সে বলল, শরৎদার সঙ্গে সম্বন্ধ এসেছে ঠিক জানো?
তাই তো শুনছি।
এঃ, শরৎদা কেন ছোড়দিকে বিয়ে করবে?
করলে তোর আপত্তি আছে?
শরৎদা তো কত বড়লোক। গায়ে কী জোর! শরৎদা রাজিই হবে না।
শচীনের মুখটা আরও গম্ভীর দেখাচ্ছিল। সে বলল, কে কাকে বিয়ে করবে কে জানে। ওসব ভেবে কী হবে?
খবরটা কৃষ্ণকান্তর কাছে নতুন এবং অবিশ্বাস্য। বিনা বাক্যব্যয়ে সে আবার তার ঘোড়ায় উঠল। এবার কোকাবাবুর বাড়ি।
শরৎ ভিতরের মহলে ছাদের ওপর পায়রা খাওয়াচ্ছে। গায়ে স্যান্ডাে গেঞ্জি, পরনে ধুতি। বাবরি চুল। গলায় কারে বাঁধা ধুকধুকি। স্বাস্থ্য ফেটে পড়ছে।
কৃষ্ণকান্ত বিনা ভূমিকায় প্রশ্ন করে, শরৎদা, তুমি কি ছোড়দিকে বিয়ে করবে?
শরৎ আকাশ থেকে পড়ে, কাকে বিয়ে করব?
আমার ছোড়দিকে। চেনো না? বিশাখা।
শরৎ হাঁ করে তাকে কিছুক্ষণ দেখে বলে, বিশাখাকে বিয়ে করব তোকে কে বলল?
শুনেছি। শচীনদা বলেছে।
কোন শচীনদা? উকিল?
হ্যাঁ। শচীনদার সঙ্গেই ছোড়দির বিয়ের কথা চলছিল।
শরতের গলা খুব গমগমে। অট্টহাস্য করলে বহু দূর থেকে শোনা যায়। সে সেই রকমই একটা হাসি দিয়ে বলে, তোর মাথা-টাথা খারাপ হয়ে গেছে।
বাঃ, আমাকে তো শচীনদা বলো।
তোর শচীনদারও মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তাহলে কি বাজে কথা?
একদম বাজে কথা। আমি শিগগিরই বিলেত চলে যাচ্ছি।
বিলেত যাচ্ছ? বলোনি তো!
পড়তে যাচ্ছি। মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ফিরব।
সেটা কী?
খনিজ বিদ্যা। কয়লাখনির ইঞ্জিনিয়ারিং। শক্ত কাজ।
পারবে?
দেখি তো গিয়ে। ওটা না পারলে অন্য কিছু পড়ব। আর কিছু না হলে আর্মিতে ট্রেনিং নেব। বিয়ে-ফিয়ে করবই না।
একদম না?
না। তোর ছোড়দির সঙ্গে শচীনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল?
হ্যাঁ। কিন্তু বিয়েটা হবে না।
তা আমার কথা কে বলল শচীনকে?
তা জানি না।
তোর ছোড়দিকে আমি দেখিইনি, না?
দেখেছ। আমার ছোড়দি দেখতে খুব সুন্দর।
শরৎ মৃদু-মৃদু হেসে যাচ্ছিল। কিছু বলল না।
কৃষ্ণকান্ত একটু হতাশ হল। ছোড়দির সঙ্গে শরৎদারও যদি বিয়ে না হয় তবে কার সঙ্গে হবে? খুব দূরের অচেনা একজন এসে নিয়ে চলে যাবে একদিন ছোড়দিকে? কী রকম হবে সেটা?
শরৎ বলল, শচীন তোকে বাজে কথা বলেছে। সবাই জানে, আমি বিয়ে করব না।
কৃষ্ণকান্ত লোভাতুর চোখে শরতের বিরাট স্বাস্থ্যটা দেখছিল। সকালের রোদে ঝলমল করছে ডাকাতে চেহারাটা। এরকম একখানা শরীর হলে সবাইকে মেরে ঠান্ডা করে দেওয়া যায়।
শরৎ জিজ্ঞেস করল, শচীনের সঙ্গে তোর ছোড়দির বিয়ে হচ্ছে না কেন? পাত্র তো ভালই।
ছোড়দি ওকে বিয়ে করতে চায় না।
কেন রে? শচীনের দোষ কী?
কে জানে।
তবে ও কাকে বিয়ে করতে চায়? আমাকে?–বলে খুব হেসে ওঠে শরৎ।
কৃষ্ণকান্ত লজ্জা পেয়ে বলে, না। ছোড়দি কাউকে বিয়ে করতে চায় না। তোমাদের বাড়ি থেকে নাকি সম্বন্ধ এসেছে।
বাজে কথা।
আমাকে বন্দুক চালাতে শেখাবে না?
এখনই তো চরে পাখি মারতে যাব। যাবি?
যাব। চলো।
বাড়িতে বলে এসেছিস?
বলতে হবে না। কেউ কিছু বলবে না।
পরে আমার দোষ হবে না তো?
না। কেউ কিছু বলবে না। চলো।
চল তাহলে।
শরতের সঙ্গে কৃষ্ণকান্ত বেরিয়ে পড়ল। শরৎদের সহিস ঘোড়াটা পৌঁছে দেবে তাদের বাড়িতে।
হেমকান্তর সঙ্গে নৌকোবিহার বা চরে বেড়ানো একরকম। শরতের সঙ্গে অন্য রকম।
হেমকান্ত এক স্থবির মহাবৃক্ষের মতো। তার স্নিগ্ধ ছায়া আছে। আছে সুনিশ্চিত আশ্রয়। তার শান্ত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্যে যেন সমস্ত প্রকৃতিই হয়ে ওঠে স্নিগ্ধ ও রূপময়। তিনি উড়ন্ত পাখিকে নিরাপদে চলে যেতে দেন। তিনি প্রকৃতির কোথাও কোনও ব্যাঘাত সৃষ্টি করেন না।
কিন্তু শরৎ অন্যরকম। বন্য, দুরন্ত, টগবগে।
দুই নিপুণ মাঝি ছিপ-নৌকোকে তিরের গতিতে চালিয়ে নিয়ে এল দূরবর্তী এক স্থায়ি চরে। এখানে জঙ্গল। নির্জনতা। পাখির ঝাক এসে পড়েছে। শরৎ নেীকো থেকে নেমেই বন্দুক চালাল।
সে কী শব্দ! কান চেপে মাটিতে বসে পড়ে কৃষ্ণকান্ত।
ভয় পেলি?
উঃ, কী শব্দ।
দূর বোকা। পুরুষ মানুষ কি শব্দকে ভয় পায়?
শরৎ তিনটে বন্দুক এনেছে। একনলা বন্দুকটা তাকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, সাবধানে ধরে থাক। আমি দেখে আসি কটা পাখি পড়ল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুরে এল শরৎ। একটা মাথা ভাঙা পাখির রক্তাক্ত শরীর ঝুলছে তার হাতে। মুখে হাসি।
একটা। এই চরের পাখি সব পালিয়েছে। চল।
আবার ছিপ-নৌকো চলল তিরের মতো।
শরৎ বলল, এবার তুই চালাবি বন্দুক।
পারব?
খুব পারবি। কিছু শক্ত কাজ নয়।
আশ্চর্য! কৃষ্ণকান্ত পারলও। দ্বিতীয় চরে তারা নামল না। ছোট চর। বেলে হাঁসের ঝাক নেমেছে। একনলা বন্দুকটায় একটা ছররা গুলি ভরে শরৎ তার হাতে দিয়ে বলল, চালা। আমি ধরে থাকব। একটা ঝাঁকুনি লাগবে। একটুখানি। কাঁধটা শক্ত করে থাকিস। আরও ভাল হয় কুঁদোটা বগলে চেপে ধরলে।
প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষ্ণকান্ত টিপ করল। শরৎ ধরে রইল আলতো হাতে বন্দুকটা।
একটা বজ্রগর্জন চরের নির্জনতাকে টুকরো টুকরো করে ফেলল। হাত থেকে খসে গিয়েছিল বিশাল বন্দুক। শরৎ ধরে ফেলল। বলল, এই তো পেরে গেছিস।
পাখি মরেছে?
শরৎ হাসল, না মরলেই কী? প্রথমবারে মরে না। তবে এর পরে পারবি।
দুপুর পর্যন্ত কৃষ্ণকান্ত বহুবার বন্দুক চালাল। একটা পাখি মারলও সে। নিরীহ একটা ঘুঘু।
ফেরার সময় পাখিটা তার হাতে দিয়ে শরৎ বলল, বাড়ি নিয়ে যা। দেখে সবাই অবাক হয়ে যাবে।
উত্তেজনায় কৃষ্ণকান্ত তখন কাঁপছে।
বাড়ি ফিরতেই তুমুল হট্টরোল। বার-বাড়িতে চেয়ার পেতে স্বয়ং হেমকান্ত বসা। সারি সারি কর্মচারীরা দাঁড়িয়ে আছে। পাড়ার লোকজন, প্রজা, হর কম্পাউন্ডার কে নেই! এমনকী একজন। সেপাই অবধি। তাকে দেখেই সবাই চেঁচিয়ে উঠল, এসেছে! এসেছে! ফিরে এসেছে।
