে অমন কাণ্ড করবে তা কে ভাবতে পেরেছিল।
১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬। ভোরবেলা। হাওয়া জোরে বইছে। একটু জোলো, অন্তত শীত-শীত লাগছে বেশ। হিরণ আর লেদু শুধু ওরা দুজন তিনতলায় এয়ারপোর্টের দিকে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। প্যাসেঞ্জারদের জন্য ঢাকা করিডর দু-ভাঁজে ঢালু হয়ে নেমে গেছে প্লেনের প্রায় দরজা পর্যন্ত। প্যাসেঞ্জাররা প্লেনে উঠছে। প্লেন প্রায় দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
প্রথম ভাঁজের মুখে আগে সুলতা তারপর নন্দিনকে দেখা গেল। দু-হাতে দুটো মস্ত সুটকেস, বাঁক নিয়েই সে বাঁ-দিকে মুখ তুলে তাকায় এবং ছাদের আলসেয় হিরণ আর লেদুকে দেখতে পায়! বারান্দায় শুধু তারা দুজন। একজন বেঁটে, একজন লম্বা। ভুল হবার কথা নয়। করিডরের দ্বিতীয় ভাঁজের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসে নন্দিন সেই অপ্রত্যাশিত কাণ্ডটা ঘটায়।
সে সুটকেস দুটি ধীরে নামিয়ে রাখল। আহা, অত ভারি আর যা রোগা মেয়ে। অত বোঝা আর টানতে পারছে না বেচারা, হিরণ ভেবেছিল। কেন যে অত জিনিস দিতে গেল চিনু। কিন্তু, তা নয়। সেজন্য নয়।
তারপর, হঠাৎ, একেবারে অপ্রত্যাশিত, নীলিমা থেকে বজ্রাঘাতের মতো, বলা নেই, কওয়া নেই, দুদিকে দুই সুটকেস, মধ্যিখানে নন্দিন, করিডরের কাচের দেওয়ালে মাথা রাখল।
ঢাকা করিডর। স্বচ্ছ টানেলের মতো। খোলা থাকলেও শোনা যেত না। বেশ, অনেকটা দূরে। চোখের জল দেখা যেত না। তবু, হিরণ, বুঝল,নন্দিন কাঁদছে।
সে এক সত্যিই, বড় অসহ্য ছবি। ছবিই তো। শব্দ নেই, স্পর্শ নেই— ঢালু করিডর দিয়ে প্যাসেঞ্জাররা দ্রুত নেমে যাচ্ছে, শুধু নন্দিন একা দাঁড়িয়ে। কেঁদে চলেছে। চলচ্চিত্র যখন মুখর হয়নি, সেই সাইলেন্ট যুগের একটি লঙ-শট যেন। নিচে সাব-টাইটেল:বাবা, কী অপরাধ করেছিলাম যে এ-ভাবে যেতে দিচ্ছ: বাধা দিচ্ছ না?
সুলতা সরকার ফিরে এসে ওর পিঠে হাত রেখেছেন।
ঐ যে, সুটকেস তুলে নিচ্ছে নন্দিন। প্লেনে ওঠার সিঁড়ির নিচের দিকটা করিডর আড়াল করেছে। ওপরের অংশ পুরোটা দেখা যায়। কারুকে বিদায় দেবার জন্য কেউ দাঁড়িয়ে নেই, তবু অনেকেই হাত নেড়ে প্লেনে ঢুকল। শেষ দুই যাত্রী ছিল সুলতা আর নন্দিন। সুলতা তাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন। কিন্তু, করিডরের বাকি পথ বা সিঁড়ি থেকে নন্দিন একবার ফিরেও তাকাল না।
প্লেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
পিছুটানের তুলনায়, সামনে থেকে টানটা সব সময়েই বেশি শক্তিশালী, ভাগ্যিস। নইলে, হিরণ যা ভয় করেছিল, ফিরে না আসে মেয়েটা। বা, সে নিজেই হাত নাড়ানোর বিদায়-ভঙ্গিমা পাল্টে না বলে ওঠে, যেতে হবে না। চলে আয়! মৃতের তুলনায় যে-জীবিত, তার বেঁচে থাকা অনেক বেশি ইমপর্টান্ট, ভাগ্যিস। নইলে তো মৃতের জন্য পিছনের জন্য, বিলাপ করেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যেত।
তবে জীবন জুড়ে বিদায়-নাটকের সেরা দৃশ্য তবু এটা নয়। সেটা দেখা দিয়েছিল ক্লারা আর কুমুদকে বিদায় দেবার সময়। গ্রিস থেকে এসে, এখানে বিয়ে করে; ওরা বায় ল্যান্ড গ্রিসে ফিরে যাচ্ছে। স্থান:হাওড়া স্টেশন। ট্রেন ছাড়ার পূর্ব-মুহূর্তে শ্বেতাঙ্গিনী বন্ধুপত্নী জানালার কাছে তাকে ডেকে এনে বলল, হিরণ, তুমি তো আচ্ছা লোক। আমাদের বিয়ের পার্টিতে সামওয়ান ওয়জ মেকিং পাসেস অ্যাট ইওর ওয়াইফ অল দা হোয়াইল, আর তুমি এমন ড্রাঙ্ক হয়ে গেলে যে তা নোটিসই করলে না।
এ-সব যৌবনকালের দৃশ্য। তখন বছর খানেকও হয়নি তাদের বিয়ে হয়েছে। শুনে ভর্তি চায়ের খুরি মাটিতে আছড়ে ফেলে হিরণ ছুটে চলেছে ট্রেনের সঙ্গে আর বলে চলেছে কে, কে, তুমি নাম বলে যাও ক্লারা, প্লিজ, যে কোন শালা আর জানালায় অপসৃয়মাণ জাস্ট-ম্যারেড ক্লারা হাসতে হাসতে তখন আঙুল তুলে তার অট্টহাস্যমুখর বরকে দেখাচ্ছে… অবশ্যই ঠাট্টা। বিদায়দৃশ্যগুলির মধ্যে ত এটাই, সবাইকে ছাপিয়ে, সবচেয়ে কাছের জিনিস হয়ে আছে।
০৬. এখানে এনো না কোনও ঋণ…
২৯ এপ্রিল।
বাবা? কিচেনে ট্র্যাশ-ক্লোজেটের ওপর ঝুড়িতে আপেল আছে কয়েকটা। বড় দেখে একটা এনে রাখবে?
সকালবেলা। বাথরুমে শাওয়ারের শব্দ। নন্দিন স্নান করে নিচ্ছে। সাড়ে ৭টায় ইয়াস আন্টি তার দুই ছেলে নিয়ে আসবে। তাদের স্কুলে এবং নন্দিনকে কলেজে নিয়ে যাবে। এ-ঘরে যেদিকে তাকাও, অনেকগুলো ছোট-বড় কোয়ার্টজ ঘডি; দেওয়ালে তো বটেই, আলমারিতে, ড্রয়ারে, ডিশওয়াশারে, ওয়াশিং মেশিনে, টয়লেটে, মায় স্টিলের ডট পেনেও—সর্বত্র একটা-না-একটা ঘড়ি সাঁটা। হঠাৎ দেখলে মনে হবে নিশ্চল আমেরিকান আরশোলা সব। শুধু শুড় দুটো নড়ছে। হুশ করলেই এখুনি পালাবে।
