তাহলে অনর্থক দুশ্চিন্তা করছেন কেন? আপনাদের মেয়ে যদি অসুখী হত তাহলে না হয় কিছু বলার থাকতে পারত।
কিছু বলছি না। যা বলছি সেটাকে বলতে পারো থিংকিং লাউডলি। তুমি বিবেচক ছেলে, নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না, বুঝতে পারছি না।
আড়াল থেকে রেমির মনে হচ্ছিল, এবার তার হস্তক্ষেপ করা উচিত। যদি সে দেরি করে তাহলে দুজনের মধ্যে আবহাওয়াটা খারাপ হয়ে যেতে পারে। সে দেখতে পেল, মা বাইরের ঘরে ট্রে নিয়ে ঢোকার মুখে দ্বিধায় পড়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
এ বাড়ির সকলেই ধ্রুবকে কী মারাত্মক ভয় পায় তা আজ ভাল করে বুঝতে পারে রেমি। ধ্রুবর জন্য খাবার আনতে গিয়েছিল জয়ন্ত। সেও বাইরের ঘর দিয়ে যায়নি। মা সামনে যেতে ভয় পাচ্ছে। বাবা কথা গুলিয়ে ফেলছে। আর ওই সুন্দর শয়তানটা সবই টের পাচ্ছে মনে মনে এবং উপভোগও করছে হয়তো।
যাবে রেমি? দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে রেমি থেমে গেল। মজাটা শেষ অবধি দেখবে নাকি! দেখাই যাক না।
মা ঘোমটা টেনে খুব সন্তর্পণে ভিতরে ঢুকলেন। ধ্রুব সসম্মানে উঠে দাঁড়াল বটে, কিন্তু প্রণাম-টনাম করল না। মা একটা টেবিলে সযত্নে খাবারের প্লেট আর চা সাজিয়ে সামনে টেবিলটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, একটু মুখে দাও বাবা।
ধ্রুব খাবারের প্লেটের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল একটু। তারপর বলল, আমি এসব খাই না।
একটু কিছু?
ধ্রুব মাথা নাড়ে, না।
মুখে অত্যন্ত সরল হাসি তার। কিন্তু মতামত স্পষ্ট এবং চূড়ান্ত। তার ওপর কেউ চাপাচাপি করতে ভরসা পায় না।
মাও পেলেন না। একটু অপ্রতিভ হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, কত কাল পরে এলে!
ধ্রুব একটু হাসল মাত্র। এসব কথার জবাব দেওয়ার প্রয়োজনই সে বোধ করে না।
মা পালিয়ে বাঁচলেন। রেমির হাসি পাচ্ছিল।
ধ্রুব আর-একটুক্ষণ বসে উঠবার চেষ্টা করে বলল, আজ আসি। আপনি বরং একটু সাবধানে থাকবেন। শরীরের বিশ্রামটাই সব নয়। মনটারও বিশ্রাম দরকার। কোনও দুশ্চিন্তা করবেন না।
দুশ্চিন্তাকে কি ঠেকানো যায় বাবা? জয়ন্তকে একবার ডাকি! সে বোধহয় বাড়িতেই আছে।
ধ্রুব ভ্রু কুঁচকে বলল, বাড়িতে থেকেও যখন সামনে আসছে না তখন বুঝতে হবে তার আসার ইচ্ছে নেই।
হয়তো লজ্জা পাচ্ছে।
পেতেই পারে। এখন তাকে জোর করা ঠিক নয়।
আমি চাই ও তোমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাক।
ধ্রুব খুব উদারভাবে হেসে বলে, আরে ওসব তো ফরমালিটি। ওর দরকার নেই।
তাহলে কী করব বলো তো?
একবার যেন সময় পেলে আমার কাছে যায়।
তোমাদের বাড়িতে?
ক্ষতি কী!
ঠিক আছে। যাবে।
ওকে বলবেন কোনও ভয় নেই। ধ্রুব কথাটা বলে একটু অপেক্ষা করল। তারপর বলল, ওকে সম্ভব হলে একথাটাও বলবেন। লোকে স্ক্যান্ডাল পছন্দ করে, শুনতে চায় এবং বিশ্বাস করে। কিন্তু একজন লোক সম্পর্কে ভাল কথা বলা হলে লোকে তা শুনতে বেশি আগ্রহ বোধ করে না। খুব কমন সাইকোলজি। তাই একবার একটা স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়লে সহজে সেটাকে পালটানো যায় না। কাজেই কারও সম্পর্কে খারাপ কিছু প্রচার করার আগে ভাল করে চিন্তা করা উচিত।
বলব বাবা। কথাটা খুবই সত্যি।
আমি আসি!
যাবে? রেমি যে এখানে আছে। ও তোমার সঙ্গে যাবে না!
ধ্রুব একটু গোমড়ামুখে বলে, আমি তো এখন বাড়ি ফিরব না।
ও, তাহলে এসো।
রেমি বাঘিনীর মতো বারান্দায় গিয়ে ওত পেতে রইল। ধ্রুব বেরোতেই ধরল।
কোথায় যাচ্ছ?
আরে কী খবর?
এমনভাবে বলল কথাটা ধ্রুব, যেন বহুকাল পরে কোনও চেনা মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে রাস্তায়।
খবর ভাল। কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছ?
কেন বলো তো?–অবাক হয়ে ধ্রুব জিজ্ঞেস করে, আজকাল আমার চলাফেরার হিসেব রাখছ নাকি?
রাখাই তো উচিত?
ধ্রুব হেসে বলে, ঠিক আছে বন্ধু, রাখো। আমি যাচ্ছি আড্ডায়। ফিরতে রাত হবে।
তোমার কোন বন্ধু এ বাড়িতে হামলা করেছে, তার নামটা বলবে?
কেন নাম দিয়ে কী হবে?
তুমি টেলিফোনে আমাকে বলেছিলে যারা হামলা করেছে তারা তোমার বন্ধু নয়।
বলেছিলাম। তখন জানতাম না।
এখন জানো তো। তার নাম বলো।
নাম জেনে কী করবে?
পুলিশে খবর দেব।
তা তো দিতেই পারে। কিন্তু ব্যাপারটা ঘটানো কি ঠিক হবে?
হবে। আমি ঘাঁটাতে চাই।
তুমি চাইলেও আমি আমার বন্ধুকে বিপদে ফেলতে চাই না।
তাহলে আমি তোমার নামেই পুলিশের কাছে ডায়েরি করব।
তাও ভাল। কেন, শ্বশুরমশাইকে জানাবে না?
জানাতে পারি, তবে উনি নিজের ছেলেকে কি আর জেল খাটাবেন?
তুমি নিজের স্বামীকে পারলে, উনিও পারবেন।
তিনি যা খুশি করবেন। তবে আমি পুলিশকে ব্যাপারটা জানাতে চাই।
ধ্রুব একটু গম্ভীর হয়ে বলে, রেমি, ছেলেমানুষি কোরো না।
আমি সব শুনেছি।
শুনতেই পারো। আমি কিছু লুকোচ্ছি না। তোমার বাবাকেও বলেছি।
এটা কি খুব একটা বীরত্ব? তোমার লজ্জা করল না কতগুলো থার্ড ক্লাস গুন্ডাকে নিজের শ্বশুরবাড়িতে হামলা করতে পাঠাতে!
আমি পাঠিয়েছি কে বলল?
তাহলে কে পাঠিয়েছে?
কথাটা এখানে আলোচনা না হওয়াই ভাল।
বাড়ি ফিরে হবে?
হতে পারে।
তাহলে বাড়ি চলো। আমি শুনতে চাই।
পরে হলে হয় না?
না। ব্যাপারটা আমি জানতে চাই।
ধ্রুব একটা শ্বাস ফেলে বলল, মাঝে মাঝে তুমি বড় কঠিন হয়ে যাও। আচ্ছা ঠিক আছে। চলো।
ধ্রুব বড় রাস্তায় এসেই একজন ট্রাফিক পুলিশকে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ট্যাকসি ধরে দিতে বলো। লোকটা পাঁচ মিনিটের মধ্যে ট্যাকসি দাড় করিয়ে দিল সামনে।
ধ্রুব বাড়ির দিকে গেল না। সোজা ময়দানের দিকে চালাতে বলো। একটু পরেই মত পালটে হুকুম দিল, পার্ক স্ট্রিট। রেমি গুম হয়ে বসে ছিল। এসব গ্রাহ্য করল না। গন্তব্য বড় কথা নয়, সে কথাটা শুনতে চায়।
