হেমকান্তর মুখ একটু বিবর্ণ দেখাতে লাগল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কোকাবাবুর পরিবারের আভিজাত্য আছে। কিন্তু পরিবারটার মধ্যে কেমন যেন মায়াদয়া কম। কোকাবাবু যখন মারা যাচ্ছিলেন সেই সময় শরৎ পাখি মেরে বাড়ি ফিরল। সে কী উত্তেজনা!
রঙ্গময়ি বলল, ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। খবর পেয়েছি, শরৎ বিলেত যাচ্ছে। বিয়ে-টিয়ে করবে না।
কে বলল তোমাকে?
কৃষ্ণ। শরতের সঙ্গে সেদিন পাখি শিকার করতে গিয়েছিল, মনে নেই? সেদিনই কথা হয়েছে।
হেমকান্ত ভ্রু কুঁচকে বললেন, কৃষ্ণের সঙ্গে শরতের এত ভাব কী করে হল বলল তো!
বন্দুক! তোমার ছেলের দিনরাতের ধ্যান-জ্ঞান এখন বন্দুক।
বন্দুক! ও বাবা!
ও বাবা আবার কী? বন্দুক কি নতুন কিছু নাকি?
হেমকান্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন রঙ্গময়ির দিকে। তারপর বলেন, বন্দুক ওকে ছুঁতে না দেওয়াই ভাল, মনু। বাঘ যদি রক্তের স্বাদ পায়—
০৩২. থানায় যাওয়ার আগে ধ্রুব
থানায় যাওয়ার আগে ধ্রুব কয়েক মিনিট সময় নিয়েছিল। রওনা হয়েও ফটকের ওপাশ থেকে ফিরে এল। পুলিশ অফিসারটিকে বাইরের ঘরে বসিয়ে খুব দ্রুত রেমির হাত ধরে টেনে আনল শোওয়ার ঘরে। চাপা জরুরি গলায় বলল, সোরাব-রুস্তম! বুঝলে! সোরাব-রুস্তম!
রেমি বুঝল না। দিশাহারা হয়ে ধ্রুবর মুখের দিকে চেয়ে বলল, তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে? তোমাকে!
ধ্রুব একটু ফিচেল হাসি হেসে বলল, তুমিও তো এরকমই একটা কিছু করবে বলেছিলে! বলোনি, থানায় যাবে?
বলেছি। কিন্তু সত্যিই তো আর যেতাম না।
তুমি যাওনি, কিন্তু অন্য একজন গেছে। ফল একই।
কে গেছে?
বললাম যে, সোরাব-রুস্তম।
তার মানে কী?
বসে বসে ভাবো, ঠিক বুঝতে পারবে।
না পারব না। আমার মাথা গুলিয়ে গেছে।
মিনিস্টারের বাড়িতে পুলিশ তার ছেলেকে ধরতে আসে, ব্যাপারটা এদেশে একটু অস্বাভাবিক নয় কি?
রেমি মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ। শ্বশুরমশাই থাকতে—
শ্বশুরমশাইয়ের মুখখানা ভাল করে লক্ষ করেছ?
খুব বিচলিত মনে হচ্ছিল।
বিচলিত ঠিক নয়, একটু নার্ভাস। তবে সেটা পুলিশের ভয়ে নয়।
তবে?
আমার ভয়ে।
তোমার ভয়ে? তোমাকে উনি ভয় পান নাকি?
এমনিতে পান না। কিন্তু পচা শামুকেও তো পা কাটে।
বুঝলাম না।
তোমার আই কিউ অ্যাভারেজের চেয়ে কম।
বুঝিয়ে বলল, তোমাকে উনি ভয় পাবেন কেন?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, থাক না, সবটুকু আমি বুঝিয়ে নাই-বা দিলাম। আমি থানায় যাচ্ছি, তুমি বসে বসে বরং ধাঁধাটার জবাব খুঁজে বের করো। ধাধাটার সূত্র একটাই, সোরাব ভারসাস রুস্তম।
থানায় কি এখন তোমাকে আটকে রাখবে?
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, আরে না। আটকানোর আইনই নেই। তবে রাতটা ইন্টারোগেশনের নামে কাটিয়ে দিতে পারে। চলি, গুডনাইট।
ধ্রুব ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পিছু পিছু রেমি।
ধ্রুব ঘর থেকে বেরিয়েই বাঁ দিকে বাইরের ঘরে যেতে দুপা এগিয়েই হঠাৎ থমকে গেল। তারপর আচমকা পিছু ফিরে রেমিকে বলল, ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দাও। তুমি কিছু দেখোনি, কিছু শোনোনি।
রেমি আঁতকে উঠে বলে, তার মানে? কী করবে তুমি?
ধ্রুব চাপা গলায় বলল, ঘরে যাও রেমি। মজাটা আর-একটু জমিয়ে দিই। যাও, কেউ জিজ্ঞেস করলে কিছু বোলো না। বোলো, তুমি জানো না।
রেমি কম্পিত বুকে দরজা বন্ধ করল।
পরমূহুর্তেই দরজায় টোকা পড়ল আবার।
রেমি! রেমি!
রেমি দরজা খুলে বলে, কী গো?
হাতের কাছে একটা ব্যাগ-ট্যাগ কিছু আছে?
আছে।
গোটাকয়েক শাড়ি আর যা পারো গুছিয়ে নাও। আমারও গোটাকয়েক জামাপ্যান্ট। কুইক! প্রশ্ন কোরো না। সময় নেই।
রেমি উদভ্রান্তের মতো পাগলের আদেশ পালন করল। দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যেই গোছানা হয়ে গেল। কারণ ধ্রুবর ট্যুর থাকে বলে একটা ফাইবারের সুটকেস গোছানোই থাকে। রেমি শুধু নিজেরটা গোছাল। দরজায় ধ্ৰুব পাহারা দিচ্ছে।
রেমি বুঝতে পারছিল, ধ্রুব তাকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছে এবং সেটা খুব বিধিসংগতভাবে যাচ্ছে। সম্ভবত শ্বশুরমশাই খবরটা জানবেন না এবং বাইরের ঘরের পুলিশ অফিসারও কিছু টের পাবেন না। সাধারণ অবস্থায় রেমি নিশ্চয়ই ধ্রুবর এই প্রস্তাবে রাজি হত না। কিন্তু এখন তার মনের অবস্থা স্বাভাবিক নয়। সকাল থেকে তার চারদিকে এমন সব ঘটনা ঘটছে যে তার মাথা গুলিয়ে গেছে। এই অ্যাডভেঞ্চার হয়তো সে মনে মনে চাইছিল।
সুটকেস আর ব্যাগটা হাতে নিয়ে ধ্রুব পিছনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পিছু পিছু রেমি। চাকরবাকররা দেখল, কিন্তু কেউ উচ্চবাচ্য করল না। তারা ধ্রুবকে চেনে।
পিছন দিককার ছোট্ট বাগানের ফটক দিয়ে বেরোলে একটা গলি পাওয়া যায়। নোংরা গলি। কখনও রেমি এ গলিতে পা দেয়নি। গলিটা পেরিয়ে রাস্তায় উঠে ধ্রুব চট করে একটা মিটার নামানো ট্যাকসিকে ধরল। এ তল্লাটের ট্যাকসিওয়ালারা ধ্রুবকে মোটামুটি চিনে রেখেছে। তারা বেগরবাই করে না।
হাওড়া স্টেশনে এসে ধ্রুব মাত্র আধ ঘণ্টার প্রয়াসে পুরীর দুটো বার্থ রিজার্ভ করে ফেলল।
ট্রেনে ওঠার পর রেমি দম নিচ্ছিল। এইরকম হুটোপাটা করে কোথাও যাওয়া তার জীবনে এই প্রথম। বিবাহিত জীবনে শ্বশুরমশাইয়ের অনুমতি না নিয়ে ঘর থেকে বেরোনোও এই প্রথম। কাজটা কেমন হল তা সে বুঝতে পারছে না।
ধ্রুব ফার্স্ট ক্লাসের টিকিটই করেছে, কিন্তু কল্পে নয়। আরও দুজন যাত্রী আছে। তারা প্রবীণ এক দম্পতি। তাদের তুলে দিয়ে যেতে ছেলেমেয়ে নাতিনাতনিরা এসেছে। কামরায় বেশ ভিড়।
