দুটো দিন ধ্রুব শুধু সমুদ্রস্নান ছাড়া আর তেমন কিছু করল না। ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ল। কয়েকটা বই কিনে আনল কোথা থেকে। তাও পড়ল। কোথাও বেড়াতে-টেড়াতে গেল না।
রেমি তৃতীয় দিন সকালবেলায় বলল, জগন্নাথের মন্দিরে যাবে?
তুমি যাও, ঘুরে এসো।
তুমি চলো না!
একদম ইচ্ছে করছে না। তুমি যাও।
একা। যদি আমার কিছু হয়?
কী হবে?
ধরো কেউ যদি পিছু-টিছু নেয়!
ধ্রুব হেসে বলল, বদমাইশি হচ্ছে? আমাকে বডিগার্ড বানিয়ে নিয়ে যেতে চাও?
তুমি তো আমার বডিগার্ডই।
তা বটে, কিন্তু আত্মিক উন্নতির ব্যাপারটায় সব মানুষই একা। একাই ভাল।
আমি না তোমার সহধর্মিণী?
সেটা হলফ করে বলা মুশকিল।
কেন?
আমার ধর্ম অন্যরকম। সে ধর্ম তুমি মেনে নিতে পারবে? ধরো যদি তোমাকে একটু মাল-টাল খেতে বলি, খাবে?
কী যে বর্বর হয়েছে না!
তাই তো বলছি, বর্বরের ধর্ম আলাদা। তার সহধর্মিণী হতে নেই। জাস্ট বি মাই ওয়াইফ। নো রিলিজিয়াস কানেকশন। ভয় পেয়ো না, আমাদের পরিবারের নিজস্ব পান্ডা আছে। তাকে খবর দিলেই আসবে। খুব গার্ড দিয়ে নিয়ে যাবে তোমাকে।
রেমি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে জগন্নাথের মন্দিরেও সে গেল না।
তাঁদের হোটেলটা স্বর্গদ্বারের ওপর। বেশ বড়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সামনেই সমুদ্র এবং তার অবিরাম শব্দ। রেমি সমুদ্রে নামে না। ভয় পায়। তবে জলের ধার ধরে ধরে বেড়াতে ভালবাসে। ঝিনুক কুড়িয়ে জড়ো করে অনেক। একা। ধ্রুব প্রায় সময়েই তার সঙ্গে থাকে না।
দুপুরে রেমি সমুদ্রের ধার থেকে বেড়িয়ে ফিরে আসতেই ধ্রুব বলল, আরে, তুমি কখনও সমুদ্রে স্নান করো না কেন বলো তো!
আমার বাথরুমই ভাল।
সে তো জানি। কিন্তু বাথরুমের সীমাবদ্ধতা থেকে সমুদ্রের অসীমে একটু অবগাহন করে নিলে আয়ুটা বাড়ত।
আমার দরকার নেই। আমি সঙ্গে থাকলেও ভয়?
ও বাবা! আমি সাঁতার জানি না।
হাঁটুজলে সাঁতার জানার কী দরকার! চলো, আজ ধ্রুব নুলিয়া তোমাকে স্নান করাবে। দুটো টাকা দিয়ে দিয়ে বখশিশ।
বখশিশ এখনই দিচ্ছি। স্নান করাতে হবে না।
তাই কি হয়! নুলিয়ারা কাজ না করে বখশিশ নেয় না, চলো।
না না। আতঙ্কে রেমি তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকবার চেষ্টা করে।
ধ্রুব করাল যমের মতো রাস্তা আটকায়। তারপর জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে নিয়ে দুটো ঘুরপাক খাইয়ে ছেড়ে দিয়ে বলে, ভয় পেয়ো না। ড়ুবলে দুজনেই ড়ুবব। একই যাত্রার যাত্রী তো। চলো।
ভয় পাই যে।
ভয়টাই তো ভাঙা দরকার। ঢেউ যত বিরাট তত ভয়ংকর নয়। মানুষ বাইরেটা দেখে ভয় পায়। বুঝলে! যেমন মন্ত্রীমশাই।
তাঁকে আবার কেন?
তাঁর সঙ্গে মিল আছে। বেশ করাল চেহারার একটি ঢেউ, কিন্তু ভিতরে ঢুকে গেলে দেখা যায়, ফোঁপরা।
মোটেই নয়।
আচ্ছা, ওটা নিয়ে বরং পরে ডিবেটে বসা যাবে। এখন চলল। সমুদ্রে নামবার মতো পোশাক আছে?
না। মোটে তো কয়েকটা শাড়ি নিয়ে এসেছি।
শাড়িতেই হবে। একটু শক্ত করে গাছকোমর বেঁধে নাও।
ভয় করছে যে!
বললাম তো ড়ুবলে দুজনেই ড়ুবব। তা ছাড়া জানালা দিয়ে চেয়ে দেখো, তোমার মতো কত মহিলা স্নান করছে। কত ধুড়ি বুড়ি ছুঁড়ি। দেখছ?
দেখেছি।
চলো তা হলে।
দুরু দুরু বুকে অগত্যা যেতেই হয় রেমিকে।
ঢেউ দেখে যত পা এগোয় তার দ্বিগুণ পিছিয়ে যায় রেমি। ও বাবা, সে বাঁচবে না নামলে। দুম দাম শব্দে জল এসে ফাটছে বালুর ওপর।
কিন্তু ধ্রুব ছাড়ার পাত্র নয়। শক্ত করে হাত চেপে ধরে বলল, যদি না নামো তা হলে আজই আমি ব্রেকিং পয়েন্ট পেরিয়ে চলে যাব।
তার মানে?
আর ফিরব না। আমার জানের পরোয়া নেই, জানো তো?
কী যে সব বলো না!
রেমি প্রায় ঢেউয়ের ধাক্কাতেই পড়ে যাচ্ছিল। কী প্রলয়ংকর ব্যাপার! যেন এক পাহাড় এসে ভেঙে পড়ল মাথার ওপর। কান বন্ধ হয়ে গেলে মুখে ঢুকে গেল নুন আর বালি মেশানো জল। হাঁপসে সে অস্থির।
তবে ভেসে গেল না রেমি। ধ্রুব ধরে ছিল তাকে।
প্রথম ঢেউটা সরে যাওয়ার পর দম নেওয়ার একটু অবকাশ পেতে না পেতেই দ্বিতীয় ঢেউটা দোতলা বাড়ির সমান হয়ে ধেয়ে এল।
রেমি চেঁচাল, বাবা গো!
কিন্তু তার কোমর ধরে দুটো সবল হাত তাকে ওপরে তুলে দিল। ঢেউয়ের ওপরে। চমৎকার এক নৃত্যপর দোলাচল। পড়ে গেল রেমি, কিন্তু ধ্রুব তাকে ছাড়ল না। টেনে তুলে নিল। পায়ের নীচে সরষেদানার মতো বালি সরে যাচ্ছে। এক শিরশিরে অনুভব।
ভয় ভেঙে গেল তৃতীয় ঢেউটার পর।
ধ্রুব বলল, ড়ুব দিয়ো না। মুখোমুখি ঢেউটাকে কনফ্রন্ট কোরো না। কাত হয়ে দাঁড়াও। লাফাও।
রেমি তাই করল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে সমুদ্রের গভীর ভালবাসায় পড়ে গেল। বাঃ, এরকম তার জীবনে কিছুই তো ঘটেনি আগে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাল দু জন জলে। জীবনে যত ক্ষোভ ছিল রেমির, যত অভাববোধ, তা এক মহাসমুদ্রের ঢেউ এসে ধুয়ে মুছে নিয়ে যেতে লাগল।
০৩৩. পুজো আর আম-কাঁঠালের সময়
পুজো আর আম-কাঁঠালের সময় প্রবাসী ছেলে-মেয়েদের ঘরে আসার একটা রেওয়াজ ছিল এ বাড়িতে। আজকাল নেই। সুনয়নী বেঁচে থাকলে হয়তো আসত। মা-হীন এই লক্ষ্মীছাড়া বাড়ির প্রতি তারা বোধহয় আর কোনও আকর্ষণ বোধ করে না। বড় ছেলে কনক শীতকালে একবার আসবে বলে চিঠি দিয়েছিল। পরে মত পালটায়। মেজো জীমূতকান্তির শখ ছিল বিলেত গিয়ে আই সি এস হয়ে আসবে। সেটা হয়ে ওঠেনি বলে বাবার ওপর তার কিছু রাগ বা অভিমান থাকতেও পারে। সে প্রায় সম্পর্কই রাখে না। আসা দূরে থাক, চিঠি পর্যন্ত দেয় না। এই দুই ছেলের জন্য হেমকান্তর যে বিশেষ কোনও অভাববোধ আছে তা নয়। তবে মাঝে মাঝে ওদের একটু দেখতে ইচ্ছে করে, এই মাত্র।
