শেষ অবধি পার্ক স্ট্রিটও নয়। গঙ্গার ধার।
বেশ রাত হয়ে গেছে। গঙ্গার ধার এখন তেমন মনোরম কিছু নয়। একটা মোটামুটি নির্জন জায়গায় ট্যাকসি দাঁড় করাল ধ্রুব। তারপর ড্রাইভারকে হুকুম করল, যাও তো, একটু ঘুরে-টুরে এসো। আমরা কথা বলব।
ড্রাইভার একবারও গাঁইগুঁই না করে নেমে গেল।
ধ্রুব আচমকাই জীবনে এই প্রথম, রেমিকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে একটি তপ্ত চুমু খেল। অনেকক্ষণ ধরে। তারপর বলল, আমাকে তুমি একদম বিশ্বাস করো না, না?
চুমুতে কেমন বিভ্রান্ত হয়ে গেল রেমি। ভিতরে যে শক্ত জমি তৈবি হয়েছিল তা আবার বেনোজলে হয়ে গেল কাদামাটি। পিছল, ভীষণ পিছল। রেমি দাঁড়াতে পারে না তার ওপর।
ধরা গলায় সে বলল, করি।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে চেয়ে রইল অপরূপ পুরুষটির দিকে। এখনও এই পুরুষটির প্রায় সবটাই তার জানার বাইরে। এতদিন একসঙ্গে শুয়ে বসেও কেন এর রহস্য ভেদ করতে পারে না সে?
ধ্রুব বলল, যাবে পুলিশের কাছে? ধরিয়ে দেবে আমাকে?
রেমি দুহাতে আঁকড়ে ধরে ধ্রুবকে বলে, তুমি আমাকে ভালবাসো না কেন? কেন? কেন?
কে বলল বাসি না?
বাসো না, আমি জানি।
এটা কি কেউ তোমাকে বুঝিয়েছে?
না। বর ভালবাসে কি না তা বউ ছাড়া আর কে টের পাবে?
কী জানি। ভাবলাম আজকাল তো অনেকেই আমার সম্পর্কে তোমার কান ভারী করছে, ভালবাসার ব্যাপারেও করে থাকতে পারে।
করেনি।
শোনো রেমি, আমি চরিত্রহীন বা লম্পট নই।
রেমি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলে, ওসব শুনতে চাই না। জানি।
ধ্রুব মুখটা সরিয়ে নিয়ে বলে, জানা উচিত। কিন্তু সবচেয়ে যেটা স্যাড সেটা হল আমাকে নিজের মুখে কথাটা বলতে হচ্ছে। আমি যে চরিত্রহীন বা লম্পট নই ৩া তুমি ছাড়া আর কে বেশি জানবে?
জয়ন্ত ভুল করেছে।
ধ্রুব দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বলে, আমি একটা লড়াই লড়ছি। সেটা আমার ব্যক্তিগত লড়াই। খুব সাংঘাতিকও। সেটা লড়তে আমাকে হবেই। সেটার জন্যই আমার ভিতরে কিছু অস্বাভাবিকতা আছে। কিন্তু অন্য কিছু নেই।
আর কেউ না জানুক আমি জানি।
জানো? ঠিক তো!
বলছি তো। এখন ওসব কথা নয়।
ক্লান্ত স্বরে ধ্রুব বলে, কিন্তু প্রেমের কথা যে আমি বেশিক্ষণ বলতে পারি না।
বলতে হবেও না। শুধু ধরে বসে থাকো।
চমকার কাটল দিনটা রেমির। বাড়ি ফিরেও প্রেমটা নিঃশেষ হয়ে গেল না। বিছানায় অনেকক্ষণ মাখামাখি হল তাদের। রাত জেগে গল্প।
কিন্তু সকাল হল অন্যরকম।
ভবানীপুর থানার ওসি বিনীতভাবে অপেক্ষা করছিলেন বাইরের ঘরে। কৃষ্ণকান্ত ধ্রুবকে ডেকে পাঠালেন। রেমিও গেল পিছু পিছু।
কৃষ্ণকান্ত তার গম্ভীর গলায় বললেন, ইনি এসেছেন তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে।
ধ্রুব দারোগার দিকে দৃকপাতও করল না। শুধু অপলক চোখে কিছুক্ষণ কৃষ্ণকান্তর দিকে চেয়ে রইল।
কৃষ্ণকান্ত চোখ সরালেন। বললেন, কোথায় কার বাড়িতে একটা হামলা হয়েছে। সেই ব্যাপারে।
বলে উঠে গেলেন কৃষ্ণকান্ত।
ও সি বললেন, ব্যাপারটা খুব অস্বস্তিকর, ধ্রুববাবু। ঘটনাটা ঘটেছে আপনার শ্বশুরবাড়িতে।
তাতে আপনার বন্ধুরাও ইনভলভড।
তাই নাকি?–ব্যঙ্গের স্বরে প্রশ্ন করে ধ্রুব।
০৩১. হেমকান্ত জীবনে অনেক সৌন্দর্য দেখেছেন
হেমকান্ত জীবনে অনেক সৌন্দর্য দেখেছেন, কিন্তু চৈত্রের শুরুতেই এক বিকেলে যে কালবৈশাখী এল তার মতো সম্মোহনকারক আর কিছুই হয় না।
হেমকান্ত রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার বই পড়ছিলেন ছাদে বসে। রোদ পড়ে গেলে ছাদটি আজকাল মনোরম। একটু থম ধরা ভাব ছিল চারধারে। বাতাস ছিল না। ঠিক এই সময়ে আচমকা একটা কুচুটে বাতাস বইতে লাগল। সেই বাতাসে প্রেতের শ্বাসবায়ু মিশে আছে, টের পেলেন হেমকান্ত। বাল্যকাল থেকেই ঝড়ের অভিজ্ঞতা তাঁকে অনুভূতিশীল করেছে। ফরফর করে কোলে রাখা বইটির কয়েকটা পাতা উলটে গেল। পাম গাছে হাহাকার বেজে উঠল। চোখ তুলে হেমকান্ত দূরে দিগন্তে এক অতিকায় কৃষ্ণবর্ণ মেঘস্তম্ভকে দেখতে পেলেন। ঘূর্ণমান এক কালান্তক চেহারা সেই স্তম্ভের। আকাশে রোদ ছিল তখনও। সেই আলোয় দেখা গেল, বহু ওপরে ঘুড়ির মতো কী যেন সব ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘুড়ি নয়, হেমকান্ত ভাল করে দেখার জন্য হরিকে ডেকে দুরবীনটা আনতে বললেন।
হরি দুরবীন নিয়ে এসে বলল, ঘরে যাবেন না কর্তামশাই? ভীষণ ঝড় আসছে।
হেমকান্ত শুধু বললেন, হুঁ।
দুরবীন লাগিয়ে দেখলেন, বহু দূরে আকাশের গায়ে টিনের চাল উড়ছে কয়েকটা। আরও কিছু জিনিসও আছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। অতিকায় সেই মেঘস্তম্ভের মাথার দিকটা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। ডাইনির চুলের মতো। বাতাসে একটা তীব্র চাপা গুমগুম শব্দ আসছে। কোথায় ঝলসাচ্ছে মেঘ! ব্রহ্মপুত্রের কালো জলে হঠাৎ তুমুল এক আলোড়ন ওঠে।
বাতাস শরীরী নয়। কিন্তু হেমকাও হঠাৎ টের পেলেন, বাতাস তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। এক অদৃশ্য পালোয়ানের মতো শক্তিমান বাতাসের ধাক্কায় কয়েক হাত পিছিয়ে গেলেন হেমকান্ত। হড়-হড় করে তীব্র বাতাস ঢুকে যাচ্ছে ফুসফুসে। দম নিতে পারছেন তো ছাড়তে পারছেন না। শ্বাসকষ্ট হতে থাকে তাঁর।
হরি সিঁড়িঘরের কাছ থেকে দৌড়ে এসে তাঁকে ধরে।
কর্তামশাই, ঘরে চলুন।
এক ঝটকায় তার হাত ছাড়িয়ে দেন হেমকান্ত। ঘরে যাবেন কী? এই অপার্থিব দৃশ্য ছেড়ে কি কোথাও যাওয়ার উপায় আছে!
চোখের সামনেই মাঝদরিয়ায় একটা বেসামাল নৌকোকে নিশ্চিত ভরাড়ুবির সঙ্গে লড়াই করতে দেখতে পান তিনি। মস্ত এক ঢেউয়ের মাথায় চড়ে নৌকোটা এক ঘূর্ণি বাতাসের ঝাপটায় পাক খেয়ে ঘুরে পড়ে গেল নীচে। আবার উঠল।
