কৃষ্ণ আর বিশাখা ছাড়া আজ নিকটাত্মীয়েরা কেহই আমার নিকটে নাই। পুত্রেরা বিষয়কর্মে ব্যস্ত, কন্যারা ঘর-সংসারে ড়ুবিয়া আছে। আমি তাহাদের দোষ দিই না। মাঝে মধ্যে কর্তব্যবশে এক-আধখানা পত্র তাহারা লেখে, উহাই আমার কাছে যথেষ্ট। আমার এখনকার জীবনযাপনে এগুলি অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে। তথাপি ঝড় থামিবার পর আজ যেন মনে হইল, আমি বড় একা। আজ স্ত্রী বাঁচিয়া থাকিলেও বোধহয় এরূপই মনে হইত।
কেন বলো তো? এই রহস্যময় একাকিত্বের উৎস কী?
ঝড় যখন আসিল তখন আমার ভৃত্য আমাকে গৃহাভ্যন্তরে লইয়া যাওয়ার চেষ্টা করিয়াছিল। আমি যাই নাই। সেই অপরূপ ঝড়ের সঙ্গে তখন শুভদৃষ্টি হইতেছে, যাই কী করিয়া?
যখন ঝড় থামিল তখন দেখি আমার আরামকেদারা ছিটকাইয়া কোথায় সরিয়া গিয়াছে। রবিবাবুর গ্রন্থটির হদিশ নাই। আমি মুহ্যমান অবস্থায় পড়িয়া আছি। ভৃত্যটি সিঁড়িঘরের নিরাপত্তায় আশ্রয় লইয়াছে। ভাগ্য ভাল, পলাইয়া যায় নাই।
অভিমান নহে। ঝড়ের নিসর্গদৃশ্য যত সুন্দরই হোক, তাহার ভয়াবহতাও কম নহে। একটা বিপদ ঘটিতে পারিত। তথাপি কেহ আমাকে জোর করিয়া ঘরে টানিয়া আনে নাই বা আমার বিপদের ভাগ লইবার জন্য আমার সহিত অবস্থান করে নাই।
বোধহয় এই সামান্য ঘটনা হইতেই আজ বড় নিঃসঙ্গতা অনুভব করিতেছি।
এইবার কিছু কাজের কথা বলি। রাজেনবাবুর কথা নিশ্চয়ই ভুলিয়া যাও নাই। কর্মঠ, আত্মনির্ভরশীল মানুষ। ঢাকার বিক্রমপুরে ইহাদের বাড়ি। রাজেনবাবুর পুত্র শচীন ওকালতি পাস করিয়া আইন ব্যবসায় করিতেছে। তাহার সহিত বিশাখার বিবাহের একটি কথা চলিতেছে। সম্বন্ধটি কেমন হইল, তোমার মনোমত হইল কি না তাহা জানাইয়ো।
কিন্তু এই বিবাহের সম্বন্ধে অন্যরূপ একটা বিপদ দেখা দিয়াছে। লোক পরম্পরায় শুনিতেছি, আমার কন্যার নাকি এই পাত্র বিশেষ পছন্দ নয়। বড়ই বিস্ময় বোধ করি সচ্চিদানন্দ। যুগের হাওয়া পালটাইতেছে বটে, তা বলিয়া পনেরো বৎসবের একটি মেয়ের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের সমস্যা দেখা দিবে তাহা ভাবি নাই। আমিই তাহার মত নিতে আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু আশা ছিল, আমার মতের উপরে সে কথা কহিবে না। পনেরো বৎসর বয়সে কাহারও বিচারবুদ্ধি থাকে না। সুতরাং পিতামাতার বিচারবুদ্ধিই তাহাকে পথ নির্ধারণ করিতে সাহায্য করে। কিন্তু আমার হিসাব-নিকাশ কিছুই মিলিতেছে না।
আমি কি তাহার উপর জোর খাটাইব? না কি তাহার মতই মানিয়া লইব? কিছু স্থির করিতে পারিতেছি না। তুমি কি এ বিষয়ে আমাকে সাহায্য করিতে পারো?
এইসব সংকট সময়ে বড়ই মৃত স্ত্রীর কথা মনে পড়ে।-তোমার হেম।
সকালবেলায় রঙ্গময়ি একবার করে নিয়মিত এসে হেমকান্তর সঙ্গে দেখা করে যায়। কাজের কথা থাকলে তাও বলে। হেমকান্ত সকালের দিকটায় রঙ্গময়ির জন্য নিজের অজান্তেই কিছুটা প্রতীক্ষা করে থাকেন। আজও করছিলেন।
চৈত্রের শুরুতেই এবার কালবৈশাখীর দাপট দেখা দিয়েছে। কাল সন্ধেবেলায় তুমুল ঝড় বয়ে। গেল। গোয়ালের চালের টিন উড়ে গেছে। বাগানে বহুকালের পুরনো একটা কামরাঙা গাছ উপড়ে পড়েছে। ব্রহ্মপুত্রে দু-চারটে নৌকো ড়ুবেছে নিশ্চয়ই। এখনও অবশ্য খবর আসেনি, তবে ফি বছরই ডোবে। এছাড়া গাঁ-গঞ্জে, শহরতলিতে কী ঘটেছে তাও এখনও অনুমানের বিষয়। প্রজাদের অবস্থাই বা কী? অবস্থা যাই হোক, যে-কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়কেই তারা খাজনা না দেওয়ার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করায়। হেমকান্ত বিষয়চিন্তা করতে চান না, কিন্তু বিষয়চিন্তা তার ঘাড়ে চাপবেই। সরকারের খাজনা শোধ করতে তার দম বেরিয়ে যাচ্ছে। পুরো জমিদারি না হোক, এক-আধটা মহল বিক্রি করে দিলে কেমন হয়?
এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিলেন, এমন সময় রঙ্গময়ি এল।
কী খবর, মনু? কালকের ঝড়ে কী হল খবর পেলে?
আমি মেয়েমানুষ, কী খবর পাব? তুমি একটু ঘুরে সব দেখে এলেই তো পারো।
যাব-যাব ভাবছিলাম।
ভেবেই তোমার দিন যাবে।
মৌকো-চৌকো ড়ুবেছে নাকি?
ড়ুবেছে। তবে ব্রহ্মপুত্রে নয়, তোমার সংসারে।
এটা আবার কেমন হেঁয়ালি?
হেঁয়ালি হবে কেন? তোমার আদরের মেয়ে বেঁকে বসেছে, শচীনকে বিয়ে করবে না। তার কী করছ?
হেমকান্ত কার্পেটের ওপর মেরুদণ্ড সোজা করেই বসে ছিলেন, আরও টান হয়ে বললেন, কী করব বলল তো! ওর আপত্তি কীসের?
শচীনরা নাকি ভীষণ গরিব।
গরিব! শচীন গরিব হতে যাবে কেন? জমাট প্র্যাকটিস।
সে তোমার মেয়েকে বোঝাও গে।
আমি যে ওদের সঙ্গে কথা পেড়ে ফেলেছি।
রঙ্গময়ি বিরস মুখে বলে, বিয়ের কথা ওঠার পর থেকেই নানারকম আপত্তি তুলছিল। তোমাকে বলিনি, কারণ বললেই তুমি আকাশপাতাল ভাবতে শুরু করবে। কিন্তু এখন না বলেও তো উপায় নেই। মেয়েদের নিজস্ব মত থাকবে, তারা বিয়েতে আপত্তি তুলবে, এসব তো আমরা ভাবতেও পারি না।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, সেটা কথা নয়, মনু। আমি মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দিই। কিন্তু আপত্তি যদি থাকেই সেটা প্রথমেই বলেনি কেন?
তোমাকে বলতে হয়তো লজ্জা পেয়েছে।
শুধু গরিব বলেই আপত্তি?
ও তো তাই বলেছে। শচীনদের বাড়ি থেকে নাকি চেয়েচিন্তে নিত এ বাড়ি থেকে। কথাটা মিথ্যেও নয়। কিন্তু তাতে বিয়ে আটকায় কেন তা বুঝছি না।
আর কোনও কারণ নেই?
রঙ্গময়ি একটু দ্বিধায় পড়ে দোনোমনো করে বলে, আছে বোধহয়। ওর মনে হয় কোকাবাবুর নাতি শরৎকে পছন্দ।
শরৎ মানে যে পাখি মারে?
হ্যাঁ। শরৎ তো একজনই।
