০০১. বাদামতলায় রামজীবনের পাকা ঘর

বাদামতলায় রামজীবনের পাকা ঘর উঠছে ওই। সেঁদা স্যাঁতা মেঘলা সকালের ম্যাদাটে আলোয় ও যেন বাড়ি নয়, বাড়ির ভৃত। চারদিকে বড় বড় দাঁতের মতো ইটের সারি যেন খিচিয়ে আছে। গায়ে ভারা বাঁধা। দেড় মানুষ সমান দেয়াল খাড়া হতে বছর ঘুরে গেল। এখন দেয়ালে শ্যাওলা ধরেছে, ভারার বাঁশ পচতে চলল। গেল মঙ্গলবার গো-গাড়িতে সিমেন্টের বস্তা এসেছে অনেকগুলো। পাটের নিচে সেগুলো ডাঁই হয়ে আছে। ছাদ কি আর ঢালাই হবে? বিষ্ণুপদ যে গতকাল রাতে কালঘড়ি দেখেছে। ও একবার দেখলে আর কথা নেই। দরিয়া পেরোনোর সময় ঘনিয়ে এল।

কালঘড়ির কথা এরা কেউ বিশ্বাস করবে না। তাই বলেওনি কাউকে বিষ্ণুপদ। কথাটা বুকে নিয়ে, কৌটোর মুখ আট করে বন্ধ রেখে বসে আছে। আর কৌটোর মধ্যে প্রাণভোমরা চক্কর মারছে বো-বো করতে করতে। বেরোনোর পথ খুঁজছে। একটা র পেলেই পগার পার।

আজ এই মেঘলা সকালে, হাওয়ায় বৃষ্টির ঝাপটায় দাওয়ায় বসে বাদামতলার দিকে কাহিল চোখে চেয়ে আছে বিষ্ণুপদ। পারলি না তো বাপ, পেরে তো উঠলি না। তোর ঘর রোজ আমাকে মুখ ভ্যাংচায়, থাকবি বুড়ো? আয়, থাক এসে।

রামজীবনের দোষ কি? জোগাড়-যন্তর কি চাট্টিখানি কথা! এটা জোটে তো সেটা জোটে না, দুশো এল তো চারশো বেরিয়ে গেল। নাকের জলে চোখের জলে হয়ে রামজীবন তবু বাপ আর মাকে পাকা ঘরে রাখবে বলে জান বড় কম চুঁইয়ে দেয়নি। তা তার ভাগ্যটাও এমনি। এবার সব জোগাড় হল তো অলক্ষুণে বর্ষা কেমন চেপে ধরল দুনিয়াটাকে। ডাইনীর এলো চুলের মতো ঝেঁপে থাকে মেঘ। সারাদিন একদিন একটু রোদ ওঠে তো হঠাৎ ফের ভূষোকালি মাখানেমেঘ থমথম করে ওঠে দিগন্তে। তারপর হাওয়া দেয়। রণপায়ে চলে আসে বৃষ্টি। টিনের চালে দিনরাত নাচুনে শব্দ। ঘরময় বাট, কৌটো, ভেঁড়া বস্তা পাতা। চালের পুরনো টিন চালুনির মতো হয়ে এল। কটা ফুটোর জল সামাল দেওয়া যায় বাপ! নিত্যনতুন ফুটো দিয়ে জল পড়ছে ঘরে। পাকাঘর এই হল বলে, আশায় আশায় এবার আর ঘরের টিন মেরামত হয়নি। হেমেন মিস্ত্রি কয়েক জায়গায় পুটিং ঠেসে দিয়েছিল শুধু। বর্ষার তোড়ে সে সব পুটিং কবে ভেসে গেছে।

বিষ্ণুপদ যে জীবনে ঘড়ি মেলা দেখেছে তা নয়। বিষ্ণুপদর ঘড়িই নেই। কাল শেষ রাতে সে ঘড়িটা দেখতে পেল। কালো, গোলপানা, মস্ত বড়। তাতে দুখানা সাদা কাটা। একটা বড়, আর একটা ছোটো। কাটা দুখানা বাই বাই করে ঘুরে যাচ্ছে। তারপর ঘুরতে ঘুরতে গতিটা কমে এল। খুব কমে এল। তারপর একেবারে থেমে আমাত লাগল। বড় কাঁটা এক পাক মারলে ছোটাকাঁটা এক ঘর এগোয়, এটাই নিয়ম। বিষ্ণুপদ দেখল, বারোটা ঘরের মধ্যে একটা মাত্র বাকি। বড় কাঁটা খুব ধীরে ধীরে পাক খাচ্ছে আর ছোটো কাঁটাটা শেষ ঘরের দিকে এগোচ্ছে।

কথাটা একমাত্র যাকে বলা যায় সে হল, রামজীবনের মা। নয়নতারা রান্নাঘরে।

বুঝলে একমাত্র নয়নতারাই বুঝবে। বিষ্ণুপদর সব কথা নয়নতারাই একমাত্র বুঝতে পারে। পৌনে একশ বছর বেঁচে আছে বিষ্ণুপদ, নয়নতারা তার সঙ্গে লেগে আছে নাহোক পঞ্চাশ বছর। পঞ্চাশ বছর ধরেই কাছে। বিষ্ণুপদ নিশ্চয়ই সারাদিনে সর্বকথা ঠিকমতো বলে না, ঠিক কথাও বলে না। কিন্তু নয়নতারা তার সব কথাই নেড়েচেড়ে ভেবে দেখে। কালঘড়ির কথাটাও নয়নতারা ফেলবে না।

লম্বা দাওয়ার উত্তরপ্রান্তে রান্নাঘর। ভেজা ঘুটে আর সাতানো গুল দিয়ে আঁচ তুলতে আজ সকালে দমসম হয়েছে। সবাই। খুব ধোঁয়া হয়েছিল। এখন বোধহয় আঁচ উঠেছে। রান্নাঘর থেকে দুটো গলার আওয়াজও আসছে। একটা তর্ক বেধে উঠছে। ঝগড়ায় গড়াবে। ও দুজন হচ্ছে সেজো আর মেজো বউ। দুজনে প্রায়ই লেগে যায়। হাঁড়ি আলাদা হল বলে। এইসব ঝগড়া কাজিয়ায় নয়নতারা কখনও থাকে না। মাঝখানে পড়ে মিটমাটও করতে যায় না। আসলে নয়নতারা বড় ভীতু মানুষ। সবসময়ে সিটিয়ে আছে ভয়ে। মেজো বামাচরণের বউ শ্যামলীর জিভের যেমন ধার, গলার তেমনি জোর। সেজো রামজীবনের বউ রাঙা যে খুব ভালমানুষ তা নয়। তবে কমজোরি। হাঁপানী আছে। খুব ভোগে।

নয়নতারা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। হাতে একটা বড় সোলা কচু। বর্ষায় কচুঘেঁচুই সম্বল।

নয়নতারা কাছে এসে একবার বিষ্ণুপদর দিকে তাকাল। ভারী নিরীহ চোখ নয়নতারার। গরুর চোখ। বিষ্ণুপদ জানে, সে নিজেও তেমন বুদ্ধি রাখে না। তার বউ নয়নতারাও না। ভগবান তাদের একই ছাঁচে তৈরি করেছেন।

নয়নতারার কথা কম। কথা কওয়ার ধাতটাই নেই, কায়দাও জানে না। শুধু বিষ্ণুপদর সঙ্গেই যা একটু কয়। মৃদুস্বরে বলল, বৃষ্টি হচ্ছে। গায়ে ছাঁট লাগছে না তো! ঘরে গিয়ে বসলেই তো হয়।

ঘরখানা বড় আঁধার লাগে। একটু আলোয় বসে আছি।

তাহলে থাকো। একখানা চাঁদর এনে দিই, জড়িয়ে বোসো!

লাগবে না। এই বেশ আছি। কফ-কাশির ধাত তো নয়।

শরীর নিয়ে বড়াই করতে নেই। হতে কতক্ষণ। যা বাদলা হচ্ছে।

বিষ্ণুপদ কথাটা কইবার আগে ভণিতা করতে গিয়ে একটু কেশে নিয়ে বলে, তোমাকে একখানা কথা কইবার জন্য মন করছে। কবো?

বলো।

শেষ রাতে আমি কালঘড়ি দেখলাম। ব্যাপার সুবিধের নয়।

কালঘড়ি দেখলে?

তোমার মনে নাই, আমার ঠাকুর্দাও দেখেছিল! সেই যে মাঘের শেষে যেবার ঠাকুর্দা চলে গেল।

নয়নতারার মুখখানা কেমন আরও বোকাটে মার্কা হয়ে গেল। বলল, মনে আছে।

ঠাকুর্দা ঘুম থেকে উঠেই সে কী হাঁকডাক। ওরে তোরা সব তাড়াতাড়ি রান্না-খাওয়া সেরে নে, আজ আর কেউ বেরোবি না ঘর থেকে, সবাই আমার কাছাকাছি থাক, আর গঙ্গাজল তুলসী চন্দনপাটা সব রাখ হাতের কাছে। সব মনে পড়ে?

পড়ে।

সেদিন শেষ রাতে ঠাকুর্দাও কালঘড়ি দেখেছিল। আমি মস্করা করে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন ঘড়ি ও ঠাকুর্দা? তা ঠাকুর্দা যা বলেছিল ঠিক হুবহু সেইরকম দেখলাম কাল রাতে। কালো একখানা চক্কর। তাতে দুটো সাদা কাঁটা কক্কালের হাতের মতো ঘুরে যাচ্ছে।

নয়নতারার চোখ দুখানা জ্বলজুল করছে। বেচারার এ দুনিয়াতে সব থেকেও কেউ নেই, একমাত্র বিষ্ণুপদ ছাড়া। এসব কথায় তার বুক উথাল-পাথাল হওয়ার কথাই। নয়নতারা বলে, সেই দিন তো আর ঠাকুর্দা মরেনি।

না। সাতদিনের মাথায় মরল। কি হবে কে জানে! আমিও দেখলাম।

কথাটা বলা ঠিক হল কিনা কে জানে! ও মানুষটাকে একটা উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হল। নয়নতারা তো বিশেষ সুখে থাকেনি একটা জীবন।

বিষ্ণুপদ ফের বৃষ্টির ভিতর দিয়ে ময়লা আলোয় রামজীবনের ঘরটার দিকে চেয়ে রইল।

রামজীবনের আধখ্যাঁচড়া ঘর দাঁত বের করে খুব হাসছে। বাঁশের খাঁচায় আটকে আছে কতকাল।

ধপ করে উবু হয়ে বসে পড়েছে নয়নতাৱা। চোখে আঁচল। মেয়েদের কত যে কাঁদতে হয়। সংসারে রোজই এমন কিছু ঘটনা আছে যাতে মেয়েদের কাঁদতে হয়। নয়নতারাকে অনেক কাঁদতে দেখেছে বিষ্ণুপদ।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, রামজীবনের ঘরখানা শেষ হলে বেশ দেখতে হবে কিন্তু।

নয়নতারা কিছু বলল না। ঘুঘুন করে কাঁদছে। আকাশ আরও একটু কালো হয়ে গেল নাকি? আলোটা যেন মরে এল। বৃষ্টির সঙ্গে একটা দমকা হাওয়া আসছে। দমকে দমকে।

নয়নতারা ভেজা গলায় বলে, ওঠো, ঘরে যাও।

ঘরে যেতে ইচ্ছে নেই বিষ্ণুপদর। দাওয়ায় বসে এইরকম চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে আজ। জলেডোবা উঠোনের বা ধারে করবী ফুলের গাছের তলা দিয়ে ওরা তাকে নেবে। তারপর আর ফিরে আসা নেই। আর ঘরবাড়ি নেই, সংসার নেই, নয়নতারা নেই। কেমন হবে তখন?

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, বুঝলাম না।

কী বুঝলে না গো।

কিছু বোঝা যায় না। অজান প্ৰান্তর পড়ে আছে সব। কত কি বোঝা গেল না। এই বলে নয়নতারার দিকে মায়াভরে তাকায় বিষ্ণুপদ। পঞ্চাশ বছরের বন্ধু। নয়নতারাও কি কিছু বোঝে! তারা দুটো বোকা মানুষ। কত কি ঘটে যায় চারদিকে, তাদের কাছে সব আবছা আবছা, ভয়-ভয়, কেমন-কেমন। নয়নতারাকে খুব ভাল কোনও কথা বলতে ইচ্ছে করে বিষ্ণুপদর। গাছের মতো ছায়া দিল এতকাল, বসা বাঁধতে দিল, ছাপোনা হল। এবার উড়ে যেতে দেয় কি করে? বড় মায়া যে!

তবে কালঘড়ির কথাটা এই বোকা মেয়েটাই বুঝবে। আর কেউ নয়।

মরার সময়টা চতুর্দশী পড়বে কি? ও সময়টা ভারী খারাপ। আজ কৃষ্ণপক্ষ সপ্তমী। বিষ্ণুপদর ঠাকুর্দা কালঘড়ি দেখার ঠিক সাতদিনের মাথায় গিয়েছিল। যদি সেই হিসেবে বিষ্ণুপদও মরে তা হলে চতুর্দশীই পায় সে।

চকবেড়ের হাট থেকে একখানা পকেট-পঞ্জিকা এনে দিয়েছিল রামজীবন। নয়নতারার দিকে চেয়ে বলল, পঞ্জিকাখানা দাও তো এনে।

কী দেখবে?

চতুর্দশীটা পাবো নাকি?

পঞ্জিকা দেখার দরকার নেই। ঘরে চলো।

আর ঘর। বলে বিষ্ণুপদ একটু হাসে। পুবের ভিটে থেকে কেতরে একটা টোড়া উঠোনের জলে নামল। গেছে শালার ঘরদোর ভেসে। বেরিয়ে পড়েছে হারা-উদ্দেশে। এইসময়ে ব্যাটারা বড় ঘরদোরে সেঁধোয় এসে। টোড়াই বেশী, তবে চক্করওলারাও আছেন।

দুপুর হয়ে এল। নাইতে যাও।

বিষ্ণুপদ অবাক হয়ে বলে, দুপুর কোথা? এই তো দশটা বাজল একটু আগে। বেলা এখনও ঢের আছে।

নয়নতারা বিনাবাক্যে ঘর থেকে পঞ্জিকাখানা এনে দিয়ে বলে, ওই দিনে আমিও যাবো।

বিষ্ণুপদ অবাক হয়ে বোকা মুখখানার দিকে চেয়ে বলে, কোথায় যাবে বলছ?

আমাকে একা ফেলে যাবে নাকি? এখনে কে আছে আমার?

বিষ্ণুপদ পঞ্জিকা ওল্টাল না। ভাববার মতো কথা। কারও যদি কেউ নেই তবে সংসারটা কি জন্যে? এতগুলো সস্তান, তাদের ছানাপোনা, এত থেকেও কেউ নেই নয়নতারার, সে ছাড়া?

বিষ্ণুপদ গলা খাকারি দিয়ে বলে, আগুরি কিছু বলা ভাল নয়। যা হওয়ার যখন হওয়ার হবে। দুদিন এদিক আর ওদিক। এ তো ইচ্ছামৃত্যু নয়।

নয়নতারা কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে, স্বপন দেখনি তো?

তাই। তবে স্পষ্ট দেখলাম।

কেমন দেখতে।

কি? কালঘড়ির কথা বলছ?

হ্যাঁ, সেই অলক্ষুণেটা দেখতে কেমন।

সে খুব বড়। যেন আকাশটা জুড়ে দেখা দিল। বুকটা কেমনমোচড় মেরে খা খ করে উঠল। আঁধারকরা বিশাল একটা চাকা। দুটো সাদা লম্বা সবু হাত ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে।

ঠাকুর্দা তাই দেখেছিলেন?

অবিকল।

তাড়াতাড়ি নেয়ে খেয়ে একটু ঘুমোও। মাথাটা পরিষ্কার হবে, ওসব মনের ভূত নেমে যাবে।

মাথা পরিষ্কারই আছে।

রান্নাঘরে দুটো গলা চুপ মেরে গেছে। দিনটাই এমন সতানো যে, মেজাজও সব ঠাণ্ডা মেরে যায়। গরম থাকতে চায় না কিছু।

ছানি কাটানো গেল না বলে বিষ্ণুপদর চোখ কিছু আবছা। পুলিন হোমিওপ্যাথির ওষুধ দিয়ে ছানিটা আটকে রেখেছে এক জায়গায়। নইলে এতদিনে চোখ একেবারেই অন্ধকার হয়ে যেত। রামজীবন কাটাবে বলে ঠিক করেছিল। যা খরচ হত তাতে ঘরের খানিকটা ইট আর সিমেন্ট হয়ে যায়। বিষ্ণুপদ কাটাতে চায়নি। একা রামজীবন আর কত করবে।

চোথে এখনও অনেকটাই দেখতে পায় বিষ্ণুপদ। এই মেঘলা দিনের মরা আলোতেও কত কি দেখতে পায়। রামজীবনের আধখ্যাঁচড়া বাড়ি, নয়নতারার চোখের জল। পঞ্জিকাটা আর খুলল না বিষ্ণুপদ। চতুর্দশী পড়লেই বা কী করার আছে। ভেবে লাভ কি?

নয়নতারা ফের তাড়া দিল, ওঠে। বসে বসে ভাবতে থাকলে তোমার আরও শরীর খারাপ করবে। ওসব নিয়ে অত ভাবতে নেই।

বিষ্ণুপদ উঠল। পাকা ঘরটার দিকে আর একবার চাইল বিষ্ণুপদ। রামজীবন পেরে উঠল না।

কেউ কেউ পেরে ওঠে না। আবার কেউ কেউ পেরে ওঠে। যেমন কৃষ্ণজীবন। সাততলার ওপর আরামে পায়ের ওপর পা দিয়ে বসে থাকে। বর্ষা-বাদলা হোক, ঝড়বাতাস হোক, ধরা বান হোক, পরোয়া নেই।

মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, রামজীবন বুঝি বড় ভাইয়ের সঙ্গে রেষারেষি করেই তুলতে চেয়েছিল পাকা ঘরখানা। কিন্তু তাই কি পারে? কৃষ্ণজীবনকে ধরতে পারা কি রামজীবনের পক্ষে সম্ভব! সে যে বহুদূর এগিয়ে রয়েছে। রামজীবন তার নাগাল তো পাবেই না, বরং ঘেঁদিয়ে মরবে। তবু চেষ্টা তো করেছিল! বুকটা সেই কারণে একটু ভরে থাকে। মাতাল হোক কি আর যাই হোক, সারা দিনমানের কোনও না কোনও সময়ে বাপ-মায়ের কথা ভাবে তো।

আজ একটু সাবান দিয়ে চান করব, দেবে।

সাবান! আবার সাবান কেন! আবান মাখলে বেশী চান হয়ে যাবে। যা বাদলা, বুকে ঠাণ্ডা বসে গেলে বিপদ।

রামজীবন একখানা গন্ধ সাবান এনে দিয়েছিল না! আছে?

সে তো কবেকার কথা। আছে। মাখে কে বলে? আমাদের বাংলা সাবানেই কাজ চলে যায়।

দাও, মাখি।

সাবানটা বর্ষা-বাদলায় বের করলে খরচ হবে খুব। জলে ক্ষয়ে যাবে।

আজ অত হিসেব কোরো না। দাও।

দিচ্ছি। কুয়োতলায় গিয়ে বোসো। বাক্সের তলায় রেখেছি। বের করতে হবে।

বিপদর বড় জানতে ইচ্ছে করে, সাবান জিনিসটা কী দিয়ে তৈরি হয়।

কত কি জানা হল না দুনিয়াটার। সব আবছা রয়ে গেল।

এই বর্ষায় কুয়ো একেবারে টৈটমুর। বালতিতে দড়ি না বাধলেও চলে। তবে কুয়োর চাকগুলো অনেক পুরনো। জোড় আলগা হয়ে কাদামাটি ঢুকে জল ঘোলা করে দেয়। চোত-বোশেখে বড় কষ্ট গেছে। কোন পাতালে নামাতে হত বালতি। কাদাগোলা জল উঠত, আর তাতে বিজবিজ করত পোকা।

বৃষ্টিতে কুয়োর ধারে বসে আনমনে চেয়েছিল বিষ্ণুপদ। তোড় কমে ভারী মিঠে ঝিরঝিরে ঝর্ণাকলের মতো জল পড়ছে এখন। একবার কৃষ্ণজীবন নিয়ে গিয়েছিল তার বাড়িতে। সাতলায় বাঁধানো ঘরদোরে যেন আলো পিছলে যাচ্ছে। সেই বাড়ির বাথরুমে ঝর্ণা কলের নিচে বসে চান করেছিল বিষ্ণুপদ। তখন মনে হয়েছিল যেন বৃষ্টির মধ্যে বসে আছে।

মানুষ কত কল বানিয়েছে। আরও বানাচ্ছে। কলের যেন আর শেষ নেই।

উঠোনে সাইকেলের ঘন্টি। একটা নয়, তিন-চারটে সাইকেল। একটা হেঁড়ে গলা জিজ্ঞেস করল, রামদা নেই বাড়িতে?

রামজীবনের বউ ক্ষীণ গলায় বলে, না। সকালে বেরিয়েছে।

গেল কোথায়?

বলে যায়নি।

এলে বলে দিও বটতলায় যেতে। জরুরী কাজ আছে।

আচ্ছা।

কথাগুলো মন দিয়ে শুনল বিষ্ণুপদ। এরা সব কারা মাঝে মাঝেই রামজীবনের কাছে আসে তা জানে না বিষ্ণুপদ। দেখে বড় ভাল লোক বলে মনে হয় না। চেহারাগুলোই কেমন যেন লোখাচোখা। এই বৃষ্টিতেও কারও মাথায় ছাতা নেই। উঠোনে সাইকেল এসে থামে, সাইকেলে বসে থেকেই একটা হাক দিয়ে চলে যায়। কখনও নামে না, বসে না, বাড়ির কারও সঙ্গে কথাবার্তা কয় না। মনে হয় খুব কাজের লোক সব। খুব তাড়া আছে।

সাইকেল ঘুরিয়ে জলের মধ্যেই চলে গেল ছোঁড়াগুলো। কুয়োপাড় থেকে গাছপালার ভিতর দিয়ে, বৃষ্টির ভিতর দিয়ে ছানি-পড়া চোখে যতদূর দেখা গেল, চারজন।

এই দুনিয়াটা নিয়ে আর ভাববার কিছু নেই বিষ্ণুপদর। সে কালঘড়ি দেখেছে। সময় ফুরিয়ে এল। এখন চারদিক থেকে নিজেকে কুড়িয়ে তুলে এনে এক জায়গায় জড়ো করা ভাল। কে কি করছে, কার কোন মতলব, কে উচ্ছনে গেল এসব নিয়ে আর মাথা ঘামানো ভাল নয়।

রোজ বড় আশায় আশায় রামজীবনের ঘরখানার দিকে চেয়ে থেকেছে এতদিন। কৃষ্ণজীবনের ঝা-চকচকে ঘরদোরের মতো না হলেও পাকাঘর তো। এই গা-গঞ্জে একখানা পাকাঘরে থাকারও একটা আরাম আছে। কিন্তু আর আশা নেই। ঘরখানা থেকে মনটাকে সরাতে হবে এইবার।

এই যে তোমার সাবান। কিন্তু বাক্স নেই, মোড়কের কাগজখানা ফেলো না। ওতে মুড়ে রাখা যাবে।

সাবানখানা হাতে নিয়ে চেয়ে থাকে বিষ্ণুপদ। কি দিয়ে যে কি বানিয়ে তোলে মানুষ। সাবানখান হাতে নিয়ে ভারী আহ্ৰাদ হল বিষ্ণুপদর। খুব হাসল সে। খুব হাসল।

সাবানের মজাই হচ্ছে তার ফেনায়। বগবগ করে ফেনা উথলে উঠবে তবে না সাবান। কিন্তু ফেনা তুলবে কি, গায়ে ঘষতে না ঘষতেই বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে সব। খামোখা ক্ষয়ে যাচ্ছে। নয়নতারা বুক-বুক করে আগলে রেখেছিল। থাক, মেখে কাজ নেই।

সাবানখানা কাগজে সাবধানে মুড়ে দাওয়ায় রেখে বিষ্ণুপদ হেঁকে বলল, তোমার সাবানখানা নিয়ে যাও।

নয়নতারা দৌড়ে এসে চাপা গলায় ধমক দেয়, সাবানের কথা ভেঁচিয়ে বলতে আছে? বউদের কানে গেলে পাঁচটা কথা উঠে পড়বে। কে দিল, কোথেকে এল। রামজীবন চুপটি করে এনে দিয়েছিল।

বিষ্ণুপদ অপ্রস্তুত হয়ে বলে, তাও বটে। যাকগে, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন তুলে রাখে।

জল ঢালতে ঢালতে আর একখানা সাইকেলের আওয়াজ পায় বিষ্ণুপদ। আওয়াজটা চেনা। পটলের ঝাঁ-কুকুর সাইকেল। এই সাইকেল একসময়ে বিষ্ণুপদ নিজে চালাত। চালিয়ে সাত মাইল দূরে একখানা প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে যেত। তারপর কৃষ্ণজীবন চালিয়েছে, বামাচরণ চালিয়েছে, রামজীবন চালিয়েছে, শিবচরণ চালিয়েছে। এখন চালায় পটল।

সাইকেলটা উঠোন অবধি এসে থামল। সেজ বউ ছুটে এল কোথা থেকে। ভয়ের গলায় বলল, ওরে শিগগির নিতাইকে গিয়ে একটা খবর দে। ওরা আবার এসেছিল।

কারা মা?

বটতলার ওরা। নিতাইকে এখনই খবর দিতে হবে।

নিতাইদাকে তো দেখলাম কলোনীর মোড় পেরিয়ে কোথায় যাচ্ছে। সঙ্গে কারা সব আছে।

দৌড়ে গিয়ে খবরটা দিয়ে আয় বাবা। কেন যে রোজ আসছে এরা কিছু বুঝতে পারছি না। এক্ষুনি যা।

যাচ্ছি। কিন্তু গিয়ে বলবটা কি?

বলিস বটতলার ওরা তোর বাবাকে খুঁজতে এসেছিল।

তাতেই হবে?

সকলের সামনে বলিস না। আড়ালে ডেকে চুপিচুপি বলিস।

কুয়োতলা থেকে সবই শুনতে পেল বিষ্ণুপদ। গায়ে জল ঢালল না অনেকক্ষণ। ভেজা গায়ে বসে রইল। সব জায়গা থেকে নিজেকে তুলে আনা কি সহজ কাজ?

রামজীবন কিছু পাকিয়ে তুলেছে। বটতলা তো এতকাল ভাল জায়গাই ছিল। শীতলার থান আছে। সবাই বলে জাগ্রত দেবী। একসময়ে এই জায়গার নামই ছিল শীতলাতলা। গায়ের নাম বিষ্টুপুর বললে কেউ কেউ বলে, কোন্ বিপুর গো! শীতলাতলা বিষ্টুপুর?

সেই শীতলাতলায় এখন আড্ডা হয়েছে। খারাপ খারাপ লোক এসে জুটেছে। কাছ ঘেঁষে বাসরাস্তা হওয়ার পর থেকেই অধঃপতন। কঁচাপয়সার কারবার আছে।

পটল ফের সাইকেল ঘুরিয়ে বেরিয়ে গেল।

দাওয়ায় চালের তলায় দাঁড়িয়ে গামছাটা নিংড়ে নেয় বিষ্ণুপদ। মাথা মোছে, গা মোছে। মুছতে মুছতে অনেক কথা ভাবে। চারটে সাইকেল। চারটে আবছা লোক। হেঁড়ে গলা। সেজো বউ ভয় পেয়েছে। রামজীবনের কি কোনও বিপদ।

বৃষ্টিটা ফের চেপে এল। একরকম ভাল। বৃষ্টিতে সব ধুয়ে যাক। যত ভাবনা-চিন্তা, যত পাপ-তাপ সব ধুয়ে যাক।

আজ অনেকটা ভাত বেড়ে এনেছে নয়নতারা। বলল, ভাল ঘানির তেল আছে, একটু ভাতে মেখে খাবে নাকি?

তেল-ভাত বিষ্ণুপদর বেশ পছন্দ। সঙ্গে লঙ্কা আর নুন। বলল, দাও একটু। ভাতটা একটু বেশী মনে হচ্ছে।

খাও। কচুরমুখি সেদ্ধ, বেগুনের ঝোল আর ডাল। এই আছে আজ। হবে এতে? খুব হবে।

খেয়ে উঠে বিষ্ণুপদ একটু ঘুমলো। শরীর কিন্তু খারাপ লাগছে না। শ্বাস ঠিক আছে। নাড়ীও ঠিক আছে। কোথাও কোনও গড়বড় টের পায় না সে। তবু কালঘড়িটা চোখের সামনে ভাসছে। একখানা মোটে ঘর আছে আর। দুটো কাটাই সেদিকে ঘুরছে।

জেগে দেখল, পুলিন ডাক্তার বসে আছে জলচৌকিতে।

হল কি গো বিষ্ণুপদ? কালঘড়ি না কী যেন দেখেছ!

পুলিনের বয়স বিষ্ণুপদর সমানই হবে। বিষ্ণুপদ কথাটা পছন্দ করল না। নয়নতারার কথাটা ফাঁস করা উচিত হয়নি। এরা কেউ তো বুঝতে চাইবে না ব্যাপারটা।

বিষ্ণুপদ একটা হাই তুলে বলে, ডাক্তার কি আর সব সারাতে পারে?

সারাবার মতো কিছু থাকলে সারাতে পারবে না কেন? কিন্তু তোমার সারাবটা কি? রোগটা কোথায়?

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, বোগটোগ কিছু নেই। এ হচ্ছে ফুরিয়ে যাওয়া। ঘড়ির দম শেষ হয়, দেখনি?

দম দিলে ফের চলে। বিগড়োলে দম আর নেবে কি?

তুমি কি বিগড়েছ ভাই?

মনে তো হয়। লক্ষণ তো মিলছে না। থাকগে, হাতটা দাও, নাড়ী দেখি।

বিষ্ণুপদ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হাতখানা বাড়াল। পুলিন নাড়ী দেখতে জানে কিনা তাতে ঘোর সন্দেহ আছে বিষ্ণুপদর। এ বিদ্যে সোজা নয়। জানুক না-জানুক, পুলিন ছাড়া তাদের আর সাই বা কে?

হাতখানা রেখে দিয়ে পুলিন বলে, কিছু হয়নি তোমার। নাড়ী দিব্যি টনটনে আছে।

এখনও আছে। নাড়ীটাড়ীতে কিছু বোঝা যাবে না হে।

তবে কিসে বোঝা যাবে? এটা একটা বিজ্ঞান, মানো তো!

তা মানে বিষ্ণুপদ। মানুষ কত কিছু জানে, কত খবর রাখে, কত ওষুধপত্র বের করে ফেলেছে। বিষ্ণুপদ অজান জিনিস সব মানে।

তবে কি জানো পুলিন সব জেনেও কিছু যেন অজান থেকেই যায়। এই দেহ-যন্ত্রটার মধ্যে কত কলকজা বলো তো! কী সাংঘাতিক সব কাণ্ড।

সেসব তো তোমাকে একদিন আমিই বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।

সে কথাই তো ভাবি। দেহের মধ্যে কত কী পুরে দিয়েছেন ভগবান।

ওষুধ দিচ্ছি। খেয়ো।

কিসের ওষুধ? অসুখ তো কিছু নেই বললে?

তবু দিচ্ছি। ভাবনাচিন্তা কমবে। ঘুম হবে। খিদে হবে।

সে সব তো হচ্ছেই।

 ০০২. এয়ারলাইনস্ অফিসের কাছাকাছি

বাসটা এয়ারলাইনস্ অফিসের কাছাকাছি এসেছে বলে টের পাচ্ছিল চয়ন। ঠাসা ভিড়ের মধ্যে সে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে। একটু আগে সে একজনের কজিতে ঘড়ি দেখতে পেয়েছিল। বিকেল পৌনে ছটা। সাড়ে ছটার মধ্যে গোলপার্কের কাছে মোহিনীদের বাড়িতে তার পৌছোনোর কথা। পৌঁছে যাবে বলে আশাও করছিল সে। সবই ঠিক চলছিল। বাস পাওয়া, বাসে ওঠা, পৌনে ছটা–এসব মিলিয়ে মিশিয়ে বিকেলটা ভালয় ভালয় কেটে যাচ্ছিল প্রায়।

কিন্তু হল না। ভ্যাপসা গরমে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ে চলন্ত ডবলডেকারের নিচের তলায় মানুষের গায়ে সেঁটে থেকেও সে আচমকা চোখের সামনে সেই নির্ভুল কুয়াশা দেখতে পেল। ঘন সাদা কুয়াশা। দুটো সরু রেল লাইন সেই কুয়াশায় উধাও হয়ে গেছে। আবছায়া একটা সিগন্যাল পোস্ট। ঝিক করে সিগন্যাল ডাউন হল। কুয়াশার ভিতরে কিছু দেখা যায় না। শুধু একটা রেলগাড়ির এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া যায়। ঝিক ঝক ঝিক ঝিক।

বা হাতের বুড়ো আঙুলটা আপনা থেকেই কেঁপে কেঁপে ওঠে চয়নের। ঝিক ঝিক ট্রেনের শব্দের সঙ্গে এক তালে।

আঙুলটা কেঁপে উঠতেই আতঙ্কিত চয়ন প্রাণপণে ভিড় কাটিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করতে থাকে। দুর্বল শরীরে সে এক অসম্ভব চেষ্টা। তার চারদিকে মানুষের দেয়ালে ফাটল ধরানোর জন্য যে শক্তির দরকার তা তার এমনিতেই নেই। তার ওপর শরীরে যে কাপন উঠে আসছে সেটা ইতিমধ্যেই তার শরীরের আনাচে কানাচে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিয়েছে। সমস্ত শরীর হাড়িকাঠে ফেলা বলির পাঠার মতো নিজীব আত্মসমর্পণের দিকে ঢলে পড়ছে।

একটু নামতে দিন! একটু নামতে দিন দাদা! কাতর কণ্ঠে একথা বলতে বলতে চয়ন প্ৰাণপণে চেষ্টা করছে দরজার দিকে যেতে। দরজা বেশী দূরেও নয়। তিন চার ফুটের মধ্যে। তবু মনে হয়েছে কী ভীষণ দূর।

নামবেন! তা এতক্ষণ কী করছিলেন। বলে কে একজন ধমক দেয়।

বাধ্য হয়েই চয়ন তার অভ্যস্ত মিথ্যে কথাটা বলে, আমার বমি আসছে ভীষণ! একটু নামতে দেবেন।

এই কথাটায় বরাবর কাজ হয়। বমিকে ভয় এবং ঘেন্না না পায় কে? ভীড়ের মধ্যে একটু ঢেউ ঢেউ খেলে যায়। মানুষের শক্ত শরীরগুলো নমনীয় হয়ে যেতে থাকে।

যান দাদা যান! তাড়াতাড়ি এগিয়ে যান।

অনেক সময় হয়, এই কাপন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ভোলা হাওয়ায় দম নিলে কাঁপটা ধীরে ধীরে কমে যায়। সেটা কুচিৎ কদাচিৎ। কিন্তু অভ্যাসবশে চয়ন এই অবস্থাটা দেখা দিলেই খোলা হওয়ার দিকে ছুটে যায়।

আজ কোনও সৌভাগ্যসূচক দিন নয় তার। স্টপে নেমেই সে বুঝতে পারে, বা হাত ঝিঁঝি ধরার মতো অবশ হয়ে আসছে। কঁপন ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে। সে চোখে কুয়াশা দেখছে। শ্ৰবণ ক্ষীণ হয়ে এল। সে একজন অস্পষ্ট পথচারীকে বলল, দাদা, একটু হেলপ করবেন? আমি এপিলেপটিক

কে শুনল বা বুঝল কে জানে? ডান হাতটা বাড়িয়ে সে একটা কিছু ধরার চেষ্টা করল। কিছু ধরল কিনা বোঝা গেল। না। তবে এ সময়টায় তার সব শক্তি জড়ো হয় ডান হাতের মুঠোয়।

এ সময়ে তার ডান হাত বড় বিপজ্জনক। মুঠো করে কিছু ধরলে আর তা ছাড়ানো যায় না, যতক্ষণ না জ্ঞান ফিরছে। একবার অজ্ঞান হওয়ার মুহূর্তে সে কণিকার ডান হাত চেপে ধরেছিল। তারপর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। কণিকার আতঙ্কিত চিৎকারে বাড়ির লোক ছুটে আসে এবং দৃশ্যটা দেখে তারাও ভয়ংকর ঘাবড়ে যায়। মুঠো থেকে কণিকার কজি ছাড়াতে না পেরে তাদের কেউ কাপড় কাঁচার কাঠের মুগুড় দিয়ে মেরে চয়নের ডান হাত ভেঙে দিয়েছিল।

ভাঙা হাত জোড়া লেগেছিল যথাসময়ে। চিকিৎসার খরচও দিয়েছিল কণিকার অভিভাবকেরা। কিন্তু টিউশনিটা ছাড়তে হয়েছিল চয়নকে। দেড়শ টাকার টিউশনি।

এখন সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ের ভিড়ে সেরকমই কিছু আবার ঘটতে পারত। মুঠোয় কিছু ধরতে পারেনি ভাগ্যিস। জ্ঞান হারানোর আগে সেই ক্ষীণ সান্ত্বনা নিয়ে সে খাড়া থেকে কাটা গাছের মতো পড়ে গেল।

তারপর কুয়াশা আর কুয়াশা। একটা রেলগাড়ির ঝন ঝন শব্দ। তারপর সব মুছে যাওয়া।

জ্ঞান ফেরার পর বেশীর ভাগ সময়েই সে একটা পরিচিত দৃশ্য দেখতে পায়। চারদিকে মানুষের পা। অনেক ওপরে। মানুষদের মুখ। অনেক মুখ। সব কটা চোখ তার ওপর নিবদ্ধ। আর টের পায়, তার মাথা মুখ সব জলে ভেজা। ভেজা জামায় জল, ধুলো, কাদা।

কলকাতায় এবার বৃষ্টি হচ্ছে খুব। ফুটপাথের জল সহজে শুকোয় না। একটা ছোট্ট জমা জলের গর্তে তার মাথাটা পড়েছে আজ। পা থেকে চপ্পল খসে পড়েছে কোথায়!

কে যেন বলল, কেমন লাগছে? উঠতে পারবেন?

মানুষকে তার খুব খারাপ লাগে না। এদের মধ্যে ভাল আছে, মন্দ আছে, দয়ালু আছে, উদাসীন আছে। কিন্তু কোনও মানুষ হঠাৎ এরকম পড়ে গেলে সকলেই জড়ো হয় চারপাশে। সবাই খারাপ নয়, এটাই যা একটা ভাল ব্যাপার।

চয়ন তার দুর্বল শরীর শোয় অবস্থা থেকে টেনে তোলে, আগে লজ্জা করত। আজকাল তেমন লজ্জা করে না। এরকম তার অভ্যাস হয়ে গেছে।

একজনের দিকে চেয়ে সে স্তিমিত গলায় জিজ্ঞেস করে, কটা বাজে?

সোয়া ছটা।

তার মানে মোহিনীদের বাড়িতে যাওয়ার সময় নেই নাকি? যাওয়াটা খুব দরকার। মোহিনীর কাল ইংরজি সেকেন্ড পেপারের পরীক্ষা। মোহিনীর বাবা গত পরশু একটু হুঁশিয়ার করে দিয়েছিলেন।

সে উঠে বসার পর ভিড়টা পাতলা হচ্ছে।

কে একজন তার হাতের ওপরের দিকটা ধরে বলল, উঠতে পারবেন তো! তাহলে ধীরে ধীরে উঠে পড়ন।

পারল চয়ন। আগে পারত না। আজকাল পারে। বাধ্য হয়ে পরতে হয়। তবে এই সময়টা এত দুর্বল লাগে যে মাথাটা অবধি ঘাড়ের ওপর লটপট করতে থাকে। হাত পা সব অবশ। শরীর জুড়ে ঝিঁঝির ডাক।

আমাকে ওই দেয়ালটায় ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিন।

পারবেন তো?

পারব। আমার প্র্যাকটিস আছে।

বলবান লোকটি তাকে দেয়ালের গায়ে দাঁড় করিয়ে বলে, ট্যাক্সি নেবেন?

উদ্বেগের মাথায় চয়ন তাড়াতাড়ি বলে, না না। ট্যাক্সি লাগবে না।

বাড়ি যাবেন কি করে?

চয়ন বাড়ির কথায় শিহরিত হল। তার যদি সেরকম একটা বাড়ি থাকত যেখানে অসুস্থ শরীরে ট্যাক্সি নিয়ে গিয়ে নামলেই বাড়ির লোক ছুটে আসবে, ভাড়া মেটাবে এবং ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেবে?

আছে। এখনও মা আছে। ছুটে আসতে পারবে না বা ঘরেও নিয়ে যেতে পারবে না। তবু একমাত্র মা-ই কি হল কি হল বলে সেঁচাবে। কাঁদবেও।

চয়নের সেই অর্থে বাড়ি নেই। দাদার বাড়িতে সে আর মা একরকম জোর করে আছে। একটা সুতোর মতো সম্পর্ক ঘরে আছে বটে, কিন্তু সেটা ঠিক থাকা নয়। উঠি-উঠি যাই-যাই ভাব সবসময়ে। দাদা আর বউদির ভয়, আর বেশীদিন। থাকলে বাড়িটার ওপর তার এবং মায়ের একটা দাবী বা স্বত্ব দাঁড়িয়ে যাবে। তাই আজকাল তাদের তাড়াবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে তারা।

দেয়ালে ঠেস দিয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে চয়ন। পারবে কি? মোহিনীর কাল ইংরিজি পরীক্ষা। যাওয়াটা দরকার।

যে লোকটা তাকে ধরে তুলেছে সে এখনও দাড়িয়ে, বাকিরা চলে গেছে।

লোকটা ভাল প্রকৃতির। বলল, ট্যাক্সি ভাড়া না থাকলে বলুন না, দিচ্ছি। সংকোচের কারণ নেই।

চয়ন মাথা নেড়ে বলে, না। এরকম আমার প্রায়ই হয়। চিকিৎসা করিয়েছেন?

হোহামিওপ্যাথি করাই। এটা ঠিক সারবার অসুখ নয়।

জানি। আমার ছোট বোনটার আছে।

লোকটাকে লক্ষ করে চয়ন। বেঁটে মতো, স্বাস্থ্যটা পেটানো, মাথায় একটু টাক আর গোঁফ, রংশানা কটা আর মুখে একটা সদাশয় ভাব আছে। বেশ লোক।

কোন দিকে যাবেন?

সাউথে। সাউথ তো অনেক বড়। সাউথে কোথায়?

গোলপাকের কাছে। সেখানেই বাড়ি?

না, টিউশনি করতে যাই।

এ অবস্থায় সেখানে গিয়ে কি হবে? পড়াতে পারবেন?

পারব। আজ আর অজ্ঞান হবে না। দিনে একেবারের বেশী হয় না।

তার মানে কি দিনে একবার করে হয়? তাহলে তো সাংঘাতিক কথা!

না, রোজ হয় না। এক দুই সপ্তাহ পরে হয়। কখনও তারও বেশী গ্যাপ যায়।

আমার বোনটার মতোই। কি করেন।

টিউশনি।

আর কিছু নয়? না।

আর কি করব?

আমি সাউথের দিকেই যাব। আমার সঙ্গে যেতে পারেন।

তারও দরকার নেই। একাই পারব। একটু রেস্ট নিলেই হবে।

আপনার স্ট্যামিনা আছে মশাই। আমার বোনটার যেদিন অ্যাটাক হয় সারাদিন আর উঠতে পারে না। শুয়ে থাকতে হয়।

আমার শুয়ে থাকলে চলে না।

তা বলে—লোকটা একটু ইতস্তত করে কথাটা অসমাপ্ত রাখে।

চয়ন চোখ বুজে ঘন ঘন বড় শ্বাস নিতে থাকে। একমাত্র বড় বড় শ্বাসই তাকে তাড়াতাড়ি স্বাভাবিক করে তোলে। একটু সময় লাগে, এই যা।

লোকটি দাঁড়িয়ে আছে এখনও। দয়ালু লোক। চয়ন চোখ মেলতেই বলে, কিছু খাবেন? এ সময়ে একটু গরম দুধটুধ খেলে ভাল হয়। কিন্তু দুধ এখানে বোধহয় পাওয়া যাবে না। অন্য কিছু খাবেন?

চয়ন লাজুক মুখে মাথা নেড়ে বলে, না না। এখন কিছু খেতে পারব না।

খুব দুর্বল লাগছে?

একটু লাগে।

পকেটে একটা নাম-ঠিকানা লেখা কাগজ রাখবেন। এপিলেপটিকদের ওটা রাখা দরকার।

চয়ন জবাব দেয় না। নাম-ঠিকানা লেখা কাগজ পকেটে রাখলেই বা কি লাভ হবে? কলকাতার পথচারী জনসাধারণের ওপর তার আস্থা অনেক বেশী। পথেঘাটে এই রকম প্রায়ই হয় তার। তবু দুবারের বেশী তার পকেটের টাকা-পয়সা খোয়া যায়নি। গেছেও সামান্যই। সেটা না ধরলে কলকাতার অনাত্মীয় জনসাধারণই তার দেখভাল করেছে। ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে মাথা কিছু পরিষ্কার হল। লোকটা তার মুখের দিকে নিবিড় চোখে চেয়ে আছে। একটু লজ্জা করছে চয়নের লোকটি একটু বেশীই দয়ালু। সে বলল, এবার আর ভয় নেই। আমি চলে যেতে পারব।

আমিও দক্ষিণেই থাকি। যাদবপুরে। একসঙ্গে যেতে আপত্তি আছে?

লাজুক চয়ন বলে, না না, আপত্তি হবে কেন? তবে টাক্সির দরকার নেই।

দরকার থাকলেও পাওয়া যাবে কিনা সেটাই বড় কথা। আপনি আর একটু জিরিয়ে নিন বরং। এখনও হাঁফাচ্ছেন। টিউশনিতে কি আজ না গেলেই নয়?

কাল আর ছাত্রীর পরীক্ষা। না গেলে কথা হবে।

ছাত্রীর বাবা খুব কড়া ধাতের বুঝি?

লজ্জিত চয়ন মাথা নেড়ে বলে, তা নয়। তবে টিউটরের তো অভাব নেই। সামান্য কারণে হয়তো ছাড়িয়ে দিতে পারে।

কটা করছেন।

তিনটে।

আমি আপনার মতো বয়সে দিনে ছ-সাতটা করতাম। ভাল রোজগার ছিল। পরে হোম টিউটোরিয়াল খুলি। এখন চাকরি করি বলে টিউটোরিয়াল তুলে দিতে হয়েছে। আসুন, অন্তত একটু চা খেয়ে নেওয়া যাক। তাতেও খানিকটা কাজ হবে আপনার।

লোকটার কজির ঘড়িটা বিরাট বড়। সেটা লক্ষ করছিল চয়ন। সাড়ে ছটা বাজে। আর দেরী করলে যাওয়াটা অর্থহীন হয়ে যাবে। সে মাথা নেড়ে বলে, আমার দেরী হয়ে যাবে।

বলতে একটু কষ্ট হল তার। লোকটা তার জন্য এতটা দরদ দেখাচ্ছে, মুখের ওপর না বলতে লজ্জা করছে। কিন্তু উপায় নেই।

লোকটা বুক পকেট থেকে একটা ছোটো নোটবই বের করে বলে, আপনার ঠিকানাটা অন্তত দিন। একজন সাধুর একটা মাদুলি পেয়েছি। বোনটাকে ধারণ করিয়েছি গত পরশু। যদি উপকার পাওয়া যায় তবে আপনাকেও একটা জোগাড় করে দেবখন। কতরকম মিরাক আছে মশাই। কী থেকে কী হয় কে জানে। আমার ঠিকানাটাও জেনে রাখুন। এই যে এল. আই. সি. বিল্ডিংটা দেখছেন এর চারতলায় মেশিন ডিপার্টমেন্টে আমি চাকরি করি। আশিস বর্ধন আমার নাম। এবার আপনার ঠিকানাটা আমায় বলুন।

চয়ন ঠিকানাটা বলল। তারপর অতিশয় সংকোচের সঙ্গে জানাল, বাড়িটা আমার দাদার। সেখানে—

সেখানে কী?

মানে সেখানে আমার বন্ধু বা পরিচিতরা ঠিক ওয়েলকাম নয়। আমি যদি বাড়িতে না থাকি তবে আমার বউদি খুব একটা পাত্তা দেন না।

লোকটি হাসল, বুঝেছি। আপনি কোন সময়টায় অ্যাভেলেবল?

দুপুরবেলাটায় থাকি। বেলা বারোটা থেকে তিনটে।

লোকটা নোটবই পকেটে রেখে বলল, আশা করি আবার দেখা হবে। আপনি সংকোচ বোধ করছেন, নইলে আপনাকে গোল পার্ক অবধি পৌঁছে দিতাম। চলি।

লোকটা বোধহয় তাকে রেহাই দিতেই ভিড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। যেন একটু স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল। মানুষের ভালবাসা, সহানুভূতি গ্রহণ করতে আজকাল তার লজ্জা হয় না বটে, কিন্তু খুব বেশীক্ষণ সে সইতে পারে না। শুধুই নতমস্তকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে যেতে যেতে সে আজকাল হীনমন্যতায় ভোগে। মানুষের জন্য উল্টে যদি কিছু করতে পারত্ব সে!

ভাগ্যক্রমে পরের বাসটা দু মিনিটের মধ্যেই পেয়ে গেল চয়ন। কষ্ট করেই সে এল. নাইন বাসের দোতলায় উঠল। এ বাটা এসপ্লানেডে কিছুটা ফাঁকা হয়। ভাগ্য সুপ্ৰসন্ন থাকলে বসার জায়গা পেয়েও যেতে পারে। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার। পর জ্ঞান ফিরলে তার বড় ঘুম পায়। এখন পাচ্ছে। চোখ জুড়ে আসছে বারবার। বসতে পারলে সে একটু ঘুমিয়ে নেবে।

আশিস বর্ধন নামটা তার মনে থাকবে। সে সহজে কিছু ভোলে না। না নাম, না মুখ। তার স্মৃতিশক্তি চমৎকার। কিন্তু লোকটা যদি হুট করে তাদের বাড়িতে হাজির হয় তাহলে অপমানিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তার একজন উপকারী বন্ধু তার আরও বেশী উপকার করতে উপাঁচক হয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে অপমানিত হয়ে আসবে ভাবতেই সে সংকোচে মরে যাচ্ছে।

আগে অবশ্য ব্যাপারটা এরকম ছিল না। ভাল না হোক, বউদি অন্তত খুব খারাপ ব্যবহার বা অপমান করত না। কাউকে। কিন্তু গোলমালটা পাকাল পাড়ার পল্টু।

মাস ছয়েক আগে তার দাদা আর বউদি মিলে তুমুল চেঁচামেচি আর অশান্তির পর চয়নকে আর মাকে বাড়ি থেকে। তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। বাড়িটা দাদার এবং দাদার পয়সাতেই মোটামুটি সংসার চলে। কিছু করার ছিল না তাদের। এক দিদি থাকে উল্টোডাঙা হাউসিং-এ, সেখানেই যেতে হত তাদের। গিয়ে কী হত কে জানে? তবে পোটলা-পুঁটলি বাক্স নিয়ে একরকম পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু সদর খুলে বেরোতেই এক বিপরীত দৃশ্য। সামনে পল্টু দাঁড়ানো, পিছনে পাড়ার বিস্তর ছেলে এবং কয়েকজন মহিলাও।

পই এগিয়ে এসে মাকে বলল, মাসীমা, ঘরে যান। চয়নদা, তুমিও ভিতরে যাও। আমরা না বললে খবৰ্দার বাড়ি ছাড়বে না।

পল্ট পাড়ার মোড়ল গোছের। তার ক্লাব আছে। মাঝে মাঝে রক্তদান শিবির, নাটক ইত্যাদি করে। তার প্রবল দাপটে পাড়ায় সাট্টার ঠেক আর দিশি মদের আস্তানা উঠে গেছে। পলিটিকসও করে।

ভয়ে চয়ন তার মাকে নিয়ে দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইল। ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা।

তাদের পাশ কাটিয়ে পল্টু ঘরে ঢুকে সোজা দাদার গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরল দেয়ালে, এ পাড়ায় বাস করতে চান? যদি চান তাহলে এবার থেকে মা আর বেকার ভাইকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। করলে আপনাকেও এ বাড়ি ছাড়তে হবে। কথাটা আপনার বউকেও বুঝিয়ে দেবেন।

কথাটা বেশ নাটুকে এবং বীরত্বব্যঞ্জক বটে, কিন্তু ঝামেলা অত সহজে মেটেনি। বউদি ঝাঁপিয়ে পড়ল পল্টুর ওপর। তারপর অকথ্য গালিগালাজ। পাড়ার লোক ভিড় করে এল। পল্টুর বীরত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠল। পারিবারিক ব্যাপারে বাইরের লোকের নাক গলানো কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও কথা হতে লাগল। তবে মোটামুটি জনসাধারণের চাপে তারা রয়ে গেল দাদার বাড়িতে। সম্পর্কটা খুবই খারাপ হয়ে গেল এর পর। দাদা পল্টুর এই হামলা নিয়ে প্রবল আন্দোলন করতে লাগল। এমন কি গুণ্ডা লাগানোর চেষ্টাও করেছিল।

দাদার হাতে ছেলেবেলায় বিস্তর মারধর পেয়েছে চয়ন। বড় হওয়ার পর খায়নি। কিন্তু পর হামলাবাজির পর সেই রাতেই দাদা তাকে একটা লাঠি দিয়ে খুব পেটায়। সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল মার খেয়ে। পরে শুনেছে, বউদি একটা কৌটো ছুঁড়ে মেরেছিল মাকে।

এর পরও তারা আছে। বাড়িটা ছোটো এবং পুরোনো। এ বাড়িতে তারা ভাড়া থাকত একসময়ে। পরে বাড়িওলার। কাছ থেকে দাদা সস্তায় কিনে নেয়। বাড়ি কেনার পর থেকেই দাদার ভয়, বেশী দিন এ বাড়িতে থাকতে দিলে চয়নের দাবী জন্মে যাবে।

এই ঘটনার পর থেকেই চয়নকে কেউ খুঁজতে এলে বউদি ভীষণ চেঁচামেচি করে। চয়নের নামও সহ্য করতে পারে না দুজন।

আশিস যেন অসময়ে গিয়ে হাজির না হয়, হে ভগবান! এইটুকু বলে এসপ্লানেডে একটা সীট পেয়ে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল চয়ন। গভীর ক্লান্তির ঘুম।

গোল পার্ক টার্মিনাসে কন্ডাক্টর ডেকে তুলে দিল তাকে। মোহিনী তাকে দেখে আঁতকে উঠে বলে, কী হয়েছে চয়নদা! পড়ে গিয়েছিলেন নাকি? জামাকাপড় তো কাদায় মাখামাখি।

চয়ন যথাসাধ্য গম্ভীর হয়ে বলে, রাস্তা যা পিছল।

ইস, ভেজা জামাকাপড়ে থাকবেন?

কিছু হবে না। রোজ তো বৃষ্টিতে ভিজছি, এত জামাকাপড় পাবো কোথায়?

বাবার ধুতিটুতি কিছু দেবো?

চয়ন শিহরিত হয়ে বলে, না না। কিছু লাগবে না।

এ বাড়িতে বিকেলে দুখানা মাখন টোস্ট পাওয়া যায়। এক কাপ চা। কখনও কখনও অবশ্য টোস্টের বদলে বিস্কুট। আজ টোস্ট দুখানা তার বড় দরকার। খিদে পেয়েছে।

সে এক গ্রাস জল চেয়ে খেল এবং পড়াতে লাগল।

চয়নদা, আপনাকে কিন্তু অসুস্থ দেখাচ্ছে। ফ্যাকাসে লাগছে খুব। পড়ার মাঝখানে বলে ফেলে মোহিনী।

মৃগী রোগের কথা শুনলে এরা হয়তো আর রাখবে না তাকে। কণিকার বাড়ির তিক্ত অভিজ্ঞতা সে তো ভোলেনি। ভাঙা ডান হাতখানা তার আজও কমজোরি। ভারী জিনিস তুলতে পারে না। সে মুখে একটু হাসির ছদ্মবেশ ধারণ করে বলল, না না, শরীর ঠিক আছে।

মোহিনীর বয়স পনেরো। বিপজ্জনক বয়স। এই বয়সে মেয়েরা বড় চঞ্চল হয়। চয়ন এসব জেনেছে টিউশনি করতে করতেই। তাই আজকাল সে তার কিশোরী ছাত্রীদের চোখের দিকে চায় না। জীবনের জটিলতা যত কম হয় ততই ভাল।

মোহিনী একটু উসখৃস করে এক মিনিট আসছি বলে উঠে গেল।

কিছুক্ষণ বাদে মোহিনীর মা এলেন। হাতে এক গ্লাস কম্যান আর দুটো টোস্ট।

মোহিনী বলছিল তোমার নাকি কি হয়েছে?

চয়ন বড় অপ্রতিভ হয়ে বলে, তেমন কিছু না। পিছল রাস্তায় একটা আছাড় খেয়েছি।

খুব লেগেছে?

সামান্য। জামাকাপড় নষ্ট হয়েছে জলকাদায়। অবশ্য শুকিয়েও গেছে এতক্ষণে।

শরীর ভাল আছে তো?

আছে।

এটা খেয়ে নাও।

চয়ন কৃতজ্ঞতায় মরমে মরে গেল। কিন্তু খিদের মুখে কী যে চমৎকার লাগল তার খাবারটুকু! বুকটা ঠাণ্ডা হল, জুড়িয়ে গেল।

পড়ায় সে ভালই। ইংরজি আর অঙ্ক দুটোই ভাল পারে বলে টিউশনির অভাব হয় না। তবে বেশী টাকা দাবী করতে ভয় পায়।

 ০০৩. নতুন কেনা সুটকেসটা

নতুন কেনা সুটকেসটার দিকে চেয়ে ছিল বীণাপাণি। দেখতে হুবহু চামড়ার জিনিস। কিন্তু বীণাপাণি জানে জিনিসটা পিচবোর্ডের। ওপরটা ঠিক চামড়ার মতো রং করা। সস্তার জিনিস। নিমাই তাতে পাটে পাটে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে নিচ্ছিল।

বীণাপাণির খুব অম্বলের রোগ আজকাল। সকালবেলাতেও টক জল বমি হয়েছে খানিকটা। বুক এখনও ঢাক ঢক। করছে তেলগোলার মতো অম্বলে। মাথাটা ঠিক থাকছে না। শরীরটা দুর্বল লাগছে। বিছানায় বসে সে একদৃষ্টে নিমাইয়ের সুটকেস গোছানো দেখছে। শুধু স্যুটকেস নয়, নিমাই গোছাচ্ছে তার আখের। এ দেশে মেয়ে হয়ে জন্মানো যে কত বড় পাপ তা বীণাপাণির চেয়ে ভাল আর কে জানে! মাথাটা ধরে আছে খুব। চোখ ঝাপসা বোধহয় চোখের জলেই হবে। কিন্তু কান্না নয়। বরং বুকে উথলে উঠছে রাগ। রাগের সাপ ছোবলাচ্ছে। বিষ ঢালছে শরীরময়।

বীণাপাণির রাগটা নিমাইও টের পাচ্ছে। তাই চোখে চোখ রাখছে না। মাথা নিচু করে খুব মন দিয়ে সুটকেস গোছাচ্ছে। তিনখানা ধুতি আর জামায় পাঞ্জাবিতে গোটা চারেক, সাকুল্যে এ কখানাই সম্বল। ওপরে দুখানা লুঙ্গি আর একখানা গামছা পাট করে রাখতে যত সময় লাগা উচিত তার চেয়ে বেশী সময় নিচ্ছে। এই শেষ সময়টাতে বীণাপাণি কিছু বলবে, আস্কারা-দেওয়া, লাই-দেওয়া কোনও কথা, সেইজন্যই কি অপেক্ষা করছে? আগে, অর্থাৎ বিয়ের পর পর ওই বেঁটে রোগা কালো এবং অপদাৰ্থ লোকটার মান ভাঙাতে পায়ে অবধি পড়েছে বীণাপাণি। তখন দুনিয়াটা একরকম ছিল, আজ সেই দুনিয়াটারই রং চটে, পলেস্তারা খসে বেড়ানো চেহারাটা বেরিয়ে পড়েছে। কত কী ভাল লাগত তখন। এখন সবই বিষাদ।

এই মেনীমুখো মানুষটাকেই তার বাবা খুঁজে এনে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল। বাবার মতে বড়ই ভাল ছেলে। শান্তশিষ্ট, স্থিরবুদ্ধি, চরিত্রবান। সবচেয়ে বড় কথা, মা-বাপের প্রতি ভক্তি আছে। ভগবানে বিশ্বাস আছে। চমৎকার কীর্তন গায়। শুধু পয়সাটারই যা অভাব। বড় জাগুলিয়ায় এক ঠিকাদারের গুদাম পাহারা দেয়। চাকরি পাকা নয়, তবে ঠিকাদারবাবুটি ভাল, স্নেহ করেন। চাকরির মেয়াদ বাড়তে পারে। পালপাড়ায় নিজেদের একখানা মেটে বাড়ি আছে, তিনচার বিঘে জমি। সুতরাং মেয়েকে একেবারে জলেফেলা হচ্ছে না। অন্তত অগাধ জলে নয়।

বীণাপাণি তখন কতটুকুই বা মেয়ে? বুদ্ধিটুদ্ধি কিছু পাকেনি, মা-বাপের ওপর নির্ভর। তবে বিয়ে নিয়ে একটা সুখের ভাবনা ছিল বড়। মিথ্যে বলবে না বীণাপাণি, বিয়ের পর সুখ হয়েছিল কিছুদিন। তার বুঝি তুলনা নেই। বীণাপাণি এ কথাও বুকে হাত রেখে বলতে পারবে না যে, নিমাই লোকটা খারাপ। যদি মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবে তাহলেই বুঝতে পারে, এ লোকটার মনের জোর নেই বটে, কিন্তু দোষঘাটও বিশেষ নেই। নরম মনের মানুষ। সবসময়েই বিনয়ী বিগলিত ভাব। সেই কারণেই লোকে নিমাইকে ভালবাসে। ঠিকাদার নিরঞ্জনবাবুও বাসতেন। তবে তাঁর কাজটাই নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে। জাগুলিয়ার কাছে একটা রাস্তা তৈরির কাজশেষ করে তিনি আসামে গেলেন আরও বড় কাজে। নিমাইকে নিতে চেয়েছিলেন, তবে বুড়ো মা-বাপ, ক্ষেতি-গেরস্তি, নতুন বউ ছেড়ে তিন চারশ টাকার ভরসায় অতদূর যাওয়ায় গা-ও বিশেষ নেই। জাগুলিয়ায় একখানা ফলের স্টল খুলেছিল নিমাই। তখনই তার ব্যারাম শুরু হয়। জুর, কাশি, বুকে ব্যথা। জল জমেছিল বুকে। এমন কিছু সাতিক রোগ নয়। আজকাল কত ওষুধ বেরিয়ে গেছে। কিন্তু ওই রোগের চিকিৎসা করতে গিয়েই দুবিঘে জমি বেচে দিতে হল। হাঁড়ির হাল।

যেসব ড্যাকরারা বক্তৃতা দিয়ে দেশ চালাচ্ছে, মানুষকে ন্যায়-অন্যায় নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে, তারা কি জানে গাঁয়ে গঞ্জে মাঠে ঘাটে লোকে রোগ-ভোগ খিদে-তেষ্টা বিপদ-আপদ নিয়ে কিরকম ভাবে বেঁচে আছে। আর কেমনতরো বেঁচে-থাকাটাই বা এটা? এই মলাম কি সেই মলাম বলে এই যে শ্বাসটুকু চালু রাখা—এর মধ্যে আবার ধৰ্ম-অধৰ্ম পাপ-পুণ্য ঢোকানোর কোনও মানে হয়? আকাশে যে আর কোন এক ড্যাকরা থাকে তার ততা নাকে তেল দিয়ে ঘুমোনো ছাড়া আর কোনও কাজ দেখতে পায় না বীণাপাণি। পাপ-পুণ্য কোলে করে বসে থাকলে কি ভাত জুটবে? বীণাপাণির ঘরের পাশ দিয়েই পেটকেঁচড়ে পিস্তল নিয়ে এইটুকুন-টুকুন ছেলেরা প্রাণ হাতে করে যেসব কাজ করতে যায় তা পাপ না পুণ্য তা কে বলে দেবে? পেট-ভাতের জোগাড় থাকলে যেত ওসব করতে? বেকারে ভরা দেশ, বাপে খেদায় মায়ে খেদায়, চা-বিস্কুট খাওয়ার, দাড়ি কামানোর অবধি পয়সা জুটতে চায় না, তা করবেটা কি? কোন ভগবান দেখবে তাদের কোন সরকার। আছে নাকি তারা এদেশে?

নদেরচাঁদদ লোকটা গঙ্গাজলে যোয়া তুলসীপাতা যে নয় সবাই জানে সে কথা। তার নামে লোকে দু-গাল ভাত বেশী খায়। নানা দোষ আছে তার, কিন্তু ওই বিপদের দিনে লোক বাছতে গেলে কি চলত? বিপদে যে পাপ-পুণ্য ভেসে যায়। ভগবানের যদি বিচার থাকত তাহলে পাপ-পুণ্যের নিক্তিখানা ধরার আগে কুলোর বাতাস দিয়ে আপদ-বিপদ রোগ-ভোগ তাড়িয়ে মানুষকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে দিত। না বচলে পাপ-পুণ্য করবেটা কি?

ভগবানের কাজ ভগবান না করে যদি এক পাপীতাপী লম্পট এসে করে তবে সেই লম্পটই তখন বীণাপাণির ভগবান। নদেরাদ তো ভগবানের মতোই এসে দাঁড়াল একদিন। তখন মেটে স্যাঁতসেঁতে ঘরে পুঁকছে নিমাই। অ্যালোপ্যাথির পয়সায় টান পড়ায়, হোমিওপ্যাথি চলছে। পথ্যের জোগাড় নেই। জ্যেঠতুতো দেওরের বন্ধু নদেরাদ উদয় হয়ে বলল বনগাঁর দিকে আমার কাকার একটা ব্যবসা আছে। তাতে একজন লোক দরকার। তবে পুরুষমানুষ হলে চলবে না। মেয়েছেলে চাই।

বীণাপাণি ডগমগ যুবতী। সে জানে মেয়েছেলে হয়ে জন্মানোর কিছু জনগত পাপ আছে। তবে শরীরটা যে সব পুরুষেরই ভক্ষ্যবস্তু। যদি একটু দেখনসই হয় তাহলে তো কথাই নেই। ছেলে-বুড়ো সকলেই নরখাদকের মতো মনে মনে ঠোঁট চাটবে। এই হালুম-খালুম ভাবটা চারদিকে বড় টের পায় বীণাপাণি। কপালের দোষই হবে, সে দেখতে ভাল। লম্বাটে গড়ন, রংখানাও ফর্সার দিকে, মুখের ডৌলটি নিখুঁত, দুটি টানা চোখ। নিজেকে কখনও আড়াল করেনি সে।

কথা হচ্ছিল নিমাইয়ের সামনে বসেই। বোেকা শাশুড়িটাও ঘরে ছিল। এরা দুনিয়ার হালচাল কিছুই জানে না, বোঝেও না। লোকে অচেনা কথা বললে হ করে চেয়ে থাকে। বোকা মাথায় কোনও ভাল বা মদের ঢেউ ওঠে না। এতদিন দুনিয়াতে কাটিয়েও দুনিয়াটা বড় অচেনা এদের কাছে। বীণাপাণিরও তো এর চেয়ে ভাল অবস্থা নয়। তবে সে নদেরচাদের চোখে একটা লোভানি দেখতে পেয়েছিল।

নিমাই বলল, ব্যবসাটা কিসের?

নানান জিনিসের। চালানি ব্যবসা। মাল আনা, চালান দেওয়া। পয়সা আছে।

শাশুড়ি বলে উঠল, বউমাকে দিয়ে হয়, ও বাবা নদেরচাঁদ?

খুব হয়। বউদি তো দিব্যি চটপটে মেয়ে। কাকা এরকমই খুঁজছে।

দেখবে নাকি বউমা?

বীণাপাণি জানে, এর মধ্যে একটা চক্কর আছে। তাকে গভীর জলে টেনে নামানোর জন্য কুমীর এসে ডাঙায় উঠেছে।

বাপের বাড়ির অবস্থা একটু ভাল হলে বীণাপাণি দুর্দিনে গিয়ে বাপ-ভাইয়ের ঠ্যাং ধরত। কিন্তু সে সুবিধে নেই। বউদিরা দাঁতে বিষ নিয়ে ফণা তুলে আছে। বাপ-মায়ের অবস্থা শোচনীয়।

বীণাপাণি সভয়ে বলল, কেমনধারা কাজ গো! আমি কি পারব।

নদেরচাঁদ উদাস গলায় বলল, মেয়েছেলেরই কাজ।

বোকা শাশুড়িটা নেচে উঠে বলল, দে বাবা নদেরাদ, কাজটা করে দে। সবাই মিলে দুটি খেতে পাই তাহলে।

ভয়-ভাবনা-অনিশ্চয়তা নিয়েই একদিন নদেরষ্টাদের সঙ্গে বনগাঁয় এল বীণা। কাকার সঙ্গে কথা বলে বিকেলেই ফিরে যাবে। বাসে বসেই নদেরাদ বলে ফেলল, শোনো বউদি, নিমাইদা অবুঝ তোক বলে তার সামনে বলিনি। যে কাজে তোমাকে নামাতে চাইছি তা একটু অন্যরকম।

বীণা চমকে উঠে বলল, কিরকম?

খুব মজার। চাকরির একঘেয়েমি নেই। রংদার কাজ।

 

বনগাঁয়ে বিশ্ববিজয় অপেরা সবে ডানা মেলতে শুরু করেছে। বিশ্ববিজয় অপেরার স্বত্বাধিকারী বিজয় সাহাকে কেউ তার আসল নামে ভাল চেনে না। সবাই জানে কাকা বলে। পঁয়ত্রিশ-চত্রিশ বছর বয়স, কালো, লম্বা, ছিপছিপে চেহারা। অভিনয় তার নেশা। কলকাতার থিয়েটার পাড়া, যাত্রাপাড়া, ফিলমের স্টুডিওতে এতকাল ঘুরঘুর করেছে। সুযোগ পেয়েছিল কয়েকটা, কিন্তু সুযোগ এক কথা, উন্নতি আর এক জিনিস। শেষে একটা যাত্ৰাদলের চাকরি পেয়েছিল সামান্য মাইনের। বনল না। তখন মাথায় রোধ চাপল, কলকাতায় আর নয়। দেশে বনগাঁয়ে ফিরে গিয়ে যাত্ৰাদল খুলবে। কলকাতার পেশাদারদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তবে ছাড়বে।

কিন্তু ভাবা আর করা তো এক কথা নয়। টাকা-পয়সার বন্দোবস্ত নেই, ভাল পালাকার কোথায় পাবে, গানবাজনার লোকই বা কোথা থেকে জুটবে, নটনটী জোটানোও কি সোজা কথা। কিন্তু সবার আগে দরকার টাকা।

নাটকের নেশাই কাকাকে পথ দেখাল। কাছেই বাংলাদেশ বর্ডার। চোরাইচালানের ব্যবসায়ে লোকে টাকা লুটছে। যাত্ৰাদল করতে হবেই, সুতরাং কিছু না ভেবেই সে চোরাইচালানের কাজে নেমে গেল। কাজটা বড় সহজ নয়। প্রথম প্রথম বিপদে পড়ত, মারধর খেত, অ্যারেস্টও হয়েছে। কিন্তু লেগে রইল। ধীরে ধীরে দল তৈরি হল, চোরাই ব্যবসার অলিগলি মুখস্থ হল, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পাকা ব্যবস্থা হয়ে গেল। সবচেয়ে বড় কথা, টাকা আসতে লাগল হাতে।

টাকা ওড়াত না সে। নেশাভাঙ ছিল না, জুয়া খেলত না, মেয়েমানুষের দোষ নেই! দিনত শুধু যাত্রার ভাবনা তাব মাথায়। কলকাতার নাম-করা অপেরাগুলোর খোতা মুখ সে ভোতা করে ছাড়বে। মফস্বলের দল নিয়ে সে কাপিয়ে দেরে দেশ।

বিশ্ববিজয় অপেরা খুলেছে বছর দুই। গুটি কয়েক পালা করে একটু নামও হয়েছে। তবে সেটা কিছু নয়। বিরূপ চৌধুরীর হাতে পায়ে ধরে দুখানা পালার বায়না করেছে। ঐতিহাসিক পালায় বিরূপবাবুর জুড়ি নেই। গানের জন্য আকাশবাণীর পুরোনো এক গায়ককে ধরেছে। নিমাই পাল। কেউ পৌঁছে না, কিন্তু নিমাইবাবুর অগাধ জ্ঞান। এইসব ফেলে দেওয়া লোককেই দরকার কাকার। কার ভিতর থেকে কোন প্ৰতিভা বেরিয়ে আসবে কে জানে!

প্রতিভা খুঁজবার নেশোটা ছিল বলেই কাকা নদের চাঁদের আনা মেয়েটাকে প্রথম দর্শনেই ভাগিয়ে দিল না। নদেরচাঁদকেও সে একটু খাতির করে। তিন চারখানা বায়না করে দিয়েছে ছেলেটা।

মেয়েটা দেখতে ভাল। ছোটোখাটো পার্টে চলবে। তবে এখনও বড্ড গেয়ো আর জড়োসড়ো। ভয়ে আধখানা হয়ে আছে।

নদেরচাঁদ ধরে পড়ল, একে কাজ না দিলেই নয় কাকা।

 

বলতে নেই, প্রথম দর্শনেই এই কাকা লোকটিকে ভাল লেগেছিল বীণাপাণির। জন্মে সে অভিনয় করেনি। আসার-ভরা লোকের সামনে সে হয়তো কেন্দেই ফেলবে পার্ট করতে উঠে। তবে এই কাকা লোকটি যে আর পাঁচটা মতলবীবাজাদের মতো নয়, এ যে যাত্ৰা-পাগল মানুষ, অন্য ধান্দা নেই, তা দশ-পনেরো মিনিট কথাবার্তার মধ্যেই বুঝতে পারল বীণাপাণি।

তবে বোকা-মাথার বুঝ, সেই বুঝকে তো আর বিশ্বাস নেই। এই তো নদেরচাঁদ চাকরির নাম করে নিয়ে এল। তাকে, বুঝতে পেরেছিল কিছু বীণাপাণি?

শুধু একটা জিনিসই স্পষ্ট বোঝে সে, তার শরীরখানার দিকে সকলের নজর। মেয়েদের চারদিকে পাপের হাজারো পথ। যেদিকেই পা বাড়াও, পথ পায়ের নিচে হাজির হয়ে যায়।

সে বলেই ফেলল, এ কাজ আমি পারব না।

কাকা তার দিকে চেয়ে নিরাসক্ত গলায় বলল, ইচ্ছে না হলে জোর তো কেউ করছে না। জবরদস্তির কাজও নয় এটা। এসব আর্ট, ভালবাসার জিনিস। যদি টান না থাকে তাহলে পারবেও না। তবে এসব কাজ মানুষই করে, অভিনয় করতে তো আর স্বৰ্গ থেকে আসে না। চেষ্টা করলে পারা কঠিন নয়।

আমি ঘরের বউ, এসব যাত্রাপালায় নানা খারাপ ব্যাপার হয়, শুনেছি। মেয়েমানুষের ধর্ম থাকে না।

ধর্ম যে যার নিজের কাছে। আগেই তো বলেছি, জবরদস্তির কিছু নেই। বহু ছেলেমেয়ে ঘুরঘুর করে একটা পার্টের জন্য। এ বাজারে একটা সুযোগ পাওয়াই যে বড্ড কঠিন। কত মানুষকে ফিরিয়ে দিতে হয় রোজ। তোমাকে যে প্রথম চোটেই ফিরিয়ে দিইনি। সেটা কিন্তু মস্ত ব্যাপার। তুমি চাইলে করতে পারো। শিখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, কষ্ট করতে হবে। এ লাইন খুব কঠিন। বাড়ি গিয়ে দেখ। রাজি থাকলে এসো। সামনের মাসেই পালা নামবে।

প্রথম দিন এর বেশী কথা হয়নি। কাকা ব্যস্ত লোক। সবসময়ই তার ঘরে ভিড়।

বাইরে এসে নদেরচাঁদ বলল, দিলে তো ড়ুবিয়ে! ওরকম বেঁকে বসলে কেন বলো তো! সারাক্ষণ যে পাখি-পড়া করে শিখিয়ে আনলুম।

শেখালেই হল! এক কথা বলে নিয়ে এলে, পরে দেখি আর এক ব্যাপার। তুমি ভীষণ খারাপ লোক।

এ বাজারে এ এক মস্ত সুযোগ তা জানো? কত বিদ্যোবুদ্ধি নিয়ে বেকার ছেয়েমেয়েরা বসে আছে তা দেখছ না?

আমি এসব পারব না।

সে তো বুঝতেই পারছি। আমার বাসভাড়াটাই জলে গেল।

শেষ অবধি জলে গেল না। বাড়ি ফিরে সকলের নানা প্রশ্নে ভাসা-ভাসা জবাব দিয়ে সে গভীর রাত অবধি নিবিষ্ট হয়ে ভাবল। সামনে তার অনেক বিপদ। তার মধ্যেই যেন একটু ডাঙা জমি হল ওই কাকা।

পরের সপ্তাহে ফের বনগাঁয়ে নদের চাঁদকে নিয়ে হাজির হল বীণাপাণি। কাকার সামনে সতেজে দাড়িয়ে অকম্পিত গলায় বলল, পার্ট দিন, করব।

তাহলে রোজ রিহার্সালে আসতে হবে। কঠিন কাজ। তোমার কোনও ট্রেনিং নেই। শিখতে সময় লাগবে, খাটতে হবে খুব।

আমাকে কত মাইনে দেবেন?

মাইনে! দল না দাঁড়ালে মাইনে আসবে কোথা থেকে? এ কি কলকাতার পেশাদার দল! শুধু পয়সার লালচ থাকে এসো না, তাতে লাভ নেই। অভিনয় অন্য জিনিস।

অন্য জিনিস তো বটেই। সিনেমা থিয়েটার কিছু দেখেছে বীণাপাণি। সিনেমার হিরো হিরোইনদের অনেক পয়সা আছে বলেও শুনেছে কিন্তু এই লাইন তার চেনাজানা জগতের বাইরে।

পারবে?

বীণাপাণি কাদো কাদো হয়ে বলল, আমার বরের খুব অসুখ। বাড়িতে হাঁড়ি চড়ছে না। আমার একটা ব্যবস্থা না করে দিলে কি করে পারব?

কাকা মৃদু হেসে বলে, সকলের গল্পই একরকম, বুঝলে? এদেশে কেউ সুখে নেই। সকলেরই নানা বিপদ। তবে সেসব সয়ে বয়ে এগিয়ে যেতে হয়।

কিন্তু নদেরচাঁদ আমাকে বলেছিল। আপনি চাকরি দেবেন।

নদেরচাঁদ জানে না বলেই বলেছে। তবে তোমাকে আমি ঠিকাব না। যদি লেগে থাকো, দল যদি দাঁড়ায় তবে ভালই পাবে। এখন অবশ্য থোক টাকা না দিলেও খাওয়া-পরা পাবে, থাকার জায়গা দেবো। কিছু হাতখরচ।

বীণা হাত পেতে কাকার দেওয়া পঞ্চাশটা টাকা প্ৰায় ভিক্ষে হিসেবে নিল। সেই টাকা পেয়ে শ্বশুরবাড়ির সকলেই খুশি। তাকে বনগাঁয়ে রহস্যময় চাকরিতে পাঠাতে কারও কোনও আপত্তি হল না। শুধু ধুকতে ধুকতে নিমাই বলল, বনগাঁ যে অনেক দূর!

নদেরচাঁদ বলল, কিসের দূর! দুনিয়াটা কি আর আগের মতো আছে নিমাইদা? লোকে কলকাতায় ঘুম থেকে উঠে রাত্তিরের খাবার আমেরিকায় খায়, তা জানো? দুনিয়াটা এই একটুখানি হয়ে এসেছে। পালপাড়া থেকে বনগাঁ যদি দূর তাহলে নাক থেকে কানটাও দূর।

ডাঙা থেকে কুমীরটা শেষ অবধি তাকে বিপদসঙ্কুল জলে টেনে নামালই। হাবুড়ুবু কিছু কম খেয়েছে বীণাপাণি! তবে না শক্তিপোক্ত হয়েছে! বনগাঁয়ে তাকে আসতে হয়েছিল একা। যাত্ৰাদলের আর একটা মেয়ের বাড়িতে কাকা তার থাকবার ব্যবস্থা করে দিল। তিন মেয়ে নিয়ে বিধবা মায়ের সংসার। বুড়ি একটু ভাল মানুষ গোছের। বড় মেয়ে একটা স্কুলে পড়ায়, সংসার তারই কাঁধে। মেজো একটা ছেলের সঙ্গে বিয়ে বসে চলে গিয়েছিল, ফেরত এসেছে। ছোটো মেয়ে সীমা যাত্ৰাদলে ঢুকে পরে সিনেমায় নামবার স্বপ্ন দেখছে।

প্রথম প্রথম লজ্জা, ভয়, অনভ্যাস আর অস্বস্তিতে রিহার্সালের পর রিহার্সালে বকুনির পর বকুনি খেত বীণাপাণি। রাতে শুয়ে কাদত আর সীমা তাকে সান্তুনা দিত। একমাস তাকে খাঁটিয়ে জেরবার করে দিল কাকা। তারপর ভরাভর্তি আসরে একটা ছোটো রোলে সত্যিই নেমে পড়ল বীণাপাণি। কোনওরকমে পার্ট মুখস্থ বলে যেতে পারল।

কাকা তার মধ্যে কী দেখেছিল কে জানে! এর পরও তাকে দল থেকে তাড়ায়নি, বরং উঠে-পড়ে লাগল তাকে তৈরি করতে। শুরু হল বেদম খাটুনি। কাকা বলতে লাগল, এবার বড় রোল দিচ্ছি, কিন্তু দিনের মধ্যে চব্বিশ ঘণ্টাই রোলটা। ভাববে। ভাববে। তুমি দময়ন্তী, তুমিই দময়ন্তী, দময়ন্তী ছাড়া আর কেউ নও।

তাই ভেবেছিল বীণাপাণি। দ্বিতীয়বার একই পালায় অন্য ভূমিকায় নেমে তার আর বিশেষ ভয় হল না। খানিকটা সহজভাবে পার্ট করে গেল। নল-দময়ন্তী দিয়ে চাঁদপাড়া, চাকদা, বড় জাগুলিয়া, কাঁচড়াপাড়ায় বেশ লোক টানল বিশ্ববিজয় অপেরা। ততদিনে পাকাপোক্ত হয়ে উঠল বীণাপাণি। নেশা ধরল অভিনয়ের।

সবচেয়ে বড় কথা হাতে টাকা আসতে লাগল। আর বেনোজলে ভেসে আসতে লাগল যতেক কামট কুমীর। ডাঙা থেকে তাকে জলে টেনে নামানোর অপেক্ষায় যারা ছিল। তাদের কাছে মেয়েছেলে মানে মেয়েছেলেই। তার বেশি আর কিছু নয়। কে আর্ট করে, কে লেখাপড়ায় ভাল, কার গানের গলা আছে বা লেখার হাত আছে সে সব নিয়ে বেশির ভাগ পুরুষেরই মাথাব্যথা নেই। মেয়েমানুষের গুণকে তারা মোটেই দাম দিতে চায় না। তাদের কাছে শরীরটাই আসল কথা।

শরীর বাঁচাতে বীণাপাণিকে কম কূটবুদ্ধি খাটাতে হয়নি। দু-একজন তো খুন করারও হুমকি দিয়েছিল।

শরীরের জন্য একজন পাহারাদার দরকার ছিল। সে চৌকিদার স্বামীর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে? নিমাই যতই সামান্য মানুষ হোক, তবু কলেরা-বসন্তের টীকার মতো স্বামীরও কিছু উপকার আছে। যাত্রায় নামবার ছমাস বাদে নিমাইকে আনতে গিয়েছিল বীণাপাণি। সে বনগাঁয়ে একখানা ঘর ভাড়া করেছে, নতুন চৌকি কিনেছে।

বীণাপাণির টাকায় ওষুধ-পথ্য করে নিমাই তখন শক্ত অসুখ থেকে খাড়া হয়েছে। ফলের দোকানে বসেছেও। বীণাপাণিকে দেখে তার অভিমান আকাশে উঠল বুঝি। বাকা গলায় বলল, আমাকে আর তোমার কিসের দরকার।

বীণাপাণি অবাক হয়ে বলে, দরকারের কথা ওঠে কেন? আমি তোমার বিয়ে-করা বউ, নাকি?

সে ছিলে কোনওদিন।

আজ নয়?

নিমাই মাথা নিচু করে বলল, আজ আর আমি কে! তোমার কত মোসাহেব জুটেছে।

মোসাহেব অত সস্তা নয়। যাত্রায় নামলেই বুঝি মোসাহেব জোটে? এখনও আমাকে কেউ পাত্তাই দেয় না। সবে তো একটু-আধটু শিখেছি, আড় ভাঙছে।

যাত্রায় নামলে কেন? আমি তো বেঁচে ছিলুম।

বাঁচতে না। ঠিক সময় ওষুধপত্র না পড়লে মরতে হত। ভাগ্যিস পালা দুটো ভাল চলল, তাই কাকা খুশি হয়ে মাস কয়েক হল তিনশো টাকা মাইনে দিচ্ছে।

এই কাকাটি কে বলো তো! খুব শুনছি। তার কথা।

কাকার কথা বলার সময় কেমন যেন ভক্তিতে গদগদ হয়ে পড়ে বীণাপাণি। ভারী গলায় বলল, ওরকম মানুষ দেখিনি। নাটক আর অ্যাকটিং নিয়ে সারাক্ষণ বুদ হয়ে আছে। অন্য কোন দিকে মন নেই।

কিন্তু আমি শুনেছি লোকটা স্মাগলার।

সেটাও মিথ্যে শোনোনি। কাকা নাটকের জন্য বুঝি সব করতে পারে। এই যেমন তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমি হায়া লজ্জা বিসর্জন দিয়ে যাত্রায় নামলুম, ঠিক তেমনি। ভালবাসার জিনিসকে বাচাতে মানুষ সব করতে পারে। কাকা স্মাগলিং করেছে। যাত্রার দল বানাবে বলে।

তাহলে তাকে কি ভাল লোক বলা যায়?

একবার চলো না বনগাঁয়ে, দেখা হোক, কথাবার্তা হোক, তারপর নিজেই বুঝতে পারবে কেমন লোক।

আমি এই বেশ আছি বীণা।

বোকা শ্বশুর আর শাশুড়ি ছেলে আর ছেলের বউয়ের আড়াআড়ি দেখে ভয় খেল। খুব স্বাভাবিক। বউ টাকা রোজগার কুরুন্টু ভুৱা সেই টাকায় দুটি খেতে পরতে পাচ্ছে। ছেলে আর বউতে আড়াআড়ি ছাড়াছাড়ি হলে তাদেরই বিপদ। পেটে টান পড়বে।

দুই বুড়োবুড়ি তখন ছেলেকে নিয়ে পড়ল, কাজটা খারাপ কেন হবে? সিনেমা থিয়েটারে আজকাল কত বাবুঘরের মেয়েরা নামে। পাশ-টাশ করা সব মেয়ে। ওসব এখন আর কেউ ধরে না।

শাশুড়ি গোপনে তাকে এমন কথাও বলল, মনিবকে খুশি রেখো। মনিব অন্নদাতা ভগবান। শরীর যদি ঐটোকাটা হয়ে পড়ে তো গঙ্গায় ড়ুব দিয়ে এলেই সব পাপ ধুয়ে ফর্সা।

গুণ একখানা ছিল নিমাইয়ের। মা-বাপের ওপর ভক্তি। শেষ অবধি যে সে বনগাঁয়ে বউয়ের ঘর করতে এল সে। ওই মা-বাপের জন্যই। তাদের কথায় বা আদেশে ততটা নয়, যতটা তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

শ্বশুরমশাইয়ের খুব ইচ্ছে, বনগাঁয়ে গিয়ে ব্যাটা-বউয়ের সঙ্গে থাকে। সেটা হতে দিল না নিমাই। বলল, আগে আমি গিয়ে সব বুঝে আসি, তারপর দেখা যাবে।

বনগাঁয়ে এসেই যে নিমাই সব বুঝতে পারল, এমন নয়। তবে বীণাপাণি যে ভারী ব্যস্ত মানুষ এবং তাকে যে সেই গ্ৰাম্য সরল বোকা বিউটির মতো আর পাওয়া যাবে না সেটা টের পেতে তার দেরী হল না। এতে তার অভিমান হতে লাগল, সে বেকার লোক, সারাদিন কাজ নেই বলে বসে থাকে, আর তার বউ সকাল-বিকেল রিহার্সাল দিতে যায় নাওয়াখাওয়ার সময় নেই-এটা ভাল লাগার কথাও নয়। তার ওপর পালা নিয়ে বাইরে যাওয়া তো আছেই। হয়তো দু রাত্তির তিন রাত্তির ফেরেই না। বউয়ের রেশ নামডাক হচ্ছে চারদিকে। লোকে পথে-ঘাটে বাজারহাটে নিমাইকে টিটকিরি দেয়। তাই থেকেই বোঝা যায় যে, বউয়ের নামডাক হচ্ছে।

নাম হচ্ছিল বিশ্ববিজয় অপেরার। বারাসতে নিখিল বঙ্গ যাত্ৰা উৎসবে বিশ্ববিজয় অপেরার দুখানা পালা হল, দুখানাই মুকুট, কলকাতার দলগুলোর মতো অত হ্যান্ডস নেই তাদের, নামডাকের অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই, তবু বিশ্ববিজয় ফাটিয়ে দিল।

বীণাপাণি সবে তার ঘরবন্দী নারীত্বের খোলস ছেড়ে হাজার মানুষের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার অদ্ভুত মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে, এরকম সময়ে ঘরে ফিরে সে রোজ একখানা বিমর্ষ অন্ধকার মুখ দেখে খুশি হবে কেন? দেখে দেখে তেতো হয়ে যেতে লাগল।

কী হয়েছে তোমার বলো তো? আমন গোমড়া মুখ করে থাকো কেন?

নিমাই ঝগড়া করত না। ঝগড়াঝাঁটি, খিটিমিটি তার মোটে আসেই না। সে হল পান্তা-পুরুষ। জলে ভেজা, ঠাণ্ডা। শুধু ডাইনে বাঁয়ে মাথা নেড়ে একটা নেতিবাচক ভঙ্গি করে। তার বেশি কিছু নয়। মাঝে মাঝে কাতরভাবে বলত, আমার যে এখানে করার কিছুই নেই। একটু কিছু না করলে কী হয়?

যাত্রার দলে লোকলঙ্কর লাগে। সে-কাজে ঢোকাতে চেয়েছিল বীণাপাণি, নিমাই রাজি হচ্ছিল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।

কিসের বাড়াবাড়ি তা আর ভাঙল না।

বছর দুই এইভাবে চলল। বীণাপাণি জমি কিনে ফেলল বনগাঁয়ে। দুখানা ঘর। নিমাই নিজেই তত্ত্বাবধান করল, কিন্তু উদাসীনভাবে। বীণাপাণির যে হচ্ছে তাতে যেন ওর কিছুই না। বীণা ভারী বিরক্তি বোধ করে নিমাইয়ের ওপর।

ওর কিছুই কি ভাল লাগে না বীণার। লাগে। যখন খুব ভোরবেলা ঘুমচোখে সে শুনতে পায়, নিমাই উঠে বারান্দায় বসে সুরেলা গলায় প্রভাতী গাইছে। ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ শুনতে শুনতে গায়ে কাটা দেয়। নিমাইয়ের আর একটা ব্যাপারও ভাল লাগে বীণার। তার বাবার সঙ্গে নিমাইয়ের আবছা একটা মিল আছে। দুজনেই ভারী নিরীহ।

বাইরে আজ মেঘলা দিন। গুড়ো বৃষ্টির একটা আবছায়া চারদিকে। এইসব দিন বীণাপাণির পক্ষে খারাপ, বিশ্ববিজয় অপেরার পক্ষে খারাপ। বর্ষাকালে বায়না নেই-ই প্রায়। এবারের ভারী বর্ষায় কয়েকটা বুঝায়না কেঁচেও গেছে। আজকাল আর হাত পা ঠুটো করে ঘরে থাকা তার ভাল লাগে না। ঘর যেন গারদ। আর এমন দরকচা-মারা দিনে ওই লোকটা বাক্স গুছিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পায়তাড়া কষছে। দুধকলা দিয়ে কাল-সাপ পোষারই সামিল হল বোধহয় ব্যাপারখানা।

অথচ এমন কি ব্যাপারটা ছিল? কাকার দলের ছেলেদের সঙ্গে বীণাপাণির চেনাজানা অনেকদিনের। যাত্রার দলে তারাও মাঝে মাঝে ভিড়ে যায়। আবার বর্ডার পেরিয়ে মালও নিয়ে আসে রাতবিরেতে। তারা কে কেমন লোক অত জেনে দরকার নেই। বীণার। তবে তারা মাঝে মাঝে জিনিসপত্র গচ্ছিত রেখে যায় তার কাছে। একবেলা আধবেলা পর নিয়ে যায়। এদের একজন পগা। বীণা তাকে বেশ একটু পছন্দ করে। ভারী মিষ্টি তার কথাবার্তা। চোখ দুখানা বড্ড ভাবালু। তার কাছে অনেক টাকা থাকে, ডলার থাকে, পাউন্ড থাকে। সে টাকারই কারবারি। সোনার বিকিকিনিও করে বলে শুনেছে বীণাপাণি। তবে সে কারোরই হাঁড়ির খবর নিতে যায় না। বন্ধুর মতো সম্পর্ক রেখে চলে। পগা মাঝে মাঝে তার কাছে মস্ত এক-একটা প্যাকেট জিম্মা রেখে যায়। সন্ধের পর সে যায় জুয়া খেলতে আর মদ খেতে। সঙ্গে বেশি টাকা থাকলে চোট হয়ে যেতে পারে। বীণাপাণি রেখে দেয়, কোনও কৌতূহল প্রকাশ করে না।

এ ব্যাপারটা নিয়েই নিমাইয়ের বড় অশান্তি। বারবার বলে, ওসব ছোকরাদের জিনিস গচ্ছিত রাখা ঠিক হচ্ছে না। কোনটা কী জিনিস কে জানে। হয়তো অন্ত্রটন্ত্রই রেখে গেল একটা ন্যাকড়ায় মুড়ে, বা বোমা।

অস্ত্ৰও থাকে, তবে সেটা আর নিমাইকে বলেনি বীণা। সে শুধু বলল, এ জায়গায় থাকলে হলে এদের সঙ্গে ভাব রেখেই থাকতে হয়। এরা বন্ধু থাকলে ভয় নেই।

এ ব্যাপারটা আমার বড় অশান্তির কারণ হচ্ছে।

বীণাপাণি এই ঘ্যানঘ্যান শুনে শুনে পরশু আর সহ্য করতে পারেনি। খুব এক তরফা ঝেড়েছে নিমাইকে। মুখে কোনও কথা আটকায়নি। শেষ অবধি বলেছে, তুমি এ বাড়ি থেকে বিদেয় হও। এখানে আর জায়গা হবে না।

কথাটা বলার সময় খেয়াল হয়নি যে, নিমাইকে সে যেচে নিয়ে এসেছিল।

এখন নিমাই ওই বাক্স গোছানো শেষ করে চুপচাপ বসে আছে। চোখ দুটো ছলছলে। কিছু বলবে বলে মনে করছে, কিন্তু কথা আসছে না মুখে। এত রাগারগি করল সেদিন বীণাপাণি, একটিও জবাব দেয়নি। বড় নিরীহ।

আর এত নিরীহ বলেই রেগে যায় বীণাপাণি। সে শুধু চেয়ে আছে এখন। নিমাই চলে গেলে এ বাড়িতে একা থাকবে বীণাপাণি। একটু একা লাগবে। তা লাগুক।

এখন দুজনে ঝুম হয়ে বসে আছে। বীণা তাকিয়ে আছে নিমাইয়ের দিকে। চোখে জ্বালা, রাগ আক্রোশ; নিমাই চোখ নিচু করে বসে আছে মেঝোয়। ঘরে ছুচ পড়লে শোনা যায়। লোকটার কোনও দাম নেই বাইরের দুনিয়ায়। শুধু বীণাপানির কাছে কিছু আছে। এক কানাকড়ি হলেও আছে। তবু আস্পর্ধা দেখ।

চোখে জল আসছিল বীণাপাণির। আঁচলটা চোখে তুলতে যাবে, ঠিক এই সময়ে জানলা দিয়ে একটা মুখ উঁকি দিল। পাড়ার একটা ছেলে।

বীণাদি, খবর শুনেছো? পগা কাল রাতে বটতলায় খুন হয়েছে।

অ্যাঁ!

লাশ ঘিরে দারুণ ভিড়। পুলিশ এসেছে। বলেই ছেলেটা চলে গেল।

নিমাই মুখ তুলে বীণার দিকে চাইল।

কাল রাতে পগা মস্ত একটা প্যাকেট রেখে গেছে বীণার কাছে। তাতে অনেক টাকা।

০০৪. একটা ন্যাকা বৃষ্টি

একটা ন্যাকা বৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরে হয়ে যাচ্ছে। হয়েই যাচ্ছে। ধরছে না, কমছে না। জোরেও নয়, আস্তেও নয়। ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান ঘ্যান। একখানা পাতলা ঝরোকার মতো ঢেকে আছে চারপাশ।

বৃষ্টি খুবই ভালবাসে মণীশ। মুণীশের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি ঘটেছে বর্ষাকালে। এমন কি অপর্ণার সঙ্গে তার, চমকপ্ৰদ প্ৰেমটাও। এখন মণীশ নার্সিং হোম-এ। শক্তিশালী ওষুধে আচ্ছন্ন। সেই গাঢ় কুয়াশার মতো আচ্ছন্নতার ভিতরে এই বৃষ্টির কোনও খবর পৌঁছোচ্ছে না। মাঝে মাঝে গভীর ব্যথায় এক একটা কাতর শব্দ উঠে আসে বুকের গহন থেকে।

মণীশের বাড়ির অবস্থাটা সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় খুব স্নান ও স্তব্ধ। টি ভি-টা চলছে। বাংলা খবর একটু আগেই শুরু হল। টি ভি-র মুখোমুখি বসে মণীশের ছেলে অনীশ। বাবাকে নিয়ে দু রাত জাগার পর এখন তার চোখের পাতা চুম্বকের টানে জুড়ে যাচ্ছে বারবার। করুণ গলায় একবার বলেছিল অনেকক্ষণ আগে, মা, একটু চা দেবে? একটু কড়া করে?

অপর্ণা বলেছিল, দিই।

সাড়ে সাতটা নাগাদই ঝুমকি তার কমপিউটার ক্লাস থেকে ফেরে। ফিরে চা চায় বা নিজেই করে নেয়। অপর্ণা একটু দেরী করছিল চা করতে। এখনই তো ফিরবে ঝুমকি।

এ বাড়িতে কারও মন ভাল নেই বলে সংসারটাই যেন এলিয়ে পড়েছে। ছোটো মেয়ে অনু এ সময়ে রোজ স্টিরিওতে গান শোনে। রাজ্যের হিন্দি গান। অনুশীলা অর্থাৎ অনু দু রাতের টেনশনের পর বাইরের ঘরে ডিভানে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন।

বাচ্চা কাজের মেয়েটা রান্নাঘরের মেঝোয় বসে আটা মাখছে। রাতের রুটি হবে। ফ্রিজ খুলে অপর্ণা দেখে নিয়েছে, আনাজপাতি প্রায় কিছুই নেই। রান্না করা ডাল-ডালনাও নয়। দুদিন তাদের এসব খেয়াল ছিল না। কিন্তু আজ রাতে রাধতে হবে, খেতেও হবে-ভাবতেই গায়ে জ্বর আসছিল অপর্ণার। খিচুড়ি করলে ঝামেলা মিটে যেত। কিন্তু স্বাভাবিক বুদ্ধি তো কাজ করছে না মাথায়। খিচুড়ির কথা মনেই ছিল না।

মণীশ কি চললি? মণীশ চলে গেলে অপর্ণার কি করে চলবে?

আজ সব কাজ ফেলে রেখে অপর্ণার ইচ্ছে করছে কাউকে ডেকে গল্পটা শোনায়, তাদের প্রেম হয়েছিল কত অদ্ভুতভাবে, কী রোমান্টিকভাবে।

বৃষ্টির জন্যই দেরী হচ্ছে মেয়েটার, ভিজে আসবে বোধহয়। মেয়েটার সাইনাস, ঠাণ্ডায় এলাৰ্জি, ইসিনোফেলিয়া খুব বেশী। বাবার জন্য দুদিন ধরে মেয়েটা কেঁদোছে আর ছুটেছে। এখানে সেখানে। ঝুমকি বরাবর তার বাপের বেশী ন্যাওটা। এখনও বাপের হাতে ভাত খায়, বায়না করে, কোলে অবধি বসে।

মণীশ যদি চলে যায় তাহলে এ বাড়ির আলোটুকু, সুখটুকু, উত্তাপটুকু সব টেনে নিয়ে যাবে। এটা মণীশের দ্বিতীয় অ্যাটাক এবং ম্যাসিভ। ডাক্তার প্রথমে ছত্রিশ, তারপর আটচল্লিশ এবং তারপর বাহাত্তর ঘন্টার অনিশ্চয়তার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এগুলো কথার কথা। পদ্মপাতার জলের মতোই টলমল মণীশের আয়ু, অপর্ণা জানে।

শক্ত হওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। অপর্ণা। কিন্তু মুঠোয় ধরবার মতো কিছু পাচ্ছে না। যথাক্রমে কুড়ি, আঠারো এবং চৌদ্দ বছরের তিন ছেলেমেয়ে তাদের। বয়সের অনুপাতে তিনজনই কিন্তু ছেলেমানুষ রয়ে গেছে। সংসারের কোনও আঁচ ওদের গায়ে লাগতে দেয়নি। অপর্ণা আর মণীশ। আজ ওরা সবচেয়ে বেশী অসহায়, দিশাহারা।

জলের মতো টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। মহার্ঘ টাকা, কিন্তু টাকার কথাটা একদম ভাবতে চাইছে না। অপর্ণা। টাকাটা তো আসল নয়, মণীশই আসল। টাকার অপচয়ের কথা ভাবাও বোধহয় মণীশের প্রতি অসম্মান।

ভাবতে চাইছে না। তবু ঘুরে ফিরে মাছির মতো একই জায়গায় এসে বসছে মনটা। কারণ আছে। গত কয়েক বছর মণীশ একটু টাকা ওড়াচ্ছিল। না, তার বাইরের কোনও দোষটোষ নেই। আসলে সে একটু বড়লোকের মতো থাকতে শুরু করেছিল। দামী জিনিসপত্র কিনে আনা, ভাল হোটেলে আকাশ-ছোঁয়া দামে সপরিবারে গিয়ে মাঝে মাঝে খাওয়া, সেকেন্ড ক্লাশের বদলে ট্রেনের এ সি কামরায় বেড়াতে যাওয়া। এসব বড়লোকী লক্ষণের পিছনে মণীশের প্রথম জীবনের অভাবকষ্টের স্মৃতি কাজ করে নিশ্চয়ই। কিছু টাকা হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে যেন সব পুষিয়ে নিতে উঠে পড়ে লাগল সে। ইদানীং অপর্ণা লক্ষ করেছে, ছেলেমেয়ে এবং মণীশের মধ্যে একটা ভাব এসে গেছে—আমরা বড়লোক।

এই ভাবটাই মিথ্যে। মণীশের চাকরিটা চমৎকার। বহুজাতিক প্রথম শ্রেণীর কোম্পানিতে সে চাকরি করে। বিশাল মাইনে। কিন্তু সেটা মাইনেই। আমাপা, অফুরন্ত টাকা তো নয়। মাইনে মানেই দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ সমন্বিত টাকা। সীমাবদ্ধ। বুদ্ধিমান মানুষ কখনও সীমাবদ্ধ টাকার ওপর নির্ভর করে বড়লোকী করতে যায় না। বড়লোকী করার জন্য যে টাকার প্রয়োজন তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ আর বোধ থাকে না। তা মাসের শেষেও আসবে না।

এসব মণীশকে বোঝানো খুব সহজ কাজ নয়। মণীশ অবুঝ ও অত্যন্ত অভিমানী। কথায় কথায় সে বিগড়ে যায়। অপর্ণা তাই মণীশকে শাসন করতে হলে করেছে আদরের ছলে। বেশির ভাগ সময়ে ঘন আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে শ্বাসবায়ুতে শ্বাসবায়ু মিশিয়ে বলেছে, শোনো, আমরা কিন্তু বড়লোক নই। টাকা উড়িয়ে দেওয়াটা কি খুব ভাল? আমাদের না দুটো মেয়ে আছে, যাদের বিয়ে দিতে হবে?

সঞ্চায়ের কথা, মিতব্যয়িতার কথা শুনলেই মণীশ চটে যায়। এসব হিসেবী কথা সে একদম সইতে পারে না। ভবিষ্যতের ভাবনা তার একদম নেই। সে বলে, মেয়ের বিয়ে ফুয়ে হয়ে যাবে। আমি কত প্রভিডেন্ট ফাণ্ড আর গ্র্যাচুইটি পাবো জানো?

অনেক বলেও মণীশকে এ ব্যাপারে লাগাম পরাতে পারেনি। অপর্ণা। আর মণীশের ছায়াতে তিনটে ছেলেমেয়েও হল ওইরকম। টাকা-পয়সাকে টাকা-পয়সা বলে মনে করতে চায় না।

টাকা বোধহয় প্রতিশোধ নেয়। নার্সিং হোমের খাতায় প্রতিদিন মোটা টাকার অংক জুরের পারদের মতো ওপরে উঠে যাচ্ছে। ভাবতেও ভয় পায় অপর্ণা। এ সংসারে একমাত্র সে-ই বাস্তববাদী। সে একা। সে কখনও নিজেদের সীমাবদ্ধতা বিস্মৃত হয় না। সে জানে, মণীশের চিকিৎসার সব খরচ দেবে তার কোম্পানি। সেজন্য চিন্তা নেই। কিন্তু মণীশ যদি না ফেরে?

মণীশ না ফিরলে তার পিছনে চালচিত্রের মতো বহুজাতিক সংস্থাটিও মুছে যাবে। এককালীন কিছু টাকা গছিয়ে দিয়ে কোম্পানি তাদের সম্পূর্ণ ভুলে যাবে। আর তখনই কি শুরু হবে টাকার প্রতিশোধ?

চায়ের কাপে চামচে নাড়তে নাড়তে যখন সামনের ঘরে এল অপর্ণা তখন অনীশের মাথা ঝুঁকে পড়েছে বুকের ওপর। নাক ডাকছে। খুব আদর করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে অপর্ণা নরম গলায় ডাকল, বুবকা, ও বুবকা! চা খাবি না?

অনীশ রক্তবর্ণ চোখ মেলে চাইল। তারপর লজ্জার হাসি হাসল।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, না?

ঘুমের আর দোষ কি? যা যাচ্ছে আমাদের ওপর দিয়ে!

আর এক কাপ চা করে ফেলেছে। অপর্ণা, কিন্তু ঝুমকি এখনও এল না। যদি দেরী করে তাহলে চা নষ্ট হবে। ঠাণ্ডা চা ফের গরম করে দিলে তা ছোবেও না। নতুন করে বানিয়ে দিতে হবে। অপর্ণার একটা কান উদ্‌গ্ৰীব রয়েছে ডোরবেল-এর জন্য। কুমকির বুক দুর্বল। সর্দিকাশি জ্বরে খুব ভোগে। বড্ড রোগা। তবু নানারকম অকাজের ট্রেনিং নিচ্ছে। অনার্স ছাড়া বি এ পাশ করেছে। এম এ পড়ার উপায় নেই। গাদা গুচ্ছের টাকা দিয়ে কমপিউটার এবং গান শিখছে। এই অপচয়টাও যদি রোধ করা যেত!

মাছিটা উড়ে উড়ে ঘুরে ফিরে একটা জায়গাতেই এসে বসছে। টাকা। অপর্ণ ভাবছে, টাকা কি প্রতিশোধ নেয়? টুকু দি অসম্মান, উপেক্ষা করা হয়, টাকাকে যদি যথােচিত মূল্য না দেওয়া হয়, তাহলে কি টাকা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে?

অপচয় এবং অপব্যয়ে বাঁধ দিতে চেয়েছিল অপর্ণা। পুরোপুরি পারেনি। সঞ্চয়মুখী করে তোলার অনেক চেষ্টা করেছে, মণীশ হয়নি। শুধু আয়কর থেকে বাঁচতে প্রতি বছর এন এস এস আর এন এস সি-তে যা একটু-আধটু জমা হয়। কিছু টাকা জমছে জীবনবীমায়। ব্যস।

নিস্তব্ধ বাড়িতে ডোরবেলের আওয়াজ প্ৰায় বজাঘাতের মতো চমকে দিল। অপর্ণাকে। ঝুমকি এল বুঝি! কত না জানি ভিজে এসেছে মেয়েটা!

দরজা খুলল বুবকা। না, ঝুমকি নয়। অনুর বান্ধবী মোহিনী। চমৎকার দেখতে মেয়েটা। বাইরের চটক ততটা কিন্তু নেই। মোহিনীর সৌন্দর্য দেখতে হলে একটু মন দিয়ে দেখলে ধরা যায়। মুখ চোখ যেন সূক্ষ্ম সব যন্ত্র দিয়ে কমপিউটারে মাপজোখ করে তৈরি। কিন্তু মোহিনী খুব ফর্সা নয়, খুব লম্বা নয়। আলটপকা চোখে পড়ে না। কিন্তু মিষ্টি ধারালো মুখখানা আর ভারী পাতার নিচে ঢলঢলে দুখানা চোখ অপর্ণার খুব পছন্দ। একটাই দোষ, বড্ড ইংরিজিতে কথা বলে।

অপর্ণার বাড়িতেও একই অবস্থা। ঝুমকি বাদে বাকি দুজন প্রথম থেকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে। ওরা বাংলা বলতে একটুও ভালবাসে না। মণীশও ওদের ইংরিজিকে আকণ্ঠ প্রশ্রয় দেয়। আন্টি, কি খবর জানতে এলাম।

একইরকম। বোসো। এই ড্রেসটা কবে করালে?

মোহিনী তার ঘাঘরা আর কামিজের নতুন পোশাকটাকে যেন হাত বুলিয়ে একটু আদর করে বলল, আমার বার্থ ডে ছিল তো গত মাসে। বাবা দিয়েছে।

বেশ পোশাকটা হয়েছে। ঘাঘরার তলায় রঙিন বলগুলো কি তোমরা লাগিয়ে নিয়েছো, না কি ওরকমই?

এরকমই কিনতে পাওয়া যায়। বাবা বম্বে থেকে এনেছে।

তাই বলো। এখানে এখনও এসব ফ্যাশন চালু হয়নি।

মিষ্টি করে হাসল মোহিনী, খুশির হাসি।

তবে এই বৃষ্টির দিনে ড্রেসটা পরে ভাল করেনি।

মোহিনী অকপটে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, চট করে চলে এলাম তো, খেয়াল করিনি।

বোসো। চা খাবে?

আমি তো খাই না। বলে আবার সেই মিষ্টি হাসি।

ওঃ, তাই তো। আসলে আমার এক কাপ চা বাড়তি হয়েছে। কী যে করি!

বুবকা বিরক্ত গলায় বলল, তোমার প্রবলেমগুলো এত ছোটখাটো কেন বলো তো মা! চা-টা আমাকে দিয়ে দাও। আঠারো বছরের ছেলেরা আজকাল ভোট দেয়। বুবকর আঠারো। তার মানে কি বুববকা সাবালক হয়ে গেল! এক কাপ চা বাড়তি হয়েছে, একথাটা বোধহয় মোহিনীর কাছে বলাটা উচিত হয়নি। যেন বাড়তি হয়েছে বলেই অফার করা হচ্ছে। বুবক বোধহয় সেই কারণেই অপর্ণার ওপর বিরক্ত হল। আজকাল অপর্ণা কত কি শেখে ছেলের কাছ থেকে।

মোহিনী আসতেই এক ডাকে উঠে পড়ল অনু।

অপর্ণা মনে মনে এরকমই একটা কিছু চাইছিল। কেউ একজন আসুক। এই নিস্তব্ধ বিষণ্ণ বাড়িটার ভারী বাতাস কেটে যাক কথায় বার্তায় হাসিতে।

অফিস থেকে লিজ নেওয়া এই ফ্ল্যাটটা বেশ বড় এবং স্ট্যাটাস সিম্বল সবই প্রায় আছে। শুধু গ্যারেজে গাড়িটা নেই। আগের অ্যাম্বাসাডারটা ভাল দাম পেয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। মণীশ গত মাসেই। একটা মারুতি ভ্যান কেনার কথা। দরাদরি * চলছিল। দু-চার দিনের মধ্যেই এর্সে যেত। কিন্তু মণীশের অসুখটাই বাধা হল বোধহয়। অপর্ণা একরকম খুশি। তেলের যা দাম বাড়ছে, গাড়ি পোষার মানেই হয় না। মণীশ অফিসে যায় আসে পুল কার-এ। তবে গাড়িটা দিয়ে কি হয়? অপৰ্ণার শখ ছিল গাড়ি চালানো শিখবে। মোটর ট্রেনিং স্কুলে শিখেও ফেলল। লাইসেন্স দিয়ে দিল। আর তারপরই সে ভয়াবহ অ্যাকসিডেন্ট… অপৰ্ণা সে কথা আর ভাবতেই চায় না।

একটা নতুন আওয়াজ বজ্ৰাঘাতের মতোই ফের চমকে দেয় অপর্ণাকে, ভুল শুনছে না তো! করিডোরে টেলিফোন বাজছে নাকি? চার মাস ধরে টেলিফোন মূক ও বধির হয়ে ছিল। তারা ক্রমে ভুলে যাচ্ছিল টেলিফোনের কথা। পরশুদিনই ঠুমুক গিয়ে টেলিফোন অফিসে ধরে পড়েছিল, আমার বাবার ভীষণ সিরিয়াস অসুখ, আমাদের টেলিফোনটা ঠিক করে দিন।

এসব আবেদনে কাজ হয় কি?

টেলিফোনের আওয়াজে বুবকা আর অনুও উঠে দাঁড়িয়েছিল। বিস্ময়ে।

অপৰ্ণাই গিয়ে সবার আগে ধরল।

হ্যালো।

আপনাদের লাইন ঠিক করে দেওয়া হল।

অপর্ণা বুকভরা কৃতজ্ঞতা অনুভব করে বলে, কি বলে যে ধন্যবাদ দেবো। আমার স্বামী ভীষণ অসুস্থ, নার্সিং হোমে। তাই টেলিফোনটা আমাদের এখন ভীষণ দরকার।

অসুখ আছে বলছেন! আচ্ছা ঠিক আছে।

লাইন এখন চালু থাকবে তো!

চেষ্টা তো আমরা সবসময়েই করি। মেশিন সব পুরোনো, বুঝতেই পারছেন।

অপর্ণার অভিজ্ঞতা আছে। লাইন চালু হয়েই ফের বন্ধ হয়ে যায়। সে টেলিফেনটা রেখে আবার তুলল। ডায়ালটোন আছে।

বুবকা উঠে এসেছে। টেলিফোন তুলে নিয়ে বলল, দাঁড়াও, নার্সিং হোমে একটা ফোন করি।

এই তো সন্ধেবেলায় দেখে এলি।

তবু। টেলিফোনটাও একটু বাজিয়ে নেওয়া যাবে।

বাড়ির সকলে যতক্ষণ না ফিরছে ততক্ষণ স্বস্তি নেই অপর্ণার। সন্ধের পর একে একে ফিরতে থাকে সবাই। সকলে যখন ফিরল, কেউ বাকি রইল না, তখন স্বস্তি। অপর্ণা অস্বস্তি টের পাচ্ছে ঝুমকির জন্য। আটটা বাজতে চলল।

অফিসের বদান্যতায় তারা বেশ ভাল আছে। খুব ভাল আছে। বাইরে থেকে তাদের বড়লোক বলেই তেঁা ভাবে লোকে। কিন্তু ভাল থাকাকে বিশ্বাস করে না। অপর্ণা। যেদিন পিছনে পেখম ধরার মতো মণীশের মস্ত নামজাদা অহংকারী কোম্পানিটি থাকবে না সেদিন ব্ল্যাকবোর্ডের লিখন মুছে দেবে সময়।

মণীশ বাড়ি করতে আগ্রহী ছিল না। ফ্ল্যাট কিনতে রাজি ছিল, তবে খুব অভিজাত কোনও পাড়ায়। কিন্তু তাতে যা টাকা লাগবে তা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু মণীশ কেবলই বলেছে, হয়ে যাবে। টাকা ঠিক জুটিয়ে নেবো।

কিন্তু সেরকম জুটিয়ে নেওয়ার মানে অপর্ণা জানে। হয়তো এমন সোর্স থেকে টাকা জোগাড় করবে যাতে চড়া সুদ দিতে হয়। আর ফলে হাঁড়ির হাল হবে।

অন্যদিকে বুদ্ধি কতটা তীক্ষ্ণ তা অপর্ণা জানে না, তবে টাকা-পয়সার ব্যাপারে তার স্বাভাবিক মেধা খুবই বাস্তববাদী। সে মণীশকে ড়ুবে-মরার হাত থেকে বাঁচাতে রোজ রাতে পইপই করে বোঝাতো। বুঝিয়ে বুঝিয়ে মুখে ফেনা অবশেষে মণীশ অতিশয় তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষার ভাব দেখিয়ে রাজি হল ইন্টাৰ্ণ বাইপাসের কাছাকাছি অপর্ণার মিনি মাসীর একটা চার কাঠা প্লট কিনতে। দাম খুবই সুসাধ্য। তখন ওপাশটায় লোকালয় নেই।

দুবছর আগে জমিটা কেনা হয়েছে। মণীশ একবারও দেখতে যায়নি। ছেলেমেয়েরা দেখে নাক সিটিকেছে। ওঃ, এই জায়গা!

এই তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষা মেনে নিয়েছে অপর্ণা। দেয়াল দিয়ে প্লটটা ঘেরা করিয়েছে।

মাঝে মাঝে সে ওই চার কাঠা জমির কথা ভাবে আর মনটা আনন্দে ভরে যায়। সব জায়গা থেকে উৎখাত হয়ে গেলেও তাদের জন্য ওই চারকাঠা জমি কোল পেতে থাকবে। সেখানে অনেক গাছ লাগিয়ে এসেছিল অপর্ণা। গাছগুলো। হয়েছে। তাদের ঘিরে আগাছাও জন্মেছে অনেক।

আজ এই বিষণ্ণ সন্ধ্যায় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ভাবনার মধ্যে তার কাছে একটা দ্বীপের মতো ভেসে উঠল ওই চারকাঠা জমি। মণীশ, তুমি জানো না, এখন কত হিসেবা-নিকেশের দিন এল আমাদের।

মা! একটু চা হবে?

অনু খুব করুণ গলায় বলে।

অপর্ণা মৃদু ধমক দিয়ে বলে, খালি পেটে চা কিসের? আগে কিছু খেয়ে নে। পাউরুটি টোস্ট করে দিচ্ছি।

না, কিছু খাবো না। অবেলায় খেয়ে বমি বমি লাগছে। চা দেবে মা?

মোহিনী তো চা খায় না, ওকে একটু মিষ্টি-টিষ্টি দে। দ্যাখ, ফ্রিজে বোধহয় আছে।

মোহিনী বলে, মাসিম, আমার সঙ্গে ফর্মালিটি কিসের? মিষ্টি আমি খাই না।

তুমি তো চা খাও না, কত ভাল তুমি! আর দেখ অনুর এ বয়সেই চায়ের নেশা।

টেলিফোনটা রেখে অনীশ রাগের গলায় বলে, ওরা কোনও ইনফর্মেশন দেয় না কেন বলো তো মা?

কেন, কী বলল?

বলল, পেশেন্ট স্টেবল, ঘুমোচ্ছেন।

তাহলে তো ঠিকই আছে। আর কী ইনফর্মেশন চাস?

তুমি বুঝছে না। ফোন ধরেই বলে দিল। তার মানে বাবার কেবিনে গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে তো আর বলল না। সবাইকেই বোধহয় এরকম বলে দেয়। আমি বরং একবার গিয়ে ঘুরে আসি।

দূর পাগল! এত অস্থির হওয়ার কী আছে? দু রাত নার্সিং হোমের চেয়ারে বসে কাটিয়েছিস। আজ একটু রিল্যাক্স কর।

মা, তুমি নিজে রিল্যাক্স করতে পারছে কি? বাবা যতক্ষণ না আউট অব ডেনজার হচ্ছে ততক্ষণ আমার রিল্যাক্স করার প্রশ্নই নেই।

টেলিফোনটা আবার বেজে উঠতেই আবার যেন বজাঘাতে কেঁপে ওঠে। অপর্ণা। কী হল? ফোন বাজছে কেন?

বুবকা ফোন তুলল, কে?… ওঃ দিদি! তুই কোথা তেকে ফোন করছিস! অ্যাঁ!… নার্সিং হোম! তোকে কে বলল যে আমাদের ফোন ঠিক হয়ে গেছে!… ওঃ। হ্যাঁ।

অপর্ণা স্তব্ধ হয়ে থাকে। কান বা বা করছে ভয়ে, উত্তেজনায়।

কী বলছে রে ও?

বুবক হেসে বলে, দিদি নার্সিং হোমে চলে গেছে। ওখানে ওরাই বলেছে যে বাড়ির ফোন ঠিক হয়ে গেছে। তাই দিদি। ফোন করছিল।

নার্সিং হোমে চলে গেছে! আর দেরি দেখে আমি এদিকে ভেবে মরছি।

বুবকা উদাস হাসি হেসে বলে, আমাদের এখন কোনও রুটিন নেই মা। মাথা কারও নর্ম্যাল কাজ করছে না। তোমারই কি করছে, বলো! মঙ্গলবার ওই দৃশ্য দেখার পর… ওঃ ইট ওয়াজ এ নাইটমেয়ার!

অপর্ণা চোখ বুজে শক্ত হয়ে যায়। প্রিয় মানুষের ব্যথা সহ্য করাই বোধহয় পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ। যখন বুক জুড়ে সেই ব্যথার বাঁশি বেজে উঠল। মণীশের, সে শুধু চিৎকার করেছিল আপু… আপু… বাঁচাও… মরে যাচ্ছি…

বুক মথিত করা সেই ব্যথা। যেন এক মত্ত মাতঙ্গ পায়ের তলায় পিষে ফেলছে। ওর বুক। দুটো চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল, বেঁকে যাচ্ছিল মুখ। সে যেন নিত্যকার চেনা মণীশ নয়। এ যেন অন্য মণীশ।

কিছুক্ষণ তারা সকলেই শুধু কি হল কি হল বলে উদভ্ৰান্ত আচরণ করেছিল। সবার আগে স্বাভাবিক বুদ্ধি ফিরে পেল অপর্ণা। সে দৌড়ে বেরিয়ে গিয়ে উল্টোদিকে বাড়ির ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনল। তিনি সাধারণ ডাক্তার। হার্ট স্পেশালিস্ট নন। কিন্তু প্ৰাথমিক একটা সামাল দিয়েই বললেন, ইমিডিয়েটলি হসপিটালাইজ করুন। কেস সিরিয়াস।

আজও সেই ঘোষণার ধাক্কা তারা সামলে উঠতে পারেনি। আজও যেন মণীশের সেই ব্যথা এ বাড়িতে রয়ে গেছে।

হঠাৎ ডোরবেল বেজে উটিলে, কেউ জোরে কথা বললে, হঠাৎ দমকা বাতাস বয়ে গেলে কেন যে ধক করে ওঠে অপর্ণার বুক! সামান্য শব্দই বজ্ৰপাতের মতো চমকে দেয়। তাকে। আর অপর্ণার চারদিক যেন এক ঘোর লাগা অবাস্তব। রিয়ালিটি ব্যাপারটা সে ঠিক টের পাচ্ছে না। প্ৰাণপণে সে স্বাভাবিক থাকতে চাইছে। ঠিকঠাক পেরে উঠছে না। অভিনয় করে যাচ্ছে। রাতে একা ঘরে সে কেন টের পায়, মণীশের বুক-জোড়া গহন ব্যথা গুমরে বেঁড়াচ্ছে ঘরময়? এরকম ভাবা কি স্বাভাবিক?

এত ভয় করে! এত এক লাগে! এত দুশ্চিন্তা আসে মনে! কাজের মেয়েটা আগে বস্তা পেতে সামনের ঘরে শুতো। তাকে এখন শোওয়ার ঘরের মেঝেতে শোওয়ায় সে।

প্রথমবার মণীশের হৃদযন্ত্র বিনীত ভাবেই তার অক্ষমতা জ্ঞাপন করতে শুরু করেছিল বছর দুই আগে। সেবার খুব মারাত্মক হয়নি। নার্সিং হোমেও যেতে হয়নি। ব্যথাও উঠে যায়নি চৌদুনে। সেদিন সকালে অফিস যাওয়ার সময় খুব হাঁসফাস, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা নিয়ে অফিসে যাওয়ার পোশাক সমেত বিছানায় শুয়ে পড়েছিল মণীশ। পাড়ার ডাক্তার দেখেই বলেছিল হার্ট স্পেশালিস্ট ডাকতে। বড় ডাক্তার এসে মণীশকে বিছানার বাইরে এক পাও নড়তে, সিগারেট ও স্নেহযুক্ত বা মশলাদার খাবার খেতে বারণ করেছিলেন। দিন দশেক শয্যা নিয়ে ছিল মণীশ। সিগারেট ছাড়ল, খাওয়া-দাওয়ার নিয়ন্ত্রণ মেনে নিল। সেবার তারা সবাই মণীশের অনিশ্চয়তা নিয়ে এমন দিশাহারা হয়ে যায়নি। ভেবেছিল, ঠিক হয়ে যাবে।

দশ দিনের মধ্যেই সামান্য ডিগবাজি খাওয়া হৃদযন্ত্র ফের ঠিকঠাক চলতে শুরু করে। মণীশ ফিরে আসে স্বাভাবিক কাজেকর্মে। দুবছর লম্বা সময়। মণীশের হৃদযন্ত্রের কথা আর কারও মনে থাকেনি। মণীশেরও না। রুটিনমাফিক মাঝে মাঝে ই সি জি করা হত। কোনও বেচাল পাওয়া যেত না তাতে।

প্রথমটা ছিল প্রোলগ মাত্র। নেহাতই ভূমিকা। পীয়তারা। বহাস্ফোট। লড়াইটা তখন শুরুই হয়নি।

দ্বিতীয়টা এল দিগ্বিজয়ী ঘোড়সওয়ারের মতো। সারা পৃথিবী জুড়ে তার দাপট। বুড়ো-বাচ্চা, ধনী-নির্ধন, পাবলিক-ভি আই পি সকলেই নতজানু তার কাছে। হার্ট অ্যাটাক-এ দুটি শব্দ যেন দামামা বাজিয়ে দেয় বুকে।

কে জানে কেন, হার্ট অ্যাটাক কথাটা অপর্ণার ভাল লাগে। একটা স্পর্ধিত আভিজাত্য, একটা অমোঘ পরিণতির ধ্বনি আছে তাতে। অথচ কী সর্বনেশে ব্যাপার। একটা হার্ট অ্যাটাক মানে কত জন মানুষের কত কী বন্ধ হয়ে যাওয়া।

মণীশ যদি চলেও যায় তাদেরও কত কী বন্ধ করে দিতে হবে। প্রথমেই বন্ধ হবে সব বিলাসিত, বাহুল্য, বড়লোকী। তারপরও হিসেব করে টিপে টিপে চলা শুরু হবে। এখন যেমন তাদের ছেলেমেয়েরা পাতে মাছ বা ভাত ফেলে উঠে যায়, অপ্রয়োজন ফ্যাশনের জিনিস কিনে উড়িয়ে দেয় টাকা, অন্যায্য বায়না করে বসে, ঠিক তেমনটি তো আর হবে না!

মোহিনী উঠে এল রান্নাঘরের দরজায়, মাসীমা, যাচ্ছি। আঙ্কল তো এখন আউট অফ ডেনজার, তাই না?

কে জানে বাবা! তুমি কিন্তু রোজ এসো।

আমি প্রায় রোজই আসি। তবে টিউটর পড়াতে আসেন তো সন্ধেবেলায়, তাই এ সময়টায় আসা যায় না।

যখন খুশি এসো। আমি তো বাড়িতেই থাকি।

মোহিনী চলে গেল। আচমকা অপর্ণার মনে হল, আচ্ছা, মোহিনীর সঙ্গে অনীশের কোনও গোপন ভাবসাব নেই তো? আঠারো বছরের ছেলে, চৌদ্দ বছরের মেয়ে!

০০৫. দোকানটায় ঢুকতে একটু লজ্জা করছে

দোকানটায় ঢুকতে একটু লজ্জা করছে হেমাঙ্গর। প্রায় রোজই সন্ধের দিকে এসে হানা দিচ্ছে, একটি জিনিসই রোজ  খুঁটিয়ে দেখছে এবং রোজই নানা নতুন প্রশ্ন করছে জিনিসটা সম্বন্ধে—এতে ওরা বিরক্ত হচ্ছে কি?

অবশ্য কোনও দোকানদারই হেমাঙ্গর ওপর বিরক্ত হয় না। যারা মোটামুটি ভাল দোকানদার তারা লোকের মুখ দেখেই অভ্যন্তরকে বুঝে নিতে পারে। এ দোকানটায় দত্ত বলে যে লোকটি আছে তার সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়ে গেছে তারা। ধৈর্যশীল দত্ত রোজ তাকে মাইক্রোওয়েভ সম্পর্কে জ্ঞানদান করে। ছাত্রের মতো শেখে হেমাঙ্গ। আর জিনিসটাকে অত্যন্ত পরীক্ষামূলক চোখে দেখে। পরশু দত্ত একটা লাইভ ডেমনস্ট্রেশন দিয়ে দেখিয়েছে, মাইক্রোওয়েভে বাস্তবিকই ছমিনিটে ভাত রান্না হয়। এবং তার ফ্যান গালাবার দরকার হয় না। চাল আগে থেকে ভিজিয়ে রাখতে হয়। জলটা মেপে দিলে ফ্যান শুষে ভাত ঝরঝরে হয়ে যায়। ঠাণ্ডা। চায়ের কাপটি মাইক্রোওয়েভে রাখলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে চা আগুনগরম হয়ে যায় এবং চায়ের স্বাদগন্ধে কোনও অশুভ বদল ঘটে না। মিয়ানো মুড়ি বা ন্যান্তানো বিস্কুট ফের নতুন মুড়ি আর টাটকা বিস্কুট হয়ে ওঠে। ফ্রিজের ঠাণ্ডা জিনিস। কয়েক সেকেন্ডে হয়ে যায় পাইপিং হট। সবচেয়ে অদ্ভুত হল, মাইক্রোয়েভে জিনিসটাই গরম হয়, কিন্তু পাত্ৰটি নয়। যত দেখছে তত মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে হেমাঙ্গ। যত মুগ্ধ হচ্ছে ততই লজ্জিত হয়ে পড়ছে ভিতরে ভিতরে। এই সব জিনিস—অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি বা ভোগ্যপণ্যের ছলাকলায় সে যে কেন এত সহজে বশ মানে তা সে ভাল বুঝতে পারে না। মদ মেয়েমানুষ মারিজুয়ানা কি এর চেয়ে বেশী বিপজ্জনক?

খুবই কুণ্ঠিতপায়ে, প্রায় নববধূর মতো সে প্রকাণ্ড দোকানঘরটায় ঢুকল। দিব্যি স্প্রিং এর দরজা। ভিতরটা ঠাণ্ডা এবং শব্দহীন। থরে থরে শুধু জিনিস আর জিনিস। যথেষ্ট খন্দেরের ভিড়।

দত্তই তাকে প্রথম দেখল। বোধহয় শিকারীর চোখে অপেক্ষা করছিল তারই জন্য। দত্তর অভিজ্ঞ চোখ হেমাঙ্গর নির্মোক এবং প্রতিরোধ ভেদ করে দেখতে পাচ্ছে, ভিতরে ভিতরে হেমাঙ্গ ক্ৰমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। হার মেনে নিচ্ছে। দুমাস আগে এই দত্তই তাকে ওয়াশিং মেশিনটা গছিয়েছিল, ঠিক একইভাবে। ধীরে ধীরে। অপেক্ষা করে করে। সুতো ছেড়ে ছেড়ে। আপনজনের মতো, বাল্যবন্ধুর মতো ব্যবহার করে করে। আর ওয়াশিং মেশিনটাও নীরবে নিবেদন করেছিল তার হৃদয়, যদিদং হৃদয়ং তব, তদিদং…

আরে, আসুন স্যার। গুড ইভনিং।

ওই দুর্দান্ত স্মার্ট লোকটা আসলে মাকড়সা। তার চারদিকে এই সব অত্যাধুনিক জিনিসপত্রের মায়াজাল পাতা। আর হেমাঙ্গ নিয়তি-নির্দিষ্ট সেই পতঙ্গ। নইলে স্বক্ষেত্রে হেমাঙ্গ কিছু কম স্মার্ট নয়। নিজস্ব ক্ষেত্রে সেও তো লোককে হিপনোটাইজ করে। তবু এইসব ভোগ্যপণ্যের কাছাকাছি এসে যে কেমন যেন এলিয়ে পড়ে। কেমন যেন আনস্যাট, লজ্জাতুর, আত্মবিশ্বাসহীন লাগে নিজেকে।

জিনিস কিনতে সে ভীষণ ভালবাসে। অথচ খামোখা যে এত জিনিস কিনে ঘরে জঞ্জাল বাড়ানো উচিত নয় এটাও সে ভালই জানে। জিনিস কেনা নিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে তাকে যথেষ্ট ভর্ৎসনা সহ্য করতে হচ্ছে। মনের এই দ্বান্দুক প্রতিক্রিয়া-টু বি অর নট টু বি—তাকে কাহিল করে ফেলছে কি? তাই দত্তের মুখোমুখি সে গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে আছে আজও।

দত্ত সামান্য উঁচু গলায় ডাকল, গৌরী, প্লীজ মিস্টার চট্টরাজকে একটু অ্যাটেন্ড করো।

সাইনবোর্ডের মতো মিষ্টি মেকানিক্যাল হাসি মুখে ঝুলিয়ে গৌরী এল, আসুন স্যার। মাইক্রোওয়েভ তো!

ওই আর কি! বলে হেমাঙ্গর মনে হল, কথাটার আদ্যন্ত কোনও মানেই হয় না। সে ভিতরে ভিতরে এত লজ্জিত ও কুণ্ঠিতহয়ে পড়েছে যে, ভেবেচিন্তে সাজিয়ে-গুছিয়ে কিছু বলছে না।

ডিসপ্লে সারকেলে চূড়ান্ত পোজ নিয়ে চারখানা মাইক্রোয়েভ তাকে একযোগে কটাক্ষে বিদ্ধ করল।

গৌরী-নামী মেয়েটি বলল, আপনি কিন্তু স্যার এটাই পছন্দ করে রেখেছেন। দিস ওয়ান ইজ দ্যা বেষ্ট। ফুললি অটোমেটিক, ব্ৰউনিং করা যায়, টাইমার আছে।

এ সবই হেমাঙ্গর মুখস্থ। সে সোফায় বসে গৌরীর মুখের দিকে সম্মোহিতের মতো চেয়ে থেকে অন্যমনস্ক হাতে ব্রিফকেস খুলে চেকবই বের করল।

কত যেন একজক্ট ফিগারটা?

উনিশ হাজার একশো…

সম্পূর্ণ আনমনা হাত চেকের ওপর অংকটা লিখল এবং সই করল, তারপর সেটা ছিঁড়ে মেয়েটার হাতে দিল। সবটাই করল। তার হাত। সে নয় যেন।

থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, আপনার সঙ্গে কি গাড়ি আছে?

আছে।

গাড়িতেই তুলে দেবো তো! নাকি কাল হোম ডেলিভারিতে পাঠিয়ে দেবো?

না না, গাড়িতে তুলে দিন।

ভারী একটা স্বস্তিবোধ করে হেমাঙ্গ। যেন কিছুদিন ধরে একটা টেনশন ও টানাপোড়েন চলছিল মনে মনে। এই ট্র্যানজাকশনটা হয়ে যাওয়ার পর সে হালকাবোধ করছে। ব্রিফকেসটা বন্ধ করল তার দুটি হাত। হাতই, সে নয়।

ভ্রূ কুচকে সে ব্রিফকেসটার দিকে একটু চেয়ে থাকে। সিঙ্গাপুর থেকে কিনেছিল। আসল গুক্কি। এই ব্রিফকেসটাও তাকে ঠিক এরকমই টেনশনে ফেলে দিয়েছিল। কেনার পর শান্তি।

দত্ত এগিয়ে এল।

হয়ে গেল স্যার?

রুমালে ঘর্মাক্ত মুখ মুছে হেমাঙ্গ বলে, শুনেছি মাইক্রোওয়েভে খুব কমপ্লেন হয়। এদের সার্ভিস ভাল তো!

এ গ্রেড। তাছাড়া আমরা তো আছিই। কিছু হলে আমাদের কাছে কমপ্লেন করবেন, উই উইল সি টু ইট।

হেমাঙ্গ জানে, তাই মাইক্রোওয়েভে বিশেষ কমপ্লেন হবে না। প্রথম প্রথম কয়েকদিন শখ করে ব্যবহার করবে বটে, তারপর পড়ে থাকবে। যেমন তার অন্যান্য জিনিস রয়েছে পড়ে। মোটর ড্রিভূন ক্যামেরা, ওয়াশিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, দুটো ফ্রিজ, দুটো টিভি, দুটো ভি সি আর, এগারোটা ব্রিফকেস, আরও কত কী!

বাড়িটা পাওয়া গিয়েছিল খুব বরাতজোরে। তাদের অনেক বাড়ি কলকাতায়। বেশীরভাগ বাড়িতেই বহু পুরনোকালের ভাড়াটেরা পনেরো বিশ ত্রিশ চল্লিশ টাকা ভাড়ায় বসে আছে। কাউকেই নড়ানো সম্ভব নয়।

আচমকা এই একখানা বাড়ি থেকে এক বহু পুরনো ভাড়াটে চলে গেল। হেমাঙ্গ তার বাবাকে গিয়ে বলল, বাড়িটা আমায় দেবেন? আমি থাকব।

তার মানে? আলাদা হতে চাও নাকি?

না। তবে একটু হাত-পা খেলিয়ে থাকব।

কেন এই এত বড় বাড়িটায় তোমার হাত-পা খেলানোর জায়গার অভাব হচ্ছে নাকি?

কথাটা ঠিক। তাদের বিশাল দুই মহলা বাড়িতে জায়গার অভাব নেই। হেমাঙ্গরা ছয় ভাই, চারজনই বিয়ে করেছে। প্ৰত্যেকেরই একাধিক কাচ্চাব্বাচ্চা। তবু জায়গার সমস্যা নেই। সামনের দিকের বাড়িটায় হেমাঙ্গ তিনখানা ঘর নিয়ে যথেষ্ট হাত-পা খেলিয়েই থাকে। তবে অসুবিধে একটাই, বাড়িতে তার অভিভাবকের সংখ্যা বড্ড বেশি। পাঁচ ভাই-ই তার বড়। তাছাড়া বাবা, বাবার ওপরে বিরানব্বই বছর বয়সী দাদু, বিধবা এক পিসি, এক ব্যাচেলর কাকা, মা, এক বিধবা কাকীমা, খুড়তুতো এক দাদা, তার নিজের এক অবিবাহিতা দিদি-সবাই তার অভিভাবক। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন হয়ে ওঠা তার কপালে হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু কথাটা তো বাবাকে বলা যায় না। সে খুবই বিনয়ের সঙ্গে বলল, বাড়িটা ফাঁকা ফেলে রাখা ঠিক হবে না। আজকাল বাড়ি ফাঁকা রাখলে জোর করে লোক ঢুকে পড়ছে।

হেমাঙ্গর বাবা দুর্গানাথ খুবই অবাক হয়ে বললেন, এ খবর আবার কোথায় পেলে? এটা কি মগের মুলুক বলে তোমার ধারণা?

দুৰ্গানাথ যে খুব কড়া ধাতের লোক তা নয়। বরং রঙ্গরসিকতার দিকেই তার পক্ষপাত এবং স্বভাবে খানিকটা শিথিলতাও আছে। আবার অন্যদিকে অতিকায় ক্ষুরধার বুদ্ধি ও প্রবল পরিশ্রমী। তিন পুরুষের একটি ব্যবসাকে প্রায় একা হাতে ধরে রেখেছেন এবং ফলাও করে তুলেছেন। পশ্চিমবঙ্গের কারখানাগুলিতে শ্রমিক-অশান্তির যে প্রাবল্য রয়েছে, ধর্মঘট-ধীরে চলো-লকআউট ইত্যাদি দুৰ্গানাথের প্লাগ তৈরির কারখানায় নেই। কোনও অশান্তি নেই তাদের সার্জিক্যাল গুডসের দুটি এবং ওষুধের একটি দোকানেও। সবই নিখুঁতভাবে চলছে। সামান্য অশান্তি দেখা দিলেই দুর্গানাথ সেটিকে গোড়াতেই মেরে দেন। খুব জোরালো যুক্তি ছাড়া দুৰ্গানাথকে কাজ করা অসম্ভব। হেমাঙ্গ রণে ভঙ্গ দিল। জোরালো যুক্তি তার ছিল না, শুধু একা স্বাধীনভাবে থাকার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিল মাত্র।

গড়চা বাই লেনের বাড়িটার মালিক যে তারাই এটা হেমাঙ্গরা ভুলেই গিয়েছিল একরকম। ভাড়াটে তোলার নিস্ফল চেষ্টা তারা কোনওদিন কোনও বাড়ির জন্যই করেনি। কিন্তু এই বাড়িটার ভাড়াটে মহিমবাবু একদম একা হয়ে গেলেন হঠাৎ। ছেলেমেয়ে দুজনেই অস্ট্রেলিয়ায়, হঠাৎ তার স্ত্রী-বিয়োগ ঘটল। একা বাড়িতে থাকতে পারছিলেন না। তখন ছেলে এসে স্থায়ীভাবে বাবাকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে গেল। তাদের যথেষ্ট টাকা, বাড়িটা নিয়ে তারা কোনও ঘোট পাকাতে চায়নি।

কিন্তু মুশকিল হল, বাড়ি খালি হওয়ার পর নানা লোক আসছে ভাড়া নেওয়ার জন্য। দুর্গানাথ বিরক্ত হচ্ছেন। আসছে দালাল, রাজনীতির লোক, লোকাল মস্তান। একখানা আস্ত দোতলা বাড়ি খালি পড়ে থাকা ও নয়। কলকাতায় যখন এত স্থানাভাব।

দুর্গানাথ একদিন হেমাঙ্গকে ডেকে বললেন, তুমি না। গড়চার বাড়িটায় থাকতে চেয়েছিলে?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

তোমার মতলবখানা কী?

হেমাঙ্গ একটু আশার আলো দেখতে পেয়ে বলল, আজ্ঞে আমার একটু নিরিবিলিতে থাকার শখ।

এ বাড়িতে কি সবাই তোমাকে উত্যক্ত করে?

না, তা কেন? আসলে, এখানে ঠিক প্রাইভেসি নেই তো। লোকজন আসছে যাচ্ছে।

গড়চার বাড়িটা আমার আর ভাড়া দেওয়ার ইচ্ছে নেই। খালিও ফেলে রাখা যাচ্ছে না। তুমি সেখানে গিয়ে থাকতে পার। তবে একটা শর্ত আছে।

শর্ত! শর্ত কিসের?

তুমি এখনও ব্যাচেলর। তোমার পক্ষে একা থাকা বিপজ্জনক। তুমি বরং চট করে বিয়েটা সেরে ফেল, তারপর বউ নিয়ে ও বাড়িতে গিয়ে থাক।

আতঙ্কিত হেমাঙ্গ বলল, আমার ও বাড়িতে যাওয়ার আর কোনও ইচ্ছে নেই। বাবা। আমি এখানেই বেশ আছি।

দুৰ্গানাথ ছেলের অবস্থা দেখে হাসলেন, বিয়ের কথায় ভয় পেয়ে গেলে দেখছি।

আজ্ঞে আমি ওনাদের খুবই ভয় পাই।

শুনেছি। মহিলাদের সম্পর্কে তোমার একটু অ্যালার্জি আছে। নারীর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা এবং তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা খুবই ভাল। কিন্তু আতঙ্ক থাকা ভাল নয়। তোমার এই স্বভাবের জন্য তোমার মা-ও কিছু চিন্তিত। থাকগে, তা হলে বিয়েটা করতে চাইছ না?

আজ্ঞে না।

গড়চার বাড়িটা বেশ বড়ই। ওপর নিচে বোধহয় সাত-আটটা ঘর। এতগুলি ঘর নিয়ে একাই থাকবে?

যে আজ্ঞে!

একা থাকা আমার খুবই প্রিয়।

দুৰ্গানাথ একটু হেসে বললেন, গড়চার গলির মধ্যে বাড়ি বলে তোমার বিবাহিত দাদারা কেউই ও বাড়িতে যেতে চাইছেন না। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব ফ্ল্যাটও ফাঁকা পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে এখন তোমাকেই পাঠাতে হবে দেখছি। তা ওখানেই রান্নাবান্না হবে, নাকি এ বাড়িতে এসে খেয়ে যাবে! সকালের চা ইত্যাদি করে দেওয়ারও তো লোক চাই।

আজ্ঞে লোক রাখলে একা থাকার ব্যাপারটা নষ্ট হয়ে যায়। রান্না আমি নিজেই করে নেবো।

বলো কি? রান্না নিজে করে নোবে!

চেষ্টা করলে পারব।

পুরুষ মানুষ রাঁধে এ তো কস্মিনকালেও শুনিনি।

হেমাঙ্গ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল, বাবা, দুনিয়ার যত বড় বড় হোটেলের ওস্তাদ রাঁধুনীরা সবাই পুরুষ।

দুর্গানাথ একটু হোঁচটি খেয়ে গেলেন এ কথায়। বললেন, তা বটে। খেয়াল ছিল না। মহাভারতের ভীমসেনও মস্ত রাঁধুনী ছিলেন। কিন্তু তুমি কি পারবে? সবাই সব কিছু পারে না। তোমার মা শুনলে তো মূৰ্ছা যাবেন। ভাল করে ভেবে দেখি।

আমি ভাল করে ভেবে দেখেছি। একা থাকব এবং নিজের সব কাজ নিজেই করে নেবো।

ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসনামাজা এসবও করবে নাকি?

ওসবের জন্য একজন ঠিকে লোক রাখলেই হবে।

তার দরকার নেই। বুড়ো দারোয়ান ফটিক আউট হাউসে থাকে। ও সব করে দেবেখন।

হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, ও বাড়িতে দারোয়ানও আছে নাকি?

ছিল না। বাড়ি খালি হয়ে যাওয়ার পর ফটিককে কারখানা থেকে ওখানে বদলি করেছি। পাহারা না রাখলে বিপদ। ফটিক বিশ্বাসী লোক, সে তোমাকে ডিস্টার্ব করবে না। ফটকের পাশে একটা কুঠুরি মতো আছে। একা মানুষ, সেখানেই দিব্যি থাকে। তোমার হঠাৎ একা থাকার বাই যে কেন উঠল কে জানে! শুনেছি তুমি কিছুটা বায়ুগ্ৰস্ত, সত্যি নাকি?

আপনাকে কে বলেছে?

তোমাকে যারা অহৰ্নিশ লক্ষ করে তাদেরই এরকম ধারণা।

হেমাঙ্গ সামান্য অভিমানী গলায় বলল, আমাকে অহৰ্নিশ লক্ষ করাটা কি সকলের উচিত? সেইজন্যই তো আমি একা থাকতে চাই।

তোমাকে লক্ষ করা হয় লক্ষ করার মতো কিছু আচরণের জন্যই। সেইসব আচরণ যদি একা থাকলে বেড়ে যায়?

আমি কি অ্যাবনরমাল বলে আপনার ধারণা?

দুৰ্গানাথ ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলেন, আরে না না। অল্পবিস্তর অ্যাবনরমাল আমরা সকলেই। বাড়াবাড়ি না করলেই হল। আমি তো অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ, তাই সন্তানরা কে কেমন হল তা লক্ষও করি না, মাথাও তেমন ঘামাই না। এ ব্যাপারে যাবতীয় চিন্তা থেকে তোমাদের মা, কাকা আর দাদু আমাকে অনেকদিন আগেই রেহাই দিয়েছেন। তাই তোমরা আমার কাছে কিছুটা অচেনা রয়ে গেছে। সেইজন্যই কথাগুলো বলতে হল। আর একটা কথা, ও বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে তোমার মা আর কাকার মতামত নেওয়াটাও দরকার।

হেমাঙ্গ জানে, সেটাই শক্ত কাজ। খুবই শক্ত।

মা শুনেই বলল, ওসব চিন্তা মাথা থেকে তাড়া। কিছুতেই তোকে আমি একা থাকতে দেব না। পাগল নাকি?

হেমাঙ্গকে আবার পিছোতে হল। হতাশ এবং ব্যৰ্থ। সে প্রাপ্তবয়স্ক, উপার্জনশীল এবং যোগ্যতাসম্পন্ন একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এ বাড়িতে তার প্রতি নাবালকের মতোই আচরণ করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে মা। মায়ের কাছে থেকে সে কখনোই পূৰ্ণবয়স্ক মানুষের মর্যাদা আদায় করতে পারেনি।

মানুষের জীবনে নানা ধরনের দুঃখ থাকে। হেমাঙ্গর জীবনে এইটেইছিল সাংঘাতিক দুঃখ। মাথার ওপর এতগুলো অভিভাবকের ভার সে আর বহন করতে পারছিল না। নিজেকে তার মনে হত ইটচাপা ঘাস। বিবৰ্ণ, খৰ্বটে, ভবিষ্যৎ-হীন।

হঠাৎ হেমাঙ্গর ভাগ্যাকাশে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হল। কিছুদিন বাদে খবর এল গড়চা বাই লেনের বাড়িটার একজন দাবীদার উঠেছে। লোকটা বলছে, তার কােকা মহিমবাবু বাড়িটা আদৌ ছাড়েননি, বরং তাকেই থাকতে দিয়ে গেছেন। বাড়ির তার কাকার ব্যবহৃত জিনিসপত্রও কিছু আছে।

কথাটা মিথ্যে নয়। বাস্তবিকই মহিমবাবুর খাঁটি আলমারি চেয়ার টেবিল ইত্যাদি কিছু জিনিস তাড়াতাড়িতে বিলিব্যবস্থা করা যায়নি বলে ফেলেই গেছেন তিনি। দুর্গানাথকে বলে গেছেন, ওগুলোর একটা গতি যেন তিনিই করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, লোকটি সত্যিই মহিমবাবুর ভাইপো। সে পাড়ার লোক এবং একজন পাকা উঁকিলের সহায়তায় বাড়ি দখলের জন্য নানা হুজ্জত শুরু করে দিল। তালা ভেঙে ঢোকার চেষ্টাও হল একটা। পুলিশ এল, কিন্তু কেমন যেন গা-ছাড়া ভাব তাদের।

দুর্গানাথ বিপদ বুঝে একটা পারিবারিক মিটিং ডেকে বললেন, বাড়ির পজেশন নেওয়াটাই আইনের বড় কথা। অবিলম্বে বাড়িতে লোক ঢোকানো দরকার। হেমাঙ্গ যখন স্বেচ্ছায় ওখানে থাকতে চাইছে তখন ওকেই পাঠানো হোক।

মা অবশ্য বেঁকে বসল, হাঙ্গামার মধ্যে ছেলেকে পাঠানো কেন? ও কি ভেসে এসেছে? যদি ওকে মারে?

বিস্তর বিতর্কের পর শেষ অবধি হেমাঙ্গই জয়টিকা পরল। পরদিন বাক্স-বিছানা নিয়ে গিয়ে সে গড়চা বাই লেনের বাড়ির দখল পত্তন করল। সঙ্গে পাড়ার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। বন্ধুরা অবশ্য সাময়িকভাবে সঙ্গ দিতে গিয়েছিল।

মহিমবাবুর ভাইপো কিছু তিড়িংবিড়িং করেছিল বটে, কিন্তু ডাহা একটা মিথ্যে দাবী নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারল না। দিন সাতেক বাদে সে নিরস্ত হল।

সেই থেকে হেমাঙ্গ এক সুখী ও একা মানুষ। দোতলায় চারখানা যাওয়ার ও একখানা বড় বসবার ঘর নিয়ে বিশাল ফ্ল্যাটে সে থাকে। একতলাটা কিছুদিন ফাঁকা থাকার পর তার সেজদা গৌরাঙ্গ সেখানে একটা সাউন্ড রেকর্ডিং স্টুডিও করে। সেটা চলল না। এরপর টিভি সিরিয়ালের সেট হিসেবে সেটা ভাড়া দেওয়া হয় কিছুদিন। তারপর বিয়েবাড়ি হিসেবে ভাড়া দেওয়া হতে থাকে। অবশেষে ওটা এখন তাদের গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হেমাঙ্গ এখন নিশ্চিন্ত। সে এখন নিরঙ্কুশ একা।

একা বটে, কিন্তু উৎপাতহীন নয়। তার পৈতৃক বড় বাড়িটা বিডন স্ট্রিটে হলেও, তার সেজদি নীলা বন্ডেল রোড এবং পিসতুতো দিদি চারুশীলা গোলপার্কে থাকে। তারা সময় অসময়ে এসে হাজির হয় এবং যথেষ্ট হামলা মাগিয়ে যায়। প্রথম প্রথম বিডন স্ট্রিট থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে মা বা ছোড়দি চলে আসত। আজকাল সেটা বন্ধ হয়ে হয়েছে। কিন্তু এই দুই দিদির খবরদারি বন্ধ হয়নি। হেমাঙ্গর প্রত্যেকটা শ্বাসপ্রশ্বাস অবধি এরা দুজন বিডন স্ট্রিটে ফোন করে জানিয়ে দেয়।

এই যে তার ফিয়াট গাড়ির ডিকিতে মাইক্রোয়েভের বাক্সটি নিয়ে সে বাড়ি ফিরছে এটা দুএকদিনের মধ্যেই রাষ্ট্র হয়ে যাবে। ফি রোববার সে বিডন স্ট্রিটে মাকে দেখতে যায়। আর তখন কৃতকর্মের জন্য তাকে শতেক গঞ্জনা শুনতে হয় নানাজনের কাছে। মাইক্রোওয়েভ তাকে যথেষ্ট বেগ দেবে।

হেমাঙ্গ কি বোঝে না যে এত জিনিসপত্র কোনও কাজের নয়? অবুঝ হেমাঙ্গর ভিতরে একজন যুক্তিবাদী হেমাঙ্গও বাস করে। যুক্তিবাদী হেমাঙ্গ ভালই জানে, এই সব জিনিসপত্র কেনা মানে দুর্লভ অর্থশক্তির অপপ্রয়োগ মাত্র। অবুঝ হেমাঙ্গ বলে, আরে, আয়ু তো দুদিনের। যা ইচ্ছে যায় তা করে নেওয়াই ভাল।

ডিকি থেকে বাক্সটা ওপরে তুলে দিল ফটিক। ফটিক একটি বেশ লোক। হেমাঙ্গর সব কথাতেই সে সায় দেয় এবং যথেষ্ট বাতির করে। ফটিকের বয়স ষাটের ওপর এবং হেমাঙ্গর বয়স ত্রিশের নিচে হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে একটা। বন্ধুত্বের সম্পর্ক আছে।

বাক্স খুলে জিনিসটা বের করে রান্নাঘরের তাকে রেখে প্লাগ লাগিয়ে হেমাঙ্গ বলল, জিনিসটা দেখেছ ফটিকদা?

ফটিক সবিস্ময়ে চেয়ে থেকে বলে, রান্নাঘরে টিভি দিয়ে কি হবে দাদাবাবু?

এটা টিভি নয়। মাইক্রোওয়েভ। এতে রান্নাবান্না হয়। বসে দেখ।

ফটিক উবু হয়ে বসল। তার চোখের সামনে চোখের পলকে ফ্রিজের ঠাণ্ডা খাবার গরম করে ফেলল হেমাঙ্গ। পাঁপর সেঁকল। বিনা জলে আলু সেদ্ধ করল।

দেখলে?

ই রে বাবা! এ তো দেখছি অশৈলী কাণ্ডকারখানা! দোয়া নেই, শব্দ নেই, তা হলে কী হল কাণ্ডখানা।

মাইক্রোওয়েভ হল পৃথিবীর নতুন বিস্ময়। আলট্রা মডার্ন জিনিস।

তাই তো দেখছি।

ফটিকের জিনিস এত কম যে সেটাও হেমাঙ্গর কাছে বিস্ময়। ফটিকের সম্বল মাত্র একটা তোলা উনুন, একখানা কড়াই, একটি হাঁড়ি আর থালা। একটা ঘটি,একটা বালতি, একখানা মগ ও একটা গামছা আছে তার। আছে দুটি লুঙ্গি, দুখানা ধুতি আর দু-তিনটে জামা। আসবাব বলতে একটা ছোট চৌকি। এ সবই খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করেছে হেমাঙ্গ। ফটিকের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে তার। ফটিকের অতি ছোটো ঘরটায় গিয়ে মাঝে মাঝে বসে হেমাঙ্গ। চারদিকে চেয়ে ফটিকের একাবোকা সংসার দেখে। এরকমভাবেও মানুষের তো চলে যায় বেশ!

 ০০৬. নপাড়ার ছেলেরা

নপাড়ার ছেলেরা তাকে পেলে কেন মারবে তা ঠিক ঠিক বলতে পারবে না পটল। বোধহয় সে নিতু, নন্দ আর গৌরাঙ্গর বন্ধু বলে। নপাড়ার তাপসকে ওরা কদমতলায় ইস্কুলে পথে তিনজনে মিলে মেরেছিল। সে দলে পটল ছিল না। কাজটা ভালও করেনি ওরা। মারপিটে নপাড়ার বদনাম আছে। মারপিট হয়ে যাওয়ার পরদিন কলোনিতে হামলা করেছিল অন্তত বিশ জন ছেলে। হাতে রড, লাঠি, ড্যাগার অবধি। বড়রা বেরিয়ে মাঝখানে পড়ে মিটমাট করে নেয়। কলোনির লোকও জানে নপাড়া গুণ্ডার জায়গা। তাই কেউ গা-জোয়ারি দেখায়নি। কিন্তু বাইরে থেকে মিটলেও আসলে ব্যাপারটা। মেটেওনি। নিতু, নন্দ আর গৌরাঙ্গ দুদিন ইস্কুল কামাই দিয়েছে, তারপর গোঁসাইপাড়া ঘুরে অনেক দূর হেঁটে ইস্কুল যাচ্ছে। পটল অত জানত না। মারপিটের পরদিন কদমতলার কাছে কিছু ছেলে তাকে তাড়া করে, বাশ চালিয়ে সাইকেল সমেত তাকে ফেলেও দিচ্ছিল। তার এই পুরনো সাইকেলখানা সেদিন পক্ষিরাজের মতো না উড়লে মার খেয়ে পিসে যেত পটল। আর কিছু না জানুক পটল সাইকেলটা জানে। এ গায়ে সাইকেলের ওস্তাদ হিসেবে তার নাম আছে, লোকে বাহবা দেয়। তাও এই ঝাঁ-কুকুর সাইকের। পেত যদি একখানা এস এল আর বা স্পোর্টস সাইকেল তাহলে আরও কত কী দেখাতে পারে পটল।

নপাড়া যেমন ভয়ের তেমনই আরও কিছু ভয়-ভীতির জায়গা আছে তার। ওই যে পঞ্চাননের ইটভাটি। ও রাস্তাটা তাকে এড়িয়ে চলতে হয়। পঞ্চানন ঘোষের কাছে ইট বাবদ এখনও সাতশো টাকা বাকি। পটলকে দেখলেই ডেকে তার বাপের উদ্দেশে খারাপ খারাপ কথা শোনায়।

এ সব এড়িয়ে, চোখ কান খোলা রেখে চললে এ জায়গা যে কত সুন্দর তা জানে পটল আর গোপাল। গোপাল কখনও মুখ ফুটে বলতে পারবে না, কত সুন্দর এই গ্রামখানা। গোপালের চোখ থেকে সেটা বুঝে নেয় পটল। গোপাল পাখির ডাক শুনতে পায় না, ঝিঁঝির ডাক শুনতে পায় না, সাইকেলের ঘন্টি শুনতে পায় না। তার বোবা আর কালা পাঁচ বছর বয়সী এই ভাইটি তবু অনেক কিছু টের পায়। সবচেয়ে বেশী টের পায় বিপদ। তাদের দুই ভাইয়ের ঘরে আর বাইরে অনেক রকমের বিপদ থাকে বোজ। মায়ের মেজাজ বিগড়োলে, বাবা মাতাল হয়ে ফিরলে, কাকীমার সঙ্গে মায়ের ঝগড়া লাগলে, কাকার সঙ্গে বাবার লেগে গেলে তাদের দুই ভাইয়ের ওপরেও কিছু ঝাল ঝাড়া হয়ে থাকে। ইদানীং বটতলার কয়েকটা লোক বাবার বন্ধু জুটেছে। সেটাও এক বিপদ, কারণ লোকগুলো এলেই তাকে বাবার খোঁজে বেরোতে হয়, নয়তো নিতাইকাকাকে গিয়ে খবর দিতে হয়। নিতাইকাকা হল এ গায়ের গান্ধীবাবা। সকলের ভাল করে বেড়ায়, ঝগড়াকাজিয়া থামায়, সবাইকে ভাল হতে বলে। নিতাইকাকা গাঁটগচ্ছা দিয়ে অন্যের সাহায্য করে, মড়া পোড়াতে যায় আর বক্তৃতাও দেয় মাইকে। তবু নিতাইকাকার মতো লোক থাকতেও বটতলায় বদমাইশি বাড়ছে, মদের টেক হচ্ছে, নপাড়ার ছেলেরা কলোনিতে ঢুকে মারপিট করে যাচ্ছে, চুরি ডাকাতি হচ্ছে, ব্ল্যাক হচ্ছে।

গান্ধীবাবাই কি পেরেছিল? এই যে দেশ ভাগাভাগি হল বলে তাদের যে সোনার দেশ ছেড়ে চলে আসতে হয়েছিল, তখন গান্ধীবাবা কাদেনি? আর সুভাষ বোস? আর শ্যামাপ্রসাদ। আরও কে যেন। সব ঠিকঠাক জানে না পটল। তবে এরকমই সে শুনেছে বটে তার ঠাকুর্দা আর বাবার কাছে।

তবে সাইকেল চালানোর সময় বেশী ভাবতে নেই। ভাবলেই বিপদ। চোখ কান একেবারে সজাগ রাখতে হয় রাস্তার দিকে। এ গায়ের রাস্তাঘাট সব তার চেনা। সবসময় রাস্তা ধরে সাইকেল চালায় না পটল। তাতে অনেক ঘোরা পড়ে যায়, আর তাতে বাহাদুরীও নেই। বটতলার পাণুর দোকান থেকে কেনা বনস্পতির বাটিটা তার বাঁ হাতে ধরা, ডান হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, রডে গোপাল শক্ত হয়ে বসে আছে দুহাতে হ্যাভেল ধরে। এই অবস্থায় সে বটতলার শীতলার থানের। বাঁ দিকের রাস্তা ছেড়ে ঘোষপাড়ার মাঠে নেমে পড়েছে। চষা ক্ষেতের মতো উঁচু-নিচু আর ঢিবিতে ভর্তি মাঠ। বর্ষার জলে হড়হড়ে হয়ে আছে কাদা। চাকা বসে যায়, এক জায়গায় ঘুরতে থাকে। কত কী হয়। পটল বলেই পারে। গোসাইপাড়ায় ঢুকবার মুখে দুধারে দু-দুটো পুকুর, মাঝখানে ক্ষয়া, পিছল, সরু একখানা রাস্তা। খুব ওস্তাদ সাইকেলবাজও এ রাস্তায় চালাবে না। নেমে হেঁটে পার হবে। পটল ঠিক পেরিয়ে যায়।

আজও পেরোচ্ছিল। কাল থেকে বৃষ্টি হয়নি। তবে আকাশ মেঘলা হয়ে থম ধরে আছে। ফ্যাকাসে মেঘ। কতকাল রোদের দেখা নেই। একটা দিন বৃষ্টি হয়নি বলে কাদাটা আঁট হয়ে আছে। আঁট কাদা আরও বিপদের জিনিস।

বা ধারের পুকুর থেকে একটা সাপ উঠে ডানধারের পুকুরে নামতে যাচ্ছে। সেটা দেখতে পেয়েই বোধ হয় গোপাল গলায় একটা ঘোৎ ঘোৎ শব্দ তুলে সাবধান করছে তাকে। গোপাল ওভাবেই জানান দেয় বিপদের কথা, খিদের কথা, আনন্দের কথাও। ওই শব্দটাই তার সম্বল।

সাপকে বাঁচিয়ে চলার কোনও ইচ্ছেই নেই পটলের। সাপগুলো মহা খচ্চর। দু-দুটো পুকুর ভর্তি হাজারো জলচেঁড়া চারাপোনা আর ছোটো মাছ সব খেয়ে ফেলে। গায়ের লোক সাপ মারে না বলে ঝড়েবংশে সাপগুলো বেড়েছে কম নয়। একটা দুটো মরলে কি যায় আসে। তাছাড়া হঠাৎ ব্ৰেক কষলে সাইকেল উস্টে দুজনকে নিয়ে পুকুরে পড়বে। পটল ভ্যাক করে সাপের পেটের ওপর দিয়ে পেরিয়ে গেল। পিছু ফিরে দেখার উপায় নেই, সামনে সরু রাস্তা। এক চিলতে জায়গা দুদুটো চাকাকে সমান রেখে পেরোতে হবে। পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটা।

সমস্ত চৈতন্য আর চোখ আর মন একাগ্র রেখে রাস্তাটা শেষ করে এনেছিল প্রায় পটল। কিন্তু গোপাল তবু অফুট শব্দটা করে যাচ্ছে। ঘোৎ ঘোৎ। অন্য কেউ হলে গোপালের ওই বোবা শব্দকে গ্রাহ্যই করত না। কিন্তু পটল জানে, তার এই অবোধ ভাইটাকে লোকে যা ভাবে তা নয়। সে চোখ রাস্তা তুলে এক ঝলক সামনের দিকটা দেখবার চেষ্টা করল।

দেখল, নীল শার্ট পরা কে একজন দাঁড়িয়ে আছে পথের শেষ দিকটায়। কচুবনের আড়ালে তার নিচের অংশ ঢাকা। তার মুখটা দেখতে পেল না পটল।

কিন্তু শক্ত আর জোরালো ঢিলটা সোজা এসে তার বা চোখের নিচে লাগতেই মাথা অন্ধকার হয়ে গেল তার। সাইকেল টলে গেল।

পুকুরেই পড়ত পটল। সাইকেলের সামনে চাকা ডাইনে বায়ে ভয়ংকর মোড় খেল। কিন্তু মাথার অন্ধকারটা এক আঁকিতে কাটিয়ে নিল পটল। তারপর প্রাণপণে প্যাডেল মারল। দুটো গর্তের মতো উঁচু-নিচু জায়গা ঝাং ঝাং করে পার হয়ে সোজা নীল জামার দিকে সাইকেলখানা বাড়িয়ে দিল সে।

হুড়মুড় করে কচুবনে গিয়ে আটকাল তার সাইকেল। ততক্ষণে নীল জামা পরা হোকরাটি হাওয়া হয়েছে। আর বা চোখের কোলথেকে টপটপ করে রক্ত ঝরে পড়ছে জামায়, বনস্পতির বাটিতে।

সাইকেলটা কাত হয়ে থেমেছে। বাঁ পা বাড়িয়ে পড়ে যাওয়া আটকেছে পটল। ভয় খাওয়া মুখটা তার দিকে ফিরিয়ে চেয়ে আছে গোপাল।

নপাড়ার ছেলেটা একাই ছিল। দল জুটিয়ে আসেনি। ভাগ্যিস। তাই একখানা ঢিলের ওপর দিয়ে গেছে। পটল নেমে গোপালকে নামাল। তারপর সাইকেলখানা শুইয়ে রেখে পুকুরের জলে মুখের রক্ত ধুয়ে নিল। বনস্পতির বাটিটাও চুবিয়ে নিল জলে। বনস্পতি শক্ত জিনিস। জলে ধুলে ক্ষয় হয় না।

গোপাল তার দুটো অবাক চোখে চেয়ে আছে। গোলগাল, ন্যাদাতেদা ভাইটাকে দেখে বড় মায়া হল এখন। ঢিলটা ওরও লাগতে পারত। ভাগ্যিস হোকরার হাতের টিপটা ভাল, তাই গোপালের লাগেনি।

পটলের রাগ হল না। রাগের চেয়ে অনেক বেশী তার ভয়। এতক্ষণে গোপাল আর সাইকেল সমেত তার জলে হাবুড়ুবু খাওয়ার কথা।

সাপটা খুব দাপাচ্ছে এখনও। মরেনি। এক চুলও এগোতে পারেনি। দাপাতে দাপাতে ওখানেই এক সময়ে মরে পড়ে থাকবে। এই পাপেরই কি নগদ সাজা পেয়ে গেল পটল!

সাইকেল দাঁড় করিয়ে গোপালকে ফের রড়ে তুলে দিল পটল। তার ক্ষতস্থান খুব জ্বালা করছে, ফুলে উঠেছে এর মধ্যেই। চারদিকটা খুব ভাল করে দেখে নিল সে। এ দিকটায় পতিত জমি, আগাছা আর জঙ্গল। গোর্সাইপাড়া আর একটু এগিয়ে। পথটা খুব নির্জন।

কালঘড়ি না কি একটা জিনিস দেখেছে দাদু। সে জিনিস দেখলে লোকে নাকি আর বেশিদিন বাঁচে না। তার বাবা রামজীবনের যত দোষ থাক, কিন্তু নিজের মা-বাপকে বড় ভালবাসে। তাই নিয়ে বাড়িতে নানা অশান্তি হয়। কিন্তু মাবাপের ওপর আর কারও কথাকে গ্রাহ্য করে না রামজীবন দাদু মাঝে মধ্যে নানারকম বায়না করছে আজকাল। দিন তিনেক আগে পুলিপিঠে খেতে চাইল। বর্ষাকালে পিঠে করে না কেউ। তবু হল। আজ সকালে ঠাকুমাকে বলল, দুখানা লুচি করে দেবে। ঠাকুমা ধমক দিয়েছিল, কিন্তু বাবা বলল, না না করে দাও। বুড়ো মানুষ, ভাল-মন্দ কিছু তেমন খাওয়াতে পারি না।

দাদু লুচির জন্য দাওয়ায় বসে আছে। আটা মাখা হচ্ছে। দেখে এসেছে পটল। আর দেরি করা ঠিক হবে না।

পটল সাইকেলে উঠে প্যাডেল মারতে লাগল। পিছনের চয় পাম্প কিছু কম বলে মনে হচ্ছে। গনার দোকানে আগে পাম্প করতে পয়সা লাগত না। আজকাল দশ পয়সা করে নিচ্ছে। একটা পাম্পার হলে…।

না, তাদের অত ফালতু পয়সা নেই।

বাড়ির দাওয়ায় যখন সাইকেলখানা ঠেস দিয়ে দাঁড় করাল পটল, তখন ফের রক্ত পড়ছে। তার খয়েরি জামার বা দিকটায় মস্ত দাগ ধরেছে।

দরজার বাইরে থেকেই রান্নাঘরের ভিতরে বাটিটা ঠেলে দিয়ে পটল বলল, মা, এই যে লুচি ভাজার ঘি।

মা পোঁস করে উঠল, লুচি খাওয়ার ইচ্ছে হলে বড়লোক ছেলের বাড়ি গিয়ে থাকলেই তো হয়। তিন দিনেই তো বড় গিন্নির মেজাজ সপ্তমে উঠেছিল। ঘাড় ধাক্কা দিতে পারলে বাঁচে। উঁচু বাড়িতে থাকলেই হল বুঝি! মনটা উঁচু করতে হয় না।

বড় ঘরের কুলুঙ্গিতে হাতকাটা তেল আছে। শিশিটা নামিয়ে কাটা জায়গায় তেলটা লাগাতে গিয়ে পটল টের পেল, ক্ষতটা বেশ গভীর। বাঁ দিকের গোটা মুখখানাই ফুলে বিষিয়ে আছে।

গোপাল তার হাঁটু ধরে দাড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে দেখছে। সব সময়ে তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, সব টের পায়, শুধু কথা কইতে পারে না। শুনতেও পায় না কিছু।

হাঁটু গেড়ে বসে গোপালের করুণ মুখখানার দিকে চেয়ে হেসে পটল বলে, কিছু হয়নি রে। সব ঠিক হয়ে যাবে।

লুচি ভাজার একটা উচাটন গন্ধে চনমন করে উঠল বাতাস। এই কচুঘেঁচুর সংসারে এমন বিদেশী গন্ধ বড় একটা পাওয়া যায় না। নাক উঁচু করে গন্ধটা নিল পটল। গোপাল শব্দ টের পায় না বটে, গন্ধ কিন্তু পায়।

দাদু উদাস মনে দাওয়ায় জলচৌকিতে বসে আছে। লুচি হচ্ছে। কিন্তু লুচির দিকে যেন ততটা মন নেই। সকালে সুচির কথা মনে হয়েছিল, এখন যেন ভুলে গেছে সে কথা। পাকা বাড়ির কংকালটার দিকে চেয়ে আছে।

দাদুর কাছাকাছি গিয়ে দাওয়ায় বসল পটল। কাছ ঘেঁষে গোপাল। লুচির ভাগ তারাও পাবে। সঙ্গে কিছু থাকতে পারে। না থাকলেও কিছু অসুবিধে নেই। শুধু শুধু সুচিও খেতে চমৎকার।

ও দাদু!

কি রে?

সুচির গন্ধ পাচ্ছে।

বিষ্ণুপদ মাথা নাড়ে, পাচ্ছি। হচ্ছে বুঝি?

বাঃ, হবে না! ঘি নিয়ে এলাম বটতলা থেকে।

বেশ বেশ।

তুমি কি এবার মরে যাবে?

আর কি! এবার গেলেই হয়। বাড়িটা হলে বেশ হত।

হবে তো! মিস্তিরি আসবে।

তোকে কে বলল।

শুনেছি।

বিষ্ণুপদ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, পারবে রামজীবন? শেষ অবধি পারবে তো! সাপটা যে ফণা তুলে আছে! কখন ছোবলাবে তার তো ঠিক নেই কিনা।

সাপ! কোন সাপের কথা বলছো?

মরণের কথা রে। যে শালা সারাটা জীবন ফণা তুলে রইল। সাপের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ে আছে আমাদের ওপর। কবে কখন মর্জি হবে, দেবে ছুবলে। তা সেই সাপের ছায়ায় বসে তো, কিছুই নিশ্চয় করে বলা যায় না। মানুষের সব ঠাট-ঠমক তার কাছে বড় জব্দ।

পটল কথাটা ভাল বুঝল না। চুপ করে রইল। সামনেই তাদের পাকা বাড়ি আধখানা উঠে থেমে আছে কবে থেকে। পঞ্চানন ঘোষ আর ইট দেবে কি? সাতশো টাকা এখনও বাকি। তবে কয়েক বস্তা সিমেন্ট এসেছে কয়েকদিন আগে। পটল যতদূর জানে, এ চোরাই সিমেন্ট। বটতলার গিরীনের চায়ের দোকানে কাজ করে পাঁচু। সেই বলেছে, একটা সিমেন্টের ট্রাক সুঠ হয়েছে কদিন আগে। পুলিশ এল বলে।

পুলিশ এখনও আসেনি। আসবে কিনা কে জানে। বাড়িটার ওপর দাদুর খুব টান।

তুমি কী একটা জিনিস যেন দেখেছো দাদু! কালঘড়ি না কী যেন।

কত কী দেখি। মানে বুঝতে পারি না। বুঝলি! তোদের যেমন মানে-বই আছে, শব্দের অর্থ, বাক্যের অর্থ দেওয়া থাকে, ঠিক তেমনি একখানা মানে-বই থাকলে ভাল হত। আজকাল তো কত সরল জিনিসকেও ভারি গোলমেলে লাগে। হ্যাঁ রে, বটতলা থেকে তোর বাবার খোঁজে কারা সব আসে? তারা কি ভাল লোক।

না দাদু। খুব হেক্কোড় মানুষ সব।

কথাটা কী বলি? হেক্কোড় না কি? ওটার মানে কি?

সবাই বলে ওরা সব হেক্কোড়। খারাপ লোক।

কিসের খারাপ করে তারা?

কে জানে! চাউনি দেখলে ভয় ভয় করে।

তা হবে। আগে দুনিয়ায় এত খারাপ লোক ছিল না। এখন খুব হয়েছে, না রে?

পটল মাথা নেড়ে বলে, সবাই ওদের খুব ভয় খায়। খাতির করে চলে।

বিষ্ণুপদ একটা শ্বাস ফেলে বলে, ওই বাস রাস্তাটা না হলেই ভাল ছিল। যতদিন হয়নি ততদিন গণ্ডগোল ছিল না। যখন প্রথম এসেছিলাম দেশ থেকে তখন কেবল চাষাভুষোর রাজত্ব। এক পাল এসে এখানে সেখানে বাঁশ গেড়ে বেড়া তুলে বসে গেলাম। ক্রমে জমিজিরেত একটু হল। কষ্ট ছিল, কিন্তু তেমন ভয়ডর ছিল না।

চোর ছিল না?

খুব ছিল। চোর ডাকাত সব ছিল। তবু ভয় ছিল না। কেন জানিস? এমন মদ আর জুয়ায় ছয়লাপ ছিল না চারদিকে। চোর ডাকাত বাইরে থাকবেই। সে থাকুক। ভয়টা হল, চোর ডাকাত যখন ভিতরে হয়ে ওঠে।

সেটা কেমন?

বললেই কি বুঝতে পারবি? চোর ডাকাতেরা আগে বাইরে থেকে আসত। আজকাল সব গা ঘেঁষেই বসত করে। এমন কি আমাদের মধ্যেই গজিয়ে ওঠে।

মেজো বউ রাঙা লুচির থালা নিয়ে বিরক্ত মুখে দাওয়ায় উঠে এসে বলল, লুচি খাবেন তো! বসুন।

বিষ্ণুপদ একটু অবাক হয়ে বলল, অবেলা হয়ে যাবে না।

খেতে চাইলেন যে!

কটা বাজে জানো?

নটা বাজে বোধ হয়। নিন, গরম আছে।

বিষ্ণুপদ তবু হাত গুটিয়ে থাকে। আমতা আমতা করে বলে, তোমার শাশুড়ি কোথায় গেল?

দোকানে পাঠিয়েছি। ফোড়নের সর্ষে আনতে গেছে। থালাটা ধরুন, আমার মেলা কাজ পড়ে আছে।

ওদের দেবে না?

ওরা সকালে ভাত খেয়েছে।

দুখানা করে দাও। এখান থেকেই দাও। এ তো মেলা লুচি দেখছি, একটা পল্টনের খোরাক।

আপনার ছেলে হুকুম দিয়ে গেছে যেন সাধ মিটিয়ে খাওয়াই। কম করতে ভরসা হয়নি, তাহলে তো এসে কিলোবে। বিষ্ণুপদ লুচির থালাটা ধরে থাকে। রাঙা চলে যাওয়ার পরও ধরে থাকে। খায় না। ইচ্ছেটা মরে গেছে।

ও দাদু, খাও।

কি জানি কেন, খেতে ইচ্ছে যাচ্ছে না। তোর ঠাকুমাকে ডাকবি একটু?

লুচি দেখেই বোধ হয় একটু চঞ্চল হয় গোপাল। ঘন ঘন ঘোৎ ঘোৎ শব্দ করে। ওই শব্দ ছাড়া আর কিছু জানে না। মাতাল রামজীবন মাঝে মাঝে মধ্যরাত্রে ছেলেটাকে ঘুম থেকে তুলে বড় মারে। মারে আর বলে, কথা ক হারামজাদা, কথা বের কর মুখ থেকে। বোবা হয়ে আমাকে জব্দ করবে ভেবেছো শালা? মারের চোটে তোরমুখ দিয়ে কথা বের করে ছাড়বো।

তারপর পেটায় আর পেটায়। কেউ থামাতে পারে না। সারা বাড়িতে হুলুস্থল পড়ে যায়।

আর অত মারের চোটেও কাঁদতে পারে না গোপাল। শুধু গোঁ গোঁ শব্দ করে, আর ফোপায়। আর কাঁপে। থরথর করে কাঁপে।

মাও মারে। যখন তখন মারে। গোপালের কোনও বায়না নেই। তবে খিদে আছে। খিদে পেলে জিনিস ভাঙে। লাফায়। ছোটাছুটি করে বিপদ ডেকে আনে। তখন মারে মা।

গোপালকে বোঝে শুধু পটল। আর কেউ নয়। বড় হলে সে গোপালকে নিয়ে দূরে গিয়ে থাকবে। এ বাড়িতে থাকবে না। এদের সঙ্গে থাকবে না।

দাদু লুচি ভাগ করে দিল দুজনকে। দুটো করে।

দুপুরে রামজীবন ইরফান মিস্ত্রিকে নিয়ে ফিরল। খুব কথা হচ্ছিল দুজনে। ইরফান পাকা ঘরখানা ঘুরে ফিরে দেখছে।

কত দিনে পারবে ইরফান?

বাদলাটা না ছাড়লে তো কঠিন হবে রামজীবন।

তাই যদি হবে তো তোমাকে ডাকলুম কেন? তুমি ওস্তাদ লোক, খাড়া করে দাও।

ভারী জল না হলে হয়ে যাবে। নইলে বালি সিমেন্ট সব ধুয়ে যাবে। পয়সা বরবাদ।

হবে না কিছুতেই?

ইরফান দোনোমোনো করে বলে, ডবল খাটনি না পড়ে যায়। বালি সিমেন্ট সব রেডি আছে?

এনে ফেলব।

ইট ভিজিয়ে রাখবেন। রবিবার এসে হাত লাগাব। একটু কাগজ-কলম দিন। ইট সিমেন্ট আর বালির হিসেবটা লিখে দিয়ে যাই। লোহার শিক, বাঁশ এসবও লাগবে।

সে তো খোকাটিও জানে! লেখো, লিখে দিয়ে যাও।

রামজীবন চান করতে গেল। পটল দুনিয়া ভুলে ইরফানের কাছ ঘেঁষে বসে রইল।

মাটি থেকে ইট। ইট সাজিয়ে বাড়ি। একটা থেকে আর একটা, তা থেকে আর একটা কেমন হয়ে ওঠে। পটলের বড় ভাল লাগে। মাটি থেকে ইট। ইট থেকে বাড়ি।

আবার সেই বাড়িও পুরনো হয়। ভেঙে ভেঙে পড়ে। মাটিতে মেশে। মাটি হয়ে যায়। আবার মাটি থেকে ইট। ফের ইট সাজিয়ে বাড়ি।

০০৭. পৃথিবী কি দাড়ি কামায়

পৃথিবী কি দাড়ি কামায় বাবা?

না না, পৃথিবী মোটেই তার খোঁচা খোঁচা দাড়ি কামাতে চায় না। কিন্তু মানুষ বারবার জোর করে তার খেউরি করে দিচ্ছে। পৃথিবীর দাড়ি হল সবুজ। যদি আকাশের অনেক ওপরে কোনও স্যাটেলাইটে বসে দেখ, তাহলে দেখবে ওই সবুজ কত সুন্দর! গ্লোরিয়াস গ্রিন। আর কোনও গ্রহই এত সুন্দর নয়।

তুমি কি করে দেখতে পাও বাবা?

আমি চোখ বুঝে ভিসুয়ালাইজ করি। আমাদের মোটে দুটো চোখ, তা দিয়ে তো অত দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু কল্পনাশক্তিও আর একরকম চোখ। তা দিয়েও দেখা যায়। কিরকম জানো? কালো মিশমিশে আকাশে সবুজ আর নীলে মেশানো একটা স্নিগ্ধ মুখ। মাথায় বরফের সাদা চুল, গলায় বরফের সাদা একটা বো।

চোখ বুজলে আমিও দেখতে পাবো?

নিশ্চয়ই পাবে। তুমি তো ছোটো, তোমার ইমাজিনেশন আরও ভাল। তুমি সহজেই পারবে।

কিন্তু পৃথিবীর দাড়ি কামানোর কথাটা বললেনা!

পৃথিবীর দাড়ি হল তার গাছপালা, শস্যক্ষেত্র। একমাত্র পৃথিবী ছাড়া দৃশ্যমান কোনও গ্রহে প্রাণের লেশমাত্র নেই। তাই পৃথিবী তুলনাহীন। প্রাণহীন নিথর সৌরমণ্ডলে শুধু এই একটা গ্রহেই গাছ জন্মায়, জীবজন্তু ঘুরে বেড়ায়, মানুষ কথা বলে। কিন্তু এই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীটিই সবচেয়ে বেশী বোকা। সে পৃথিবীর সবুজ দাড়ি কামিয়ে দিতে চাইছে। আর ডেকে আনছে সর্বনাশ। সে ব্রাজিলের রেন ফরেস্ট থেকে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল সব জায়গা থেকেই কেটে নিচ্ছে গাছ। গাছ কেটে বসতি বানাচ্ছে, কলকারখানা সাচ্ছে, কাঠ পুড়িয়ে আগুন জ্বলছে, কাঠ দিয়ে আসবাব আর ঘরবাড়ি বানাচ্ছে। গাছ কাটছে, কিন্তু সেই পরিমাণে গাছ বসাচ্ছে না। এইভাবে চলতে থাকলে একদিন স্যাটেলাইট থেকে দেখা যাবে, কালো আকাশে যে সুন্দর ঢলঢ়লে নীলচে সবুজ হাসি-হাসি মুখখানা ভেসে থাকত সেটা একেবারে পশুটে হয়ে গেছে। বুঝতে পারলে?

কেন এরকম হবে বাবা?

তুমি সব ঠিকঠাক বুঝতে পারবে না। শুধু জেনে রাখো, গাছ কাটা খুব খারাপ। জঙ্গল উড়িয়ে দেওয়া খুব খারাপ। পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখছে গাছপালা। পৃথিবীর গাল থেকে ওই সবুজ দাড়ি কখনও কামিয়ে ফেলা উচিত নয়। যখন বড় হবে তখন তোমার যেন কথাটা মনে থাকে।

কৃষ্ণজীবনের সঙ্গে তার ছোট ছেলে দোলনের খুব ভাব। এতটা ভাব কৃষ্ণজীবনের সঙ্গে আর কারও নয়। দোলনের মধ্যে সে নানা ভাবে নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে। তার মত, তার চিন্তা, তার যত জ্ঞান। বারো বছরের দোলনের অত বুঝবার ক্ষমতাই নেই। তবু সে বাবাকে গ্রহণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করে। দোলন বোধহয় টের পায় সে ছাড়া কৃষ্ণজীবনের আর কোনও বন্ধু নেই।

কথাটা ঠিক। কৃষ্ণজীবনের তেমন কোনও বন্ধু নেই, যাকে সে সব কথা উজাড় করে বলতে পারে। তা বলে কৃষ্ণজীবনের যে অনেক কথা বলার আছে তাও নয়। তার মুখে যেমন কথা খুব কম, তার ভিতরেও তেমনি কথা খুব কম। তার মন ও মস্তিষ্ক দুটোই কিছুটা বোবা।

সাত তলার ওপর একটি সুন্দর ফ্ল্যাটে কৃষ্ণজীবন থাকে। এ তার নিজস্ব ফ্ল্যাট। সে ও তার স্ত্রী রিয়া এই ফ্ল্যাটের যুগ্ম মালিক। অথচ কেন কখনও এই ফ্ল্যাটটা তার নিজস্ব বলে মনে হয় না? কেন নিজস্ব বলে মনে হয় না তার আর দুটি সন্তান ও স্ত্রীকে?

এক অজ পাড়াগাঁয়ের উদ্বাস্তু বসতির ভাঙা ঘর থেকে এতদূর এসেছে সে। কিন্তু নিজের সবটুকুকে আনতে পারা গেছে কি? সবটুকু কৃষ্ণজীবন কি আনতে পারল? না বোধহয়। টেনে হিচড়ে আনতে গিয়ে কৃষ্ণজীবনের খানিকটা পড়ে রইল সেই ভাঙাচোরা মেটে বাড়ির আশেপাশে, খানিক পড়ে রইল পথে-বিপথে, খানিকটা কৃষ্ণজীবন এল। কিন্তু পুরোপুরি হল না এই আসা।

যার নাম কৃষ্ণজীবন, যার বাপের নাম বিষ্ণুপদ, তার বউয়ের নাম কি করে হয় রিয়া? কৃষ্ণজীবন আর রিয়া—এ যেন এক বিষম অসবর্ণ জোড়। না, বর্ণে তাদের অমিল নেই। তারা দুজনেই কায়স্থ। কিন্তু শুধু বর্ণে মিললেই কি হয়! কত যে অমিল! রিয়া তাকে এক সময়ে বলেছিল, আজকাল কত লোক তো এফিডেভিট করে নাম বদলায়। তুমিও বদলে ফেল না।

ভারী আশ্চর্য হয়েছিল কৃষ্ণজীবন। বলেছিল, কেন?

শোনো, রাগ কোরো না। পুরোপুরি বদলাতে বলছি না।শুধু জীবনটা ঘেঁটে দাও। কৃষ্ণ নামটা চলবে।

কৃষ্ণজীবন গম্ভীর হয়ে বলেছিল, এটা যে খুব অপমানজনক রিয়া।

তার মাথা ছিল পরিষ্কার। লেখাপড়ায় ধুরন্ধর। আর চেহারাখানা বেশ লম্বা চওড়া, সুদৰ্শন। এ দুটি জিনিস তাকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। যদিও যে ততদূর বিষয়বুদ্ধির অধিকারী নয় যাতে নিজে থেকেই এ দুটি মূলধনকে কাজে লাগাবে। সে ততদূর খারাপ ও ধান্দাবাজও নয়। কিন্তু চেহারা আর মেধা আপনা থেকেই রচনা করে গেছে তার পরিবর্তনশীল পারিপার্শ্বিককে। উত্তর চব্বিশ পরগণা থেকে কলকাতা। ওই মেধা ও চেহারার মৃগয়ায় একদিন শিকার হয়ে গেল রিয়াও।

কিংবা ঠিক তাও নয়। কে করে শিকার তা কে বলবে?

আজ সাততলার এই ফ্ল্যাটবাড়িতে তার অবিশ্বাস্য অধিষ্ঠান। সে থাকে, রিয়া থাকে, তার দুই ছেলে আর মেয়ে থাকে। থাকে, তবু কিছুতেই থাকাটাকে তার বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। কেবলই মনে হয়, এ সবই স্বপ্ন। একদিন ভেঙে যাবে। হঠাৎ গুম ভেঙে জেগে উঠে দেখবে, সবু ফব্ধিকারি।

এত দুঃসহ ছিল তাদের দারিদ্র্য যে, যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন থেকেই তাকে টিউশনি করতে হত। জনপ্রতি দশটাকা করে রেট ছিল। তিনটে বাড়ি ঘুরে ঘুরে ছোটো ক্লাসের ছেলেদের পড়াত সে। সেই বয়সের তীব্র খিদের কথা কৃষ্ণজীবন কখনও ভুলতে পারে না। কখনও নেমন্তন্ন-বাড়ির ডাক পেলে কী যে আনন্দ হত! ওই খিদেই তাকে জাগিয়ে রাখত রাতে। সে পড়ত। ওই খিদেই শান দিত তার মেধায়। সে বরাবর ফার্স্ট হত। ওই খিদেই তাকে চনমনে, উচাটন রাখত সবসময়। তাই সে সাহস করে পড়তে আসত কলকাতায়। কত দূরে রেল স্টেশন। কতক্ষণ ধরে ট্রেনের ধকল। তারপরও অনেকটা হেঁটে কলেজ। গাড়িভাড়া নেই, টিকিট নেই, বইপত্র নেই, খাতা-কলমেরও অভাব। ট্রেনে টিকিট কাটত না। কতবার ধরা পড়ে নাকাল হয়েছে। তিন চারবার হাজতে নিয়ে গেছে তাকে। সুন্দর চেহারা দেখে এবং অতিশয় দরিদ্র এবং ছাত্র বলে ছেড়ে দিয়েছে শেষ অবধি। মেয়াদ হয়নি।

আজ খিদেটা নেই। আজ তার ভিতরটা মৃত।

তার বাবা এক বোকা মানুষ, তার মা এক বোকা মানুষ। তাদের বোকাসোকা সব ছেলেমেয়ে। তাদের মধ্যে এই একজন হঠাৎ কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠল তা দেখে সবাই ভয় খেল, অবাক হল। কলেজ ইউনিভার্সিটি সে টপকাল হরিণের মতো লঘু পায়ে। কোথাও আটকাল না। বরাবর দারুণ ভাল রেজাল্ট। বড় আশায় বুক বেঁধেছিল বোকা বাবা আর মা। ভাইবোেনরা ঝকমক করত দাদার অহংকারে। ক্লান্ত দিনশেষে যখন গাঁয়ের বাড়িতে ফিরে যেত তখন জোনাকি পোকা, অন্ধকার আর আপনজনেরা ঘিরে ধরত তাকে। সেও কত স্বপ্ন দেখত।

চাকরি বাধাই ছিল তার। পড়াশুনো শেষ করতে না করতেই সে অধ্যাপনায় বহাল হল। প্রথমে কলেজে। রিয়া তার অধ্যাপকজীবনের প্রথম বছরের ছাত্রী। সেও এক অধ্যাপকের মেয়ে। একটু ফাজিল, ফচকে ধরনের মেয়ে। নবাগত অধ্যাপকটির সঙ্গে খুনসুটি করতে গিয়েই বোধহয় বিপদে পড়ল। বিয়ে হতে দেরী হয়নি।

যৌবনের উন্মাদনা ছাড়া আর কি! উন্মাদনা মানেই পাগলামি। হিসেব-নিকেশহীন কিছু ঘটিয়ে ফেলা। সেই উন্মাদনা ছিল না বলেই রিয়ার বাবা তাদের গায়ের বাড়ি ও পরিবারের অবস্থা দেখে এসে বিয়েতে অমত করলেন। রিয়া উল্টে গো ধরল।

বিয়েটা শেষ অবধি হল বটে, কিন্তু বয়ে আনল নানা উপসৰ্গ আর জটিলতা। গায়ের ওই বাড়িতে গিয়েই বিবর্ণ হয়ে গেল রিয়া। এই বাড়ি? এইসব অতি নিম্নমানের মা-বাবা-ভাইবোন? বোকা, আহাম্মক, হিংসুটে, লোভী! প্রত্যেক রাতে প্রেমের বদলে তাদের ঝগড়া হতে লাগল। প্রতি রাতে কাঁদত রিয়া। আর প্রতিদিন সকাল থেকে কৃষ্ণজীবনের ভাইবোনদের সঙ্গে মন কষাকষি শুরু হত রিয়ার। এই সাঙ্ঘাতিক অবস্থায় বড় কাহিল আর অসহায় আর একা হয়ে পড়ছিল কৃষ্ণজীবন।

দুমাসের মধ্যে তাকে চলে আসতে হল কলকাতার ভাড়া বাসায়। বড় কষ্ট হয়েছিল কৃষ্ণজীবনের। কারণ সে ফাটলটা দেখতে পেয়েছিল। সে জানত, নিজের আপনজনদের সঙ্গে এই যে বাঁধন কাটল আর কিছুতেই তা গিঁট বাঁধা যাবে না। গাদাবোটকে টেনে নিয়ে যাবে একটি লঞ্চ—এরকমই আশা ছিল সকলের। কিন্তু লঞ্চ শিকল কেটে তফাত হল। সংসারের গাদাবোট যেখানে ছিল পড়ে রইল। উত্তর চব্বিশ পরগনার ওই অজ পাড়াগাঁয়ে আজও তার স্তিমিত পরিবারটি অভাবে, অশিক্ষার অন্ধকারে পড়ে আছে। অভাবের সংসারে ঝগড়া-কাজিয়া-অশান্তি আর নানা পঙ্কিলতার মধ্যে।

কৃষ্ণজীবন পারত। পারল না।

কে কার শিকার তা বুঝে ওঠা মুশকিল। আজ তো কৃষ্ণজীবনের মনে হয়, এক লোলুপ বাঘের থাবার নিচে লম্বমান পড়ে আছে তার মৃতদেহ। ধীরে ধীরে বাঘটা তাকে খেয়ে ফেলছে। তার কিছু করার নেই।

না, রিয়াকে সেই বাঘ ভাবে না কৃষ্ণজীবন। গোটা পরিস্থিতিটাই সেই বাঘ। রিয়া তার একটি থাবা মাত্র।

মাইনে কম ছিল তখন। তবু কষ্টেসৃষ্টে টাকা পাঠাত কৃষ্ণজীবন। প্রতি শনিবারে রবিবারে যেত গায়ের বাড়িতে। আর তখন তাকে চোখা চোখা কথা শোনাতো ভাইবোনেরা। বিশেষ করে বোনেরা। বউয়ের চাকর, ব্যক্তিত্বহীন ভেড়া, স্ত্রৈণ। এতকাল কৃষ্ণজীবনের মুখের ওপর কথা বলার সাহসই কারও ছিল না। এই গরিব, গৌরবহীন পরিবারে কৃষ্ণজীবন ছিল প্রায় গৃহদেবতার মতো সম্মানের আসনে। সবাই তাকে তোয়াজ করত, ভয় পেত। কিন্তু বিয়ের পর সব ভাঙচুর হয়ে গেল। একদিন তার বোন বীণাপাণি বলেছিল, তুই তো লেখাপড়া শিখে ভদ্ৰলোক হয়ে গেছি, আমরা সেই ছোটলোকই আছি, আমাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখার দরকার কি তোর?

সবচেয়ে বেশী লেগেছিল ভাই রামজীবনের সঙ্গে। আগে কুব বশংবদ ছিল রামজীবন। কি কারণে কে জানে, সেই রামজীবনই তার ওপর ক্ষেপে গেল সবচেয়ে বেশী। এক শনিবার বিকেলে সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিজের পরিবারের জন্য নিয়ে গিয়ে গায়ের বাড়িতে হাজির হয়েছিল সে। তার পদার্পণমাত্র বাড়ির আবহাওয়া থমথমে করে উঠল। ভিতরে ভিতরে একটা আক্ৰোশ পাকিয়ে ছিল আগে থেকেই। সন্ধের পর রামজীবন মদ খেয়ে ফিরল। মাতাল নয়, তবে বেশ টং। ফিরেই তাকে দেখে বাবার উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে উঠল, এই ততা আপনার লেখাপড়া জানা ছেলে এসে গেছে। শালা মেলা লেখাপড়া করেছে। মেলা বই পড়েছে। মেলা ভাল ভাল কথা জানে। কিন্তু শালা নিজের পরিবার, নিজের ভাইবোনের জন্য এক ফেঁটা বিদ্যে খরচ করেনি। করেছে বাবা? আপনিই বলুন, আমাদের কোনওদিন ডেকে বলেছে, আয় তোকে এটা বুঝিয়ে দিই বা সেটা শিখিয়ে দিই? কোনওদিন জিজ্ঞেস করেছে যে, আমরা কে কোন ক্লাসে পড়ি? আপনার বিদ্যাধর ছেলে শুধু নিজেরটা গুছিয়ে নিয়েছে। আর আমরা শালাকে তেল দিয়ে গেছি। বলুন সত্যি কিনা! আপনার গুণধর ছেলে এখন কলেজে পড়ায়, ছেলেদের ভাল ভাল জ্ঞানের কথা শেখায়। কী শেখাবে ও বলুন তো! ওর চরিত্র আছে, না মায়াদয়া আছে? ও জানে, মা-বাবা ভাই-বোনকে কেমন করে শ্রদ্ধাভক্তি করতে হয়, ভালবাসতে হয়? লেখাপড়া জানা বউকে দিয়ে আমাদের কম অপমান করে গেল? সব শেখানো ছিল আগে থেকে।

রামজীবন যে মদ খায় তা জানত না কৃষ্ণজীবন। হয়তো আগে যেত না। সম্প্রতি ধরেছে। মদ পয়সার জিনিস। এ বাড়িতে চাল কেনার পয়সা জোটে না তো মদ কেনার পয়সা আসবে কোথেকে? কৃষ্ণজীবন জীবনে খুবই কম আত্মবিস্তৃত হয়েছে। সেদিন হল। ওই মাতাল অবস্থায় রামজীবনের চেঁচামেচি তার সহ্য হয়নি। তার ওপর রামজীবন তাকে গুয়োরের বাচ্চা ও বেজন্ম বলে গাল দিয়েছিল। মায়ের পেটের ভাই হয়েও দিয়েছিল। সে উঠে তেড়ে গিয়েছিল রামজীবনের দিকে, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা!

রামজীবন একা নয়, সঙ্গে সঙ্গে তার সব ভাইবোন যেন এককাট্টা হয়ে উষ্টে তেড়ে এল তার দিকে বিস্তর চেঁচামেচি হয়েছিল। তার মধ্যে রামজীবনের একটা কথা খুব কানে বাজে আজও, তোর টাকায় আমরা পেচ্ছাপ করি। তোর লেখাপড়া জানার মুখে পেচ্ছাপ করি।

রামজীবনকে খুন করতে পারলে সেদিন তার জ্বালা জুড়োতো। কিন্তু আজ আর সেই রাগটা তার নেই। কৃষ্ণজীবন আজ বুঝতে পারে তাকে বড় বেশী ভালবাসত তার পরিবার, অনেক নির্ভর করত তার ওপর, তাকে ঘিরেই ছিল ওদের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে চুরমার করে দিয়েছে তো সে নিজেই।

সেই রাতেই ফিরে এল কৃষ্ণজীবন। সে কি মারতে গিয়েছিল রামজীবনকে? সে কি আত্মবিস্তৃত হয়েছিল। তার সঙ্গে কি ওদের আর সম্পর্ক থাকবে না? কী হল! সে কিছুতেই এইসব ঘটনার জট খুলতে পারল না। শুধু টের পেল, তাকে ঘিরে একটা অদৃশ্য পোকা একটা গুটি বুনে যাচ্ছে। তাকে বন্ধ করে দিতে চাইছে নিজস্ব খোলর মধ্যে।

কলকাতার বাসাই বা কোন কোল পেতে বসে ছিল তার জন্য? অভাবী সংসার থেকে মেধা দিয়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল সে, কিন্তু গা থেকে গায়ের গন্ধ মোছেনি, মুছে যায়নি তার নিম্নবিত্ত, প্ৰায় অশিক্ষিত পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড। সে নিজেও টের পায়, পুরোপুরি ভদ্ৰলোক নয়, খানিকটা গেঁয়ো, খানিকটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন। রিয়া ঝকঝকে আধুনিক, ছলেবলে, আর্ট। অসবর্ণের সেই শুরু।

তার বাবা বিষ্ণুপদর স্বভাব হল, সংসারের কোনও ব্যাপারেই জোরালো মতামত নেই। বিষ্ণুপদ ছেলেপুলেদের শাসন-টাসন করত না। তার চোখের সামনে কোনও অন্যায় অবিচার দেখলেও বিষ্ণুপদ রা কাড়ত না। ওটাও একরকম মূক বধিরতা। বাবার কাছ থেকে ওই স্বভাবটি পেয়েছিল কৃষ্ণজীবনও। ভিতরটা যতই টগবগ করুক বাইরেটা শান্ত। সে কখনোই চেষ্টা করেনি রিয়াকে কিছু বোঝাতে বা শাসন করতে। চেষ্টা করলেও হয়তো পারত না। রিয়া বড্ড বেশী প্রখর, বড় বেশী মুখর।

কৃষ্ণজীবনের ওই আংশিক মূক-বধিরতা তার আর রিয়ার মধ্যে কোনও সেতুবন্ধন রচনা করতে দেয়নি। এক ঘরে থেকেও তারা পরস্পরের অচেনা থেকে গেছে। আর রিয়া তার ওপর ক্ষেপে উঠত সেইজন্যই। রাগ বাধা না পেলে অনেক সময়ে স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় উল্টোটাও হতে পারে। মানুষের চরিত্র ততা নানা বৈচিত্র্যে ভরা। রিয়া হয়তো চাইত, কৃষ্ণজীবন তার প্রতিবাদ করুক। তাতে বোধহয় রিয়ার ধার বাড়ত। যত সে চুপ করে থেকেছে ততই রাগ বেড়েছে। রিয়ার। বাড়তে বাড়তে আজ কৃষ্ণজীবনকে প্রায় পাপোশ বানিয়ে ছেড়েছে রিয়া।

রাগের কারণ অনেক। প্রথম কারণ, কৃষ্ণজীবনের নিম্নবিত্ত, নিম্নরুচি ও নিচু কালচারের পরিবার। অর্থাৎ কৃষ্ণজীবনের স্নান পটভূমি। আর দ্বিতীয় কারণ, কৃষ্ণজীবনের নিরীহ অনুত্তেজক ব্যক্তিত্ব। বা ব্যক্তিত্বের অভাব। তৃতীয়, চতুৰ্থ, পঞ্চম আরও নানা দাম্পত্য কারণ তো আছেই। সব সময়ে যথেষ্ট কারণেরও দরকার হয় না।

রাগ! রাগই রিয়াকে চালায়। রাগই তার চালিকাশক্তি। তার রাগের চোটে ঝি থাকে না। বাড়িওলার সঙ্গে খিটিমিটি বাধে, ছেলেমেয়েরা জড়োসড়ো হয়ে থাকে। তাদের সংসারে আনন্দের লেশমাত্র নেই।

তাকে উসকে তোলার জন্য, দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ করার জন্যই কি বিয়ের দুবছরের মধ্যেই একদিন, বাচ্চার জন্য কৌটোর দুধ আনতে ভুলে গিয়েছিল বলে, রাত বারোটা নাগাদ কৃষ্ণজীবনের হাতের বোটানির ভারী বইটা কেড়ে নিয়ে সেটা দিয়েই তার মাথায় মেরেছিল রিয়া? সরাসরি হাত তোলেনি, শুধু বইটা দিয়ে মেরেছিল।

ভারী বই। খুব সজোরে এসে মাথায় লাগতেই ঢলে পড়ে গিয়েছিল সে। মাথা অন্ধকার। আঘাতটা বড় কথা নয়। মানুষ মাঝে মাঝে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। সে ওভাবে পড়ে যাওয়ায়, নিজের কৃতকর্মে অনুশোচনায় পাগলের মতো আচরণ করতে শুরু করেছিল রিয়া। কৃষ্ণজীবন মাথার সাময়িক অন্ধকার কাটিয়ে উঠে রিয়াকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। কান্না থামিয়েছিল। বলেছিল, কিছু নি। আমার একটুও লাগেনি।

আমি যে তোমাকে মারলাম? এ কী করলাম আমি?

মার! একে কি মারা বলে? তুমি বইটা রাগ করে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েছিলে। আমিই তে এগিয়ে যেতে গিয়েঠিক গুছিয়ে মিথ্যেটা সাজাতে পারল না কৃষ্ণজীবন। সেই দক্ষতা তার নেই। তবে কাজ হল। রিয়া শান্ত হল।

কিন্তু অনেকক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুমি খুব অদ্ভুত।

এ কথাটা কৃষ্ণজীবনের বিশ্বাস হয়। সে কিছু অদ্ভুত। রিয়া মিথ্যে বলেনি।

তার নিজের চারদিকে একটা গুটিপোকার খোলস আছে। প্রকৃত কৃষ্ণজীবন বাস করে সেই খোলর মধ্যে। সেখানে শক্ত হয়ে থাকে সে। বাইরের কারও সঙ্গেই তার সম্পর্ক রচিত হতে চায় না সহজে।

সম্পর্ক রচনা হল না তার বড় দুই সন্তানের সঙ্গেও। ব্যস্ততা বা সময়ের অভাব নয়, আগ্রহের অভাব নয়। অভাব পড়ল বাক্যের। অভাব পড়ল ভাব প্রকাশের। যখন ছোটো শিশু ছিল তখন একরকম। যখন বড় হল, বুঝতে শিখল, মতামত হতে লাগল, তখন অন্যরকম।

আজ সাতলার ফ্ল্যাটে তার সংসার। রিয়া আর সে দুজনেই অধ্যাপনা করে। মিলিত রোজগার আর ধার মিলিয়ে। কষ্ট করে কেনা। ধার এখনও অনেক শোধ হওয়ার বাকি। কিন্তু কোনওদিন এই ফ্ল্যাটটার সঙ্গেও কেন একটা আপন-আপ ভাব রচনা করা হল না কৃষ্ণজীবনের পক্ষে? কেন কেলই মনে হয় এ পরের বাড়ি?

এইসব কারণেই কৃষ্ণজীবনের কেবল মনে হয়, তার সবটুকুকে সে জড়ো করতে পারেনি আজও। এখানে ওখানে তার টুকরো টাকরা পড়ে আছে আজও। অনেকটাই পড়ে আছে ওই অজ পাড়াগাঁয়ে। মেটে ঘর, দারিদ্র্যের ক্লিষ্ট ছাপ চারদিকে, প্রতি পদক্ষেপে এক পয়সা দুপয়সার হিসেব রাখতে হয় মাথায়। নুন আনতে সত্যিই পান্তা ফুরোয়। তবু সেইখানে তার অনেকটা পড়ে আছে।

কৃষ্ণজীবন একবার একটা পেপার পড়তে আমেরিকা গিয়েছিল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। রিয়ার ইচ্ছেতেই বিশেষ করে। স্বামী একবার বিদেশ ঘুরে এলে তার মুখ কিছু উজ্জ্বল হয়। ফলে একটা আলগা আমন্ত্রণপত্র যা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামেশাই আসে, ব্যক্তিবিশেষকে নয়, সেই নৈর্ব্যক্তিক একটি আমন্ত্রণলিপিকে অবলম্বন করে, বিস্তর চিঠি চালাচালির পর সে রাহাখরচ ও অন্যান্য ক্ষতি স্বীকার করে গিয়েছিল। সেখানে সেই ঝা-চকচকে, উন্নত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সভ্যতার দেশে পা দিয়েও তার মনে হয়েছিল উত্তর চব্বিশ পরগনার সেই অজ পাড়াগাঁ তার সঙ্গেই এসেছে। ধুলোটে পা, চোখে অসহায় আত্মবিশ্বাসহীন দৃষ্টি, ভিতরে কেবলই বিস্ময়ের পর বিস্ময়।

খুবই বিস্ময়ের কথা, পৃথিবীর বাতাবরণের ওপর তার বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধটি সেখানে বিস্তর কদর পেল। শুধু হাততালি দিয়ে কদর জানানো নয়। সাহেবরা যার মূল্য বুঝতে পারে সেটাকে বাস্তবসম্মত ভাবেই কদর দেয়। একটা ফাউন্ডেশন তার যাবতীয় রাহাখরচ আর হোটেলের ব্যয় মিটিয়ে দিল। সঙ্গে দিল কিছু দক্ষিণাও। এক আশাতীত পুরস্কার। আজকাল মাঝে মাঝে তাকে আমেরিকা যেতে হয়। নিজের উদ্যোগে আর নয়, পুরোপুরি আমন্ত্রণ পেয়েই সে যায়। সারা পৃথিবী জুড়ে একটা দুশ্চিন্তা আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে ক্রমে। ওজোন হোল, গ্লোব ওয়ার্মিং, সমুদ্রের জলস্তরে স্ফীতি। দ্বীপ রাষ্ট্রগুলি ইতিমধ্যেই চারদিকে করুণ আবেদন জানাতে শুরু করেছে—কিছু একটা করো, নইলে অচিরে আমাদের প্রিয় ভূখণ্ড তলিয়ে যাবে সমুদ্রে।

খুবই বিস্ময়ের কথা, এই পৃথিবীকে প্রগাঢ় ভালবাসে কৃষ্ণজীবন। অন্য কারও সঙ্গে তার তেমন সম্পর্ক রচিত হয় না বটে। কিন্তু এই অদ্ভুত প্রাণময় গ্রহটির প্রতি হয়।

দোলন তার সরু গলায় খুব সাবধানে ডাকল, বাবা।

উঁ! গভীর আনমনা কৃষ্ণজীবন জবাব দিল।

কী ভাবছো বাবা?

কৃষ্ণজীবন মাথাটা সামান্য নত করে বলে, আমরা যখন ছোটো ছিলাম তখন আমাদের গায়ে অনেক গাছপালা ছিল।

তুমি কেন শুধু গাছপালার কথা ভাবছো বাবা?

কেন ভাবছি! তোমাকে যে এই পৃথিবীতে রেখে যেতে হবে আমাকে। মানুষ যে কেন তার সন্তানের কথা ভাবে না।

আমি গাছ কাটব না বাবা। আমি কখনও পৃথিবীর দাড়ি কামিয়ে দেবো না।

০০৮. মেঘলা দিনের কালো আলো

মেঘলা দিনের কালো আলোয় ঘরের মধ্যে দুটি ছাইরঙা মানুষ দুজনের দিকে চেয়ে আছে। বাইরে সরু সরু অজস্র সাদা সুতোর মতো ঝুলে আছে বৃষ্টি। টিনের চালে ঝিমঝিম নেশাড় শব্দ। কথা নেই। বীণাপাণি আর নিমাই।

সেদিন অনেকক্ষণ পগার আচমকা মৃত্যুসংবাদটা ভাল করে বসছিল না বীণাপাণির মাথায়। কাঁদবে, না হোঃ হোঃ করে লটারি জেতার মতো আনন্দে হেসে উঠবে, সেটা তার ভিতরে তখনও স্থির হয়নি। আর ওই উজবুক লোকটা, পাঁচ ফুটিয়া, রোগাভোগা, ভীতু আর ধার্মিক লোকটা, চোখ তুলে ভাল করে বীণার দিকে যে তাকাতেই পারল না আজ অবধি, সেই লোকটা কেমন যেন চোখা চোখে চেয়ে ছিল তার চোখে। লোকটার সামনে গোছানো সুটকেস। একটু বাদেই চৌকাঠ পার হবে। তারপর হয়তো আর কোনওদিনই উল্টোবাগে চৌকাঠ পেরিয়ে এসে ঢুকবে না বীণাপাণির ঘরে।

বীণাপাণি এরকম অদ্ভুত অবস্থায় আর জীবনে পড়েনি। শোক, আনন্দ, উত্তেজনা, রাগ, ঘেন্না সব একসঙ্গে উথলে উঠছে ভিতরে। ঠিক এই সময়ে যদি চৌকির তলা থেকে তার পোষা বেড়াল কুঁচকি বেরিয়ে এসে তার কোলে না উঠে পড়ত, তাহলে কী যে করত বীণাপাণি কে জানে? কুঁচকিই সব কাটিয়ে দিল একটা আদুরে মিয়াও শব্দ তুলে। তার খিদে পেয়েছে।

বীণাপাণি বেড়ালটাকে বুকে চেপে ধরল। তার বুদ্ধি এখন স্থির নেই। মাথার ভিতরটা পাগল-পাগল। বুকটায় বড় দাপাদাপি। কী বলতে কী বলবে, কী করতে কী করে বসবে, কে জানে বাবা! আর ওই আহাম্মক লোটা তাকে কেন যে ওরকম করে দেখতে লেগেছে! বীণাপাণির কি একটু কাঁদা উচিত? বাড়াবাড়ি হবে না তো!

কদল না, তবে কাঁদার মতো একটা অবস্থায় সে থেমে রইল। চোখ ভরে উঠল জলে, কিন্তু গড়িয়ে পড়ল না। স্থির হয়ে জানালা দিয়ে বাইরের অজস্র সুতোর বুনটের মতো একঘেয়ে বৃষ্টির দিকে চেয়ে রইল।

নিমাই এ সময়ে একটা গলা খাকারি দিল। তারপর তার সরু নরম মেয়েলি গলায় জিজ্ঞেস করল, ছেলেটা কি পগার খবর দিয়ে গেল?

বীণা জবাব দিল না।

নিমাই জবাবের জন্য অপেক্ষা করল একটু। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, এরকম সব কাণ্ড হয় বলেই তোমায় বারণ করেছিলাম।

বীণা চুপ করে যেমন চেয়েছিল তেমনি চেয়ে রইল। বাইরে চুপ বটে, কিন্তু তার ভিতরে এ সময়ে একটা কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। ঠিক এরকম একটা গোলমেলে ব্যাপারের মধ্যে নিমাই চলে গেলে তার কি হবে? ওকে চলে যেতে দেওয়া কি ঠিক হবে? রাগের মাথায়, কেঁকের মাথায় যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। কিন্তু এখন তো সেই অবস্থাটা নেই। তাকে বুদ্ধি দেবে কে? বুদ্ধি চাইলে অনেকেই মাথা ধার দিতে আসবে, কিন্তু বীণাপাণির ভাল-মন্দ বুঝে কথা কইবে কি কেউ? তার বন্ধু অনেক, কিন্তু আত্মীয় তো এই একজনই। মাদামারা, পান্তাভাত, সব ঠিক। তবু নিমাই তো লোভী নয়, পাজি নয়, ধান্দাবাজ নয়। বকাঝকা-অত্যাচার ওর ওপর কম করে না বীণা! তবু নির্ভর করে। ওকে চলে যেতে দেওয়া কি উচিত কাজ হবে! আটকানোই বা যায় কি করে?

নিমাই উঠবার মতো একটু ভাব করে ফের বসে পড়ল উবু হয়ে, তারপর খুব সংকোচের সঙ্গে বলল, একটা কথা জিজ্ঞেস করি। এ কথাটার জবাব অন্তত মাথা নেড়ে হলেও দাও। পা কি কাল রাতে টাকা পয়সা কিছু তোমার কাছে

গচ্ছিত রেখে গেছে?

এই প্রশ্নটাকেই ভয় পাচ্ছিল বীণা। পগা এসেছিল সন্ধের মুখে। খুব তাড়া ছিল। বৃষ্টি হচ্ছিল তুমুল। নিমাই কোথায় বেরিয়েছে। খুব হাওয়া। হ্যারিকেনের আলোয় একখানা একসারসাইজ খাতা খুলে পরশমণি নামে একটা নতুন নাটকের পার্ট মুখস্থ করছিল বীণাপাণি। দরজায় ধাক্কা আর ডাকাডাকিতে উঠে দরজা খুলে দেখল, বর্ষাতি গায়ে পগা। জলে সপসপ করছে। মুখে একগাল হাসি। ফোম লেদারের ব্যাগ থেকে পলিথিনে মোড়া একটা প্যাকেট বের করে বীণার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, কাল সকালে নিয়ে যাবো।

বেশ ভারী প্যাকেট। এরা যে তাকে বিশ্বাস করে, ভালবেসে এসব রেখে যায় তা নয়। এরা জানে এদের টাকা পয়সা মেরে দিয়ে বীণাপাণি পার পাবে না। সীমান্ত জুড়ে এদের জাল বিছিয়ে রাখা আছে। সেই জাল কেটে বীণাপাণি কত দূর যারে? যতদিন মাথা নিচু করে চলবে ততদিন ঠিক আছে। গড়বড় করলে রেহাই নেই।

বীণা বাধ্য মেয়ের মতো প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বলল, ঠিক আছে।

পগা আবার অন্ধকারে বাতাস-বৃষ্টির মধ্যে মিলিয়ে গেল। দরজা এঁটে বীণাপাণি প্যাকেটটা তেরঙ্গে রেখে তালা দিয়েছিল। এ সব প্যাকেটে কী থাকে তা তার জানতে নেই। জানতে চায়ও না সে। শুধু হেরোইন-টেরোইন না থাকলেই হল। পগা অবশ্য ও কারবার করে না। সে ডলার পাউন্ড আর টাকার লেনদেন করে।

কেউ দেখেনি। কেউ জানে না।

বীণাপাণির অভিনয়ের প্রতিভা এখন কাজে লাগল। সে অকপটে নিমাইয়ের দিকে চেয়ে কঠিন দৃঢ় গলায় বলে না। পগা রোজ আমার কাছে টাকা-পয়সা রেখে যায় না।

পার্টটা চমৎকার হল।

নিমাই চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, তাহলেই রক্ষে। নইলে বিপদ ছিল।

কিসের বিপদ?

নিমাই মাথাটা একটু নেড়ে বলে, তা কি জানি? বিপদ ওদের সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে।

বিপদ থাকলে আমার ছিল, তোমার তো আর নয়। তুমি তো বাক্সপ্যাটরা নিয়ে চৌকাঠ ডিঙিয়ে পগারপার হবে। আমি পড়ে থাকব, একা মেয়েমানুষ।

নিমাই কি একটু তটস্থ হল? নড়েচড়ে বসল। তারপর স্তিমিত গলায় বলল, বিপদ তো তোমারও ছিল না। মেশামেশিটা বড় করে ফেললে যে ওদের সঙ্গে। ভদ্রলোকের বউ-ঝিরা কি ওরকম করে?

বীণাপাণি নিজেকে সামলাতে পারল না। থমকানো চোখের জলটা এবার নেমে পড়ল গাল বেয়ে। টপটপ করে নামতে লাগল। গালে ছাকা দিয়ে নামতে লাগল। বীণাপাণি একটু ফুঁপিয়ে উঠে বলল, আগে বলো, আমরা কবে ভদ্রলোক ছিলাম। কবে দ্রলোকের মতো ছিলাম? কেউ মানে আমাকে দ্রলোকের মেয়ে বলে? বলো, মানে কেউ? গোনে কেউ? সেই চোখে দেখে কেউ?

নিমাই কথাটা স্বীকার করল না। ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল, ওটা কথাই নয়। কথা হল তুমি মানো কিনা। তোমার বাবা মাস্টারমশাই ছিলেন। তোমার দাদা অত বড় বিদ্বান লোক।

বীণাপাণি কান্নার মধ্যেও ছিছিক্কার করে উঠল, তাই বুঝি আজ এই দশা আমার! বনগাঁয়ে যাত্ৰাদলে সঙ সাজতে হচ্ছে। রাস্তায় মুখখামুখি দেখা হলে আমার মায়ের পেটের দাদা আমাকে চিনতে চাইবে? আর বাবা! এ যাবৎ খোঁজ করেছে একবারও, মেয়েটা বেঁচে আছে না মরেছে?

আজ মাথাটা বড় গরম তোমার।

লোকে যখন আমাকে ভাল ভাল কথা বলে তখন আমার মুখে থুথু আসে, বুঝেছো? আর তুমি! তুমিই বা কোন দ্রলোটা শুনি! দাদার কথা বলছে, অমন মানুষের বোনকে বিয়ে করার সুবোদ কি তোমার ছিল? বাবা আহাম্মক বলেই না দিল বুলিয়ে!

নিমাই মাথা নিচু করেই বসে রইল। বড় অপরাধী ভাব।

আর বীণা জ্বলতে জ্বলতে ভিজতে লাগল চোখের জলে। বুঁচকি খিদে চেপে চুপ করে বসে রইল তার কোলে।

নিমাই অনেকক্ষণ বাদে গলা খাকারি দিয়ে বলল, একটা কথাই কই। কথাটা বাড়িয়ে বলছি না। বিয়ের কথাটা যখন উঠল তখন তোমার বাবাকে আমি কিন্তু বলেছিলাম, কাজটা আপনি ঠিক করছেন না মশাই। জাতে-কাটে এক হলেও, আমরা ঠিক সমান সমান নই। তা উনিও একটু বোকাসোকা মানুষ, লোক চিনতে পারেন না। বললেন, তোমার একদিন খুব উন্নতি হবে। এ আমি দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছি।

বীণাপাণি নাটক করে বলেই নিজের ওপর রাশ টেনে রাখতে পারে। দমকা কান্নাটা সামলে চুপ করে বসে রইল।

নিমাই খুব ভীতুভাবে আরও একবার গলা খাকারি দিয়ে বলে, কাজটা ঠিক হয়নি, জানি। আমি বড় নিচুতলার মানুষ। বড় পতিত। পড়েও ছিলুম কোন আঘাটায়। তোমার বাবাই কুড়িয়ে নিলেন। তা বলে সেই বুড়ো মানুষটার ওপর রেগে গিয়েও লাভ নেই। উনিও তাঁর কর্মের ফল ভোগ করছেন।

বীণাপাণি নিমাইয়ের দিকে অসুরবধের সময় মা দুৰ্গার মতো চেয়ে থেকে বলে, আর আমি কার কর্মফলটা ভোগ করছি শুনি! আমি কার পাকা ধানে মই দিয়ে এসেছি? দুনিয়াটা বুঝে শুনে উঠবার আগেই আহাম্মক বাপ আর একটা আহাম্মকের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে কন্যাদায় মিটিয়ে হাত ধুয়ে বসে রইল। একবার ভাবল না মেয়েটা খাবে পরবে কি। শুধু শুনেছিলাম ছেলের নাকি স্বভাবচরিত্ৰ ভাল। ওঃ ভাল চরিত্র ধুয়ে তো জল খাবো কিনা! এর চেয়ে যে স্মাগলাররাও অনেক ভাল। তারা তবু পুরুষমানুষ, ডাকাবুকো। এমন মেনীমুখখ তো নয়!

নিমাই ফের অপোবদন। এই বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটা আরও একটু অন্যরকম হতে পারত বোধ হয়। সে তো চলেই যাচ্ছে। তবে আর এই বাক্যবাণ কেন? স্যুটকেসটার দিকে হাত বাড়িয়ে নিমাই ফের গলা খাকারি দিয়ে বলে, পাপমুখে একটা কথা আসছে। বলব?

বীণা জবাব দিল না।

নিমাই মাথাটা নিচু রেখেই বলে, আজকাল সবই হচ্ছে-টচ্ছে দেখছি চারদিকে। সেইসব দেখেই সাহস করে বলছি। বিয়ে ব্যাপারটা আগে যেমন পাকা ব্যাপার ছিল, আজকাল তেমনধারা নেই। ওসব অংবং মন্ত্রের কী-ই বা দাম। পুবুতরা তো দক্ষিণাটি পেলেই গড়গড় করে মন্ত্ৰ পড়ে চারহাত মিলিয়ে দেয়। কেউ মানছে না ওসব। আমি বলি কি, তোমারই বা মানবার কি দরকার?

বীণা বুঁচকিকে এত জোরে চেপে ধরল যে বেড়ালটা হাঁচোড় পাঁচোড় করে উঠল। বীণা বলল, কী বলতে চাইছ?

বিয়েটা তোমায় মানতে হবে না। আমরা বড় নিচুতলার লোক, আমরা যাই করি, আমাদের নিয়ে সমাজে কথা ওঠে না। কেউ ভাল করে নজরই করে না আমাদের। তাই বলি কি, এখনও সময় আছে তোমার। নামডাক হয়েছে। দু-পাঁচটা টাকাও আসছে। কাউকে পছন্দ হলে বিয়ে করা।

কথাটা নতুন নয়। আগেও ঠারেঠোরে বলেছে নিমাই। বীণাপাণি দাঁতে দাঁত পিষে বলে, কথাটা বলতে লজ্জা হল না। জিব খসে পড়ল না তোমার?

নিমাই মাথাটা নেড়ে বলে, আমি যদি একটা মানুষের মতো মানুষ হতাম তবে কি বলতে পারতাম। দখল রাখা এখন বড় শক্ত কাজ। জোরালো লোক না হলে কিছুর ওপর দখল থাকে না আজকাল। অনেক ভেবে দেখেছি, বিয়েটাও মাঝে মাঝে একটা জুলুম ছাড়া কিছু নয়। যেখানে বনে না সেখানেও ধরে বেঁধে আটকে রাখা! কাজটা অন্যায়। ছোটোলোকদের তো দেখছ! পেটে এক মুখে আর এক নয়। পাঁচু রিকশাওলা এই তো মাসটাক আগে টোপর পরে বিয়ে করে এল। সঙ্গে বাদ্যি-বাজনা, হ্যাজাকের আলো। মাস না ঘুরতেই বউ হাওয়া হয়েছে। পাঁচুও দিব্যি হাসিমুখে রিকশা চালাচ্ছে। যেন কিছুই হয়নি। আমার বেশ লাগল ব্যাপারটা। চাপান নেই, বাঁধন নেই। বেশ তো!

সেটা বুঝি ভাল হল!

খারাপটা কিসের বলো তো! আমাদের আর কি আসে যায়? কে মাথা ঘামাবে আমাদের নিয়ে?

তোমার নিজের আবার বিয়ে বসার ইচ্ছে হয়েছে, সে কথাটা কবুল করলেই তো হয়।

নিমাই জিব কেটে বলে, ও কথা বোলা না।

কেন বলব না? গরজ তো তোমারই বেশী দেখছি!

নিমাই দুঃখিত মুখে বলে, আমার আর্ষ নেই। অধিকারী না হলে কি হয়? তোমার মতো মানুষ পেয়েও কি হল কিছু। আর আমার জন্যই না তোমার এত আপদ-বিপদ-কষ্ট। অত বড় অসুখটা থেকে বাঁচিয়ে তুললে, খাওয়া পরার জোগাড় করলে। কিছু কম তো করোনি। আমার মা-বাবা বড় অভাবী, বড় লোভী। তারাই নামিয়ে দিল তোমাকে। সবই বরাত। এখন ভাবি, কিছু যদি শোধরানো যায়।

আমাকে বোধহয় আজকাল তোমার সন্দেহ হয়!

নিমাই সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, তা সে দোষও আমার আছে। মনে কত পাপ লুকিয়ে থাকে মানুষের

কার সঙ্গে সন্দেহ হয়? কাকা তো?

সে বড় ভাল লোক। স্মাগলার হোক, কি আর যাই হোক, সে একটা জিনিস নিয়েই পড়ে আছে। পালা ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবে না। অমন যার ধ্যান সে সহজে এসব দিকে ঝোঁকে? তাকে আমি খানিক চিনেছি। সে ঠিক ওরকম নয়। তবে যদি তোমার তাকে ভক্তি করতে ইচ্ছে করে তো মন্দ কী? কাকাকেই বিয়ে করতে পারো।

সম্প্ৰদানটা কি তুমিই করবে নাকি?

বড্ড রেগে যাচ্ছে। আমি হিংসুটে কথা বলিনি। আমার আর ওসব হয় না। বড় কষ্ট দিয়েছি তোমাকে। কোথায় একটা শক্ত গিঁট পড়ে গেছে, খুলছে না। আমি অত গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।

বেশ গুছিয়েই বলেছে। শোনো, যদি কাউকে বিয়ে করতে চাই তবে কি এতদিন তোমার অনুমতির জন্য বসেছিলাম? অনুমতি বা আদেশ দরকার হত নাকি? বরং নিজেকে বাঁচাতেই তোমাকে জোর করে ধরে এনেছিলাম। ভুলে গেছ সব?

ভুলব? আমি কি তেমন নিমকহারাম?

তুমিই তো সবচেয়ে বেশী নিমকহারাম। নাহলে ওকথা কেউ মুখে উচ্চারণ করে। বেইমান নও তুমি!

নিমাই ফের মাথা নিচু করে। অনেকক্ষণ নিচু করে রাখে মুখ।

বীণা দেখতে পায়, নিমাইয়ের চোখ থেকে টপ টপ করে জল পড়ছে মাটির মেঝের ওপর।

আমি মেয়েমানুষ, আমার অত বুদ্ধি নেই। মেয়েমানুষ চলে পুরুষের বুদ্ধিতে। কিন্তু পারলে তুমি আমাকে চালিয়ে নিতে? আমাকে নষ্ট বলে ধরে নিচ্ছে, কিন্তু যদি সত্যিই নষ্ট হই তার জন্য দায়ী কে থাকবে শুনি! তুমি ছাড়া আর কে? বউকে ফেলে চলে যাওয়ার মধ্যেই বুঝি তোমার সব বাহাদুরি? আর ভাবছো আমাকে আবার বিয়ে করার কথা বলে খুব উদারতা দেখানো হল।

পুরুষমানুষের কান্না দুচোখে দেখতে পারে না বীণাপাণি। তার বুক জ্বলছে। সে মুখ ফিরিয়ে নিল। বাইরে অজস্র সুতো ঝুলছে। ঝুলেই আছে। টিনের চালে মিঠে মিহিন বৃষ্টির শব্দ। একটা ব্যাঙ লাফ মেরে নিমাইয়ের সুটকেসটা ডিঙিয়ে চৌকির তলায় ঢুকে গেল।

নিমাই ধরা গলায় বলল, আমরা একটু বোকাসোকা মানুষ। তোমাকে দেওয়ার মতো বুদ্ধিই কি আমার আছে! ভেবেচিন্তে একটা কথা হয়তো বললাম, সেটা তোমার হয়তো পছন্দ হল না। তোমাকে বড় ভয় খাই বীণাপাণি!

বীণাপাণি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সেটা জানি। আমার পয়সায় খাও বলে তোমার ভারী লজ্জা। সবসময়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকো, যেন পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে। তাই না?

আজ তুমি বড় সুন্দর করে বলছো। এরকম করে বললে বুকের একটা জোর হয়! বলো, আরও খানিক বলো।

বীণা লোকটার দিকে তাকাল। মাথাটা কি ঠাণ্ডা হয়েছে। ওর ঐ অনুতাপ হচ্ছে? সে বলল, তাহলে কথাগুলো সত্যি?

খুব। তুমি যেন সবসময়ে আমার নাগালের বাইরে। যখন বিয়ে করে আনলাম তখন একরকম ছিলো। এখন যেন গুটি কেটে প্রজাপতি বেরিয়ে পড়েছে। সেইজন্যেই কেমন যেন পর-পর লাগে, ভয়-ভয় লাগে।

দোষটা কি আমার, বলো!

নিমাই মাথা নেড়ে বলে, তোমার দোষ কেন হবে? আমিই কি একটা মানুষ? রোগে ভুগে আমার খানিকটা গেছে, ভয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি বলে আমার বারো আনাই বরবাদ। তার ওপর কাজ নেই, কর্ম নেই, আমি ষোল আনাই তো নষ্ট! তুমি ছিলে বলে টিক টিক করে বেঁচে আছি। কিন্তু পুরুষমানুষের এরকম বেঁচে থাকতে নেই, সে আমি খুব বুঝতে পারি।

আমার মাঝে মাঝে ভীষণ মাথা গরম হয়ে যায়। নিজেকে সামলাতে পারি না। জানো তো?

জানব না? এতকাল একসঙ্গে আছি।

জানোই যদি, তবে একটা কথার জন্য চলে যাচ্ছে কেন?

নিমাই এবার হাসল। তার রোগা মুখখানায় কোনও তেমন সৌন্দৰ্য নেই। তবে হাসলে ভারী ভাল দেখায়। লাজুক গলায় বলল, থাকতে বললে তবে তো থাকব। আমার তো কখনও তোমার ওপর রাগ-টাগ হয় না, অভিমান হয় না। শুধু ভাবি আমি থাকায় বীণার বড় অসুবিধে হচ্ছে।

হাঁড়ি কলসিতেও ঠোকাঠুকি হয়, তা বলে যা নয়। তাই ভেবে নাও কেন? আর রাগ করে বাঁধন ছিড়লেই তো হবে না। তোমার মা-বাবাকে খাওয়াবে কি? সব দিক বিচার করে তবে তো কাজ করতে হয়!

মা-বাবার কথা উঠলেই বড় দুঃখিত হয়ে পড়ে নিমাই। তার মা-বাবা বড় লোভী মানুষ। অভাবে অভাবেই এমনটা হয়েছে। একটু খাওয়া পরার আশায় সব ভাসিয়ে দিতে পারে। এমন কি বীণাপাণি যখন যাত্রায় নাম লেখায় তখন নিমাইয়ের মা খুব আশকারা দিয়ে বলেছিল,মনিবকে খুশি রাখতে চেষ্টা কোরো। শরীর যদি ঐটোকাটা হয়ে পড়ে তাহলে গঙ্গায় ড়ুব দিয়ে নিলেই হবে। একথা বীণাপাণিই বলেছে নিমাইকে। শুনে কানে হাত চাপা দিয়েছিল নিমাই। কিন্তু মায়ের ওপর তা বলে রাগ নেই তার। মা বড় বোকা মানুষ, বাবাও বড় বোকা মানুষ। এ দুটি বোকা মানুষের জন্য তার বড় মায়া। এ দুজন যদি খেতে না পায়, যদি কষ্ট পায়, তবে আর নিমাইয়ের বেঁচে থাকার মানে হয় না।

নিমাই কৃতজ্ঞতায় ছলছলে চোখে বীণাপাণির দিকে চেয়ে বলে, তোমার বড় দয়া বীণাপাণি! তোমার জন্যই বুড়োটা আর বুড়িটা এখনও বেঁচে আছে। কত আশীৰ্বাদ করে তোমাকে! তবে তাদের তো বুদ্ধি নেই, বড় লোভী, কখন কি বলে, কি করে তার ঠিক নেই! তুমি ওদের ওপর রাগ কোরো না।

তোমাকে অত গদগদ হতে হবে না। ওরকম গদগদ হও বলেই তো তোমার সঙ্গে আমার পট খায় না। বউয়ের সঙ্গে অত হাত-কচলানো ভদ্রতা কিসের? তোমার ভাবখানাই এমন যেন পরের বউ চুরি করে এনেছো।

নিমাই আবার নিরাশ-হওয়া গলায় বলে, আমি বড় বোকা মানুষ। খুব বুদ্ধি করে কিছু কইতে বা করতে পারি না।

আজ তোমাকে বোকা মানুষ পেয়েছে। শুধু বোকা বলে বসে থাকলেই হবে! বোকাদেরও তো বাঁচতে হবে, না-কি? আচ্ছা বলো তো, এই বাক্সটা গুছিয়ে রওনা হচ্ছিলে কোথায়? আমার কাছে লুকিও না।

নিমাই ভারি লজ্জায় পড়ে গেল। মাথা নিচু করে মাটির ওপর আঙুল দিয়ে একটু আঁক কাটতে কাটতে বলল, বসন্তপুরের গোকুল একটা যোগালির কাজ দিয়েছিল। আজ সেইখানেই যাচ্ছিলুম।

যোগালির কাজ! সে কিরকম?

বিয়েবাড়িতে গোকুল রান্না করে। তার বেশ নাম-ডাক। বড় একটা বসে থাকে না। দুতিনজন যোগালি লাগে। মাছ কাটা, পেষা, জল তোলা—এইসব আর কি।

মা গো! তুমি ওইসব করতে যাচ্ছিলে?

দোষের কি? কাজ অত গায়ে মাখতে নেই। গোকুল একটু খাতিরও করে। তবে পাকাঁপাকি করতুম না। দুচারটে বড় জোর। পলের দোকানটাই ফেরি করব একদিন।

সে তো এখানেও করতে পারো। করবে?

এখানে একটা অসুবিধে। তোমায় সবাই চেনে। দোকান দিলে তোমার অপমান হবে না তো!

শোনো কথা! আমার আবার সম্মানটা কিসের? আর দোকানদারই বা কোন খারাপ?

বাঁচালে! আমি শুধু তোমার কথা ভেবেই এতদিন কথাটা মাথায় রাখিনি।

শোনো, খোলা রোদে হাওয়ার স্টল দিয়ে বসলে হবে না। মাথার ওপর ছাউনি না থাকলে বড় কষ্ট। তুমি রোগা মানুষ, ওসব সাইবে না। দিলে ঘর ভাড়া নিয়ে দোকান দিও।

ও বাবা! সে যে বেজায় ভাড়া চাইবে। বাজারের দোকান, সেলামিও চেয়ে বসবে নির্ঘাৎ।

ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না! যা লাগে তা আমি দেবো।

তুমিই তো দিচ্ছে। শরীর পাত করে দিচ্ছে। দরকার কি ওসব বাবুগিরির? মনোেহারী দোকান তো আর নয়! ফলের দোকান খোলামেলাই ভাল।

মনোহারীই বা নয় কেন?

ও বাবাঃ! পাগলী বলে কি?

ওসব পরে ভাবা যাবে। আজ বাদলা দিনে খিচুড়ি আর পোপর ভাজা খাবে?

বসন্ত যে বসে থাকবে বটতলায় আমার জন্য!

তোমাকে আজ বেরোতে দিচ্ছে কে?

তাহলে অন্তত তাকে খবরটা দিয়ে আসতে হয়! লোকটা অপেক্ষা করবে। কাল সকাল থেকে যজ্ঞিবাড়ির রান্না, আজ বেলাবেলি গিয়ে সব ব্যবস্থাপত্তর যোগাড়-যন্তর করার কথা।

ওই অলক্ষুণে বাক্সটা খুলে জামাকাপড় সব নামিয়ে রাখো। তারপর ছাতাটা নিয়ে এক দৌড়ে তাকে জানিয়ে এসো গে যে, যেতে পারবে না।

কথার খেলাপ হবে না। তাতে?

মোটেই হবে না! মাঝে মাঝে বাঁচার জন্য কথার খেলাপ করতে হয়। তাতে দোষ নেই। আর যোগালির কি অভাব নাকি? চারদিকে কত বেকার লোক!

তা বটে।

দোকান থেকে একটু ঘি এনো। রসময়ের দোকানে পাওয়া যায়। আর পঁচিশ পয়সার তেজপাতা।

ও বাবা! আজি তো দেখছি ভোজবাড়ি?

যাও, দেরি কোরো না।

উঠে পড়ল নিমাই। ছাতা মাথায় সে বেরিয়ে যেতেই দরজা। এঁটে দিল বীণাপাণি। না, এখন নিমাইকে তাড়ালে তার চলবে না। নিমাইকে তার দরকার।

তোরঙ্গটা বের করার আগে সে জানালাগুলো বন্ধ করে নিল। সাবধানের মার নেই! তোরঙ্গটা যখন খুলছে তখন বুক কাপিছিল ভীষণ। মস্ত ভারী প্যাকেটটা সে অস্থির হাতে টেনে হিঁচড়ে মোড়কটা ছিঁড়ে খুলল। যা দেখল তাতে তার চক্ষুঃস্থির। ডলার আর পাউন্ডের কয়েক কেতা নোট। মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছিল তার। তাড়াতাড়ি উল্টেপাল্টে যতদূর দেখল। কয়েকটা একশ ডলারের নোটও আছে। তোরঙ্গের নিচে জামাকাপড়ের তলায় জিনিসটা আবার চাপা দিয়ে রেখে তালা বন্ধ করল। সে।

একটু আগে নিমাই যখন চলে যাচ্ছিল তখন মনটা বিষ হয়ে ছিল বীণার। যাচ্ছে যাক। বেঘোরে কোথায় মরে পড়ে থাকবে হয়তো! তাই থাক! বীণা আর ভাববে না। ওর কথা। মনটা শক্ত হয়ে ছিল। যেই পগার খুন হওয়ার খবরটা পেল অমনি সব ওলট পালট হয়ে গেল কেন? মনটা নরম হল। কেন যেন মনে হতে লাগল, নিমাই ছাড়া সে একা থাকতে পারবে না! সে কি এই এত এত পড়ে পাওয়া টাকার জন্য? সে জানে, এ টাকার কথা জানলে নিমাই কিছুতেই তাকে এ টাকা ছুতে দেবে না। বড্ড ধর্মভীরু মানুষ।

বীণাপাণিকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। সব দিক যাতে বজায় থাকে।

০০৯. আই সি এস ই পরীক্ষায়

আই সি এস ই পরীক্ষায় অনীশ পেয়েছিল শতকরা একাশি নম্বর। আর আপা পেয়েছিল। তিরাশি। সেই থেকে খুব গোপনে এবং গভীরে অনীশের একটা হীনম্মন্যতা দেখা দিয়েছে। হায়ার সেকেন্ডারিতে সে ওকে টপকে যেতে পারে, আবার নাও পারে। আপা ভাল মেয়ে এবং তার খুব ভাল বন্ধু। আপা তাকে সব বিষয়ে সাহায্য করতে চায়, যদিও অনীশের সাহায্য লাগে না। কিন্তু আপা এতই ভাল যে, অনীশের হীনম্মন্যতার কথা জানতে পারলে নিজের বাড়তি শতকরা দু নম্বর এখনই তাকে দিয়ে দিতে চাইবে। সেটা অসম্ভব জেনেও চাইবে। আপা একটু ও ধরনেরই। তামিলরা বেশ श বলে শুনেছে অনীশ। কিন্তু ব্যতিক্রম তো থাকেই! আপা সেই ব্যতিক্রম। এই কালো, রোগা, নিরহঙ্কারী, এবং সবসময়ে একটু ঘোরের মধ্যে থাকা মেয়েটি মোটেই বাস্তববাদী নয়। আঠারো বছর বয়সেও এই ছোটখাটো মেয়েটিকে মোটেই যুবতী বলে মনে হয় না, বরং বালিকা বলে ভ্ৰম হয়। আপা পুরোপুরি বালিকাও নয়, মনের মধ্যে এখনও অনেকটাই শিশু।

আপাতত আপা কলকাতার ভিখিরিদের জীবনী লিখছে। সেটা একটা কাণ্ডই। লাল কাপড়ে বাধাই খেরোর খাতা সবসময়ে তার সঙ্গে থাকে। ফুটপাথে হাঁটু গেড়ে বসে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিখিরিদের সাক্ষাৎকার নেয় এবং তা যত্ন করে টুকে রাখে। মাঝে মাঝে টেপ রেকর্ডারও ব্যবহার করে বটে, কিন্তু মাইক মুখের সামনে ধরলে অধিকাংশ ভিখিরিই ঘাবড়ে যায় বলে সেটা ব্যবহার করে খুব কম। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছে একটা বুড়ো ভিখিরিকে আপা বাবা বলে ডাকে। জীবনীসংক্রান্ত নোট তার অনেক জমেছে। আপার ইচ্ছে ছবিসহ বইটা আমেরিকা বা ইংলন্ড থেকে বেরোবে। খুব বিক্রি হবে। তার রয়্যালটি থেকে সে ভিখিরিদের জন্য একটা প্ৰাসাদ বানাবে ইস্টার্ন বাইপাসের কাছে কোথাও।

নাসা এবং রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা প্রকল্পে একটা প্রস্তাব উঠেছিল, বন্ধু দেশের কতিপয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষকে মহাকাশে ঘুরিয়ে আনবে। সেই প্রকল্পে নিজের নাম নথিভুক্ত করার জন্য আপা বিস্তর লেখালেখি করেছে। কোনও আশাব্যঞ্জক জবাব পায়নি। সে শিখতে চায় এয়ারো ডায়নামিকস। নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে-অৰ্থাৎ কেরিয়ার নিয়ে আপা চিন্তিত নয়। সে শুধু চায় পৃথিবীর সামনে ভারতবর্ষকে তুলে ধরতে। ভারতবর্ষের দারিদ্র্য, আধ্যাত্মিকতা, ভারতের বিচিত্র মানুষ ও ইতিহাসকে। আপা সংস্কৃতকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। এ নিয়ে সে কাগজে কাগজে চিঠি লেখে। কয়েকটা চিঠি ছাপাও হয়েছে।

আপার সঙ্গ খুবই পছন্দ করে অনীশ। ওর কোনও সেক্স অ্যাপিল নেই এবং ওকে মেয়ে বলে না ভাবলেও চলে। ভাবেও না অনীশ। শুধু আজকাল, আই সি এস ই পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর থেকে তার একটু আফসোস হয়, আপার কাছে দু নম্বরের জন্য হেরে যাওয়াটা তার পৌরুষের পক্ষে অপমানজনক।

চার দিন ক্লাশে যায়নি অনীশ। সবাই জানে, তার বাবার অসুখ। আজ পাঁচ দিনের দিন দুপুরে আপা নার্সিং হোমে এসে হাজিরা। সঙ্গে ক্লাসের আরও পাঁচটি ছেলেমেয়ে। সুমিত সিং, অৰ্চনা হায়দার, রোশন, পিটার, রচনা। অনীশ সকালে আসছে না। সকালে উঠতে তার দেরি হয়। আসে দুপুরে, বিকেলে আর মাঝে মাঝে রাতেও।

মণীশকে রাখা হয়েছে ইনটেনসিভ কেয়ারে। সেখানে ঢোকা বারণ। তবে কাচের পার্টিশন দিয়ে শায়িত বাবাকে দেখতে পায় অনীশ। হু-হু করা বুক নিয়ে সে দেখে। চব্বিশ ঘণ্টা মনিটরিং-এ রয়েছে তার বাবা। কথা বন্ধ, নড়াচড়া বন্ধ। শুধু ওষুধ দিয়ে নিরন্তর ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়।

বেশীর ভাগ সময়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে অনীশ। আর ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর নেয়। বাবাহীন পৃথিবী কি সে সহ্য করতে পারবে? বাবা ছাড়া বেঁচে থাকাটার কি মানে থাকবে কোনও? আজকাল এই একটি চিন্তাতেই তার মাথা ভার হয়ে থাকে। মাইনাস বাবা এই পৃথিবীর, এই জীবনের কোনও বর্ণ, কোনও স্বাদ থাকবে না। বড় নিঃসঙ্গ লাগবে তার। ভীষণ একা। ভয় করবে।

পাশ করার পর ইদানীং তার বাবা তাকে মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করছিল, ইউ আর কোয়াইট এ ইয়ংম্যান নাউ। এনি গার্ল? ইজ দেয়ার এনি গার্ল?

না বাবা, নো গার্ল।

মণীশ ভ্রূ কুঁচকে চিন্তিতভাবে বলে, সাম ডে এ গার্ল মে টেক এ প্লেস ইন ইওর লাইফ। এ ভেরি ইস্পট্যান্টি প্লেস। চুজ হার ইওরসেলফ। বাট বি চুজি। ভেরি ভেরি চুজি।

কিন্তু অনীশের জীবনে এখনও সেই অর্থে কোনও মেয়ে বা মহিলা নেই। তার দিগন্ত কেউ আড়াল করে দাঁড়ায়নি। তার অনেক অনেক মেয়ে-বন্ধু আছে। সম্পর্ক খুবই সহজ, জটিলতাশূন্য।

এ সব প্রসঙ্গ উঠলে তার মা একটু রাগ করে, কেন এখনই ওসব ওর মাথায় ঢোকাচ্ছে বলো তো? ও তো বলতে গেলেও এখনও দুধের শিশু।

মণীশ গম্ভীর হয়ে বলে, প্ৰাপ্তে তু ষোড়শবর্ষে পুত্রমিত্রবদাচারেৎ। আমি চাই আমার ছেলে আমার কাছে জলের মতো সহজ হোক, তাতে কমপ্লিকেশনসের ভয় থাকবে না। অধিকাংশ বাবাই এটা না বলে জেনারেশন গ্যাপি তৈরি হয়।

মায়েরা কখনও বোঝে না। এসব। তার মা এখনও ছেলের শৈশব আঁকড়ে পড়ে আছে। তাই তর্ক করে বাবার সঙ্গে।

বাবাকে আকণ্ঠ ভালবাসে অনীশ। এত ভালবাসে যে, তার মনে হয়। বাবা মরে গেলে তাকেও হয়তো আত্মহত্যা করতে হবে।

বন্ধু ও বান্ধবীরা যখন দুপুরবেলা আচমকা এসে হাজির হল, তখন নিঃসঙ্গ অনীশের মনে হল, এদের সঙ্গে তার দেখা হল দু হাজার বছর পর। কতকাল দেখেনি ওদের! এত একা, এত মৃত্যুহিম, এত অসহায় লাগছে নিজেকে যে, অনীশ নিজেকে দেখে নিজেই অবাক!

নার্সিং হোমের লবিটা বিরাট বড়। দুপুরবেলা একটু ফাঁকা। তারা বসে গেল। বন্ধুদের মুখ সময়োচিত গভীর। অনীশ শুকনো মুখে বলে, প্লীজ স্মাইল এ বিট। আমি একটু হাসিমুখ দেখতে চাই।

বাস্তবিক ওদের মুখের গাম্ভীর্য–যতই কৃত্রিম হোক–সহ্য হয় না। অনীশের। চারদিকটা শোকার্ত হয়ে পড়লে সে যে জোর পায় না।

বন্ধুরা একটু হাসল। তবে জোর করে। একটু সাহস-টাহস দিল। সুমিতের বাবা মস্ত হাৰ্ট স্পেশালিস্ট। তবে এখন আমেরিকায় গেছেন একটা কনফারেন্সে। সুমিত মুখে আফসোসের শব্দ করে বলল, ড্যাডি আমেরিকায় না গেলে আমি ড্যাডিকে নিয়ে আসতাম। এনিওয়ে অল বিগ ফিজিসিয়নস আর হিয়ার। নো ওরি।

একটু পড়াশুনোর কথা হল, একটু খেলাধূলার কথা হল, একটু পপ মিউজিকের কথা হল। তারপর আপা ছাড়া সবাই চলে গেল।

আপা বলে, তুমি কিছু খাওনি অনীশ? লানচ্‌?

লানচ্‌-ফানচ্‌ এখন মাথায় উঠেছে। খিদে পেলে—অর্থাৎ খুব খিদে পেলে দুটো কলা বা বিস্কুট খেয়ে নিই।

তুমি অনেক উইকি হয়ে গেছ। চোখের কোল বসে গেছে। চলো তোমাকে কিছু খাইয়ে আনি।

আরে না ভাই, খেতে ইচ্ছে করে না। আমার। টেনশনের মধ্যে কি খাওয়া যায়!

তোমাকে গুচ্ছের খেতে বলছি না। ট্রাই ফাস্ট ফুড। কিংবা ফুট জুসি। এগুলো খেতে কোনও বোরডম নেই। খেয়ে যাচ্ছি। তো খেয়েই যাচ্ছি—আমারও ওরকম ভাল লাগে না। চলো, স্ট্রং না থাকলে তোমার বাবার কোন উপকার করতে পারবে তুমি?

অনীশ রাজী হয়ে গেল। ফলের রস খেতে তার আপত্তি নেই। আর শরীরটা তার বেশ দুর্বল লাগছে আজকাল।

নার্সিং হোমের কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুজনে দুগ্ৰাস মুসুম্বির রস নিয়ে বসে গেল। অনীশ তার সব সহপাঠী বন্ধু এবং বাবার সঙ্গে ইংরেজিতেই কথা বলে। ব্যতিক্রম শুধু আপা। এ মেয়েটা ঝরঝরে বাংলা বলে এবং বাংলা ছাড়া ইংরেজিতে কখনও কথা বলে না। অনীশের সঙ্গে। আপা বলে, তোমাদের প্যাট্রিওটিজম নেই জানি। এখন যা আছে সেটা হল প্রভিনসিয়াল প্যাট্রিওটিজম। তামিলরা তামিলনাড়ু, কন্নড়রা কর্ণাটক, পঞ্জাবীরা পঞ্জাব নিয়ে পড়ে আছে। কিন্তু তোমরা বাঙালী আপার মিডলক্লাস— তোমাদের সেটাও নেই। আর কিছু না পারো মাতৃভাষায় কথাটা বোলো বাপু।

মুগা বাংলা জানে বললে ভুল হবে, সে বাংলার গোটা ইতিহাস জানে। বাংলা সাহিত্য জানে। বাংলা লোকসাহিত্য অবধি জানে।

এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে অনীশ আরও এক গ্লাস নিল। তারপর আপাকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর–এ লাইন তুমি শুনেছো?

আপা অবাক হয়ে বলে, কেন বলো তো!

অনীশ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, আমার সতেরো বছর কমপ্লিট হওয়ার পর থেকেই আমার বাবা মাঝে মাঝে এ লাইনটা বলে। আমি তো বুঝতেই পারি না, আঠারো বছর বয়সটাই কেন ভয়ংকর? বাবার ধারণা আঠারো বছর বয়স হলেই ছেলেরা রান আফটার গার্লস অ্যান্ড ড়ু আনড়ুয়েবল থিংস। কিন্তু দেখ আপা, আমাদের আঠারো বছর বয়সটা কি সত্যিই ওরকম? পড়াশুনো, কেরিয়ার বিল্ডিং, হাজারো টেনশনের মধ্যে আমরা কি বয়সটা টের পাই? ইজ ইট এ রিয়েলি ডেনজারাস এজ? লাইনটা কার জানো?

তোমাকে নিয়ে আর পারাই যায় না। এটা কবি সুকান্তর লাইন।

সুকান্ত! মিন, সুকান্ত ভট্টাচার্ড?

হ্যাঁ বুদ্ধ। পড়েনি?

না। জাস্ট নামটা শোনা। পড়বার সময়টা কোথায় বলো তো? আমাদের সময় বলে কিছু আছে?

আমি তাহলে কি করে সময় পাই?

তুমি! তোমার কথা আলাদা, তুমি একসেপশনাল।

মোটেই নয় বাবা। তবে আমি তোমার মতো কেরিয়ার-কনশাস। নই। আমি যা পড়ি তা ভালবেসে পড়ি।

ওই আঠারো বছর নিয়ে কবিতা একদিন আমাকে শোনাবো?

মুখস্থ নেই। তবে বই দিতে পারি।

ঠিক আছে। আমার বাবা কেন লাইনটা কোট করে তা আমার জানা দরকার! আপা, তোমার কি মনে হয় বাবা সারভাইভ করবে?

কেন করবে না? ওঁর বয়স কত?

পঞ্চাশের ঘরে। আরলি ফিফটিজ। কিন্তু বয়সটা বড় কথা নয়।

নৈরাশ্যের মধ্যেও আশার কথা ভাবতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ফিলজফি—তা জানো?

ভাবতে হলে বুকের জোর চাই। আমি যে একদম জোর পাচ্ছি না। আপা। বাবার কিছু হলে আমি বঁচিব না।

আপার চোখ হঠাৎ ছলছল করে উঠল। টেবিলের ওপর রাখা অনীশের হাতটা ধরে থেকে সে বলল, তুমি এই কারণেই ভীষণ ভাল।

কি কারণে?

পিতা স্বৰ্গঃ, পিতা ধৰ্মঃ, পিতাহি পরামং তপঃ, তুমি কথাটা মানো?

শুনেছি, অতটা নয়, তবে আমি বাবা ছাড়া অন্ধকার দেখি। মা বলে, বাবাই নাকি আদর আর আশকারা দিয়ে আমাকে নাবালক করে রেখেছে।

মা-বাবা ওরকমই হয়। ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে তারা ভীষণ প্যাশনেট। কিন্তু কি জানো, স্নেহ সবসময়ে নিম্নগামী। মা-বাবা আমাদের যতটা ভালবাসে আমরা কিছুতেই তাদের ততটা ভালবাসতে পারি না।

বাজে কথা। আপা। আমি কিন্তু—

তুমি তো প্রকৃতির নিয়ম উল্টে দিতে পারো না। তবে আমি মানছি তুমি তোমার বাবাকে খুব ভালবাসো, যতটা আমাদের বন্ধুদের কারও মধ্যেই দেখি না। আর সেইজন্যই তুমি ভীষণ ভাল।

থ্যাংক ইউ। কিন্তু তুমি জানো না, আমার বাবাও ভীষণ ভাল। আইডিয়াল ম্যান।

কেন জানবো না! তোমার বাবার সঙ্গে তো আমি কত কথা বলেছি। অনেক খবর রাখেন। প্রচুর পড়াশুনো করেছেন। স্মার্ট।

অ্যান্ড অনেস্ট। অ্যান্ড লাভিং। অ্যান্ড কেয়ারিং।

আপা অনীশের হাতে মৃদু চাপড় দিয়ে বলে, শোনো, এখন বাবার কথা অত ভেবো না। মনটাকে অন্যদিকে সরিয়ে নাও।

কি করে?

জোর করে। সবসময়ে বাবার কথা ভাবছো, অথচ তার জন্য প্র্যাকটিক্যালি তোমার কিছু করার নেই, এটা তোমাকে ভীষণ দুর্বল করে ফেলছে। জোর করে মনটাকে অন্য চিন্তা-ভাবনায় নিয়ে যাও। পৃথিবীটা তো অনেক বড়, কত কি আছে, ভাবতে পারো না!

না।

তাহলে একটা কাজ করবে? আমার সঙ্গে দাবা খেলবে?

দাবা? যাঃ!

দাবা খুব ভাল খেলা। মনটাকে একদম গ্রেফতার করে নেয়। কিছুক্ষণ খুব রিলিফ পাবে। আর যদি থ্রিলার পড়তে চাও আমি তোমাকে একটা দারুণ বই দিতে পারি। রোড টু গনডলফো। পোপকে চুরি করার একটা মজাদার উপন্যাস পড়বে?

অনীশ হোসে ফেলে। বলে, বাবার কথা ভাবতে তো আমার খারাপ লাগছে না। মনটাকে অত সহজে সরানো যাবে না। আপা!

আমি মনে করি। কাল থেকে তোমার ক্লাস করাও উচিত। তোমার বাবা নার্সিং হোম-এ, ডাক্তাররা যা করার করবে। তুমি কেন ক্লাসে যাচ্ছে না?

পড়াশুনোর চিন্তা মাথায় উঠেছে। আমাদের ফিউচারও খুব আনসার্টেন। বাবাই আমাদের সোর্স অফ ইনকাম। চাকরিটা ভাল। কিন্তু আমাদের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স বা প্রপার্টি নেই।

তাহলে সুকান্তর কবিতাটা তোমাকে শুনিয়ে লাভ নেই, ও কবিতা তুমি বুঝবে না।

তার মানে?

সুকান্তর আমলে আঠারো বছরের ছেলেরা এত হিসেবী ছিল না। পকেটে টাকা নেই, ভবিষ্যতের আশা নেই, অথচ দুনিয়াটা তার নিজের বলে মনে হয়। তুমি সেরকম যুবক বোধ হয়। কখনও হবে না।

না না, কবিতাটা আমি তবু শুনতে চাই আপা। কি কারণে আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর, আমাকে জানতে হবে।

ভয়ংকর শব্দটা এবং আপা দুপুর থেকে বিকেল অবধি তার সঙ্গে রইল। তারপর আপা চলে গেল, কিন্তু ভয়ংকর শব্দটা গেল না।

ভিজিটিং আওয়ারে অপর্ণা এসে ছেলের দিকে চেয়ে বলল, তুই ভেবেছিস কি বল তো! এভাবে কি নিজেকে শেষ করতে চাস? দুপুরে কিছু খাসনি। বাবার অসুখ কি আর কারও করে না?

কাতর গলায় অনীশ বলে, অ্যাপেটাইট নেই মা। গা বমি-বমি করছিল।

খালি পেট বলেই ওরকম করেছে। সকালে শুধু দুখানা বিস্কুট আর চা ছাড়া তার পেটে কিছুই যায়নি।

গেছে মা। আপা এসেছিল। আমরা ফুট জুস খেয়েছি।

অত ভাবছিস কেন বল তো! আজ সকাল থেকে তোর বাবার অবস্থা স্টেবল। আমরা তো ফোনে খবর নিচ্ছিই। এখন বাড়ি যা। আমি খাবার সাজিয়ে রেখে এসেছি টেবিলে, খেয়ে নিস। তারপর একটু রেস্ট নে।

আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর… আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর বিড়বিড় করতে করতে তার বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। কোন এক ঘোরের মধ্যে কোন বাসে চড়ে যেন— বসে বা দাঁড়িয়ে-7 – ঠিক মনে নেই, সে বাড়ি ফিরে এল। তার বাবা ইদানীং তাকে একটা স্কুটার কিনে দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেছিল। বাসে ভিড়। কিন্তু অপর্ণা এই প্রস্তাব ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করেছে, পাগল নাকি! স্কুটার ভীষণ বিপজ্জনক জিনিস। আমি যতদিন বেঁচে আছি ওসব হবে না।

একটা স্কুটার বা মোটরবাইক থাকলে তার অনেক সুবিধে হত। তার অনেক বন্ধুর আছে অ্যাকসিডেন্ট জিনিসটাই তো অ্যাকসিডেন্ট। রাস্তায় হাঁটছিল একটা লোক, পাঁচতলার ছাদে কাপড় রোদে শুকোতে দিয়ে ইট-চাপা দিয়েছিল। কেউ, বাতাসের তোড়ে কাপড় উড়ে ইট খসে পড়ল সোজা মাথার চাঁদিতে, লোকে তো এ ভাবেও মরে! খবরের কাগজে এ খবর পড়েছে অনীশ। মৃত্যু-ভয় আছে জেনেও মানুষ উঁচু পাহাড়ে চড়ে, রেসিং কার চালায়, প্লেন ওড়ায়, আরও কত কী করে!

ভেবে লাভ নেই। মা ওসব যুক্তির ধার ধারে না। কিন্তু তার বিবেচক বাবা কথাটা যে ভেবেছিল, তাতেই সে আজ যথেষ্ট কৃতজ্ঞ বোধ করে। বাবার অন্তত আপত্তি ছিল না।

রাত সাড়ে আটটার সময় দাবার এক চাল খেলা শেষ করল ঝুমকি আর অনীশ। জমল না। তারা কেউ মন দিয়ে চাল দেয়নি, কেউ জিততে চায়নি, ভুল চাল ফেরত নেয়নি। মাত্র পনেরো মিনিটে খেলাটা শেষ হয়েছে। ঘুটিগুলো নাড়াঘাটা করতে করতে অনীশ বলে, বাবা তোকেই সবচেয়ে বেশী ভালবাসে রে দিদি!

তোকে।

না, তোকে।

আগে আমাকেই বাসতো। এখন তোকে।

মোটেই নয়।

তোর চেয়ে বেশী। কিন্তু আমি ভালবাসি বাবাকে।

চ্যালেঞ্জ।

জানিস তো, ছেলেরা বিয়ে করলেই কাতি! কিন্তু মেয়েরা মোটেই সেরকম নয়।

বিয়েই করব না।

ওরকম সবাই বলে, আবার করেও। তারপর বউ-পাগলা ন্ত্রৈণ হয়ে সবাইকে ভুলে যায়। মা বাবা ভাই বোন কাউকে আর পাত্তা দেয় না। ছেলেগুলো ভীষণ ট্রেচারাস।

তুই মেয়েদের খুব সাপোর্টার, না?

তা কেন, যা সত্যি তাই বলছি।

শোন দিদি, আজ আমার ঝগড়া করতে ইচ্ছে নেই। মনটা বিগড়ে আছে। তুই একটা কবিতা পড়েছিস, যাতে এই লাইনটা আছে, আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর?

ঝুমকি একটু ভ্রূ কুঁচকে বলে, পড়েছি। সুকান্ত। কেন বল তো?

আমার একটুও বাংলা নলেজ নেই। এমন কি আপাও কত কী জানে। আমি কবিতাটা জানিই না!

কবিতাটা হঠাৎ তোর মনে পড়ল কেন?

আজকাল বাবা আমাকে প্রায়ই লাইনটা বলে। কেন বলে তা বুঝতে পারছি না। বাংলা আমি কিছু জানি না।

জানবি কি করে! ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে পড়ে ট্যাশ গরু তৈরি হয়েছিস যে। আমি তো তোর মতো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়িনি। বাবা পড়ায়নি। তুই হচ্ছি। ড্যাডিজ র আইড বয়।

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়লে ট্যাশ গরু হয়? ট্যাশ গরু মানে কি বল তো! সামথিং মিক্স আপ? ক্রস ব্রিড?

তোকে নিয়ে আর পারা যায় না। অনু আর তুই দুটোই ট্যাশ-গরু।

বল না!

কবিতাটা পড়েছিস?

বললাম তো বাংলা নলেজ নেই।

ট্যাশ গরু একটা মজার কথা। এ ফানি মিক্সড আপ। তবে আসলে ননসেন্স ভার্স।

আর ও কবিতাটা! আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর!

ওটা ননসেন্স ভার্স নয়। পোয়েট্রি।

বাবা ওটা আমাকে কেন বলে?

বাবার ভয় আঠারো বয়স হওয়ার পর তুই একটু ওয়াইল্ড হয়ে যেতে পারিস।

ওয়াইন্ডা! আমি! আমি তো বরাবর শান্ত ছেলে।

ঝুমকি ভ্রূ কুচকে বলল, তাই বুঝি? আজকাল নিজের ক্যারেকটর সার্টিফিকেট নিজেই দিচ্ছিস? তোর কিল ঘুষি, চুলটানার ব্যথা আজও আমার যায়নি, তা জানিস?

ওঃ, তোর কথা তো আলাদা। দিদিদের সঙ্গে ভাইরা সকলেই ওরকম এক-আধটু করে।

ইস, মায়ের কথাগুলো কেমন মনে করে রেখেছে দেখ!

আচ্ছা, আমি সত্যিই ওয়াইল্ড হয়ে যেতে পারি বলে বাবা মনে করে?

বাবা তোকে নিয়ে ভীষণ ভাবে। তাই বলে। আঠারো বছর বয়সটা একটু খারাপ।

এই সময়ে রান্নাঘরে এক অপর্ণা। গ্যাসের উনুনে মাছের ঝোল আর ডাল ফুটছে। রুটি বেলছে কাজের মেয়েটা। রোজ একইরকম একঘেয়ে দৃশ্য। সে এই রান্না করা, খাওয়া, শোওয়া, ওঠা, রান্না করা… ইত্যাদি একটা ছক থেকে বেরোনোর কোনও পথ খুঁজে পায় না। মাকড়সার জাল যেমন এও ঠিক তেমনি। নিজের জালের পরিধিতে দিনের পর দিন আটকে থাকে মাকড়সা। অপর্ণাও কি তাই?

আজ বিকেলেও মণীশকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখতে পেল না। অপর্ণা। ডাক্তার বলছে, অবস্থা স্টেবল। কিন্তু তেমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছে না। আজ মণীশের বস এসেছিল বিশাল একখানা কনটেসা গাড়িতে চেপে, বয়স চল্লিশের নিচে। দারুণ স্মার্ট, পার্শি লোকটা ডাক্তারের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ গন্তীর মুখে কথা বলছিল। ইংরেজিতে। অপর্ণা পাশেই ছিল, কিন্তু এক বর্ণও বুঝতে পারেনি। অনীশ বা অনু হলে বুঝত। অপর্ণা ওরকম খই-ফোনা ইংরেজি বুঝতে পারে না। মণীশের বস বনাতওয়ালার আবার বিদেশেই জন্ম, সেখানেই লেখাপড়া।

পুরো না বুঝলেও ভাবসাব এবং গলার স্বর থেকে অনুমান করতে পারে, মণীশের বেঁচে যাওয়ার একটা আউটসাইড চান্স আছে। আউটসাইড চান্স কাকে বলে তা অবশ্য অপর্ণা জানে।

ছেলেমেয়েদের মতো অপর্ণা ভেঙে পড়েনি বটে, কিন্তু তাকে অনেক চাপ নিতে হচ্ছে মনের মধ্যে। অপর্ণা আর কতটা পারবে, তা জানে না। তবে সে পৃথিবীর এবং জীবনের নেতিবাচক দিকটাকে সবসময়ে বড় করে দেখে, সঠিক গুরুত্ব দেয়। তার আশা ভরসা, স্বপ্ন কখনোই মাত্ৰ-ছাড়া নয়। মণীশ যেমন আদ্যন্ত ব্লপ্লের ঘোরে বাস করে, অপর্ণার তেমনই সবসময়ে কঠিন মাটিতে পা।

মাছের ঝোল বেশী রাখতে নেই, তাহলে রুটির সঙ্গে ওরা ভাল খাবে না। আসলে রুটির সঙ্গে ডিম বা মাংসই ভাল। কিন্তু অপর্ণার সময় হয়নি বাজার করার। ফ্রিজে মাছ ছিল, তাই রাঁধছে। মণীশের অসুখ বলে ওরা হয়তো খাবার নিয়ে কথা তুলবে না। খুশী না হলেও না। ওরা খাবারের স্বাদ পায় না এখন। বাবা ওদের ভুবনময়। বাস্তববাদী অপর্ণা, হিসেবী অপর্ণা, একটু কৃপণ অপর্ণার চেয়ে ওরা অনেক বেশী পছন্দ করে বেহিসেবী, ক্যাপাটে, স্বপ্নশীল মণীশকে।

সেই একই কারণে কি অপর্ণাও পছন্দ করেনি মণীশকে?

ঘুম চোখে অনুশীলা এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল, মা, এ সময়ে কি ড্যাডিকে নিয়ে ডিসকাস করা ভাল?

কে ডিসকাস করছে?

ওই তো। ওরা করছে। দাদা আর দিদি।

ডিসকাস করলে কী হয়?

এ সময়ে তো ড্যাডি সিক। এখন কী ডিসকাস করা ভাল? সুপারস্টিশন আছে না?

কিসের সুপারস্টিশন?

ডিসকাস করাটা আমার ভাল লাগছে না। আমাদের চুপ করে থাকা উচিত!

তা কেন? ডিসকাস করলে খারাপ কিছু হয় না। তুই আজ সারাদিন বেরোসনি, যা একটু ছাদে ঘুরে আয়।

ছাদটা ভীষণ অন্ধকার। আমি ভয় পাই।

উঃ, তোর ভয় নিয়ে আর পারি না বাপু। ভয়ে ভয়েই তুই শেষ হয়ে গেলি। বড় হচ্ছিাস, এখনও অত ভয় কিসের!

অনু ছিলো ছলো চোখে চেয়ে থাকে। জবাব দেয় না।

অপর্ণা বলে, তাহলে যা না, স্টিরিওটা চালিয়ে গান শোন। পিয়াসার ক্যাসেটটা চালা, আমিও শুনতে পাবো।

ভুরুঙ্গুয়ে সুমি বরং মোহিনীদের বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি মা ও বোজ আসে, আমি তো যাই না।

কটা বাজে?

পৌনে আটটা মাত্র। কাছেই তো!

একটু দোনোমোনো করে অপর্ণা। পাড়ার একটা কেষ্ট ঠাকুর সম্প্রতি অনুর পিছনে লেগেছে। ঘন ঘন বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াত করে। লেটার বক্সে চিঠিও ফেলে গেছে দু দিন। গুরুতর কিছু নয়। তবু সাবধান হওয়া ভাল।

এত রাতে যাওয়া ভাল দেখাবে না।

কেন, কি হয়েছে মা? এক মিনিটের তো রাস্তা!

সেই ছেলেটা যদি পিছু-টিছু নেয়?

দুকু মুক্ত করবে? ওরা তো কাওয়ার্ড টাইপেরই হয়। সামনে আসতে সাহস পায় না। আমি পাত্তাই দিই না।

সে আমি জানি।

ও ছেলেটা একদম হ্যাংলা। মোহিনীর পিছনেও লেগেছিল। ওরকমই চিঠি দিত।

তারপর কী হল?

কী আবার হবে! মোহিনী পাত্তা দেয়নি, তাই আর পিছনেও লাগৈ না। তুমি ভয় পেও না।

মৃত্যুহলে। মনটা একটু ভাল লাগবে। ছাতা নিয়ে যাস। বৃষ্টি আসতে পারে। আধঘণ্টার মধ্যে ফিরবি।

আছে।

মোহিনী তোর কেমন বন্ধু?

জাস্ট বন্ধু।

ওরা ভাল লোক তো?

খুব ভাল। ওর বাবা ফার্মার ছিল।

কী ছিল?

ফার্মার। চাষ-টাস যারা করে।

চাষা নাকি?

ঠিক তা নয়। তবে ওরকমই। ওদের গ্রামটা ভীষণ নাকি অজ পাড়া গা। শেয়াল ডাকে।

কে থাকে। সেখানে?

সবাই। মোহিনী বলেছে। ওর দাদু-টাদু সব সেকেলে আর আন এড়ুকেটেড।

কিন্তু ওর বাবা তো বিরাট চাকরি করে! বিদেশে যায় শুনেছি!

ওর বাবা একজন প্ৰাইম এনভিরনমেন্টালিস্ট।

সেটা আবার কী?

ও তুমি বুঝবে না। নাইস ম্যান। খুব শান্ত, ঠাণ্ডা, ভেরি আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ঠিক আমার বাবার মতোই।

চাষা ছিল বলছিস?

খুব গরিব। ওদের সঙ্গে একদম মেলে না। সম্পর্কও নেই।

তাই বল! যাবো মা?

যা।

০১০. কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত

রামকৃষ্ণদেব বলেছেন, কামিনী-কাঞ্চন থেকে তফাত তফাত খুব তফাত থাকো। কাঞ্চনকে এড়াতে পারেনি হেমাঙ্গ। তবে কামিনীকে অনেকটাই অনেকটাই পেরেছে। গড়চার বাড়িতে আসার পর তার জীবন প্রায় কামিনী-শূন্য।

তবে এই যে একটা গোটা বাড়ি নিয়ে সে একা থাকে এটা কারও কারও কাছে খুব অন্যায় রকমের বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়। বিশেষ করে পিসতুতো দিদি চারুশীলার কাছে। পিসতুতো হলেও চারুশীলা একসময়ে তাদের বাড়িতেই লালিত পালিত হয়েছে। কারণ পিসিমার ছিল দুরারোগ্য নানা আধিব্যাধি। চারুশীলাকে দেখার কেউ ছিল না। সেই শিশুকাল থেকে চারুশীলা তার ওপর শতেক খবরদারি করে এসেছে। আজও করে। মাঝে মাঝে এসে বলে, অ্যাই, তোর বাড়িটা সামনের শনিবার ছাড়তে হবে, আমি এখানে একটা পার্টি দেবো।

হেমাঙ্গ আপত্তি করলেও এঁটে ওঠে না। দিদিটি বড়ই প্রখরা। যখন মুখ ছোটায় তখন রোখে কার সাধ্য। হেমাঙ্গ অগত্যা বাড়ি ছেড়ে কোনও ছোটখাটো টু্যরে আশেপাশে কোনও জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হয়। মেয়েদের সে যে পছন্দ করে না তার অন্যতম প্রধান কারণ কি এই দিদিটি? হতে পারে। চারুশীলা দুর্দান্ত সুন্দরী। দুটো সিনেমার নায়িকাও হয়েছিল। মুখখানা এমনিতে সুন্দর হলেও ফটোগ্ৰাকী নয় বলে আর বিশেষ সুযোগ পায়নি। তবে সুন্দরী বলেই ভাল একখানা বর বাগিয়ে নিয়েছে। ওর স্বামী আন্তর্জাতিক সম্মান-টম্মান পাওয়া একজন বিখ্যাত স্থপতি। সল্ট লোকে অনেকগুলো বাড়ি তার ডিজাইন করা। দিল্লি, বোম্বাই, নিউ জার্সি ও লন্ডনের শহরতলীতে সে বেশ কয়েকটা বাড়ি বানিয়ে নাম করে ফেলেছে। দেদার টাকা। উদয়াস্ত ব্যস্ত মানুষ। স্বামী যেমন ব্যস্ত, বউটির তেমনই অখন্ড অবসর। সারাদিন নেই কাজ তো খই ভাজ করে বেড়াচ্ছে। পার্টি দেওয়ার জন্য চারুশীলার জায়গার অভাব নেই। গোলপার্কের কাছে তার নিজস্ব বাড়িটিই কি কম? তবু চারুশীলা যে হেমাঙ্গর বাড়ি মাঝে মাঝে ধার করে সে শুধু কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখার জন্য।

আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতাকে হেমাঙ্গ খুব অপছন্দ করে না। সে বিজ্ঞানের ছাত্র নয়, কারণ সলিড জিওমেট্রিও ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাস তাকে চোখ রাঙিয়ে এমন ভয় দেখিয়েছিল যে, সে পালিয়ে বাঁচে। কিন্তু বিজ্ঞানের অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারকসমূহকে সে অতিশয় বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করে। বিশেষ করে ভোগ্যপণ্য ও নিত্য ব্যবহার্য যে সব জিনিস হাতের কাছে এগিয়ে বিজ্ঞান, সেগুলিই তাকে আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশী। তবে বিজ্ঞানের কিছু অভিশাপও আছে। তার মধ্যে একটা হল টেলিফোন আর বাড়িটাকে টেলিফোনমুক্ত রাখতে পারলে সে সত্যিকারের স্বাধীন হতে পারত। কিন্তু ভাড়াটে ভদ্রলোক অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে একটা জ্যান্ত টেলিফোনও রেখে গেছেন এবং হেমাঙ্গর বাবা সেটা বহাল রেখেছেন। ফলে বহির্জগতের নানা কৌতূহল ও প্রশ্ন তাকে সময়ে অসময়ে ব্যতিব্যস্ত রাখে। পিসতুতো দিদি চারুশীলার আক্রমণ ওই টেলিফোনের মাধ্যমেই আসে সবচেয়ে বেশী।

রাত দশটায় হেমাঙ্গ অখণ্ড মনোযোগে ভি সি আর-এ একখানা সায়েন্স ফিকশনের ক্যাসেট চালিয়ে দেখছিল। ঠিক এই সময়ে চারুশীলার টেলিফোন এল।

কি রে! কী করছিস?

হ্যালো ব্রেন, আবার কিসের দরকার পড়ল?

তোর ঘরে কিসের শব্দ হচ্ছে বলতো! ভি সি আর চলছে নাকি? একা বাড়িতে বসে ব্লু ফিল্ম দেখছিস না তো!

তুই একটা অত্যন্ত বাজে মেয়ে, তা কি জানিস?

একটু হেসে চারুশীলা বলে, আহা, দোষের তো কিছু নয়। এখন বয়স হয়েছে, একা বাড়িতে থাকিস, ওসব তো হবেই বাবা। স্বীকার করলেই হয়। শুধু শুধু সাধু সেজে থাকা কেন বাপু?

তোর মতো সবাই রাদি মার্কা কিনা। আমি একটা সায়েন্স ফিকশন দেখছি।

আজকাল বেশীর ভাগ ইংরেজি ছবিতেই একটু পর্ণোগ্রাফি থাকে।

থাকলে থাকে। তোকে আমার মরাল গার্জিয়ান হতে হবে না।

আবার খিলখিল হাসি শোনা গেল।

হেমাঙ্গ গম্ভীর গলায় বলে, দেখ, রাত দশটার সময় ইয়ার্কি ভাল লাগে না। ছবিটা শেষ হলেই আমি শুতে যাবো। কাল অপিস আছে। তোর মতো বেলা নটায় ঘুম থেকে উঠলে আমার চলবে না।

তুই কিরকম কাজের লোক তো জানি। আমিও একটা দরকারেই ফোন করছি। মোটেই ইয়ার্কি নয় সেটা।

তাহলে ভ্যানতাড়া করছিস কেন? কী দরকার?

আচ্ছা, তোর একজন চেনাজানা হোমিওপ্যাথ আছে না? চৌধুরী না কী যেন!

আছে তো। কর্ণাদ চৌধুরী।

অ্যাপায়েন্টমেন্ট পাওয়া কি শক্ত?

দিন দশেক লাগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে। কেন?

আমার একটা বন্ধু আছে না, রিয়া, ওর একটু প্রবলেম হচ্ছে।

কী প্রবলেম?

মেয়েদের অনেক প্রবলেম থাকে। তাতে তোর কী দরকার?

যা বাবা! আমি তো সেফ অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্ট থেকে জিজ্ঞেস করলাম।

মুকু রূপার ছেলেমানুষদের অত ইটারেট ভাল নয়। যাকগে, কাল একটা আপয়েন্টমেন্ট করে দিবি? বিকেল ছটা সাড়ে ছঢা। নাগাদ?

রিয়া মানে সেই মোটাসোটা ফর্সা মতো না? যার হাজব্যান্ড একটু গেয়ো টাইপের, কিন্তু দারুণ কোয়ালিফায়েড!

হ্যাঁ। কিন্তু রিয়া মোটেই মোটা নয়। সলিড হেলথ।

একটু বেশী সলিড। তোর মতোই।

কী, আমি সলিড! জানিস, গত এক বছরে আমার ওজন দেড় কেজি কমেছে, দশ গ্রামও বাড়েনি!

দেখে তো তা মনে হয় না। স্বামী বেচারা হিল্লিদিল্লি করে মরছে আর বউ গ্যাট হয়ে বসে বসে খাচ্ছে আর মুটোচ্ছে। তোর মতো আইড়ল ব্রেনের অপদাৰ্থ মেয়েদের দেখে দেখেই আমার বিয়ের ইচ্ছেটা চলে গেছে।

আর তোকে দেখে বহু মেয়ে চিরকুমারী থাকবে বলে তৈরি হচ্ছে, তা জানিস? আমার বর হিল্লি দিল্লি করে বেড়ায় সেটা কি আমার দোষ? আমি তো বলেই দিয়েছি, অত টাকা রোজগারের কোনও দরকার নেই, এবার একটু বাড়িতে থাকো। যা আছে তাতেই আমাদের ঢের। কিন্তু পুরুষদের তো টাকার নেশা। আরও চাই, আরও চাই। এই যে তুই, মামার টাকার পাহাড়ের ওপর বসে আছিস, তাও টাকার গন্ধে গন্ধে কোথায় কোথায় ছোঁক ছোঁক করে বেড়াচ্ছিস। আজকাল তো শুনি গায়ে গঞ্জের ছোটো ছোটো ইস্কুলে অবধি অডিট করতে যাস। শুনে ঘেন্নায় মরে যাই।

একটা চড়াই পাখির মাথায় যেটুকু ঘিলু আছে সেটুকুও যদি তোর থাকত! জানিস তো, ভগবান খুব ইমপারাশিয়াল। যাকে বিউটি দেন তাকে ব্ৰেনটা দেন না, যাকে ব্রেন দেন তাকে বিউটি থেকে বঞ্চিত করেন। এরকমই। আর কি! তবে ব্ৰেন না থাকা খুব ভাল। ব্ৰেনলেসরাই জগতে সুখী। পাখির মস্তিষ্ক না হলে কেউ ভাবতে পারে যে, আমি টাকার লোভে গাঁয়ে অডিট করতে যাই?

তাহলে কোন যাস?

আমার রুদ্র্যাল লাইফ দেখতে ভাল লাগে, তাই যাই।

শেষে একদিন একটা গায়ের বঁধু এনে হাজির করবি নাকি? দেড় হাত গোমটার নিচে নোলক দুলবে, চোখে জ্যাবড়া কাজল, কনুই অবধি গয়না, পরনে রোলেক্স শাড়ি!

তবু তোদের চেয়ে ভাল। রাত হয়ে যাচ্ছে, ছাড়ছি।

ওরে দাঁড়া দাঁড়া। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টটার কী হবে?

কী আবার হবে! বলে দেখবখন।

দেখবখন বললে হবে না। কালকেই চাই।

হয়ে যাবে।

চেম্বারটা বদ্রীদাস টেম্পল স্ট্রিট না?

হ্যাঁ। তুই তো একবার গিয়েছিলি!

সে তো কবে! তিন বছর আগে।

তোর কথা শেষ হয়েছে?

না, না, শোন লোকটার ভিজিট কত?

জানি না। ষাট-টাট হবে। কেন, রিয়ার কি টাকার প্রবলেম?

না। তবে ওর মেয়ের একটি প্রাইভেট টিউটর আছে। ছেলেটা খুব ভাল। দারুণ পড়ায়। বোধহয় ছেলেটা এপিলেপটিক। জানিস তো, এপিলেপিসির কোনও চিকিৎসাই নেই। রিয়ার ইচ্ছে সেই ছেলেটাকেও নিয়ে যায়। ভিজিট বেশী হলে পেরে উঠবে না।

বেশী নয়। আমার রেফারেন্সে গেলে ভিজিট হয়তো নিতেই চাইবে না। তোরা মেয়েরা এত কিম্বুস কেন রে? প্রাইভেট টিউটরের চিকিৎসা করাতে চায় সেটা বেশ ভাল, জেসচার, কিন্তু ভিজিট বেশী হলে চিকিৎসা করাবে না। এটা কেমন কথা?

মেয়েরা হিসেব করে চলে বলেই স্বামীরা টিকে আছে।

বেশী বকিস না। নিজের শাড়ি, গয়না, সাজের জিনিস কেনার সময় স্বামীর টাকার মায়া করিস? ওই একটা ব্যাপারে মেয়েরা মোটেই কিম্বুস নয়।

তাহলে ভিজিট বেশী নয় বলছিস?

আমি খবর রাখি না। তবে কণাদকে বলে দেবোখন যেন প্ৰাইভেট টিউটরের ভিজিট না নেয়, আর রিয়ার ভিজিট যেন অবশ্যই নেয়।

ঠিক আছে বাবা, তাই হোক। রিয়া মোটেই বিনা ভিজিটে চিকিৎসা করাতে চাইছে না।

এবার কি কথা শেষ হয়েছে?

আর একটা কথা।

আবার কী?

একটা ফাস্ট ক্লাস মেয়ে আছে আমার হাতে। তোর সঙ্গে খুব মানাবে।

সে তো পুরোনো কাসুন্দি। তোর হাতে সব সময়েই পাত্রী মজুদ থাকে, আর তাদের সবাইকেই আমার সঙ্গে মানায়।

না মাইরি, এ মেয়েটা দারুণ ভাল।

ভাল না হওয়ার তো কারণ নেই। দুনিয়াতে বিস্তর ভাল মেয়ে আছে।

আমার একটা কি সন্দেহ হয় জানিস? তোকে কেউ দাগ দিয়েছে। কিন্তু কে যে দিল সেইটেই বুঝতে পারছি না। আগে তো সব কথা আমাকে বলতিস, আজকাল লুকোস। বলবি সত্যি কথাটা?

বলছি। আমাকে একজন ভীষণ দাগ দিয়ে গেছে। হল তো!

ইয়ার্কি রাখি। সত্যি করে বল না ভাই!

তুই যা শুনতে ভালবাসিস তাই তো বলছি।

আচ্ছা, তুই কি নারী বিদ্বেষী?

প্ৰবল রকমের। তোর মতো মেয়েদের দেখে দেখেই বিদ্বেষটা জন্মেছে।

আমার জন্য কত ছেলে পাগল ছিল তা জানিস?

জানি। পৃথিবীতে আহাম্মকদের সংখ্যাই বেশী। আমার ঘুম পাচ্ছে, এবার ছাড়ছি।

ওরে দাঁড়া, দাঁড়া। কাজের কথাটাই তো হয়নি।

আবার কিসের কাজের কথা?

শোন না পাগলা, কাল ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ব্যাপারে একটু প্রবলেম রয়েছে যে!

কিসের প্রবলেম?

কাল আমাদের অন্তু ড্রাইভার দেশে যাচ্ছে। গাড়ি চালাবে কে?

তার আমি কি জানি? অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন থেকে ড্রাইভার নিয়ে নে।

দূর পাগলা, বাইরের একটা অচেনা লোক গাড়িতে থাকলে কি ফ্রীলি কথা বলা যায়, বল! গাড়ি চড়ার আরামটাই মাটি হয়ে যায়। অন্তু থাকলে কথা ছিল না, সে পুরোনো লোক।

কী বলতে চাস খোলসা করে বলবি? অন্তু না থাক, তোর আর একটা গাড়ি আর তার ড্রাইভারও তো আছে।

ছাই জানিস। সেটা তো আমার কর্তা নিজে চালায়। গত সপ্তাহে আমস্টারডাম যাওয়ার আগে ড্রাইভারকে ছাড়িয়ে দিয়ে গেছে। আমাকে বলে গেছে, যেন এই অয়েল ক্রাইসিসে দুটো গাড়ি ব্যবহার না করি। ফলে ও গাড়ি এখন অস্পৃশ্য। কর্তা ফিরলে ফের চলবে।

তাহলে মানেটা কী দাঁড়াল?

মানে দাঁড়াল, কাল তুই একটু সকাল সকাল অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা আমার এখানে চলে আসবি। তোর সঙ্গেই আমরা দুই বান্ধবী ডাক্তারখানায় যাবো।

অসম্ভব! অসম্ভব!

অসম্ভব কথাটা কাদের অভিধানে থাকে তা জানিস?

বোকাদের। আমি তো বোকাই।

বোকা একটু আছিস, তবে সেটা ধরছি না। আসলে তুই হচ্ছিস কলকাতার সবচেয়ে ভাল দশ জন মোটর ড্রাইভারদের একজন। ইন ফ্যাক্ট তুই-ই হয়তো এক নম্বর।

তেল দিয়ে লাভ হবে না রে। আমি পারব না। কলকাতায় ট্যাক্সির অভাব নেই।

কী যে বলিস তার ঠিক নেই। পুরুষ ছাড়া শুধু মেয়েরা ট্যাক্সিতে চড়ে কখনও? যদি নিয়ে পালিয়ে যায়?

তোকে নিয়ে কেউ পালাবে না, যদি ঘটে তার বুদ্ধি থাকে। তুই হচ্ছিস যে কোনও পুরুষের গভীর লায়াবিলিটি। আর, কলকাতার ট্যাক্সিওলাদের অনেক দোষ থাকলেও মহিলা হাপিস করার বদনাম নেই। প্রতিদিন শয়ে শয়ে মেয়ে একা একটা ট্যাক্সিতে চড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে।

আমরা কি ওরকম? অতি সাহস আমার নেই। তা ছাড়া জায়গাটাও যে ভাল চিনি না। সেই কবে একবার গিয়েছিলাম। লক্ষ্মী, ভাই, তোর তো পরোপকারী বলে একটা নাম আছে।

আমি আজকাল তেল নিই না রে।

তেল নয়, তোর কিছু ভাল গুণ তো সত্যিই আছে। তোর কি আর সবটাই খারাপ?

সবটাই খারাপ এমন লোক দুনিয়াতে বিশেষ নেই। ওটা কোনও কমপ্লিমেন্ট হল না। আর তোর মতো দুমুকো লোকের কমপ্লিমেন্ট আমি নিইও না।

আমি দুমুখো লোক! আচ্ছা বেশ তাই হল। কিন্তু একটা ট্যাক্সিতে গিয়ে যদি আমাদের বিপদ হয় তো মামার কাছে মুখ দেখাতে পারবি? নিজের বিবেককেই বা কি বলবি?

তুই কলকাতা-চষা ঝানু মেয়ে, ন্যাকামি রাখ। তোকে যে-ট্যাক্সিওলা সীতাহরণ করবে। সে এখনও মায়ের পেটে।

কিডন্যাপ নয় না-ই করল, টাকা-পয়সা গয়নাগাটি কেড়ে নিতে পারে তো!

না, পারে না। বাজে কথার সময় নেই। ছাড়ছি।

আহা, শোন না কথােটা! ছেলেবেলায় তোর মনটা কত নরম ছিল ভোব তো। আমার একদিন স্কুল থেকে ফিরতে দেরী হয়েছিল বলে কেঁদে ভাসিয়েছিলি। মনে আছে, আর একটা কথা শোন, পিন্টুটাও সঙ্গে যাবে। ওর খুব ইচ্ছে তোর সঙ্গে যায়।

উফ, তোদের চক্রান্তে একটা ইনোসেন্ট বাচ্চাকেও টেনে নামালি! তোর মত…

আচ্ছা, আচ্ছা, তুই বরং পিন্টুর সঙ্গেই কথা বলে দেখ!

সে যে লড়াইয়ের হারছে তা হেমাঙ্গ বুঝতে পারছিল। কিন্তু করার নেই। চারুশীলার দুই সন্তানের মধ্যে বড়টি মেয়ে নন্দনা, ছোটোটি স্পন্দন বা পিন্টু। দুটিই সাহেব-বাচ্চাদের মতো সুন্দর। পিন্টুটা কোনও এক কার্যকরণে হেমাঙ্গর ভীষণ ন্যা ওটা। যখন দুধের শিশু ছিল তখনই আর কারও কোলে নয়, শুধু হেমাঙ্গ হাত বাড়ালে ঝাপ খেয়ে চলে আসত এবং আর কারও কাছে যেতে চাইত না। হেমাঙ্গ চারুশীলাকে বলত, দেখ, শিশুরা ঠিক মানুষ চেনে। ওরা হচ্ছে ভগবানের লোক, তাই নিষ্পাপ মানুষ দেখলেই তার কাছে চলে আসতে চায়। চারুশীলা বলত, তা নয় রে। ও আসলে তোর মধ্যে আর একটি অবোধ শিশুকেই দেখতে পায়, তাই আমন করে। তোর মাথাটা তো ডেভেলপ করেনি।

পিন্টুর বয়স এখন সাত আট হবে। আজিও ওর প্রতি হেমাঙ্গর এক প্রগাঢ় মায়া। আর পিন্টুও বড্ড ভালবাসে হেমু মুক্ত। পিটুর কথায় বরাবর হেমাঙ্গ দুর্বল। ফোনে পিন্টুর গলা পাওয়া গেল, মামা, আমি কাল তোমার সঙ্গে যাবো কিন্তু।

যাবে। কিন্তু তোমার মা যে একটি বিছু তা কি তুমি জানো?

হ্যাঁ। তোমার সজোগ রোজ ঝগড়া করে।

আমি ভাল লোক হওয়া সত্ত্বেও করে। এসব দেখে রাখে। বড় হয়ে একদিন বিচার কোরো। কেমন?

পিন্টু বুঝল না, তবু বলল, আচ্ছা।

ফোনটা রেখে দিয়ে হেমাঙ্গ ভি সি আর বন্ধ করল। ছবিটা আর দেখতে ইচ্ছে করল না। আগামী কাল তার দুদুটো এনগেজমেন্ট আছে। খুব গুরুতর কিছু নয়। একটা পার্টি, আর তার আগে একজন অসুস্থ ক্লায়েন্টকে নার্সিং হোম-এ দেখতে যাওয়া। দুটোই কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

মায়া জিনিসটা যে কী ভয়ংকর তা ঘুমোনোর আগে অনেকক্ষণ ভাবল হেমাঙ্গ। একথা নিশ্চিত যে সে বিয়ে করবে না। কিন্তু তার খুব ইচ্ছে হয়, পিন্টুর মতো নিষ্পাপ ও দেবদুর্লভ সৌন্দর্যের একটি ছেলে তার হোক। সে একবার চারুশীলাকে বলেছিল, পিন্টুকে দত্তক দিবি?

ইল্লি! দত্তক নিয়ে পাকাঁপাকি ব্যাচেলর থাকার ইচ্ছে? খুব তো স্বার্থপর দেখছি। বিয়ে করে নিজের ছেলের বাপ হ গে যা। পরের ছেলে নিয়ে টানাটানি কেন রে অলম্বুস?

অলম্বুস শব্দের মানে হেমাঙ্গ জানে না। জানার দরকারও নেই। হয়তো। ওটার কোনও মানে নেইও। চারুশীলার নিজস্ব ডিকশনারি আছে, তাতে এরকম বিস্তর শব্দ থাকে এবং যেগুলোর কোনও মানেই হয় না।

কিন্তু মায়া জিনিসটা ভাল নয়। একদম ভাল নয়। মায়াও একধরনের পরাধীনতা, এক ধরনের স্বাধীনতার অভাব, মুক্তির প্রতিবন্ধক। বাচ্চাদের সে খুব ভালবাসে। এই ভালবাসাটা কি একদিন তার কাল হবে?

পরদিন অফিসের পর হেমাঙ্গ যখন গাড়ি নিয়ে চারুশীলার বাড়িতে হাজির হল তখন আরও একটা মায়া তার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে হল ওই প্ৰাইভেট টিউটরটি।

রোগা, গোবেচারা ছেলেটাকে দেখলেই বোঝা যায়, এর ভিতরে গভীর ও গোপন অসুখ রয়েছে। তবু যেন বাঁচার এক প্রাণপণ ইচ্ছে এর দুখানা আয়ত চক্ষুতে এসে বাসা বেঁধেছে। সেখানেই দুটি পিন্দিমের মতো জ্বলছে এর সবটুকু প্ৰাণশক্তি। অস্বস্তিতে, লজ্জায়, হীনম্মন্যতা ছেলেটা নুয়ে পড়েছে। কৃতজ্ঞতায় ছলছল বরছে চোখ। কেননা তাকে এরা নিজেদের পয়সায় চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাচ্ছে। তাও আবার গাড়িতে করে। এই বিরল সৌভাগ্যে তার যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না।

কয়েক মিনিট কথা বলেই ছেলেটাকে ভারী ভাল লাগতে লাগল, হেমাঙ্গর। গরিব, দীনভাবসম্পন্ন, নিরহংকারী লোকেরাই কি ঈশ্বরের চিহ্নিত মানুষ? কে জানে, হতেও পারে। এ ছেলেটার কাছে বসলে একটা ভাল অনুভূতি হয়। যেটা অধিকাংশ মানুষের সান্নিধ্যে হয় না।

সাজগোজ করতে চারুশীলা সময় নেয়। আজও নিল। তারপর যখন বন্ধু রিয়া আর ছেলে পিন্টুকে নিয়ে বেরিয়ে এল তখন ঘর একেবারে মাতোয়ারা হয়ে গেল নানা সুগন্ধে।

নাক কুচকে হেমাঙ্গ বলে, ইস। তোকে যে ডাক্তারখানায় ঢুকতেই দেবে না।

চারুশীলা ফোস করল, ইস! কেন দেবে না শুনি?

হোমিওপ্যাথি, ওষুধ দারুণ সেনসিটিভ। উগ্ৰ গন্ধে তাদের গুণ নষ্ট হয়ে যায়।

যাঃ, বাজে বকিস না।

রিয়া কিন্তু একটু অস্বস্তিতে পড়ে বলে, হ্যাঁ, আমিও কিন্তু ওরকম কথা শুনেছি। কী হবে এখন!

চারুশীলা ধমকের গলায় বলে, ওর কথায় নাচিস না তো। ওটা এক নম্বরের পাজি। লোককে ভড়কে দেওয়াই ওর হবি।

হেমাঙ্গ গম্ভীর থেকেই বলে, আজ তোর কপালে অপমান লেখাই আছে। কণাদ নিশ্চয়ই তোকে বের করে দেবে চেম্বার থেকে। বিদেশ থেকে গুচ্ছের সেন্ট আনিয়ে মাখছিস, তোর আক্কেল নেই? এত সেন্ট মাখলে অন্য সব গন্ধ পাবি কি করে? ফুলের গন্ধ, ফলের গন্ধ, খাবারের গন্ধ, শিশুর মুখের গন্ধ এসবই তো তোর অজানা থেকে যাবে!

চারুশীলা চোখ পাকিয়ে বলল, থামবি? আমাকে আর গন্ধ চেনাতে হবে না। যা একখানা শহরে বাস করি, ম্যাগো, ডাস্টবিনের গন্ধ, পচা ইঁদুরের গন্ধ, ডিজেলের গন্ধ গা গুলিয়ে দেয়। উনি এসেছেন গন্ধ নিয়ে বক্তৃতা দিতে।

গাড়িতে সামনের সীটে হেমাঙ্গর পাশে চয়ন বসল, জানালার ধারে পিন্টু। পিছনে কলরবমুখর চারুশীলা আর রিয়া।

গাড়ি চালাতে চালাতে হেমাঙ্গ নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, আপনার প্রবলেমটা কি? এপিলেপসি?

চয়ন মাথা নেড়ে বলে, না না। এপিলেপসি নয়।

তাহলে?

একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়। কুয়াশার মধ্যে একটা ট্রেন ঝিক ঝিক করতে করতে এগিয়ে আসে। তখন আমার বা হাতের বুড়ো আঙুলটা নড়তে থাকে। আর তারপর…

তারপর?

আমার আর কিছু মনে থাকে না।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি নামল। ওয়াইপারটা চালু করে হেমাঙ্গ বলল, অজ্ঞান হয়ে যান?

হ্যাঁ। কিন্তু সেটা ফিটের অসুখ বলে আমার মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, ওই ট্রেনের শব্দটা না হলে আমিও আর অজ্ঞান হবে না। কেন যে শব্দটা হয়! আপনি জানেন?

দুনিয়ার কতটুকুই বা আমরা জানি? বাড়ি থেকে আপনার কোনও চিকিৎসা হয়নি?

একটু দোনোমানো করে চয়ন বলে, হয়েছে। লাভ হয়নি।

অ্যালোপ্যাথি না হোমিওপ্যাথি?

দুরকমই। মাদুলি-টাদুলিও দেওয়া হয়েছিল।

কখনও ব্যায়াম বা আসন-টাসন করেছেন?

আমি পারি না। শরীরে দেয় না। আমি ভীষণ দুর্বল।

অনেক সময়ে আসন করলে সারে।

চয়ন বিনীতভাবে চুপ করে থাকে। বড় কাটা হয়ে বসে আছে। এয়ার কন্ডিশনার চলছে বলে কাচের গায়ে ভাপ জমে যাচ্ছে। বাইরে বৃষ্টির তোড় বাড়ছে।

বাড়িতে কে কে আছে?

চয়ন যেন একটু সচকিত হয়ে বলে, মা দাদা বউদি।

কে আর্নিং মেম্বার?

দাদা।

দাদা কোথায় চাকরি করে।

একটা ব্যাংকে।

বাবা নেই, না?

না। আমার দশ বছর বয়সে মারা যায়।

বাড়িটা কি নিজেদের?

আবার একটু দোনোমোনো করে চয়ন বলে, বাড়ি দাদার।

বুঝেছি।

পিছন থেকে চারুশীলা বলে, এই উদ্ভট, ঠাণ্ডা লাগছে, এয়ারকুলারটা বন্ধ করে দে।

দিচ্ছি। কিন্তু এগুলো লোকের শ্বাসের দূষিত বায়ু বেরোবে কি করে? জানালা খোলা যাবে না, বৃষ্টি হচ্ছে।

তোর দিকের জানালা একটু ফাঁক করে রাখ, তাতেই হবে।

সেলফিস আর কাকে বলে!

হেমাঙ্গ এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ করে নিজের দিকের জানালার কাচ একটু নামিয়ে দিয়ে বলল, ব্যাচেলরদের সবাই এক্সয়েট করে।

তুই আবার ব্যাচেলার কিসের? এক ফেঁটা তো বয়স। বিয়ের যুগি আগে হ, তারপর ব্যাচেলর কপচাবি।

কাল তো তুই-ই একটা পাত্রীর খবর দিলি।

ওরকম দিদিরা করেই থাকে। বিয়ের কথায় বেসামাল হয়ে আবার গাড়ি কোথাও ভিড়িয়ে দিস না। এত ঝাঁকুনি লাগছে কেন?

কলকাতার রাস্তা তো আর আমার বানানো নয়।

দেখে চালা। যা বকবক করছি তখন থেকে। গাড়ি চালানোর সময় অত কথা কিসের?

বকবক তুইও কি কিছু কম করছিস?

করছি বেশ করছি। আমি তো আর গাড়ি চালাচ্ছি না।

বেশী মেজাজ দেখাবি তো গাড়ি থামিয়ে নেমে কোথাও চলে যাবো।

আচ্ছা বাবা, বকবক করতে করতেই চালা। রিয়া জানতে চাইছে কণাদ চৌধুরী কি বিলেত-ফেরত?

হ্যাঁ। জার্মানি আর আমেরিকাতেও ছিল। বলে হেমাঙ্গ চয়নের দিকে তাকিয়ে বলল, বাঁ হাতটা অমন চেপে ধরে আছেন কেন? সামথিং রং।

ক্লিষ্ট মুখে ভয়াতুর চয়ন বরে, সেই রেলগাড়ির শব্দটা হচ্ছে। বড্ড কুয়াশা। মাই গড্‌।

০১১. কাল রাতে বামাচরণে আর রামজীবনে

কাল রাতে বামাচরণে আর রামজীবনে তুমুল হয়ে গেছে। সে এমন ব্যাপার যে মনেই হয়নি এরা ভদ্রলোকের ছেলে। ও একে আর এ ওকে শুয়োরের বাচ্চা, খানকীর বাচ্চা থেকে শুরু করে এমন সব গালাগাল দিয়েছে যা সহোদয় ভাইরা পরস্পরকে দিতে পারে না। মুখে মুখে যতক্ষণ হচ্ছিল ততক্ষণ একরকম ছিল, তারপর দুজনেই একজন দা আর একজন টাঙ্গি নিয়ে উঠোনে নেমে পড়ল। বউ দুটো আর নয়নতারা প্ৰাণপণে চেঁচাচ্ছিল। নয়নতারা ভয়ে আর বউ দুটো রাগে। লোকজন যারা জুটেছিল তারাই শেষ অবধি খুনোখুনি হতে দেয়নি। উঠোনে যখন এ কাও চলছিল তখনও বারান্দায় জলচৌকিতে বিষ্ণুপদ ঝুম হয়ে বসা। নড়াচড়া নেই, ঝগড়া থামানোর উদ্যোগ নেই। বিষ্ণুপদর ভিতরটা কি মরে পাথর হয়ে গেছে? বিষ্ণুপদ নিজেই সেটা বুঝতে পারে না।

গাঁয়ের মাতব্বররা এসে বিষ্ণুপদকে বলল, এর একটা বিহিত তো করতে হবে বিষ্ণুখুড়ো! সম্পত্তি ভাগ করে দিচ্ছেন না কেন?

বিষ্ণুপদ নিস্তেজ গলায় বলল, ভাগ তো ওরাই করে নিয়েছে। আর ভাগের কী?

রাজু হালদার বলল, ভাগের কাগজপত্র নকশা না থাকলে ভাগের মূল্যটা কী বলুন। বামাচরণের জমির মধ্যেই তো রান্নাঘর তুলে ফেলল রমজীবন। তা হলে আইনটা কী হবে?

এত লোক সোরগোল করছিল যে, বিষ্ণুপদ মাথাটা ভাল কাজ করছিল না। তবে এ কথা ঠিক যে, আজ দুপুরে হঠাৎ ইরফান মিস্ত্রিকে দিয়ে পশ্চিম দিকে একটা ছোটো ঘর গাঁথিয়ে ফেলছিল রামজীবন। তখনই বামার বউ শ্যামলী বেরিয়ে এসে চেঁচিয়েছিল, এটা কী হচ্ছে? ও তো আমাদের ভাগের জমি, ওখানে ঘর তুলছেন কেন?

রামজীবন প্রথমটায় জবাব দেয়নি, শুধু ইরফানকে তাড়া দিচ্ছিল ঘরখানা ঝটিতি বানিয়ে ফেলতে।

শ্যামলী তখন থাকতে না পেরে সোজা গিয়ে ইরফানকে এক ধাক্কা মেরে বলেছিল, খবদার আর একটাও ইট গাঁথবেন না। তাহলে খারাপ হয়ে যাবে।

আর তখন রামজীবন চোখ রাঙিয়ে উঠেছিল, চোপ মাগী।

শ্যামলী তার দেওরের দিকে ফিরে বলেছিল, অতই যদি মুরোদ তবে উনি বাড়ি থাকতে ঘর তোলেননি কেন? যেই উনি বেরিয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে ঘর তুলে ফেলছেন! মহা শয়তান তো আপনি!

সেই থেকে ঝগড়া চলছে।

শ্যামলী একবার এসে বিষ্ণুপদকেও বলেছিল, আপনি ঠুটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছেন যে বড়! আপনার চোখের সামনে এত বড় অন্যায়টা হয়ে যাচ্ছে দেখেও চুপ করে বসে আছেন! মুখে কি পুটিং ঠেসে দিয়ে গেছে কেউ? না কি গুণধর ছেলের পাকা ঘরে থাকবেন বলে সব অন্যায় মেনে নিচ্ছেন?

বিষ্ণুপদর মুখে কোনও জবাব এল না। মাথাটা বড় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তার চোখের সামনে বহু অন্যায় বহুবার হয়ে গেছে, বিষ্ণুপদর মুখে একটিও প্রতিবাদ কেউ শোনেনি। শ্যামলীর দিকে বিষ্ণুপদ শুধু চেয়ে ছিল।

নয়নতারা এসে পক্ষিণী যেমন শাবককে আড়াল করে তেমনি করেই বিষ্ণুপদকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল, ওঁকে এর মধ্যে টানছো কেন বউমা? এ লোক তো সাতে-পাঁচে থাকেনি কখনও। ভীতু মানুষ। ও সব তোমাদের গণ্ডগোল, তোমরা বুঝে নাও।

আহা, ন্যাকা! কিছু বোঝে না! ভীতু! অমন ছেলের জন্ম তাহলে দিল কি করে?

নয়নতারা বিষ্ণুপদকে বলল, যাও তো, জলচৌকি হাতে করে নিয়ে গিয়ে জামতলায় বসে থাকো তো। বাড়িতে থাকার দরকার নেই।

ভাগ্যিস বৃষ্টিটা তখন ছিল না। বিষ্ণুপদ গুটি গুটি গিয়ে বাইরের জামতলায় বসে রইল। কিন্তু গায়ে গু মাখলেই কি যমে ছাড়ে? সন্ধেবেলাতক বসে থেকে যখন বিষ্ণুপদ ঘরে এল তখনও উঠোনে দাপাচ্ছে শ্যামলী, বিস্তার বউ-ঝি কাছাবাচ্চা, দু-চারটে উটকো লোকও জুটে গেছে মজা দেখতে। রামজীব বাড়িতে নেই। ইরফান কাজ বন্ধ রেখে চলে গেছে। তবে রান্নাঘরের দেয়াল চারটে প্রায় ছাদ অবধি গেঁথে ফেলেছে।

বামাচরণ ফিরল সন্ধের কিছু পর। ফিরতেই শ্যামলী এমন চেঁচিয়ে উঠল যেন তার নিকটজন কারও কাল হয়েছে। বামাচরণ এক সরকারী অফিসে পিওনের কাজ করে। সে খুব ফিকিরের লোক, দালালি-টালালি কিসের যেন একটু বাড়তি দুপয়সা আয় আছে। তবে সে সব সে কখনও ফাস করে না। এক বাড়িতে থেকেও, এক হাঁড়ি হয়েও তারা খুব আলগোছ হয়ে থাকে। তবে হাঁড়ি আর এক রাখা যাবে না, বিষ্ণুপদ বুঝতে পারছিল। এক থাকলেই কি আর আলাদা হলেই বা কি? বিষ্ণুপদর আর যে সব ভেবে কাজ নেই।

ঝগড়াটা জস্পেশ করে লাগল সন্ধের পর। রামজীবন একটু মাতাল হয়েই রোজ ফেরে। আজও ফিরল। সে গ্রিতেই বামাচরণ লাফ দিয়ে উঠোনে নামল। তারপর দুজনে গঙ্গাজলের মতো গালাগাল দিতে লাগল দুজনকে। তারপর খুনখুনির জোগাড়।

বিষ্ণুপদ মাতব্বরদের কথার খেই ধরে বুঝতে পারছিল, তারা বামাচরণের পক্ষে। কাজটা অন্যায় হয়েছে।

রাজু হালদার বলল, আপনার চোখের সামনেই অন্যায্য ব্যাপারটা হয়ে গেল, এটা কেমন কথা? বামাচরণ কি আপনার ছেলে নয়? আমাদের একটা খবর দিলেই আমরা এসে মীমাংসা করতাম।

রামজীবনকে তার ঘরের কাছে কয়েকজন ঘিরে রেখেছিল। সেখান থেকেই সে গলা তুলে বলল, কোনও হারামীর বাচ্চার সালিশ মানব না। শালারা মাতব্বরী দেখাতে এসেছে! আবে এই খানকীর ছেলে রাজু, আমার বাবাকে চোখ রাঙাচ্ছিস কেন রে? বাপের ব্যাটা হয়ে থাকলে আমাকে চোখ রাঙাবি আয়! চোখ গেলে দেবো।

বিষ্ণুপদ টের পেল, মাতব্বরদেরও আর সেই দিন নেই। রামজীবন হুমকিতে রাজু থিতিয়ে গেল।

ঘর তুলেছি বেশ করেছি। বুকের পাটা থাকলে একটা ইটও খসিয়ে দেখ, দেখ খসিয়ে কী হয়।

রাজুর বয়স পঞ্চাশের ওপর। এক সময় গায়ের রাজনীতিতে বেশ নামডাক ছিল। এখন আর সেসব নেই। লোকেও তেমন মানে না। আগে এই রাজুরই কত হাঁকডাক ছিল। বিষ্ণুপদ একটু কষ্টই হল রাজুর জন্য।

রাজু বিষ্ণুপদকে বলল, শুনলেন রামজীবনের কথা? ওর যদি এরপর একটা বিপদ হয় তখন কিন্তু আমাদের দুষবেন না। রামজীবন কিন্তু খারাপ সংসর্গে পড়েছে।

বেশ চাপা গলায় বলল, যাতে রামজীবন শুনতে না পায়। রামজীবন অবশ্য শুনতে পেল না, কারণ সে নিজেই চেঁচিয়ে মাতব্বরদের চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করছিল।

বামাচরণ তার দাওয়া থেকে নেমে এসে বিষ্ণুপদকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে রাজুকে বলল, এই শালা বুড়োর জন্যই যত গণ্ডগোল বুঝলেন রাজু দাদা? কবে থেকে বলে আসছি, বাবা, বাড়িটা বাগজোখ করে বেড়া তুলে দাও। শালা বসে বসে। ঝিমোয় আর কঁড়ি কড়ি খায়। গা করে না। কেন করে না জানেন? ওই হারামজাদা রেমো ওকে হাত করেছে। রামজীবন ছাড়া উনি চোখে অন্ধকার দেখেন।

বামাচরণ বাপকে শালা বলাতেও কেউ তেমন কোনও আপত্তি করল না। শুধু কে যেন—লুণ্ঠনের আলোয় মুখটা ভাল দেখা গেল না—বিড়বিড় করে বলল, ওভাবে বলছে কেন? ওভাবে বলা কি ঠিক?

বিষ্ণুপদর অবশ্য রাগ-টাগ হল না। কোনওদিনই হয় না। বামাচরণ হয়তো ঠিকই বলে।

বামা চেঁচাচ্ছিল, কেন এই খচ্চর বুড়ো রামজীবনের পক্ষ নেয় জানো? রামজীবন পাকা ঘর তুললে সেখানে আরামসে। থাকবে সেই লোভে। রামজীবন লুচি খাওয়ায়, রসগোল্লা খাওয়ায়, মাঝে মাঝে জামা জুতো দেয়; আর সেই সঙ্গে যত কু পরামর্শ দেয়।

ওপাশ থেকে রামজীবনও কী যেন বলে উঠল।

বিষ্ণুপদর হল গণ্ডারের চামড়া। সে শুধু অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে ওপাশে রামজীবনের ঘরখানার দিকে চেয়ে রইল। বড় তাড়াতাড়ি কাজ হচ্ছে এখন। একটু বেশী তাড়াতাড়ি কি?

আর এক মাতব্বর কপিল ঘোষ বলল, আচ্ছা খুড়ো, আপনার বড় ছেলে কৃষ্ণজীবনের তো আর এই গাঁয়ের বাড়ির ভাগ দরকার নেই। তা তার ভাগেরটা এদিকে বাঁটোয়ারা করে দিলেও তো হয়।

সতীশ পাল মাথা নেড়ে বলে, আইন জানোনা বলে বলছো। সে বা তার পুত্ৰ পৌত্ৰাদি কেউ দাবি তুললে তো ছাড়তেই হবে বাপু। তার ওপর মেয়েদের ভাগের কথাটা ধরছে না কেন? জমি পুরো কুড়ি কাঠাও নয়। ছভাগ করতেই হবে।

ভাগজোখের কথায় বিষ্ণুপদ ফের ভাবনায় পড়ে গেল। ভাগের বড় জ্বালা। ভাগ করতে করতে একশ বছর পর থাকবেই বা কি?

সতীশ পাল বলে উঠল, রামজীবনের রান্নাঘর সরাতে হবে। না সরাতে পারলে জমির দাম ধরে দিক। বখেরা মিটে যাবে।

রামজীবন ওপাশ থেকে চেঁচিয়ে বলে, যে গু-খেগোর ব্যাটা এ কথা বলে তার মুখে পেচ্ছাপ করি, পেচ্ছাপ। বুঝলে! জমি এখনও বাবার। কোন শালাকে মূল্য ধরে দেবো?

খুব হতে লাগল তুমুল সব কাণ্ড। বিষ্ণুপদ শুনল, শব্দের পর শব্দ, আরও শব্দ। এ সব শব্দের যেন ঠিক মনে হচ্ছে না। এ সব যেন ফাঁকা কার্তুজের আওয়াজ।

একটু রাত হচ্ছিল। আরও গড়াত। হঠাৎ একটা ভেজা হাওয়া ছাড়ল। জয়ঢাকের শব্দ তুলল মেঘ। আর তারপর তেরচা ঘাটের বল্লমের মতো বৃষ্টি নেমে এল। দুনিয়াকে গেঁথে ফেলতে লাগল যেন। লোকজন সব বেমালুম গায়েব হয়ে গেল ভেজাবাজির মতো। দাওয়ার দু-তিনজন শুধু গা বাঁচিয়ে বসে থেকে কিছুক্ষণ পর ভিজেই রওনা হয়ে গেল।

তারপরই নয়নতারা এসে হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল বিষ্ণুপদকে।

 

আজও রোদ নেই। মাঝে মাঝে ছাড় হ্যাড় করে বৃষ্টি হচ্ছে। থামছে। আবার হচ্ছে। রামজীবনের কাঁচা সিমেন্ট ধুয়ে যাচ্ছে। ইরফান আসেনি।

আজ সকাল থেকে বাড়িটা বড় নিঝুম। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঘুলিয়ে উঠছে, পাকিয়ে উঠছে কত আক্রোশ, রাগ; তবে বাইরেটা আজ ভারি নিঝুম। যে কোন সময়ে হঠাৎ বোমা ফাটানোর মতো ধুন্ধুমার লেগে যেতে পারে। দুছেলের কেউ বাড়ি নেই। শ্যামলী সকাল থেকে ঘরের বার হয়নি। সবই দেখছে বিষ্ণুপদ। দেখে যাওয়া ছাড়া তার কী কাজ।

বিষ্ণুপদর ঘড়ি নেই। কটা বাজে জানে না। কিন্তু সে ঠিক টের পায়, এইবার নয়নতারা একবার আসবে। এসে দেখে যাবে তাকে। কিছুক্ষণ পর পর এসে তাকে একবার করে দেখে যায় এই কদিন হল। বুড়িটার প্রাণে ভয় ঢুকেছে, বুড়োটা কখন টুকুস করে মরে যায়। এই কালঘড়ি দেখার পর থেকেই ভয়টা খুব ধরেছে বুড়িকে। মানুষের শশাকের একটা বড় কারণ হল, একা হয়ে যাওয়া। বিষ্ণুপদ চলে গেলে বুড়িটা খুব একা হয়ে যাবে। বড্ড আতান্তরে পড়ে যাবে।

ভয়-ডর আরও কত আছে। কাল রাতে যখন দু ভাই সুন্দ উপসুলের লড়াই করছিল তখন বুড়ি ভয়ে সেঁদিয়েছিল ঘরে। ঠাকুর দেবতার কাছে মাথা কুটছিল। কাল রাতে তারা বুড়োবুড়ি কেউ ঘুমোতে পারেনি। নয়নতারা বিস্তর কেঁলেছে। মেলা দুঃখের কথা বলেছে।

নয়নতারার বাবুগিরি হল তামাকপাতা দিয়ে পান খাওয়া। কলাইকরা একখানা বাটিতে তার পান সুপুরি চুন আর খয়ের থাকে ছোটো ছোটো কৌটোয়। সেই বাটিখানা হাতে করে নয়নতারা ঘর থেকে বেরিয়ে নিঃসাড়ে কাছে এসে উবু হয়ে বসল। বর্ষাকালে পান বেজায় সস্তা, তবু ভারি কৃপণের মতো এখানা পানের একটুখানি ছিঁড়ে নিয়ে তাতে চুন দেয়। সুপুরিগাছ বাড়িতেই আছে কয়েকটা। ভাগজোখ হয়েও যা পায় তাতে নয়নতারার বছর চলে যায়। কিন্তু কিছুটা বিক্রি করে দিতে হয় বলে নয়নতারা সুপুরি খায় এক চিমটি। দাঁতের জোর নেই বলে ছছাটো হামানদিস্তায় ফেলে ঔড়ড়া করে নেয়। তাতে খরচাও হয় কম। এক চিলতে কাঁচা তামাকপাতা ঠেসে মুখে পানটা পুরে দেয়। অনেকক্ষণ পানটা মুখেই থেকে যায়, রসস্থ হয়। সারা দিন ওই জিনিসই নয়নতারাকে চাঙ্গা রাখে।

পান সাজা থেকে মুখে দেওয়া অবধি লক্ষ করল বিষ্ণুপদ। দেখতে বেশ ভাল লাগল। কত যত্নে টুকটুক করে ভালবেসে পানটা সজল নয়নতারা! পানের মধ্যেই যেন ওর প্রাণভোমরা।

কিছু বলবে বলে মুখটা তুলল বুড়ি। বিষ্ণুপদ চেয়েই ছিল। একটু হাসল।

নয়নতারা হাসল না। বলল, শ্যামলী আজ ঘর থেকে বেরোলো না। দেখলে?

দেখলাম।

আবার লাগবে বোধ হয়।

তা লেগে যাবে।

রামজীবনের ওই পাকাবাড়িটাই অপয়া। ওটা যখন উঠতে শুরু করল তখন থেকে অশান্তি।

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, শান্তি আবার কবে ছিল?

শ্যামলী বলে, বীণাপাণি নাকি নটী হয়ে গেছে। লাইনে নেমেছে। খারাপ খারাপ সব কথা। আমি বলি কি, পাঁচজনের কাছে না শুনে একবার নিজেই খবর নাও না। যাত্রায় নামা কি ভাল?

হঠাৎ বীণার কথা উঠছে কেন?

কাল রাতে তাকে নিয়ে একটা খারাপ স্বপন দেখেছি। কী সব যেন দেখলুম, ভাল মনে নেই। কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেল।

বিষ্ণুপদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ভাল খবর কি আর পাবে? অজান থাকাই তো ভাল।

তুমি এমন করে বলো যে, ভয় খেয়ে যাই।

আর ভয় কিসের! ডাক এসে গেছে। মনটা তুলে নাও।

তুমি ওরকম বোলো না তো!

তোমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য বলিনি। আমার কি মনে হয় জানো, ওরা সব আমাদের চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধিবিবেচনাওলা মানুষ। আমরা কি দুনিয়াটাকে বুঝি? যা সব ঘটে যাচ্ছে চারদিকে তা বুঝি? এই হাবলা-ভ্যাবলা মাথায় কি সব সেখোয়? আমাদের চেয়ে ওরা বোঝে অনেক ভাল। তা ওরাই দুনিয়াটাকে বুঝে-সুঝে নিক না। আমাদের আমল তো এটা নয়।

সে কথা ঠিক। তবে ভয় হয়, যদি নষ্ট পায়।

সেটাও ওরাই বুঝবে। নষ্ট কি ভাবে পায় তা কি তুমি জানো, নাকি আমিই জানি।

কিন্তু ও কথাও বলি, বীণার বিয়েটা তুমি ভাল দাওনি। নিমাই কি আর তেমন ছেলে? খাওয়াতে পরাতেই তো পারে না। পেটে টান না পড়লে বীণা কি আর যাত্রায় নামত?

ওই কথাই তো বলি, আমি বড় আহাম্মক। তাই আজকাল ভয়ে আর রা কড়ি না। মুখ খুললেই কত কি ভুলভাল বলে ফেলব। বীণার বিয়েটাও তো ওই আহাম্মকিই হল কি না। ছেলেটা দেখলুম বড় সৎ। মা-বাপের ওপর অগাধ ভক্তি। ওই দেখেই বুকটা নেচে উঠল, এ আমলে তো এ জিনিস মেলে না। কিন্তু এখন বুঝি, কত বড় বোকার মতোই কাজটা হল। মেয়ে হয়তো আমাকে কত শাপশাপান্ত করে।

আজ আমার বীণার জন্য বড় মনটা খারাপ লাগছে। স্বপন দেখা ইস্তক বুকটা ভার।

তাহলে একবার রামজীবনকে বলো। যে তো এধার ওধার ঘোরাফেরা করে। সে গিয়ে খবর এনে দেবেন।

সে কি আর এখন যেতে চাইবে? ঘর উঠছে, সে এখন ঘরের নেশায় বুদ। হা-টাকা জো-টাকা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে নড়ানো যাবে না।

তাও বটে।

আমি বলি কি, আমরা বুড়োবুড়ি তো অনেককাল ভিটে আকড়ে পড়ে আছি, কোথাও যাই-টাই না। তা একবার যাবে নাকি বনগাঁ? বুড়োবুড়ি মিলে যাই চলো। বেশী দূর তো নয়।

বিষ্ণুপদ হাসল, সে আর বেশী কথা কি! কিন্তু তোমাদেরই তো কিসে যেন বাধে। ছেলেপুলে না হলে নাকি মেয়ের বাড়ি যেতে নেই!

ও বাবা! তাই তো! মনে ছিল না কথাটা। তা হলে একখানা পোস্টকার্ড লিখে দাও, পটল আজই ডাকে দিয়ে আসবে। রিপ্লাই কার্ডে দিও। পটলকে পাঠাচ্ছি পোস্টকার্ড আনতে।

পাঠাতে হবে না। আমার কাছে একখানা জোড়া পোস্টকার্ড আছে। লিখে দিচ্ছি।

তাকে আসতে লিখো একবারটি। বড় দেখতে ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে।

লিখবখন। তবে এই অশান্তির মধ্যে এসে তার তো তেমন সুখ হবে না।

তবু আসুক। নিমাইকে নিয়েই যেন আসে।

সব দিক বুঝে-সুঝে বলছে তো!

বুঝবার আবার কি আছে! সেই কবে একবার এসেছিল, বছর চারেক হবে বোধ হয়। মুখখানাই তো ভুলতে বসেছি। আর বুঝঝ দরকার নেই, মনটা বড় খারাপ। একবার আসুক। তোমার তাকে দেখতে ইচ্ছে হয় না?

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না। আমি বড় একা হয়ে গেছি। কেবল মনে হয় আমার আর কেউ নেই।

বলে কি গো! সর্বনেশে কথা যে!

থেকেও কি আছে! তুমিই বলো। ওরা কি আর আমার তোমার? ওরা সব নিজের নিজের। কাউকে আপনার জন ভাবতে পারি না। কৃষ্ণজীবনের কথা ভাবো তো একবার!

তার কথা আবার কি ভাবব?

ভাবো। ভাবলেই বুঝবে।

তুমিই বুঝিয়ে দাও না! জানো তো আমার মাথা নেই।

কৃষ্ণজীবন তো আমাদেরই ছেলে, নাকি?

তবে কার ছেলে?

তাকে কি আমাদের ছেলে বলে মনে হয়? সে যদি রামজীবন বা বামাচরণের মতো হত তাহলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক হত। তা তো হল না। কত বিদ্যে শিখে সে এক লাফে কোথায় উঠে গেল। বিলেত-আমেরিকা অবধি ঘুরে আসছে। দুনিয়া-জোড়া নাম। এটা কেমন হল বলো তো! আমাদের ছেলের কি এ রকম হওয়ার কথা? আমরা দুটো বোকাসোকা মেয়েপুরুষ, আমাদের ছেলেপুলেরা তো আমাদের মতোই হবে নাকি! তা তো হল না কৃষ্ণজীবন!

লোকের পাঁচটা ছেলে কি একরকম হয়?

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, না। কিন্তু কেন হয় না তাই তো বুঝি না। রামজীবন, বামাচরণ এরাও কি আর আমাদের ছেলে? তুমি তো জানো, জীবনে আমার সঙ্গে কারও ঝগড়াঝাটি হয়নি, মুখে একটাও দূষিত কথা উচ্চারণ করিনি, কাউকে গালাগালি অপমান করিনি। রামজীবন বা বামাচরণ তাহলে ওরকম করে কি করে?

সে কপালের দোষে।

তাই হবে। আমি ভেবে দেখেছি, ছেলেপুলে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কোনও লাভ নেই। আমরা তো আর তৈরি করিনি ওদের, আমাদের ভিতর দিয়ে জন্মেছে। যার যার নিজের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন আর ওদের নিয়ে ভেবে কি লাভ?

ভাবনা কি ছাড়ে।

আমাকে তো ছেড়েছে। যখনই কৃষ্ণজীবনের কথা ভাবি তখনই বড় অবাক লাগে। আমার প্রাইমারি ইস্কুলে পড়ানোর বিদ্যে, বিষয়বুদ্ধি নেই, তেমন বড় কোনও বাবু-মানুষ এসে দাঁড়ালে কথা কইতে ভয় খাই। সেই আমার ছেলে ওরকম বাঘা বিদ্বান হয়ে ওঠে কি করে? এ যে অশৈলী কাণ্ড! আর সে অমনধারা হয়ে উঠল বলেই তো এদের সঙ্গে বনল না। একরকম মেরেরে তাড়াল তাকে।

পুরনো কথা তুলে কি লাভ? তুমি কি বসে বসে ও সব ভাবো?

দুটো জিনিস খুব ঘোরাফেরা করে মনের মধ্যে। একটা হল কৃষ্ণজীবনের কথা। ইদানীং খুব তার কথা মনে হয় আর বড় অবাক লাগে। আর দু নম্বর হল রামজীবনের ওই বাড়িটা। কেন যে মনে হয়, ওই বাড়িটা যেই শেষ হবে অমনি আমার ঘড়ির সময় ফুরোবে।

সর্বনেশে কথা! তাহলে ওই অলক্ষুণে বাড়ি এখনই বন্ধ করে দিতে বলি।

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, বোলো না। ও সব আবোল তাবোল ভাবনা, ওর মধ্যে কোনও সার নেই। মন হচ্ছে এক নিষ্কৰ্মা মানুষ, সারাদিন অকাজ করে যাচ্ছে। দুনিয়াতে যারা বড় মানুষ তাদের মন হল বিশ্বকৰ্মা। কত কী ভাবছে আর করে ফেলছে। সেই জন্যই তো দুনিয়ায় কত অশৈলী কাণ্ড ঘটছে। আকাশে এরোপ্লেন উঠছে, চাঁদে মানুষ যাচ্ছে, লোকে টিভি দেখছে ঘরে বসে। ও সব তো আমার মতে বোকাসোকা মানুষের কর্ম নয়। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বেঁচে আছি মাত্র। নাড়ী চলছে, বুক ধুকধুক করছে, খাচ্ছি হাগছি, এইমাত্র। বিষ্ণুপদ থাকলেই কি, গেলেই কি। দুনিয়ার লাভও নেই, লোকসানও নেই।

নয়নতারা পানের একটুখানি পিক ফেলে হেঁচকি তুলে বলল, আর আমার কথা বুঝি ভাবতে নেই?

সেই তো কথা। তুমিই একমাত্র মানুষ যার কাছে বিষ্ণুপদ একটা তালেবর লোক। তোমার জন্যই তো দড়ি ছিড়তে চাইছে না আমার।

এ কথায় নয়নতারা হয়তো কেঁদে ফেলত, কিন্তু এ সময়ে বৃষ্টি মাথায় করে উঠোনে চারটে সাইকেল এসে ঢুকল পর পর।

ঘটনা পুরনো, বহুবার ঘটেছে। তবু নয়নতারা ওই আবার এসেছে বলে একটা চাপা আর্তনাদ করে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল, বলল, তুমি কথা কইতে যেও না ওদের সঙ্গে। রাঙাকে ডেকে দিচ্ছি।

চারটে জোয়ান মর্দ ছেলে এসে দাওয়ার সামনে পা ঠেকিয়ে সাইকেল থামাল, নামল না।

কালো চেহারার একটা ছেলে বিষ্ণুপদর দিকে চেয়ে থমথমে গলায় বলল, রামজীবন কোথায়?

নয়নতারা কথা কইতে বারণ করে গেছে। কিন্তু রাঙাকে এখন পাবে না নয়নতারা। রাঙা একটু আগে পুকুরে গেছে। এক ডাই বাসি কাপড় নিয়ে। বিষ্ণুপদ ছেলেটাকে দেখল ভাল করে। শক্ত পোক্ত শরীর, বয়সে রামজীবনের চেয়ে ছোটো, চোখের নজর মোটেই সাদা-সরল নয়। চোখে একটু ধমক আছে।

বিষ্ণুপদ নিরীহ গলায় বলে, সে তো সকালে বেরিয়ে গেছে।

সোডার বোতল খোলার আওয়াজের মতো পরের প্রশ্ন এল, কোথায় গেছে?

সে তো বলে যায়নি।

পিছনে তিনটে ছেলে পাথরের মূর্তির মতো সাইকেলে বসা। বৃষ্টিকে গ্রাহ্য নেই।

সামনের ছেলেটা বিষ্ণুপদর দিকে পলক না ফেলে চেয়ে থেকে বলে, কাল তার বটতলায় যাওয়ার কথা ছিল। যায়নি।

বিষ্ণুপদর একটুও ভয় হল না। ছেলেটার চোখের দিকে সেও নিম্পলক চেয়ে থেকে বলল, কাল তার যাওয়ার উপায় ছিল না।

কী হয়েছিল?

একটু ঝামেলায় ছিল।

বটতলা দিয়ে আজকাল সে যাতায়াত করছে না। তাকে বলবেন আজ সন্ধের পর যদি না যায় তা হলে কিন্তু মুশকিল আছে।

বিষ্ণুপদ নিরীহ গলায় বলে, মুশকিল! কেন, সে কি কোনও খারাপ কাজ করেছে।

তাকে বলবেন, আমরা সন্ধের পর বটতলায় থাকব। কথা আছে।

বিষ্ণুপদ মাথাটা ডাইনে বায়ে নাড়ল। সে কিছু বুঝতে পারছ না। বৃষ্টি হঠাৎ চেপে নামল। চারজন সাইকেবাজ আবছা হয়ে গেল বৃষ্টিতে। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ওরা চলে যাচ্ছে। যেন একটা পরোয়ারা ধরিয়ে দেওয়ার ছিল, কাজ শেষ করে ফিরে গেল।

উঠোনটা কঁকা হয়ে গেল, বটে, কিন্তু মনটা কি হল, চারজন সাইকেলবাজ এখন অনেক সময় ধরে মনের মধ্যে ঘঘারাফেরা করবে। কিছুতেই যাবে না।

বামাচরণের ঘরের দরজা খুলে শ্যামলী বেরিয়ে এল। বিষ্ণুপদ প্রথমটায় ভেবেছিল, বোধ হয় পুকুরে বা কুয়োতলায় যাবে। কিন্তু ঘোমটা টেনে জলময় উঠোনটা পেরিয়ে শ্যামলী উঠে এল দাওয়ায়।

আপনাকে একটা কথা বলছি। আপনার এক ছেলে যদি আর এক ছেলেকে খুন করতে শুণ্ডা লাগায় তাহলেও কি আপনি এ রকম নির্বিকার বসে থাকবেন?

বিষ্ণুপদ সচকিত হয়ে বলে, কে কাকে খুন করাবে বললে?

আপনার আদরের রামজীবন যে আমার স্বামীকে খুন করানোর সাঁট করছে তা কি জানেন?

বিষ্ণুপদ ভারি বেকুব হয়ে গেল। চেয়ে রইল শ্যামলীর দিকে।

০১২. লিফটবাহিত হয়ে

লিফটবাহিত হয়ে কী মসৃণ এই সাতলায় উঠে আসা। তারপর ডোরবেল বাজিয়ে দাও। কয়েদখানার দরজা খুলে যাবে। যখনই সে ফেরে তখনই তার মনে হয়, পাখি কি কখনও খাঁচায় ফেরে? গাঁয়ের বাড়িতে সে যখন কবুতর পুষেছিল, বারান্দায় ওপরে লটকানো কাঠের বাক্সের ঘরে রোজ ফিরে আসত পোষা কবুতরেরা। গৃহী পাখি। মানুষকে পুষল কে? মানুষ নিজেই কি? সে ঘর বানাল, কপাট বানাল, নিজেকে পুরল তার মধ্যে। কিন্তু গৃহের মধ্যে কী আশা করে মানুষ। নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা, স্বস্তি, নির্ভরতা, স্নেহ? আবার এই তার নিজস্ব ঘর তাকে পৃথিবী থেকে খানিকটা আলাদা করে দেয় না। মানুষ কি ভাবতে শেখে না, এই ঘর আমার, এই বাড়ি আমার, অন্য ঘর-বাড়িগুলো আমার নয়? অন্য ঘরবাড়ি উড়ুক পুড়ুক, আমারটা থাকলেই হয়। মানুষ এইভাবেই কি ক্ৰমে উদাসিন হয়ে যায় ঘরের বাইরের পৃথিবীর প্রতি। অন্য সকলের প্রতি?

অনেকের সঙ্গেই তার মতের অমিল হচ্ছে আজকাল-মন্ত্ৰী, আমলা, কতিপয় শিল্পপতি। কৃষ্ণজীবন তাদের কিছুই বুঝিয়ে উঠতে পারে না। সে বরাবর নন-কমিউনিকেটিভ। কিন্তু লিখিত প্রতিবেদনে সে তুখোড়। সে জানে, তার যুক্তি অকাট্য। তার মত আজ বা কাল পৃথিবীকে গ্রহণ করতেই হবে। আজ হলেই ভাল হয়। কাল বড় দেরি হয়ে যাবে না কি?

ইদানীং তাকে একগাদা কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তাকে ডাকা হচ্ছে বিভিন্ন কনফারেন্সে। বিশেষজ্ঞরা তার কথা শুনছেন। এখনও মানতে পারছেন না। সেইসব লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে দেশ ও বিদেশের নানা পত্র-পত্রিকায়। লোকে তার কথার সারবত্তা বুঝতে পারছে। মানতে পারছে না।

আজ দিল্লিতে সমবেদনাসম্পন্ন, বন্ধুভাবাপন্ন এক মন্ত্রী একটু ক্ষোতের সঙ্গে বললেন, এটা কী করে হয় কৃষ্ণজীবনবাবু, আপনি ইন্ডাস্ট্রির গ্রোথকেই বন্ধ করে দিতে চাইছেন! ইন্ডাস্ট্রি কমে গেলে প্রােডাকশন কমে যাবে, সরকারের আয় কমবে, আএমপ্লয়মেন্ট দেখা দেবে।

কৃষ্ণজীবন খুব মৃদুস্বরে বলল, মানুষ অনর্থক কিছু বাহুল্য জিনিস তৈরি করে যাচ্ছে। আমি বিচার করে দেখেছি, অনেক কিছু না হলেও মানুষের চলে যায়।

আপনি অনেকগুলো ইন্ডাস্ট্রিকে ব্ল্যাকলিস্টে ফেলতে চাইছেন। একটা চালু ইন্ডাস্ট্রি কি হুট করে বন্ধ করে দেওয়া যায়? বরং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্ট রিসাইক্লিং-এর জন্য আপনি যে নানারকম প্ল্যান্টের কথা বলেছেন সেটা ভেবে দেখার মতো। কিন্তু তাতেও অনেক টাকার দরকার। এটা তো নতুন কনসেপশন! কিন্তু, কারখানার ধেয়াকে মাটির তলায় চেম্বারে ঢুকিয়ে তা থেকে বাই প্রােডাক্ট করার যে প্রস্তাব দিয়েছেন সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

আমিও জানি না কি করা যায়। সায়েন্টিস্টরা ব্যাপারটা ভাবলে এবং হাতে-কলমে চেষ্টা করলে কিছু একটা হতে পারে।

মন্ত্রী মাথা নেড়ে বললেন, আমাদের পক্ষে এসব ব্যাপার বড় বেশী নাগালের বাইরে। এটা গরিব দেশ। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তেমন গ্রো করেনি, এ তো আপনি জানেন। ভারতবর্ষের কলকারখানার দূষণ পৃথিবীর খুব বেশী ক্ষতি করছে না।

ঘরে কয়েকজন উচ্চপদস্থ আমলাও ছিলেন। তারা বললেন, কোথায় আমরা নতুন ইন্ডাস্ট্রির কথা ভাবছি, আর এদিকে আপনি বলছেন ইন্ডাস্ট্রি কমাতে হবে।

কৃষ্ণজীবন যে অর্থনীতি বোঝে না, তা নয়। পরিবেশ, অর্থনীতি, বিজ্ঞান সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে অন্বিত। সে এও জানে ইন্ডাস্ট্রি কমলে ভারতের ওপর প্রথম ধাক্কাটা হবে মারাত্মক। তবে তার প্রস্তাব যে এঁরা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনাও করছেন না এবং সে চলে গেলেই যে তার বক্তৃতার কপি বাজে কাগজের ঝুড়িতে চালান হয়ে যাবে, এও সে জানে। সে বুঝতে পারছে এরা তাকে একটু বাজিয়ে দেখছে মাত্র, গুরুত্ব দিচ্ছে না। তবু যে সেমিনারের পর তাকে আলাদা ডেকে মন্ত্রী স্বয়ং কথা বলেছেন, এটাই ঢের। কৃষ্ণজীবন ক্লান্ত বোধ করছিল।

এরা কি তাকে পাগল ভাবে। তার প্রস্তাব কি এতই অবাস্তব? কিংবা খুব হাস্যকর? অনেক জ্ঞাণীগুণী তাকে বলেছেন, দূষণবোধ খুব ভাল কথা, কিন্তু আপনি ইন্ডাস্ট্রি কমাতে বলছেন, সেটা তো ঘড়িকে উল্টোদিকে চালানো!

ঠিক কথা। কৃষ্ণজীবন গোটা দুনিয়াকেই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতে চাইছে, ভোগ কমাও, ভোগ্যপণ্য সংযত করো, অল্প নিয়ে থাকে, যদি শেষ অবধি বাঁচতে চাও, যদি সন্তানসন্ততির বেঁচে থাকা চাও। মন্ত্রী মানছেন না, আমলারা মানছেন না, অর্থনীতিবিদরা মানতে রাজি নন, তবু দুষণমুক্ত পৃথিবীর নানা দিকে যে শঙ্কিত পরিবেশ-চেতনার উন্মেষ ঘটছে তাতে ক্ৰমে ক্ৰমে কৃষ্ণজীবনের কণ্ঠস্বরটিই কি প্রবল হয়ে উঠবে না একদিন? কিছু লোক কৃষ্ণজীবনের কথা শুনছে, অনুধাবন করছে, সমর্থন করছে। তাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলেই কি মন্ত্রী তাকে নিজের ঘরে আমন্ত্রণ করে আনেননি?

একজন আমলা বললেন, যথেষ্ট গাছপালা লাগানো হচ্ছে, নতুন নতুন বনসৃজন হচ্ছে, পলিউশন তাতেই কন্ট্রোলে থাকবে।

কৃষ্ণজীবন মূক ও বধিরের মতো বসে রইল। তার কথা আসতে চাইছে না। তার পেপারে ভারতবর্ষের বনসৃজনের নামে যে ধাক্টামো হচ্ছে তার স্পষ্ট উল্লেখ আছে। জলদি জাতের গাছ লাগিয়ে দায় সারা হচ্ছে বটে, কিন্তু সেইসব গাছ তাড়াতাড়ি বাড়তে গিয়ে মাটির রসকষ টেনে ছিবড়ে করে ফেলছে। অন্য দিতে বন দফতরের পরোয়ানায় কাটা হচ্ছে। সেইসব গাছ যা বহুদিন ধরে বাড়ে, বহুদিন বাঁচে এবং মাটিকে ধরে রাখে।

বলে লাভ কি? এরা কি জানে না? এরা কি জানে না আজকাল হিমালয় পর্বতমালায় অবধি বৃষ্টি অনিয়মিত এবং পশু-খাদ্যেরও অভাব? পাহাড়ী মানুষেরা জ্বালানী ও অন্য প্রয়োজনে নেড়া করে ফেলছে বৃক্ষ সংবলিত পাহাড়গুলিকে! এরা কি জানে না, পৃথিবী ছাড়া গোটা সৌরমণ্ডলে আর একটিও গ্রহ নেই, যতে প্রাণের বিন্দুমাত্র লক্ষণ আছে? জীবজন্তু, গাছপালা দূরে থাক, কোনও গ্রহে একটি জীবাণুও নেই? এই মহার্ঘ, অনন্য গ্রহটিকে শুধু অবিমৃশ্যকারিতায় একটি মৃত গ্রহে পরিণত করার অধিকার কার আছে?

নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট, ডিজেল ইঞ্জিন, কম্প্রেসর, রাসায়নিক ধোঁয়াশা, ক্ষতিকারক গ্যাস সবকিছুর বিরুদ্ধেই সোচ্চার কৃষ্ণজীবন। শুধু ভারতবর্ষ তো নয়, গোটা দুনিয়ায় প্রগতির নামে এক বিপুল যন্ত্র সভ্যতার বিস্তারের বিরুদ্ধেই তার জেহাদ। পৃথিবীর মায়াময় বাতাবরণ ছিদ্ৰময় হয়ে এল। সকল প্রাণের উৎস মহান সূর্য অবিরল ছুঁড়ে দিচ্ছে তার মারক নানা বল্পম। পৃথিবীর মায়াময় আবরণ তা আটকাতে পারছে না আর। উষ্ণ হচ্ছে তার মরু অঞ্চল। বাড়ছে ক্যানসার, চর্মরোগ। অচিরে মেরু প্রদেশের বরফ গলে মহাপ্লাবনের জলের ঢল নেমে আসবে সমুদ্রে।

এত কথা কি বলা যায়?

মন্ত্রী তার দিকে চেয়ে ছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন, লোকটা কি একটু বেহেড? একটু ডাম্ব?

মন্ত্ৰী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ইউ আর অ্যান এক্সপার্ট। আপনি ভেবে দেখবেন।

দুপুরের ফ্লাইটে ফিরে এসেছে কৃষ্ণজীবন।

আনমনে সে কিছুক্ষণ ডোরবেল বাজাল। বিরক্তিকর এক পাখির ডাকের মতো শব্দ হচ্ছে ভিতরে। কে যে এরকম বিরক্তিকর ডোরবেল পছন্দ করেছিল কে জানে! একবার বোতাম টিপলে অনেকক্ষণ ধরে বেজে যায়। অথচ ডোরবেলের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত জোরালো আওয়াজই যথেষ্ট। খামোকা এই শব্দময় শহরে আরও নতুন নতুন বিচিত্র শব্দের দৃষ্টি করা। কে জানে, এ আমলের লোকেরা বোধ হয় শব্দ ভালবাসে। কেবল শব্দ আর শব্দ। সেইজন্যই কি স্টিরিও, রক মিউজিক, চেঁচিয়ে কথা বলা?

দরজা খুলল না। একটা স্পেয়ার চাবি কৃষ্ণজীবনের কাছে থাকে। সে দরজা খুলে খাঁচায় ঢুকল।

বাড়িতে কেউ নেই। রিয়া তার ছেলেমেয়ে সহ কোথায় গেছে। এ বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টার কাজের একটি মেয়েও আছে। তাকেও হয় সঙ্গে নিয়ে গেছে, নয় ছাড়িয়ে দিয়েছে। রিয়া ঘন ঘন কাজের লোক পাল্টায়।

ফাঁকা বাড়িতেই অধিকতর স্বস্তি বোধ করে কৃষ্ণজীবন। তোক থাকলে সে অস্বস্তি বোধ করে। শুধু দোলন ছাড়া। অন্য সব জায়গা থেকে ধাক্কা খেয়ে প্রত্যাহত হয়েছে তার মন। তারপর জড়ো হয়েছে দোলনের ওপর। দোলনকে সে সবটুকু দিয়ে ভালবাসে। সে ভাবে, আমি দোলনকে একটা সবুজ পৃথিবী দিয়ে যাবো।

কৃষ্ণজীবনের কোনও নেশা নেই। চা অবধি খায় না। সে এক গ্রাস জল খেল। বাড়ির পোশক পরে নিজের ঘরে গিয়ে বইপত্র নিয়ে বসল।

বইতে ড়ুব দিলে কৃষ্ণজীবনের কোনও বাহ্যজ্ঞান থাকে না। সে সম্পূর্ণ সম্মোহিত হয়ে থাকে। ড্ডারবেলটা তবু শুনতে পেল সে। অনেকক্ষণ ধরে বাজছে। মেকানিক্যাল পাখির ডাক।

কৃষ্ণজীবন গিয়ে দরজা খুলল। মুখটা চেনা, কিন্তু নামটা মনে করতে পারল না সে। তার মগজ অধিকার করে আছে। বই।

তারপর হাসল কৃষ্ণজীবন। বলল, ওরা তো কেউ বাড়ি নেই।

মেয়েটা তার দিকে একটু বিস্ফারিত চোখে চেয়েছিল। বলল, আমি একটু ভিতরে আসব?

কেন আসবে তা বুঝতে পারল না কৃষ্ণজীবন। মেয়েটা তার মেয়ে মোহিনীর বান্ধবী। প্রায়ই আসে। নামটা মনে পড়ল না।

দরজা ছেড়ে কৃষ্ণজীবন বলল, আসতে পারে। কিছু দরকার আছে?

আমাদের বাড়ির ফোনে ডায়ালটোন নেই। আমি আপনাদেরটা একটু ব্যবহার করতে পারি?

বিরক্ত কৃষ্ণজীবনের মনেই পড়ল না, তাদের টেলিফোনটা কোথায় আছে। সে টেলিফোন যন্ত্রটাকে সুনজরে দেখে না। উপকারী যন্ত্র বটে, কিন্তু বড় জ্বালায়। টেলিফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে ভালবাসে তার বউ রিয়া আর মেয়ে মোমাহিনী। কী করে বলে কে জানে।

কৃষ্ণজীবন বলল, করতে পারো। হয়ে গেলে যাওয়ার সময় দরজাটা টেনে দিয়ে যেও। আমি আমার ঘরে যাচ্ছি।

কৃষ্ণজীবন তার ঘরে এসে ফের বই খুলে বসল। জগৎ-সংসার ভুলে গেল।

কতক্ষণ কেটেছে কে জানে। হঠাৎ কে যেন ঘরের আলোটা জ্বেলে দিল।

এই অন্ধকারে কি করে পড়ছিলেন?

কৃষ্ণজীবন তার ঘোর-লাগা চোখ তুলে তাকাল। সেই মেয়েটি।

কৃষ্ণজীবন কী বলবে ভেবে পেল না। খুব অস্বস্তির সঙ্গে বলল, সন্ধে হয়ে গেছে, না?

হ্যাঁ। আপনার চোখ খুব ভাল, তাই এই অন্ধকারেও পড়ে যাচ্ছিলেন।

আলো জ্বালতাম। একটু বাদেই জ্বালতাম।

আমার ফোন করা হয়ে গেছে। দরজাটা টেনে দিয়ে যাও।

আচ্ছা, আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?

কি কথা?

আপনি কখনও লাঙ্গল চালিয়েছেন?

কেন চালাব না? অনেক চালিয়েছি।

সত্যি? দারুণ ব্যাপার, না!

কৃষ্ণজীবন মেয়েটির দিকে অবাক চোখে চেয়ে বলে, এমন কিছু দারুণ ব্যাপার নয়। সবই অভ্যাস।

আচ্ছা, আপনি তো হাইলি এডাইট। আপনি কেন চাষ করতেন?

করতাম। আমরা খুব গরিব ছিলাম।

আমি একটু বসতে পারি?

বোসো।

আপনাকে ডিস্টার্ব করছি না তো?

কৃষ্ণজীবন বিরক্ত হচ্ছে। তবু বলল, কিছু বলবে?

আমি প্রায়ই আসি, জানেন তো?

জানি। তোমার নামটা মনে নেই।

অনু। আপনার সঙ্গে ভীষণ কথা বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আপনি সবসময়ে এত ব্যস্ত থাকেন। আসলে আপনি তো থাকেনই না কলকাতায়।

হ্যাঁ।

আর আপনি ভীষণ গম্ভীর বলে একটু ভয় পাই।

কৃষ্ণজীবন খুব অবাক হয়ে বলে, ভয় পাও? কেন?

মনে হয় আপনি ভীষণ রাগী।

কৃষ্ণজীবন দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, আমার রাগ নেই। রাগতে পারি না। রাগতে পারলে হয়তো ভালই হত। রাগ কি ভাল? আপনি রাগবেন কেন? কখনও রাগবেন না।

কৃষ্ণজীবন ঠিক এ ধরনের কথাবার্তা কখনও শশানে না। মেয়েটি কি খুব সরল? বা মাথায় ছিট আছে? বুঝতে না পেরে সে চুপ করে থাকে।

অনু বলল, আপনার ভয়েসটা দারুণ ভাল। রিয়েল বাস। আর আপনি ভীষণ হ্যান্ডসাম।

মেয়ের বয়সী একটি মেয়ের মুখে একথা শুনে আর একটু বিস্ময় বাড়ল কৃষ্ণজীবনের। যৌবনকালে সে নেহে বটে যে, তার চেহারাখানা ভাল। কিন্তু ভাল চেহারার কোনও উপযোগ বা প্ৰয়োজনীয়তা সে তো অনুভব করে না। তার চিন্তার রাজ্যে চেহারার মূল্যই বা কী?

অনু খিলখিল করে হেসে ফেলল। তারপর বলল, কিন্তু আপনি একটু শ্যাবি। আজ শেষ করেননি কেন?

কৃষ্ণজীবন নিজের গালে হাত বুলিয়ে নিল নিজের অজান্তেই, বলল, শেভ! করিনি বলছো।

করেননি। সেটাই মনে নেই?

কৃষ্ণজীবন খুব ভাবিত হয়ে বলে, সকালে খুব তাড়া ছিল। কি জানি ভুলেও যেতে পারি। মিনিস্টারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। শেভ তো করার কথা।

ফের খিলখিল করে হাসল অনু। বলল, মোটেই করেননি। আপনার গালে স্টাস রয়েছে।

হতে পারে। তুমি খুব হাসো বুঝি?

অনু একটু গম্ভীর হয়ে বলে, হাসিই তো আমার রোগ। কিন্তু ফর লাস্ট টু উইকস হাসছি না। এই প্রথম আপনার কাছে এসে হাসলাম। আমার বাবা সিরিয়াসলি ইল। হার্ট অ্যাটাক।

ওঃ! বলে কৃষ্ণজীবন খুব অস্বস্তির সঙ্গে চুপ করে থাকে।

এই বয়সের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার দেখাসাক্ষাৎ বা কথাবার্তা হয়ই না। জানেই না এরা কেমন।

আজ বাবা একটু বেটার। পেইন নেই, সেডেটিভ কম দেওয়া হচ্ছে। আজ আমার মনটা খুব ভাল লাগছে।

এসব ক্ষেত্রে কী বলতে হবে তা কৃষ্ণজীবন ভেবে পায় না। একজন প্রম্পটার থাকলে ভাল হত। সে শুধু বলল, বাঃ বেশ!

আচ্ছা, আপনি বাড়িতে বুঝি লুঙ্গি পরেন? আমার বাবা পরে পাজামা আর পাঞ্জাবি। সব সময়ে ফিটফাট।

কৃষ্ণজীবন প্ৰচণ্ড অস্বস্তি বোধ করছে। এ মেয়েটা কি ফাজিল? ফচকে? অসভ্য? ছিটিয়াল? এভাবে কৃষ্ণজীবনের সঙ্গে কেউ কথা বলে না। এ বাড়িতে তাকে ভাল করে লক্ষই বা করে কে? কৃষ্ণজীবন তার লুঙ্গিটার দিকে চেয়ে বুঝতে পারল না, কৃতকর্মের জন্য তার অনুশোচনা হওয়া উচিত কিনা! জ্বলোকদের কি বাড়িতে পাজামা-পাঞ্জাবি পরেই থাকা উচিত? সে পাজামা তো পরেইনি, এমনকি তার গা আদুর।

আপনি কি একসারসাইজ করেন? একসারসাইজ! মানে ব্যায়াম?

হ্যাঁ। আমার বাবা একটুও করে না। ডাক্তার বলেছে, এখন থেকে রেগুলার হাঁটতে হবে। অনেকটা করে। অবশ্য এখনই নয়। টোটাল রিকভারির পর। আপনি কিন্তু খুব মাসকুলার। হি-ম্যান। আচ্ছা, গ্রামের বাড়িতে আপনার কে আছে?

কৃষ্ণজীবন এতক্ষণে কূল খুঁজে পেল। গা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে সে আজও কথা খুঁজে পায়। কৃষ্ণজীবন একটু হেসে বলল, সবাই আছে। মা-বাবা, ভাইরা, ভাইদের ছেলেপুলে। আমাদের বেশ বড় সংসার।

সবাই প্লাউম্যান?

প্লউম্যান? না না, চাষের জমি এখন ভাগচাষীদের হাতে। বেশী নেইও। অভাবে বিক্রি করে দিতে হয়েছে। আমার ভাইরা সামান্য চাকরি বা ব্যবসা করে।

আপনার গ্রাম বেশী ভাল লাগে, না শহর।

কৃষ্ণজীবন স্বরাতুর চোখে মেয়েটির দিকে চেয়ে বলে, গ্রাম। আমি একদিন সেখানেই ফিরে যাবো। চাষ করব। গাছের পর গাছ লাগাব। সবুজে সবুজ করে দেবো চারধার।

আপনি তো পলিউশন এক্সপার্ট। গাঁয়ে কোনও পলিউশন নেই, না?

আছে, আছে। পলিউশন সর্বত্র আছে। যেখানে কল-কারখানা নেই, ডিজেলের ধোঁয়া নেই, কেমিক্যাল ফিউম নেই, সেখানে কী আছে জানো? মানুষকে মানুষের গালাগাল, অশ্রাব্য কথা, করাপশন। এগুলোও পলিউশন। ভিতরকার পলিউশন। কলকাতার বস্তি বা ঝুপড়ি দেখনি?

দেখব না কেন! আমাদের বাড়ির পিছনেই একটা আছে।

ঝগড়া শুনতে পাও?

হ্যাঁ। কী অসভ্য অসভ্য গালাগাল দেয়।

সে কথাই বলছি। মানুষ এখনও এইসব পলিউশন নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেনি বোধ হয়। মাতাল, অশিক্ষিত বাপ দূষিত কথা বলে, গাল দেয়, মারধর করে। ছেলেমেয়েরা সেইসব শিখে নেয়। এইভাবেই এত পলিউটেড হয়ে যায় এরা, যখন আর পৃথিবীর সৌন্দর্য বুঝতে পারে না, জীবনের সৌন্দর্য বুঝতে পারে না। গোটা দুনিয়াকে ঘেন্না করতে থাকে।

ইউ টক নাই। মুগ্ধ চোখে চেয়ে অণু বলে।

কৃষ্ণজীবন মৃদু হেসে বলে, গ্রামেও সেরকম পলিউশন আছে।

রুরাল লাইফ আমি কখনও দেখিনি। আমার খুব ইচ্ছে করে।

গাঢ় স্বরে কৃষ্ণজীবন বলে, সব মানুষেরই করে। প্রত্যেক মানুষের রক্তেই একটা ফিরে যাওয়ার টান আছে। কিন্তু যেতে পারে না। শহর বেঁধে রাখে।

আমরা মাঝে মাঝে বেড়াতে যাই। কখনও পাহাড়ে, কখনও সমুদ্রের ধারে, কখনও জঙ্গলে, কী যে ভাল লাগে। কিন্তু তিন চারদিন পর ইট বিকাম বোরিং। ভেরি বোরং। রোজ পাহাড় দেখছি তো পাহাড়ই দেখছি। নার্থি চেঞ্জেস।

শুধু দেখতে গেলে এবং ইনভলভমেন্ট না থাকলে ওরকম হয়। যে জায়গায় যাচ্ছে সেই জায়গার সঙ্গে তোমার তো আত্মীয়তা নেই! থাকলে বোরডম টের পেতে না। আমি যখন গাঁয়ে ফিরে যাব, ঠিক চাষী হয়ে যাবো, গেঁয়ো হয়ে যাবে, সব বিদ্যে ভুলে যাবে।

ইউ আর প্যাশনেটলি ইন লাভ উইথ ইওর ভিলেজ। আচ্ছা, আপনি কি চান শহর থেকে মোটরগাড়ি, বাস সব তুলে দিয়ে রিকশা, সাইকেল, ঘোড়ার গাড়ি আর ট্রাম চালু করতে? হাই ফানি। মোহিনী বলছিল।

কৃষ্ণজীবন ম্লান একটু হাসল। বলল, একদিন হয়তো তাই হবে। আমার মতে কী যায় আসে? আমি যা ভাল বুঝি, বলি। আমাদের চেয়ে তোমরা আরও বেশী দিন পৃথিবীতে থাকবে। তোমাদের সন্ততিরা থাকবে আরও বেশী দিন। পৃথিবীকে আমরা যদি তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে ফেলি তাহলে তাদের জন্য কী থাকবে? আমি তো ভাবী পৃথিবীর চেহারা দেখতে পাই, ঘোড়ার গাড়ি ফিরে এসেছে, সাইকেল চলছে। পালকি, গোরুর গাড়ি, নৌকো…

ইউ আর ফানি।

পাশাপাশি সোলার এনার্জি, ব্যাটারি আর উইন্ডমিল। পৃথিবী বসে থাকবে না। বাঁচবার পথ করে নেবেই। কিন্তু বোকারা কিছু বুঝতে পারছে না।

কারা বলুন তো!

মানুষেরা। ক্ষমতাবানরা। যারা পৃথিবীকে চালাচ্ছে তারা।

অনু মুগ্ধতার সঙ্গে চেয়েছিল। হঠাৎ বলল, ইউ আর নাইস। আই অ্যাডোর ইউ।

কৃষ্ণজীবনের আবার, মনে হল, তার একজন প্রম্পটার দরকার। এই পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সংলাপ, সে বুঝতেই পারে না। কত কী বলে দেয় এরা মুখের ওপর। এরা কি এরকমই নাকি! কিন্তু খারাপ লাগছে না। মোটেই খারাপ লাগছে না তার।

অনু চেয়ারটা আর একটু কাছে টেনে বসল। তারপর বলল, আমি শুনেছি, আপনার কোনও ফ্রেন্ড নেই। সত্যি?

কৃষ্ণজীবন অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে আবার চকিত হল। তারপর মৃদু হেসে বলল, না। আমার কোনওদিনই তেমন কোনও বন্ধু ছিল না। কেন বলো তো!

আমি আপনার ফ্রেন্ড হতে চাই।

তুমি!

আমি খুব ভাল ফ্রেন্ড হবো। আই অ্যাডোর ইউ। ইউ আর এ নাইস ম্যান। মাঝে মাঝে চলে আসবো, গল্প করব। আবোল তাবোর গল্প কিন্তু! রাগ করবেন না তো! ফ্রেন্ডের ওপর রাগ করতে নেই।

মাই গড! তুমি তো মোহিনীর বন্ধু! তাতে কি? আপনি কি ওল্ড কনসেপশনের লোক?

না, মানে …

কথা হারিয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ অনেকদিন পর একটা নির্মল হাসিতে তার মন উদ্ভাসিত হয়ে গেল। কেন যে ভীষণ ভাল লাগল তার এই অবাস্তব, অসম্ভব প্রস্তাবকে।

কি, রাজী?

কৃষ্ণজীবন সকৌতুকে অনুর দিকে চেয়ে বলে, রাজী। কিন্তু আমার তো অভ্যাস নেই বন্ধুত্বের। কি করতে হয় বলে তো!

আই উইল টিচ ইউ।

শেখাবে?

আপনি তো ভীষণ ভাল আর ছেলেমানুষ, তাই না? আমি আপনাকে সব শিখিয়ে দেব। আজ যাই, নার্সিং হোম-এ যেতে হবে। বাই।

অনু চলে যাওয়ার পর আর কিছুতেই বইয়ে মন দিতে পারল না সে। তার আংশিক বোব মন হঠাৎ যেন অনেক কথা বলে উঠতে চাইছে। মজা লাগছে, হাসি পাচ্ছে। মেয়েটা পাগল বোধ হয়। কিন্তু এ গুড কম্পানি। তার জীবনে এরকম ঘটনা কখনও ঘটেনি। কত বয়স হবে মেয়েটার, হার্ডলি পনেরো বা যোলো? পোশাকটা কী ছিল যেন? না শাড়ি নয়। কী যেন? বেশ স্মার্ট দেখাচ্ছিল তো! বোধহয় সালোয়ার কামিজ! হা, তাই হবে। বেশ ধারালো বুদ্ধির ছাপওয়ালা মুখ।

একটু রাতে নিজস্ব ছোট টেলিস্কোপ আর দোলনকে নিয়ে যখন ছাদে বসে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে তারা দেখার চেষ্টা করছিল কৃষ্ণজীবন তখনও আনন্দের রেশটা রয়েছে।

বাবা, তুমি হাসছে কেন? আমাকে তারা দেখাবে না।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আজ বড় মেঘলা, ভাল দেখা যাচ্ছে না।

তুমি হাসছিলে কেন বাবা?

এমনি।

তুমি তো কখনও হাসো না! সবসময়ে গম্ভীর থাকো।

হাসলে কি আমাকে তোমার ভাল লাগে না!

খুব ভাল লাগে।

আজ আমার খুব মজা লাগছে।

কেন বাবা?

এমনিই। কথাটা খাওয়ার টেবিলে রিয়াও তুলল, কী গো, আজ তোমাকে একদম অন্যরকম দেখাচ্ছে কেন?

কিরকম?

সেই চেনা মানুষটা তো নয় দেখছি! সেই গোমড়ামুখখা, দ্রুকুটিকুটিল মুখখানা তো দেখছি না। কী হল হঠাৎ?

কৃষ্ণজীবন ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

দোলন নিরীহ গলায় বলে, বাবার আজ খুব মজা লাগছে।

রিয়া ভ্রূ কুঁচকে বলে, কিসের মজা?

মোহিনী আর সত্রাজিৎ তাদের প্লেট থেকে মুখ তুলে কৃষ্ণজীবনের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। তাদের বাবার মজা লাগছে, এরকম অদ্ভুত ঘটনার কথা তারা কখনও শশানেনি।

রিয়া বলল, সবই তো চেপে থাকো। সত্যি বলো তো, তুমি কোনও অ্যাওয়ার্ড বা রিকগনিশন পাওনি তো!

না, না, বলে কৃষ্ণজীবন নিজেকে ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টা করল। বন্ধুত্বও কি অ্যাওয়ার্ড নয়? রিকগনিশন নয়?

রিয়া একটু বিরক্ত মুখে বলল, বিষ্টুপুর থেকে একটা চিঠি এসেছে। পোস্টকার্ড!

একটু চমকে উঠল কৃষ্ণজীবন, কার চিঠি! খারাপ খবর নাকি?

ইউ ডিপেন্ড। তোমার বাবা তোমাকে একবার যেতে লিখেছেন।

কেন?

কি সব গোলমাল হচ্ছে। বাড়ি ভাগাভাগি হবে। তোমার নাকি যাওয়া দরকার।

ওঃ। বলে চুপ করে থাকে কৃষ্ণজীবন।

আমি একটা কথা বলব?

কি কথা?

তুমি কিন্তু নিজের ভাগটা ছেড়ো না। আজকাল কেউ কিছু সহজে ছাড়ে না। তুমিও বোকার মতো ছেড়ে দিও না।

হুঁ। বলে চুপ করে থাকে কৃষ্ণজীবন। চোখে ভেসে ওঠে, কুলগাছ ছেয়ে সোনালতার বিস্তার। কী সবুজ মাঠ। মাটির মদির গন্ধ নাকে ভেসে এল বুঝি!

০১৩. যেমন ভ্যাতভ্যাতে বর্ষা তেমনি গুমসোনো গরম

এবার যেমন ভ্যাতভ্যাতে বর্ষা তেমনি গুমসোনো গরম। দুদিন বৃষ্টি নেই। আকাশ থমকানো মেঘলা। ভেজা মাটির ভাপ আর গুম-ধরা আকাশের মাঝখানটা যেন সেঁকা রুটির পেটের মধ্যেকার মতো। বাতাস নেই, গাছের পাতাটিও নড়ছে না। ঘাম হয়, শ্বাসকষ্ট হয়। দুপুরবেলাটা এই ভ্যাপসা গরমে বড় সুনসান। মানুষ দূরের কথা, পথেঘাটে নেড়ী কুকুরটাও ল্যাং ল্যাং করে ঘুরে বেড়ায় না।

একখানা রিক্সা ট্যাঙস ট্যাঙস করতে করতে চলেছে। তাতে মাইক ফিট করা। ফাটা গলায় চিহি সুরে প্রচার চলছে। বিশ্ববিজয় অপেরার আগামী পালা আউরঙ্গজে–ব! আউরঙ্গজে–ব!

পালা নামতে এখনও পাক্কা দুটি মাস। বর্ষা না গেলে, ক্ষেতের কাজ শেষ না হলে নামবার কথাও নয়। আহাম্মক ছাড়া এবাবে কেউ গাঁটগচ্চা দেয়?

বটতলায় রিক্সা থামিয়ে পাঁচু সিট থেকে নেমে গামছায় মুখের ঘাম মুছল। নিমাই প্লাস্টিকের বোতল থেকে ঢকঢ়ক করে জল খাচ্ছিল। নিম-গরম জলে তেষ্টা যেতে চায় না। যা গরমটা পড়েছে, জলের কি ঠাণ্ডা থাকার জো আছে? টিপকল থেকে যখন ভরেছিল তখন ভারি ঠাণ্ডা ছিল।

পাঁচু বলল, একটু জিরিয়ে নাও নিমাইদাদা। আমি একটু বিড়ি টেনে নিই। নইলে জুত হচ্ছে না।

নিমাইয়ের তাতে বিশেষ আপত্তি নেই। এই দুপুরে ঘুরে ঘুরে বিশ্ববিজয়ের পালার কথা বলে তেমন লাভও তো হচ্ছে না। শুনছে কি কেউ? শুনলেও গা করছে বলে মনে হয় না। রিক্সা আর মাইকের দিনভর ভাড়া, নিমাইয়ের মজুরি মিলে টাকা কিছু কম যাচ্ছে না। তবে কাকা লোকটাই অমনি। চাপল বাই তো কটক যাই। যত্র আয়, তত্র ব্যয়।

নিমাই নেমে বটতলার বাঁধানো তলায় বসতে গিয়ে আঁতকে উঠল। শান তেতে আছে। রোদ নেই, তবু যে কেন তাতে কে জানে বাবা!

পাঁচু আড়চোখে কাণ্ডটা দেখে বলল, রিক্সার সীটটা নামিয়ে ওটা পেতে বোসসা। আমি মকবুলের দোকান থেকে বিড়িটা ধরিয়ে আসছি।

সীটটা পেতেই বসল নিমাই। পাঁচু শিগগির আসবে না। অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে রিক্সা টেনেছে। হাঁপাচ্ছে। মালিকের আগেরটা দিয়ে কটা টাকাই বা থাকবে হাতে? মাস দুয়েক আগে টিবি থেকে সেরে উঠেছে। আবার হয়তো শিগগিরই রোগে পড়বে। গরিব মানুষদের বাঁচাও যা, মরাও তা।

নিমাই বিড়িটিড়ি খায় না। শরীরে সয় না তো বটেই, তাছাড়া ওসব তার কাছে বাবুগিরির সামিল। দিনে দশটা করে টাকা আসছে, এটাকে সে টুক টুক করে জমাচ্ছে। বাজারে একখানা দোকানঘর নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এখনো বন্দোবস্ত হয়নি। এই ফাঁকে কাকাকে বলে এ কাজে তাকে বহাল করেছে বীণাপাণি। কাজটা খাটুনির নয়। তবে এই গরমে বড় কষ্ট।

কষ্টটাকে গায়ে না মেখে টাকাটা রাখছে নিমাই। শতখানেক হলেই পালপাড়ায় গিয়ে বাবার হাতে তুলে দেবে। আর তখন বুড়োবুড়ির মুখে যে হাসিখানা ফুটবে সেটাতেই জুড়িয়ে যাবে তার প্রাণ। ওই বোকাসোকা দুটো বুড়োবুড়ির জন্য নিমাই না পারে হেন কাজ নেই। কিন্তু কাজই জুটতে চায় না মোটে। দোকানটা হলে বাঁচোয়া। একখানা দোকান হলে সারা দিনমান খদ্দের সামলে সন্ধের পর একখানা কীর্তনের আসরে গিয়ে বসবে এর চেয়ে বেশি নিমাই আর কিছু চায় না। তার ইচ্ছে ছিল, কীর্তন করে তা থেকে যা জোটে তাই দিয়েই চালিয়ে নেবে। পয়সা না থাক, বুকভরা আনন্দ তো আছে। গলায় সুর ছিল তার। কিন্তু আজকাল গলার আওয়াজটা তার নিজের কানেই ভাল ঠেকছে না। বুকে দমেরও যেন ঘাটতি হচ্ছে।

টাকাপয়সার চিন্তা বড় দৃষিত চিন্তা। মনে ঠাই দিতে নেই। তবে ঘুরেফিরে কথাটা মনে হয়, সে বড় গরিব। বড় টানাটানির মধ্যে সে বড় হয়েছে। খিদের কষ্ট সইতে পারত না ছেলেবেলায়। কাঁদত। তার কান্না দেখে মাও কাঁদত। ফলপাকুড় পেড়ে খাবে তা সেরকম ফলন্ত গাছও ছিল না পালপাড়ায়।

তবে ভগবানের দয়াটা আছেই। খিদের কষ্ট পেতে পেতেই আস্তে আস্তে খিদেটা সয়ে যেতে লাগল। মানুষের দাঁতে ব্যথা হয়, মাথা ধরে, জ্বরজারি হয়, লোকে সয়ে থাকে না সেসব? খিদেটাও সেরকম আধিব্যাধি ঠাউরে নিল সে। ও যেন দাঁতের ব্যথা, পেটের ব্যামো। আজ আর খিদেকে ভয় নেই তার। খাওয়ার কষ্টটাও নেই। ইদানীং বেশ খাওয়া-দাওয়া হচ্ছে তাদের। গেলবার তো বীণাপাণি একটু সরু চালই কিনে ফেলল। দোবেলা মাছ হচ্ছে। ডালের পাতে পটল বা ঢাড়শ ভাজা জুটে যাচ্ছে। গত দু মাসে না থােক তিনবার মাংস হয়েছে। এ সময়টায় এই অপয়া বর্ষায় বীণাপাণির হাতে বাড়তি টাকা থাকার কথাই নয়। তবে আসছে কোথেকে?

দুপুরের এই ঝিমধরা গরমে প্রশ্নটা নিয়ে খুব ভাবিত হল সে। গালে হাত দিয়ে বসে ভাবতে লাগল। কাকা ভাল লোক, কিন্তু গাড়ল তো নয় যে, এই যাত্রার আকালে বেশী করে টাকা দিচ্ছে বীণাকে!

তবে কি অন্য কেউ দিচ্ছে? দিলে তো বলতে হবে, দেওয়াটা ধৰ্মত ন্যায্যত দিচ্ছে না, ভিতরে মতলব আছে। ধর্মে টাকা নেই, অধর্মে আছে। অধর্মের টাকা বড় হুড় হুড় করে আসে, সামাল দেওয়া যায় না।

পাঁচু একটা বিড়ি শেষ করে আর একখানা ধরিয়ে এসে ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু কনুই চুলকুলো, একটা হাই তুললো, তারপর উদাস গলায় বলল, আরও ঘুরবে নাকি? তার চেয়ে একটু জিরোই চলো। তুমি এদিকটায় গদি মাথায় দিয়ে শোও, আমি ওদিকটায় একটু গড়িয়ে নিই। বেজায় গরম।

নিমাই রাজি হয়ে গেল। বলল, ঘন্টাখানেকের বেশী নয় কিন্তু। বটতলা খারাপ জায়গা, কেউ দেখে ফেলতে পারে।

কেউ দেখবে না। আর দেখলেই কি? মানুষের শরীর তো, নাকি?

নিমাই কথা বাড়াল না। শুয়ে পড়ল। ঘুমটাও আসত। তবে চিন্তাটা বড্ড কুটকুট করছে বলে ঘুমটা চোখের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রইল। বীণাকে টাকাটা দিচ্ছে কে? এই যে সকাল থেকে বিকেল অবধি মাইক ফুকে বেড়ানোর চাকরিটা বীণা তাকে জোগাড় করে দিয়েছে তার পিছনে মতলব নেই তো! এই ভরদুপুরে কি কেউ আসে-টাসে বীণার কাছে?

মন বড় পাপী। কথাটা মনে হতেই জিব কাটে নিমাই। ছিঃ ছিঃ, বীণা তার জন্য জান কিছু কম চুঁইয়েছে? সে চলে যাচ্ছিল, নিজেই সেধে যেচে রেখেছে। আজ অবধি এই পাপ-মুখে সে বলতে পারবে না যে, বীণার কিছু বেগোছ দেখেছে। তবে কথাটা মনে হচ্ছে কেন? একবার গিয়ে চুপি চুপি হাজির হবে নাকি বাড়িতে? গিয়ে যদি সত্যিই দেখতে পায় যে, বীণা পরপুরুষের সঙ্গ করছে, তাহলে? তাহলেই কি কিছু করতে পারবে নিমাই? দু ঘা কষাতে পারবে লোকটাকে? নাকি পারবে বীণাকেই ধমক চমক করতে? ওসব গণ্ডগোলে না পড়ে যাওয়াটাই তার পক্ষে মঙ্গল। গিয়ে কিছু বেগোছ দেখলে বিপদ তারই।

ঘুমটা এল আচমকা, নোটস না দিয়ে। ঘুমিয়ে মেলা স্বপ্ন দেখতে লাগল নিমাই। একটা স্বপ্ন ভারি ভাল। তার মা মর্তমান কলা আর দুধ দিয়ে চিড়ে মেখে খুব খাচ্ছে এক ডেলা গুড় দিয়ে।

ও নিমাইচন্দ্র, ওঠো! ওঠো!

নিমাই উঠে বসে। ঘেমে একেবারে চান করে উঠেছে।

ডাকনি কেন?

মেঘ চমকাচ্ছে। নামল বলে।

নিমাই একবার ময়লা কালো আকাশের দিকে চেয়ে বলল, নামলে বাচি। যা পচা গরমটা পড়েছে!

কোনদিক যাবে এবার? আমাদের টাইম কিন্তু শেষ হয়েছে।

তাহলে বাজারপানেই চল। মাইক-টাইক সব বুঝিয়ে ফেরত দিয়ে দিই।

পোকাটা অনেকক্ষণ কুটকুট করে কামড়াচ্ছে। মাথাটা ঠিক নেই, বীণা টাকাটা পাচ্ছে কোথা থেকে?

ব্ৰজবাসীর মাইকের দোকান অবধি পৌছোতে পারল না তারা। তার আগেই রেলগাড়ির মতো একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটা এল, আর তার পিছু পিছু রসমুণ্ডির মতো বড় বড় ফোঁটায় হরির লুঠ ছড়াতে ছড়াতে বৃষ্টি।

ভিজে চুব্বস হয়ে ব্ৰজর দোকানে উঠে পড়ল দুজন। ব্ৰজবাসীর ছোকরা কর্মচারী যন্ত্রপাতি তুলে নিল দোকানে। বলল, ভিজিয়ে ফেললে? এসব ইলেকট্রনিক জিনিস, বরবাদ হলে দাম দেবে কে?

নিমাই কথা বলল না। তবে পাঁচু বলল, বৃষ্টি কি আমার বাপের চাকর যে হুকুম মেনে নামবে? অতই যদি তোয়াজের জিনিস তবে ভাড়া দেওয়ার সময় সঙ্গে একটা ঢাকনা দিয়ে দিস না কেন?

ব্ৰজবাসীর দোকানের সামনে একখানা বারান্দা আর তাতে বেঞ্চ আছে। দুজনে বসল পাশাপাশি। বৃষ্টির ছাঁট আসছে, প্রবল বাতাস।

পাঁচু বলল, একটু চা হলে হত, কী বলো!

নিমাই মাঝে মাঝে খায়, তবে নেশা নেই। বীণাপাণির চায়ের নেশা আছে বলেই নিমাইকে মাঝে মাঝে খেতে হয়। নিমাই উদাস গলায় বলে, তা খা না। ওই তো পর দোকানে হচ্ছে।

পাঁচু নড়ল না, বসে রইল। খানিকক্ষণ বাদে বলল, এবার বৃষ্টিটা খুব ভোগাবে, বুঝলে! লক্ষণ ভাল নয়। চাষবাসের বারোটা না বাজে।

চাষবাস নিয়ে নিমাইয়ের ভাববার সময় নেই। তার মাথায় অন্য পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। বীণাপাণির ঘরে যদি পরপুরুষ ঢুকেই থাকে তবে এতক্ষণ কি সে আছে? থাকলে এই বৃষ্টিতে সেও বেরোতে পারবে না। টাকাওলা লোক কি? জোয়ানমদা? নাকি বুড়োধুড়ো?

পাপের চিন্তা করলে শরীর কোয়, মন শুকোয়। দুনিয়াটাই শুকিয়ে যায়। এই বৃষ্টি-ভেজা বিকেলটা নিমাইয়ের কাছে ভারি শুকনো ঠেকছে। সে হঠাৎ বলল, হ্যাঁ রে পাঁচু, তুই ভগবান মানিস?

পাঁচু একখানা বিড়ি বের করেছে। দেশলাই রাখে না বলে ধরাতে পারছে না। বলল, তা মানি। শীতলা মানি, কালীঠাকুর মানি। তবে আমরা পাপী-তাপী লোক, ভগবানের কথা আর ভাবতে পারি কই বলো!

আমার খুব ভগবানের কথা মনে হয়। একটু শাস্তর জানা থাকলে, মন্ত্র নেওয়া থাকলে বেশ হত। কিছু হল না। সংসারের প্যাঁচে পড়ে গেছি।

পাঁচু তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, তোমার আবার সংসার টোনাটুনি মিলে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আছে। পাঁচখানা ছেলেপুলে নিয়ে আমার মতো ফাঁদে পড়তে তো বুঝতে!

বিয়ে কি সকলের সয় রে! সংসার আমার জন্য নয়। ইচ্ছে ছিল সারাদিন কাজটাজ করব, সন্ধেবেলা প্রাণভরে কীর্তন করব। তা আর হল কই?

তোমার একটু সাধু-সাধু ভাব আছে বটে।

নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেঘের ছায়ায়, বৃষ্টির ঘোরে চারদিকটা ছাইরঙা হয়ে গেল। দুৰ্জয় গরমটা উড়ে গেল কোথায়। ভেজা গায়ে বাতাস লেগে একটু শীতশীত করছে। আগে সঙ্গে সবসময়ে একখানা গামছা থাকত। তাতে ভারি সুবিধে। কিন্তু আজকাল বীণাপাণি গামছা নিতে দেয় না। ওটা নাকি ভারি ছোটলোকি ব্যাপার। পাঁচু দিব্যি তার গামছাখানায় ভেজা মাথা আর মুখ মুছে নিয়ে বসে আছে। নিমাইয়ের সে সুবিধে নেই। পকেটে একখানা বুমাল আছে বটে, কিন্তু তা দিয়ে গামছার কাজ চলে না। পাঁচুর গামছাখানা ধার নিতেও ইচ্ছে যায় না। বড় নোংরা।

গা গরম করতেই গুনগুন করে একখানা গান ধরেছিল নিৰ্মাই। কিন্তু কপালের এমনই ফের, যে গানটা মনে এল সেটার মধ্যেই বিষ মেশানো। আমার বন্ধুয়া আন-বাড়ি যায় আমার আঙ্গিনা দিয়া…। নিয়মিতই হবে। নইলে এ গানখানাই ভুস করে মাথায় ভেসে উঠল কেন? গান ধরতেই মনটা কু গেয়ে উঠল, বীণাপানির ওসব দোষ আছে কি? নিমাই তো ঝাঁঝালো পুরুষ নয়, পয়সার জোরও নেই। বীণার আর দোষ কী?

মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রুর কী জানিস পাঁচু?

পাঁচু একটু রাগ করে বলে, গানটা গাইছিলে তাই গাও না। বেশ তো শুনতে লাগছিল। এর মধ্যে আবার ওসব গন্ধমাদন কথা কেন?

না, বলছিলাম আর কি! মানুষের সব চেয়ে বড় শত্তুর হল তার মন।

আরে, ওসব জানি। ওসব হল তত্ত্বকথা। আমর মতো গরিবের মন কোথায় থাকে জানো? পেটে আর অণ্ডমোষে। সারাদিন রিক্সা টেনে মুখে রক্ত তুলতে তো বুঝতে, মনটন সব কোথায় গিয়ে সেঁধোয়। বরং গানটা গাও। কীৰ্তন শুনলে একটু ভাব আসে আমার।

নিমাই ফের গানটা ধরল। গলাটা খেলছে না ভাল। কিন্তু পাঁচু চোখ বুজে শুনছে গানটা শেষ করে নিমাই বলল, মন ভাল থাকলে দুনিয়াটা ভারি ভাল, আর মন বিগড়লে পরমান্নও তেতো।

আমি বলি কি, ছেলেপুলে করে ফেল এইবেলা। মনটন সব কায় এসে যাবেখন। সবাই বলে বীণাপাণি সিনেমায় নামবে বলে চেহারা রাখছে। তাই ছেলেপুলে হচ্ছে না। সত্যি নাকি?

নিমাইয়ের কান একটু গরম হল। বীণাপাণিকে নিয়ে বেশ কথা হয় এ অঞ্চলে।

পাঁচু দূরের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ওটাও অর্ধর্ম হচ্ছে, বুঝলে? আত্মারা সব চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের জন্মাতে না দেওয়াটাও পাপ।

ছোটলোকে যা ভাবে তাই বলে, সবসময়ে মাথা খাঁটিয়ে তো বলে না। নিমাই তাই চুপ করে থাকে।

পাঁচু নিজে থেকেই বলে, অবিশ্যি সিনেমায় নামলে অন্য কথা। তখন তো সোনার খাটে মাথা, রুপোর খাটে না। গাড়ি, বাড়ি, টাকায় ভাসাভাসি। টাকা থাকলে তখন আর পাপটাপ অৰ্শায় না। রাবণরাজার কথা তো জানো, স্বয়ং শিবঠাকুর তার বাড়ি চৌকি দিত।

বীণাপাণি সিনেমায় নামবে কিনা তা নিমাই জানে না। তবে ছেলেপুলে যে এখনই চায় না সেটা নিৰ্মাই জানে। স্টেজে উঠে মেলা নাচন কৌদন করতে হয়, গলা তুলতে হয় সপ্তমে, ওসব করতে গেলে শরীরের তাগদ চাই। ছেলেপুলে হয়ে পড়লে অসুবিধে আছে। আর নিমাই-ই বা কোন মুখে চাপাচাপি করবে। নিজেই যে দাড়ের পাখি হয়ে আছে।

বৃষ্টিটা ছাড়ল না। তবে চাপটা একটু কমল। চারদিকটা যেমন ধোঁয়াটে হয়ে গিয়েছিল তেমনটা আর নেই।

নিমাই বলল, চল, কাকার কাছ থেকে টাকাটা নিয়ে বাড়ি যাই।

পাঁচু নড়ল না। বলল, অত তাড়া কিসের? আজ টাকা পেতে দেরি হবে। হাঙ্গামা আছে।

কিসের হাঙ্গামা?

বটতলায় একটা ছেলে খুন হল না সেদিন? সেটা নিয়েই কী সব হচ্ছে-টচ্ছে।

সে তো পগা।

পগাই বটে নামটা। ডলার আর পাউন্ড বিকিকিনি করত।

সে শুনেছি।

তা তার মহাজন কলকাতা থেকে লোকজন নিয়ে এসেছে। পগার কাছে নাকি মেলা সাহেবী টাকা ছিল।

হ্যাঁ, মাঝে মাঝে … বলতেই যেন ভগবান জিবখানা টেনে ধরলেন। সে বলে ফেরতে যাচ্ছিল যে, বীণাপাণির কাছেও মাঝে মাঝে টাকা গচ্ছিত রেখে যেত। কথাটা পাঁচকান হওয়া ভাল নয়।

পাঁচু উদাস গলায় বলল, বড় বড় বানরের বড় বড় লেজ। কত খুনখারাপি হচ্ছে কেউ গা করে না। পগা মহাজনের লোক বলে এখন নাড়াঘাটা পড়েছে।

তাতে কাকার হাঙ্গামা হচ্ছে কেন?

কে জানে বাপু কি বৃত্তান্ত, নাম-ধাম শুনতে চেও না, তবে শোনা যাচ্ছে খুনটা যারা করেছে তারা কাকার দলের হোকরা সব।

আজকের দশটি টাকা পেলে নিমাইয়ের সত্তরটা টাকা হয়। আর তিনটে ক্ষেপ মারতে পারলে পুরো একশ। একশ হলেই পালপাড়া। মা-বাবার মুখে হাসির ঢল। নিমাইয়ের নিজের রোজগার বলে টাকাটার দামও কি একটু বেশী? কে খুন হল, সে সেটা করল আর কারা তার তত্ত্বতালাশ করতে এসেছে এসব নিয়ে নিমাইয়ের মাথাব্যথা নেই। তার ভাবনা হল, হাঙ্গামায় টাকাটা যদি আজ কাকা না দেয় তা হলে কাল এই বকেয়া টাকাটা দিতে কাকা ভুলে যাবে না তো? নাটক-পাগল লোক, ভুললে দোষ কি? তবে সমস্যা হল, মুখ ফুটে সেটা চাইতে পারবে না নিমাই। দিনের হিসেব দিনকে মিটে গেলেই ভাল।

দোকানটা কবে খুলছো?

নিমাই বেজার মুখ করে বলে, হবে।

হবে সে আমিও জানি। তবে মহেন্দ্ৰ মোটা টাকা ঘেঁকে বসেছে তো। ছহাজারের নিচে নামতে চাইছে না, না?

এ বাজারে দরটা আর নামাচ্ছে কে?

তবে তোমার বউ যখন লেগেছে ও হয়ে যাবে।

এ কথাটা নিমাই বুঝল না। বীণাপাণি তো আর বড়লোক নয়। কাকার দয়ায় খেয়ে পরে কোনওক্রমে আছে। একেবারে হাততোলা অবস্থা। শহরের বাইরের দিকটায় এবং ভিতর ভাগে একটুখানি জমি কিনতে দম শেষ হয়ে গিয়েছিল বীণার। বেড়া আর টিন দিয়ে যে ঘরখানা তুলেছে সে টাকার জোরে নয়, মনের জোরে। মহেন্দ্ৰ যে ছহাজার টাকা চেয়েছে সেটা জানতই না নিমাই। এই শুনল। ফলের দোকান এমন কিছু লাভের ব্যবসা নয়। বনগাঁয়ে ফলটা খাবে কে? পুজোআচ্চায় কলাটা শশাটা কিছু বিক্রি হয় আর সিজন ফল। দুহাজার টাকা সেলামি দিলে সে টাকা উসুল করতে নিমাইয়ের বহু বছর চলে যাবে। আজই গিয়ে বীণাকে বারণ করতে হবে।

পাঁচু উদাস মুখে বলল, মনোহারি দোকানেও খরচাও আছে। কম করেও পনেরো বিশ হাজার টাকা লাগসই না করলে হবে না। তার ওপর ধরো কাচের বাক্স, আলমারি এসবেরও খরচ ভালই।

নিমাইয়ের মাথায় ছোটো একটা বজ্ৰাঘাত হল। একদিন ঠাট্টা করে মনোেহরি দোকানের কথা বলেছিল বটে বীণা। তা হলে সে কাণ্ডই হতে যাচ্ছে! নিমাইয়ের চোখটা ঘোলাটে হয়ে এল। এসব হচ্ছেটা কী? বীণার ট্যাকের তত এমন জোর। নেই। আর এসব ঘরের কথা তাকে পাঁচুর মুখেই বা গুনতে হচ্ছে কেন? মনোহারির কথা, ছহাজার সেলামির কথা তো তাকে বলেনি বীণা! এদিকে বাজারে তো চাউর হয়েছে দেখা যাচ্ছে।

পাঁচু তেমনি উদাস মুখে বলে, বিয়ে তোমার সয় না বলছিলে। তা দেখ বাপু, তোমার মতে বউ এ তরাটে এটা লোকের আছে। তোমার মুবোদ না থাক বউ তো দশভুজার মতো আগলাচ্ছে।

কোনও কারণ নেই, তবু নিমাই তাড়াতাড়ি বলল, হ্যাঁ, বীণার মতো মেয়ে হয় না। আসলে বলতে চেয়েছিলুম কি জানিস, বীণার মতো বউ কি আমার কপালে জোটা উচিত। আমি কি একটা মনিষ্যি?

পাঁচু তার ক্ষয়া দাঁতে হাসল, তা যাই বলো বাপু, কার ভিতরে কী আছে ভগবান জানে। তোমার কথা বলতে হয় তো বলি, যখন কীর্তন গাও তখন কিন্তু মনটা ভারি ভিজে যায়। তোমার গলায় যেন হরি এসে বসেন।

নিমাই লজ্জার হাসি হাসল, হরির আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই।

পর পর দুখানা গাড়ি, একখানা জীপ আর একখানা মারুতি বটতলার দিকে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেল।

পাঁচু বলল, ওই যাচ্ছে।

কে রে?

ওই যারা কলকাতা থেকে এসেছে। জিপ আর মারুতি নিয়ে।

এত কথা তোকে কে বল?

সকাল থেকে কাকার বাড়িতে রিক্সা ঠেকিয়ে বসেছিলুম তো। ওখানকারই সুধীর বলল। সে কাকার অপেরার একজন বাজনদার। মুখ-পকা তোক।

চিনি।

কলকাতার বাবুরা চলে গেল বোধ হয়। আবার আসবে ঠিক। একটা গণ্ডগোল পাকাচ্ছে। মারদাঙ্গা লাগবে মনে হয়। যাবে নাকি? গেলে বলো, এখন একটু ফাকায় পাওয়া যাবে তেনাকে।

নিমাই রিক্সায় উঠে বসল। তার বুকে বড় ভয়। বীণাকে এই এত এত টাকা জোগাচ্ছে কে? খুব বড় কোনও বাবু? কথাটা মুখোমুখি জিজ্ঞেস করতেও তত বাধে। কে দিচ্ছে টাকা? তার চেয়েও বড় কথা, কেন দিচ্ছে? সিনেমায় নামার যে কথা শুনছে পাঁচুর মুখে সেইটিই কি সত্যি নাকি? বীণাকে নিয়ে যে এত মাথা ঘামাতে হবে তা জানা ছিল না তার।

কাকার বাড়িতে আজ থমথমে ভাব। বাইরের ঘরখানায় যারা গম্ভীর মুখে বসে আছে কাকাকে ঘিরে, তারা কেউ যাত্রার দলের নয়। এরা কাকার অন্য দিককার লোক। স্মাগলার কাকা আর যাত্ৰাদলের কাকা দেহে এক হলেও দুটো আলাদা। আলাদা মানুষ। এখন যে মানুষটা ঘরে সবার মধ্যমণি হয়ে বসা সে মোটেই যাত্ৰাদলের কাকা নয়। একে দেখলেই বুক দুরদার করে।

কাকার বাড়িখানা পাকা আর দু মহলা। মহল না হলেও দুখানা আলাদা ভাগ আছে। সামনের বৈঠকখানা গোছের ঘরখানা বাড়ি থেকে অন্তত দশ বারো গজ তফাতে। গোটা বাড়ি দেয়ালবন্দী। গাছপালা আছে।

ঘরের ভিতরকার চেহারা বারান্দা থেকেই দেখতে পাচ্ছিল দুজন। গতিক সুবিধের নয়।

একটা ছোকরা এগিয়ে এসে বলল, কী চাই।

পাঁচু বলল, আমাদের মজুরীটা?

এখানেই দাঁড়াও। বলে ছেলেটা ঘরে গেল আর পরমুহূর্তেই বেরিয়ে এসে মজুরীর টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, কাকা বলে দিয়েছে কাল থেকে আর বেরোতে হবে না। এখন যাও।

নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। একশ পুরল না।

বাড়ি যখন ফিরল তখন নিমাইয়ের বুকখানা বড় ভার। অনেক কথার জবাব খুঁজে পাচ্ছে না। অনেক কথার জবাব সে কখনও পাবেও না।

হাতমুখ ধুয়ে যখন ঘরে ঢুকে বসল তখন বীণাপাণি উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে একটা খাতায় কী যেন লিখছে।

কী লিখছো?

ও কিছু নয়। একটা হিসেব।

নিমাই একটু গলা খাকারি দিয়ে বলল, শুনলুম মহেন্দ্র অনেক টাকা সেলামি চাইছে।

কে মহেন্দ্ৰ?

যার দোকান নেবে বলে ঠিক করেছো!

বীণা মুখ তুলে বলল, নিইনি এখনও। কথা বলছি।

কী দরকার? ছহাজার টাকা কি সোজা কথা? আমাদের অত টাকা তো বেচলেও উঠবে না।

তোমাকে ভাবতে কে বলেছে?

না ভেবে কি পারি? তোমার জন্যই ভাবি আমিও তো তোমার জন্য ভাবি বলেই করছি।

সে খুব জানি। তোমার মতো মেয়ে হয় না। সদ্বংশে জন্মেছো, তোমার ধরনই আলাদা। তবু বলি টাকাপয়সা হাতে রাখো। মহেন্দ্ৰ যা টাকা চাইছে তা আমাদের নাগালের বাইরে। আমার চাকরিটাও আজ থেকে নট হয়ে গেল।

বীণা অবাক হয়ে বলে, কেন? কাকা তো বলছিল আউরঙ্গজেব খুব ঘটা করে নামাবে। দু মাস ধরে মাইকে প্রচার হবে।

কী সব গণ্ডগোর শুনে এলুম।

কিসের গণ্ডগোল।

ওই যে পগা খুন হয়েছিল, তার মহাজন আজ এসেছে পাইক-পেয়াদা নিয়ে। অনেক নাকি সাহেবী টাকা ছিল পগার কাছে। সেই সব খোঁজ-খবর হচ্ছে আর কি!

তাতে কাকার কি?

কাকার সঙ্গেই তো গণ্ডগোল। খুনটা নাকি তার দলের ছেলেরাই করেছে।

সন্ধের মরা আলোতেও দেখা গেল বীণাপাণির মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। লেখা ছেড়ে উঠে বসল সে, আর কী শুনে এলে?

এইটুকুই। কাকার ঘরে আজ সব ষণ্ডারা জুটেছে। শলাপরামর্শ হচ্ছে।

তোমাকে কে বলল?

বাতাসে কথা উড়ছে। রিক্সাওলাটা অবধি সব জানে।

বীণা হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর আর দুঃখী হয়ে বসে রইল। এ সময়টায় নিমাই ফিরলে উঠে রুটি বা মুড়ি চানাচুর যা হোক কিছু দেয়। আজ নড়ল না।

নিমাই বিছানার একধারে পা তুলে বসল। বলল, আজ ঠাণ্ডা লেগেছে। যা আচমকা বৃষ্টিটা এল।

বীণা হঠাৎ তার দিকে চেয়ে বলল, কাল সকালে বিষ্টুপুর যাই চলো।

বিষ্টুপুর। সেখানে কেন?

মা দেখতে চেয়েছে আমাকে। বাবার চিঠি এসেছে আজ।

তা আমার আর কাজ কি? গেলেই হয়। বাড়ি দেখবে কে?

দেখার লোক আছে। এখনই গোছগাছ করে নিই চলে। সকালের বাস ধরব।

গোছগাছ বেশী নয়। একখানা সুটকেসে সবই এঁটে যায়। বীণা তবু আর একখানা টিনের বাক্স নিল। তারপর হঠাৎ বলল, দোকান থেকে একটু মিষ্টিটিস্টি কিনে আনো তো! বাবা খুব গুজিয়া ভালবাসে।

গুজিয়া এনে নিমাই দেখল, গোছানো শেষ।

খেয়েদেয়ে সকাল সকালই বিছানায় গেল দুজন।

সকালের বাস পাঁচটায়। ভোরে না উঠলে হবে না।

কত রাত হবে কে জানে, হঠাৎ দরজায় ধাক্কা পড়ল।

বীণা? এই বীণা? দরজা খোলো!

দুজনেই উঠে বসল। ভয়ে সিটিয়ে থেকে বীণা বলল, কে?

আমি কাকা। দরকার আছে। দরজা খোলা।

অন্ধকারে বীণা হঠাৎ হাত বাড়িয়ে নিমাইয়ের একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে চাপা গলায় বলল, বড় ভয় করছে।

০১৪. মায়ের সঙ্গে ঝুমকির বোঝাপড়ার অভাব

মায়ের সঙ্গে ঝুমকির বোঝাপড়ার অভাবটা অনেক দিনের পুরনো। এতই পুরনো যে এখন ব্যাপারটা তার গা-সওয়া, অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। কি থেকে কি হয়, কেমন করে হয় তা জানে না ঝুমকি। শুধু জানে, তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সেই মায়ের সবচেয়ে অপছন্দের সন্তান। সে বড়, সে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েনি, সে একটু অলস, একটু প্রতিবাদী—এগুলো দোষ কিনা কে বলবে? কিন্তু তার মা অপর্ণার চোখে সবটাই তার দোষ। তার সব কিছুর মধ্যে দোষ। এ সংসারে মোট পাঁচ জনের মধ্যে ঝুমকির পক্ষে আছে একমাত্র তার বাবা।

তার বাবার হার্ট অ্যাটাকের পর এ বাড়িতে চলে গেল ভূতের হাতে। শোক, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ পাথরের মতো চেপে বসল বাড়িটার ওপর। মায়ের সঙ্গে ঝুমকির ব্যক্তিত্বের সংঘাত কটা দিন নিরুদ্দেশ ছিল। বাড়িটা নিঝুম আর চুপচাপ হয়ে রইল কিছুদিন।

বাবার সামাতিক বিপদের অবস্থাটা খানিকটা সামাল দেওয়া গেছে। হার্টের ব্যাপার অবশ্য সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। সুস্থ হয়ে ওঠার পরই হয়তো আর একটা মারাত্মক অ্যাটাক এসে সব হিসেব ওলটপালট করে দেয়। তবু সংকট কাটিয়ে উঠছে তার বাবা। ব্যথা নেই, ঘুমের ওষুধ কম দেওয়া হচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যেই ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে কেবিনে স্থানান্তরিত করা হবে তাকে।

কাল থেকে তাই, এ বাড়ির ওপর থেকে ভূতুড়ে ও ভারী আবহাওয়াটি খানিক ফিকে হয়েছে। স্বস্তির শ্বাস ফেলছে তারা। আর সেই সঙ্গে সঙ্গেই লুকোনো গর্ত থেকে সাপখোপ বেরিয়ে পড়ছে নাকি? নইলে আজ সকালে ঝুমকি একটু বেশীক্ষণ ঘুমোনোর জন্য অপর্ণা ওরকম রেগে যাবে কেন?

শুধু ঝুমকির সঙ্গেই লাগে অপর্ণার। আর কারও সঙ্গে নয়। মণীশের সঙ্গে অপর্ণার অনেক বিষয়েই মতান্তর আছে, তবু ঝগড়া হয় না কখনোই। এক গভীর ভালবাসা বুঝি দুটি উলের কাঁটাকে পরস্পরের সঙ্গে নানা নকশায়, নানা বাঁধনে ও সম্পর্কে বেঁধে রাখে। ছেলে বুবকা মা অপর্ণার কাছে যেন এক দেবদূত। যখন ছেলের দিকে অপর্ণা তাকায়, তখন চোখ দুখানা স্বরাতুর হয়ে যায়। যখন ছেলেকে ডাকে অপর্ণা, তখন গলায় যেন রবীন্দ্রসঙ্গীত এসে পড়তে চায়। অনু ততটা নয় বটে, কিন্তু অনুরও একটা বি আছে। সে কোলপোছা সন্তান, অর্থাৎ মণীশ ও অপর্ণার আরও সন্তান-সম্ভাবনার ওপর দাড়ি টেনে তার আসা। অনু লেখাপড়ায় ভীষণ ভাল, খুব বুদ্ধিমতী। বুদ্ধিমতী বলেই সে মায়ের কাছে সরলা বালিকা সেজে থাকে। অন্য সময়ে দারুণ অ্যাডাল্ট।

ঝুমকি বারবার নানাভাবে এই পাঁচ জনের সম্পর্ক বিচার ও বিশ্লেষণ করেছে। শুধু মায়ের সঙ্গে তার শত্রুতা ভিন্ন এ সংসারে তেমন কোনও অশান্তি নেই।

আজ সকালে তার ঘুম ভেঙেছে অপর্ণার বকুনিতে। বউনিটাই খারাপ।

কাল যে অনেক রাত অবধি ঘুমোয়নি ঝুমকি, অপর্ণা তা জানে না। বলল, কাজ করার ভয়ে মটকা মেরে পড়ে আছিস। তোকে হাড়ে হাড়ে চিনি। এত বড় মেয়ে, সংসারের কাজে এতটুকু সাহায্য পাই না তোর। কিসের চিন্তায় বিভোর থাকিস শুনি!

হতচকিত, শঙ্কিত ঝুমকি উঠে বসে ঘুমচোখে দুনিয়াকে খান খান হয়ে যেতে দেখে বলল, রাতে ঘুম হয়নি। ইনসোমনিয়া হয়েছিল

কবে তোর সকালে ঘুম ভাঙে! রোজ কারও ইনসোমনিয়া হয়। এ সংসারটা কি আমার একার?

তার বিচ্ছিরি সর্দির ধাত আছে, টনসিল আছে। মাঝে মাঝে পেটে গ্যাস হয়। তা ছাড়া তার কিছু অদ্ভুত চিন্তাভাবনা আছে। ঝুমকি যে মাঝে মাঝে. রাতে ঘুমোতে পারে না তার কারণ খানিকটা শরীর, খানিকটা মন। কিন্তু এসব শৌখিন কথা, সূক্ষ্ম যুক্তি, তার মা কখনও মানতে চায় না।

অপৰ্ণা আজ অনেকক্ষণ বকল মেয়েকে। অনেকক্ষণ। যেন বেশ কিছুদিন ধরে জমানো বিষ একসঙ্গে ঢেলে দিল। এমন নয় যে, ঝুমকি এক তরফা বকুনি খায়। উল্টে সেও ঝগড়া করে। প্রায়ই ঝুমকি মাঝে মাঝে বুঝতে পারে, তার শরীরের নানা অস্বস্তির কারণেই সে নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। মাঝে মাঝে সে খিটখিটে হয়ে যায়। রেগে যায়।

আজ ঝুমকি মায়ের কথার একটাও জবাব দেয়নি। একতরফা শুধু সহ্য করেছে। দাঁত বুরুশ করে, চুল আঁচড়ে এবং কিছুটি না খেয়ে সে নিজের ঘরে জানালার কাছে তার বিছানায় বসে আছে এখন। রাগ করলে সে কিছু খায় না। চা অবধি নয়। আর সেই জন্যই অশান্তি আরও বাড়তে থাকে। অপর্ণা রাগের ওপর আরও গতে থাকে।

ঠিক এ সময়ে—যখন অপর্ণা রান্নঘর থেকে তার চিকন গলায় কিছু শব্দভেদী বাণ নিক্ষেপ করছিল–ঠিক সেই সময়ে। পড়ার টেবিল থেকে একটা স্বপ্নস্বপ্ন মুখ নিয়ে উঠে গেল অনু।

মা!

অপর্ণা ঝাঝালো চোখে কাল মেয়ের দিকে, কী বলছিস?

আমাদের বোধ হয় এখন চুপ করে থাকা উচিত।

কেন, চুপ করব কেন?

আমার মনে হয় এখন আমাদের পিস অফ মাইন্ড দরকার। বাবা তো এখনও বাড়ি ফেরেনি!

তাতে কি হল? বাপের জন্য কারও মাথাব্যথা আছে? নাকি মায়ের জন্যই আছে?

খুব নরম পাখির মতো গলায় অনু বলল, আমাদের কিছু সুপারস্টিশন মানা উচিত। একটা রিচুয়াল আছে। এসব করলে হয়তো একটা পলিউশন হয়।

পলিউশন! কিসের পলিউশন?

সায়েন্টিস্টরা বলছেন, মানুষ যে মানুষের ওপর রেগে যায়, গালাগাল করে, অপমান করে—সেটাও পলিউশন। তাতেও ক্ষতি হয়।

এসব কোথায় শিখছিস?

হয় মা, সত্যিই। আমার মনে হয় বাবা সম্পূর্ণ রিভাইভ করা পর্যন্ত আমাদের চুপ করে থাকা উচিত।

অপর্ণা কি বুঝল কে জানে, হঠাৎ বলল, ঠিক আছে, চুপ করব। তোর দিদিকে ধরে এনে কিছু খাওয়া, তাহলে চুপ করব।

দ্যাটস এ গুড গার্ল! বলে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে গালে চকাম করে একটা চুমু খেয়ে অনু দিদির কাছে এল।

ঝুমকি একটু শক্ত হয়ে ছিল। অনু আর অপর্ণার কথা সে সব শুনেছে। সে সহজে ভাঙবে না।

অনু এসে ঝুমকির পাশে বসল। তারপর বলল, দিদি, ফর মাই সেক, টু সেভ মাই ফেস, একটু খা।

না। আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।

আমি ফ্রুট জুস করে দিচ্ছি, আর টোস্ট। নিজে করব।

তোকে কিছু করতে হবে না। আমি তো ভেসে এসেছি, আমার জন্য কিছু করার দরকার নেই।

ভেসে আসবি কেন? এ বাড়ির সত্যিকারের গার্সিয়ান কে বল তো! বাবা যখন বাড়িতে থাকে না তখন মা নয়, আমি। তোকে গার্জিয়ান বলে ভাবি।

আমি গার্জিয়ান হতে চাই না। তুই এখন যা, জ্বালাতন করি না।

অনু গেল না, তবে উপরোধ অনুরোধ করল না। গা ঘেঁষে চুপ করে বসে রইল।

ঝুমকি মুখ ফিরিয়ে বোনের দিকে চেয়ে বলে, বসে আছিস যে বড়!

অনু ছলছলে চোখে দিদির দিকে চেয়ে বলে, তোর জন্য কষ্ট হচ্ছে।

আমার জন্য তোদর কষ্ট হবে কেন? আমাকে বোধ হয় এরা কোথাও কুড়িয়ে পেয়েছিল। নইলে আমার সঙ্গে সবসময়ে এরকম করত না।

কিন্তু সেটা তো খুব রোমান্টিক ব্যাপার, তাই না?

রোমান্টিক! কিসের রোমান্টিক?

ধর আমি যদি চাইল্ডহুডে হারিয়ে যেতাম আর যদি কেউ মানে কোনও কাপ আমাকে কুড়িয়ে পেত, তাহলে কিরকম থ্রিলিং হত ব্যাপারটা! আমি জানতে পারছি না কে আমার মা-বাবা, আর তারাও আমাকে সার্চ করে বেড়াচ্ছে—উঃ, দারুণ ব্যাপার।

মোটেই দারুণ নয়।

আমার কাছে কিন্তু খুব থ্রিলিং লাগে। ইন ফ্যাক্ট, আমি মাঝে মাঝে চুপ করে বসে ভাবি যে, আমার আসল মা-বাবা এরা নয়, অন্য কেউ। আমাকে এরা কোনও ডেস্টিটিট, হোম থেকে বা অন্য কোন জায়গায় কুড়িয়ে পেয়েছে। আই অ্যাম অলরাইট হিয়ার, নো প্রবলেম। কিন্তু অন্য কোথাও আমার আসল মা-বাবা আমার কথা দিনরাত ভাবছে, আমাকে খুঁজছে, আমার জন্য কাঁদছে। কী ইম্পৰ্ট্যান্ট ওদের কাছে এই লস্ট আমিঃ রিয়েল পেরেন্টরা তো একটু বোরিং। কিন্তু লস্ট পেরেন্টরা ভীষণ রোমান্টিক, তাই না?

ঝুমকি চুপ করে রইল। তবে তার মুখে একটু স্মিত হাসি।

অনু মৃদু স্বরে বলে, একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোকে? ডোন্ট প্লে বিগ সিস্টার, প্লীজ! তোর কোনও বয়ফ্রেন্ড হয়নি?

ঝুমকির মুখ এ কথায় সামান্য কঠোর হয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে চাপা গলায় বলল, আমার কেন ওসব হবে? আমার তো কিছু নেই। না রূপ, না গুণ।

ডোন্ট ন্যাগ দিদি। সবাই জানে তুই কেমন।

আমি কেমন?

কোয়াইট অল রাইট। ইউ আর বিউটিফুল ইন ইওর ওন ওয়ে। কিন্তু তুই ভীষণ মেজাজী। আজকালকার ছেলেরা রাগী মেয়েদের ভয় পায়।

রাগী! কই আমি তো রাগী নই।

ভীষণ রাগী। তার মানে ইউ হ্যাভ এ পারসোনালিটি। ওটা সকলের থাকে না। রেয়ার। পারসোনালিটি মিনস স্ট্রং লাইকস্ অ্যান্ড ডিজলাইকস্। আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে, আমার মধ্যে বা দাদার মধ্যে পারসোনালিটি কিছু নেই।

খুব কথা শিখেছিস।

আমি যখন বড় হবো, ঠিক তোর মতো হবে। একটু মব, একটু অহংকারী, একটু দেমাক আর মেজাজ হবে। কেউ চট করে কাছে ঘেঁষতে পারবে না। তবে তখন একটা প্রবলেম হবে।

কি প্রবলেম?

যারা স্ট্রং পারসোনালিটির হয় তারা কিন্তু একটু লোনলি। চট করে কারও সঙ্গে মিশতে পারে না তো। তাই দে আর ন্যাচারালি লোনলি সোলস্।

খুব পেকেছিস তো।

আমি এসব নিয়ে খুব ভাবি। পিপল অ্যান্ড দেয়ার ক্যারেকটারিস্টিকস।

তোর কোনও ছেলে-ছোকরার সঙ্গে ভাব নেই তো!

অনু এ প্রশ্ন শুনে খিলখিল করে হাসল, সেই তো দিদিগিরি শুরু হল। বিগ সিস্টার, আমি তো কোড-এ পড়ি। দেয়ার আর বয়েজ অ্যান্ড বয়েজ। কিন্তু ফ্রেন্ড একটাও নয়।

কেন?

আমার কনটেম্পোরারি ছেলেগুলোর ডেপথ্‌ ভীষণ কম। মগজ নেই। মনে হয় অল আর কম্পিউটার।

ঝুমকি কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, তাহলে তোর কী হবে রে?

কেন, আমার তো একটু এজেড, একটু এরুইট, একটু ফিলজফিক পুরুষকে বেশী ভাল লাগে। মানে মেন উইথ পারসোনালিটি। তোর?

ঝুমকি বিষণ্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলে, আমার যে কী ভাল লাগে, আমি বুঝতেই পারি না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্য একটা ফ্যামিলিতে গিয়ে–মানে বিয়ের পর—একটু অন্যরকম লাগতে পারে।

অনু চোখ বড় বড় করে বলে, তুই এখনই বিয়ের কথা ভাবছিস? সত্যি!

আহা, ভাবতে দোষ কি? ভাবা তো কিছু খারাপ নয়। ভাবা আর করা কি এক?

এনিওয়ে, আমি তো ভাবতেই পারি না।

আমার মতে বয়স হোক, তারপর ভারবি।

অনু ফের হাসে, সেই দিদিগিরি। তুই আমার চেয়ে কতই বা বড়। ইউ আর স্টিল ভেরি টেভার এজেড।

তোর মাথা! মা এখন আমাকে বিয়ে দিয়ে বিয়ে করতে পারলে বাঁচে। আমি শুনেছি, মা প্রায়ই বাবাকে আড়ালে আবড়ালে বলে, ঝুমকির কিন্তু বয়স হল, পাত্র দেখতে থাকে।

হি হি। মা একটু পাগলি আছে, না রে?

একটু সেকেলে।

তুইও একটু সেকেলে। আচ্ছা, মা যখন ওকথা বলে, তখন বাবা কী জবাব দেয়?

বাবা উড়িয়ে দেয়। বলে দুর দুর। এখনই বিয়ের কি!

বাবারা ওরকমই হয়। আচ্ছা দিদি, তোর কি খিদে পায় না? সত্যিই পায় না?

আবার ও কথা! পারলে আমি এ বাড়ির খাওয়া ছেড়েই দিতাম।

আহা, রাগের কথা বলছি না। কিন্তু এমনিতেই দেখি, তোর মিল খুব গ্যাল। একটুখানি করে বাস। চড়াই পাখির মতো। কিন্তু আমি আর দাদা খুব খাই।

আমার স্টমাকটা বোধ হয় ছোটো। খেতে আমার ভাল লাগে না।

কিন্তু তুই খুব ফুচকা খাস, আর তেলেভাজা। তাই না?

ঝুমকি হাসল, খাই। আর অম্বল হয় ভীষণ। তবু খাই।

আমি ফুচকাটা স্ট্যান্ড করতে পারি না। তেলেভাজাও না। ভীষণ আনহাইজিনিক। হাইজিন ভেবে খেলে শুধু শুকতো আর ঝোল খেতে হয়। মা গো!

তুই পাতে ভাত ফেলিস, আমি ফেলি না।

আমিও ফেলতে চাই না। কিন্তু মা যে জোর করে বেশী তাত দেয়।

মা পাগলি আছে। আমার কাছে একটা চকোলেট বার আছে, খাবি?

না।

রাগ করছিস কেন বাবা! আমার সঙ্গে তো ঝগড়া নয়।

রান্নাঘরে উৎকর্ণ হয়ে আছে অপৰ্ণা। দুই বোনে গুনগুন করে কথা হচ্ছে ঘরে। কি কথা হচ্ছে ওদের? ঝুমকি কেন এখনও কিছু খাচ্ছে না? খাওয়া নিয়ে বরাবর ঝুমকির নাক সিঁটকানো। কোনওদিন কোনও খাবার খেয়ে বলে না, উঃ, দারুণ হয়েছে তো! কোনওদিন বলে না, মা ওমুক জিনিসটা রাধবে? খাওয়াটাই যেন ওর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে অপছন্দের কাজ। সেই জন্যই রোগা, সেই জন্যই ওর শরীরে হাজারো রোগ। আর সেইজন্যই ওর অপর অপর্ণার এই রাগ। সেই শিশুকাল থেকে ওকে খাওয়াতে হিমসিম খেয়েছে সে, গলদঘর্ম হয়েছে, মেরেছে, বকেছে, কেঁদেছে। আজ অবধি স্বভাব পাল্টাল না। একটা জিনিস চেয়ে খায়, সেটা চা। কিন্তু চা তো কোনও খাদ্য নয়। বরং অনিষ্টকারী। বিশেষ করে খালি পেটে।

অপর্ণার চোখ কড়াইয়ের দিকে। মাংস ফুটছে। কিন্তু তেমন ভাল গন্ধ বেরোচ্ছে না। কী একটা জিনিস দিতে ভুল হয়েছে। কিন্তু মনে করতে পারছে না সে। মেজাজ বিগড়ে আছে, মাথা কাজ করছে না। আরও পনেরো মিনিট দেখবে অপর্ণা। তার মধ্যে ও যদি না যায় তাহলে–

এই তাহলে-টা নিয়েই হল মুশকিল। তাহলে কী করবে অপর্ণা? ওকে ধরে মারবে, না আরও বকবে? কিন্তু লাভ হবে তাতে? আরও শক্ত, আরও গোঁজ, আরও গুটি পাকিয়ে যাবে। না হলে ঝগড়া করবে। অথচ ঝুমকিকে নিয়ে তার চিন্তার অর্ধেক ব্যাপৃত থাকে সবসময়ে। এই মেয়েটাকে কিছুতেই বুঝতে পারে না সে। একদম খোলামেলা নয়, অপর্ণার সঙ্গে বসে কখনও গল্প করে না। থাকে একটেরে। আলগোছ। কথা যেটুকু বলে তা বাবার সঙ্গে।

মণীশের প্রাণাধিক তিনজনই। ঝুমকি, বুবকা, অনু। তবু বুঝি ঝুমকিরই কিছু বেশী বশীভূত সে। বোগা, দুর্বল, অ্যালার্জিক এই মেয়েটিকে শাসন-টাসন করা একদম পছন্দ করে না মণীশ। বলে, ওকে ওর মতো থাকতে দাও। কোনও ব্যাপারে জোর জবরদস্তি কোরো না।

মণীশের বুদ্ধি পাকা নয় বলেই বলে। জবরদস্তি না করলে কি বাঁচিয়ে রাখা যেত ওকে এতদিন! উপপাস করেই তো মরে যেত।

ডাক্তাররা বলে, খেতে না চাইলে খেতে দেবেন না। একদিন দুদিন তিনদিন যদি খাওয়া নিয়ে পেশার না দেন তাহলে আপনা থেকেই খাবে।

ওসব ডাক্তারি বিদ্যেতে বিশ্বাস নেই অপর্ণার। মেয়ে তো আর ডাক্তারের নয়, তার। সে জানে, মেয়ে না খেয়ে থাকলে মায়ের ভিতরটা কেমন হয়।

পনেরো মিনিট পার করে অপর্ণা প্রস্তুত হল। আর একবার বকুনি দেওয়া দরকার। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। মাংসটা চাপা দিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল অপৰ্ণা। মাথাটা গরম।

ঝুমকির ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল সে। চোয়াল ও ঠোঁট কঠিন।

অনু তাকে দেখে এক গল হেসে হাত বাড়িয়ে বলল, কম অন মম, জয়েন দা ক্রাউড।

আমি জানতে চাই, এসব আর কতক্ষণ চলবে।

মাংস হলেই দিদি ভাত খাবে।

অপর্ণাকে দেখেই ঝুমকি জানালার বাইরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। অপর্ণা বলল, কথাটা আমি ওর মুখে শুনতে চাই।

অনু একটা ঠেলা দিয়ে বলে, দিদি, বল না। বলব না।

অনু কবুণ চোখে মায়ের দিকে চেয়ে বলে, মা, ইটস নাউ এ প্রেস্টিজ ইস্যু। দিদি এখন কমিট করলে ওর ইগো একটু উন্ডেড হবে। তোমার রান্না কি রেডি?

হয়ে এসেছে।

তাহলে যাও না, আমি দিদিকে ঠিক নিয়ে যাব।

অপর্ণা সামান্য শান্ত হল। বলল, যতক্ষণ রেডি না হচ্ছে ততক্ষণ এক কাপ দুধ খেয়ে নিতে বল।

অনু চোখ বড় বড় করে বলে, দুধ! মাই গড, দুধ আবার কবে দিদি খায়। মা, ইউ আর গোয়িং টু ফার। মাংসটা হোক, দিদি খাবে।

আমি কোনওকালে শুনিনি যে, বাচ্চারা দুধ খায় না। সব বাড়িতেই একটা নিয়ম আছে। মা যা দেয়, ছেলেমেয়েরা তাই খায়। শুধু এ বাড়িতেই উল্টো।

অনু হাসছিল। বলল, আমার বন্ধুদের মধ্যে কেউ দুধ-টাপ খায় না মা। সব বাড়িতেই এ নিয়ে খুব ফাইট হয়।

খুব জ্ঞান হয়েছে দেখছি।

তবে অপর্ণা আর কথা বাড়াল না। যদি খায় তবেই বাপের ভাগ্যি। সংসারটা আজও অপর্ণা বুঝতে পারে না, ঠিক কেমন। ভাল না মন্দ? প্রয়োজন, নাকি না হলেও চলে? মণীশের সঙ্গে যখন তার ভালবাসা হল তখন মণীশ প্রায়ই বলত, তাদের এক ডজন ছেলেপুলে হবে। দি মোর দি মেরিয়ার।

অপর্ণা বলত, তাহলে তোমাকে পুলিশে দেবো।

কোন অপরাধে। ছেলেপুলে হওয়া তো বে-আইনি নয়।

না হলেই কি? পুলিশের কাছে বলব, এ লোকটা অত্যাচারী। জোর করে—

আরে না ভাই, ওসব ঠাট্টার কথা। তোমাকে তা বলে কষ্ট দেববা নাকি? কিন্তু আগেকার দিনে তো হত।

তখন ফ্যামিলি প্ল্যানিং ছিল না। বেশী ছেলেপুলে হলে কি হয় তা তো জানো। একটি সন্তানই যথেষ্ট। ভালভাবে মানুষ করা যাবে।

শেষ অবধি তিনটে হল। তাতে অপর্ণার বিশেষ আপত্তি হয়নি। কিন্তু এখন ভাবে, এ তিনজন তাদের দুজনকে তিনরকম দুশ্চিন্তায় রাখছে। একটা তো হল, ঠিকমতো বড় হবে কিনা! অসুখ-বিসুখ অ্যাকসিডেন্ট হবে না তো! মানুষ হবে তো! ড্রাগ-ফাগ ধরবে না তো! চরিত্র ঠিক রাখতে পারবে তো! হাজার রকমের প্রশ্ন আর প্রশ্ন।

এটা কি প্রেমের খাজনা? ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটু অচেনা মাত্রাও যোগ হচ্ছে ক্রমে ক্রমে। যত বড় হচ্ছে তত কি নাগালের বাইরে যাচ্ছে। এই অচেনা ভাবটা সহ্য করতে পারে না সে।

ডোর বেল বাজল। দরজা খুলল অনু। বুবকা দরজার কাছ থেকে চেঁচাল, মা! গুড নিউজ! অপর্ণার বুক কেঁপে ওঠে। গুড নিউজ শুনেও ওঠে।

কি হল আবার?

দু ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে বাবার সঙ্গে এক মিনিট কথা বলতে পেরেছি।

কথা বলল। অপর্ণার অন্ধকার অভ্যন্তর যেন আলোয় ভরে গেল হঠাৎ। এ কয়দিন শুধু ঘুমন্ত মণীশকে দেখে এসেছে তারা। এখনও কথা হয়নি। মণীশের কণ্ঠস্বর প্রায় ভুলেই গেছে অপর্ণা।

কী বলল?

বুবকা মাকে দুহাতে ধরে বলল, তুমি কাঁদবে নাকি? চোখ তো টলমল করছে। বাবার কাছে যেতেই দিচ্ছিল না। অনেক ধরে করে যখন গেলাম তখন সেডেটিডের অ্যাকশন বেশী ছিল না। খুব টেনশন ছিল মুখে। আমি যেতেই বলল, তোেরা কেমন আছিস? কি করে চলছে।

গলার স্বর কেমন ওনলি? নরমাল?

নরমাল। তবে একটু হাকি। আমি বললাম, আমরা খুব ভাল আছি। কোনও গণ্ডগোল নেই।

একটু হাসল কি?

একটুখানি। আর কিছু বলার আগেই নার্স বের করে দিল। আর একটা গুড নিউজ হল, বাবা সকালে স্যুপ খেয়েছে। নিজেই। নো হেলপ। আজকেই হয়তো কেবিনে ট্রান্সফার করতে পারে।

অপর্ণার দুচোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ে ভেসে যাচ্ছে বুক। মণীশ ফিরবে। মণীশ ফিরছে। পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশী অপর্ণা আর কী চাইতে পারে?

দুটো পেলব হাত পিছন থেকে তাকে ধরল, মা।

অপর্ণা চোখের জলের ভিতরে দিয়ে ঝুমকির অস্পষ্ট মুখটা দেখতে পেল! মান অভিমান রাগ ভেসে গেল কোথায়। দুহাতে ঝুমকিকে আঁকড়ে ধরে তার বুকেই মাথা গুঁজে দিল সে। যেন সে বাচ্চা মেয়ে, মায়ের বুকে আশ্রয় খুঁজছে।

 ০১৫. দুদুটো প্রেমে পড়ে গেল হেমাঙ্গ

এক সপ্তাহের পর পর দুদুটো প্রেমে পড়ে গেল হেমাঙ্গ। একেই বলে ইন কুইক সাকসেশন। কুইক সাকসেশন কথাটার সঠিক বাংলা কী হবে? উপর্যুপরি? হা তাই। উপর্যুপরি দুদুটো লাভ অ্যাফেয়ার। এবং কন্যাহরণের মতোই, অবৈধ প্রেমিকার মতোই খুব গোপনে গাড়ি করে বাড়ি নিয়ে এল সে। কিন্তু ঘরে তুলল না ফটিকের ভয়ে। একটু গাঢ় রাত্তিরে দু দিনই সে তার দুটি প্রেমিকাকে গাড়ি থেকে কোলে করে বয়ে আনল ঘরে। একটি সৌরচুল্লি এবং অন্যটি ইলেকট্রনিক ওয়াটার ফিল্টার। চুরি করে নয়, লোক ঠকিয়ে নয়, নগদ দামে কেনা। তবু এইসব জিনিস ঘরে আনার সময় এবং পরে কয়েকটি দিন কেন যে এক অদ্ভুত পাপবোধ কষ্ট পায় সে তা কে জানে!

ফটিকের চোখকে অবশ্য ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা পশ্রম। কারণ ফটিক সকালে ঘর ঝটপাট দিতে আসে। ঘরের জিনিসপত্র তার সবই দেখা এবং গোনা। নতুন কিছু দেখলেই সে ঝাঁটা ফেলে খেল্ দেখতে বসে যায়, ই কি নতুন কিনলেন দাদাবাবু? তা দ্রব্যটা কি? একটু চালিয়ে ভেলকি দেখিয়ে দিন তো।

ফটিক ছাড়া আর দেখবেটাই বা কে? সুতরাং সৌরচুল্পি আর ওয়াটার ফিল্টার চালু করে দেখাল হেমাঙ্গ।

ফটিক মুগ্ধ। বাক্যহারা। অনেকক্ষণ বাদে বলল, এ বাড়ির বউদিমণির খুব সুবিধে হয়ে যাচ্ছে। কাজকর্ম আর বাকি থাকছে না কিছু। সব কলকজাই সেরে দেবে। পাউডার লিপস্টিক মেখে হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন শুধু।

বউদিমণিটা আবার কে রে?

আপনার যিনি বউ হবেন তার কথাই বলছি।

কেউ হবেন না। কস্মিনকালেও না।

ফটিক খুব রহস্যের হাসি হাসে। ভাবখানা যেন, ঠাট্টা ইয়ার্কি হচ্ছে। তারপর জিজ্ঞেস করে, তা কত দাম পড়ল দাদাবাবু?

হেমাঙ্গ মাথাটাথা চুলকোয়। সঠিক দাম থেকে অর্ধেক কমিয়ে বলে। তাতেও ফটিকের চোখ রসগোল্লার মতো হয়ে যায় বিস্ময়ে, অবিশ্বাসে। বলে, দেশের বাড়িতে এ টাকায় যে একখানা ঘর উঠে যায়!

হেমাঙ্গ সেটা জানে। আর জানে বলেই আর একদফা পাপবোধ এসে ভালুকের মতো চেপে ধরে তাকে।

এই পাপবোধ থেকে বেরোনোর একটা বন্ধু খুঁজছিল অনেকদিন ধরে। সুযোগটা পেল রবিবার। পিন্টুর জন্মদিন।

চারুশীলা যখনই যা করে তা বেহেড বাড়াবাড়ি রকমের। বরের টাকা আছে, যথেষ্টর চেয়েও বেশী আছে। ঠিক কথা। কিন্তু টাকা যে এরকম পাগলের মতো ওড়ানো যায়, তা না দেখলে বিশ্বাস হত না। পুঁচকে একটা সাত বছরের ছেলের জন্মদিন মাত্র, বিয়ে-শাদিও নয়। তবু সারা বাড়িতে আলোকসজ্জা, স্টিরিওতে সানাই। নামী ক্যাটারার ডাকা হয়েছে। ছোটো করে ককটেল পার্টি দেওয়া হচ্ছে। হলঘরে বেলুন, রঙিন কাগজের শিকলি, ফুল আর মালা, নানা বর্ণের আলোয় ছয়লাপ। একটা ক্ষুদে স্টেজের ওপর চলছে কুইজ কন্টেন্ট, অন্তাক্ষরী, ম্যাজিক শো, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি। অন্তত পঞ্চাশ জন বাচ্চা আর শ দেড়েক মেয়ে-পুরুষ এসেছে নেমন্তন্ন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, ক্যাটারার একশ দশ টাকা করে প্লেট নিচ্ছে।

উত্তেজিত হেমাঙ্গ চারুশীলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। ধরা মুশকিল। সবচেয়ে মুশকিল মেয়েদের দঙ্গলে ঢুকে ওকে টেনে আনা। মহিলাদের সমাবেশের ধারে কাছে কখনও যায় না হেমাঙ্গ। সুতরাং সে তর্কে তত্ত্বে রইল। এটা ফুটফুটে অচেনা যুবতী মেয়ে তার হাতে একটা ঠাণ্ডা নরম পানীয় ধরিয়ে দিয়ে গেছে কখন। হেমাঙ্গ সেটাতে একবারের বেশী চুমুক দিতে পারেনি অন্যমনস্কতায়।

চারুশীলার বাড়িটা বিশাল। আর্কিটেক্ট স্বামী মনের মুখে বানিয়েছে। অজস্র খাজ-খোঁজ, গুপ্ত জায়গা, আচমকা দু ধাপ সিঁড়ি বা একটি ডিপ্রেসন। এ সব কেন কে জানে! তবে ডাইনিং হলের মাঝখানে দিয়ে একটা নারকেল গাছের কাণ্ড সিলিং ভেদ করে ওপরে উঠে গেছে। প্ল্যানে বাড়ির মধ্যেই পড়েছিল গাছটা। সুব্রত–অর্থাৎ চারুশীলার বর সেটা কাটেনি। চাদে উঠলে একদম হাতের নাগালে নারকেল ফলে থাকে। হাত দিয়েই পাড়া যায়।

নানা জায়গায় চেয়ার পাতা। বসবার জন্য একটা আড়াল খুঁজছিল হেমাঙ্গ। হলঘরটায় বড় হল্লা। পাশের ঘরে ককটেল সেখানেও শান্তি নেই। আর প্রায় সর্বত্রই মেয়েদের জটলা। হেমাঙ্গ হলঘরের লাগোয়া বারান্দাটা ফাঁকা পেয়ে গেল। একটু অন্ধকার মস্ত বারান্দায় সার দিয়ে মমান্ডেড চেয়ার পাতা।

বসতে গিয়ে একটু চমকাল হেমাঙ্গ। না, ফাঁক নয়। একদম কোণের দিকে দুজন মানুষ খুব কাছাকাছি বসা। নিচু গলায় গুনগুন করে কথা কইছে।

হেমাঙ্গ সামান্য অস্বস্তি বোধ করল। কেউ প্রেমট্রেম করছে নাকি? তাহলে মূর্তিমান রসভঙ্গের মতো তার এখানে থাকার দরকার কী? উঠতেই যাচ্ছিল, হঠাৎ মনে হল, এজন বয়স্ক পুরুষের সঙ্গে একজন কিশোরী মাত্র। প্রেম কি? নাও হতে পারে।

হঠাৎ কিশোরীটিই আধো অন্ধকার থেকে হেমাঙ্গকে চমকে দিয়ে ইংরজিতে বলে উঠল, উই আর টকিং অ্যাবাউট পলিউশনস।

কথাটা বুঝল না হেমাঙ্গ। তবু বলল, দ্যাটস ফাইন, ক্যারি অন।

কিন্তু জুটিটা ভেঙে গেল। বোধ হয় হেমাঙ্গর জন্যই ভাঙল। মেয়েটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে পুরুষটিকে বলল, অলরাইট, সি ইউ এগেন।

তারপর দৌড়পায়ে চলে গেল হলঘরে।

মেয়েটাকে চিনল না, কিন্তু দু তিনবার তাকাতেই পুরুষটিকে চিনতে পারল হেমাঙ্গ। তার মতোই ভীরু-ভীরু, গ্যাঞ্জাম-ভীতু, দার্শনিক টাইপের লোকটি কৃষ্ণজীবন, রিয়ার স্বামী। একটি বিশেষ ক্ষেত্রে এ লোকটি বিশেষ রকমের বিখ্যাত। স্বয়ং সরকার ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এর পরামর্শ নেয়।

আরে, কী খবর? বলে দেয়ার বদল করে লোকটার একটু কাছাকাছি বসল হেমাঙ্গ।

লোকটা কম কথা বলে, মোটেই ভাল আজ্ঞাবাজ নয়, পেঁয়ো টাইপের এবং মুখচোরা। কিন্তু কৃষ্ণজীবন ওই কিশোরীটির সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলছিল এতক্ষণ। পলিউশন, গ্লোব ওয়ার্মিং, ওজোন হোল, ডিফরেস্টেশন, সমুদ্রের জলস্তরে স্ফীতি? কিশোরী বয়স কি অত জ্ঞান ধারণ করার বয়স? বিশেষ করে যখন লাগোয়া হলঘরে চলছে ম্যাজিক শশা, অন্তাক্ষরী, কুইজ কন্টেস্ট এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত!

হেমাঙ্গ আলাপ জমানোর জন্য ততটা নয়, একটা চাপা উদ্বেগ নিরসনের জন্যই হঠাৎ প্রশ্ন করল, হ্যাঁ ভাল কথা, আপনাদের সেই প্রাইভেট টিউটর চয়ন কেমন আছে বলুন তো!

কৃষ্ণজীবন যেন কিছুক্ষণ আকাশ হাতড়ে বেড়াল। তারপর বলল, চয়ন! সে কে?

আপনার মেয়ে মোহিনীকে প্রাইভেট পড়ায় যে ছেলেটি! একটু এপিলেপটিক!

ওঃ, চয়ন! বলে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে কৃষ্ণজীবন অসহায় ভাবে মাথা নেড়ে বলে, জানি না তো! তার সঙ্গে আমার তো দেখাই হয় না। কী হয়েছে তার?

হেমাঙ্গ হেসে বলল, তাহলে না জানাই ভাল। তবে আমার বন্ধু কণাদ চৌধুরী তার চিকিৎসা করছিল।

হবে। আমাকে কেউ কিছু বলে না।

আর আপনার স্ত্রীর মাইগ্রেন?

কৃষ্ণজীবন ফের অসহায়ভাবে মাথা নাড়ল, জানি না। তবে ভালই আছে বোধ হয়। ওই তো আছে ভিতরে, জিজ্ঞেস করুন না!

দরকার নেই। পরে জেনে নেবো। আপনি বোধ হয় ডোমেস্টিক ফ্রন্টের কোনও খবরই রাখেন না।

সংকুচিত হয়ে কৃষ্ণজীবন বলে রিয়া, আমাকে কিছু বলে না যে।

দেন ইউ আর এ হ্যাপী ম্যান। শুনতে পাই বউদের ঘ্যানঘ্যানানিতে নাকি স্বামীরা জেরবার হয়ে যায়।

কৃষ্ণজীবন একটু হাসল। লোকটা হ্যান্ডসম, হাসলে খুবই ভাল দেখায়। মেহীন, রুক্ষ, ছিপছিপে চেহারায় বয়সের কোনও ছাপই পড়েনি। রিয়ার পাশে একে হয়তো বয়সে কিছু কমই মনে হবে।

হেমাঙ্গ একটু হিংসের গলায় বলে, আপনি কিন্তু বেশ ফিট, তাই না?

কৃষ্ণজীবন এই কমপ্লিমেন্টও নিতে পারল না। অস্বস্তি বোধকরে বলল, আমি কষ্টে মানুষ।

হেমাঙ্গ হেসে ফেলল, কী কথর কী জবাব! এ লোকের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার চেষ্টা বৃথা। প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার জন্যই সে বলল, একটু ককটেল চলবে? ব্যবস্থা আছে কিন্তু!

কৃষ্ণজীবন এ কথায় শঙ্কিত হয়ে বলল, না না, ওসব নয়। আমি খাই না।

হেমাঙ্গ একটা শ্বাস ছেড়ে উদাস গলায় বলে, এইরকম ম্যাসিভ স্কেলে জন্মদিন করার কোনও মানে হয়, বলুন। ক্যাটারীর ককটেল, ডেকোরেশন! এটা কি অপব্যয় নয়?

একথাটা কৃষ্ণজীবনের যেন পছন্দ হল। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ, খুবই অপব্যয়। ভীষণ অপব্যয়। আমার বা আমার ভাইবোনদের কখনও জন্মদিনটিন হত না। জন্মের তারিখ জানা ছিল না। স্কুলের খাতায় আন্দাজে জন্মের তারিখ লেখানো হয়েছিল, মনে আছে।

আচ্ছা, আপনার বাড়ি শুনেছি উত্তর চব্বিশ পরগনায়। কোন গ্রাম বলুন তো! আমার ওদিকে একটু যাতায়াত আছে।

বিষ্টুপুর। শীতলাতলা বিষ্টুপুর। স্টেশন থেকে দু মাইল দূর। আগে হেঁটে যাতায়াত করতে হত। আজকাল বাসরাস্তা হয়েছে। ছোট গ্রাম।

নামটা চেনা। ওদিকে গেলে খোঁজ নেবো।

নেবেন। একটেরে জায়গা।

কিছু মনে করবেন না, আপনি তো প্রায় একটা ইন্টারন্যাশনাল ফিগার, তবু এখনও বেশ সহজ সরল আছেন। গাঁয়ের লোক বলেই কি?

কৃষ্ণজীবনের একথাটাও পছন্দ হল। আবার একবার হাসল। তারপর মৃদু স্বগতোক্তির মতো বলল, সহজ সরল আর থাকতে দিচ্ছে কই? বুদ্ধিমান মানুষেরা, বিদ্বান মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসে। ফলে গ্রাম বড় ফাঁক আর অন্ধকার হয়ে যায়। আজেবাজে লোকেরা সেখানে রাজত্ব করে। ভুল শিক্ষা, ভুল রাজনীতি, ভুল ধর্ম, ভুল নৈতিকতা নষ্ট করে দিচ্ছে। আমাদের গ্রামগুলোকে। গাঁয়ে গেলে লক্ষ করবেন, সব সেকেন্ড গ্রেড থার্ড গ্রেড লোক সেখানে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে।

এত কথা কৃষ্ণজীবনের মুখে একসঙ্গে শুনে হেমাঙ্গ অবাক হল। ওই কিশোরী মেয়েটিও কি এ সবই শুনছিল? পলিউশনের কথা বলছিল না।

হেমাঙ্গ বলল, জানি। গ্রামে এখন খুব পলিটিকস। আপনি বোধ হয় বিষ্টুপুর ছেড়ে এসে খুব হ্যাপী নন।

একটুও না। কিন্তু হায়ার এড়ুকেশন, বেটার জব অপরচুনিটি, হায়ার স্ট্যাটাস টেনে আনে মানুষকে। মুশকিল কী জানেন? একবার চলে এলে আর কখনও ফিরে গিয়ে নিজের গ্রামে নিজেকে ট্রানসপ্ল্যান্ট করতে পারবেন না। গাঁয়ের লোকই থাকতে দেবে না আপনাকে। তবু আমি চেষ্টা করব।

হেমাঙ্গ অবাক হলে বলে, কী চেষ্টা করবেন?

ফিরে যেতে। আমি যদি যাই, তাহলে একদম চাষী হয়ে যাবো। নিজের হাতে লাঙ্গল চালাবো, ঘর ছাইব, মিশে যাবো।

হেমাঙ্গ হাসল, পারবেন না। আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন যে, আপনি পারবেন না। আমি মাঝে মাঝে গ্রামে যাই বলেই জানি, আপনার অ্যাসেসমেন্ট হান্ড্রেড পারসেন্ট কারেক্ট।

কৃষ্ণজীবন কি একটু বিষণ্ণ হল? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিষাদ মাখানো গলায় বলল, কিন্তু গ্রামে না ফিরলেও, আমাদের সবাইকেই একদিন গ্রাম্য জীবনে ফিরে যেতেই হবে। এই সব বড় বড় শহর তৈরি করাই ছিল মানুষের মস্ত ভুল। এক জায়গায় এত মানুষকে জড়ো করলে বাতাস বিষিয়ে যায়, জমে ওঠে গাদ, দূষণ। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন আর বাক্সবন্দী হয়ে যায় মানুষ। ভবিষ্যতে একদিন মানুষ নিজেদের ভুল শুধরে নিতে শহর ভাঙবেই। ভাঙ্গবে কলকারখানা, কমিয়ে দেবে রাসায়নিকের ব্যবহার, বহু ভোগ্যপণ্যকে বাতিল করে দেবে।

আপনি জনসংখ্যার দিকটাও ততা ভাববেন!

কৃষ্ণজীবন একটু হাসল ফের। উদাস গলায় বলল, আগামী কয়েক দশকে প্রকৃতির নিয়মেই লাখো লাখো মানুষ মরবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ ভোগ, যুদ্ধ বা খুন—এ সবই হল জনসংখ্যার সিলিং। একমাত্র এইভাবেই কত মানুষ মরবে তা কি জানেন?

খবরের কাগজে পড়েছি বটে। নাম্বারটা অ্যালার্মিং।

আবহমণ্ডলে ওজোন হোল সৃষ্টি হওয়ায় ক্যানসার মহামারীতে দাড়িয়ে যাবে। ন্যাচারাল রিসোর্স আর জনসংখ্যার মধ্যে রেশিও রক্ষা করতে পার্জিং হবেই। আমি চোখ বুজলে দেখতে পাই পৃথিবী জুড়ে মৃতদেহের গাদি লেগে আছে। সকারের লোক নেই।

হেমাঙ্গ বারান্দার বুঝকো অন্ধকারে লোকটার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়েছিল। সে যতদূর জানে, লোকটা পাগল নয়, বায়ুগ্রস্ত নয়। লোকটা একজন বিশেষজ্ঞ। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরিসংখ্যানের জোরে কথা বলছে। তবু সে স্বগতোক্তির মতো বলল, অতটাই কি হবে! বিজ্ঞানীরা যখন উঠে পড়ে লেগেছে তখন একটা কিছু সমাধান তো হবেই। তাই না?

বিজ্ঞানীরা মুষ্টিমেয়। পৃথিবীর যে সংকট আসছে সে সম্পর্কে অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষেরই ধারণা ভাসা ভাসা। আর অশিক্ষিতরা তো সম্পূর্ণ নির্বিকার। কয়েকদিন আগেই একজন সেন্ট্রাল মিনিস্টার আমাকে ডেকে বলেছেন, আমি যে কলকারখানা কমাতে বলছি তাতে নাকি উৎপাদন ও উন্নয়ন মার খাবে। তাকে আমি বোঝাতে পারিনি, আগে অস্তিত্বকে রক্ষা করা দরকার, নইলে উন্নয়ন আর উৎপাদন কার কাজে লাগবে? আমি পৃথিবীর লোককে বোঝানোর চেষ্টা করছি, সবগুলো রাষ্ট্রের উচিত অন্যসব ইস্যুকে উপেক্ষা করে পৃথিবীর পরিবেশ ও আবহমণ্ডলকে রক্ষা করার জন্য সব রিসোর্সেস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু কে শুনছে বলুন! রাজনীতিকরা তাঁদের কূটকচালিতে বন্দী হয়ে আছেন, আমলারা ব্যস্ত প্রশাসনিক কাজে। সাধারণ মানুষ অন্নবস্ত্রের বাইরে কিছুই ভাবতে চায় না। এই পৃথিবীর জন্য, মাটির জন্য, গাছের জন্য, প্রকৃতির জন্য তাদের যেন কিছুই করার নেই। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে এই উদাসীনতা। নেগলিজেন্স। আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে আমি কী করতাম জানেন! কেউ গাছ কাটলে তার ফঁাসির ব্যবস্থা করতাম। সন্তান সংখ্যা যার বেশী হবে তাকে জেল-এ পাঠানোর ব্যবস্থা করতাম। জল বা বায়ু দূষিত হয় এমন কলকারখানার মালিকদের দেউলিয়া করে ছেড়ে দিতাম।

হেমাঙ্গ সামান্য সপ্রশংস গলায় বলে, আপনাকে দেখে বোঝা যায় না বটে, কিন্তু ইউ আর এ টাফ ম্যান।

কৃষ্ণজীবন একটুও হাসল না। মাথা নেড়ে বলল, না। আমি বড় অসহায় আর দুর্বল। আমি কিছু করতে পারছি না। এ বিটন ওল্ড ম্যান।

ওল্ড কোথায়! আপনি তো দারুণ ইয়ং লুকিং।

বাইরেটা। ভিতরে ভিতরে আমি বুড়িয়ে যাচ্ছি দুশ্চিন্তায়, টেনশনে।

অবস্থাটা কি ততটাই খারাপ?

আপনি যতদূর ভাবতে পারছেন তার চেয়েও বোধ হয় বেশী। আমাদের আর একদম সময় নেই।

তাহলে বৈজ্ঞানিকরা এতদিন কী করল মশাই?

তাদের দিয়ে যা করানো হয়েছে তারা তাই করেছে। তারাও রাজনীতি আর প্রশাসনের শিকার। তাদের মস্তিষ্ক আছে, চরিত্র নেই। তাই তারা নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট, মারণাস্ত্র, দূষিত কেমিক্যালস তৈরি করে যাচ্ছে। তাদের লাগানো হচ্ছে কসমেটিক জিনিসপত্র তৈরির কাজে লাগানো হচ্ছে লোককে চমকে দেওয়ার জন্য নানা ম্যাজিক আইটেম বানানোর কাজে। লোককে বোঝানো হচ্ছে, এটা বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানীরা ঈশ্বরের বিকল্প। বিজ্ঞান দুনিয়ার সব রহস্য ভেদ করতে চলেছে। কিন্তু যারা বিজ্ঞান জানে তারা এ কথা শুনে লজ্জায় জিব কাটে। বিজ্ঞান কোথায় পড়ে আছে তা কি জানেন? লোকে আকাশে রকেট পাঠানো দেখে, স্যাটেলাইটে টিভি দেখে ভাবছে, বিজ্ঞান বুঝি কেল্লা মেরে দিল। কিন্তু আসলে কি তাই! বিজ্ঞানের ঘরে পচা ইঁদুরও কি নেই? মহাকাশের কথা বাদ দিয়ে শুধু এই সোলার সিস্টেমের কথাই ধরুন। এরই এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে যেতে কত সময় লাগছে বলুন তো একটা রকেট বা প্রজেক্টাইলের? কত ফুয়েল খরচ হচ্ছে! কত কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে! দুনিয়ার মানুষকে উপোস, অশিক্ষা আর রোগেভোগ রেখে এই গবেষণা কী দিচ্ছে আমাদের? প্রায় কিছুই নয়। আমাদের নিকটতম নক্ষত্রটি পৃথিবী থেকে চার লাইট ইয়ার দূরে। যদি মানুষ কখনও আলোর গতি অর্জন করতে পারে তাহলেও সেখানে মহাকাশযান পাঠাতে লাগবে চার বছর। যদি না মাঝপথে অ্যাস্টেরয়েডরা সেই মহাকাশযান ধ্বংস করে দেয়। আলোর গতি অর্জন করাও আইনস্টাইনের মতে প্রায় অসম্ভব। সেই ফুয়েল আমাদের নেই এবং ওই গতি কোনও ম্যাটারের পক্ষে অর্জন করা অসম্ভব, বস্তুগত রূপান্তর ছাড়া। আলোর গতি পেলে ম্যাটার হয়ে যাবে এনার্জি, আমি কি একটু বেশী টেকনিক্যাল হয়ে পড়ছি।

আমি বুঝতে পারছি। আজকাল সবাই এসব বোঝে।

কৃষ্ণজীবন হতাশ গলায় বলে, বুঝছে কই? বৈজ্ঞানিকরা আমাদের খেলনা দিয়ে, চুষিকাঠি দিয়ে, রূপকথার গল্প বলে ভুলিয়ে রাখছে। কিন্তু আমরা পচা ইঁদুরের গন্ধ পেতে শুরু করেছি। আমি হিউস্টনে এক বক্তৃতায় বলেছিলাম, আমেরিকা যদি তার একটা বা দুটো রকেট উৎক্ষেপন বন্ধ রেখে টাকাটা ইথিওপিয়ার মরু-প্রকৃতিকে বশে আনতে ব্যয় করে তাহলে পৃথিবীর অনেক বেশী উপকার হবে। আমেরিকানরা তুমুল হাততালি দিল, বাহবা দিল, কিন্তু প্রস্তাবটা কার্যকর করল না।

আপনি কি মহাকাশ গবেষণা বন্ধ করার পক্ষে।

না, আমি ততটা গাধা নই। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, মহাকাশ গবেষণার কলমে কিছু মানুষ বড়লোক হয়ে যাচ্ছে এবং চলছে ওয়াইল্ড গুজ চেজ। আমি বাড়াবাড়ির বিপক্ষে। আমেরিকা যখন চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল তখন সেটা কত বড় হাই রিস্ক ভেনচার ছিল তা কি জানেন? তখনও ফুল-প্রুফ টেকনোলজি ছিল না, শুধু বাহবা পাওয়ার জন্য ওই সাতিক ঝুঁকি নিয়েছিল। এইসব ইউজলেস কাজ তো বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য নয়। তার উদ্দেশ্য মানুষের মঙ্গল। কিন্তু সে কথাটা মানুষ বুঝছে কই! বিজ্ঞান-পাগল মানুষ বিজ্ঞানকে মাথায় তুলেছে, ঈশ্বরের বিকল্প করে তুলছে, অথচ বাস্তবুদ্ধি থাকলে মানুষের বোঝা উচিত ছিল, বিজ্ঞানের ভূমিকা হল মানুষের ভৃত্যের। যার চাকর হওয়ার কথা তাকে মনিব করে তোলা কি উচিত?

আপনি নিজে বৈজ্ঞানিক, তবে বিজ্ঞানের ওপর ক্ষেপে আছেন কেন?

বিজ্ঞানের ওপর ক্ষেপব কেন! আমার রাগ আহাম্মক মানুষের ওপর। অস্ত্র গবেষণায় কত কোটি কোটি ডলার খরচ হয় তা কি জানেন? এক একটা যুদ্ধে কত কোটি ডলার খরচ বলুন তো! এক একটা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কত, একটা পুওর ম্যান অ্যাটম বোমার? প্রতি মিনিটে কত মিলিয়ন ডলার ছারখার হয়ে যায়? মাটির নিচে তেল ফুরিয়ে আসছে, তবু কিছু আহাম্মক শত্ৰুতা করে জ্বালিয়ে দেয় তেলের খনি। কত তেল পুড়ে গেল! কত ক্ষতি হল মানুষের! কতখানি বিষিয়ে গেল পৃথিবীর বায়ু আর জল! কী হবে আপনার এই বৈজ্ঞানিক সভ্যতা দিয়ে, যা বর্বর, অদূরদর্শী, আত্মঘাতী?

লোকটা এত গুছিয়ে কথা বলতে পারে, এটা একদমই জানা ছিল না হেমাঙ্গর। বরং সে শুনেছে, লোকটা গ্রাম্য, মুখচোরা, একটু ক্ষ্যাপাটে এবং আনমনা, হয়তো তাই। হয়তো শুধু নিজের গবেষণা ও উপলব্ধির ক্ষেত্রেই লোকটা সহজ ও বাপটু। সে একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বলে, ইউ আর পারহ্যাপস রাইট।

আই অ্যাম রাইট। আমি ফিকশ্যনাল সায়েন্সে বিশ্বাস করি না, ডেট্রাকটিভ সায়েন্সে বিশ্বাস করি না, ওয়েলফেয়ার সায়েন্সে বিশ্বাস করি। সভ্যতায় অনেক কদম এগিয়ে গিয়েও যখন মানুষকে বর্বর, আহাম্মক, নির্বোধ আর উদাসীন দেখি তখন মনে হয়, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি-নির্ভর সভ্যতার কোনও দাম নেই। আমাদের কোন সৎ শিক্ষাই এই সভ্যতা দিচ্ছে না। চাকা সুতরাং উল্টোদিকে ঘোরাতেই হবে।

বারান্দার ঝাঁঝালো বাতিটা হঠাৎ জ্বলে উঠতেই চমকে গেল হেমাঙ্গ।

এই অলম্বুস! বলেই জিব কাটল চারুশীলা, আরে, আপনিও এখানে! বলে কৃষ্ণজীবনের দিকে চেয়ে হেসে ফেলল।

হেমাঙ্গ গম্ভীর হয়ে বলে, যা ততা। এখন কাজের কথা হচ্ছে।

সে কি! খাবি না? ডিনার শুরু হচ্ছে যে!

আরও পরে খাবো।

চারুশীলা কৃষ্ণজীবনের দিকে চেয়ে বলে, প্লীজ, আপনি আসুন। রিয়া খুঁজছে আপনাকে। আপনার নাকি আজ রাত বারোটায় প্লেন ধরতে হবে।

আজ্ঞে হ্যাঁ। বলে কৃষ্ণজীবন উঠে দাঁড়ায়। ভারী আপ্যায়িত ভঙ্গি।

হেমাঙ্গ বলে, কোথায় যাচ্ছেন রাত বারোটার প্লেনে?

লন্ডন। এমনভাবে বলল, যেন লিলুয়া-টিলুয়া কোথাও যাচ্ছে।

একা বারান্দায় আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে হেমাঙ্গ। পৃথিবীর আসন্ন বিপদ নিয়ে মোটেই দুশ্চিন্তা নেই তার। কৃষ্ণজীবন যতই বলুক, সে জানে পৃথিবীর ভাল করার কথা যারা ভাবছে, তারা ঠিকই ভাল করবে। ঘুরেফিরে তার কেবলই একটা প্রশ্ন আসছে মনে, ওই কিশোরী মেয়েটি এইসব গুরুতর কথাই কি চুপ করে শুনছিল কৃষ্ণজীবনের কাছ ঘেঁষে বসে? কে মেয়েটা?

চারুশীলা আবার এল, কী হচ্ছে বল তো? খাবি না নাকি?

নাও খেতে পারি। প্রতিবাদ হিসেবে।

তার মানে!

এই গরিব দেশে এত খরচ করে কেউ ছেলের জন্মদিন করে? এই অপচয়ের মানে হয় কোনও?

ওঃ, তাহলে এই হল ব্যাপার! আর তুই যে আজেবাজে জিনিস কিনে রোজ টাকা উড়িয়ে দিচ্ছি।

তোর মাথায় ঘিলু বলে পদার্থটা নেই বলেই বলছিস। জিনিস কিনলে টাকার অপচয় হয় না, টাকাটা জিনিসে কনভার্টেড হয় এবং ঘরে থাকে।

ওটা তো আই-ওয়াশ। জিনিসগুলো বেচলে ফের পুরো টাকাটা কখনও ফেরত পাবি?

ফেরত পাওয়ার প্রশ্নই নেই। জিনিসগুলো আমাকে সারভিস দিচ্ছে। ছা

ই দিচ্ছে। আয় বলছি খেতে।

এই গরিব দেশে একশ দশ টাকা প্লেট মূখের মতো অপচয়। বহু খাবার নষ্ট হবে। আই প্রটেস্ট।

মারব থাপ্পড়, কিঙ্কুস কোথাকার। নইলে পিন্টুকে লেলিয়ে দেবো। তখন সুড়সুড় করে যাবি।

তুই পিন্টুটাকে নষ্ট করছিস।

বেশ করছি। আর একটা কথা বলে রাখি, আমার সামনে গরিব কথাটা উচ্চারণ করবি না কখনও। গরিব কথাটাই আমি সহ্য করতে পারি না। গরিবদের দুচোখে দেখতেও পারি না।

হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, বলতে পারলি কথাটা! জিবে আটকাল না? তুই সত্যি খারাপ হয়ে গেছিস।

তোর চেয়ে খারাপ নই। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। নীলা বলে রোডে ফিরবে। ওর গাড়ি নেই। ওকে নামিয়ে দিয়ে যাবি।

আমার খিদে পাচ্ছে না।

খপ করে তার চুলের মুঠি চেপে ধরল চারুশীলা, খাবি কিনা?

উঃ। যাচ্ছি যাচ্ছি।

খাওয়ার ঘরেই কিশোরীটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। প্লেটে সামান্য একটু মাছের কারি নিয়ে একটু খাওয়ার ভান করছে। এটা খিদের বয়স, কিন্তু এই প্রজন্মের হাই ব্রাও মেয়েরা তেমন খেতে-টেতে চায় না। অন্তত পাবলিকলি নয়।

ভিড়ে মেয়েটার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল হেমাঙ্গ, তুমি কে বলো তো?

মেয়েটা মুখ তুলে তাকে দেখে হাসল, আমি অনু। নন্দনা আমার বন্ধু। আপনি?

আমি! আমি নন্দনার মামা। হেমাঙ্গ। তুমি ওটা কী খাচ্ছো?

মাছ। কিন্তু বিচ্ছিরি খেতে হয়েছে।

তবে খাচ্ছে কেন? অনেক আইটেম আছে, নিয়ে খাও না।

আসলে আমার অ্যাপেটাইট নেই। মাই ড্যাড ইজ সিক। নট ফিলিং হাংরি।

বাবার কী হয়েছে?

হয়েছিল। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। তবে হি ইজ পুলিং থ্রু। ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে পরশু কেবিনে ট্রান্সফার করা হয়েছে।

তাহলে তো ভাল খবর।

ভালই। তবু কেন যেন বাবার অ্যাটাক হওয়ার পর থেকে খেতে পারি না।

কৃষ্ণজীবনবাবুকে তুমি চেনো?

মেয়েটা টপ করে তার দিকে একবার তাকাল। তারপর স্মার্ট হেসে বলল, উই আর ফ্রেন্ডস।

ফ্রেন্ডস।

ভেরি গুড ফ্রেন্ডস।

হেমাঙ্গ মেয়েটার পাকামিতে একটু হাসল। একটু চিমটি কেটে বলল, পারহ্যাপস নট এ বয় ফ্রেন্ড? অ্যান্ড হোয়াই নট? বলে হিহি করে হাসল মেয়েটা।

মাই গড!

আপনি একটু ওল্ড ফ্যাশনড়, তাই না?

কি জানি! হবে হয়তো।

আসলে ওঁর মেয়ে মোহিনী আমার খুব বন্ধু।

তাই বলো।

উনিও বন্ধু।

হেমাঙ্গ একটা মুর্গির ঠ্যাং সন্তৰ্পণে কামড়ে বলল, হি ইজ ইন লাভ উইথ দিস আর্থ। জানো?

সবাই জানে। হি ইজ এ গুড গাই। জেম অফ এ গাই।

বোধ হয় তুমি ঠিকই বলছো। আফটার অল হি ইজ ট্রাইং টু ড়ু সামথিং ফর ম্যানকাইন্ড অ্যান্ড দিস প্ল্যানেট।

দ্যাটস হোয়াই আই অ্যাম ইন লাভ উইথ হিম।

এরা যে কী ভাষায় কথা বলে তা ঠিক পায় না হেমাঙ্গ। সে একটু অস্বস্তি বোধ করে চুপ করে রইল।

অনু তার মাছসুদ্ধ প্লেটটা একজন চলন্ত বেয়ারার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ড়ু ইউ নো সামথিং অ্যাবাউট ইওরসেলফ?

ইউ আর এ হ্যান্ডসাম ম্যান!

বলে হিহি করে হাসল অনু। তারপর বলল, যাই।

হেমাঙ্গর হাত থেকে মুর্গির ঠ্যাংটা পড়েই যাচ্ছিল।

 ০১৬. বিষ্ণুপদর পেটটা একটু নেমেছে

বিষ্ণুপদর পেটটা একটু নেমেছে। সকাল থেকে বার চারেক দাস্ত, পেটটা ভার। একটা বিশেষ বয়সের পর শাস্ত্রে আছে মলভাণ্ডং ন চালয়েৎ। চালাতে হয়নি, ইদানীং খাওয়া-দাওয়াটা একটু বেহিসেবী মতো হওয়ায় সামাল দিতে পারা যায়নি। রামজীবন খাওয়াচ্ছে খুব। পরশু কোথা থেকে ক্ষীর নিয়ে এল এক ভাড়। থকথকে ক্ষীর, সরে ননীতে একেবারে মাখামাখি, ভাঁড়টা একবার তাকে শুকিয়ে নিয়েছিল রামজীবন। আহা, কী মিঠে গন্ধ! প্ৰাণ জুড়িয়ে জিব রসস্থ হয়ে পড়ল। ইদানীং নোলাটা যে বেড়েছে তা বিষ্ণুপদ নিজেই টের পায়। কাল যখন ডাকে, তখন এরকমই হয়। নোলা বাড়ে।

ক্ষীর দেখে নয়নতারা চেঁচামেচি শুরু করল, ওই বুড়ো মানুষটাকে এই বিষ গেলাবি নাকি রে বাবা? এ কি ওর পেটে সইবে!

রামজীবন উদার গলায় বলে, আহা, খাক না মা। সাধ মিটিয়ে খাক। ভালমন্দ অত হিসেব করার কি বয়স এটা? এখন প্রাণ খুলে সাধ মিটিয়ে যা খুশি খেয়ে হরি বলে চলে যাওয়া।

নয়নতারা রাগ করে বলল, আমি বাপু তোদের মতো করে বুঝি না। আমি বুঝি যতদিন রাখা যায় ধরে বেঁধে ততদিনই রাখলাম। ওই ঘন পাকের জিনিস হজম হবে না বাবা। তোরা বরং ভাগজোগ করে খেয়ে নে। আমি একটা ফেঁটা বুঝেসুঝে দেবোখন তোর বাপকে।

রামজীবন জিব কেটে বলে, তা কি হয়! বাবার নাম করে এনেছি, বাবাই খাবে। এতে ভাগজোগ চলবে না।

বিষ্ণুপদ বারান্দায় বসে শুনছিল। শুনে মনে মনে খুব বাহবা দিল রামজীবনকে। এ তার বিদ্বান ছেলে নয়, দোষঘাটওলা মুখ ছেলে, কিন্তু বাপ-মায়ে ভক্তি এর কাছ থেকে লোকে শিখতে পারে। আর নয়নতারার তারিফও না করে পারে না বিষ্ণুপদ। ওই একটা মানুষই তার ভালমন্দর কথা ভাবে।

নাড়ে পরশু রাত্তিরে একটু ক্ষীর পড়ল। রামজীবন একেবারে সামনে খাড়া দাড়িয়ে, দেখল, কম দেওয়া হচ্ছে কিনা। সাদা বাতাসা গুঁড়িয়ে দিল রাঙা, সঙ্গে পাকা একখানা মর্তমান কলা। নয়নতারা একটু আবড়াল থেকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল, বুঝেসুঝে খেও গো। মরা পেট, ওসব খাওয়ার অব্যেস নেই তো। পেটে ঢুকে কী হুলুস্থল বাধায় কে জানে বাবা!

রামজীবন একটু অসন্তোষের গলায় বলল, খাওয়ার সময় অমন টিকটিক কোরো না তো মা!

সাধে কি বলি বাবা, ভুগতে তো হবে আমাকেই।

ক্ষীরটা আজও যেন জিবে লেগে আছে। যেমন স্বাদ, তেমনই গন্ধ। দুহাতার একটু বেশীই খেয়ে ফেলল বিষ্ণুপদ। ঢেঁকুরখানায় অবধি ক্ষীরের গন্ধ আসছিল।

ভুটভাট শুরু হল শেষ রাতে। কাল সারাদিন থম ধরে রইল পেট। খিদেই হল না। আজ সকাল থেকে নেমেছে। বর্ষা ঋতুটা এমনিতেই ভাল নয়। রোগ সহজে ছাড়তে চায় না। ছাতা মাথায় দিয়ে বার বার ঘটি নিয়ে দৌড়োত হচ্ছে পুকুরধারে। এ তো আর কৃষ্ণজীবনের সাততলার ফ্ল্যাটবাড়ির পাকা ঝা চকচকে পায়খানা নয়। নিতান্তই চট দিয়ে ঘেরা কাঁচা ব্যাপার। ওপরে কোনও ছাউনিও নেই। তবে রামজীবনের পাকা ঘরখানা হলে তাতে সব বন্দোবস্ত থাকবে। লাগোয়া না হলেও, কাছেই বারান্দার শেষ দিকটায় স্যানিটারি হচ্ছে। বাবা-মায়ের জন্য জান-কবুল করে লেগেছে ছেলেটা।

চারবার হয়ে গেল। লক্ষণ ভাল বুঝছে না বিষ্ণুপদ। শরীরটা কাহিল লাগছে, সিটিয়ে যাচ্ছে যেন। জিবটা খসখসে, বিম্বাদ নয়নতারা এসে বলল, কবার হল।

চারবার।

আরও হবে?

বলি কি করে?

বুঝছো কেমন?

ভয় খাওয়ার মতো কিছু নয়।

থানকুনি আর গ্যাঁদাল রস করে রেখেছি। খাও। বমির ভাব নেই তো!

না।

নয়নতারা গেলাসে রসটা নিয়ে এল। বিষ্ণুপদ ঢক করে রসটা খেয়ে বরল, সব ভাল যার শেষ ভাল।

দাসীর কথা বাসি হলে তবে কানে যায়। পিচকিরি যে ছুটবে সে তো তখনই বুঝতে পেরেছিলাম।

বিষ্ণুপদ কাহিল হাসি হেসে বলল, লোভে পিপ, পাপে মৃত্যু। কিন্তু লোভের ক্ষমতা কি কিছু কম। শয়তানের গায়ে মেলা জোর। তার সঙ্গে আমরা পেরে উঠব কেন? তবে যদি এখন কলেরা হয়ে মরি তবে দুঃখ থাকবে না। একখানা জম্পে জিনিস খাওয়াল বটে রামজীবন। তুমিও একটু চেখে দেখেছো তো!

সে খোঁজ আর নিলে কোথায়?

খোঁজ নিইনি বটে। দোষই হয়েছে। তবে মনে হয় তুমিও একটু জিভে ঠেকিয়েছে, তাই না?

কী পুরুষের সঙ্গেই জীবনটা কাটল! বলি, দুধ সর ক্ষীর কবে মুখে তুলতে দেখেছে আমায়? আমার হল সাদা-পাতা খাওয়া পচা মুখ, ওসব ভাল ভাল জিনিস কি সয় আমার?

তাও বটে। তুমি তো সত্যি দুধটুধ খাও না। তবে এটা একটু খেয়ে দেখলে পারতে। বড় খাঁটি জিনিস।

ধোঁয়াটে গন্ধ পাওনি?

না তো! ছিল নাকি?

আমি তো ভাঁড় শুঁকেই পেয়েছি। মোষের দুধের ক্ষীর।

মোষের দুধে কি ধোঁয়াটে গন্ধ হয়?

তাই তো জানি।

বিষ্ণুপদ একটু হাসল, আমাদের আর গরু মোষের তফাত করে লাভ কি?

মোষের দুধ তেজী জিনিস। গুরুপাক। পেট ডাকল নাকি? শব্দ পেলাম যেন!

ডাকছে।

তাহলে আবার হবে। টোটকাতে আর ভরসা পাচ্ছি না। ডাক্তার ডাকি।

ব্যস্ত হয়ো না। ধরেও যেতে পারে। আজকালকার অ্যালোপ্যাথি মানেই তো বিষ। বিষে বিষ ক্ষয়। আজকের দিনটা উপোস দিলেই হবে।

আজ খুব সকালে রামজীবন বেরিয়ে গেছে। শুনছি আজ নাও ফিরতে পারে। বামাচরণ তো সম্পর্ক রাখছে না। এখন বিপদ হলে কাকে ডাকি?

বিষ্ণুপদ হাসে, কাউকে ডাকতে হবে না। বিষ্ণুপুরে এতকাল আছি। পাড়া-প্রতিবেশীরা কি আর আসবে না ডাকলে! কিন্তু অত কিছু করতে হবে না।

এ বয়সে পেট-ছাড়া কি ভাল? কথায় বলে, ছেলে আগে বাড়তে, বুড়ো হাগে মরতে।

বিষ্ণুপদ মাথা নেড়ে বলে, তাই খারাপ কি? সময় হলে চলে যাওয়াই তো ভাল।

এ কি হাসিঠাট্টার কথা।

আহা, রাগ করো কেন? পানের বাটাখান নিয়ে এখানেই বোসসা। পাহারা দাও।

যমদূত এলে তাড়িয়ে দিও। বিষ্ণুপদ আর একবার গেল। ঘুরে যখন এল তখন আর হাসিখুশি ভাবখানা নেই।

বুঝলে, একটু শোবো।

নয়নতারা উঠে পড়ল। বলল, আগেই ভেবে রেখেছি। বিছানা করাই আছে। শুয়ে পড়বে চলো। রক্তক্ত যাচ্ছে না তো!

না। এখনও ততটা খারাপ নয়।

ঘরে অন্ধকার ঘনিয়ে আছে। বাইরে মেঘলা। বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালে খই-ভাজার শব্দ তুলে।

নয়নতারা দাওয়ায় বেরিয়ে পটলকে ডাকল। এইবেলা যা দাদা, পুলিনবাবুকে ডেকে নিয়ে আয়। পেট খারাপের কথা বলিস, ওষুধ যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসে।

পটল ছাতা আর সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল। তার সেই–কুকুর সাইকেল। এই নীতিটিকে বড় ভালবাসে নয়নতারা। বড় হলে কেমন হবে কে জানে। কিন্তু এখন অবধি ভারি বাধ্যের, এ বয়সেই বুদ্ধি বিবেচনা খুব হয়েছে, বোবা ভাইটাকে বুকে বুকে আগলে রাখে।

দুই বউ আজকাল আলাদা রাধছে। রান্নাঘরটা রাঙার দখলে। শ্যামলী নিজের ঘরে স্টোভ জ্বেলে বা তোলা উনুনে বেঁধে নিচ্ছে। সেই ঝগড়ার পর থেকেই এই ব্যবস্থা। ভিতরে ভিতরে ভাইয়ে ভাইয়ে জায়ে জায়ে ভাগ হয়েই ছিল। মনের মধ্যেকার ভাগটাই এখন বেরিয়ে পড়েছে। যতদিন যাচ্ছে তত ভাগাভাগিটা যেন বাড়ছে চারদিকে।

নয়নতারা ঘরে এসে দেখতে পায়, চোখ চেয়ে নিঝুম শুয়ে আছে বিষ্ণুপদ। যেন ভাবন-জগতে।

কী হচ্ছে পেটের মধ্যে!

বিষ্ণুপদ বলে, পেটের মধ্যে নয়, মনের মধ্যে। সেখানে অনেক কিছু হচ্ছে।

তোমার তো মন নিয়েই যত জ্বালা। কী যে সারাদিন ভাবো বসে বসে!

তোমার ভাবনাচিন্তা আসে না, না?

তা আসবে না কেন? মেয়েমানুষের মাথায় তেল-নুন, রোগ-ভোগ, সংসারে পাঁচটা ভালমন্দ এইসব ছাড়া আর কী আসবে বলো! এই যে রোগ বাঁধালে এখন এইটেই মাথা জুড়ে থাকবে।

এইমাত্র কী ভাবছিলাম জানো?

কী ভাবছিলে?

ভাবছিলাম কলকাতায় থাকলে এখন বেশ হত। না, কৃষ্ণজীবনের বাড়িতে নয়। সে বড় সাহেব জায়গা। কলকাতার বড় রাস্তার একটি ধারে যদি বসে থাকতে পারতাম সারা দিনমান তাহলে বেশ হত।

রাস্তায় বসে থাকলে আবার ভালটা কী হবে?

এই গাঁয়ে গঞ্জে যেমন সব কিছু থেমে থাকে, নড়াচড়া নেই, কলকাতায় তেমনি আবার সবসময়ে সব কিছু কেবল চলছে। ধুন্ধুমার করে চলছে। কী শব্দ! কী হইচই!

যাই বলো বাপু, ও আমার সয় না। কবার তো গেলুম। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, বেলুড়, একবার চিড়িয়াখানা। আমার মনে হয়, বেড়াতে খারাপ নয়, কিন্তু সারাক্ষণ থাকলে মাথা ধরে যাবে।

আমারও কি আর ভাল লাগবে! আমরা হলুম মাটি-ঘেঁষা মানুষ। সে কথা বলছি না। কিন্তু মাঝে মাঝে ইচ্ছে যায়, ওরকম ধুন্ধমার কাণ্ডখানা কিছুক্ষণ বসে দেখি। চারদিকটা যেন বড় জীয়ন্ত মনে হয় কলকাতায়। আর এই বিষ্ণুপুরের বাড়ির দাওয়ায় বসে থেকে থেকে কী মনে হয় জানো? এত নিস্তেজ, এত মরা চারধার যে, হঠাৎ চমকে উঠে ভাবি, ওরে বাবা, আমি মরে যাইনি তো!

পেট ভাঙল বুঝি! শব্দ পেলাম যেন!

অত ভাবছো কেন? বদহজম হলে ওরকম একটু হয়। কলেরা-টলেরা নয়। ভয় নেই। বরং পানের বাটাখানা নিয়ে এইখানে বোসসা। একখানা পান সেজে খাও। দেখি।

পান খাওয়ার আর দেখার কী আছে?

আছে। সবকিছুর মধ্যেই দেখার জিনিস আছে। তুমি যখন পান সাজো তখন ভারি আদর করে, যত্ন করে সাজো। দেখতে বেশ লাগে। ইস্কুলে যখন পড়াতুম তখন একখানা বাংলা গল্প পড়াতে হত। তাতে ছিল, জাপানীরা যখন চা তৈরি করে তখন এত যত্ন নিয়ে করে, এত সুন্দর ভঙ্গিতে যে, সেটাও নাকি চেয়ে দেখার মতো ব্যাপার। তোমার পান সাজার মধ্যেও খানিকটা ওরকম কিছু আছে।

কী যে মাথামুণ্ডু বলো তার ঠিক নেই! সাদা পাতা দিয়ে একটু চুন জেবড়ে মুখে ফেলে দিই। দেখার যে কী আছে বুঝি না!

নয়নতারা পানের বাটা আনতে গেল। কিন্তু সহজে এল না। সংসারী মানুষ, একটা কাজ করতে গেলে সেটার সঙ্গে আর একটা জড়িয়ে পড়ে।

দুর্বল শরীরে একটু ঘুম-ঘুম পাচ্ছিল বিষ্ণুপদর। পেটে হাঁড়িকলসি ভাঙছে, জিব তেতো। শরীরটা জুত-এর নেই মোটেই। চোখ জড়িয়ে যখন এল তখনই হঠাৎ মনে হল, ঘুমও কি ছোট করে মরণ? ঘুমোলে তো শরীরের বোধ মুছে যায়, সমাজ সংসার, আত্মীয়স্বজন সব মুছে যায়। মরণও তাই। তবে কি নিত্যি দিন ঘুমের মধ্যে আমরা একটু একটু করে মরি! মরণের পর কি সব ফব্ধিকারি! মাথায় আজকাল কত কথাই আসে। উড়ুটে সব কথা। বিষ্ণুপদ বৈতরণীর কথা ভাবে, যমরাজার কথা ভাবে, স্বর্গ বা নরকের কথাও ভাবে। ওসব কি আছে বটে? বিষ্ণুপদর তেমন বিশ্বাস হতে চায় না। তবে আছেটা কি? মানুষ জন্মায় বাঁচে, তারপর মরে হারিয়ে যায়? তাহলে তো এর কোনও মানেই হচ্ছে না। বিষ্ণুপদর শাস্ত্রটাস্ত্ৰ পড়া নেই, তবে আজকাল মনে হয়, এই জীবনটার একখানা মানে-বই থাকলে বড় ভাল হত। সহজ করে সব বোঝানো থাকত তাতে।

জানালার সরু সরু শিকরে ওপাশের বর্ষার জল পেয়ে সতেজ পেয়ারা গাছটার ডালপালা আর পাতা উঁকি দিতে। থাকে। গাছ যেন হাসছে। খুব হাসছে। গাছখানার স্বৰ্গ-নরক নেই, কর্মফল নেই। এই ঠাই দিব্যি একটা গোটা জীবন কাটিয়ে যায়।

চটকাটা ভাঙল পুলিন ডাক্তারের ডাকে।

আবার কী বাধালে হে?

এসো ভায়া, বোসসা। তোমাকে আবার এই বাদলায় ছেঁচড়ে আনল কেন?

বাদলা বলে কি আর হাত পা গুটিয়ে বসে আছি নাকি ঘরে? চাষবাস দেখতে হচ্ছে। তা খুব নাকি ক্ষীর খেয়েছে?

খুব রটেছে দেখছি। বলে উঠে বসে বিষ্ণুপদ। মাথাটা একখানা চক্কর মারল।

তা রটেছে। তোমার নাতি গিয়ে বলল, ক্ষীর খেয়ে পেট ছেড়েছে। জরুরি তলব।

বিষ্ণুপদ হেসে বলে, ছেলে শেষ খাওয়া খাওয়াচ্ছে হে। তা আমারই বা আপত্তিটা কিসের?

দিলুম ঠেসে। মরণ-বাঁচন ভগবানের হাত।

সবটাই ভগবানের ওপর ছেড়ে দিও না! মরণ-বাঁচনে তোমার আমারও একটু হাত আছে। কবার হয়েছে? বার পাঁচেক হবে বোধহয়। বমিটমি নেই। খিদে আছে? শোনো পাগল ডাক্তারের কথা! খিদে থাকবে না কেন? এ কি বড়লোকের পেট। গরিবের পেটে সবসময়ে খিদে।

হরি বলো মন! তুমিই যদি গরিব তবে আমরা যাই কোথা! অত বড় বিলেত-ফেরত তালেবর ছেলে থাকতে তুমি গরিব কপচাচ্ছো? এও কি ধর্মে সয়?

বিষ্ণুপদ এক গাল হাসল। পুত্ৰগর্ব বলে একটা ব্যাপারও তো আছে! বলল, ছেলে তালেবর সে তার নিজের গুণে। আমার কোন গুণটা আছে বলো!

পুলিন প্রায় ঘরের লোক। সব খবরই জানে। তাছাড়া বিষ্ণুপুরে সবাই সবাকার সব জানে। তালেবর ছেলে যে বাপমায়ের থেকে তফাত হয়েছে, তা কি আর গুহ্য কথা কোনও। পুলিন তার পেট টিপে দেখতে দেখতে বলল, টাকাপয়সা না হয় না-ই দিল, চোখের দেখা না হয় নাই দেখল, তবু তো ছেলে বটে হে! গত বিশ বছরে এ গাঁয়ে ওরকম ছেলে আর একটাও বেরিয়েছে? টাকাপয়সায় নও হে বাপু, তুমি অন্য দিকে বড়লোক।

একথাটা বিষ্ণুপদর খুব পছন্দ হল। মাথা নেড়ে বলল, সে খুব ঠিক কথা।

পুলিন পেটে আঙুলের খোঁচা দিচ্ছে বটে, কিন্তু সেটা অভ্যাসবশে। আসলে ডাক্তারি পরীক্ষা করছে না কিছুই। তাকে আজ কিছু কথায় পেয়েছে। বলতে লাগল, আমার দশাই কি কিছু ভাল? আগে তবু রুগী-পত্তর আসত, আজকাল ভো ভা। বটতলায় এক হাতুড়ে চেম্বার খুলেছে, হস্তায় দুদিন বসছে এসে। শুধু এম বি বি এস ডিগ্রিটা ছিল বলে সেখানে পাকা কাঁঠালে মাছির মতো ভিড়, নাড়ীজ্ঞান নেই, মোট তেরোখানা ওষুধের নাম জানে, লক্ষণ দেখে রোগ চিনতে পারে না, কিন্তু গায়ের পয়সা বের করে নিয়ে যাচ্ছে। দু-দুটো ছেলেকে ডাক্তারি পড়াবো বলে ঠিক করে রেখেছিলুম, তাদুটো ষাঁড় ইস্কুল ডিঙোতেই হিমসিম খেয়ে গেল। কপাল! বুঝলে? কপাল! নাও, শুয়ে পড়ো দেখি।

বিষ্ণুপদ শুয়ে পড়ল।

পুলিন পেটে টোকা মেরে দেখল, বুকে পিঠে স্টেথােসকোপ দিল, নাড়ীও পরীক্ষা করল।

বিষ্ণুপদর খিদে পেয়ে রয়েছে। বলল, ওষুধের কথা থাক, পথ্যিটা কী হবে বলে তো! একটু ঝোলভাত খাবো নাকি?

তা খেতে পারো। পাঁচবার তো। ও কিছু নয়। বেশী করে জলটা খেও। ফুটিয়ে খেলেই ভাল। বর্ষাটা পেটের পক্ষে একেবারে যম। ওষুধটাও খেও। কয়েকটা ট্যাবলেট দিয়ে যাচ্ছি।

নয়নতারার এতক্ষণে সময় হল আসবার। ঘরে ঢুকেই বলল, কেমন দেখলেন মানুষটাকে?

কিছু নয় তেমন। ক্ষীরের দেনা শোধ হচ্ছে। একদিক দিয়ে ভালই, কোষ্ঠটা পরিষ্কার হয়ে গেল।

বড় নোলা হয়েছে ইদানীং। বারণ করলুম, তবু জোর করে ক্ষীর খেল।

আর বিশেষ খেও না হে বিষ্ণুপদ। কথা কি জানো! বুডোরা যখন একে একে কেটে পড়তে থাকে তখন বেঁচে-থাকা বুড়োদের বড্ড একা লাগে। ভয়-ভয়ও করে। বুঝলে কথাটা?

বুঝেছি।

তুমি যদি এখন টিকিট কাটো, তাহলে আমার দশাটা কেমন হবে জানো? মনে হবে, এই রে, এবার আমার পালা বুঝি।

বিষ্ণুপদ খুব হাসল। বলল, এমনিতে যাবো না। পোক্ত শরীর। তবে কিনা ডাক এলে তো যেতেই হবে।

সেই কালঘড়ি না কোন গুষ্টির পিণ্ডি দেখেছিলেন, সেই থেকেই মাথা বিগড়েছে!

রামজীবন ফিরল সন্ধেবেলা। বাপের খবর শুনেই চলে এল বিষ্ণুপদর কাছে, বাবা! শেষে কি পিতৃঘাতক হলাম?

মুখ থেকে ভকভক করে কাঁচা মদের গন্ধ আসছে। বড্ড খারাপ গন্ধ। গা গুলোয়। বিষ্ণুপদ বলল, ওরে না! সে ব্যাপার নয়।

রামজীবন দুখানা পা সাপটে ধরল বিষ্ণুপদর। ফুঁপিয়ে খুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি কুলাঙ্গার! নেমকহারাম। একটু কষ্ট করে উঠে আমাকে জুতোপেটা করুন বাবা। দু গালে থাবড়া দিন।

মাতালের মনস্তাপও বড় সাঘাতিক জিনিস। সহজে শেষ হতে চায় না। বিষ্ণুপদ দুখানা পা ছাড়ানোর একটা ক্ষীণ চেষ্টা করতে করতে বলল, আমার তেমন কিছু হয়নি। সকালে দুপুরে মিলিয়ে বার ছ-সাত হয়েছে। তাতে ভালই হয়েছে বাবা। পেটের গাদ নেমে গেছে। এ বেলা শরীর বেশ ঝরঝরে।

কিন্তু এত কথার পরও রামজীবনের কান্না থামে না, আমার মতো পাপী কি আর আছে? শালার এই ভাঙা ঘরে আপনাকে ফেলে রেখেছি! পাকা ঘর তুলে তাতে রাখব বলে কতকাল ধরে চেষ্টা করছি। আপনি মরে গেলে পাকা ঘর দিয়ে আমার কী হবে!

মরার এখনই কি! পুলিন ডাক্তারও দেখে গেছে, বলেছে কিছুই হয়নি। অত ভাবছিস কেন?

কিন্তু রাঙা যে বলল, ক্ষীর খেয়েই নাকি আপনার ভেদবমি শুরু হয়েছে।

ওরে না। ক্ষীর বলে কথা নয়। বর্ষাকালটা এরকমই হয়। নতুন জল তো!

আজ যে আমি জ্যান্ত শোল মাছ এনেছি। সেটা খাবে কে?

শোল মাছের কথায় বিষ্ণুপদ চাঙ্গা হয়ে উঠল। তার অতি প্রিয় মাছ। তেজী গলায় বলল, এনেছি? খুব ভাল করেছিস। আজ তো পেটটা ধরেই গেছে। সঁতলে রাখুক, কাল খাবোখন।

নয়নতারা ঘরে ছিল না। কিন্তু শুনেছে ঠিক। বাইরে থেকেই উঁচু গলায় বলল, শশাল মাছ খাবে! মাথাটা কি একেবারেই গেছে নাকি? তোমার ওই পেটে শোল মাছ সাক্ষাৎ বিষ।

রামজীবন হাহাকার করে উঠল, ও কথা বোলো না মা। শোল মাছ আমি বাবার নাম করে কিনে এনেছি।

তার চেয়ে বাপকে একটু সেঁকো বিষ এনে দে। ল্যাঠা চুকে যায়।

বিষ্ণুপদ গলাটা নামিয়ে রামজীবনকে বলল, অত সোরগোলের দরকার নেই। বউমাকে বলিস, তেলঝাল দিয়ে বেঁধে রাখতে। এক ফাঁকে কাল ঠিক খেয়ে নেবো। মুলো দিয়ে শোল অমৃত। তা এ তো মুলোর সময় নয়।

মুলো দিয়ে যাবেন বাবা! আজকাল সব সময়ে সব কিছু পাওয়া যায়। কাল ভোরে গিয়ে জাগুলিয়া থেকে নিয়ে আসব।

আধা ঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিটকতক্ষণ কে জানে বিষ্ণুপদর আজকাল আর সময়ের হিসেব থাকে নারামজীবন পা দুখানা বুকে চেপে ধরে রইল। তারপর নয়নতারা আর পটল মিলে প্রায় জোর করে তুলে নিয়ে গেল রামজীবনকে। তারপরও বিষ্ণুপদ শুনতে পেল, নিজের ঘরের দাওয়ায় বসে রামজীবন মেলা কান্নাকাটি করছে। নানা দুঃখ উথলে উঠছে। এখন তার। হঠাৎ বৃষ্টি নেমে সব শব্দ ড়ুবিয়ে দিল।

সারা রাত ধরে তুমুল বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেল বিষ্ণুপদ। আজকাল মাঝে মাঝে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়ে, মাঝে মাঝে বায়ু চড়া হয়ে সময়েও ঘুম আসতে চায় না। আজ রাতে বায়ু চড়েছে।

খুব ভোরে, ভাল করে আলো ফোটবার আগেই বিষ্ণুপদ দাওয়ায় এসে বসল। একটু ধরেছে বৃষ্টিটা। তবে আকাশ মুখিয়ে রয়েছে এখনও। উঠোনে হাঁটুজল দাঁড়িয়ে গেছে। ঘরে জল, দাওয়ায় জল। এত জল বহুকাল হয়নি। আগে এই জলে গা ভেসে যেত। আজকাল একটা নিকাশী খালের দরুন ততটা হচ্ছে না। কিন্তু তেমন ভারী জল হলে বিপদ।

রামজীবনের পাকা ঘরের অবস্থাও বড় করুণ। ইরফান সাতদিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছে। এই বাদলায় গাঁথনি থাকছে না, মশলা ধুয়ে যাচ্ছে। ঘরে কয়েক বস্তা সিমেন্ট পড়ে আছে। ভিজেভিজে জমে না পাথর হয়ে যায়।

রোজকার মতো আজও আধখ্যাচড়া ভূতুরে বাড়িটা বিষ্ণুপদকে মুখ ভ্যাঙচায় যেন, কী বুড়ো, থাকবি পাকা ঘরে? আয় থাকাচ্ছি। কালঘড়ি তো আয়ু খেয়ে ফেলল তোর। এরপর যখন ফুরু হয়ে যাবি তখন ঘর কোথা পাবি বুড়ো? খুব ক্ষীর সাঁটাচ্ছিস, শোল গিলছিস, শরীরে আহুতি দিচ্ছি, কদিন পর তো শরীরখানা পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই জলে ভাসিয়ে দেবে? কে খাবে বাবা সোলমুলো, কে থাকবে বাবা পাকা ঘরে?

ঘরখানার সঙ্গে বিষ্ণুপদর একটা আড়াআড়ি আছে। তাকে সইতে পারে না ঘটা। সেই জন্যই কি কাজ আটকে থাকে? এ বড় অলক্ষুণে ব্যাপার হল।

বর্ষাটা ছাড়লে বাড়ি ভাগ হবে। আমি আসবে। মাপজোখ হবে। ছেলেমেয়েরা আসবে। গায়ের মাতব্বর সব সাক্ষী হবে। ছেলে কৃষ্ণজীবন আর দুই মেয়েকে চিঠি দিয়েছে বিষ্ণুপদ। কঠিন হল শিবচরণ। আজ বছর সাত-আট হল সে বাড়ি ছেড়ে কোথায় চলে গেছে। তার কথা আজকাল আর মনে পড়ে না বিশেষ বরাবর কিছু ডাকাবুকো ছিল, লেখাপড়ায় মাথা ছিল না। কিন্তু বড় হওয়ার শখ ছিল খুব। গায়ে থেকে কিছু হচ্ছে না, প্রায়ই বলত। তারপর একদিন নিজের জিনিসপত্র নিয়ে, বাড়ির কিছু পুরনো কাঁসার বাসন, নয়নতারার দুটি সোনার দুল, ঘটে জমানো পয়সা, রাঙার বিয়েতে পাওয়া রূপোর চুটকি, রামজীবনের ঘড়ি এইসব জিনিস চুরি করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল। খোঁজখবর করা হয়েছে, লাভ হয়নি।

এলেম থাকলে পালিয়ে গিয়ে কেউ কেউ ভাগ্য ফিরিয়ে আসতে পারে। শিবচরণ পারবে কিনা কে জানে। কিন্তু যদি হেরো হয়ে একদিন ফিরে আসে তবে এ বাড়িতে তিষ্ঠোনো মুশকিল হবে।

শিবচরণ সম্পর্কে আর একটা ভাবনাও আছে। মরেটরে যায়নি তো! যদি গিয়ে থাকে তবে খবরটা জীবকালে পেতে চায় না বিষ্ণুপদ। নিরুদ্দেশ থাকাই ভাল। খারাপ খবর-টবর না এলে ধরে নেওয়া যাবে, ভালই আছে। হয়তো করে-কর্মে খাচ্ছে। কে জানে, হয়তো বিয়েও করেছে, ছেলেপুলে হয়েছে।

নয়নতারা আগে খুব কাঁদত শিবচরণের জন্যে। আজকাল বোধহয় ভাটা পড়েছে একটু।

আজ বেহানবেলায় হারানো ছেলের কথা মনে হতে বিষ্ণুপদ ভাবল, এ বাড়িতে তো শিবচরণেরও ভাগ আছে। কথাটা মনে রাখতে হবে।

 ০১৭. জানালা দুরকম হয়

জানালা দুরকম হয়। কোনও জানালায় দৃশ্য থাকে, কোনটায় থাকে না। চয়নের জানালায় কোনও দৃশ্য নেই। তার একতলার ঘরখানা খুবই অন্ধকার। একটাই দরজা ভিতরদিকে, একটাই জানালা বাইরের দিকে। জানালার ওপাশে একটা সংকীর্ণ গলি, তার ওপাশে দেয়াল। নিরেট দেয়াল, নোনাধরা। জানালার পুরনো শিক আর জং ধরা এক্সপাণ্ডেড মেটাল লাগানো। দিনেই আলো জ্বালতে হয়। তবে এ ঘরে ইলেকট্রিক লাইন কেটে দিয়েছে চয়নের দাদা। বাড়ির পিছন দিককার সবচেয়ে খারাপ, ড্যাম্প ধরা, অন্ধকার ঘরখানায় থাকে চয়ন আর তার মা। চয়ন এ ঘরে পড়াশুনো করতে হলে জানালার ধারে বসে করে। এ ঘরেই স্টোভ জ্বেলে তার আর মায়ের রান্না হয়। এক চিলতে উঠোনে চৌবাচ্চা আছে। তাতে করপোরেশনের জল আসে। জল ব্যবহারের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আছে। সকাল আটটার মধ্যে তাদের স্নান করে নিতে হয়। ছাদে যাওয়া বারণ বলে ভেজা কাপড় শুকোতে হয় ঘরের মধ্যেই। সাবান কাঁচা সম্পূর্ণ নিষেধ।

জানালায় দৃশ্য থাক বা না-থাক, ঘরে থাকলে চয়নের বেশীর ভাগ সময়ই কাটে জানালার ধারে বসে। এ ঘরের যেটুকু আলো তা ওই জানালার সুবাদেই পাওয়া যায়। এই পেছনের গলিটা সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য নয়। আগে খাটা পায়খানার আমলে মেথর আসবার রাস্তা ছিল, আজকাল খিড়কির রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করে অন্য বাড়ির লোক। মাঝখানে গলিতে ময়লা ফেলা শুরু হয়েছিল, সেটা চয়ন চেঁচামেচি করে পাড়ার হস্তক্ষেপে বন্ধ করেছে। তবু কিছু কিছু অশ্লীল জিনিস গলিতে নিক্ষিপ্ত হয়। কাকেরা টানা-হ্যাচড়া করে।

মলিন আলোটুকু বইতে পড়তে বা লিখতে কাজে লাগে চয়নের। দুপুরে জানালার খাজে বসে কোলে বই বা খাতা নিয়ে সে ড়ুবে যায় নিজের কাজে বা চিন্তায়। ওই গলিপথেই একদিন দুপুরে উদয় হল আশিস বর্ধন।

কি মশাই, চিনতে পারছেন?

চয়নের স্মৃতিশক্তি চমৎকার। কোনও নাম বা মুখ সহজে ভোলে না। সে একটু অবাক হয়ে বলে, চিনতে পারছি। আপনি আশিসবাবু, এল আই সিতে কাজ করেন। মেশিন ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু গলি দিয়ে এলেন কেন? এদিক দিয়ে তো এ বাড়িতে ঢোকার রাস্তা নেই।

সে জানি। তবে আপনার কথা থেকে আঁচ করেছিলাম যে, সদর দিয়ে ঢোকা একটু আনসেফ। ঢোকার দরকারও নেই। এখান থেকেই কথা বলে চলে যাই। বলে প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাগজের পুরিয়া বের করে এক্সপাডেড মেটালের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিয়ে বলে, ধরুন। কালো তাগায় বেঁধে পরবেন।

কী এটা?

মাদুলি। হাবড়ার এক তান্ত্রিকের দেওয়া।

চয়ন মৃদু একটু হেসে বলে, তাবিজ-কবজ তো অনেক হয়ে গেল। কাজ হয়নি কিছু।

আশিসও হাসল, ওসবে আমারও বিশ্বাস নেই। তবে মানুষ তো সব রকম চেষ্টাই করবে। আমিও যে যা বলে করে যাই, বোনটার জন্য। মৃগী না সারলে বিয়ে দেওয়া যাবে না, আর বিয়ে না হলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

আপনার বোনের কি মাদুলিতে কাজ হয়েছে?

মনে হয় হতেও পারে। গত পনেরো দিন তো অজ্ঞান হয়নি। দেখা যাক।

চয়ন কুষ্ঠিতভাবে বলে, আপনি এত কষ্ট করলেন! দাঁড়ান, আমি জামাটা পরে আসছি।

আশিস বর্ধন জানালার কাছে এসে ঘরের মধ্যে একটু উঁকি দিয়ে বলল, এইটাই বুঝি আপনার আর আপনার মার ঘর? চয়ন মৃদু হেসে বলে, হ্যাঁ। বাদবাকি বড়িটা আমার কাছে নিষিদ্ধ। সেইজন্য—

আরে ব্যস্ত হবেন না। এসব সিচুয়েশন আমার জানা আছে। মা বুঝি ঘুমোচ্ছন! খুব রোগা তো!

সরু চৌকির ওপর পড়ে থাকা মায়ের দিকে একবার তাকায় চয়ন। বলে, হাড় কখানা অবশিষ্ট আছে। মায়ের অনেক রোগ, চিকিৎসা তো হয় না। পড়ে থাকে নির্জীব হয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, মরেটরে গেছে বুঝি।

রোগটা কী?

মার চোখে ছানি। প্রেশার খুব বেশী। হার্টও বোধ হয় ভাল নয়। বাত।

আপনাদের রান্না করে কে?

কিছুদিন আগেও মা পারত। আজকাল আমি করি। একটা কুকার ছিল বাবার আমলের। সেইটে কাজে লাগছে।

দাদা বউদির সঙ্গে সম্পর্কটা এখন কেমন?

সম্পর্ক নেই। দেখা হলেও কথাবার্তা হচ্ছে না।

বকাঝকা বা পরোক্ষ গালাগাল?

চয়ন মৃদু হেসে বলে, আগে হত। আজকাল সেদিক দিয়ে পিসফুল। আপনাকে তো এত কথা বলিনি, জানলেন কি করে?

বেশীর ভাগ অভাবের সংসারের ছবিটা একই রকম কিনা। আমি সেদিন আপনার বাড়ির ঠিকানা চাওয়ায় আপনি একটু দোনোমোনো করেছিলেন এবং অসময়ে আসতে বারণ করেছিলেন, তখনই আন্দাজ করে নিয়েছিলাম। কিছু মনে। করলেন না তো!

বিবৰ্ণ একটু হেসে চয়ন বলে, না না, আপনি তো সিমপ্যাথাইজার।

একজ্যালি। কারণ আমার দাদা আমাকে আপনার চেয়েও একটি বেশী করেছিল। লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।

চয়ন চেয়ে রইল লোকটার দিকে।

আশিস ম্লান হেসে বলল, অবশ্য দোষটা আমারই ছিল। দাদার জায়গায় আমি হলেও হয়তো তাই করতাম। যাকগে। তবে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াতেই কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে যেতে পেরেছি। নইলে একদম বখে গাড়ায় চলে যেতাম।

দাদার সঙ্গে আপনার আর সম্পর্ক আছে?

পরে রিকনসিলিয়েশন হয়েছিল, তবে সংসার তো আর এক হয়নি। শত্ৰুতাও নেই।

কিন্তু আপনি গলিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, আমার খুব অভদ্রতা হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়ান, জামাটা গায়ে দিয়ে আসছি।

একবার বেরোলে ঢুকতে পারবেন তো! সদর বন্ধ বা খোলার ব্যবস্থা কি আপনার হাতে আছে?

চয়ন মলিন মুখে মাথা নেড়ে বলে, না। বউদি ওপরে ঘুমোচ্ছ। সদর খুলে বেরোলে দরজা টেনে দিলে লেগে যাবে। কিন্তু ফের ঢুকতে হলে তোরবেল বাজাতে হবে। তবে অসময়ে ফিরলে আমি এই জানালায় এসে মাকে ডাকি। মা খুলে দেয়। তবে মার কষ্ট হয়।

তাহলে বেরোনোর দরকার নেই আপনার। আমি যাচ্ছি।

আরে না। আমার টিউশানিতে যাওয়ার সময় তো হয়ে এল।

তাহলে আসুন। আমি রাস্তায় অপেক্ষা করছি।

তার নতুন একজন বন্ধু হল কিনা তা বুঝতে পারছে না চয়ন। আগে ইস্কুল-কলেজে তার অনেক বন্ধু ছিল। আজকাল বিশেষ কেউ নেই। সে কোনওদিন চায়ের দোকানে বা পাড়ার ঠেক-এ আড্ডা দিতে যায়নি। তার শরীর দেয় না, তার সময়ও হয় না। প্রাণপাত বন্ধুত্ব তার সঙ্গে ছিলও না কারও। সে অনেকটাই একা, সঙ্গহীন। আশিস তার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড়, তবু যদি বন্ধুত্ব হয় তাহলে খারাপ লাগবে না চয়নের। তার বোধ হয় এখন একজন বন্ধুই দরকার। পোশাক বলতে প্যান্ট, জামা আর চপ্পল।. পরতে দুমিনিট লাগে। বেরোনোর আগে একবার মাকে ডেকে বলে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু মা এত অকাতরে ঘুমোচ্ছ যে, ডাকতে ইচ্ছে হল না। এরকম ঘুমের মধ্যেই মা একদিন চলে যাবে বোধ হয়। সেদিন চয়ন আরও একটু একা হয়ে যাবে।

বাইরে মেঘলা আকাশ। ভ্যাপসা গরম।

আশিস বলল, আজ টিউশনি কোন দিকে? সাউথে কি?

আজ্ঞে হ্যাঁ। গোল পার্কের কাছে, সেদিন যেখানে যাচ্ছিলাম।

ছাত্র না ছাত্রী? ছাত্রীই যেন বলেছিলেন।

হ্যাঁ।

বড়লোক নাকি?

পয়সায় তেমন নয়। তবে ছাত্রীর বাড়া বড় সায়েন্টিস্ট। নাম আছে।

কী নাম বলুন তো!

কৃষ্ণজীবন বিশ্বাস। কাগজে লেখেন-টেখেন। এনভিরনমেন্টের ওপর।

আশিস বর্ধন মাথা নেড়ে বলল, জানি। বিখ্যাত লোক। ইংরজি কাগজে লেখা পড়েছি। কি রকম দেয় আপনাকে?

আড়াই।

কমই দিচ্ছে। বাসভাড়াটা বাদ দিন, কী থাকছে বলুন।

এর বেশী চাইতে ভয় করে। হয়তো টিউশনিই পাবো না।

দুর মশাই! বরং উল্টো। যত দাম বাড়াবেন তত ডিমান্ড হবে। আমি তো এক গুজরাতির ছেলেকে পাঁচশো টাকাতেও পড়িয়েছি।

ও বাবা!

আজকাল আর ওই উঞ্ছবৃত্তি করি না। তবে আমার আর একটা সাইড বিজনেস আছে। শেয়ার বাজারের ব্রোকারি।

সেটা কী ব্যাপার?

সেটা খুব ভাল ব্যাপার। একটু মেধা আর ক্যালকুলেশনের দরকার হয়। কিছু টাকাও খাটাতে হয়। লেগে থাকলে অনেক পয়সা করবেন?

চয়ন খুব লাজুক দৃষ্টিতে আশিস বর্ধনের দিকে একবার তাকায়। পৃথিবীর কত কিছুই সে পারে না। পারবে না ইহজন্মে। সে স্মিত মুখে চুপ করে রইল।

আশিস বর্ধন তার মনের কথাটা যেন পড়ে নিল। বলল, পারবেন না তো! বাঙালির ছেলেরা ওসব রাস্তায় যেতে চায় না। তারা চায় সেফ প্রফেসন। যাকগে, মাদুলিটা পরবেন কিন্তু। একটু নিয়ম আছে। শনিবার সকালে একটু কাঁচা দুধে ধুয়ে নিয়ে কালো কার বেঁধে পরবেন। কাজ হলে হবে। না হলেও ক্ষতি নেই। তাই না?

এর দাম?

দুর মশাই! পাঁচ সিকে দক্ষিণা দিয়েছি। আপনাকে কিছু দিতে হবে না। তান্ত্রিকটার পয়সার লালচ নেই, সেইজন্যই ভরসা হল, কাজ হতেও পারে। চলুন, চা খাই কোথাও বসে।

সম্পর্ক জিনিসটা চয়ন কখনও রচনা করতে পারে না। আপনা থেকেই রচিত হয়ে যায়। বেশীরভাগ সময়েই সেটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয়। এই যে আশিস বর্ধন, এইমাত্ৰ চয়ন বুঝতে পারছে, এর সঙ্গেও তার বন্ধুত্ব হবে না। লোকটি মেধাবী, করিকর্মা এবং শক্তিমান। এর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হবে কি করে? সম্পর্কটা উপকারী ও উপকৃতের। অনুগ্রহকারী ও অনগৃহীতের, উপদেষ্টা ও উপদিষ্টের। এ লোকটা সেদিন তার কিছু উপকার করেছিল এবং আরও কিছু উপকার করতে চেয়েছিল। আজও বাড়ি বয়ে মাদুলি দিয়ে গেল। চয়নের কৃতজ্ঞতাবোধ বড়ই বেশী। কেউ তার জন্য সামান্য কিছু করলেও

সে গলে যায়। এই মনোভাব নিয়ে কি বন্ধুত্ব হয়।

আশিসকে নিয়ে পাড়ার কালোর চায়ের দোকানে বসল চয়ন। এ দোকান তার ঠেক নয়। তবে অনেকদিন এ পাড়ায়। থাকার সুবাদে চেনা। চা খুবই ভাল বানায় এরা। আশিসকে চা আর ওমলেট খাওয়াল চয়ন। খাওয়াল, কিন্তু দামটা দিতে পারল না। কারও সঙ্গে সে জোর জবরদস্তিতে পেরে ওঠে না। আশিস জের করেই দামটা মেটাল। খুব হীনন্যতা কষ্ট পেতে লাগল চয়ন।

আশিস বলল, আমি সাউথেই যাচ্ছি। চলুন নামিয়ে দিয়ে যাই। ট্যাক্সি নেবো।

চয়ন আবার আর একটা কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হয়ে পড়তে চাই না। পৃথিবীর শক্তিমান লোকগুলোর ওপর ইদানীং তার খুব রাগ হয়।

চয়ন মৃদু হেসে বলে, এখনও ঢের দেরি। আমি একটু পরে যাবো।

চলুন, আগেই বেরোই। এই ফাঁকে আমার বাড়িতে ঘুরে আসবেন।

বাড়িতে! বলে চয়ন ভাবিত হয়। এত অল্প পরিচয়ে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় কেউ?

আরে অত ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন? আমি দ্রুত বন্ধুত্বে বিশ্বাসী।

দ্রুত-বন্ধুত্ব!

এ যুগে যা করার তা চটপট সেরে ফেলতে হয়। আমাদের আয় কম, সময় কম, অবসর কম, বন্ধুত্ব করার জন্য বেশী ভ্যানতারার স্কোপ কোথায় বলুন। আমি তাই চটপট বন্ধুত্ব করে ফেলি। তাতে দু-চারটে সন্দেহজনক ক্যারেকটারও যে। জোটে না তা নয়। তবে মোটের ওপর আমি ঠকিনি। আর আপনার চিন্তার কিছু নেই। চলুন। সবসময়ে অত সংকুচিত হয়ে থাকবেন না। সবসময়ে যদি নিজের ডেফিসিয়েন্সিগুলোর কথা ভাবতে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে, নিজের কাছেই নিজে বাতিল হয়ে বসে আছেন। তাহলে দুনিয়া আপনাকে পাত্তা দেবে কেন বলুন।

চয়ন লোকটার দিকে আর একবার চোৱাচোখে তাকাল। লোকটি সদাশয়, সে আগের দিনই বুঝেছিল। কিন্তু এর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হবে দাতা ও গ্রহীতার। এ তার অনেক উপকার করবে এবং করতেই থাকবে। বন্ধুত্বের জন্য আর একটু সমানে সমানে হওয়া দরকার। তবু জীবনে যা আসে তাই নেওয়া ছাড়া কী আর করার আছে তার।

সে বলল, চলুন।

ট্যাক্সিতে চড়াটা চয়নের কাছে বেশ একটা অপব্যয় বলে মনে হয়। কলকাতায় এত বাস ট্রাম, তা সত্ত্বেও ট্যাক্সি চড়ে তারাই যাদের বিস্তর ফালতু পয়সা আছে। আশিস বর্ধনও মনে হচ্ছে, বিস্তর ফালতু পয়সার মালিক।

ধীরে ধীরে আশিস বর্ধনের ছবিটা পরিষ্কার হচ্ছে তার কাছে। আশিস বর্ধন চটপট বন্ধুত্বে বিশ্বাসী, চয়ন তা নয়। আসলে চয়ন তত বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে পারে না আজকাল, হীনম্মন্যতা ভোগে বলে। কিন্তু মানুষকে সে খুব লক্ষ করে। তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ ছাড়াও তার আর যেসব খামতি বা বাড়তি, খুঁটিনাটি সব কিছু। লোকে বুঝতেই পারে না, চয়নের চোখে গোয়েন্দার পর্যবেক্ষণ আছে।

ট্যাক্সিতে বসে আশিস বলল, চাকরি পেলে করবেন?

এখনই। হাতে আছে?

আরে না। বলে হাসল আশিস, চাকরি কি হাতে থাকে নাকি? তবে আমি শেয়ারের ব্রোকার তো, বিজনেসম্যানদের চিনি। আমারই খদ্দের সব। এদের কারও কোম্পানিতে হয়ে যেতে পারে। তবে কিনা মাইনে খুব কম, খাটুনি বেদম। আসলে দেশে এত বেকার আর এই বাঙালি ছেলেগুলো চাকরি ছাড়া আর কিছু করতে চায় না বলে, এইসব লোকেরা সুযোগটা নেয়। তিনশো চারশো টাকায় বারো ঘণ্টা খাঁটিয়ে নিচ্ছে।

চয়ন মলিন মুখে বলে, জানি। আমি ওরকম পেরে উঠবো না।

চাকরির বাজার খারাপ। তবু আপনার বায়োডাটাটা আজ লিখে দেবেন তো আমাকে।

চয়ন বলল, আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করছেন। আমি তো কিছুই প্রতিদান দিতে পারছি না।

আপনি মশাই, খুব খারাপ লোক।

তাই বুঝি?

খারাপ ছাড়া কী! এখনও দূরত্বটাই ঘোচাতে পারলেন না। এইসব ছোটোখাটো পরিচয়গুলোকে উপেক্ষা করবেন না। এভাবেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, ভাব ভালবাসা আসে, আর এ থেকেই জাতীয় সংহতি। বুঝলেন?

বলেই আশিস হেসে ফেলল।

চয়ন সহজে কারও সঙ্গে ঠাট্টা রসিকতা করে না। কিন্তু এই সহজ লোকটাকে সে বলে ফেলল, আপনিও খারাপ লোক। আমাকে চা ওমলেটের দাম দিতে দেননি।

হবে হবে, বিস্তর চা ওমলেট পাওয়া যাবে। খাওয়ার এই তো শুরু।

যাদবপুরের একটু ভিতরদিকে কলোনির মধ্যে আশিস বর্ধনের দোতলা বাড়ি। একটু জমি আছে সামনে আর পিছনে। মেলা গাছ। যেটুকু জমি পেয়েছে ঘন বুনটে গাছগাছালি লাগিয়েছে। ফলন্ত কুমড়ো, লঙ্কা, ঢাড় দেখতে পেল চয়ন। আরও আছে।

বাড়িতে ঢোকার আগে বর্ধন তাকে বাগানটা দেখাল, এই এরাই আমার প্রাণ। এইসব গাছপালা, জীবনে এই একটাই আমার হবি, নিজের লাগানো গাছের সবজি বা ফল খাওয়া, নিজের গাছের ফুল দিয়ে ঠাকুরপুজো করা। জমি থাকলে আরও কত কী করতাম। আসুন ভিতরে।

একজন এপিলেপটিকের সঙ্গে আর একজন এপিলেপটিকের পরিচয় কি অন্যরকম কিছু ঘটনা? কোনও টেলিপ্যাথি হয়? বা বিশেষ ধরনের সমবেদনা? কে জানে কী! তবে আশিসের হাঁকডাকে যখন জনা তিনেক মহিলা আর দুটো বাচ্চা এসে বৈঠকখানায় জড়ো হল তখন লজ্জায় নতমুখ চয়নও টের পেল, তাকে সবচেয়ে নিবিড় ভাবে লক্ষ করছে যে মেয়েটি, সে হল আশিসের ওই এপিলেপটিক বোন, রোগা দাঁত-উঁচু ফ্যাকাশে মেয়েটিকে দেখলেই বোঝা যায়, অসুস্থ। একবারের বেশী তাকায়নি চয়ন। তবু দেখে নিয়েছে, মেয়েটির মাথায় অনেক চুল, আর চোখ দুখানা ভারি টানা টানা।

এরা বেশ ভাল পরিবার। বেশী এটিকেট নেই। ঝাপঝাপ সবাই বসে পড়ল। হই হই করে কথা বলতে লাগল।

চয়নের কথা আসে না। স্মিত মুখে চুপচাপ বসে থাকতেই সে ভালবাসে। একজন এপিলেপটিক কি আর একজন এপিলেপটিককে দেখে ভরসা পায়? জীবনের ওপর বিশ্বাস ফিরে পায়? আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এপিলেপটিকরা কি পরস্পরকে আশ্বস্ত এবং আরোগ্যও করে তুলতে পারে। তার কেন যেন সন্দেহ হচ্ছে, নিজের মৃগী রোগী বোনের জন্যই তাকে বাড়িতে এনেছে আশিস। হয়তো তাকে দেখিয়ে বোনের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।

আশিসের বউ চা আর বাবার করতে গেল। আশিসের মা গেল নাতি আর নাতনি সামলাতে? আশিস গেল বাথরুমে। রইল শুধু মেয়েটি।

আমার নাম রাকা। আপনার কথা দাদা খুব বলে।

বলার মতো কী? আজ তোে দ্বিতীয় দিনের পরিচয় মাত্র।

কী জানি কেন বলে! ওর আবার যাকে ভাল লাগে, তাকে এক মিনিটেই লাগে।

ওঁর সঙ্গে একদিনের মাত্র আলাপ, তাও আমার পক্ষে লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে। আমি রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম।

দাদা সব বলেছে। আমারও তো ওরকম হয়। ইস্কুলে কলেজে ক্লাস করতে করতে কতবার হয়েছে। একবার রাস্তায় আর একবার ট্রামেও হয়েছিল। দাদা কিন্তু তা বলে আমাকে বেরোতে বারণ করে না। বরং বলে, না বেরোলে কনফিডেন্স থাকবে না। ওর ভীষণ কনফিডেন্স জানেন তো!

জানলাম। উনি আমাকে আজ একটা মাদুলি দিয়ে আসতে গিয়েছিলেন।

মেয়েটি হাসল, তাও জানি। ও এমনিতে ভীষণ নাস্তিক, কিন্তু অসুখ-বিসুখের বেলায় কিছুই ছাড়ে না, সব বাজিয়ে দেখে। আপনি মাদুলীটা ধারণ করবেন কিন্তু। আমার মনে হচ্ছে একটু কাজ হয়েছে।

করব। তবে গত একমাস আমার অ্যাটাক হয়নি। একজন বড় হোমিওপ্যাথকে দেখাচ্ছি। বোধ হয় কাজ হচ্ছে তাতেও।

দুজনেই দুজনের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ নীরবে। তারপর দুজনেই একসঙ্গে হেসে ফেলল।

রাকা বলল, আসলে কিসে যে সত্যিকারের কাজ হবে কে জানে। ফ্রিকোয়েন্সিটা কমলেই যেন হাতে চাঁদ পাই। তাই না বলুন।

চয়ন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তা তো ঠিকই। কিন্তু যখন যখন দীর্ঘ দিন গ্যাপ যায় তখন ভীষণ টেনশন শুরু হয়, এই বুঝি হবে! এই বুঝি হবে!

উঃ, আপনার সঙ্গে আমার দারুন মিল! আমারও ঠিক এরকমই হয়।

বিকেলটা হাসিতে গল্পে বেশ কেটে গেল চয়নের। অনেকদিন বাদে কিছুটা সময় এমন ভাল কাটল তার। আশিস তাকে বাসরাস্তা অবধি এগিয়ে দিয়ে বলল, দেখলেন তো, এসে তাঁকেননি! এ যুগে চটপট বন্ধুত্ব করে নেওয়া ভাল, নইলে ভ্যানতাড়ায় আয়ুক্ষয় হয়ে যায়। চলে আসবেন যখন তখন, অলওয়েজ ওয়েলকাম।

অটোমেটিক লিফটে মোহিনীদের সাততলায় ফ্ল্যাটে উঠবার সময় মনে মনে একটা ভারি উচ্চকোটির ভাব হচ্ছিল তার। মনটাও যেন লিফটে করে অনেক ওপরে উঠে বসে আছে আজ। নামতে চাইছে না।

চার বা পঁচ তলায় কেউ লিটটা থামাল। চয়ন চোখ বুজে তার আনন্দিত অভ্যন্তরটাকে অনুভব করার চেষ্টা করছিল। লিস্টটা থামতেই চোখ খুলল। কিন্তু তাকে আপাদমস্তক শিহরিত করে চোখে ঘনিয়ে আছে কুয়াশা। একটা ট্রেনের শব্দ এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বা হাতের বুড়ো আঙুলটা থরথর করে কাঁপছে।

না, আজ কিছুতেই অজ্ঞান হওয়া চলবে না তার। কিছুতেই না। যেমন করেই হোক তাকে আজ জেগে থাকতেই হবে। দরজাটা খুলতেই তাই সে কুয়াশায় আবছা চোখেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কেউ উঠছিল, তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে এল সে করিডোরে। তারপর সিঁড়ি ধরে ছুটতে ছুটতে উঠতে লাগল সে, না আমার কিছু হয়নি। কিছু হয়নি। আমি ভাল আছি!….. ভাল আছি….

একটা ল্যান্ডিং অবধি উঠতে পেরেছিল সে। তারপর দড়াম করে পড়ল। সিঁড়ি দিয়ে খানিক গড়িয়ে, তারপর টেরচা হয়ে রেলিং-এ লেগে স্থির হল তার শরীর। ওইভাবেই পড়ে রইল। প্রায় পনেরো মিনিট বাদে তাকে আবিষ্কার করলেন মিসেস মেহতা। তিনি খবর দেওয়াতে, মোহিনী আর রিয়া নেমে এল।

 ০১৮. বীণাপাণির বিপদের কথা

বীণাপাণির বিপদের কথা কেউ জানে না। কেউ না। কত বড় বিপদ নিয়ে যে সে বাস করছে আজকাল। সবসময়ে বুক এত ঢিবঢ়িব করে যে, বুকের ব্যামমা না দাঁড়িয়ে যায়। সে ভাল করে ঘুমোতে পারে না, খেতে পারে না। মনটায় সবসময় অশান্তি। আজকাল রিহার্সালে তার পার্টও ভুল হয়।

সেদিন এক চুলের জন্য বেঁচে গেছে বীণাপাণি। শেষ রাত্তিরে যখন কাকা তার স্মাগলার কয়েকজন সাকরে নিয়ে এসে হাজির হল সেদিনই হয়ে গিয়েছিল বীণার। ভয়ে সে দরজা খুলবে কি, নিমাইয়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলে ফেলেছিল, আমার বড় ভয় করছে।

নিমাই অবাক হয়ে বলল, ভয়ের কী ও তো কাকার গলা।

তবু করছে। তুমি দরজা খুলো না।

নিমাই ডবল অবাক হয়ে বলে, খুলবো না! বলে কী? কাকা আমাদের অন্নদাতা, কোন বিপদে পড়ে এসেছে, দরজা না খুললে কি হয়? বলে নিমাই সাড়া দিয়ে বলল, কাকা নাকি? এই খুলছি।

দরজার শব্দ বন্ধ হল।

নিমাই যখন মশারি তুলে বেরোচ্ছে, তখন বীণাও চৌকির অন্য পাশ দিয়ে নামল। তারপর নিচু হয়ে চৌকির তলা থেকে কাপড়ে বাঁধা একটা পুঁটলি টেনে পট করে পিছনের জানালা গলিয়ে কচুবনে ফেলে দিল।

কাজটা ভেবেচিন্তে করেনি বীণা। তবে খুব বিবেচনার কাজই হয়েছিল।

নিমাই দরজা খুলতেই কাকা বলল, কিছু মনে কোরো না ভাই, আমরা বড় জরুরি কাজে এসেছি। বীণাকে ডাকো।

বীণার বুকের ঢিবঢ়িব সেই থেকে শুরু। সে ঘুমকাতুরে মুখ নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল, কী কাকা? এত সকালে কী ব্যাপার গো? কোনও বিপদ নাকি?

কাকা গম্ভীর মুখে বলল, কিছু লুকিও না। পগা কি তোমার কাছে মাঝে মাঝে বিদেশী টাকা রেখে যেত?

বীণা একটু হ করে চেয়ে বলল, বিদেশী টাকা? তা কি করে বলব! মাঝে মাঝে একটা প্যাকেটমটে কি যেন রাখতে দিত। খুলে তো দেখিনি। হেরোইন-টেরোইন ভেবে ভয়ে আধকানা হয়ে থেকেছি।

পগা যে রাতে মারা যায় সে রাতের কথা মনে করে দেখ তো!

মনে করার কি আছে?

সেই রাতে কিছু রেখে গিয়েছিল তোমার কাছে?

না তো! তার এক মাস আগে থেকেই তার সঙ্গে দেখা নেই।

ভাল করে ভেবে দেখ। ব্যাপারটা কিন্তু খুব সিরিয়াস।

বীণা মাথা নেড়ে বলে, ভাববার কিছু নেই। আমার স্মরণশক্তি খুব ভাল। তবে সে কিন্তু আরও দু-একজনের কাছেও প্যাকেট রাখত।

সব জানি। লক্ষ্মী আর সনাতন। তাদের কাছেও খোঁজ নিতে হবে। একটা কথা বলি, রাগ করতে পারবে না।

আবার কি কথা?

তোমার কথা আমি বিশ্বাস করছি। তবু তোমার ঘরখানা আমরা সার্চ করব। আমরা সিওর হতে চাই।

বীণার ঘর ছোটো, আসবাবপত্রও নেই। সার্চ করতে দশ মিনিটও লাগল না। কচুবন বা বাড়ির আঁদাড়-পদাড় খোজার মতো ধৈর্য এদের নেই।

কিছু না পেয়ে কাকা যেন খুশিই হল। বীণাকে বলর, বাঁচালে! তোমার ঘরে চোরাই ডলার পাওয়া গেলে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যেত।

বীণা খুব অবাক হওয়ার ভান করে বলে, ওম্ম গো! পাওয়া গেলেই বা মাথা কেন কাটা যেত তোমার। আমি কি ছাই জানতুম যে, কী আছে ওই প্যাকেটে।

তা ঠিক। আমার বড় বিপদ যাচ্ছে বীণা, মাথাটা ঠিক নেই। নন্দী আর রহমান পালিয়ে গেছে। তাদেরও ধরতে পারছি না। খুনের দায়ে ওদের নামে বোধহয় হুলিয়া বেরোবে। আচ্ছা, ঘুমোও। যাই।

নিমাই ব্যাপারটা জানতে ওদের সঙ্গে একটু এগোলো। বীণা সেই ফঁাকে পুঁটলিটা কুড়িয়ে এনে বাক্সবন্দী করল। সুযোগমত ঘটিতে পুরে সরা চাপা দিয়ে মাটির মধ্যে পুঁতে রাখতে হবে। থাক কিছুদিন। লোকে যখন সব ভুলে যাবে তখন বের করে অল্পে অল্পে বেচে দিলেই হবে।

কিন্তু ভয়ও একটা ছিল। বাজারে লটারির টিকিট বিক্রির স্টল আছে পল্টু নামে একটা ছেলের। বিশ্ববিজয় অপেরার লাইটমিস্ত্রির ভাই। তার কাছে দুদফায় মোট পঞ্চাশ ডলার ভাঙিয়ে বেশ কিছু টাকা পেয়েছিল বীণা। সুতরাং তার কাছে যে ডলার আছে তা পল্টু জানে। বীণা অবশ্য বুদ্ধি করে বলেছিল তার বড়দা কৃষ্ণজীবন বছরে দু-তিনবার বিদেশে যায়, মস্ত মানুষ, সেই দাদাই তাকে ডলার দিয়েছে। কথাটা অবিশ্বাসের নয় হয়তো, কিন্তু তবু মানুষকে বিশ্বাস কি? পল্টু যদি বলে দেয় তা হলে কী হবে তা ভাবতেই পারে না বীণাপাণি। কাকা এমনিতে ভাল কিন্তু বেইমানি দেখলে কি করে কে জানে। পকে বলতে বারণ করতে গেলেও বিপদ আছে, তাতে সন্দেহ বাড়বে।

বীণাপাণি ভয় পেয়ে গেল। খুব ভয়।

কাকাকে এগিয়ে দিয়ে এসে নিমাই গম্ভীর মুখে বলল, হল তো! ওইসব আজেবাজে লোককে প্রশ্রয় দিয়ে কিরকম ঝাঁট হচ্ছে।

বীণাপাণি তার পুরুষটার দিকে চেয়ে রইল। কপাল এমনি যে, জুটল এক ল্যাংটো সাধু। চালচুলো নেই, কিন্তু পাপতাপের নামে একেবারে মূৰ্ছা যায়। এ যদি ডলারের খবর জানতে পারে তা হলে এখনই পাপের ভয়ে বীণাকে ছেড়ে লম্বা দেবে। এর কাছে বুদ্ধি, পরামর্শ চেয়ে লাভ নেই। বরং নিজের পাপ নিজেই বইবে বীণা। সেই ভাল।

বীণা মৃদুস্বরে বলে, কিসের ঝাট? আমরা তো কিছু করিনি।

করিনি, কিন্তু সকালের বাসটা তো ফেল হয়ে গেল। বিষ্ণুপুরের বাস ফের সেই দুপুরে।

থাকগে, আর গিয়ে কাজ নেই। তুমি বরং বাজার-টাজার করে আনো, আমি ঘরের কাজ সারি।

যাবে না।

আজ নয়। একটা বাধা যখন পড়েইছে তখন দুদিন পরেই যাবোখন।

নিমাই একটু ভেবে বলল, সেটা ভাল হবে। হঠাৎ করে চলে গেলে সন্দেহ বাড়ত হয়তো।

বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিমাইকে বাজারে রওনা করে দিয়ে সে চারদিকটা ভাল করে দেখে নিল। তার বাড়ির আশেপাশে বসতি নেই বললেই হয়। জংলা জায়গা, উঠোন ঘেঁষে চাষের জমি, ঝোপজঙ্গল। বীণা ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরের ভিটের এক জায়গায় একটা ইঁদুরের গর্ত আছে। সেটাই খুঁড়ে ফেলল। একটা মা-হঁদুর কিচমিচ করতে করতে পালাল। কয়েকটা বাচ্চা লালচে রঙের কুষি ইঁদুর জড়ামড়ি করে পড়েছিল। বীণা মায়া করল না। তুলে বাইরে ফেলে দিল। কাক নিয়ে যাবে।

পাপ হল? তা হোক। ওই ইঁদুরগুলো বড় হয়ে কি মানুষের কম সর্বনাশ করত। পাপের বিচার করে বীণার কাজ নেই। এ সংসারে দুটো মানুষের মধ্যে একটা পাপী, আর একটা সাধু। কিন্তু পাপীটাই সংসার চালায়, আর সাধুটার এক পয়সারও মুবোদ নেই।

গর্তটা বুজিয়ে দিয়ে ওপরটা দুরস্ত করে পুরো ঘটাই গোবরমাটি দিয়ে লেপে ফেলল বীণাপাণি। গর্তের গহীনে রইল মাটির ঘটের ভিতরে ডলার আর পাউন্ডের প্যাকেট। ওপরে কাঠের তক্তা বসিয়ে তার ওপর চাল রাখার মাটির জালাটা বসিয়ে দিল সে। যতদূর সম্ভব নিখুঁত হল বটে কাজটা, কিন্তু ভয়টা রয়েই গেল।

সেই থেকে বীণাপাণি মনে শান্তি নেই। সবচেয়ে বড় অশাস্তির কারণ হয়ে রইল পল্টু। যদি বলে দেয়? কিংবা যদি ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে?

কয়েকদিন অপেক্ষা করল বীণাপাণি। তারপর একদিন নিজেই সন্ধে রিহার্সালের পর বাজারের দিকে গেল। দু-চারটে জিনিস কিনল। তারপর যেন এমনিতেই এসে পড়েছে এমন ভাব দেখিয়ে পল্টর স্টলটার সামনে দাঁড়াল।

এই পল্টু, ভুটান লটারিতে নাকি অনেক প্রাইজ দিচ্ছে?

হ্যাজাকের আলোয় পল্টু বসে একটা বইগোছের কিছু পড়ছিল। লোজন নেই। মুখ তুলে হাসল, হা। এবার ফার্স্ট প্রাইজ এক কোটি। নেবে নাকি টিকিট?

দূর! আমার লটারির কপাল নেই। শুধু পয়সা নষ্ট।

বহু লোকের পয়সা দিয়েই তো দু-চারজন লাখখাপতি কোটিপতি হয়।

পল্টু বেশ ছেলে। বাইশ-তেইশ বছর বয়স, পাতলা ছিপছিপে চেহারা, রংটা ফর্সা, ওর মিস্ত্রী দাদার মতো নয়। চোখে-মুখে লেখাপড়ার ছাপ আছে।

বীণার বুক দুরদুর করছে তবু। কথা খুঁজে পাচ্ছে না। পল্টু কিন্তু সন্দেহ করছে কি না তাও বুঝতে পারছে না। বুকের এই ঢ়িবটিবিনি নিয়ে কি বেঁচে থাকা যায়?

বীণা একটু উদাস গলায় বলে, কোটি টাকা প্রাইজ হলে টিকিটেরও তো দাম অনেক।

হ্যাঁ। একশো টাকা করে।

না ভাই, আমাকে বরং একটা লাখ টাকার প্রাইজের টিকিট দে। কেটে দেখি।

আগে তো খুব লটারির টিকিট কিনতে, আজকাল কেনো না তো!

কেটে কেটে হদ্দ হয়ে ছেড়েছি।

পল্টু তার পেতে রাখা টিকিটের সারি থেকে বেছে একখানা দিয়ে বলল, এটা পাঁচ টাকার টিকিট। কাল খেলা। ফার্স্ট প্রাইজ পাঁচ লাখ টাকা।

পাঁচটা টাকা জলে গেল। তবু নিল বীণা। পঙ্গু বোধহয় ডলারের কথা ভুলে গেছে। জয় মা কালী! ওর যেন ব্যাপারটা একদম মুছে যায় মাথা থেকে। কী বোকামির কাজই যে হয়েছিল বনগাঁয়ে ডলার ভাঙানন।

পল্টু বীণার পাঁচটা টাকা নিয়ে আবার বইটা খুলতে যাচ্ছে, বীণাও চলে আসার জন্য পা বাড়িয়েছে, হঠাৎ পল্টু একটু চাপা গলায় বলল, ডলার আর কত আছে?

বীণা এমন চমকে উঠল যে হৃৎপিণ্ড আর একটু হলেই থেমে যেত। সে ফ্যাকাসে মুখে বলল, কিসের ডলার?

পল্টু তেমনি চাপা গলায় বলে, থাকলে দিও। ন্যায্য দাম পাবে। কেউ জানতে পারবে না।

অভিনয় ছাড়া বীণা আর কি পারে। কিন্তু মাঝে মাঝে অভিনয় করার কথা ভুল হয়ে যায়। বিশেষ করে বিপদে পড়লে। কয়েক লহমার ভুল শুধরে নিল বীণা। একটু মিষ্টি করে হেসে বলল, দুর পাগলা! ডলার কোথায় পাবো? বড়দার সঙ্গে কি আর দেখা হয় নাকি আমার? সেই একবার দেখা, বিয়ে বাবদ আশীর্বাদ দেওয়া হয়নি, পঞ্চাশ ডলার দিয়ে বলেছিল, ভাঙিয়ে কিনে নিস কিছু। মানিব্যাগে টাকা তখন ছিল না ডলার ছিল। সদ্য বিলেত থেকে ফিরেছে তখন।

ডায়ালগ যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল বীণা।

পল্টু বিশ্বাস করল কি না মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। বলল, তোমার বড়দার কথা খুব শুনি। খুব নামকরা লোক নাকি?

কার কাছে শুনিস? বড়দা তো আর নেতা নয়।

শুনি নিমাইদার কাছে। মাঝে মাঝে নিমাইদা এসে আজ্ঞা দিয়ে যায়। তার মুখেই শুনেছি, তোমার বড়দা সাংঘাতিক লোক।

বীণা মলিন মুখে বলে, হ্যাঁ।

তা হলে তোমার এইখানে পচে মরার দরকার কি? বড়দাকে বললে নিমাইদার একটা কাজও তো হয়ে যায় বোধহয়।

কে বলবে বাবা! আর তোর নিমাইদারই বা কোন বিদ্যে আছে?

আর কিছু না হোক, নিমাইদা তো বিশ্বাসী লোক।

ওইটুকুই।

ওটা কি কিছু কম হল? আজকাল বিশ্বাসী মানুষ কোথায় পাবে?

এটা যে কলিকাল তা জানিস? এখন যত পাজি লোক তত তার কদর।

পল্টু একটু হাসল। তারপর বলল, ঠিক আছে, বড়দার কাছ থেকে ফের যদি ডলার পাও তো দিও।

তুই ডলার নিয়ে কী করিস?

পল্টু মৃদু মৃদু হাসছিল। বলল, যা সবাই করে। খদ্দের আছে গো। ডলার এখন দুনিয়াটাকে চালাচ্ছে।

বীণা এবার হঠাৎ খুব দুঃসাহসী একটা কাজ করে বসল। ভাবল, সন্দেহভঞ্জন করার এর চেয়ে বড় সুযোগ আর আসবে না। যা হওয়ার হবে। সে বুক ঠুকে বলল, ডলার নিয়ে যা কাণ্ড হয়ে গেল! ও বাবা, ওই নাম শুনলেই ভয় করে।

কী কাণ্ড। কেন, পগা খুন হল না।

পল্টু মাথা নেড়ে বলে, সেটা মোটেই ডলারের জন্য নয়। ওদের জুয়ার আড্ডার পুরনো কাজিয়া। খুনটা আমার সামনেই হয়, ওই বটতলায়। দোকান বন্ধ করে বাড়ি যাওয়ার আগে আমরা তিন বন্ধু বনমালীর দোকানে চা খাচ্ছিলাম।

দেখেছিস?

স্পষ্ট। তবে খুনিয়াদের নাম-টাম জানতে চেও না। ওসব বলতে পারব না।

না বাবা, জানতে চাই না। তবে মাঝে মাঝে পগা আমার কাছে একটা প্যাকেট রেখে আসত। তাতে কী থাকত কে। জানে বাবা! ভয়ে তো কখনও খুলে দেখিনি। এখন শুনছি তাতে নাকি ডলার থাকত। তাই নিয়ে কত হাঙ্গামা, ঘর সার্চ হয়ে গেল।

তাই নাকি?

যা ভয় পেয়েছিলাম!

পল্টু হঠাৎ কেমন একটা গলায় বলল, তোমার কাছে ছিল না বুঝি?

আবার চমৎকার ভালমানুষের পার্ট করে গেল বীণা, কোথা থেকে থাকবে। তার এক মাস আগে থেকেই যে পগার সঙ্গে দেখা নেই।

পগা আমার খুব দোস্ত ছিল, জানো বীণাদি! যেদিন খুন হল সেদিনও সন্ধের পর কিছুক্ষণ আড্ডা মেরেছিল আমার দোকানে এসে। টিপ টপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল বলে বেশিক্ষণ কথা হয়নি। তারপর খুব ঝনঝম করে নামল। আমি দোকান গুটিয়ে ফেলেছিলাম। চায়ের দোকানে গিয়ে আজ্ঞা দিতে লাগলাম, আর পগা গেল জুয়ার আজ্ঞায়।

বীণার বুকে তোলপাড় হচ্ছে। পগা কি ওকে কিছু বলেছিল? বলেছিল কি যে, বীণার বাড়ি গিয়েছিল। বীণার গলা যেন আটকে আসতে চাইছে। তবু অভিনয়ের জোরে পেরিয়ে যেতে চাইল বিপদটা, ইস্! যদি তোর সঙ্গে থাকত তা হলে হয়তো বেঁচে যেত।

পল্টু মাথা নেড়ে বলে, বাঁচত না। হয়তো সেদিন বেঁচে যেত, পরদিন মরত। ওকে দেগে রেখেছিল যে। তোমার সঙ্গে ওর কেমন ভাব ছিল?

ভাব! ভাব আবার কি? কী যে বলিস। মাঝে মাঝে যেত, চেনাজানা ছিল। সে তত কত লোকের সঙ্গে আছে।

পল্টু একটু বিরস মুখে বলল, সে দিন অনেক ডলার ছিল ওর কাছে।

কাঁপা বুকে বীণা বলে, কি করে জানলি?

কি করে আবার! এই বলছিল।

বীণার চোখের সামনে একটা পর্দা নেমে এল যেন। আর অভিনয় করে কী হবে? পল্টু বোধহয় সব জানে।

কিন্তু সম্পূর্ণ বেহাল মাথা নিয়েও বীণা অভিনয় করে যেতে ছাড়ল না, আর বলিস না। এখন ডলার শুনলেই আমার ভয় করে।

পল্টু হাসল। কেমন যেন হাসিটা।

 

বীণার বুকের কাপন রয়ে গেল। ঘুম হতে চায় না। খেতে বসলে ভিতরটা কেমন যেন ঘুলিয়ে ওঠে। অম্বলের অসুখ তো ছিলই। সেটা যেন বাড়ল।

পরদিন রাতে পাশাপাশি শুয়ে একটু সাহাগের ভাব করল নিমাইয়ের সঙ্গে। তারপর বলল, জানো, আমি একটা লটারির টিকিট কিনেছি।

তাই নাকি? ও কিনে কী হয়?

যদি ফার্স্ট প্রাইজটা পেয়ে যাই তা হলে?

নিমাই বলে, ওই লোভানিই তো মানুষকে দিয়ে কত অকাজ করিয়ে নিচ্ছে।

আহা, আমি বুঝি লোভী?

আমরা সবাই কম-বেশি লোভী। সে কথা বলছি না। কেটেছে বেশ করেছে। তবে প্রাইজের আশায় বসে থেকে না। পল্টু বলল তাই কিনলাম। আচ্ছা, পৰ্টু ছেলেটা কেমন বলে তো!

কেন, ভালই।

কতটা ভাল?

নিমাই হাই তুলে বলে, ওই যেরকম হয় আর কি! ভাল থাকতে চায়, পারে না। চারদিকে নানা লোভানি তো।

তোমার সঙ্গে খুব ভাব বুঝি?

আছে একটু।

কিছু বলে-টলে তোমাকে।

অবাক হয়ে নিমাই বলে, কী বলবে? কিসের কথা বলছো?

এই আমাদের কথা-টথা!

তা কত কথা হয়। সব আগড়ম-বাগড়ম কথা। এক-এক দিন এক-একটা বিষয় উঠে পড়ে। তাই নিয়ে খানিক কথা হয়।

লটারির টিকিট ছাড়া ওর আর কিসের ব্যবসা?

নিমাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, চোরাই কারবার আছে। যখন যেটা পরে করে। লটারির টিকিটে আর কপয়সা হয়।

হয় না?

হয়ও। মাঝে মাঝে এক-আধটা প্রাইজও লেগে যায়। সে কদাচিৎ। আজকাল লটারিওয়ালাও তত বড় কম নেই।

আচ্ছা আমরা যদি একটা কাজ করি তা হলে কেমন হয়?

কি কাজ।

ধরো যদি বনগাঁ ছেড়ে চলে যাই অন্য কোথাও?

কোথায় যাবে? পালপাড়া নাকি? না বিষ্টুপুর?

যদি ধরে তাই যাই? একেবারে?

সে কী! এখানকাল বাস তুলে দিতে চাও?

কেন, এখানে আমাদের কে আছে?

তোমার যাত্রার দল, তোমার নিজের বাড়ি, এসব কষ্ট করে করলে সে কি ছেড়ে যাওয়ার জন্য?

আমার যে ভাল লাগছে না।

দুর পাগল! বলে নিমাই হাসে, আমাদের কি এত খামখেয়ালি করলে চলে?

বীণা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, তা হলে চলে, কোথা থেকে ঘুরে আসি।

কোথায় যাবে।

কাশী বৃন্দাবন নয় গো, কলকাতা যাবো।

কলকাতা! তা যেতে পারো। উঠবে কোথায়?

উঠব না। সকালে যাবো, বিকেলে চলে আসবে।

তা যেতে পারা যায়।

একটু বড়দার সঙ্গে দেখা করে আসব।

নিমাই একটু চুপ করে থেকে বলে, সে তো মস্ত কথা। শুনেছি কৃষ্ণজীবনবাবু এখন মস্ত লোক, সাততলায় ফ্ল্যাট।

ঠিকানা আছে।

সে তো আছে। চিনতে চাইবে কি?

মায়ের পেটের বোনকে চিনবে না?

হয়তো চিনবে। সে চেনার কথা বলছি না। বলছি পাত্তা দেবে কি না। একে তো অবস্থার তফাত, তার ওপর তোমরা সব ঝগড়া করে তাড়িয়েছিলে লোকটাকে।

সংসারে ওরকম কত হয়। আবার জোড়াও লাগে সম্পর্ক।

এটা লাগবে কি না কে জানে!

আমার দাদা কিন্তু মানুষটা বড় ভাল। অপমান আমিও করেছি বটে সে বউদির জন্য। বউদি আমাদের এখন ছোটো নজরে দেখত।

এখনও কি তাই দেখবে না?

দাদা দেখবে না। দাদাকে আমি চিনি।

তা হলে যাই চলো একদিন, মানুষটাকে একবার দেখেছিলাম অনেক আগে। কাছ থেকে দেখে একটু পেন্নাম করে আসব। তুমি যে অত বড় একটা মানুষের বোন তা ভাবলে আমার গায়ের রোয়া দাড়িয়ে যায়।

বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, অত বড় মানুষ, তায় আপনজন, তবু আমাদের কপালে তাকে আর রাখতে পারলুম কই নিজের জন হিসেবে। ওই রাক্ষুসীই তো গাপ করে নিল।

আহা ওরকম বলতে নেই। সব দিক বিবেচনা করতে হয়। তোমার বউদিও তো আবার লেখাপড়া জানা মেয়ে।

ছাই!

দিন চারেক বাদে তারা সত্যিই গিয়েছিল কলকাতায়। মাটি খুঁড়ে ডলারের বান্ডিল বের করে হাতব্যাগে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বীণাপাণি। তার ইচ্ছে ছিল বড়দাকে ডলারগুলো দেবে। বলবে, তুই বিদেশে যাস, তোর কাজে লাগবে। এর বদলে আমাকে টাকা দে।

দাদা নিরাপদ মানুষ।

ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে তারা যখন পৌঁছলো তখন বিকেল। লিফটে উঠতে ভরসাই হল না তাদের। এ যন্ত্র তারা চালাতে জানে না। দুজনে সাতলায় উঠল হেঁটে, ঘেমে, পসে। ডোরবেলটা অবশ্য বাজাল, তবে ভয়ে ভয়ে।

বীণা যথাসাধ্য সেজে এসেছে, যথেষ্ট ফিটফাট করে এনেছে নিমাইকেও। তবু দরজা খুলে যে সুন্দরপানা মেয়েটা উঁকি দিলে সে যেন খুব অবাক হয়ে দেখল তাদের।

কাকে চাই।

কৃষ্ণজীবনবাবু কি আছেন? বীণা বলল। এই কি তার সেই ভাইঝি? চেনেও না তো বীণা।

বাবা! বাবা তো ইংল্যান্ডে।

বীণার প্রায় বসে পড়ার মতো অবস্থা। দাদা না থাকলে তো এ বাড়িতে তার কোনও অভ্যর্থনাই নেই।

বীণা মলিন হেসে বলল, তুমি বুঝি মোহিনী?

হ্যাঁ। আপনারা কোথা থেকে আসছেন।

বনগাঁ। আমি তোমার পিসি হই। ছোটো পিসি। পিসি?

মাই গড! তা হলে আসুন ভিতরে, মাকে ডাকছি।

ব্যস্ত হয়ো না। আমরা বেশিক্ষণ থাকব না। বিকেলের গাড়ি ধরে ফিরে যাবো।

আসুন তো ভিতরে। মা আছে।

রিয়া ছিল। ওদের সাজানো গোছানো মস্ত লিভিং কাম ড্ৰয়িং রুমে উজবুকের মতো কিছুক্ষণ বসে থাকার পর রিয়া

এল।

কে, তুমি বীণাপাণি না?

হ্যাঁ বউদি। বলে দুজনে উঠে প্রণাম করল।

রিয়া যে খুব অপ্রসন্ন হয় তা নয়। তবে একটু আলগোছ ভাব। বলল, ও তো নেই।

শুনলাম। আমরা এমনি দেখা করতে এসেছিলাম। তোমরা ভাল তো!

ভালই।

দু-চারটে কথাবার্তা, চা আর সন্দেশ খাওয়ার পর বাইরের লোকের মতোই চলে এল তারা। আর ফেরত এল সব দুশ্চিন্তার আকর সেই ডলার বান্ডিলও।

 ০১৯. এনি সার্জারি অন মাই হার্ট

ওয়াজ দেয়ার এনি সার্জারি অন মাই হার্ট, সিস্টার?

সার্জারি? ও? নো স্যার, দেয়ার ওয়াজ নো ওপেন হার্ট সার্জারি। ওনলি মেডিসিন।

আই ফিল এ সর্ট অফ নাম্বনেস ইন মাই হার্ট। ইজ দ্যাট ও. কে?

ইউ আর নাউ ও. কে স্যার।

মণীশ কিছু অবিশ্বাসের চোখে পবিত্র সাদা পোশাক পরা তরুণী নার্সটিকে দেখছিল। কেরলের মেয়ে। খ্ৰীষ্টান, কালো, হাস্যময়ী। ব্রেকফাস্টের ভূক্তাবশেষ ট্রে গুছিয়ে নিচ্ছে। ডানদিকের পর্দাটা সরানো। আজও মেঘলা বিষণ্ণ আকাশ। গোমড়া। ভোর। মণীশের দিন কি ভাবে কাটছে কে তার হিসেব রেখেছে। গুনতির দিন একরকম। কিন্তু ব্যথার দিনগুলি? সংজ্ঞাহীনতার দিনগুলি? দুশ্চিন্তার দিনগুলি? সব কি একরকম? ব্যথাতুর দিন সবচেয়ে ধীরে কাটে। কাটতেই চায় না। এক একটা সেকেন্ড যেন একটি একটি ঘন্টা। এক একটি ঘন্টাই যেন এক একটি দিন বা মাস। আর দিন যেন বছর বা দশক বা কল্পান্ত।

অনেক ঘুমিয়েছে মণীশ। শুধু ঘুম আর ঘুম। জাগলেই ডাক্তার আবার সস্নেহে ঘুম পাড়িয়ে দিত। তার ধারণা হয়েছিল, ওইভাবে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেই তার হৃৎপিণ্ডে ছুরি চালিয়েছে ডাক্তার।

জ্ঞান ফেরার পর সে অবশ্য ভাল করে খুঁজে দেখেছে, তার বুকে কোন কাটা দাগ নেই। তবে বুকের ভিতরটা অন্যরকম। মাঝে মাঝে খিল ধরে থাকে। মনে হয়, হার্ট থেকে আছে। ধুকধুক নেই।

পৃথিবী হারিয়ে গিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। হারিয়ে গিয়েছিল তার প্রাণাধিক প্ৰিয় পুত্ৰ-কন্যা। তার বউ। তার চাকরি। তার সুখ-দুঃখ আনন্দ। ওই কটা দিন আর ফিরে পাবে না মণীশ। চিরকালের মতো হারিয়ে রইল।

মে আই হ্যাভ এ নিউজপেপার?

কেরলের মেয়েটি ছোটো করে মাথা নাড়ল, নো স্যার। সরি। দি ওনার্ল্ড ইজ লস্ট টু মি। আই ওয়ান্ট টু বি আপডেটেড। আঙ্ক দি ডক্টর স্যার, প্লীজ।

থ্যাংক ইউ।

পৃথিবীর কোনও খবরই রাখে না মণীশ। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে কত কী না জানি ঘটে যাচ্ছে। ঘটে গেছে! অন্তহীন ঘুমের মধ্যে পৃথিবী কতবার পাশ ফিরল! খবরের কাগজে এমন কী থাকবে, যাতে তার হৃৎপিণ্ড চাপ পড়তে পারে?

মে আই হ্যাভ এ বুক?

এনি বুক স্যার? আই ক্যান গিভ ইউ এ বাইবেল। আই হ্যাভ ওয়ান উইথ মি।

ইউ ড়ু ক্যারি এ বাইবেল?

মেয়েটি লাজুক হাসে, আই ড়ু স্যার।

ইউ আর এ রিলিজিয়াস পারসন।

ইট ইজ এ গুড কম্পান।

দেন, গিভ ইট টু মি। ইট উইল ড়ু।

মেয়েটি ব্রেকফাস্টের ট্রে নিয়ে চলে গেল। ফিরে এল একখানা কালো মলাটের বাইবেল নিয়ে। এরকম বাইবেল বড় বড় হোটলের ঘরে ড্রয়ারে রেখে দেওয়া হয়। ইচ্ছে করলে যে-কেউ নিয়েও যেতে পারে। বাইবেল চুরি করলেও দোষ হয় না। পৃথিবীময় বাইবেল ছড়িয়ে দেওয়ার এ এক চমত্তার কায়দা।

মণীশ অবসন্ন হাতে বাইবেলখানা বালিশের পাশে রেখে দিল। একটু জল খেল।

মে আই টক নাউ ফ্রিলি?

নট টু মাচ স্যার। ইফ ইউ উইশ, আই মে রীড দি বাইবেল টু ইউ।

বাইবেল ইজ অ্যান ওল্ড বুক। আই ওয়ান্ট সামথিং নিউ। সামথিং মোর আপ-টু-ডেট।

বাইবেল ইজ নেবার ওল্ড স্যার। ইউ ইজ অলওয়েজ নিউ।

অল রাইট। রীড ইট টু মি অ্যানাদার টাইম। ইজ দি সামার ওভার?

নো স্যার। দি মনসুন ইজ দেয়ার। ভেরি হেভী মনসুন।

ড়ু ইউ নো এনিথিং অ্যাবাউট দি ক্যালকাটা ফুটবল লীগ?

মেয়েটি হাসে, নো স্যার। আই অ্যাম নট স্পোর্টিং এনাফ।

টেল মি হোয়াট হ্যাপন ইন দি ওয়ার্ল্ড হোয়েন আই ওয়াজ ইন স্লিপ।

নার্থিং মাচ।

এনি গ্রেট লীডার ডেড অর কিলড্‌?

নো স্যার।

এনি বিগ প্লেন ক্র্যাশ।

নো স্যার।

এনি আর্থকোয়েক?

নো স্যার।

ইউ কেপ্ট দি ওয়ার্ল্ড ইন অর্ডার হোয়েন আই ওয়াজ অ্যাস্লিপ?

মেয়েটি খিলখিল করে হাসে, ইট ওয়াজ ইন অর্ডার।

ওনলি মি আইট অফ অর্ডার?

নট ভেরি মাচ। ইউ হ্যাড এ স্মল অ্যাটাক।

ইউ আর লাইং। আই হ্যাড এ ম্যাসিভ অ্যাটাক।

নো স্যার।

ডিড আই বিহেভ ওয়েল হোয়েন ইন পেইন?

ইউ ওয়্যার নাইস স্যার।

ওয়াজ আই ইন ডেলিরিয়াম?

নো স্যার।

আই হ্যাড ড্রিমস, ইউ নো। ব্যাড ড্রিমস।

ঘরটার দুটো ভাগ। একটা যেন বেডরুম, অন্যটা যেন বসবার। বসবার ঘরে তাজা ফুল সাজিয়ে রাখা, সোফা সেট পাতা। এয়ারকন্ডিশনড় ঘরে কোনও শব্দ নেই। ভারি ঝকঝকে তকতকে। তার শ্লিপিং স্যুটের বুকপকেটে একটা ভারী যন্ত্র রাখা। রিমোট কন্ট্রোলে চব্বিশ ঘন্টা ই সি জি হচ্ছে বোধ হয়। কে জানে কী!

চিরকালের অভ্যাস ছিল, সকালে ঘুম থেকে উঠেই সিগারেট ধরানো। তারপর চা। তারপর খবরের কাগজ। তারপর …

দয়ার দান হিসেবে আয়ু ফিরে পাওয়া গেল। কিন্তু কত দিন? কতদিনের এক্সটেনশন? আবার ব্যথা আসবে। অন্ধকার আসবে। হারিয়ে যাবে পৃথিবী। একদিন মণীশ আর এক্সটেনশন পাবে না।

জানালার গায়ে মৃদু টোকার মতো শব্দে চোখ চায় মণীশ। ইস! বৃষ্টি হচ্ছে। ঝাপসা হয়ে গেল কলকাতার আকাশরেখা। এই বৃষ্টিতে ভিজিটিং আওয়ার্সে কেউ আসবে কি? বুকা, ঝুমকি, অনু বা অপৰ্ণা? সবাই একসঙ্গে আসে না। একে এক, দুইয়ে দুইয়ে আসে। কিন্তু ওদের সবাইকে একসঙ্গে দেখতে বড় ইচ্ছে করে মণীশের।

সিস্টার, ক্যান ইউ টেল মি একজ্যাক্টলি হোয়েন আই উইল বি রিলিজড?

ভেরি সুন স্যার।

আই ওয়ান্ট এ ডেট।

প্লীজ আঙ্ক দি ডক্টর স্যার।

আজ সকালে কে আসবে? ভাবতে ভাবতে চোখ বুজল মণীশ।

অনেকদিন আগে এক মেঘলা দুপুরে এক ক্ষিপ্ত জনতার ওপর পুলিস লাঠি চার্জ করছিল। এসপ্ল্যানেড ইস্টে। কার্জন পার্কের ফেনসিং-এ উঠে একজন ফ্রি লান্স ফটোগ্রাফার দৃশ্যটা তুলছিল। একজন পুলিশ হঠাৎ তেড়ে এল তার দিকে। হাঁটুতে খটাং করে এসে পড়ল লাঠি। ফটোগ্রাফারটি ব্যথায় চিৎকার করে পড়ে গেল, তারপর অন্য পায়ে পুলিসটাকে একটা লাথি কষিয়ে দিল। খুবই সাহসের কাজ। পুলিসটা পিস্তলে হাত দিয়েছিল। হয়তো মেরে ফেলত। কিন্তু সেই সময়ে মার-খাওয়া কিছু লোক ছিটকে এল এদিকে। তাদের বেপরোয়া হতচকিত ধাক্কায় পুলিশটা সরে গেল। ফটোগ্রাফারটি উঠে দাঁড়াল। হাঁটুতে সাঘাতিক ব্যথা, চোখে জল আসছে, ঠিক সেই সময়ে দুটো গুলির আওয়াজ। আর্তচিৎকার।

সেই দুপুরে পুলিস ঠিক দু রাউন্ড গুলিই চালিয়েছিল। তাতে চলন্ত ট্রামের মধ্যে বসে থাকা একটি লোক মারা যায়। ফটোগ্রাফারটি তার জল-ভরা চোখেও দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছিল। অন্য ফটোগ্রাফাররা দেখেছিল একটু দেরিতে।

ফটোগ্রাফারটি তার জখম না নিয়ে কাছ-ঘেঁষা ট্রামটায় উঠে পড়ল। তখন হুড়োহুড়ি করে যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে। আর জখম লোকটা গোঙাচ্ছে, জল! জল! তখনও পড়ে যায়নি। তবে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ট্রামগাড়ির সীট, মেঝে। চকাচক দুতিনটে ফটো তুলে নিল সে। আর দেখতে পেল, লেডীজ সীটে সাদা মুখে একটি মেয়ে বসে আছে। এত ভয় পেয়েছিল যে, পালাতে অবধি পারেনি।

আরে! পালান, পালান। আসুন শিগগিরই বলে ফটোগ্রাফার গিয়ে মেয়েটির হাত ধরে টেনে নামিয়ে নিয়েছিল ট্রাম থেকে। বাইরে টিয়ার গ্যাসের ধোয়া, লোকজন পালাচ্ছে, পুলিস তেড়ে যাচ্ছে যাকে পাচ্ছে সামনে তার দিকে। দমাস দমাস করে লাঠি পড়ছে।

অন্তত তিনজন পুলিশ লাঠি তুলেছিল। সঙ্গে মেয়েটি ছিল বলে বেঁচে গেল ফটোগ্রাফারটি। পুলিশ মেয়ে দেখে মারেনি।

তীব্র টিয়ার গ্যাসে প্রায় অন্ধ চোখে ছুটতে ছুটতে তারা রেড রোডের দিকে চলে যেতে পেরেছিল। কোথায় থাকেন আপনি?

মেয়েটি কোনও জবাব দিতে পারেনি। শুধু কাঁপছিল। ভয়ে, অবিশ্বাসে।

নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে ঘাসে বসাল ফটোগ্রাফারটি! জিরোতে দিল। দুজনেরই চোখ ফুলে ঢোল। দুজনেই হাফাচ্ছে।

অনেকক্ষণ বাদে মেয়েটি তার ঠিকানা বলতে পারল।

একা যেতে পারবেন?

না। ভীষণ ভয় করছে।

কিন্তু আমাকে যে পত্রিকা-অফিসে যেতে হবে। এই ফটো কাল কাগজে বেরোবে।

মেয়েটা কাঁদছিলও। কিছু বলল না।

ঠিক সেই সময়ে আকাশ যুঁড়ে বৃষ্টি নেমেছিল। খুব বৃষ্টি। সাঙ্ঘাতিক বৃষ্টি।

আরে, ভিজবেন যে! উন! দৌড়োন! ময়দানে কোনও ক্লাবের টেন্টে ঢুকে পড়তে হবে।

মেয়েটি ওঠেনি। ছোটেওনি। বসে রইল মুখ নিচু করে। ক্যামেরা ভিজছিল।

ফটোগ্রাফারটি চলে যেত পারত। যায়নি শেষ পর্যন্ত। মেয়েটির সঙ্গে সেও ভিজেছিল ক্যামেরা সমেত।

সেই বিকেলে বৃষ্টি আর থামেনি। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আন্দোলন থেমে গেল, পুলিসের হামলা বন্ধ হল, জনসাধারণ পালাল নিরাপদ আশ্রয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই মেয়েটিতে তার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিল তরুণ ফটোগ্রাফার। খানিকটা বাসে, খানিকটা হেঁটে।

তার ফটো পরদিন বেরিয়েছিল কাগজে। নাম সমেত। আরো অনেকেই ফটো তুলেছিল সেদিনকার হাঙ্গামার। তবে গুলি-খাওয়া লোটার অমন নিখুঁত ছবি আর কেউ পায়নি। বেশ নাম হয়েছিল তার। পায়ের জখম সারতে কয়েকদিন সময় লেগেছিল।

অফিসের ঠিকানায় প্রায় সাত দিন বাদে চিঠিটা এল। মেয়েলি হস্তাক্ষর, আমি সেই মেয়েটি, যে সেদিন চোখের সামনে লোকটাকে মরতে দেখে পাথর হয়ে গিয়েছিল। বোধ হয় আমার হার্টফেল হয়ে যেত, আপনি আমাকে জোর করে ট্রাম থেকে নামিয়ে না আনলে। আমার বোধ হয় জ্ঞানও ছিল না। কিরকম যে হয়ে গিয়েছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে আমার জ্বর হয়েছিল, জানেন? তবু ওই বৃষ্টিটাও বোধ হয় দরকার ছিল। ভিজে ভিজে মাথা ঠাণ্ডা হয়েছিল, শরীরে সাড়া ফিরে এসেছিল। আপনার সঙ্গে আর একবার দেখা হতে পারে কি? আমার যে মুখোমুখি একবার ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার আপনাকে! আর কী অভদ্র আমি সেদিন তো এক কাপ চাও অফার করা হয়নি আপনাকে?

ফটোগ্রাফারের সময় হয়েছিল আরও সাত দিন বাদে। তারপর আর সময়ের অভাব হয়নি।

আজ সামান্য একটা উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ খুলে মণীশ সেই মেয়েটিকে দেখতে পেল। সেই ভয় খাওয়া মুখ। সেরকমই সুন্দর আছে আজও।

কেমন আছে আজ।

মণীশ হাসল, একটা কিরকম থাকা বলো তো? ডাক্তার ছুটি দিচ্ছে না কেন?

এবার দেবে।

সেটাও তো চারদিন ধরে শুনছি। আর কবে?

অপর্ণা খুব কাছে ঘেঁষে চেয়ারে বসল। বড় ভালবাসায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। শান্তিনিকেতন থেকে সেবার একটা গাড়ি ভাড়া করে তাঁতিপাড়া গিয়েছিল তারা। এক জোড়া তসরের থান কিনেছিল অপর্ণা। পরে কাঁথাফোঁড়ের কাজ করিয়ে নেয়। সেই শাড়িরই একটা আজ পরে এসেছে। একটু সেজেও এসেছে।

মণীশ অপর্ণার হাতটা নিজের কপালে চেপে ধরে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, খুব ভয় পেয়েছিলে তোমরা?

পাবো না!

হোয়ট অ্যাবাউট দি ইয়ং রোগ? ওদের কী অবস্থা হয়েছিল?

বুঝতেই তো পারো। বাবা ছাড়া ওদের কি আর অস্তিত্ব আছে?

বুবকা?

পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। নিশুত রাতে অবধি এসে বসে থাকত নিচে। রিসেপশনে খোঁজ নিয়ে জ্বালাতন করত ওদের।

বড্ড বাচ্চা রয়ে গেছে ছেলেটা। অ্যাডাল্ট হচ্ছে না কেন বলো তো!

তুমি ওকে অ্যাডাল্ট হতে দিচ্ছো কই? এখনও এমনভাবে আদর দাও যেন কোলের ছেলে। আঠারো বছর বয়স হল, এখন ওকে তোমার একটু ছেড়ে দেওয়া উচিত।

মণীশ একটা শ্বাস ফেলে বলে, ছেড়ে তো দিতেই হবে। বড় হচ্ছে, কত দিকে ইন্টারেস্ট দেখা দেবে, বাবা নিয়ে কি পড়ে থাকবে তখন?

মণীশের মনটা প্রশান্তিতে ভরে আছে। বুকার জগৎ এখনও সে অনেকটা দখল করে আছে। যতদিন পারবে মণীশ ততদিন এই নোংরা পৃথিবীকে অনুপ্রবেশ করতে দেবে না ছেলে এবং মেয়েদের ভিতরে।

কিন্তু পারবে কি মণীশ? আর পারবে কি?

এখানে আমার বড় হাফ ধরে যাচ্ছে। ডাক্তার কিছু বলছে না এখনও!

হয়তো আর দু-এক দিন।

মণীশ সবেগে মাথা নেড়ে বলে, অসম্ভব। আমি আর পারছি না। এখানে থাকলে আমার আবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।

ডাক্তার যদি বারণ করে?

আমি সাবধানে থাকব। এখানে থেকেও তো কিছু হচ্ছে না। শুধু পড়ে থাকা। আমি পারছি না অপৰ্ণা। ছেলেমেয়ে ছাড়া আমি আর পারছি না।

অপর্ণা নিজ্জের মতোই তার মাথাটা নিজের বুকের ওপর চেপে ধরে। বলে, ওরকম করতে হয় নাকি? আমরাও তো তোমাকে ছাড়া যেন ডাঙার মাছ। ছেলেমেয়েগুলো অর্ধেক হয়ে গেছে দুশ্চিন্তায়।

ওরা কখন আসবে?

অনু আসছে। তুমি গতকাল খবরের কাগজ পড়তে চেয়েছিলে, এরা নাকি দেয়নি। ও চুরি করে খবরের কাগজ দিয়ে যাবে বলে কাগজ কিনতে গেছে।

মণীশ একটু হাসল, খুব বিচ্ছু, না?

খুব।

সারাক্ষণ তোমরা কি আমার চিন্তা করো?

শুধু চিন্তা! ধ্যান বলতে পারো।

তাহলে মাঝে মাঝে অসুখ করা তো ভালই। না?

ভাল, তবে পালা করে। এবার আমার হার্ট অ্যাটাক হোক আর তোমরা আমাকে নিয়ে ভাবো, কেমন?

ও বাবা, দরকার নেই। আচ্ছা, মহিলাদের হার্ট অ্যাটাক খুব কম হয়, না? কই, বেশী শুনি না তো!

হয় মশাই, হয়। হার্ট অ্যাটাক হয়, ক্যানসার হয়, সব হয়।

অনু আসছে না কেন?

আসবে।

নার্সটা ঘরে নেই, না?

না তো!

উইল ইউ গিভ মি এ কিস?

এ মা!

ইট উইল বি এ লাইফ সেভিং কিস। প্লীজ!

অপর্ণা সামান্য ঝুঁকে হালকা করে ঠোঁট ছোঁয়াল তার ঠোটে। তারপর বলল, তাড়াতাড়ি ভাল হও তো। মনের জোর করে হও। তোমাকে ছাড়া আমিও আর পারছি না। এই পাগলকে ছাড়া আমি যে পাগল হতে বসেছি।

আজ এখনই কি ভাবছিলাম জানো?

কী?

সেই প্রথম দেখা হওয়ার ঘটনাটা। আমি তখন ফ্রি লান্স ফটোগ্রাফার, তুমি কলেজের ছাত্রী। সেই ট্রাম, গুলি, টিয়ার গ্যাস।

মাগো!

অথচ কত রোমান্টিক, তাই না?

অপর্ণা স্মিতমুখে হাসল, কী ভীষণ রোমান্টিক!

কতদিন ফটো তুলি না বলে তো! সেই যে বড় চাকরি পেয়ে গেলাম, ফটো প্যাশনটা চলে গেল। ক্যামেরা তিনটে পড়েই আছে।

আর ফটো তুলে কাজ নেই। অনেক হয়েছে।

আচ্ছা, আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে কারও ফটোগ্রাফিতে আগ্রহ নেই?

সে তো তুমিই জানো। তোমার ছেলেমেয়েকে তুমি ছাড়া আর বেশী কে চেনে?

মণীশ একটু চুপ করে ভাবে। তারপর বলে, বোধ হয় অনুটার হবে। যে কবার ফটো তুলেছে চমৎকার হয়েছে। দাঁড়াও ভাল হয়ে ফিরে ওদের তিনজনকে তিনটে ক্যামেরা দিয়ে বলব, ইচ্ছে মতো ছবি তুলে আনো। যারটা ভাল হবে তাকে প্রাইজ দেবো!

আচ্ছা, সে হবেখন। ভাল হতে না হতেই পাগলামি শুরু হয়েছে তো!

পাগলামি নয়, এটা হল এক ধরনের ইনহেরিটেন্স। আমার প্যাশন, আমার হবি, আমার ট্রেন্ড অফ মাইভ সব কিছু ওদের দিয়ে যেতে না পারলে, ওদের ভিতরে আমি বেঁচে থাকব কি করে বলো? ওদের মধ্যে নিজেকে দেখতে না পেলে আমার যে সেটা মরে যাওয়াই হবে।

আমি তো একটুও আপত্তি করছি না। ওরা তোমার মতোই হোক। তুমি ভাল হও, তারপর সব হবে। ওরা তোমার কিছুই নষ্ট হতে দেবে না। বাবা যে ওদের কাছে কী তা তো জানোই!

মণীশ আবার অনুর খোঁজ নিতে মুখ খুলেছিল, অমনি একটা দুষ্টু হাসি মুখে নিয়ে দরজা ঠেলে অনু ঢুকল। একটু যেন পা টিপে। চারদিক চেয়ে দেখল। তারপর ঢোলা পোশাকের বুকের ভিতর থেকে একটা ইংরিজি কাগজ বের করে ছুটে এল মণীশের কাছে।

বাবা, কাগজ!

মণীশ তার দুর্বল দুটি হাতে মেয়েকে জাপটে নিল বুকের ভিতর। পরমুহূর্তেই ককিয়ে উঠল, উঃ!

অপৰ্ণা আতঙ্কের গলায় বলে, কী হল?

বুক পকেটে যন্ত্রটার কথা মনেই ছিল না। লেগেছে?

একটু।

অপ্ৰস্তুত অনু বলল, এ মা, আমারও মনে ছিল না বাবা। কী হবে? যন্ত্রটা বিগড়ে যায় যদি?

আরে দুর। কিছু হবে না।

তোমার হাৰ্টে তো চাপ পড়ল।

মোটেই না। তুই কাছে আয়।

অপর্ণা উদ্বেগের গলায় বলে কী যে করো না! কিছু ঠিক থাকে না তোমার! আমি তো ভয় খেয়ে গিয়েছিলাম।

আরে না, ভয়ের ব্যাপার নয়। আর বকবে না কিন্তু।

তোমাকে বাড়ি নিয়ে গেলেও তো এরকমই হুড়ুম দুড়ুম কাও করবে সব। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হুড়োহুড়ি, লাফ ঝাপ, চেঁচামেচি!

বেঁচে থাকা মানেই তো নিজেকে জানান দেওয়া। নইলে পাথর হয়ে, মনি হয়ে বেঁচে থেকে কী লাভ বলো!

আগেই বলে রাখছি, এখন কিন্তু কিছুদিন চুপটি করে শুয়ে থাকতে হবে বাড়িতে। ওসব হুড়োহুড়ি চলবে না।

মণীশ অপর্ণার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ডাক্তারের বারণ?

হ্যাঁ।

তাহলে কি আমি চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে গেলাম?

উঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারি না। আচ্ছা বাবা, খুব হুড়োহুড়ি কোরা, কিন্তু একটু সামলে!

মণীশ মেয়ের দিকে ফিরে তাকাল। একটু অচেনা লাগছে কি?

মুখখানা দুহাতে ধরে তৃষিতের মতো চেয়ে থেকে বলল, তুই কি খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিস।

কেন বাবা? তুমি তো মমাটেই বাইশ দিন হাসপাতালে।

তবু যেন মনে হচ্ছে বাইশ দিনেই তুই আমার চোখের আড়ালে একটু বড় হয়ে গেছি! কত বয়স হল তো! তেরো না।

অনু হি হি করে হাসে, মেয়েরা বয়স কমায়, কিন্তু বাবারা মেয়েদের বয়স আরও কমিয়ে দেয়, না বাবা? আমি তো ফিফটিন কমপ্লিট করেছি, তুমি যেন জানোনা!

উরে বাবা! ফিফটিন। তার মানে সিক্সটিন হতে তো আর দেরি নেই।

আই অ্যাম রানিং সিক্সটিন।

মাই গড্‌।

ডান কানে অপর্ণা খুব আস্তে করে বলে, ঋতু হয়। বয়স বসে আছে কিনা!

ওঃ ইউ আর ইমপসিবল।

অপর্ণা হেসে ফেলল খিলখিল করে। মণীশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে করে বলল, তোমার কাছে ওরা কেউ কখনও বড় হবে না। ছেলেমেয়ে ছোটো নেই, শুধু তোমার কাছে এলেই সব ছোটো সাজে।

মণীশ গম্ভীর গলায় বলে, তার মানে কি অ্যাকটিং করে?

একটু করে।

শুনে আমার বুকে ব্যথা হচ্ছে।

মাগো! বলে আর্তনাদ করে ওঠে অপর্ণা, সত্যি নাকি?

মণীশ হাসে, সে ব্যথা নয়। অন্য রকম ব্যথা। দুঃখের ব্যথা।

আচ্ছা বাবা, কান মলছি। আর বলব না।

অনু নিষ্পলক বাবার মুখের দিকে চেয়ে আছে। মণীশ নিবিষ্ট চোখে কচি মুখখানা দেখল। অনুরও পনেরো! কিংবা গড ফরবিড—যোলো! চোখে কি একটু প্রাপ্তবয়স্কায় ছায়া।

মণীশ চোখ বুজল। অনেক বয়স হয়ে গেল বুঝি তার?

আবার চোখ চাইল।

অনু।

উঁ।

বড় হোসনি মা। এখনই বড় হোসনি। আর কিছুদিন শিশু থাক।

০২০. নতুন আফটার শেভ লোশন

নতুন আফটার শেভ লোশনটা মাখবার পর কিছুক্ষণ যেন আকাশে ভেসে রইল হেমাঙ্গ। এত হালকা লাগল মেজাজ, এত ফুরফুরে লাগল নিজেকে, যেন তার কোনও ভার নেই। সে আকাশে মেঘের মতো ভেসে আছে। গন্ধ যে মানুষকে এমন গ্যাস বেলুন করে দিতে পারে তার কোনও ধারণাই ছিল না হেমাঙ্গর। হল। সুগন্ধ সম্পর্কে তার বরাবরই আগ্রহ আছে। দেশ-বিদেশের কম সেন্ট তার সংগ্রহে নেই। সেগুলো মাখবার জন্য নয়, কারণ বেশী সুগন্ধ মাখলে তার অনেকটা এলার্জির মতো হয়। কিন্তু সে মাঝে মাঝে সাবধানে শিশি খুলে বা বাতাসে একটু স্প্রে করে নিয়ে গন্ধ শোকে। তাতে মনটা ভাল হয়ে যায়। কিন্তু এবার চারুশীলার পতিদেবতাটি এই যে আফটার শেভ লোখনটি এনেছে এটা সবাইকে জুতিয়ে দিয়েছে। এরকম দার্শনিক গন্ধ সে কখনও পায়নি।

সকাল দশটায় নিজের অফিসের চেম্বারে বসে হেমাঙ্গ একজন বিষয়ী লোকের সঙ্গে কথা বলছে। বিষয়ী লোকদের সে একদম পছন্দ করে না, কিন্তু এরাই তার অন্ন-বস্ত্রের যোগানদার। রোজই বিষয়ী লোকদের সঙ্গেই তার শতেক কথাবার্তা হয়। সে এদের আয় ও সম্পদকর বিষয়ক পরামর্শদাতা ও ছোটখাটো একজন ত্ৰাতা। তার সামনে বসে-থাকা লোকটির নাম বিরজু। প্রসাদ সাহা। পদবীটি বাঙালী হলেও লোকটি আসলে ইউ পি-ওয়ালা। স্ক্র্যাপ আয়রন কেনাবেচার ব্যবসাতে কয়েকশো কোটি টাকা খাটছে। লোকটি মোটেই লালাজীদের মতো বুদ্ধিমান, বিদ্যাহীন, ধূর্ত বিনয়ী, মোটা এবং হাত কচলানো টাইপের নয়। এর বাপ-দাদা অবশ্য তাই ছিল। কিন্তু এ রীতিমতো লেখাপড়া জানা স্মার্ট, ট্রিম এবং আধুনিক। ম্যানেজমেন্টে বিলিতি ডিগ্রি আছে। কিন্তু এর মনোজগতে কোথাও কোনও ভাবাবেগ, অলস-চিন্তা, বাহুল্য আনন্দ নেই। এ হল আদ্যন্ত ব্যবসায়ী। বাণিজ্যিক রোবট। এর যা পয়সা আছে তাতে হেমাঙ্গদের গোটা পরিবারকে অন্তত ষাট সত্তর বার কেনাবেচা করতে পারে। এইসব লোকদের খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করতে হয়। একটু বেচাল বেফাঁস কথা বললেই ধরে ফেলবে।

কিন্তু আজ হেমাঙ্গ কোনও কিছুতেই মন দিতে পারছে না। সকাল আটটায় সে দাড়ি কামিয়েছে। অবশ্য আফটার। শেভটা সে দাড়ি কামানোর পরই মাখে না। স্নান করে খেয়ে বেরোনোর সময় মেখে নেয়। তাতে মদির গন্ধটা প্রায় সারাদিন তার মুখমণ্ডলে থেকে যায়। এয়ারকুলার লাগানো ঠাণ্ডা ঘরে গন্ধটা ঝিমঝিম করছে আর তাকে গ্যাস বেলুনের। মতো ওপরে এক স্বপ্নরাজ্যে ঠেলে তুলে দিতে চাইছে। ওঃ, ফরাসীরা গন্ধ চেনে বটে। গন্ধও যে যুগপৎ একটা বিজ্ঞান ও শিল্প সেটা যে এদেশের লোক কেন বোঝ না কে জানে। মিশরের মমিদের কবরে যেসব সুগন্ধের পাত্র পাওয়া গেছে তাতে নাকি এখনও সুগন্ধ পাওয়া যায়! হাজার দুহাজার বছরেও যা নষ্ট হয় না তা কী জিনিস দিয়ে তৈরি কে বলবে?

এ গন্ধটা ততদূর দীর্ঘস্থায়ী নয়। কিন্তু সকাল নটা থেকে লেগে আছে এবং দুপুর গাড়িয়ে বেলা তিনটে সাড়ে তিনটে অবধি থেকে যায়।

বিরজু প্রসাদ সাহা আয়কর সংক্রান্ত একটি বদখত ঝামেলায় পড়েছে, যা প্রতি বছরই পড়ে মিটে যায়। এই ঝামেলা। ও তার সমাধানের মাঝখানে কয়েক হাজার বা কখনও লক্ষ টাকাও হেমাঙ্গর কোম্পানি তুলে নেয়। ফলে এরা অর্থাৎ বি পি সাহার মতো লোকেরা–তাকে অর্থাৎ হেমাঙ্গর মতো লোকদের নিজেদের চাকরবার মনে করে। একটু ভদ্ৰস্থ চাকরযাদের চোখ রাঙানো যায় না বা চটানো যায় না। তবে আক্ষরিক অর্থে চাকরই।

একজন মহাপুরুষ বলেছেন, কর মানে হাত। কর দেওয়া মানে হাতে হাত মেলানো। রাজা ও প্রজার করমর্দন। সরকার ও জনসাধারণের সহযোগিতার শুরু তার বদলে হেমাঙ্গ বা হেমাঙ্গর মতো লোকরা যা করছে তা হল অনেকটা বেড়াল-কুকুরের মল বা মৃত্রের ওপর ছাই চাপা দিয়ে রাখা, যেমনটা তার মাকে সে ছেলেবেলায় করতে দেখেছে। গত বছর প্রায় দেড় কোটি টাকা ট্যাক্স বাঁচাতে বি পি সাহাকে সাহায্য করেছে হেমাঙ্গর কোম্পানি। এবং কাজটা করে যথেষ্ট আত্মগৌরব বোধ করেছে।.বি পি সাহার মতত ক্লায়েন্টদের সর্বমোট কত ট্যাক্স বাঁচিয়ে দিয়েছে তার কোম্পানি তার হিসেব করলে যে-কারও মাথা ঘুরে যাবে। আর এই ছাই-চাপা দেওয়ার কাজ দেশ জুড়ে যারা করছে তারা মোট কত ট্যাক্স সরকারের ঘরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে তার হিসেব করলে গোটা কয়েক পাঁচসালা পরিকল্পনার মূল বিনিয়োগ উঠে আসবে না কি? হিসেটা করা হয় না, এই যা।

খুব মনোযোগর ভান করে বি পি সাহার কাগজপত্র দেখছে হেমাঙ্গ। আদতে দেখছে না। গন্ধের বেলুনে চড়ে এখনও সে অনেক ওপরে। ইনস্যাট বি-এর কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝে মাঝে সে সাহার বিষয়ী মুখটার দিকে তাকাচ্ছে। মুখখানা গোলপানা, গোফ আছে, নাকটা একটু মোটা, ঐ ঘন, কপাল ছোট এবং চুল খুব ঘেঁষ। বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশের মধ্যে। গত বছর তিন কোটি টাকার কাছাকাছি ট্যাক্স দিয়েছে। সাফল্য কি একেই বলে? অঘোষিত সাফল্য অবশ্য আরও অনেক বেশি।

বি পি সাহার মুখে হাসি নেই। আহা, এই লোকটা যদি এই আফটার শেভ লোশনটা একটু মাখত!

খানিকক্ষণ কাগজপত্র দেখার চেষ্টা করে হেমাঙ্গ বলল, ইটস্ ও. কে. মিস্টার সাহা।

বি পি সাহা একটা অস্পষ্ট থ্যাংক ইউ বলে উঠে গেল। দরজাটা বন্ধ হল। ঘরে হেমাঙ্গ একা।

মাঝে মাঝে কাজ করতে তার ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে তার অনেক দিনের ছুটি নিয়ে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। কিছুক্ষণ চোখ বুজে চুপ করে বসে সে কোনও একটা সুন্দর বেড়ানোর জায়গার কথা ভাবল। কিন্তু তেমন আকৰ্ষক কিছুই মনে পড়ল না। পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র সে কি অনেক দেখেনি। খুবই আশ্চর্যের বিষয় এবং লোকে শুনলে হয়তো আসবেও—তার প্রিয় বেড়ানোর জায়গা হল বড় বড় দোকান, যেখানে অজস্র জিনিসের সম্ভার। নতুন নতুন জিনিস। গ্যাজেটস। ইলেকট্রনিকস।

বেশীক্ষণ বিষয়কর্মকে প্রত্যাখ্যান করে থাকা গেল না। একটু বাদেই বেয়ারার চিরকুট। তার কিছুক্ষণ পরেই বি পি সাহার কার্বন কপি আর একজন বিষয়ী লোক। তারপর, আরও একজন। তারপর ইনকাম ট্যাক্স-এর একটা হিয়ারিং সেরে আসতে হল।

তিনটের পর কফি খাওয়ার সময় গন্ধটা সম্পূৰ্ণ লোপাট হয়ে গেল। অন্তত ততটা রইল না, যতটায় ইনস্যাট বি-এর কাছাকাছি উঠে থাকা যায়।

মেয়েটা এল বিকেলের দিকে। আর এক ঘন্টা পরে এলেই হত। তখন থাকত না হেমাঙ্গ। দেখা না করেও উপায় নেই। তার এক জ্যাঠার চিঠি নিয়ে এসেছে। ভূনি জ্যাঠা তার বাবার খুড়তুতো দাদা। এক সময়ে কোলিয়ারি ছিল। এখন ব্যবসা না থাক, টাকা আছে।

মেয়েদের মুখের দিকে চট করে তাকায় না হেমাঙ্গ। তাকালেই নানা বখেরা। মুখটা নিচু রেখেই বলল, চাকরি চান? কোয়ালিফিকেশন কী?

আমি একটা অ্যাপ্লিকেশন এনেছি। বায়োডাটা দেওয়া আছে।

ভূনি জ্যাঠার ক্যান্ডিডেটকে খুব একটা হেলাফেলা করার উপায় নেই। এই জ্যাঠামশাইটি রাশভারী ব্যক্তিত্ববান মানুষ। তিন ছেলে পুলিশ ও প্রশাসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করে। এই তিন দাদাই হেমাঙ্গকে প্রয়োজনে প্রচুর সাহায্য করে থাকে। ভুনি জ্যাঠা কারও অনুগ্রহ নেয় না বড় একটা। আত্মমর্যাদাজ্ঞান খুব টনটনে। কিন্তু এই মেয়েটিকে নিশ্চয়ই বিশেষ কারণেই পাঠিয়েছেন হেমাঙ্গর কাছে। হেমাঙ্গ তার দরখাস্তটা পড়ল। ইলেকট্রিক টাইপ রাইটারে দামী হ্যান্ডমেড কাগজে ছাপা দরখাস্তটা থেকে জানা গেল, মেয়েটির বয়স কুড়ি এখনও পূর্ণ হয়নি। আর্টস গ্র্যাজুয়েট এবং কমপিউটার ট্রেড।

হেমাঙ্গর জীবনে একটা মস্ত বড় ঘাটতির ব্যাপার হল, সে চট করে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। বোধ হয় কতগুলো ব্যাপারে সে অত্যন্ত সতর্ক মানুষ বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চারদিক বিচার বিবেচনা করে। মেয়েটির চেয়েও ভুনি জ্যাঠা তার কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাকটর। তারা অর্থাৎ হেমাঙ্গর গোটা পরিবারটিই আসলে পূর্ববঙ্গের। তবে দাদুর আমল থেকেই, অর্থাৎ দেশ ভাগের অনেক আগে থেকেই তারা কলকাতার বাসিন্দা বলে পূর্ববঙ্গের পরিচয়টা প্রায় মুছে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার এখনও তারা বাঙাল। ঘঘারতর বাঙাল। তার মধ্যে একটা হল, আত্মীয় বৎসল। লতায় পাতায় আত্মীয়দেরও উপেক্ষা করার জো নেই। এই ছোট পরিবারের যুগেও তাদের এই রীতিটি বজায়। আছে। আত্মীয়দের উপেক্ষা করা যাবে না। সুতরাং এই মেয়েটির তাদের আত্মীয়া হওয়ার সম্ভাবনা।

হেমাঙ্গ মৃদু স্বরে বলল, কিছু মনে করবেন না, আপনি ভুনি জ্যাঠামশাইয়ের কোনও আত্মীয় নন তো!

এবারও হেমাঙ্গ মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল না। দরখাস্তর দিকে চোখ রেখেই বলল।

মেয়েটি জবাব দেওয়ার আগেই হঠাৎ পর পর দুটো হাঁচি দিল।

হেমাঙ্গ মুখ তুলে দেখল, মেয়েটা রুমালে মুখ চাপা দিয়ে ভীষণ লজ্জার ভঙ্গিতে বসে আছে। আর খুবই উদ্বেগের কথা যে, মেয়েটি আপাদমস্তক সপসপে ভেজা।

হেমাঙ্গ ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের কাচের শার্সির ভিতর দিয়ে দেখল, বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। বন্ধ অফিসঘরে কৃত্রিম আলোয় এতক্ষণ বুঝতে পারেনি। ভেজা মেয়েটির নিশ্চয়ই ঘরের ঠাণ্ডাটা সহ্য হয়নি। ইস, আপনি যে ভিজে গেছেন।

রোগা চেহারার মেয়েটি সলজ্জ মুখে মৃদু স্বরে বলল, হ্যাঁ। একটু ভিজেছি। ছাতাটা ভুল করে সঙ্গে আনিনি।

হেমাঙ্গ উঠে এয়ারকণ্ডিশনারটা বন্ধ করে দিল। বলল, সরি। আমি এতক্ষণ লক্ষ করিনি যে আপনি ভিজে গেছেন। তোয়ালে দেবো?

মেয়েটি মাথা নেড়ে ভীষণ লজ্জার সঙ্গে বলে, না, তার দরকার নেই।

মুখটা চেনা-চেনা লাগছে হেমাঙ্গর। কোথায় দেখেছে একে? তার স্মৃতিশক্তি চমৎকার। কিন্তু মনে করতে সময় লাগবে। মুখখানার মধ্যে একটা ধারাল সৌন্দর্য আছে। মাথায় মেঘের মতো চুল।

আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি বলুন তো!

দেখেছেন, তবে মনে থাকবার কথা নয়।

কোথায় বলুন তো!

নন্দনাদের বাড়িতে। সেদিন ওর ভাইয়ের জন্মদিন ছিল। আমি অবশ্য আপনাকে চিনি।

হেমাঙ্গর টক করে মনে পড়ল। এই মেয়েটি তাকে একটা কোল্ড ড্রিংক দিয়েছিল। সঙ্গে একটু হাসি। হেমাঙ্গর মাথায় একটা টিকটিক ডাকছিল। সে বলল, ওদের বাড়িতে কি আপনার যাতায়াত আছে?

হ্যাঁ। আমরা প্রতিবেশী।

হেমাঙ্গ অবাক হয়ে বলে, কিন্তু ভূনি জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় হল কি করে? উনি তো সল্ট লেক-এ থাকেন।

মেয়েটি মাথা নেড়ে বলে, পরিচয় নেই তো।

তাহলে এই চিঠিটা?

ওটা তো চারুমাসী এনে দিয়েছে।

মাই গড! তাহলে তো আপনি আসরে আমার ওই বিন্দু দিদিটির রেফারেন্সেই এসেছেন। কিন্তু ও নিজে চিঠি দিল না। কেন? ফোনও করতে পারত।

মেয়েটি সলজ্জ একটু হেসে বলে, উনি বলছিলেন আপনি ওকে বেশী পাত্তা দেন না। তাই কোন এক আত্মীয়ের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে এসে দিলেন। আপনি কিছু মনে করেননি তো! কনসৃপিরেসিটায় কিন্তু আমি ছিলাম না।

বুঝেছি। আমার ওই দিদিটিকে আমি ভালই চিনি। এনিওয়ে, আমি দরখাস্তটা রেখে দিচ্ছি। এই ভেজা অবস্থায় আপনার আর বেশীক্ষণ থাকা উচিত নয়। তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান।

মেয়েটি দরজার কাছ অবধি চলে দিয়েছিল। হেমাঙ্গ আর এবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বাইরেটা বৃষ্টির তোড়ে সাদা হয়ে গেছে। এ বৃষ্টিতে এ মেয়েটি তো কোথাও যেতে পারবে না। নিশ্চয়ই গাড়ি কমে এসেছে রাস্তায়। আর বাসে এখন সাঙ্তিক ভিড় হবে।

শুনুন। আপনি বরং একটু অপেক্ষা করে যান। এই বৃষ্টিতে বেরোতে পারবেন না।

আমি ঠিক চলে যেতে পারব।

পারবেন না। রাস্তায় জল জমে গেছে। বেশী বৃষ্টি হলে কলকাতার অবস্থা কী হয় তা আমি জানি।

আমি জল ভেঙেই এসেছি।

এইরকম দুর্যোগের দিনে না আসাই ভাল ছিল। বসুন। সর্দি তো বোধ হয় লেগেই গেছে। আর নতুন করে লাগবে না।

মেয়েটি জড়সড় হয়ে বসল। খুব সংকোচ।

আপনি কি খুব নিডি? চাকরি খুঁজছেন কেন?

নিডি। তবে আমার বাবা খুব ভাল চাকরি করেন। কিন্তু বাবার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল। ম্যাসিভ অ্যাটাক। এখন আমাদের অবস্থা কিছুটা আনসার্টেন। চাকরিটা সেই জন্যই দরকার।

মেয়েটা আর একবার হাঁচল এবং ভীষণ লজ্জা পেল। রুমালে নাক মুখ চাপা দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও আরও তিনবার হাঁচতে হল তাকে।

বাবার ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের কথা সেদিন আরও একটা মেয়ে বলছিল না? হেমাঙ্গ একটু ভাবতেই বছর পনেরোর কিশোরীটিকে মনে করতে পারল। কিশোরীটি বড্ড বেশী স্মার্ট।

মৃদু হাসি মুখে হেমাঙ্গ বলে, সেদিন পার্টিতে কি আপনার একটি ছোট বোনও ছিল? নিয়ার অ্যাবাউট ফিফটিন!

নাক থেকে রুমাল সরিয়ে মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, অনু। আপনার সঙ্গে নাকি তার খুব ভাব হয়ে গেছে। বলছিল।

এটি আর একটি বিচ্ছ, তাই না!

মেয়েটি হাসল। কিছু বলল না।

হেমাঙ্গ দরখাস্তটা তার ব্যক্তিগত ফাইলে রেখে দিয়ে বলে, আমাদের কোম্পানি ছোট, আমরা চারজন পার্টনার এটা চালাই। আমাদের এখানে স্টাফ খুব কম দরকার হয়। কম্পিউটারেও লোক আছে। আপনার জন্য অন্য কোনও ক্লায়েন্টকে বলে একটা কিছু করার চেষ্টা করব। কম্পিউটার ট্রেনিং থাকলে কাজ পাওয়া সহজ।

মেয়েটা আবার হাঁচি দিতেই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে হেমাঙ্গ। এর তো ভালরকম ঠাণ্ডা লেগেছে। দেখা যাচ্ছে। অথচ বাইরে প্রবল থেকে প্রবলতর বৃষ্টি হচ্ছে। অকালেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। রাস্তায় বোধ হয় এখন হাঁটুজল এবং প্রবল জ্যাম। বৃষ্টি হলেই একটা দুটো গাড়ি ব্রেকডাউন হয়ে রাস্তা আটকে রাখে। কলকাতা অচল হয়ে পড়ে।

মেয়েটা আর একবার উঠবার চেষ্টা করতেই হেমাঙ্গ একটু কড়া গলায় বলে, কোথায় যাচ্ছেন?

বাড়ি যেতে হবে যে।

যেতে তো সবাইকেই হবে। কিন্তু কলকাতায় কেউ কখনও সময়মতো কোথাও পৌছোতে পারে কি? আপনি বরং টেলিফোনে বাড়িতে খবর দিতে পারেন। বাড়িতে কি টেলিফোন আছে?

আছে।

তাহলে টেলিফোন করে দিন। বলে হেমাঙ্গ যন্ত্রটা এগিয়ে দিল।

মেয়েটা এই বদান্যতায় যেন মরমে মরে যাচ্ছে। খুব সংকোচের সঙ্গে বোতাম টিপল। বারতিনেকের চেষ্টায় লাইন পেয়ে মৃদুস্বরে বলল, মা, বৃষ্টিতে আটকে গেছি। ফিরতে দেরি হবে একটু।

সংলাপটা শুনবে না বলেই হেমাঙ্গ উঠে এসে জানালার একটা পাল্লা খুলে দিল। এয়ার কন্ডিশনারটা বন্ধ করায় ঘরটা একটু ভেপে উঠছে। জানালা দিয়ে অবশ্য প্রবল বৃষ্টির ঘাট এল। তবু উঁকি মেরে নিচের অবস্থাটা একটু দেখে নিল হেমাঙ্গ। পথঘাট দেখা যাচ্ছে না বৃষ্টিতে।

জানালাটা বন্ধ করে চেয়ারে এসে বসল হেমাঙ্গ।

মেয়েটা নিজের সর্দির নাক সামলাতে ব্যস্ত।

হেমাঙ্গর এবার মেয়েটির দিকে অকপটে তাকাতে বাধা হল না। সে বলল, আপনাদের সংসার কি বড়?

আমরা তিন ভাই বোন। মা আর বাবা।

ভাই কি করে?

পড়ছে।

আপনার বাবা এখন কেমন আছেন?

একটু ভাল। কাল বাবাকে বাড়িতে আনা হবে।

একটা কাজ করুন। রাস্তায় জল জমে আছে, আমার ছোট গাড়ি ফেঁসে যাবে। একটু যদি অপেক্ষা করেন তো আমি আপনাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসতে পারি।

এই বদান্যতায় মেয়েটা ভীষণ হকচকিয়ে গিয়ে বলল, না না! তার দরকার নেই।

এই মধ্যবিত্ত সংকোচের কোনও মানেই হয় না। এটা হল সুযোগসন্ধানীদের যুগ। কোনও সুযোগ বা সুবিধা প্রত্যাখ্যান করতে নেই। কিন্তু এই মেয়েটির এখনও সেইসব কার্যকরী শিক্ষা হয়নি। কিংবা একা পুরুষের সঙ্গে গাড়িতে যাওয়া কি এর কাছে সতীত্ব বিরোধী ব্যাপার? কে জানে কি! মেয়েদের চরিত্ৰ ভাল করে জানে না হেমাঙ্গ।

সে বলল, দরকার না থাকলেও বসুন। এই বৃষ্টিতে যেতে পারবেন না। বরং একটু গরম চা বা কফি খান। আপত্তি নেই তো?

মেয়েটি আবার হাঁচল। লজ্জা পেল। ফর্সা রংটা লালও হয়ে গেল একটু। বলল, দরকার নেই।

কেন যে এত সংকোচ করছেন। বলে বেল বাজিয়ে বেয়ারা ডেকে দু কাপ কফির কথা বলে দিল।

লজ্জায় মরে যাচ্ছে মেয়েটি। যেন চাকরির উমেদারিতে এসে এই আপ্যায়ন গ্রহণ করাটা অন্যায় হয়ে যাচ্ছে।

কফি এল। দেখা গেল মেয়েটি কফিটা খুব উপভোগ করছে। দু হাতে কাপটা ধরে আছে সাবধানে। লজ্জা পাচ্ছে। কিন্তু ওর মুখ বলছে, কফিটা ওর খুব দরকার ছিল।

বৃষ্টিটা ঝপ করে অনেকটা কমে গেল কফি খাওয়ার দশ মিনিট পর। ধরেনি অবশ্য। তবে ঝিঁঝির করে পড়ছে। উদ্দাম নাগা-নৃত্যটা বন্ধ হয়েছে। আর একটু অপেক্ষা করতে পারলে রাস্তার জলও কিছুটা সরে যাবে। হেমাঙ্গর ভয় তার ছোট গাড়িটা নিয়ে। ইঞ্জিনে জল ঢুকে মোটর বন্ধ হয়ে গেলে ঠেলাঠেলির অনেক ঝামেলা।

কফি খেয়ে মেয়েটা সত্যিই উঠল, এবার আমি যাবো।

হেমাঙ্গ একটু হেসে বলল, ঠিক আছে। আসুন।

মেয়েটা চলে যাওয়ার পর হেমাঙ্গ তার কাজকর্মে একটু ব্যস্ত রইল। কয়েকটা বিষয়কৰ্মজনিত ফোন এল। পার্টনার চঞ্চল বোসের সঙ্গে একটু আজ্ঞা হল। ঘন্টা দেড়েক বাদে বুঝতে পারল রাস্তার জল নেমেছে। যাওয়া যাবে।

গাড়ি স্টার্ট নিল একবারেই। রাস্তায় কোনও ঝাঁট হল না।

ফোনটা এল রাত আটটার পর। বাইরে আবার বৃষ্টি পড়ছে। বিছানায় খুব আলস্যে এলিয়ে আধশোয়া হয়ে টিভি-তে একটা সিরিয়াল দেখছিল হেমাঙ্গ।

ফোনটা কানে তুলতেই হ্যালোর বদলে মেয়েলী গলায় শোনা গেল, ছিঃ!

হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হাঁচলি নাকি?

ছিঃ ছিঃ! তোর লজ্জা করে না?

কিসের লজ্জা?

একটা মেয়েকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে না দিয়ে বৃষ্টিতে ওভাবে ছেড়ে দিলি? জানিস ওর এখন একশ এক ডিগ্রি টেম্পারেচার!

হেমাঙ্গ অপ্রতিভ হয়ে বলে, ওই ঝুমকি মেয়েটার কথা বলছি নাকি?

তবে আর কার কথা বলছি! তোর মনুষ্যত্ব যে এত কমে গেছে, তুই যে এত হৃদয়হীন হয়ে গেছিস তা তো জানতুম না।

ঝুমকি কি তাই বলেছে তোকে?

বলার আর কী আছে?

আমি ওকে লিফট অফার করিনি একথা বলেছে?

মোটেই তা বলেনি।

তাহলে আমার দোষটা কোথায় বল তো!

ও লজ্জা পেয়েছিল, তাই বলে তুই ওকে জোর করে তে পৌঁছে দিতে পারতিস!

হেমাঙ্গ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, জোরও করা যায় নাকি? মেয়েটা অমন ভ্যাবাগঙ্গারাম আর লজ্জাবতী পতা হলে আমার কি করার আছে? আমি হিউম্যান পয়েন্টে যতটুকু করার করেছি।

বেচারার কোল্ড অ্যালার্জি আছে। বৃষ্টিতে ভিজে বুকে কনজেশন হয়ে কী অবস্থা তার ওপর ওর বাবা এখন নার্সিং হোমে। তুই কী বল তো!

হেমাঙ্গ একটু চটে গিয়ে বলে, তখন থেকে কেন যে টিকটিক করছি। বললাম তো, মেয়েটাকে পৌঁছে দিতে চেয়েছি, ও রাজি হয়নি।

একটা ছাতা দিতে পারতিস?

আমার ছাতা কোথায়?

কারও কাছ থেকে ধার করেও তো দিতে হয়। তোর মতো সকলের তো গাড়ি নেই। গরিবদের কথাও দিনের মধ্যে কিছুক্ষণ ভাবতে হয়। পৃথিবীতে কত পারসেন্ট গরিব তা জানিস?

লেকচার দিস না। মেয়েটা মোটেই গরিব নয়। ছাতাটা ভুলে ফেলে এসেছিল। ওরকম আনস্মার্ট, ভুলো মন আর বোকা মেয়েকে আমি কোনও চাকরি দিতে পারব না। সরি।

আহা, চটছিস কেন?

মেয়েটা তোর কাছে গিয়ে চুকলি কেটেছে তো! ঠিক আছে, ওরকম মেয়েকে চাকরি দেওয়ার কোনও দায়িত্বই আমার নেই।

মোটেই চুকলি কাটেনি। ও সেরকম মেয়েই নয়। বোেকা হাঁদাও নয়, আনৰ্টও নয়। তবে লাজুক সেকথা ঠিক। আর তোর মতো ইডিয়ট ছাড়া সবাই জানে যে লজ্জাই ললনার ভূষণ।

ভূষণ মানে জানিস?

কেন জানব না? তোর মতো মূর্খ নাকি? ভূষণ মানে গয়না।

ঠিক কথা। গয়না হল বাহুল্য জিনিস, এ যুগে চলে না। ওয়ার্কিং গার্লরা যেমন গয়না অ্যাভয়েড করে তেমনি সজাও অ্যাভয়েড করতে হয়। নাচতে নেমে ঘোমটা টানলে তো চলবে না। চাকরিও করব, আবার নববধূর মতো মাথা নিচু করে। থাকব তা কি চলে যে? ও হল অচল মাল।

তোর কথাবার্তাগুলো এত জংলি টাইপের। যাক গে, ক্ষমা করে দিচ্ছি। তোকে যে কেন এত ক্ষমা করতে হয় তা বুঝি না বাবা।

ভূনি জ্যাঠামশাইকে এর মধ্যে টেনে নামিয়ে তুই যে কাণ্ডটা করলি সেটা কিন্তু ক্ষমার যোগ্য অপরাধই নয়। জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে আমি জিজ্ঞেস করব ইদানীং তিনি কেন অন্যের কথায় অজ্ঞাতকুলশীল সম্পর্কে ফলস স্টেটমেন্ট এবং রেকমেন্ডেশন দিচ্ছেন।

মারব থাপ্পড়! কে অজ্ঞাতকুলশীল রে; ঝুমকিকে আমি খুব ভাল চিনি।

কিন্তু জ্যাঠামশাই চেনে না।

আমি চিনলেই হবে। ভুনি মামার চেনার তো দরকার নেই।

এইসব মিথ্যাচারের জন্য তোর নরকবাসের মেয়াদ কত বেড়ে যাচ্ছে তা জানিস। ভাল চাস তো এখনও অন্তরটা। পরিষ্কার কর। ঝাটা বালতি নিয়ে লেগে যা। তোর মনে অনেক ময়লা জমে আছে।

০২১. পুলিন ডাক্তার সব বিদ্যেই জানে

দাদুর কাছে পটল শুনেছে, পুলিন ডাক্তার সব বিদ্যেই জানে। হোমওপ্যাথি, অ্যালোপ্যাথি, কবরেজি, এমন কি চাসী অবধি। অথচ পুলিন ডাক্তারের একটা পাশ করা নেই। ধরা পড়লে ডাক্তার দাদুর জেল-জরিমানা সবই হতে পারে।

দুই বুড়ো মানুষে কথা হচ্ছিল একদিন, তখন পটল শুনেছে। ডাক্তারদাদু বড়াই করে বলল, আমি না থাকলে বিষ্টুপুর শীতলাতলা কবে ওলাবিবির গরাস হয়ে যেত তা জানো? ম্যালেরিয়া, মা শীতলার দয়া, সান্নিপাতিক, সন্ন্যাস মানুষের কোন রোগ-ভোগ সামাল দিইনি বলো! পাশ-করা ডাক্তার তখন কোথায় ছিল সব। আমি অ্যালোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি আলাদা করে ধরি না বাপু, রোগে পড়লে যার যা সয় দিই। গাঁ গঞ্জে সব রকমই লাগে। অনেকের অ্যালোপ্যাথি ওষুধ কেনার পয়সা থাকে না, অনেকের সহ্য হয় না, অনেকে আবার কবরেজির ভক্ত। সব বন্দোবস্ত রাখতে হয়েছিল সেইজন্যই।

পটল বিদ্যের ব্যাপারটা বোঝে না। তবে ডাক্তার দাদুকে তার বেশ লাগে। মজার মানুষ। বাইরে দিকে পাকা একখানা ঘরে ডিসপেনসারি। চারটে বড় বড় আলমারি ভর্তি ওষুধ। মদন কম্পাউন্ডার লোকটিও ভাল। সন্ধেবেলায় বটতলায় হারুর সাইকেলের দোকানে বসে গাঁজা খায় বটে, কিন্তু এমনিতে ভারি হাসিখুশি। কাউকে চটায় না, ঝগড়া করে না। ডিসপেনসারিতে নানা লোক আছে। রুগী তেমন কেউ না এলেও, গল্প করতে মেলা লোক আসে। বুড়ে মানুষই বেশী। তাদের কেউ কেউ ডাক্তার দাদুকে দিয়ে ব্লাড প্ৰেশার মাপিয়ে নেয়, কেউ বুকটা একটু এমনিই পরীক্ষা করিয়ে নেয়। বাদবাকি সময় গল্প হয়।

পটল মাঝে মাঝে গোপালকে নিয়ে এসে বসে থাকে এক ধারটায়, কাঠের বেঞ্চে। ডাক্তারা অনেকদিন আগেই বলে দিয়েছে, ও হল জন্মের রোগ। ও কি সারে রে!

কত অসুখের তো কত ওষুধ বেরিয়ে গেছে দাদু। পেনিসিলিন, আরও সব কী যেন!

দুনিয়ায় কত বোরা-কালা আছে জানিস? ওষুধ থাকলে কবে সবাই ভাল হয়ে যেত।

তাহলে গোপালের কী হবে?

কি আর হবে! বোবা-কালাদেরও ব্যবস্থা আছে। ডিফ অ্যান্ড ডাম্বদের ইস্কুল আছে, লেখাপড়া শিখতে পারে।

হোমিওপ্যাথিতে তো কত মরো-রো মানুষও বেঁচে ওঠে। নেই ওরকম কোনও ওষুধ? থাকলে কি বসে থাকতুম রে! মানুষকে ভগবান অনেক বিদ্যে দিয়েছেন বটে, কিন্তু সবটুকু তো আর দেননি। মানুষ যে ভগবান নয়, এটা যাতে সর্বদা মনে রাখে, সেইজন্যই দেননি।

কথাটা পটলের বিশ্বাস হয় না। ডাক্তারদাদুকে ছেড়ে মাঝে মাঝে মদন কম্পাউডারের কাছেও ব্যাপারটা বলেছে, দাও না একটা ওষুধ মদনকাকা। গোপালের জন্য একটা ওষুধ ঠিক পাওয়া যাবে। ভাল করে খুঁজে দেখ।

মদন অবশ্য সরাসরি না করে দেয় না। এক-আধটা পুরিয়া দিয়ে বলে, দেখ খাইয়ে। ঠাকুরের নাম করে খাওয়াস। শাস্ত্রে বলেছে, মূকং করনীতি বাঁচালং। দেখ কী হয়।

হয়নি। গোপাল এখনও কানে শোনে না। কথাও বলে না।

বটতলায় আগে বুধবার হাট বসত। হাটেই গায়ের মানুষ হস্তার বাজার করে রাখত। আজকাল আর সেই দুঃখ নেই। বটতলায় পাকা বাজার বসে গেছে। তবে বুধবারের হাট এখনও হয়। মেলা ব্যাপার আসে। তাদের মধ্যে এক জড়িবুটিওয়ালাও আছে। নানারকম হাড়গোড়, তেল, ভস্ম, ডো, পাথর সব থাকে তার কাছে। ভিড়ও হয়। তার কাছ থেকেও ওষুধ নিয়েছিল পটল। একটা গাছের শেকড় মধু দিয়ে বেটে খাওয়তে হয়েছিল। কাজ হয়নি।

কিসে কাজ হবে, পটল তা নিয়ে আকাশ-পাতাল ভাবে। আকাশে এরোপ্লেন ওড়ে, চাদে মানুষ যায়, অ্যাটম বোমা, টেলিফোন কত কী তৈরি করেছে মানুষ, আর গোপালকে কথা কওয়াতে পারবে না? সে একবার তার বড় জ্যাঠাকে চিঠিতে লিখেছিল, আপনি তো বিলেত আমেরিকা যান। গোপালের জন্য ওষুধ এনে দেবেন? সে চিঠির জবাবে জ্যাঠামশাই লিখেছিল, এর কোনও চিকিৎসা নেই। তবে তুমি বড় হয়ে এটা নিয়ে গবেষণা কোরো। মানুষ চেষ্টা করলে সব পারে।

সাধু-সন্ন্যাসীরা হয়তো পারে। কিন্তু জটাজুটলা লোক দেখলেই পটল ভয় খায়। তান্ত্রিক শুনলেই তার বুক হিম হয়ে যায়। গোপালের জন্য আজও সে কোনও সাধুকে ধরতে পারেনি। তবে জলপড়া, চরণামৃত খাইয়েছে অনেক।

গোপাল যদি কথা বলতে পারত তাহলে তাতে দাদা বলে ডাকত। দুই ভাইয়ে কত প্রাণের কথা হত। সে যখন কথা বলে তখন গোপাল একদৃষ্টে তার মুখের দিতে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকলে গোপাল খানিকটা তার কথা বুঝতেও পারে। পেনসিল, বই, এক গেলাস জল, মাদুর, ঘটি এসব আনতে বলতে ঠিক এনে দেয়। কিন্তু না তাকালে বুঝতে পারে না।

পটল মনে মনে ঠিক করে রেখেছে বড় হয়ে সে ডাক্তার হবে। ডাক্তার হওয়া শক্ত। পড়াশুনো খুব কঠিন। তার আগে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় খুব ভাল ফল হওয়া চাই। তাই সে আজকাল খুব কষে পড়ে। কিন্তু পড়ার ঝেকটা বজায় রাখতে পারে না। দুদিন খুব পড়ল তো চারদিন আর রোখটা রইল না।

ডাক্তারদাদু যে পাশ-করা ডাক্তার নয়, তা সে জানে। তবু আজ বৃষ্টি-ভেজা সকালে ভাইকে নিয়ে সে এসে বসেছে ডিসপেনসারিতে। ডাক্তারদাদু একবার চোখ তুলে তাকে দেখে বলল, কী ব্যাপার রে? তোর দাদুর কিছু হল নাকি আবার!

না, দাদু ঠিক আছে। তবে মায়ের বড় দাতের ব্যথা হচ্ছে।

কিরকম ব্যথা? নড়ছে নাকি?

তা জানি না, ব্যথা হচ্ছে খুব।

ব্যথার ওষুধ খাইয়ে চাপা দিয়ে রাখ। পরে দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে নিস। পেয়ারা পাতা সেদ্ধ করা জলে মুখ ধুতে। বলিস।

ভেজা গায়ে পটল আর গোপাল বেঞ্চে বসে থাকে। ডাক্তারদাদু একটা মোটা বই পড়তে থাকে। মদন তার টুলে চুপ। করে বসে থাকে। আজ আর লোক নেই, রুগী নেই।

ডাক্তার দাদু, একটা কথা বলব?

কি কথা?

ডাক্তার হতে গেলে কী করতে হয়?

কপাল লাগে। কপাল ছাড়া হয় না। আমার দু-দুটো দামড়াকে কত তৈরি করলুম, তা দুটোই ধ্যাড়াল।

খুব পড়তে হয়, না?

না পড়লে কি হয়! পড়াই তো আসল জিনিস। পড়তে হয়, বুঝতে হয়, মাথা খাটাতে হয়। শরীরের মধ্যে কি সোজা যন্ত্রপাতি রে!

একটু দমে যায় পটল। তার তো তেমন মাথা নেই, সে কি পারবে অত শক্ত জিনিস শিখতে। কিন্তু বোরা-কালা ভাইটার মায়ায় মাখানো করুণ মুখখানার দিকে চাইতে তার বুকে একটা জোর এসে পড়ে। তখন মনে হয়, গোপালের জন্যই তাকে ডাক্তার হতে হবে।

ডাক্তারদাদুর বাড়িতে বোধহয় ইলিশ মাছ ভাজা হচ্ছে। খুব গন্ধ আসছে। পাশে-বসা গোপাল একটু আনচান করে। তারপর দাদার দিকে মুখ তুলে তাকায়। পটল তার মুখখানার দিকে চেয়েই বুঝতে পারে, ওর খাওয়ার লোত হয়েছে। তার ভাইটা একটু লোভী। খেতে ভালবাসে। কিন্তু চুরি করে খায় না, না দিলে খায় না। লোভ হলে শুধু পটলকে এসে ঝাঁকুনি দেয়।

পটল উঠে পড়ল। বাইরে এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। তবে তারা দুজনেই ভিজে কুস হয়ে আছে, আর ভিজলেও ক্ষতি নেই।

কোথায় চললি রে বৃষ্টি-বাদলায়? মায়ের জন্য ওষুধ নিলি না?

দাও।

চারটে ট্যাবলেটের একটা রাংতার পাতা দিল মদনকাকা।

ডাক্তার দাদু বলল, তোদের ইলেকট্রিক লাইন এসেছে নাকি? পর দিন যেন তার টানতে দেখলাম।

হ্যাঁ। আর দুচারদিনের মধ্যেই এসে যাবে।

হুঁ! খামোখা পয়সা জলে দিচ্ছে রামজীবন। আমার বাড়িতে তো কবে থেকে আছে, তা হস্তায় জ্বলে কদিন? উসা তো সেই হ্যারিকেন লণ্ঠন। আদি সনাতন জিনিস। তা শখ হয়েছে যখন লাগিয়ে নে। রামজীবন পয়সাটা যে কোত্থেকে আসছে!

আজকার পটল বড়দের অনেক কথার ভিতরকার অর্থ বুঝতে পারে। আগে পারত না। তার বাবা রামজীবনের যে বাজারে কিছু বদনাম আছে তা সে খুব টের পায়। কিন্তু বাবা বলেই যে, সে গাল বাড়বে, এমন নয়। আসলে বাবাকেও তার বিশেষ পছন্দ হয় না। তার বাবা রামজীবন আগলিং বা চুরি-ডাকাতি গোছেরই কিছু করে বলে, সে আবছা শুনেছে। বটতলায় রামজীবনের যে আচ্ছা আছে, সেখানে খুব খারাপ খারাপ লোকের জমায়েত হয়। তবে বাবার ওপর তার রাগের কারণ সেসব নয়। রাগ হয়, কারণ মাঝে মাঝে মাতাল হয়ে এসে রামজীবন গোপালকে বড় মারে। মারার কোনও কারণই নেই। গোপাল কিছু দুষ্টুমি করে না, দোষঘাট করে না।

বৃষ্টিতে গোপালকে নিয়ে বেরোতেই সামনে ইকুলের মাঠে একটা বাজ পড়ল যেন! নীল চোখ-ধাঁধানো আলো দেখেই কুঁকড়ে গিয়েছিল পটল। শব্দটা এত জোরে হল যেন কেউ টাস করে গালে থাপ্পড় মারল। আর তারপরই কান দুটো যেন তালা লেগে গেল একেবারে।

গোপাল হা করে চেয়ে ছিল পটলের দিকে। অত বড় বাজের শব্দটা ও শুনতেও পায়নি। সবাই বলে, কানে শুনতে পায় না বলেই গোপাল কথা বলতে পারে না। কানটা যদি ভাল হয়ে যায় তাহলেই কথাও কইতে পারবে।

আজ বাজ ঠাকুর ক্ষেপে আছে মনে হয়। বটতলার দিকে একটা আর ঘোষপাড়ার দিকে দুটো বাজ বাতাসে যেন আগুন ধরিয়ে দিল। ভয় হচ্ছে। এত বাজ তো কখনও পড়ে না। আকাশটা যেন আরও কালছে হয়ে এল। বাতাস বইছে রাবণরাজার মতো অট্টহাসি হেসে। বৃষ্টিতে তলোয়ারের ধার। কাদা-মাখা রাস্তায় গোপালকে নিয়ে দুটতে থাকে পটল।

বাড়ি অবধি যেতে পারল না তারা। বৃষ্টি এত জোরে নাম, আর এত বাতাস যে পথঘাট সব গুলিয়ে গেল। বাজ পড়ছে খুব।

ইস্কুলবাড়ির পাকা দাওয়ায় উঠে পড়ল পটল। গোপাল খুব ঘেঁষ হয়ে দাঁড়ালো তার গায়ের সঙ্গে। ভয় পেলে পটলের সঙ্গে লেপটে থাকে গোপাল।

আজ রবিবার। ইস্কুল বন্ধ। চারদিকটা খ খ করছে। টানা লম্বা দুটো টিনের চালের ঘর নিয়ে ইস্কুল। একটা পাকা দোতলা বাড়ি উঠছিল, সেটার একতলার ছাদ ঢালাই হয়নি, তার আগেই টাকার জন্য কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। চার-পাঁচ বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে, মাঝখানে গাছ উঠেছে, দেয়ালগুলোয় শ্যাওলা। ৯০

ইকুলবাড়ির দরজা জানালা সব ভাঙা, বেশীর ভাগেরই পাল্লা নেই। তারা দুজনে একটা ঘরে ঢুকে দেখল, একটা ছাগল তার দুটো বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিতরে। মেঝেয় ছাগলের নাদি। বৃষ্টির ঝাঁপটায় বেঞ্চগুলো সব ভেজা। পাগলা বাতাসে জানালার দু-তিনটে পাল্লা ঠকাস করে বন্ধ হচ্ছে, ফের মচাক করে খুলে যাচ্ছে।

পটল এই ইস্কুলেই পড়ে। এই ইস্কুল থেকে যারা পাশ করে গেছে তাদের মধ্যে একমাত্র বড় জ্যাঠামশাই ছাড়া আর কেউ বড় মানুষ হয়নি। সে কি পারবে ডাক্তার হতে? তবে বড় জ্যাঠামশাইয়ের কথা ভাবলে তার খুব অহংকার হয়। জ্যাঠামশাই ইকুলের শেষ পরীক্ষায় খুব ভাল ফল করায়, ইস্কুল একদিন বন্ধ দিয়েছিল।

ব্ল্যাকবোর্ড একটা আধখাওয়া অঙ্ক জ্বলজ্বল করছে। মোছা হয়নি। অঙ্কটার দিকে চেয়ে থাকে পটল। বড় ক্লাসের অবু। সে কিছুই বুঝতে পারে না। এখনও এই ইস্কুলেই তাকে অনেক ধাপ পেরোতে হবে। কত কী জানতে হবে, শিখতে হবে। তারপর পাশ করেও আবার নতুন করে অনেক পড়াশুনো। পড়াশুনোর কথা ভাবতে ভাবতে তার মনটা খারাপ হয়ে যায়। মাথাটা ঝিমঝিম করে।

বেলা অনেক হয়েছে। গোপাল নানারকম ঘোৎ ঘৎ শব্দ করছে। তার খিদে পেয়েছে। খিদে পেলে অমন করে।

টিনের চালে একটা সুপুরির ডোঙা ভেঙে পড়ল। ছাগলটা ম্যা করে মিহি সুরে ডাকল। হঠাৎ তখন ইস্কুলবাড়ির ভূতের কথা মনে পড়ল পটলের। সবাই জানে। ভূতটা হল কমল ঘোষের। এই ইস্কুল তারই তৈরি করা। মরার পরও মায়া ছাড়তে পারেননি বলে ছুটির দিনে নিৰ্জন দুপুরে আর গভীর রাতে নাকি ঘুরে ঘুরে ক্লাসগুলো দেখেন। অনেকেই দেখেছে।

পটল আর দাঁড়াল না। গোপালকে টানতে টানতে বৃষ্টির মধ্যেই ফের বেরিয়ে পড়ল।

ঘোষপাড়ার রাস্তার পড়ে একবার ফিরে তাকাল পটল। বৃষ্টিতে আবছা ইস্কুলবাড়ির বারান্দার কি কমল ঘোষ দাঁড়িয়ে আছে! লক্ষ করছে তাদের? গোপালকে টানতে টানতে আরও জোরে দৌড়োতে থাকে পটল। ঘঘাষপাড়ার পুকুরে দুটো হেলে গামছা দিয়ে মাছ ধরছে। অনেকক্ষণ বাদে মানুষ দেখে বুকে ফের সাহস ফিরে এল।

বাড়ির মধ্যে একমাত্র দাদুরই কোনও কাজ নেই। মানুষ বুড়ো হলে তাকে আর লেখাপড়া করতে হয় না, ডাক্তার বা মাস্টার হওয়ার চেষ্টা করতে হয় না, চুপচাপ বসে থাকতে হয়। দাদুকে দেখে তাই মনে হয় পটলের। কি করে যে দাদু শুধু বসে থাকে, তা ভেবে পায় না পটল। সে তো দু মিনিট চুপ করে থাকতে পারে না, কী যেন কুটকুট করে কামড়ার তাকে, তাড়িয়ে বেড়ায়।

আজ সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছে। বাজ পড়ছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতে চলল, বৃষ্টির থামবার লক্ষণ নেই। উঠোন, বাগান, মাঠঘাট সব একাকার হয়ে গেল জলে। আজ আর কোথাও বেরোনোর নেই পটলের। সারা দুপুর বই কোলে করে বসে থেকেছে পটল। পড়েনি একটা লাইনও। ভেবেছে। বড় হয়ে সে কত বড় ধন্বন্তরী ডাক্তার হবে, জ্যাঠামশাইয়ের মতো কেমন দুনিয়া চষে বেড়াবে, সেইসব ভেবে ভেবেই মাথাটা ভার হয়েছে খুব। বিকেলে একটু ফুটবল খেললে হত। কিন্তু ফিরিঙ্গির মাঠে আজ একহাঁটু জল। ফুটবল নামেইনি। আকাশ আরও ঘোরালো হয়েছে। এ বৃষ্টি সহজে ছাড়বার নয়।

ঘরময় জল। নানা ফুটোফাটা দিয়ে জল পড়ে। ব্যাং, পোকামাকড়, সাপখোপ অবধি ঢুকে পড়তে থাকে ঘরের মধ্যে। দেয়ালে বড় বড় কেঁচো বেয়ে বেড়ায়। ঘরের মধ্যে বড় হাঁফ ধরে যায় পটলের।

দুপুরের ঘুম থেকে উঠে দাদু দাওয়ায় বসেছে। গায়ে মোটা একখানা কথা জড়ানন। চেয়ে আছে সুমুখের দিকে। কী যে দেখার আছে, তা বুঝতে পারে না পটল।

নিজেদের ঘরের দাওয়া থেকে দাদুর দাওয়ার তফাত তিন হাতের বেশী হবে না। পটল সেটা লাফ মেরে ডিঙিয়ে গেল।

ও দাদু!

দাদু গম্ভীর মুখখানা তার দিকে ফিরিয়ে বলে, কি রে? ইস্কুলে যাসনি?

আজ, রোববার না!

রোববার বুঝি!

দাদু ওইরকম। বার মাস কিছু খেয়াল থাকে না।

কি করছ বসে বসে?

এই বসে আছি। কি আর করব?

তোমার বসে থাকতে ভাল লাগে?

খারাপ লাগে না। শরীর নেড়ে কিছু তো করার নেই আমার। মনটা সচল রাখতে চেষ্টা করি।

মা যে বলে, অত বসে থাকলে বাত হয়।

তা হয় হয়তো। এখন ডঙ্কা বেজে গেছে, বাতকে আর ভয় কি?

ডঙ্কা বেজে গেছে কেন?

চলে যাওয়ার লগ্ন এসে গেছে রে ভাই।

তুমি কি মরে যাবে দাদু?

তা আর বলতে! পা বাড়িয়ে আছি।

মরে কোথায় যাবে?

বিষ্ণুপদ একটু হাসল, মানুষের বিদ্যেতে এত কিছু আছে, অথচ এ প্রশ্নটার জবাব নেই রে ভাই। কোথায় সে যায়। নাকি কিছুই থাকে না। কে জানে!

তুমি কমল ঘোষকে দেখেছে?

কোন কমল ঘোষ।

আমাদের ইস্কুলের হেড মাস্টার ছিল না?

ওঃ, সেই কমল ঘোষ চিনলো না মানে? এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এসে, সে-ই তো প্রথম ইস্কুল খোলার জন্য আদাজল খেয়ে লাগল। কত দৌড়-ঝাঁপ ধরা-করা করে, গাঁটগচ্ছা দিয়ে, তবে ইস্কুল খুলে একটা কাজের মতো কাজ করল। নইলে চার পাঁচ মাইল ঠেঙিয়ে এ গায়ের ছেলেদের ইকুলে যেতে হত। প্রথম দিকে তো প্রায় ভিক্ষে করে ইকুল চালাতে হত, মাস্টারমশাইরা মাইনে-টাইনে যৎসামান্য পেত। খুব দুরবস্থা গেছে। তবে কমল ঘোষ ছাড়েনি, দমেওনি। আমার সঙ্গে তেমন বনিবনা হয়নি অবশ্য। আমার বিদ্যে বেশী নয় বলে ইস্কুলে চাকরি দিল না। আমি ভিন গাঁয়ে মাস্টারি করতে যেতাম।

কমল ঘোষ মরার পর তার ভূত দেখনি?

ভূত! না দাদা, সেরকম কিছু তো দেখিনি!

কমল ঘোষ এখন তো ভূত হয়ে ইস্কুলে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। সবাই জানে।

বিষ্ণুপদ একটু হাসল না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তাহলেও তো একটা সমাধান হয় রে!

কিসের সমাধান দাদু?

ভূত হয়েও যদি থাকা যায়, তো, সেটাও তো মস্ত কথা। থাকাটাই তো আসল কথা, ভূত হয়েই হোক, মানুষ হয়েই থাক।

তুমি কখনও ভূত দেখনি দাদু?

বিষ্ণুপদ একটু বিব্রত হয়ে বলে, লোকে তো দেখে বলে শুনেছি। আছে বোধহয়!

তুমি কখনও দেখনি? বিষ্ণুপদ একটু চুপ করে থেকে বলে, ভূত কি না জানি না, তবে একবার একটা কাও হয়েছিল। বলবে! বলে উজ্জ্বল মুখে দাদুর কাছে ঘেঁষে বসল পটল।

তখন এ জায়গায় আমরা সবে এসেছি। চালচুলোর কোনও ঠিক নেই। যে যেখানে পারছে ঘর বেঁধে মাথা গোঁজার জায়গা করছে। দাঙ্গা হাঙ্গামাও হচ্ছে, ঝগড়া কাজিয়াও হচ্ছে, সরকারী লোক, পুলিশও আসছে, চোর ডাকাত আড়কাঠিরও অভাব নেই। সে একটা অরাজক অবস্থা। বনগাঁ ক্যাম্প থেকে আমাদের এখানকার ঠিকানা দিয়েছিল সরকারী লোকেরাই। সেই অশান্তির মধ্যে অতি কষ্টে একখানা ঘর খাড়া করে আমরা আট দশটি প্রাণী কোনওরকমে আছি। হাতের টাকা ফুরিয়ে আসছে। মা একখানা করে গয়না খুলে দেয়, আমি বা বাবা গিয়ে সেটা বেচে টাকা নিয়ে আসি, তবে দুটো ভাত জোটে। এক বছর খুব কষ্ট গেছে। মায়ের বিছের বেচে কিছু চাষের জমি কিনে বাবা চাষবাস শুরু করে দিল। কিন্তু বুড়ো বয়সে ধাক্কাটা সইল না। রোগে পড়ল। আমিও চাষ করতাম, কিন্তু সেইসময়ে মাস্টারির চাকরিটা পেয়ে যাই। জমিটা ভাগে বন্দোবস্ত করে চাকরিটা নিয়ে নিলাম। যাই হোক, বাঁধা একটা রোজগার তো। মাস গেলে ষাট সত্তরটা টাকা তো হাতে আসবে। একেবারে নির্জলা উপোস তো নয়! ইকুলটা দূরে। তখনও সাইকেল কেনা হয়নি। হেঁটেই যেতে আসতে হত। তখন শীতকাল। মাঘ মাসই হবে। প্রচণ্ড শীত পড়ত তখন এদিকটায়। মেলা গাছপালা ছিল তো! এত ঘন বসতিও হয়নি তখন। ইস্কুলের শেষ ক্লাস নিয়ে যখন ফিরতাম তখন অন্ধকার হয়ে যেত। জংলা রাস্তা, ফাঁকা মাঠঘাট দিয়ে একাফিরতে একটু গা ছম্ ছম করত। হাক মারলে শোনার লোক নেই। একদিন সন্ধেবেলা ফিরছি। সেদিন কুয়াশাও হয়েছে খুব। রঘুনাথপুরের দহ বয়ে রেখে বিষ্টুপুরের দিকে আসছি। সামনে একটি জংলা জায়গা ছিল, আঁশফলের জঙ্গল। মাঝখানে দিয়ে সরু পথ। একেবারে নিখুত রাতের মতো নিঃঝুম। শুধু ঝিঁঝি ডাকছে।

পটল আর একটু ঘেঁষে বসল।

বিষ্ণুপদ দূর অতীতের দিকে ধূসর চোখে চেয়ে থেকে ধরা গলায় বলে, জঙ্গলটা মাঝ বরাবর এসেছি, হঠাৎ শুনতে পেলাম খুব কাছ থেকে কে যেন বলে উঠল, বিষ্ণুপদ, একটু তাড়াতাড়ি যা বাবা। আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। গলাটা খুব চেনা। আমার বাবার গলা। কিন্তু বাবা এখানে এই জঙ্গলে আসবে কি করে? তার তো বিছানা ছেড়ে ওঠারই সামর্থ্য নেই। আমি চারদিকে চেয়ে দেখলাম, কোথাও কেউ নেই। চাপ অন্ধকার আর কুয়াশায় সব ঢাকা। বললুম, কে? কে আপনি? কেউ জবাব দিল না। শুধু একটা পেঁচা ডেকে উঠল আর হুড়ুস করে একটা বাদুড় উড়ে গেল আকাশে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল আমার। কথাটা স্পষ্ট শুনেছি। ভুল নেই। কিছুক্ষণ হাত পা সব কাঠ হয়ে রই। তারপর হঠাৎ মনে হল, গলাটা বাবারই। হয়তো বাবা আর নেই। মনে হতেই প্রায় ছুটতে শুরু করলাম। মাইলটাক পথ পার হয়ে বাড়ির কাছাকাছি আসতেই কান্নার রোল শুনতে পেলাম। এসে দেখি, বাবা আর নেই।

তারপর কী করলে?

বিষ্ণুপদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, কী আর করব! যা সবাই করে, তাই করলাম সব। তবে ওই একবারই একটা ঘটনা ঘটেছিল। তাই মনে হয়, মরে গিয়েও মানুষের কিছু থাকে। সবটা শেষ হয় না। কিছু একটা থেকে যায়।

সেটাই কি ভূত দাদু?

তা হতেও পারে। তবে আমার আর কতটুকু জানা আছে বল ভাই! কত কী আছে চারদিকে। টের পাই, কিন্তু ধরতে পারি না।

০২২. প্লেন চলেছে ভোরের দিকে

প্লেন চলেছে ভোরের দিকে। আলোর দিকে। পূর্বাচলে। নিচে অন্ধকার পৃথিবী। আলো ঝলমল নোম ছেড়ে একটু আগেই আবার কালো আকাশে উঠে এল তারা। লন্ডন থেকে অনেক ইতালিয়ান উঠেছিল, রোমে তারা নেমে যাওয়ায় প্লেন এখন ফাঁকা। আইন সীটের হ্যান্ডরেস্ট তুলে দিয়ে অনেকে লম্বা হয়ে ঘুমোচ্ছ। কৃষ্ণজীবন কখনও প্লেনে ঘুমোতে পারে না। বছরে দু তিনবার সে বিদেশে যায়, সারা বছর দেশের এ-শহর ও-শহর উড়ে বেড়ায়, অজস্র মিটিং সেমিনার, কনফারেন্স উপলক্ষে। তবু প্লেনে ঘুমোতে গেলেই এখনও তার একটা গ্রাম্য ভয় এসে বাধা দেয়। প্লেন যদি হঠাৎ ক্র্যাশ করে। প্লেন ক্র্যাশ করলে জাগা বা ঘুমোনো দুটোই যে সমান তা কি কৃষ্ণজীবন জানে না? তার ভয়টা বড়ই অযৌক্তিক, তাই গ্রাম্য। এত ওপরে ওঠার তো কথা ছিল না তার। বোধহয় তাই আজ পতনের ভয়।

আর একটা গ্রাম্যতা আছে তার। প্লেনের উইন্ডাে সীটে বসবার লোভ। এই লোভে সে এয়ারপোর্টে চলে আসে খুব তাড়াতাড়ি। যদি জাম্বা জেট অনেক ওপর দিয়ে যায় এবং নিচে নিমেঘ আকাশ ও দিনের আলোতেও তেমন কিছু দেখা যায় না, শুধু রিলিফ ম্যাপের মতো ভূমিখণ্ড বা নিজীব সমুদ্র ছাড়া। তবু সে জানালার ধারে বসতে চায় এবং উদগ্র আগ্রহ নিয়ে বাইরে চেয়ে থাকে।

তার ভিতরে এখনও অনেক ছেলেমানুষী আছে, অনেক গ্রাম্যতা আছে, অপরিণামদৰ্শিতা আছে। বৃষ্টি দেখলে তার আজও ভিজতে ইচ্ছে করে। কোঁচড়ে মুড়ি নিয়ে খোসাসমেত শশা দিয়ে খেতে ইচ্ছে করে, মায়ের কাছে বসে শীতের সন্ধেয় আস্কে পিঠে বানানো দেখতে ইচ্ছে করে। নিজের ফ্ল্যাটে বা হোটেলের ঘরে যখন একা হয় তখন হঠাৎ হঠাৎ সে অর্থহীন আগডম বাগড়ম সব শব্দ দিয়ে বেসুরে গান বেঁধে গায় এবং নেচে ওঠে। নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলার একটা বড় অভ্যাস তার অনেক দিনের। এইসব নিয়েই সে কৃষ্ণজীবন। সমাজের এক ভারিক্কী মানুষ, গুরুতর মানুষ। অবাক হয়ে সে মাঝে মাঝে ভাবে আমি কি করে এই সব হলাম?

তার ঘড়িতে এখনও লন্ডনের সময়। কিন্তু এই সময় অনুযায়ী মধ্যরাতেই দিল্লিতে ভোর হয়ে যাবে। ভোরের আর খুব বেশী দেরীও নেই। তারা চলেছে আলোর দিকে। ভোরের দিকে। এক উন্নত সভ্যতার সীমানা ছাড়িয়ে গরিব দেশের দিকে। দিল্লিগামী এই ফ্লাইটে সে আরও কয়েকবার এসেছে। মধ্য এশিয়ার ওপরেই ভোর হয়ে যায়। তখন এক ঊষর প্রস্তর আর রুক্ষ পাহাড়শ্রেণী দেখতে পায় সে। সবুজের লেশমাত্র নেই। পাথুরে নিরস সেই পর্বতমালার ভিতর দিয়ে একটি সর্পিল রেখার মতো একটিমাত্র পথ কোন দিগন্ত থেকে দিগন্তে চলে গেছে বাক খেয়ে খেয়ে, পাকসাট মেরে। সমস্ত পৃথিবীও কি ওই ঊষরতার পথে? এক অদ্ভুত আংকিক নিয়মে জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। খাদ্য, অক্সিজেন, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বাসের স্থান, কর্ষণযোগ্য ভূমির সঙ্গে অনুপাত থাকছে না সেই জনসংখ্যার। মানুষের বসতি এগিয়ে গিয়ে গ্রাস করে নিচ্ছে চাষের জমি, জঙ্গল, জলাভূমি। মানুষের কাছে তার সন্তান কতই না আদরের, অথচ পৃথিবীর চোখে সে সন্তান মন্ত বালাই।

প্রকৃতি শোধ নেবে? নির্মম সব রোগ, মহামারী, ভূমিকম্প, জলোচ্ছাস দিয়ে হ্রাস করবে জনসংখ্যা? নাকি মানুষই মারবে মানুষকে বেড়ে যাবে গুপ্তহত্যা, উগ্রবাদ, দাঙ্গা, রাজনৈতিক খুন? মানুষ কি একদিন মানুষেরই মাংস খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে? নিজের তিনটি সন্তানকে কোন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতে রেখে যাবে কৃষ্ণজীবন।

ঝিমুনি এসেছিল। অস্বস্তিতে হঠাৎ চটকা ভেঙে সোজা হয়ে বসল সে।

প্লেনে ডিনারটি আজ চমৎকার হয়েছিল। বারবার ঝিমুনি আসছে তার। ঝিমুনির মধ্যেই সে স্বপ্ন দেখছিল, পৃথিবীতে জনসংখ্যা কমানোর জন্য নিয়ম হয়েছে, কারও দুটির বেশী সন্তান হলে বাড়তি সন্তানদের কেড়ে নিয়ে মেরে ফেলা হবে। খবরটা শুনেই ইউনিভার্সিটি ফেলে বাড়িতে ছুটে এসেছে কৃষ্ণজীবন, গলা ফাটিয়ে ডাকছে, রিয়া! রিয়া! শীগগির দোলনকে লুকিয়ে ফেল! লুকিয়ে ফেল! ওরা কেড়ে নিতে আসছে। আদিগন্ত বিশাল এক ফ্ল্যাটে কোথা থেকে যেন আলুথালু রিয়া ছুটে আসছে আর পেঁচিয়ে বলছে, দোলনকে যে সকাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না।

দুঃস্বপ্ন! চটকা ভেঙে গেল। একটু শিহরিত হল কৃষ্ণজীবন। অনেকদিন ধরেই একটি অপরাধবোধ কাজ করে তার মনের ভিতরে। তাদের তৃতীয় সন্তান দোলনকে পৃথিবীতে আনা তাদের উচিত হয়নি। পৃথিবীর জনসংখ্যার পক্ষে নিরপেক্ষ অংকের নিয়মে দোলন একটি বাড়তি মানুষ। বাহুল্য। এই একটি বাড়তি মানুষ থেকে জন্ম নেবে আরও কিছু বাড়তি মানুষ। না, দোলনকে আনা তাদের উচিত হয়নি। কিন্তু জন্মের পর কি দোলন ক্রমে তার নয়নের মণি হয়ে ওঠেনি। দোলনকে ছাড়া এই জীবনটার কথা কি ভাবতে পারে কৃষ্ণজীবন? সে মনে মনে শিউরে ওঠে আবার। কিন্তু এও নিৰ্মম সত্য, যে ভাবাবেগ নয়, পরিসংখ্যানই আজ সবচেয়ে সত্য কথা বলে। দোলন বাড়তি, দোলন বাহুল্য। দোলনের জন্যই সে পৃথিবীর কাছে অপরাধী। দোলনের জন্য সে লন্ডনের এক বিখ্যাত দোকান থেকে অনেক দাম দিয়ে নিয়ে এসেছে একটা মন্ত মেকানো সেট, ছবি আঁকার রং, পেনসিল, ভিউ মাস্টার। ভবিষ্যতের পৃথিবী দোলনকে এত আদর করবে কি?

প্লেনের মস্ত পেটের মধ্যে লাগেজ হ্যাচ-এ তার সুটকেসে আরও অনেকের জন্য অনেক কিছু আছে। রিয়া এবং ছেলেমেয়েদের জন্য। কিন্তু সবচেয়ে অবাক কাণ্ড, এবার সে বিস্মৃতপ্রায় চারটি মানুষের জন্যও কিছু জিনিস কিনেছে। কেন কিনল, কেনার কথা কেন মনে এল, সেটাই সে বুঝতে পারছে না। সম্ভবত লন্ডনের ওয়েম্বলিতে একটা দোকানের মস্ত অখণ্ড কাচে লাগানো একটি গ্রাম্য ছবির পোস্টারই তার জন্য দায়ী। শাড়ি পরা একটি মেয়ে কলসী কাঁখে ঘোর বৃষ্টির মধ্যে আবছা একটা পিছল পথ বেয়ে আগাছার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পুকুরঘাটে নেমে যাচ্ছে। ভারী আবছায়া মায়াভরা ছবি। পিছন ফেরা বলে মেয়েটার মুখ দেখা যায় না। কিন্তু সন্দেহ নেই, ছবিটা গ্রাম বাংলার। অথচ ওয়েম্বলি হল গুজরাতি পাড়া, বাঙালি ব্যবসাদার নেই।

নিরামিষ ডিনার খাওয়াবে বলে তার বন্ধু, লন্ডনের এক স্কুলের অংকের শিক্ষক ভানুভাই তাকে নিয়ে গিয়েছিল গতকাল। সেখানে ফুটপাথে অজস্র জাপানী শাড়ি সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। ওসব দিকে নজর দেওয়ার কথা নয় কৃষ্ণজীবনের। কিন্তু পোস্টারটা দেখে সে দাঁড়িয়ে গেল। মেয়েটার পায়ের চারধারে নির্ভুল কচুবন। সামনে তালের ডোঙায় বাধানো ঘাট। অজস্র বৃষ্টির জলধার। বিষ্টুপুর যেন উড়ে এল লন্ডনে। দুটো বোনের কথা ভীষণ মনে পড়ল, যারা জনও কখনও আসবে না বিদেশে, কখনও পরবে না জাপানী সামু সাটিন শাড়ি, অতীতের সব অপমানের ওপর কি বিস্মৃতি আজও পলির আস্তরণ ফেলে যায়নি? ওদের জন্য কখনও তো কিছু নিয়ে যায় না কৃষ্ণজীবন! সে সিদ্ধান্ত নেয় আচমকা, আবেগে।

শাড়িগুলো যেমন সুন্দর, তেমনি সস্তা। ওদের জন্য কিনলে কি রিয়া কিছু মনে করবে? তার ভয় শুধু রিয়াকে।

ভানুভাই তাড়না দিয়ে বলল, আরে লে লো ভাই কুছ মেহেঙ্গা তো নেহি।

না, মোটেই মেহেঙ্গা নয়। তিন পাউন্ড মানে দেদার সস্তা। আর কৃষ্ণজীবনের বিলে সদ্য অর্জিত প্রচুর বাড়তি পাউন্ড। তাদের কৌতূহল দেখে দোকানদারনি মাঝবয়সী গুজরাতি মহিলাও নেমে পড়লেন শাড়ি বাছতে। চমত্তার বিরল রঙের দুখানা শাড়ি মাত্র ছয় পাউন্ডে কিনে ফেলল কৃষ্ণজীবন। তারপরই হঠাৎ মনে পড়ল, রামজীবন আর বামাচরণের বউয়ের কথা। দুই বোনকে শুধু দিলে ভাল দেখাবে কি? সুতরাং আরও দুখানা কিনল সে। এখন দিল্পিগামী বিমানে ভোরের প্রত্যাশায় বসে পৃথিবীর দূষণজনিত দুশ্চিন্তার মতোই একটা মৃদু উদ্বেগ অনুভব করল সে। দেওয়াটা উচিত হচ্ছে কি? সংসারের নিয়ম এর কী ব্যাখ্যা করবে? কেমনভাবে নেবে রিয়া?

মনশ্চক্ষে সেই পোস্টারটা দেখতে পায় কৃষ্ণজীবন। দোকানদারনি বলতে পারেনি, ছবিটা কার আঁকা বা কোন প্রদেশের ছবি। কিন্তু মনটা ভারী স্নিগ্ধ হয়ে যায়। গাছপালা, বৃষ্টি, পুকুরঘাট আর সেই মেয়েটি। কী সুন্দর! যেন তার শৈশবের একটা জানালা খুলে গেল হঠাৎ।

একটা পোস্টারও কত কী করতে পারে।

আবার ঝিমুনি এল কৃষ্ণজীবনের।

হাই।

আরে অনু! কী খবর?

অনু তার সুন্দর ঠোঁটদুটি ভেঙে হাসির উৎস খুলে দিয়ে বলে, ভাল আর কই! ভালবাসা পেলে লোকে ভাল থাকে, তাই না? আমাকে তো কেউ ভালবাসে না!

তাই বুঝি? কেন তোমাকে কেউ ভালবাসে না? তুমি তো লাভেবল।

মোটেই না। আমার বাবা আর মায়ের সব ভালবাসা নিয়ে নেয় আমার দাদা আর দিদি। আমি বাড়িতে থাকি অরফ্যানের মতো।

অত সহজ নয়। মা আর বাবার ভালবাসা কি অত সহজে মাপা যায়? সে ভালবাসা তো শুধু আবেগ নয়, তাতে শাসন, নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব, উদ্বেগ সব মিশে থাকে। ওটা বুঝতে একটু সময় লাগে।

তাই বুঝি? আমার কি বুদ্ধি নেই? আমি কি বুঝি না?

আমার বড় দুই ছেলেমেয়েও বোধহয় তোমার মতোই ভাবে। তারা বোধহয় ভাবে, আমি তাদের ভালবাসি না। সেটা তাদের বোঝার ভুল এবং কমিউনিকেশনের অভাব।

ইউ আব নট ক্যাপেল অফ লাভিং। সেইজন্যই তো আমি ফিলাডেলফিয়া চলে যাচ্ছি, সুমনের কাছে।

সুমন! সে কে বলো তো!

আপনি বুঝি আমার সব বয় ফ্রেন্ডকে চেনেন। সুমন সিং আমার বয়ফ্রেন্ড। দারুন স্মার্ট। ইন দি মেকিং অফ এ বিগ ডক্টর।

বয়ফ্রেন্ডের কাছে যাচ্ছো! তার সঙ্গেই থাকবে নাকি?

হোয়াই নট! উই উইল লিভ টুগেদার।

সে কী?

অনু কাঁধ দুটো ঝাঁকিয়ে বলে, সো হোয়াট! আমাদের সময়ে আমরা আদ্যিকালের সব নিয়ম আর ভ্যালুজ উড়িয়ে দেব। আমরা মানি না যে, ম্যারেজস আর মেড ইন হেভেন। লিভ টুগেদার করলে কত সুবিধে বলুন তো!

কৃষ্ণজীবন অনুর দিতে চেয়ে বলে, যদি গিয়ে দেখতে পাও যে, সুমনও আর একটা মেয়ের সঙ্গে বসবাস করছে?

অনু ফের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, সে হোয়াট? আমি তো আর জেলাস টাইপের নই। সুমন না চাইলে আমি আর একজন ফ্রেন্ডকে খুঁজে বের করে নেবো।

হতাশ মৃত কণ্ঠে কৃষ্ণজীবন বলে, তুমি এরকম কেন অনু? নর-নারীর সম্পর্কের মধ্যে কি কোনও রচনা নেই। কোনও নির্মাণ নেই?

অনু খিলখিল করে হেসে উঠে বলে, আপনি ভীষণ ওল্ড টাইমার।

তা হবে।

হঠাৎ অনু তার দিকে ঝুঁকে মুখের পানে সকৌতুকে চেয়ে থেকে বলে, রাগ করলেন?

কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে রাগ নয়। মনটা খারাপ লাগছে।

আচ্ছা, আপনি কেন নিজেকে বদলাতে পারেন না বলুন তো!

বদলাবো! কেন বলো তো!

আপনি ভীষণ সেকেলে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন আর ইনস্টিটিউশন্যাল, তাই না?

তাই নাকি?

তাই-ইতো। নইলে কেন ম্যারেজটাকে এত ভ্যালুয়েবল মনে করেন?

ম্যারেজ থেকেই তো ফ্যামিলি, আর ফ্যামিলি থেকে ক্ল্যান। পরিবার হল মানুষের ভিড়। তার শিকড়। পরিবার না থাকলে মানুষ পরগাছার মতো হয়ে যায়, যাযাবরের মতো জীবনযাপন করে।

আপনার পরিবার কি আপনাকে শিকড় মেলতে দিয়েছে? তাহলে আপনি কেন আর গায়ের বাড়িতে যান না? আপনার নিজের পরিবারের সঙ্গে কেন আপনার মাখামাখি নেই।

কৃষ্ণজীবন মাথা নেড়ে বলে, তোমার দেখার মধ্যে একটু ভুল আছে। বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু পরিবার মানুষকে কিছু একটা দেয়ই। সেটা হয়তো তার একটা পরিচয়, একটা পদবী, একটা ঠিকানা। আর এই আইডেন্টিটিই তাকে লক্ষ কোটি মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে দেয় না।

আমি তো হারিয়েই যেতে চাই। কি হবে বাবা-মা-ভাই-বোন আঁকড়ে থেকে বলুন তো! আমার তো একদম ভাল লাগে না। বাবা-মায়েরা ভীষণ ন্যাগিং টাইপের হয়, ইচ্ছেমতো চলতে দেয় না, এটা বারণ করে, সেটা বারণ করে। আমাকে আমার মতো হতে দেয় না কিছুতেই।

তুমি কিরকম হতে চাও?

আমি আমার মতো হতে চাই। আমার ইচ্ছেমতো যা-খুশি হবো, যা-খুশি করব। কোনও প্রম্পটার চাই না। লাইফ ইজ নট এ গাইডেডর টুর।

কৃষ্ণজীবন সামান্য ঘামতে থাকে দুশ্চিন্তায়। অনুর দিকে চেয়ে থেকে বলে, তাই তুমি ফিলাডেলফিয়া চলে যাচ্ছো?

আবার ঠোঁটের মনোরম একটা ভঙ্গি করে অনু বলে, যেতাম না তো, যদি এখানে কেউ আমাকে ভালবাসত।

তুমি জানো না, তোমাকে কতটা ভালবাসেন তোমার মা আর বাবা।

ওরকম ভালবাসার কথা বলছি না। আই অ্যাম টকিং অ্যাবাউট রোমান্টিক লাভ।

ওঃ, মাই গড! রোমান্টিক লাভ! তার জন্য তো বয়স পড়ে আছে তোমার সামনে।

এইটেই তো ঠিক বয়স। আর বেশী বয়স হলে আমার মন যে হিসেবী হয়ে যাবে। ভাঙচুর করতে পারব না যে।

ভাঙচুর করতেই হবে?

করুণ মুখ করে অনু বলে, নইলে যে কেউ আমাকে ইস্পার্ট্যান্স দিচ্ছে না। টিন এজার বলে ভীষণ নেগালেক্ট করছে!

ওটা তোমার ভুল ধারণা। কেউ তোমাকে নেগলেক্ট করছে না। কিন্তু বয়ঃসন্ধিতে মানুষ একটু বেশী সেন্টিমেন্টাল হয়, তাই সবাই নেগালেক্ট করছে বলে ভাবে।

অনু মাথা ঝামরে বলে, অন্তত একজন তো করছেই। আর তার জন্যই তো আমি সুমন সিং-এর কাছে চলে যাচ্ছি। রাগ করে।

কে নেগালেক্ট করছে তোমাকে?

আপনি।

আমি! বলে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়ে কৃষ্ণজীবন, আমি তো কই তোমাকে নেগলেক্ট করি না। কত আড্ডা দিই তোমার সঙ্গে।

তাই বুঝি! আমি কিন্তু ঠিক টের পাই, আপনি আমাকে একদম পাত্তা দিতে চান না। ইউ আর ম্যারেড টু ইওর ওয়াইফ, ইউ আর ম্যারেড টু ইওর ওয়ার্ক, ইউ আর ম্যারেড টু ইওর ফ্যামিলি, আমার জন্য আপনার একটুও ভালবাসা নেই।

আচ্ছা বাবা আচ্ছা। কী করলে প্রমাণ হবে যে—বলে কৃষ্ণজীবন বাক্যটা সঙ্কোচবশে অসমাপ্ত রাখে।

অনু খিলখিল করে হাসে, আগে বলুন, আমার জন্য লন্ডন থেকে কী এনেছেন!

তোমার জন্য? ওঃ, তোমার জন্য … শাড়ি-হ্যাঁ একটা দারুণ শাড়ি!

দুর! শাড়ি আমি পরি নাকি?

তাহলে?

এক বাক্স চকোলেট আনলেন না কেন?

চকোলেট! বলে হাঃ হাঃ করে হাসতে চেষ্টা করল কৃষ্ণজীবন। কী ছেলেমানুষ! বালিকা বললেই হয়।

একটা এয়ারপকেটে জপ করে কিছুটা নেমে গেল প্লেন।

চটকা ভেঙে চোখ চাইল কৃষ্ণজীবন। না, লজ্জার কিছু নেই। স্বপ্ন স্বপ্নই। তবু নিচে উষর এক পাথুরে ভূখণ্ডের উপর ভোরের অপরূপ আলোর দিকে চেয়ে নিজের কাছে নিজেকেই লুকোতে ইচ্ছে করে কৃষ্ণজীবনের। অনুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার মধ্যে কোনও গোপন পাপ নেই তো মনে?

মন বড় বিচিত্র এক জিনিস। কিছুতেই তার টিকির নাগাল পাওয়া যায় না। মন কতভাবে যে নাকল করে বেড়ায় মানুষকে। নইলে সে কেন তার অবচেতন মনেও অনুর চিন্তা পোষণ করবে? কোনও মানে হয় এর?

গায়ের আর একটা জিনিস সঙ্গে করে এনেছে কৃষ্ণজীবন। খিদে। তার প্ৰেশার, ব্লাড সুগার, কোলেস্টোরেল নেই। সেজন্য বাঘের মতো খায়। তার খিদে প্ৰচণ্ড, ব্রেকফাস্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে গোটা ট্রে চোখের পলকে উড়িয়ে দিল।

দিল্লি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সারাটা দিন পড়ে থাকতে হল কৃষ্ণজীবনকে। সে রিক্লাইনিং চেয়ারে পড়ে পড়ে ঘুমোলো। তারপর বিকেলে ধরল। কলকাতার প্লেন।

উইসকনসিন ইউনিৰ্ভার্সিটিতে অধ্যাপনা ও গবেষণার চাকরির একটা প্ৰস্তাব তার কাছে এসেছে। মনস্থির করতে পারে না কৃষ্ণজীবন। সে গায়ের ছেলে। গরিব গ্রাম, গরিব দেশ। আমেরিকায় গেলে সে লোভনীয় চাকরি পাবে, থাকবে মহা আরামে। তার চেয়েও বড় কথা, তার কাজের পরিসর বেড়ে যাবে অনেক। খুব খুশি থাকবে রিয়া এবং তার তিন ছেলেমেয়ে। সবই ঠিক। তবু বিদেশে বসবাসের কথা ভাবলেই কেন যে তার ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে। এই নোংরা, গরিব, জনাকীর্ণ অকৃতজ্ঞ স্বদেশ কেন যে তাকে সম্মোহিত করে রেখেছে কে জানে! না, কোনওদিনই দীর্ঘ প্রবাস তার সহ্য হবে না।

চারটে শাড়ি নিয়ে রাতে রিয়া তার বিষ ওগরাল।

কেন ওদের শাড়ি দেবে? ওরা কি তোমাকে চেনে? দাদা বলে খাতির করে? ঝগড়ার সময় তো পারলে গলাধাক্কা দিয়েছিল।

কৃষ্ণজীবন ব্যথাহত মুখে বলল, সংসারে তো ভুল বোঝাবুঝি হয়। তা বলে সম্পর্ক তো মিথ্যে হয়ে যায় না।

ও সম্পর্ক কোনও সম্পর্কই নয়। চুকেবুকে গেছে, ওদের নিয়ে ফের মাতামাতি শুরু করলে পেয়ে বসবে।

আমি ওদের কখনও কিছু দিই না। কখনও না। সব লেনদেনই তো বন্ধ। এটা কি ভাল?

লেনদেনের কথা বলছে। তাহলে বলি, সম্পর্ক থাকে দেওয়া আর নেওয়ার মধ্যে। তুমি তো দিলে, ওরাও কিছু দিক। এই তো সেদিন বীণা হঠাৎ করে এসে হাজির। হাতে দু টাকার মিষ্টির বাক্সও তো ঘরে আনেনি ভাইপো-ভাইঝিদের জন্য!

অবাক হয়ে কৃষ্ণজীবন বলে, বীণা এসেছিল? ‘

তুমি লন্ডন যাওয়ার তিন চারদিন পর।

কী বলল?

কী আবার বলবে! বোধহয় দাদার সংসারটা একটু দেখে গেল, গিয়ে কৃটিকচালি করবে। বরটা তো একটা হাঁদা গঙ্গারাম।

কিছু বলেনি? কোনও দরকারের কথা?

না। হয়তো তোমাকে পেলে বলত।

কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে বলে, তোমাকে ভয় পায় ওরা। তাই কিছু বলেনি। হয়তো বিপদে পড়ে এসেছিল।

তার মানে তোমার মাথায় হাত বোলাতে। তোমার ওই বোনটি কিন্তু সোজা পাত্রী নয়। শুনতে পাই সে যাত্ৰা থিয়েটার করে বেড়ায়। চরিত্রের কোনও বালাই নেই। স্বামীটা তো মেনিমুখো। খুব সাবধোন কিন্তু। পেয়ে বসবে। একবার সাহায্য করলে বারবার করে যেতে হবে।

কৃষ্ণজীবন এখনও সংসারের সব প্যাঁচ বোঝে না। তবে সে বিমর্ষ বিবৰ্ণ মুখে বসে রইল। কথাটা মিথ্যে নয় যে, বীণাপানি যাত্রায় নেমেছে।

রিয়া গম্ভীর মুখ করে বলে, কিছু মনে কোরো না, তোমার যা স্ট্যাটাস, যা নাম, তাতে এইসব সাব স্ট্যান্ডার্ড লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা ভীষণ বেমানান। কথাটা যতই খারাপ শোনাক, কিন্তু খুব সত্যি।

কৃষ্ণজীবন একটাও কথা বলতে পারল না। হার মেনে নিল। রিয়া শাড়ি চারখানা তুলে রাখল। তার নিজস্ব আলমারিতে। চিরকালের মতো।

রাতে ঘুম হল না। কৃষ্ণজীবনের। কেন যে খুব মনে পড়ছে ওদের কথা! তার ভাইবোন যদি নষ্ট হয়ে দিয়ে থাকে। তবে তা কার দোষ? ওরা যদি সাব স্ট্যান্ডার্ড থেকে গিয়ে থাকে। তবে তা কার দোষ? তার সঙ্গে যে ওদের যোজন যোজন তফাত হয়ে গেল সে কার দোষ? ছোট্ট বীণা তো তার হাত ধরে ধরে হাটতে শিখেছিল। সাইকেলের রডে পাখির মতো হ্যান্ডেল আঁকড়ে বসে থাকত আর তাকে নিয়ে নিয়ে পাড়ায় টহল দিত কৃষ্ণজীবন। ভাবলে কত কী মনে পড়ে! আর এক বোন সরো, তাকে কত কাল দেখেনি সে। রামজীবন, বামাচরণ, শিবচরণ এদের সবাই যে একদিন লতানে গাছের মতো উদ্বাহু হয়ে তাকে আঁকড়ে ধরে উঠে আসতে চেয়েছিল অন্ধকার থেকে আলোয়। অশিক্ষা, দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, আত্মাবমাননার হাত থেকে আকাশের ঈশ্বর নয়, দাদাকেই তারা বেশী নির্ভর করত।

এগারোতলার ছাদে নিশুত রাতে ভূতগ্ৰস্তের মতো উঠে আসে কৃষ্ণজীবন। আকাশে কালো ঘন মেঘ। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। তুমুল হাওয়া। ফাঁকা ছাদে আলসের ধারে দাঁড়িয়ে বিপুল শহরের অন্ধকার দিগন্তের দিকে শূন্য চোখে চেয়ে থাকে সে। ভেজে। শীত করে।

উজানে যাবে কি নদী? আবার কি রচনা করা যাবে সব বিস্মৃত সম্পর্ক? নাকি ভুলে যাওয়া ভাল?

সে ঠিক বুঝতে পারে না। শুধু বুঝতে পারে, তার বুকের প্রকোষ্ঠে বড় গোপন একটা ব্যথা হয়। তার চোখে জল আসতে চায়। তার বুক ফাঁকা হয়ে যায় হাহাকারে।

অনেক রাত। বৃষ্টির তোড় বাড়ল সাজাতিক। হাওয়ায় প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কৃষ্ণজীবনকে। তবু সে শান্ত ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির অজস্র চাবুক খেল সারা শরীরে। এ যেন তার প্রায়শ্চিত্ত। এ যেন তার নানা অপরাধের গুণাগার। এ যেন মাটি ভুলে গিয়ে বৃক্ষের অনুতাপ।

একসময়ে তার শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল শীতে। হাত পা অসাড়, কান বধির, চোখ দৃষ্টিহীন হয়ে যাচ্ছিল প্ৰবল

উপর একসময় সিঁড়িতে শরীরের জল ছড়িয়ে ধীর পায়ে নিজের ফ্ল্যাটে নেমে এল সে। দরজা খুলল। গা মুছল। তারপর নিজস্ব স্টাডিতে বসে রইল চুপ করে। বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ল।

 ০২৩. বনগাঁয়ের জমাটি অঞ্চলে নয়

বনগাঁয়ের জমাটি অঞ্চলে নয়, খানিকটা দূরে, গরিব পাড়ায় তার দুঃখী ঘরখানা। উঠোন ছাপিয়ে বর্ষার জল ঘরে ঢুকতে চাইছে। কয়েক আঙুল মোটে বাকি। ঘরের মাটির ভিত গলে যাচ্ছে জলে। এখানে সেখানে গর্তের মুখ যাচ্ছে খুলে। সাপ, ইঁদুর, ব্যাঙ, উচ্চিংড়ে, বিছে ঢুকে পড়ছে। ঘরে। সারা দিন একরকম জলবন্দী হয়ে আছে তারা। বীণাবাণি আর নিমাই। শুধু বীণা জানে, যতটা দেখায়, ততটা গরিব সে আর নয়। জালার নিচে, মাটির গভীরে প্লাস্টিকে মোড়া অনেক ডলার।

লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। তাই বুঝি আজকাল তার অম্বল বেড়েছে তিনগুণ! হাতে পায়ে জোর নেই। অল্প পরিশ্রমেই হাফ ধরে। কড়ার নিচে ব্যথা হয়।

নিমাই আর সে কথা ফুরিয়ে ফেলেছে। ঘরে মাত্র দুটি প্রাণী, বাইরে দুৰ্যোগ, টানা বৃষ্টি, জল। যাত্রার রিহার্সাল বন্ধ, কোথাও যাওয়ার নেই। দুদিন তারা ঘর থেকে বেরোয়নি। আজ তৃতীয় দিনে সকালবেলাটা ভেজা, স্যাঁতনো। বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। নিমাই বসে আছে। দরজার কাছে। হাতে একটা কিঞ্চি। জল মাপছে। চৌকাটের নিচেই জল। বীণাবাণি বসে আছে তাদের স্যাঁত।ানো বিছানায়।

তিন দিন আগে রিহার্সালে গিয়ে সন্ধেবেলায় শুনল, রিহার্সাল হবে না। কাকার বাজারের ঘরখানা থমথমে। লোকজন নেই। কাকা বসে বসে লম্বা খাতায় পালা লিখছে।

এই শান্ত বিভোর চেহারাটা দেখে বোঝাও যাবে না যে, এর একটা অন্য চেহারাও আছে। সেই চেহারাটা কেমন তা অবশ্য বীণাবাণি জানে না। জেনে কাজও নেই। এই বিভোর চেহারাটাই সে মনে রাখতে চায়। অন্য চেহারাটার কথা ভাবলে তার ভয় করে। সেদিন ভোরবেলায় তার বাড়িতে গিয়ে যখন দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিল কাকা, তখন সেই অন্য চেহারার একটা ছায়া দেখেছিল বীণা। ধরা পড়লে কাকা তাকে কী করত? মারত? তাড়িয়ে দিত? ভগবান বাচিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন। কিন্তু তার পরও কয়েকটা দিন সে কাকার মুখোমুখি হলে ভীষণ অস্বস্তি বোধ করেছে।

কাকার সামনে একটা বেঞ্চে বসে বীণা চুপ করে চেয়ে ছিল।

কাকা খাতা থেকে মুখ না তুলেই বলে, কি খবর বীণা?

খবর আর কি? পালা কবে নামবে তাই ভাবি। বসে বসে আর ভাল লাগছে না।

কাকা মৃদু গলায় বলে, সময় হোক। এই বাদলার সময়টায় আমাদের খুব আকাল।

তা জানি। এ সময়টায় অন্য কোনও কাজ পেলে হত।

কেন, তোমার কি ঘরসংসারের কাজ নেই?

বীণা একটু লজ্জা পেয়ে বল, গরিবের সংসারের আর কত কাজ থাকবে বলো তো!

ছেলেপুলে হোক, তখন দেখবে কাজ করে কূল পাবে না।

বীণা মুখটা ঘেন্নায় ফিরিয়ে নিল। ছেলে।পুলের কথা এখন সে ভাবতেই পারে না। ওসব ঝঞাট আর পোষাবে না।

কাকা ভাঁড়ের চা আনাল।

বীণা চা খেতে খেতে বলল, অন্তত রিহার্সালটা হলেও একটু সময় কাটে।

জানি। সাত আটটা দিন বাদ দিয়ে রিহার্সাল ফের শুরু হবে। এখনও সেই ঝঞাটটা যাচ্ছে। তাই বন্ধ রেখেছি।

কোন ঝঞাট?

নতুন করে আর কী শুনবে! সবাই তো জানে। পগা খুন হওয়ার পর থেকে পাপা সিং নানা গণ্ডগোল পাকাচ্ছে, জানো না?

বীণার বুকটা ধক করে ওঠে। পগা নামটাই আজকাল তার শক্ৰ। সে আবছা শুনেছে বটে, পাপা সিং হল পগার মহাজন। বিরাট, পয়সা, দুর্দান্ত মানুষ। পগা ছিল তার বিশ্বাসী লোক। তার ওপর অতগুলো ডলার। আর পাউন্ড খোয়া যাওয়াতে লোকটা ক্ষেপে গেছে।

বীণা বিবৰ্ণ মুখে বলে, এখনও মেটেনি?

এগুলো মেটে কখন জানো? পাল্টি দু-একটা লাশ পড়ার পর। তার আগে নয়।

মা গো! বীণার ভিতরটা যেন অবশ হয়ে যায়। এ সবের জন্য কি সে-ই দায়ী?

বিবশ গলায় বীণা স্বগতোক্তির মতো বলে, খুন হবে!

কাকা চায়ের ভাঁড়টা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে বলে, সেরকমই মনে হচ্ছে। মনটা তাই ভাল নেই।

বীণা সম্মোহিতের মতো কাকার দিকে চেয়ে থাকে অপলক। এ লোকটা তার অন্নদাতা, এ লোকটা তার শরীর চায়নি। কথাৎ, এ লোকটা তাকে পাঁচজনের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। আজ এর বিপদের সময় কি বীণার কিছু স্বর্থত্যাগ করা

বীণা সামান্য হাফসানো গলায় বলে, পাপা সিং কী চায় বলো তো!

কাকা বাইরের দিকে চেয়ে থেকে মৃদু গলায় বলে, কি আর চায়। ডলার আর পাউন্ডগুলো ফেরত চায়, তার বিশ্বাসী লোকের খুনের বদলা চায়।

বনগাঁ তোমার এলাকা, এখানে ও লোকটা তোমার কী করতে পারে?

কাকা ম্লান হেসে বলে, ওসব বাইরে থেকে মনে হয়। হিসেবটা অত সহজ নয়। এই এলাকায় বহু লোক আছে যারা দু-চার হাজার টাকায় দু-তিনটে খুন হাসতে হাসতে করে যাবে। পাপা সিং-এর অনেক টাকা।

বীণার বুকটা হিম হয়ে গেল কথাটা শুনে। সে কাকার দিকে অর্থহীন চোখে চেয়ে থেকে স্বলিত গলায় বলে, আমার ভয় করছে কাকা। কী হবে তাহলে!

কাকা উদাস চোখে বীণার দিকে চেয়ে বলে, দুনিয়াটা বড় কঠিন ঠাঁই বীণা। আমার রাস্তায় সবসময়েই বিপদ।

বীণা দুর্বল গলায় বলে, মিটমাট করে নেওয়া যায় না?

কাকা বিষণ্ণ মুখে বলে, মিটমাট করতেই তো চেয়েছিলাম। খুনটা যারা করেছে, তারা দুজন আমার ডান হাত আর বঁ: হাত। তারা এখন ফেরার। ফলে কাজ-করবার বন্ধ হওয়ার মুখে। আমাকে মুশকিলে পড়ে যেতে হয়েছে। তারা খুব কাজের ছেলে ছিল। মিটমাট করে ফেলতে পারলে দুজন ফিরে এসে কাজে হাত দিতে পারত। কিন্তু পাপা সিং বিগড়ে আছে। শুনছি। এখানে অনেকের সঙ্গে কথাটথা বলছে, প্রায়ই আসছে, যাচ্ছে। কিন্তু আমার সঙ্গে আর দেখা করছে না; তাইতেই বুঝতে পারছি যে একটা কিছু করবে। ভয়টা পাপা সিংকে নয়, ভয় এখানকার ছেলে-ছোকরাব্দের; এদের মধ্যে অনেকেই পগার বন্ধু ছিল। তারা পাপার সঙ্গে গা ঘষাঘষি করছে।

এ কথায় আরও বিহ্বল হয়ে গেল বীণা। লটারিওয়ালা পল্টও তো পগার বন্ধু ছিল। পল্ট কি জানে? পল্টকে যেন আজকাল কেমন কেমন লাগছে বীণার। মুখে তেমন কিছু বলছে না, কিন্তু যেন একটু ইশারা ইঙ্গিত দিচ্ছে। পগা কি সেই রাতে ওকে কিছু বলে গিয়েছিল। পল্টু কি পাপা সিংকে বলে দেবে?

বুকের ভেতরটা এমন তোলপাড় করতে থাকে যে, একটা ব্যথাই চাগাড় দিয়ে ওঠে যেন। বীণা উঃ বলে মুখে হাতঢাকা দিয়ে শক্ত হয়ে থাকে কিছুক্ষণ।

কাকা একটু উদ্বেগের গলায় বলে, কি হল তোমার? অম্বলের ব্যথাটা নাকি?

বীণা একটু থিম ধরে থেকে মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ।

তাহলে বাড়ি চলে যাও। চা না খেলেই পারতে। অম্বলের অসুখে চা-ফা খেতে নেই।

অম্বলের ব্যথার চেয়েও অনেক বড় ব্যথা ঘনিয়ে আসছে বীণার কপালে। ঠাকুর না করুন, কাকা যদি খুন হয়, তাহলে বীণার ভাত জুটবে না। আলেয়ার মতো মিলিয়ে যাবে যাত্রার মদির মায়াময় আলোর রোশনাই। দর্শকের হাততালি। এই একটা লোকের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার অদৃষ্ট। আষ্টেপৃষ্ঠে।

মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছিল তার। একথা ঠিক যে, যাত্রায় নেমে তার আরো দুটো হাত গজায়নি বা টাকা পয়সার ছড়াছড়িও হয়নি। তবে পায়ের নিচে একটু দাঁড়ানোর মতো জমি পেয়েছে, আর ভবিষ্যতের একটি রঙিন ছবি টাঙাতে পেরেছে চোখের সামনে। সব যাবে। কাকা। যদি যায়, তো সব ভেসে যাবে বীণার। উঠে যাবে বিশ্ববিজয় অপেরা। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো মানুষ এ যুগে তো বেশী নেই!

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে বীণা। মাথাটা এমন হয়ে আছে যে, পরিষ্কার করে কিছু ভাবতেই পারছে না। তার মন প্রম্পটারের মতো বলছে, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। কাজটা ঠিক হচ্ছে না।

বীণা শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করতে পারল, অনেক কষ্ট করে বলতে হল যেন। ধরা গলায় বলল, তাহলে কি হবে। কাকা?

কাকা তার দিকেই চেয়ে ছিল। বলল, সেটা নিয়েই তো ভাবছি। তবে ঝঞাট তো আর চিরকাল থাকবে না। এই দেখ, এবার নিজে পালা লিখছি। মনের মতো করে। খুব জাকজমক করে নামাবো। প্রথম শো করব কলকাতায়। কলকাতাকে দেখিয়ে দিতে হবে যে, মফস্বলেও ভাল জিনিস হয়।

কথাগুলো বীণার কানে ঢোকে, কিন্তু তাকে চেতিয়ে তুলতে পারে না। সে বিহ্বলভাবে চেয়ে থাকে শুধু। কাজটা সে ভাল করছে না। তার জন্যই যদি খুনখারাপি হয় তবে সেই পাপ কি তাকেও অর্শাবে না? তার চেয়েও বড় কথা, পল্টু যদি বলে দেয়? পল্টু যদি শক্ৰতা করে?

বীণা দুর্বল শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, আসি কাকা।

এসো। কয়েকদিন বিশ্রাম করে শরীরটা ঠিক করে নাও। আট দশ দিন বাদে রিহার্সাল শুরু হবে।

বীণা বেরিয়ে আসে। রাস্তায় পড়ে একটু এগিয়ে যেতেই পল্টুর লটারির দোকানটা চোখে পড়ে। লোডশেডিং-এ হ্যাজাক জেলে বসে আছে। দু-তিনটে ছেলেছোকরা আড্ডা দিচ্ছে।

পা ভারী লাগছিল বীণার। পল্ট শক্রিপক্ষের লোক কিনা তা সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু দিদি বলে ডাকে, ভদ্র ব্যবহারও করে। আবার এমনভাবে তাকায় যে, নানা সন্দেহে বুকটা দুরদুর করে ওঠে বীণার।

একটু দূর থেকেই বীণা অভিনয়ের গলায় বলল, এই পল্টু!

পল্টু হাজাকের আলো থেকে অন্ধকারে ভাল দেখতে পেল না তাকে। চোখটা হাত দিয়ে আড়াল করে বলল, কে! বীনাদি?

হ্যাঁ।

কি খবর?

খবর তো তোর কাছে। আমার টিকিটে প্রাইজ উঠেছে কিনা দেখেছিস?

পটু হাসল, তোমার আর লটারির প্রাইজের দরকার কী?

বীণার কয়েক সেকেন্ড লাগল কথাটা বুঝতে, তারপর হঠাৎ তার মনে হল, এ-কথাটার দু নম্বর একটা অর্থ আছে। বুকটা কেঁপে গেল। গলাটা শুকিয়ে গেল।

পল্টু খুব হালকা গলায় বলল, আর একটা টিকিট নেবে? এক কোটি টাকা প্ৰাইজ। খেলা পরশু!

না, আজ নয়।

ছেলেগুলো না থাকলে বীণা পটুর সঙ্গে একটু কথা বলত। আর কথা বাড়াল না সে, বাড়ি ফিরে এল। তখন নিমাই ঘরে ছিল না। বীণা ঘরে এসে আলো জ্বেলে ঠাকুরের আসনে একটু ধূপ দীপ জেলে, জল বাতাসা দিয়ে চুপ করে বসল। বিছানায়। অনেক ভাবতে হবে তাকে এখন। ভেবে একটা কিছু ঠিক করতে হবে।

বীণা চোখ বুজে। সব ঘটনাটা মনে মনে ঝালিয়ে নিল। বৃষ্টির মধ্যে পগার আসা, চলে যাওয়া। তারপর তার খুনের খবর। তারপর অনেক কিছু। সেই থেকে বীণার জীবনে শান্তি নেই। বুকে শব্দ হয়, মনে সবসময়ে ভয়-ভয় ভাব। তার তেমন অন্তরঙ্গ আর বিশ্বাসী কেউ যদি থাকত, তাহলে তাকে সব বলে, পরামর্শ নিতে পারত বীণা। কিন্তু কেউ নেই তার। নিমাই আছে বটে। কিন্তু ও বড় বেশী সৎ আর বোকা। শুনলেই চোঁচামেচি করবে, ভয় খাবে, টাকা ফিরিয়ে দিতে বলবে। কে জানে, হয়তো পাঁচজনকে বলেও বেড়াবে।

সেদিন কলকাতায় গিয়ে বড়দাকে পেলে খুব ভাল হত। বিদেশী টাকা দিয়ে স্বদেশী টাকা নিয়ে আসতে পারত। তা ठूल क्रा।

এখন তার কী করা উচিত? কাকাকে যদি বাঁচাতে হয় তবে বান্ডিলটা তার ফেরত দেওয়া উচিত। গল্প একটা বানিয়ে বললেই হবে। তাই কি করবে। বীণা?

তার ততদূর হিসেবনিকেশ জানা নেই, যাতে কত ডলার। আর পাউন্ডে কত টাকা হয়, তা হিসেব করে দেখবে। আসলে কত পাউন্ড আর ডলার বান্ডিলে আছে তাই সে আজ পর্যন্ত ভাল করে গুনে দেখেনি। তবে অনেক আছে। ভাঙালে যা হবে তাতে সারা জীবন চলে যাবে বীণার। শুধু চলেই যাবে না, আরও কিছু বেশীই ভাল থাকতে পারবে তারা। কাকার হাত-তোলা হয়ে, অন্নদাস হয়ে থাকতে হবে না। তাদের। উদ্ধৃবৃত্তি শেষ হবে।

নিমাই একটু বেশী রাতেই ফিরল। হাবড়ায় গিয়েছিল। কীর্তন করতে। ভাত খেতে বসে বলল, আজ তোমাকে খুব ভাবিত দেখাচ্ছে।

ভাবিত! তাহলে আমার মুখের দিকে তাকাও মাঝে মাঝে?

নিমাই হেঁ হেঁ করে বিনয়ী হাসি হেসে বলে, শোনো কথা! তোমার চন্দ্ৰবদনটি ছাড়া আর কোনও মেয়েমানুষের মুখের দিকে তাকাই নাকি কখনও?

মাঝে মাঝে তাকালেই পারো। কেউ তো বারণ করবে না। তাতে একঘেয়েমিটাও কমবে।

খুব হাসল নিমাই। হেসে-টেসে বলল, এ মুখ কি একঘেয়ে হয়। কখনও! নিত্যি নতুন লাগে যে।

ভালবাসারই কথা, তবু বীণার ভিতরটা যেন রি-রি করে কথাটা শুনে। বলে, আর মুখের গুণ গাইতে হবে না। খাও। তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে।

নিমাই একবার বীণার মুখের দিকে চেয়ে বলে, খারাপ কথা নাকি? গুরুচরণ কিছু?

ধরো তাই।

নিমাই খেয়ে উঠল। আঁচিয়ে এসে বিছানায় মশারির মধ্যে বসল। দুজন।

নিমাই মুখখানা খুব গন্ত্রীর করে বলল, বলো বীণাপাণি।

বীণা নিমাইয়ের দিকে চেয়ে রইল। হ্যারিকেনের আলোয় মুখটা খুব আবছা। কিন্তু ওই মুখ এবং ওই মুখের পিছনে চরিত্রটাকে বীণা খুব ভাল করে চেনে।

একটু আদুরে গলায় সে বলে, আচ্ছা, এটা যে কলিকাল তা তো জানো!

নিমাই হেসে বলে, শোনো কথা! এটা কোনও গুরুচরণ ব্যাপার হল?

দাঁড়াও, কথাটা তো এখনও ফেদে বসিনি। বলছি, তুমি কলির ধর্ম মানো কিনা!

কলির তো ধর্ম নেই। সবই অধর্ম। দু চারজন যারা ধাৰ্মিক, কলির শেষে তারাই টিকে থাকবে, বাদবাকি সব ফৌত হয়ে যাবে।

ফৌত একদিন সবাই হবে। সাধুও হবে, চোরও হবে। সত্য ত্রেতায় কি কেউ মরেনি নাকি?

তা অবশ্য ঠিক। তবে কিনা

দাঁড়াও। তোমার মতো অতটা না জানলেও আমি কিন্তু রামায়ণ মহাভারত অনেক শিখেছি। পৌরাণিক পালার পার্ট করি। অনেক ভাল কথা জানা আছে। আমাকে যা খুশি বোঝাতে পারবে না।

নিমাই সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে বলে, সে আর বলতে! তুমি অনেক শিখেছে। এ কদিনে।

তাই বলছি, কলিযুগের ধর্মটা হল বেঁচে থাকা। তাই নয়?

নিমাই মাথা চুলকে বলে, প্রথমেই বড্ড পায়তারায় ফেলে দিলে। আসল কথাটায় আসছে না।

আসল কথাটা তোমার মাথায় ঢোকাতেই আজ বাসর বসিয়েছি। বুঝলে?

বুঝেছি। এবার বলো।

বলি, ওরকম সাধু-সাধু ভাব করে থাকলে কি আমাদের পেট চলবে? নাকি টিকে থাকা যাবে?

টিকে তো আছি। চালেও যাবে। দোকানটা বসাতে পারলে আর চিন্তা নেই। এখানে সবাই আমাকে ভাল লোক বলে জানে।

বীণা একটু হেসে তরল গলায় বলে, তুমি কেমনতরো ভাল লোক? তোমার বউ তো যাত্ৰা থিয়েটার করে বেড়ায়। তাহলে তুমি ভাল লোক হলে কিভাবে? লোকে বলে, তুমি একজন যাত্রাওয়ালীর স্বামী। আর সবাই জানে যাত্রাওয়ালীর স্বামী মানেই একটা মেরুদণ্ডহীন লোক।

নিমাই একটু চুপ করে থেকে হতাশ গলায় বলে, কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়। তবে বাজে লোকের কথায় কিই বা আসে যায় বলো।

বাজে লোক হোক, আর যাই হোক, লোকে বলে তো?

লোকের মুখ বন্ধ করতে চাও নাকি?

চাই। আমার অভিনয়ের নেশা আছে বটে, এরকমভাবে আর থাকতে ইচ্ছে করে না। একটু ভালভাবে থাকলে বেশ হত।

নিমাই মাথা চুলকে বলে, প্রসঙ্গটা ধরতে পারছি না। কলিযুগ নিয়ে শুরু করেছিলে। কথাটা কোথায় দাঁড়াল?

আমার মাথায়। আচ্ছা হাঁদারাম বাবা!

নিমাই ভারি। কাচুমাচু হয়ে বলে, কথাটা যে বড্ড সাঁটে বলছো। ভাল করে বুঝতে পারছি না। জানোই তো, আমি বড় বোকাসোকা মানুষ।

অত বোকা হলে কি কাজ হয় বাপু? কলিযুগটা বোকাদের জন্য নয়।

তাই দেখছি।

শোনো, এ যুগে একটু পাপ-টাপ করলেও ভগবান ক্ষমা করে দেন। বুঝতে পারলে?

নিমাই পারল। উজ্জ্বল হয়ে বলল, তা ক্ষমা করবেন না কেন? তিনি যে পতিতপোবন! পাপীকে উদ্ধারের জন্যই আসেন। তবে কথাটা হল, পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। পাপ করলে লোকে পথভ্ৰষ্ট হয়। প্ৰায়শ্চিত্ত হল পুনরায় চিত্তে গমন।

ও বাবা! প্ৰায়শ্চিত্তের কথা আসছে কেন?

আসবে না? পাপ করলে অনুতাপ, খ্যাপন এইসব করতে হয়।

তোমাকে নিয়ে আর পারি না। আচ্ছা, এই যে আমি যাত্ৰা-টাত্ৰা করি, এটাও তো পাপা! নাকি?

নিমাই একটু ধন্ধে পড়ে বলে, পাপ করলেই পাপ। নইলে নয়।

ধরো যদি আমি লটারিতে টাকা পাই, সেটা কি পাপ?

না তো! পেয়েছো নাকি?

না গো! তবে যদি ওরকমই কোনও পড়ে।-যাওয়া টাকা কখনও পেয়ে যাই, তাহলে কি সেটা নেওয়া অধৰ্ম হবে? তোমার মন কি বলে?

নিমাই ফাপড়ে পড়ে বলে, এ তো গাছের মগডালে জল। টাকাটা পাচ্ছে কোথায়?

ধরো, যদি পাই?

আমি তো বাপু কিছু বুঝতে পারছি না। বড্ড গণ্ডগোলে ফেলে দিচ্ছে। আমাকে!

আমি তোমার আপনজন তো!

একশোবার।

কথাটা মনে রেখো। পাপে-তাপে, দোষে-ঘাটে, আমি কিন্তু সর্বদাই তোমার আপনজন।

খুব ঠিক কথা।

আমাকে কখনো ঘেন্না কোরো না পাপী বলে।

শোনো কথা! বলে নিমাই খুব হাসল।

সে রাতে বেশ একটু ভালবাসাবাসি হয়েছিল তাদের মধ্যে। একটু বেশী মাখামাখি। কিন্তু বীণা তবু সাহস করে কবুল করতে পারেনি। নিমাইয়ের ওপর সে নির্ভর করতে পারে না। বড্ড ভয় হয়। লোকটা ধর্মভীরু, লোকটা বড় দুর্বল। এসব লোক ভাল হলে কি হয়, এরাই বিপদ ডেকে আনে।

আজ বর্ষাকাতর দিনে, তিন দিন বাদেও বীণা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তার সামনে সবটাই ভারি আবছা, ভারি সন্দেহজর্জরিত। বুকে বুকজোড়া ভয়।

তার কি বুকের ব্যামো দাঁড়িয়ে যাবে?

নিমাই মুখ ফিরিয়ে বলল, ড়ুবল গো!

কী ড়ুবল?

আর এক আঙুল বাকি। জল ঢুকছে।

হাঁড়িকুড়ি, বাক্স-প্যাঁটরা যেটুকু আছে তাদের সব ওপরে তোলা, উনুন জ্বলেনি। বীণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ড়ুবুক। সব

 ০২৪. কাউকে কোনও উপলক্ষে ফুল দেওয়া

কাউকে কোনও উপলক্ষে ফুল দেওয়া একদম পছন্দ নয়। আপার। একমাত্র পুজোর সময় ছাড়া। ঐ একটা ব্যাপারে তার দুর্বলতা আছে। তবে ঠাকুরপুজোয় ফুলও খুব বেশী দেওয়া উচিত বলে সে মনে করে না। সামাজিক অনুষ্ঠান বা শোকের সময় যে সব ফুল ও মালা দেওয়ার প্রথা আছে সেটা তার কাছে ফুলের অপমান বলে মনে হয়। তবু আজ। আপা এক গোছা রজনীগন্ধা নিয়ে অনীশদের বাড়িতে এল সকালে।

কাকাবাবু, আপনি তো খুব ভাল আছেন দেখতে পাচ্ছি। একদম যুবক দেখাচ্ছে আপনাকে!

মণীশ হেসে বলে, থাক, আর তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে বলতে হবে না।

আপা এ বাড়িতে আলো-হাওয়ার মতো অবারিত আসে যায়। একখানা চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসে বলল, আমি মিথ্যে কথা বলতে পারি না যে!

মণীশ এ মেয়েটিকে খুব পছন্দ করে। মমতা মাখানো চোখে মেয়েটির রোগা মুখখানার দিকে চেয়ে বলল, মিথ্যে বলো না তা জানি। তবে ভুল দেখছো। কয়েকদিনেই তো আমার মনে হচ্ছে বুড়িয়ে গেছি।

একদম নয়। শুনুন, শরীরবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছমাংস না খেলে এ রোগটা কম হয়। আপনি ননভেজ ছেড়ে আমার মতো পুরো ভেজ হয়ে যান।

মণীশ হাসল, সেটা পরে ভেবে দেখব। এখন ডাক্তার কড়া হুকুম দিয়েছে, রোজ একটা করে ছোট্ট মুগীর সুরুয়া খেতে হবে।

মুর্গীদের কপাল খারাপ!

আচ্ছা, তোমার হাতে ফুল কেন? কোথাও যাচ্ছ ফুল নিয়ে!

জিব কেটে আপা বলে, এ মা, এ তো আপনার জন্যই এনেছি। অভ্যাস নেই বলে দিতেই ভুলে গেছি। এই নিন।

মণীশ ফুলের গোছাটা নিয়ে একটু গন্ধ শোকার চেষ্টা করে বলে, এসব ভদ্রতা আবার করতে গেলে কেন? তুমি তো আমার মেয়ের মতোই। আচ্ছা, কলকাতার রজনীগন্ধায় গন্ধ থাকে না কেন বলো তো! রজনীগন্ধায় তো বেশ চড়া গন্ধ হওয়ার কথা।

বাসী ফুলে কি গন্ধ থাকে বলুন! কলকাতায় ঢুকলেই সব জিনিসের গন্ধ হারিয়ে যায়, গুণ হারিয়ে যায়, চরিত্র হারিয়ে

মণীশ খুব হাসল, বলল, তুমি রীতিমতো ফিলজফার হয়ে উঠছে দিনকে দিন। তোমার নতুন অ্যাডভেঞ্চার এখন কী হচ্ছে বলো তো!

আপা একটু কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, হল না তো। আমি এভারেস্ট এক্সপিডিশান যাওয়ার একটা প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। ওরা জবাবই দিল না।

কারা?

একটা দেশী দল।

তুমি কখনও পাহাড়ে উঠেছো?

না তো! কিন্তু সুযোগ দিলে প্রথম বারেই ঠিক উঠে যেতাম।

উঃ, কী পাগল তুমি!

আমি সবসময়ে বড় কিছু করার কথা ভাবি। আমার মনে হয়, পৃথিবীর যে কোনও শক্ত কাজই আমি পেরে যাবো। কিন্তু বাড়ির আর সবাই কোথায়? কাকিম, অনীশ, অনু, ঝুমকি দিদি! এখন সকাল আটটা বাজছে। বাড়ি চুপচাপ কেন?

বুবকা বোধ হয়। সকালে জগিং করতে গেছে। ঝুমকির জুর। অনু একটু বেলা অবধি ঘুমায়। আর কাকিমাকে বোধহয় টয়লেট বা রান্নাঘরে পাওয়া যাবে।

বুবকা জগিং করছে শুনে খুশি লাগছে। ও আপনাকে এত ভালবাসে যে, আপনার অসুখের সময় ও একদম পাগলামতো হয়ে গিয়েছিল।

জানি। হি ইজ নট গ্রোয়িং টু অ্যাডাল্টহুড। একদম শিশুকাল থেকে আমার ন্যাওটা। আমি যদি হঠাৎ মারা-টারা যাই তাহলে যে ওর কী হবে!

আপনি ওকে কেন এত দখল করে আছেন কাকাবাবু? সেই জন্যই তো ও এত পলকা, টক করে ভেঙে যায়।

মণীশ এবার হাসল না। মাথাটা নেড়ে বলল, ঠিক বলেছো। ছেড়ে দিতে ইচ্ছেও করে, আবার ভয়ও পাই। সমাজটা কি রকম তা তো জানো। ড্রাগ, গার্লস, মদ, খারাপ লোক। তার ওপর পলিটিক্স আছে, গুণ্ডামি আছে, সন্ত্রাস আছে, অ্যাকসিডেন্ট আছে।

এবার আপা হাসে, ওইসব ভেবে ভেবেই বুঝি আপনার অসুখ হল! সমাজটা খারাপ বটে, কিন্তু আমাদের তো এর মধ্যেই ঝটপট দিয়ে, একটু সাফসুরত করে থাকতে হবে! নাকি!

তুমি খুব স্বাধীন, না?

আমাকে কে আটকে রাখবে বলুন! আমার বাবা সকাল থেকে রাত অবধি টাকা রোজগার করে। মার সারাদিন পুজোপাঠ। আমার দুটো দাদা ক্যারিয়ার নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। আমি একটু একা, তাই স্বাধীন। সারা দিন শহর চষে বেড়াই, অবশ্য যখন স্কুলটুল থাকে না।

অত ঘুরে বেড়াও তাহলে এত ভাল রেজাল্ট করো কী করে?

হয়ে যায়। আমি বেশী পড়িও না। যখন পড়ি তখন গল্পের বই-ই বেশী পড়ি।

তুমি যে আমার কাছে একটা বিস্ময়, সেটা জানো?

আপা হাসল, বন্ধুরা অনেকে ওকথা বলে। আসলে আমি তো ক্যারিয়ারের কথা ভেবে পড়ি না। পড়ি প্রাশন থেকে। তাই একবার পড়লেই সব বুঝে যাই।

তোমার মাথা তাহলে খুবই পরিষ্কার।

খুব মাথা নেড়ে। আপা বলে, মোটেই তা নয় কাকাবাবু। আমার মাথায় যে রাজ্যের আজেবাজে চিন্তা। আমি সব সময়ে ভাবি। আর ঘুরি। ঘুরি। আর ভাবি।

এত ঘোরো কেন আপা?

আমি দেশটাকে বুঝবার চেষ্টা করি। এত দুঃখী মানুষ আর কোনও দেশে নেই। ভাতে দুঃখী, ভাবে দুঃখী, চিন্তায় দুঃখী, কল্পনায় দুঃখী, কাজে দুঃখী। আমি বুঝবার চেষ্টা করি।

তুমি দারুণ মেয়ে। একদিন কি তুমি দেশের প্রধানমন্ত্রী-টন্ত্রী হবে নাকি? হলে আমি অবাক হবো না কিন্তু।

দূর! প্রধানমন্ত্রী হয়ে কী হবে? মন্ত্রী-টন্ত্রীরা কি এসব লোকের কাছাকাছি আসতে পারে? তারা তো এসকর্ট নিয়ে ভি আই পি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রধানমন্ত্রী হলে আমি মরেই যাবো।

তাহলে কি মাদার টেরিজার মতো হতে চাও?

সবেগে মাথা নেড়ে। আপা বলে, মা টেরিজার কথা মনে হলেই আমি ভারি লজ্জা পাই।

মণীশ অবাক হয়ে বলে, লজ্জা পাও! কেন বলো তো?

লজ্জা পাবো না? মা টেরিজা একজন মেমসাহেব। কতদূর থেকে এসে তিনি কলকাতায় দুঃখী আতুরের সেবা করছেন, তাই না? সাহেবদের সঙ্গে আমরা কোন ব্যাপারেই পারি না। অলিম্পিকে পারি না, বিজ্ঞানে পারি না. শিল্পে পারি না, সভ্যতায় পারি না, কিন্তু সেবাটুকু তো পারতে পারতাম! তাই না কাকাবাবু? সেবা তো সহজ কাজ ছিল, তার জন্ম গায়ের জোর, কসরৎ বা মেধার দরকার হয় না। কিন্তু সেটাও একজন মেমসাহেবের কাছ থেকে শিখতে হচ্ছে কেন? আসলে শিখছিও না, মা টেরিজা নিজের কাজ করে যাচ্ছেন, আর আমরা আমাদের মতো দিব্যি শুয়ে বসে আছি।

বিষণ্ণ মুখে মণীশ বলে, তুমি বোধ হয় ঠিকই বলছে আপা। এ দেশের জন্য কারও কিছু করার নেই।

ওটা কথা নয় কাকাবাবু। আসলে দেশটাকে বুঝে ওঠাই খুব শক্ত। কেউ তো সে কাজ করেনি; বুঝতে হলে গোটা দেশটা পায়ে হেঁটে ঘুরতে হবে। প্রত্যেক জায়গার লোকজনকে চিনতে হবে, শুনতে হবে অনেকের অনেক দুঃখ আর সমস্যার কথা। অনেক সময় লাগে, অনেক কষ্ট করতে হয়। কার মাথাব্যথা আছে বলুন!

মণীশ এই বাচ্চা মেয়েটার দিকে শ্রদ্ধাপুত চোখে চেয়ে থেকে বলে, এর চেয়ে অবাক-করা কথা আমি বহুকাল শুনিনি। তোমার মধ্যে দারুণ প্যাশন আছে আপা। তুমি বোধ হয় একটা কিছু করবে। খুব বড় কিছু। অল মাই গুড উইশেস।

আপা লাজুক হেসে বলে, কাকাবাবু, শুভেচ্ছা খুব ভাল। আরও ভাল কী জানেন?

কী বলো তো! আবার বোধ হয় তুমি চমকে দেবে আমাকে! মনে রেখো, আমার হার্ট কিন্তু জখম। এমন কিছু বোলো না যাতে হার্ট ডিগবাজি খায়।

আপা খুব হাসল। বলল, না, সেরকম কিছুই নয়। আমি বলতে চাই শুভেচ্ছার চেয়ে বেশী দরকার সহযোগিতা। কোঅপারেশন। আমার সঙ্গে একদিন পায়ে হেঁটে ঘুরবেন?

ও বাবাঃ! মরে যাবো যে!

আপা মাথা নেড়ে বলে, কিছু হবে না। প্রত্যেকটা মানুষই আলাদা আলাদা গল্প। যত জানবেন তত মজা। মিন্টো পার্কের কাছে দেখবেন যখন ট্র্যাফিকে গাড়ি থামে। তখন একটা লোক রেড ক্রসের কোটো ঝাকিয়ে পয়সা চায়। আর একটা লোকও এ কাজ করে চৌরঙ্গীর মোড়ে। আমি দুজনকেই পাকড়াও করেছিলাম। ওরা কেউ রেড ক্রসের লোক নয়। আসলে ওভাবেই ভিক্ষে করে। এ দেশে যার যা আছে বা নেই। সবাই সেই আছে বা নেইকে একটা ব্যাপারেই লগ্নি করতে চায়। সেটা হল ভিক্ষে। যার একটা হাত নেই সে সেই নেইটাকে ভিক্ষের কাজে লাগায়। ভিক্ষে করতে কে আমাদের শেখাচ্ছে জানেন? আমাদের সরকার। সরকার নিজেই পৃথিবীতে সবচেয়ে নির্লজ্জ ভিখিরি। এ দেশে। কত সম্পদ আছে, কোথায় কী পাওয়া যায়, আমাদের সত্যিকারের অভাব কতখানি তা কেউ খুঁজে দেখেনি আজ অবধি। খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে, আমাদের দেশে রিসোর্সের অভাব নেই। শুধু খুঁজে দেখা হয়নি, এই যা।

মণীশ চোখ বুঝে কিছুক্ষণ ভোবল। তারপর স্বগতোক্তির মতো বলল, অথচ তোমার তো আঠেরোর বেশী বয়স নয়, তাই না। আপা?

আপা সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমি একটু বেশী পাকা, না কাকাবাবু? আমার মাও সেই কথাই বলেন।

এ বয়সে এতটা ভার মাথায় নিয়েছে, তোমার সাহস তো সাজঘাতিক।

আমি আরও অনেক বেশী ভার নিতে চাই।

তুমিই বোধ হয় আমাদের ভাবী প্রধানমন্ত্রী!

ঠাট্টা করছেন কাকাবাবু?

না। আপা, ঠাট্টা করছি না। তুমি আমাকে সবসময়েই অবাক করে দাও। এইসব কথাগুলি তোমাকে কেউ শেখায়নি তো। আপা? তুমি কি নিজে ফিল করো?

খুব ফিল করি। কাকাবাবু। এত বেশী করি যে, আমার জীবনে একটুও শান্তি থাকে না। মাথা এত গরম হয়ে যায় যে, রাতে ঘুম আসতে চায় না।

মণীশ দুঃখিত মুখে বলল, তোমার তুলনায় আমার ছেলেমেয়েরা কত নাবালক আর নাবালিকা রয়ে গেছে।

আপা গম্ভীর মুখ করে বলে, আজকাল সব ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলারাই নিজেদের ছেলেমেয়েকে বোতলবন্দী করে রাখতে চায়। তাদের দোষও নেই। সমাজে নানারকম দূষণ বাড়ছে তো। কিন্তু মুশকিল হল, চারদিকে দূষণ বেড়ে গেলে তার কিছুটা ঘরের মধ্যেও ঢুকে পড়বেই। ঘরের পাশে বেড়াল মরে পড়ে থাকলে ঘরে পচা গন্ধ আসবে না? আবর্জনা জমে থাকলে মশা মাছি তো তার কিছুটা ঘরেও ছড়িয়ে দিয়ে যাবে। যাবে না, বলুন?

হ্যাঁ আপা।

আমাদের বাড়ির কাছেই একজন মাতাল থাকে। মদ খেলেই সে ভীষণ গালাগাল করে। কখনও একে, কখনও ওকে। আমাদেরও মাঝে মাঝে গালাগাল করেছে। আমরা নাকি তামিলনাড়ু থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গকে লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছি। আমার মা আর বাবা ভয় পেয়ে ওদিককার জানালা বন্ধ রাখত। কিন্তু আমি বুঝলাম, ওটা কোনও প্রতিকার নয়। আমি সেই মাতালটার সঙ্গে আলাপ করে ফেললাম। সে বস্তির লোক, গরিব, চোর এবং রাগচটা। প্রথমটায় ভোব করতে চায়নি, সন্দেহ করেছিল। তার বউ, ছেলে আর মেয়েরাও একটু কেমন যেন অ্যাগ্রেসিভ টাইপের। তবু আমি লেগে রইলাম। এক মাস ধরে রোজ গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করতাম, জিজ্ঞেস করতাম তারা কেমন আছে। একটু একটু করে ভাব হয়েই গেল। আমি লোকটার কাছে অনেকবার জানতে চেয়েছি, সে কেন সবাইকে গালাগাল করে। লোকটা জবাব দিতে পারেনি। তখন বুঝতে পারলাম, ওর রাগটা বিশেষ কারও ওপর নয়। ওর মনটাই বিগড়ে গেছে। মদ খেলেই ভিতরের নানারকম জমেথাকা বিষ গালাগাল হয়ে বেরিয়ে আসে। তখন আরাম পায়। খুব সহজ লোক, ওকে বুঝতে অসুবিধে হয় না। এখন সে আমার খুব বন্ধু।

তাকে মদ ছাড়াতে পেরেছো?

আপা মাথা নাড়ে, না কাকাবাবু। ওটা ছাড়া সোজা কথা নয়। চেষ্টা করছি। বিষ-মদে কত মানুষ মারা যায়। সে সব বলেছি। কিন্তু ওরা তো বিষকে ভয় পায় না, মরে যাওয়াকেও নয়। কিভাবে ছাড়াবো বলুন তো!

তা বটে।

তবে এখন আর গালাগাল দেয় না। ঘরে বসে মাতাল অবস্থায় গজগজ করে খানিকক্ষণ, তারপর ঘুমোয়।

তোমার মতো বুকের পাটা কম মানুষেরই আছে। আমার বাসার পাশেই তো বস্তি, কই আমার তো কখনও ওখানে ঢোকার ইচ্ছেই হয়নি।

ওটাই তো আমাদের মুশকিল। আমরা সব জায়গা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিই, প্রত্যাহার করে নিই। মনে ভাল ভাল ইচ্ছে থাকে, কিন্তু সেগুলো করি না।

তুমি কি আমাকে বকিছো?

না তো কাকাবাবু! ছিঃ, বকিবো কেন? আপনি দারুণ মানুষ একজন।

বকলেও দোষ নেই আপা। তুমি যে খুব নতুন কথা বলছে তা নয়, কিন্তু যেটা বড় কথা তা হল, তুমি যা বলো তা প্র্যাকটিসও করো। আমরা করি না।

আমি আপনাকে অনেকক্ষণ যন্ত্রণা করছি।

না না, আমার খুব সেলফ পিটি হচ্ছে ঠিকই, তবে তোমার কম্পানি খুব ভালও লাগছে। ডোরবেল বাজল নাকি? ওই বোধ হয় বুবকা এল!

বুবকাই। সাদা টি শার্ট, কালো শর্টস, পায়ে দৌড়োনোর জুতো। ঘর্মাক্ত, হাঁফাচ্ছে। ঘরে ঢুকেই মণীশের দিকে চেয়ে বলে, কেমন লাগছে। বাবা? আরে আপা! কখন এলে?

অনেকক্ষণ। বকে বকে কাকাবাবুর মাথা ধরিয়ে দিলুম।

অনীশ এসে সাবধানে তার বাবার বিছানায় একটু আলগোছে বসল। পাছে ধাপ করে বসলে খাটের ঝাঁকুনিতে হাৰ্টবিট বেড়ে যায়। মণীশের। তারা সবাই এখন অত্যধিক বাবা-সচেতন। মণীশের হাতটা নিজের সবল হাতে ধরে নাড়ীটা একটু বুঝবার চেষ্টা করল সে। তারপর বলল, মনে হয় সবই ঠিক আছে, না বাবা?

মণীশ ছেলের মুখের দিকে তৃষ্ণার্তা চোখে চেয়ে থেকে বলে, ঠিকই আছে। ভাবছিস কেন? আপা কত ফুল নিয়ে এসেছে দেখ, তোর মাকে বল সামনের ঘরে সাজিয়ে রাখতে।

ফুল! বলে অবাক হয়ে অনীশ আপার দিকে তাকায়, তুমি ফুল এনেছো নাকি? এ তো ভাবা যায় না।

আপা সামান্য লজ্জা পেয়ে বলে, ফুলটা আজ পাগলামি করে কিনে ফেললাম। কাকাবাবুকে একটু ইমপ্রেস করব বলে।

আমি খুব ইমপ্রেসড আপা। থ্যাংক ইউ।

কাকাবাবু, আপনার কি হাঁটাচলা বারণ?

মণীশ মুখটা একটু বিকৃত করে বলল, ডাক্তারদের কথা আমি কিছু বুঝতে পারি না। বলেছে ফুল রেস্ট। তার মানে শুয়ে থাকা কিনা আমি জানি না। তবে আমার এইসব অফশুটরা আমাকে শুইয়েই রেখেছে। এমন কি পাশ ফিরতে অবধি দিচ্ছে না। সাতদিন এভাবে থাকলে আমাকে বোধ হয় পাগলাগারদে পাঠাতে হবে।

আপনার নিজের কেমন লাগছে?

খুব উইক, কিন্তু উঠতে বা একটু-আধটু চলাফেরা করতে কোনও অসুবিধে নেই।

তাহলে উঠে পড়ুন তো! চলুন ডাইনিং টেবিলে বসে একটু কালো কফি খাবেন।

বুবকা ভ্রূ কুঁচকে বলে, খুব ডাক্তার হয়েছো, না? মাথা-ফাতা ঘুরে গেলে কি হবে?

আপা একটা ছোট্ট ধমক দিয়ে বলে, চুপ করো তো! আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে মস্ত এক হার্ট স্পেশালিস্ট থাকেন। আমি প্রায়ই তাকে অ্যাসিস্ট করি। কত কিছু জানি, তুমি ধারণাও করতে পারবে না। রুগীকে রুগী বানিয়ে ফেলে রাখা মানে জানো? বিশেষ করে যারা হার্ট পেশেন্ট! একজরশান না করে যতদূর সম্ভব নরমাল রাখতে হয়। তোমরা কাকাবাবুকে জড়ভরত বানাতে চাও নাকি? আপনি উঠন তো কাকাবাবু।

মণীশের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে বলে, তোমার কাকিমারও একটু পারমিশান নিয়ে এসো। নইলে হয়তো রাগ করে কথা বন্ধ করে দেবে। বেশী শুয়ে থাকলে তো বেডসোরও হয়, না? কথাটা কাকিমাকে বোলো, যাও।

একটু বাদে যখন ডাইনিং টেবিলে তারা কফি ইত্যাদি নিয়ে বসল। তখন অপর্ণা বেজার মুখে বলল, আমার বাড়িতে এত অসুখবিসুখ যে কেন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। একজনকে বাড়ি নিয়ে আসতে পারলাম তো মেয়েটা জ্বরে পড়ল। বুকে সাজঘাতিক কনজেশন, জ্বর এখনও নামেনি। এত টেনশন যাচ্ছে।

তার কথাটাকে কেউ কোনও গুরুত্বই দিল না। হয়তো শুনতেই পেল না কেউ। অনু তার বাবার কানে কানে কী বলছে তার খুব হাসছে দুজনে। আপা আর অনীশ খুব নিবিষ্টভাবে ওদের পড়াশুনোর বিষয়ে কিছু বলছে। টেবিলে অপর্না আলাদা এবং একা। কিন্তু বরাবরই কি সে একা নয়? এ বাড়িতে তার তিন ছেলেমেয়ে আর ওদের বাবা যখন একসঙ্গে থাকে তখন অপর্ণা স্পষ্ট বুঝতে পারে, ওরা এক দলে। সে আলাদা। সে আউট অফ দি সার্কল। বর্জিত, অবহেলিত, উপেক্ষিত।

অথচ অপর্ণা কি প্ৰাণপাত করে দিচ্ছে না। সংসারের পিছনে? সে কি খরচ হয়ে যাচ্ছে না, ক্ষয় হচ্ছে না। এই তার আপনজনদের জন্য? ওরা কখনও কেউ কেন গুরুত্ব দেয় না। তাকে? রান্নাঘরের বাইরে কি তার কোনও ভূমিকা নেই?

সে চারজনের দিকেই চাইল। না, তাকে কেউ লক্ষ করছে না। পাত্তা দিচ্ছে না। সে খামোখা বসে আছে। এখানে। খুব হঠাৎ করে অভিমান হল অপর্ণার। নিঃশব্দে সে নিজের কাপটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে এল।

হ্যাঁ, এইটেই তার সঠিক জায়গা। এখানেই তাকে মানায়। ভাবতে ভাবতে চোখে জল এল অপর্ণার। কত ভালবেসে সে বিয়ে করেছিল মণীশকে। কত ভালবাসার ভিতর দিয়েই না এল তাদের তিন সন্তান। টুক-টুক করে বড় করে তোলা ওই তিনজন কেন তার দিকে ফিরেও চায় না? মণীশই কি আজকাল আগের মতো গুরুত্ব দেয় তাকে? খুব ভাল হয় এখন যদি অপর্ণা মরে যায়। তাহলে ওরা হাড়ে হাড়ে বুঝবে অপর্ণা কে ছিল, কী ছিল ওদের সংসারে।

কেন যে তার মতো বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন মহিলার আজকাল এত অভিমান হয়! কেন ষে সহজেই চোখে জল চলে আসে! অপর্ণা তার টলটলে জলভরা চোখে রান্নাঘরের জানালা দিয়ে তেতো পৃথিবীটার দিকে চেয়ে রইল। উথলানো ডালের জল পড়ে গ্যাস নিবে যাচ্ছে, তবু গা করল না।

ক্ষীণকণ্ঠে একটা ডাক বাতাসে পাখির ডাকের মতো ভেসে এল, মা!

রান্নাঘরের পাশেই ঝুমকির ঘর।

ডাকটা শুনল অপর্ণা। নড়ল না। ডাকুক গে।

আবার ডাকটা এল, মা! ও মা!

অপর্ণা চোখ মুছে গম্ভীর মুখে দরজায় এসে দাঁড়ায়, কী বলছিস?

ঝুমকি একেই রোগা। অসুখে যেন বিছানায় মিশে গেছে। নিজের মাথাটা চেপে ধরে বলে, একটু কাছে এসে বসবে?

কেন?

এসো না। কাছে একটি বোসো। আমার কাছে কেউ কেন কখনও আসো না বলো তো!

কাকে চাই? অপর্ণ গম্ভীর গলাতে বলে।

তোমাকে।

অভিমানটা এবার ফেটে পড়ল জল-বেলুনের মতো, আমাকে! আমাকে আর তোমাদের কী দরকার? আমি তো এ বাড়ির কাজের লোকের চাইতে বেশী কিছু নয়।

ঝুমকি রোগা মুখে এবার হাসল, ঝগড়া হয়েছে বুঝি!

মোটেই ঝগড়া হয়নি। কী দরকার বলো, গ্যাসে রান্না চড়ানো।

গ্যাস নিবিয়ে দিয়ে এসো।

অত সময় নেই। বরং তোমার বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।

বাবা! বাবা কি উঠেছে?

বাইরের ঘরে বসে চা খাচ্ছে।

ঝুমকির মুখটা আলো হয়ে গেল, গুড নিউজ মা। তাহলে তোমার মুখ ওরকম ভার কেন?

মোটেই ভার নয়। কাজ আছে। তোমার বাবাকে ডাকছি।

বাবাকে আকণ্ঠ ভাল