জড়োসড়ো হয়ে রেমি একধারে বসে ছিল। ধ্রুব গেছে খাবার আনতে। বাইরে বেরোনোর পোশাক অবশ্য তার পরাই ছিল। বদলানোর সময় পায়নি। তাই একদিক দিয়ে রক্ষে।
নানারকম দুশ্চিন্তার মধ্যেও তার হঠাৎ একটু হাসি পেল। তাদের বাইরের ঘরে বসে পুলিশ অফিসার ভদ্রলোকটি এখন কী করছেন? হাই তুলছেন কি?
গাড়ি ছাড়ার মুখে ধ্রুব খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে এসে উঠল। তার মুখে বিশ্বজয়ির হাসি।
গাড়ি ছাড়লে কামরাটি অপেক্ষাকৃত নির্জন হয়ে গেল।
ধ্রুব রেমির কাছ ঘেঁষে বসে বলল, একটা জিনিস খুব মিস হয়ে গেল, বুঝলে?
কী মিস হল?
মাল। একটা বোতলও যদি সঙ্গে থাকত।
প্রৌঢ় দম্পতি দুজনেই ওদের আড়চোখে লক্ষ করছিলেন। রেমি ছোট্ট একটা চিমটি দিয়ে বলল, চুপ। শুনবে।
ধ্রুব কানে কানে বলল, বুড়োটা মালের পার্টি। নাকটা দেখেছ? লাল। এর কাছে জিনিস আছে।
রেমি লজ্জায় সিঁটিয়ে গিয়ে বলল, চুপ করবে কি না!
করছি। অ্যাডভেঞ্চারটা কেমন লাগছে?
কী করছি তা বুঝতেই পারছি না।
তোমাকে বুঝতে হবে না। যা করেছি আমি করেছি। মিনিস্টারের গুহা থেকে তোমাকে বের করে এনেছি। দুঃখ শুধু, তর্জন-গর্জনটা শুনতে পাব না।
তোমার ভয় করছে না?
কীসের ভয়?
পুলিশ যদি খেপে যায়!
পাগল! পুলিশের বড় দায় পড়েছে কিনা!
যদি হুলিয়া বের করে!
করবে না।
রেমি কাঁচুমাচু মুখে বলল, আমার বাবা আর জয় মিলে এটা করেছে। কেন যে করল! ওরা কি জানে না তোমাকে পুলিশে ধরলে ওদেরও অপমান!
নিশ্চয়ই জানে। তার চেয়েও বড় কথা আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিলে ওদের অন্যরকম বিপদও হতে পারে। সেই মিস্টিরিয়াস জিপগাড়ি আর সেই লোকগুলো তো খুব সোজা পাত্র নয়। তাই জয়ন্ত বা তোমার বাবা এ কাজ করেননি।
রেমি বলে, তা হলে কে করল?
বুঝতে পারোনি? সোরাব-রুস্তম।
সব সময়ে হেঁয়ালি ভাল লাগে না। তুমি বলতে চাইছ শ্বশুরমশাই নিজে তোমাকে ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন?
এতক্ষণে মাথা খেলছে তোমার।
যাঃ, কী যে বাজে কথা বকো না!
লোকটাকে তুমি চেনো না, রেমি।
রেমি কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। চিন্তা করল। তার ছোট্ট মাথায় এত চিন্তা ধরতে চায় না। কেমন ঝিম ঝিম করে।
হঠাৎ চোখ চেয়ে বলল, তাই পালিয়ে এলে! পুলিশের ভয়ে?
ধ্রুব মাথা নাড়ল, পুলিশকে আমার ভয় নেই। ওরা আমার বিরুদ্ধে কেস দিতে পারত না। দিলেও টিকত না। একটু হ্যারাস করত হয়তো।
তা হলে?
কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে একটু পালটি দিচ্ছি।
কিন্তু তুমি যে পরিবারের কোনও প্রথা ভাঙতে চাও না। তবু শ্বশুরমশাইকে না বলে আমাকে নিয়ে এলে কেন?
ওইটাই তো হ্যারাসমেন্ট, আমি একা পালালে মন্ত্রীমশাই খুব একটা গা করতেন না, কিন্তু পুত্রবধূকে লোপাট করলে গা করবেন।
তুমি একটা পাগল।
সে কথা অনেকবার বলেছ।
রেমি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার মনে হয়েছিল, বুঝি আমাকে নিয়ে আলাদা একটা হানিমুন করার ইচ্ছে হয়েছে তোমার।
তাও হয়তো হয়েছে। ধরে নাও এটা হানিমুন দ্বিতীয় পর্ব।
ও বাবাঃ, প্রথম পর্ব যা গেছে, দ্বিতীয় পর্বে আর দরকার নেই।
কেন? প্রথমটা কি খুব খারাপ হয়েছিল? শুধু প্রেম তো একঘেয়ে ব্যাপার। তার সঙ্গে একটু রহস্য রোমাঞ্চ আর মারদাঙ্গা যোগ হওয়ায় ব্যাপারটা জমে গিয়েছিল না?
আমার আর জমার দরকার নেই।
আচ্ছা, এবার আর ওরকম হবে না।
কদিনের জন্য যাচ্ছি?
বেশিদিন নয়। টাকা ফুরোলেই ফিরে আসব।
আমি কি তোমার হোস্টেজ?
একথায় আচমকা সবাইকে চমকে দিয়ে হোঃ হোঃ করে হেসে ওঠে ধ্রুব। বলে, বাঃ, দারুণ বলেছ তো! হোস্টেজ! মাইরি, তোমার মাথাটা তো তেমন নিরেট নয়!
রেমি প্রৌঢ় দম্পতির দিকে চেয়ে একটু সংকুচিত হয়ে বলল, এই, কী হচ্ছে!
ধ্রুব নিজেকে সামলে নেয়।
আশ্চর্য এই যে, ধ্রুবর অনুমান ঠিক। প্রৌঢ় লোকটি একটু পরেই তার সুটকেস থেকে একটা হুইস্কির বোতল বের করে ফেলে। লোকটার চেহারায় বেশ আভিজাত্য আর অহংকাবের ছাপ আছে। কর্তৃত্ব করতেই অভ্যস্থ বোঝা যায়। খানিকটা বোধহয় কৃষ্ণকান্তের ছায়া।
ধ্রুব চট করে ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল।
চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া রেমির আর কিছুই করার ছিল না। তবে প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা রেমিকে খানিকক্ষণ সঙ্গ দিলেন। ধ্রুব আর প্রৌঢ় ভদ্রলোক বোতলে জমে গেল।
ধ্রুবর সঙ্গে বাস করে রেমির একটা জ্ঞানলাভ ঘটেছে। বোতল জিনিসটা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ লুপ্ত করে দেয়।
পুরীতে রেমি নতুন নয়। আগে আরও বার দুই এসেছে। ধ্রুবর সঙ্গে অবশ্য এই প্রথম। আর কী আশ্চর্য! ধ্রুব সঙ্গে আছে বলেই বোধহয় তার কাছে পুরী এবার সবচেয়ে মনোরম মনে হল।
সমুদ্র কি এরকম উত্তাল ছিল আগের বার? এত বিপুল, বিশাল! আকাশ কি এরকম নীল ছিল! রেমি মুগ্ধ হয়ে গেল। সম্মোহিত হয়ে গেল। যেসব সমস্যা ও সংকট পিছনে রেখে তারা চলে এসেছে তা ভুলে গেল রেমি।
ধ্রুব ঈশ্বর মানে কি না তা রেমি আজও জানে না। তাকে কোনওদিন কোনও ঠাকুর দেবতা প্রণাম করতে দেখেনি সে। আবার নাস্তিকতার সপক্ষেও কোনওদিন কিছু বলেনি।
কিন্তু ধ্রুবকে এসব বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস হয় না। রেমি সর্বদা যেন একটি অতি অনুভূতিশীল জ্যান্ত বিস্ফোরক নিয়ে কারবার করছে। একচুল ভুলচুক হলেই সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটবে। তাই আজকাল ধ্রুবর সঙ্গে সে একটু হিসেব করে কথা বলতে শিখেছে। সে জেনে গেছে, তার স্বামীটির জন্ম যে রাশি বা লগ্নে সেই রাশি বা লগ্নের লোকেরা ইহজন্মে স্ত্রীর বশ্যতা স্বীকার করে না। তাই সেই চেষ্টাও আর করে না রেমি। ধীরে ধীরে সে ধ্রুবর ব্যক্তিত্বহীন ছায়ায় পর্যবসিত হয়ে যাচ্ছে। বোধহয় এ ছাড়া উপায়ও নেই।
