তা হলে যা ভাল বুঝিস কর। আমি কিছু জানি না। পাড়ার লোকের কাছে মুখ দেখানোর জো নেই। তার ওপর তোর বাবার বুকের দোষ হয়ে গেল।
রেমির চোখ-মুখ রাগে অপমানে অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করতে লাগল।
০২৯. বিশাখা
বিশাখা ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, আর বলবি?
চড় খেয়ে কৃষ্ণকান্ত হতভম্ব হয়ে গেছে। ছোড়দির সঙ্গে তার সারাদিন নানা কারণে বহুবার ঝগড়া হয় বটে, কিন্তু মারে না কখনও। তার গাল জ্বালা করছিল। এমন সটানো চড় সে বহুকাল খায়নি। তাকে কেউ মারে না।
কৃষ্ণকান্ত অবাক গলায় বলে, মারলি?
বিশাখা রাঙা মুখে বলে, একশোবার মারব। মেরে মুখ ভেঙে দেব।
ছোড়দির এরকম চেহারা কখনও দেখেনি কৃষ্ণকান্ত। রূপসী রাজকন্যার ভিতর থেকে যেন এক বিষধর বেরিয়ে এসে ফণা তুলেছে। বাস্তবিক ঠিক এই উপমাটিই তার মনে পড়ল। এসব অবস্থায় সাধারণত কৃষ্ণকান্ত প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আঁচড়ে, কামড়ে, ঘুসি মেরে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ছোড়দিকে সে অবশ্য তেমন করে মারেনি কখনও। আজও মারল না। শুধু অবাক হয়ে চেয়ে রইল। এই ছোড়দি তার চেনা ছোড়দি নয়। এ এক অচেনা মেয়ে।
কৃষ্ণকান্ত কয়েক পা পিছিয়ে গেল। বলল, বাবাকে বলে দেব?
বিশাখা হিংস্র মুখে বলল, যা, বল গে যা।
কৃষ্ণকান্ত অবশ্য নালশেকুটি নয়। ছোড়দির এই রাগের কারণটাও তার জানা নেই। তবে কি শচীরানি শব্দটার মধ্যেই কোনও গুপ্ত রহস্য আছে? ছোড়দির এত ঝঝের অর্থ তার বয়ঃসন্ধির মাথায় ভাল ঢুকছিল না।
সিঁড়ির মুখটায় দাঁড়িয়ে কৃষ্ণকান্ত বিশাখার চোখের দিকে চেয়ে বলল, তুই আমাকে মারলি কেন?
তুই ওকথা বললি কেন?
বললে কী হয়েছে? শচীনদার সঙ্গে তো তোর বিয়ে হবে।
কক্ষনও নয়।
হবেই। আমি শুনেছি।
হবে না। আমি বলছি।
হবে না?–কৃষ্ণকান্ত খুব অবাক আর ব্যথিত হল। মনে মনে শচীনকে সে জামাইবাবু বলে স্থির করে ফেলেছে। ব্যাপারটা তার খারাপও লাগছে না। বড় দুই জামাইবাবুকে সে ভাল করে চেনে না। দেখাই হয় না তাদের সঙ্গে। কিন্তু শচীনদা তার চেনা লোক।
কৃষ্ণকান্ত বলল, বিয়ে কি ভেঙে গেছে?
ভেঙে যাবে।
যাঃ! শচীনদা দারুণ লোক।
সে তোরা তোদর ভাল লোক নিয়ে থাক। আমি বিয়ে করব না। বলে বিশাখা তার ঘরে চলে গেল।
সিঁড়ির মুখে কৃষ্ণকান্ত একটু ভাবিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। ছোড়দি বোকা। খুব বোকা। তবে কৃষ্ণকান্ত বোকা নয়। তার মনে কয়েকটা সম্ভাবনা উঁকি মারল। হয়তো শচীনদার বাবা অনেক পণ আর দানসামগ্রী চেয়েছে। কৃষ্ণকান্ত জানে,তাদের জমিদারির অবস্থা খুব ভাল নয়। সম্পত্তি আছে বটে, কিন্তু নগদ টাকার খুব অভাব চলছে। সেই কারণে বিয়েটা ভেঙে যেতে পারেও বা। আর-একটা হল, হয়তো শচীনদার কোনও খুঁত-টুত বেরিয়েছে। কিংবা হয়তো কোষ্ঠীতে মেলেনি। কিছু একটা এরকমই হবে।
কৃষ্ণকান্ত ঘরে ঢুকল না। নীচের তলায় হেমকান্তর বৈঠকখানায় এসে ঢুকল। এখন হেমকান্ত নেই। এ সময়টায় উনি ঠাকুরঘরে গিয়ে আহ্নিক করেন। চুপচাপ তার ডেক-চেয়ারটায় বসে কৃষ্ণকান্ত তার গালে হাত বোলাতে লাগল। খুবই লেগেছে।
বসে থেকে সে অনেক কথা চিন্তা করতে লাগল। শশীদার ফাঁসি হবে। শচীনদা তাকে বাঁচাতে বরিশাল যাচ্ছে। লোকে বলছে, তার বাবাই শশীদাকে ধরিয়ে দিয়েছে। কথাটা কি ঠিক? ছোড়দি শচীনদাকে বিয়ে করতে চায় না কেন? পরশু কোকাবাবুর নাতি শরৎদা তাকে বলেছে, বন্দুক চালাতে শেখাবে। তাদের বাড়িতেও বন্দুক আছে, কিন্তু কেউ চালায় না। তাকে কেউ শেখাবেও না। শরৎদার কাছে শেখাই ভাল।
বন্দুক চালাতে শিখে কী করবে সে? পাখি মারবে, বাঘ মারবে, আর ইংরেজ।
কিন্তু বাবা বলে, ইংরেজদের দোষ নেই। দোষ দেশবাসীর। আমরা দুর্বল বলেই ইংরেজ আমাদের ওপর প্রভুত্ব করছে। অকারণে ইংরেজ মারায় বাবার সায় নেই। তার স্কুলের বন্ধুরা বলে, বাবা ইংরেজের লোক। কথাটা কি ঠিক?
কৃষ্ণকান্ত আরামদায়ক ডেক-চেয়ারটায় পা তুলে গুটিসুটি হয়ে বসেছিল। শ্রমক্লান্ত শরীরে ঘুমের ঢল নেমে এল আচমকা। ঘুমের মধ্যেই কে যেন–বোধহয় মনুপিসি নড়া ধরে তুলে নিয়ে গিয়ে কয়েক গ্রাস ভাত খাইয়ে দেয়। তারপর নিয়ে বিছানায় শোয়। আর কিছু মনে থাকে না।
সকালে উঠে সে গেল আস্তাবলে। ঘোড়াটায় জিন লাগানো ছিল না। শুধু লাগামটা পরিয়ে কৃষ্ণকান্ত তার পিঠে চেপে এক ছুটে চলে এল শচীনদার বাড়ি।
সামনের মাঠে দাঁড়িয়ে শচীন দাঁতন করছিল। তাকে দেখে বলল, কী রে?
কৃষ্ণকান্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বলে, তোমার সঙ্গে ছোড়দির বিয়ে হবে না শচীনদা?
শচীন স্নান একটু হেসে বলে, তোকে কে বলল?
ছোড়দি বলেছে।
বলেছে? তাহলে তো হয়েই গেল।
কেন বিয়ে হবে না বলো তো!
শচীন বলে, আমরা গরিব মানুষ বলেই বোধহয় তোর ছোড়দির পছন্দ নয়।
গরিব?
শচীন একটু গম্ভীর হয়ে বলে, ওসব বাচ্চাদের শোনা উচিত নয়।
আমাকে ছোড়দি কাল মেরেছে ওকে শচীরানি বলে ডেকেছিলাম, তাই।
শচীন আবার একটু হাসে, শচীরানি মানে কী?
শচীনের বউ।
দূর পাগল! বিয়ের নামেই পাত্তা নেই।
তোমরা কি অনেক টাকা পণ চেয়েছ?
শচীন এবার একটু জোরে হাসে। মাথা নেড়ে বলে, তোকে নিয়ে পারা যায় না। যা একবার মাথায় ঢুকবে তা আর ছাড়তে চাস না।
বলো না।
না রে। পণ-টন চাইবার সুযোেগই হয়নি। শুনছি ভাল জায়গা থেকে তোর ছোড়দির সম্বন্ধ এসেছে।
ভাল জায়গা?
কোকাবাবুর নাতি শরৎ। চিনিস তো?
কৃষ্ণকান্ত আরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। শরৎদা! শরৎদাকে তার যে খুব অপছন্দ তা নয়। বরং সে শরৎদার গুণে খুবই মুগ্ধ। পাঠানের মতো মস্ত চেহারা। হাতের টিপ দারুণ। শরৎদা খুব ভাল কৃন্তি লড়তে পারে। তার সম্পর্কে নানা ধরনের দুঃসাহসিকতার গল্প ছেলেদের মুখে মুখে ফেরে। সেই শরৎদা ছোড়দিকে বিয়ে করবে কেন? ওরা জমিদার হিসেবেও অনেক বড়। তবে কথাটা শুনে কৃষ্ণকান্তর বুকটা লাফিয়ে উঠল আনন্দে।
