রেমি বিরক্ত হয়ে বলল, তুমি ওরকম কোরো না তো! আমি ওকে জানি। কিছু খাবে না।
না খাক, আমাদের ভদ্রতা তো করতে হবে।
লাভ নেই, মা।
লাভ-লোকসানের কথা নয়। দ্বিরাগমনের পর এই এল।
রেমি আর তর্ক করল না। অন্য একটা ঘর থেকে ভেজানো দরজার সামান্য ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগল ধ্ৰুবকে। সামনে গেল না। তার কারণ সে সামনে গেলেই ধ্রুব হয়তো ইচ্ছে করেই অন্যরকম, হয়তো-বা অভদ্র ব্যবহার করতে শুরু করবে। আড়াল থেকে দেখাই ভাল।
ধ্রুব শ্বশুরের বিছানার পাশে একটা চেয়ারে দিব্যি গা ছেড়ে বসে বলছিল, আপনার আগে কখনও হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?
না তো।
আপনার বয়স কত?
বাহান্ন পেরিয়েছে।
আপনার নর্মাল স্বাস্থ্য তো ভালই।
হ্যাঁ, এর আগে কখনও এরকম হয়নি।
আজ হল কেন? শুনলাম সকালে নাকি কয়েকটা গুন্ডা এসে আপনাকে শাসিয়ে গেছে?
কী দুঃসাহস! রেমি অবাক হয়ে গেল। কী স্বাভাবিক মুখ! নিপাট ভালমানুষ যেন!
রেমির বাবা বললেন, আর বলো কেন! আমি সাতে নেই, পাঁচে নেই, হঠাৎ একদল লোক একটা জিপগাড়িতে এসে
শুনেছি। আপনার মেয়ে আমাকে টেলিফোন করে সব বলেছে। ইন ফ্যাকট ওই দলে আমার একজন বন্ধুও ছিল।
রেমির বাবা একটু তটস্থ হয়ে বললেন, হ্যাঁ, ওরা তোমার বন্ধু বলেই বলছিল।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, সবাই নয়। একজন। বাদবাকিরা ঠিক বন্ধু নয়। তবে চেনা লোক। কী বলছিল বলুন তো!
সে আর তোমার শুনে কাজ নেই।
ধ্রুব একটু হেসে বলে, সব অ্যাকশনেরই একটা রি-অ্যাকশন আছে।
তার মানে?
ধ্রুব উদাস গলায় বলল, এরকম ঘটনা যখন ঘটে তখন খোঁজ করে দেখা ভাল যে, এর রুটটা কোথায়। রুট একটা আছেই। কোনও কিছুই খামোকা ঘটে না।
রেমির বাবা সকালের ঘটনায় প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন। জামাইয়ের এই উক্তিতে তিনি আর উচ্চবাচ্য করবার সাহস পেলেন না। সেডেটিভের ক্রিয়া চলছে। ঘুম-ঘুম চোখে জামাইয়ের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে চোখ বুজলেন।
রেমি শ্বাস বন্ধ করে দৃশ্যটা দেখতে লাগল।
রেমির বাবা চোখ খুলে বললেন, কোথাও কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে তা বুঝতে পারছি। কিন্তু ব্যাপারটা কী তা আমি আজও জানি না।
ধ্রুব মৃদু স্বরে বলল, আমিও জানি না।
বোধহয় একটা মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং! তাই না?
হতে পারে।
রেমির বাবা হাতটা বাড়িয়ে ধ্রুবর একখানা হাত ধরলেন। বললেন, আমি কনফ্রনটেশন চাই না। জয়ন্ত আমার ছেলে, তুমিও আমার ছেলে। জয়ন্ত যদি কোনও অন্যায় করে থাকে তবে আমি ওর হয়ে মাপ চাইছি।
ধ্রুব মৃদু একটু হেসে বলে, বয়োজ্যেষ্ঠ হয়ে বয়ঃকনিষ্ঠের কাছে মাপ চাওয়াটা দৃষ্টিকটু। আর আপনিই বা অন্য কারও হয়ে মাপ চাইবেন কেন? ওটা তো প্রোটোকল হয়ে গেল। যদি কেউ অপরাধ করেই থাকে তবে তাবই উচিত মাপ-টাপ চাওয়া।
জয়ন্তর ওপর তুমি রেগে আছো, ধ্রুব!
না, না।–মিষ্টি হেসে সুন্দর শয়তানটি বলল, ওর ওপর আমি রাগ করব কেন! প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব বিচারবোধ অনুযায়ি চলার অধিকার আমি স্বীকার করি। তবে তার পিছনে মেরুদণ্ড থাকা চাই।
ও যদি কিছু বলতেই চায় তাহলে তা জোরের সঙ্গে বলুক। কূটকচালি কি পুরুষের কাজ?
তুমি রেগে আছে। ও ছেলেমানুষ। মাপ করে দাও।
ধ্রুব খুব উদার গলায় বলে, মাপ করা শক্ত কী? তবে কেটাই তো আমি জানি না। ও কী করেছে বলুন তো!
রেমির বাবা ফাঁপরে পুড়ে বললেন, বোধহয় কূটকচালিই কিছু করে থাকবে। রেমি জানে। রেমিকে যদি একবার ডেকে জিজ্ঞেস করো।
যাক গে। পরে জেনে নেওয়া যাবে।
আমরা খুব ভয়ে-ভয়ে আছি।
ভয়ে-ভয়ে থাকবেন কেন? ভয়ের কী আছে?
তোমরা ভি আই পি মানুষ, তোমাদের ভয় নেই। আমাদের আছে।
আপনি এই অবস্থায় বড্ড বেশি দুশ্চিন্তা করে ফেলছেন। এটা কিন্তু ভাল নয়।
তাহলে কথা দাও জয়ন্তকে ওরা কিছু করবে না।
করলে তো করেই ফেলত। নিশ্চয়ই সে রকম ইচ্ছে ছিল না।
আবার যদি আসে?
সেই সম্ভাবনা যাতে দেখা না দেয় তার জন্য জয়ন্তরই চেষ্টা করা উচিত।
রেমির বাবার চোখে জল টলটল করছিল। বললেন, আমি বুঝেছি বাবা। জয়ন্তকে যা বলার আমি বলব। তুমি ভেবো না।
ধ্রুব উদাস গলায় বলল, আমি কখনওই ভাবি না। ছেলেমানুষ, কত কী করে ফেলতে পারে। জয়ন্তর বয়স কত হল বলুন তো!
বোধহয় একুশ।
হাই টাইম টু বি অ্যাডাল্ট। যাক গে, বয়সটা কোনও কনসিডারেশন নয়।
তুমি রাগ করে আছে। আমি বরং রেমিকে ডাকি, ও তোমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে পারবে।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলে, না না, তার দরকার নেই। কী হয়েছে না হয়েছে তা ডিটেলসে না জানাই ভাল। আমার শালা আমার সম্পর্কে আড়ালে কী বলে বেড়ায় তা জানার আগ্রহ আমার নেই। তা ছাড়া আড়ালেই যখন বলছে তখন আড়ালটা রাখাই তো ভাল।
ও তোমাকে এমনিতে খুব পছন্দ করে।
কার কথা বলছেন?
জয়ন্ত। দু-একটা কথা বুদ্ধির দোষে বলে ফেলেছে হয়তো, কিন্তু তোমার সম্পর্কে ওর ধারণা খুবই উঁচু। ও বলে, জামাইবাবু ইচ্ছে করলেই সাংঘাতিক কিছু করে ফেলতে পারে।
ধারণাটা বোধহয় ঠিক নয়।
না না, আমাদের ধারণা তাই। শুধু যদি রেমির বাবা থামলেন। ধ্রুব একটু ঝুঁকে মৃদু হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, শুধু যদি?
আমি তোমার শ্বশুর, পিতৃতুল্য— তাই বলছি— কতগুলো অভ্যাস যদি ছাড়তে পারতে ধ্রুব।
ধ্রুব থমথমে মুখ করে কিছুক্ষণ সামনের দেয়ালের দিকে চেয়ে রইল। তারপর শ্বশুরের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, আপনারা রেমির ব্যাপারে বোধহয় খুব হ্যাপি নন, তাই না!
সে কথা বলিনি। আমার তো মনে হয় রেমি বেশ সুখী।
