হেমকান্ত উঠতে গিয়েও টলে আবার বসে পড়লেন।
কেউ কিছু বলার আগেই মনুপিসি এসে তার হাত ধরে প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে গেল ঘরে।
কোথায় গিয়েছিলি?
পাখি শিকার করতে। শরৎদার সঙ্গে।
পাখি শিকারের বয়স তোর হয়েছে?
এই দেখো না, ঘুঘু মেরে এনেছি। নিজের হাতে।
শরৎকে পেলি কোথায়?
ওদের বাড়িতে।
ও ডাকল আর তুই চলে গেলি?
শরৎদা ডাকেনি তো! আমিই গিয়েছিলাম।
কাল রাতে তোকে বিশাখা মেরেছিল?
তোমাকে কে বলল?
বিশাখা সকাল থেকে কেঁদে কেঁদে ঘর ভাসিয়ে ফেলল তোর জন্য। কেবল বলছে, ও তোকে মেরেছিল বলেই তুই চলে গেছিস। আর ফিরবি না।
কৃষ্ণকান্ত মৃদু একটু হেসে বলল, আর বাবা?
বাবার কথা কি তুই ভাবিস?
খুব ভাবি।
তোর বাবা সকাল থেকে জলস্পর্শ করেননি। পরে সব শুনব। যা, স্নান করে আয়। ভাত খেয়ে একটু ঘুমো।
বাবা রাগ করেনি তো পিসি?
রঙ্গময়ি মাথা নেড়ে ধরা গলায় বলে, রাগ করার মতো অবস্থা ছিল নাকি কারও? তোর খোঁজই নেই সকাল থেকে। সকলেরই বুকে ধুকধুকুনি।
কেন? শরৎদাদের সহিস আমার ঘোড়া দিয়ে যায়নি?
না। তাহলে তো নিশ্চিন্ত হওয়া যেত।
কৃষ্ণকান্ত জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে বলল, পিসি, দিদি কেন শচীনদাকে বিয়ে করতে চায় না বলো তো!
তা কে জানে!
শচীনদা বলল, ছোড়দির সঙ্গে নাকি শরৎদার বিয়ে হবে। কিন্তু শরৎদা তো বিয়েই করবে না।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, শরৎদা খনিজ বিদ্যা শিখতে বিলেত যাচ্ছে। তারপর সোলজার হবে।
রঙ্গময়ি চোখ কপালে তুলে বলে, তাই নাকি? তোকে বলল?
বলো। আমি তো শরৎদার কাছে সব শুনতে গিয়েছিলাম।
রঙ্গময়ি গালে হাত দিয়ে বলে, কী ছেলে রে বাবা! তা বিশাখার বিয়ে নিয়ে তোর এত মাথাব্যথা কেন?
ছোড়দি খুব দূরে কোথাও চলে যাবে না তো পিসি?
বিয়ে হলে দূরে যাওয়াই ভাল। বড় হলে বুঝবি।
না পিসি। ছোড়দির বিয়ে কাছাকাছিই দাও।
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আচ্ছা, বিয়ের কথা পরে ভাবা যাবে। এখন স্নানে যা। তোর। বাবা বসে আছেন।
স্নান করে এসে ভিতরের বারান্দায় বাবার পাশাপাশি খেতে বসার সময় একটু ভয়-ভয় করছিল কৃষ্ণকান্তর। ঠিক বটে, বাবা তাকে কখনও শাসন করেন না। কিন্তু বাবার থমথমে মুখটাই শাসনের চেয়ে অনেক বেশি।
হেমকান্ত কোনও কথা জিজ্ঞেস করলেন না। নিঃশব্দে সামান্য একটু খেয়ে উঠে গেলেন।
কৃষ্ণকান্ত চোর-চোখে লক্ষ করল।
রঙ্গময়ি বলল, খেয়ে উঠে যা, বাবার পায়ের কাছে বসে থাক একটু। লোকটা ছেলে ছেলে করে পাগল, আর ছেলে বাউন্ডুলে তৈরি হচ্ছে একটা।
কৃষ্ণকান্ত খাওয়ার পর সসঙ্কোচে বাবার কাছে আসে। ঘরে ইজিচেয়ারে বসে আছেন হেমকান্ত। মুখখানা চিন্তিত, ভ্রুকুটিকুটিল।
পায়ের কাছে বসে কৃষ্ণকান্ত তার সরল সুন্দর মুখখানা তুলে ডাকল, বাবা।
হেমকান্তর একখানা হাত এগিয়ে এসে তার মাথা স্পর্শ করল। ভারী কোমল, ভারী স্নেহময় স্পর্শ।
অনেকক্ষণ বাদে হেমকান্ত বললেন, এই বংশের রক্তটা অন্যরকম, জানো?
কীরকম?
তোমার এক কাকা নিরুদ্দেশ, অনা কাকার মৃত্যু হয়েছে অপঘাতে। তাই তোমার জন্য আমার খুব চিন্তা হয়।
আর এরকম হবে না।
যেখানেই যাও, বলে যেয়ো। যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন।
আচ্ছা।
তারপর বিশাল পৃথিবী তোমাকে টেনে নেবে। কত দিকে কত কাজে ছড়িয়ে পড়বে তুমি। আমি তো তখন থাকব না।
কৃষ্ণকান্তর চোখ ফেটে জল আসছে। এর চেয়ে শাসন যে ভাল ছিল।
হেমকান্ত অনেকক্ষণ বাদে বলল, শরৎ কি তোমাকে বন্দুক চালাতে শেখাল?
হ্যাঁ বাবা। আজ আমি একটা ঘুঘু মেরেছি।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, শুনেছি।
আপনি খুশি হননি, বাবা?
হয়েছি। তবে পাখি বড় নিরস্ত্র প্রাণী। ওদের মারায় কোনও বীরত্ব নেই। যাও, বিশাখা তোমার জন্য খুব কেঁদেছে আজ। ওর কাছে যাও।
ঘরে আসতেই বিশাখাকে দেখে কৃষ্ণকান্ত অবাক। কেঁদে কেঁদে মুখটা ফুলে রাবণের মা হয়েছে।
তাকে পেয়েই দুহাতে আঁকড়ে ধরল বিশাখা। তারপর ভেউ ভেউ করে কাঁদতে থাকল।
অস্বস্তি বোধ করে কৃষ্ণকান্ত বলে, কাঁদছিস কেন?
তোর খুব লেগেছিল কাল?
আগে বল, শচীনদাকে বিয়ে করবি।
বিশাখা কান্না থামিয়ে চেয়ে রইল অবাক হয়ে। তারপর ফিক করে হেসে ফেলল হঠাৎ।
কৃষ্ণকান্ত বলল, শচীরানি! শচীরানি!
০৩০. শ্বশুর আর জামাইয়ের সাক্ষাৎকার
শ্বশুর আর জামাইয়ের সাক্ষাৎকারটি একটু আড়াল থেকেই লক্ষ করছিল সে। ধ্রুব শ্বশুরবাড়িতে এল দ্বিরাগমনের পর এই প্রথম। চৌধুরীবাড়ির ছেলেরা শ্বশুরবাড়ি যায় না। তেমন প্রথা নেই। শ্বশুরবাড়ির বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে তারা উপহার বা আশীর্বাদ পাঠায়, কিন্তু নিজেরা আসে না। শুধু মৃত্যুসংবাদ পেলে আসে। নিতান্তই সৌজন্যের খাতিরে। ধ্রুব আজ সেই প্রথা ভেঙেছে।
রেমির বুক কাঁপছিল। ধ্রুব মদ খেয়ে এসেছে কি না তা সে জানে না। ট্যাকসি থেকে নেমে সে খুব স্বাভাবিক পায়েই ঘরে ঢুকেছে বটে, কিন্তু সেটা কোনও কথা নয়। শ্বশুরবাড়ি আসছে বলে সে সতর্ক হবে, এমন মানুষ কি ধ্রুব?
ঘরে ঢুকে ধ্রুব বেশ গম্ভীর চোখে শ্বশুরকে দেখল। ঘরে রেমির মা ছিলেন। জামাইকে দেখে, বোধহয় আতঙ্কেই, পালিয়ে এলেন ভিতরের ঘরে। রেমিকে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় বললেন, ওরে, ধ্রুব এসেছে! যা, কাছে যা!
রেমি বলল, আমার কাছে যাওয়ার কী? এসেছে তো এসেছে।
রেমির মা তাড়াতাড়ি গিয়ে ভিতরের ঘরে ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে বললেন, ধ্রুব এসেছে। খাবার-দাবার কিছু নিয়ে আয়।
