তবে ছেলেটা ওকথা বলল কেন? তোমার বন্ধুরা—
আরে দূর! তুমিও যেমন। আমার বন্ধুরা তোমার বাড়ি গিয়ে হাঙ্গামা করবে কেন? তারা কি জানে না যে ওটা আমার শ্বশুরবাড়ি?
রেমির তবু সন্দেহ থেকে যায়। বলে, তুমিই ওদের পাঠাওনি তো?
কী যে বলো রেমি!
রেমি ফোন রেখে উদ্ভ্রান্তের মতো বাইরের পোশাক পরে নিল। ট্যাকসি ডেকে আনল চাকর। বাপের বাড়িতে ঢুকেই অল্পক্ষণের মধ্যে রেমি টের পেল, বাবার অসুস্থতা যতটা নয় তার চেয়ে। ঢের বেশি আর-একটা জিনিস এ বাড়ির আবহাওয়াকে ভারী করে রেখেছে। তা হল ভয়। সকলের চোখে মুখেই একটা আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। এবং আরও যেটা চিন্তার কথা, সবাই তাকে এড়িয়ে যাচ্ছে।
বাবাকে সেডেটিভ দেওয়া হয়েছে। ঘুমোচ্ছন। ডাক্তার বলে গেছে অ্যাটাক মাইলড বটে, তবে হার্ট অ্যাটাক যে তাতে সন্দেহ নেই। খুব সাবধানে রাখা দরকার।
রেমি বোকার মতো কিছুক্ষণ তার বাবার বিছানার পাশে বসে রইল। কী করবে ভেবে পেল না।
জয়ন্ত বেরিয়েছিল ওষুধ আনতে। ফিরল। ওষুধগুলো বাবার বিছানার পাশে টেবিলে রাখল। রেমির দিকে তাকালও না। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
পিছুপিছু এসে রেমি ডাল, জয়, শোন।
জয়ন্ত বিরক্ত মুখে বলল, বল।
কী হয়েছে রে? তোকে নাকি কারা মারতে এসেছিল সকালে।
সে আর শুনে কী করবি? কিছু করতে পারবি?
আগে তো শুনি।
জামাইবাবুর কীর্তিমান বন্ধুরা এসেছিল। জিপে করে। পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেছে।
ওরা এসেছিল কেন?
আমার লাশ ফেলবে বলে।
তুই ওদের কী করেছিস?
জয়ন্ত তেতো মুখে বলল, তোকে একটা কথা বলব? তুই আমাদের সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখিস। তাতে তোর ভাল হবে কি না জানি না, কিন্তু আমরা স্বস্তি পাব।
ও কথা বলছিস কেন? আমার কী দোষ?
তোর দোষ তুই বোকা। ভীষণ বোকা। ওই স্কাউড্রেল ধ্রুব চৌধুরীকে তুই অগাধ বিশ্বাস করিস। একটা ট্রেচারাস হামবাগ, লুজ ক্যারেক্টার লোক। সেদিন তোকে ছোট ভাই হিসেবে কয়েকটা কথা বলেছিলাম, সেগুলো তুই ওর শনে তুলেছিস।
তাতে কী? তুলব না?
তোল ক্ষতি নেই, কিন্তু ব্যাপারটাকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিস।
তুই তো বললি ওকে তোর ভয় নেই।
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, ভয় নেই, কিন্তু ৫ ঘন্না আছে। আই হেট হিম।
রেমির চোখে জল আসার উপক্রম। সে ধরা গলায় বলল, সব দোষই আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছিস কেন? আমি তো ওকে পছন্দ করে বিয়ে করিনি। বাবা নিজে দেখেশুনে বিয়ে দিয়েছে। ও ভাল না খারাপ তা কি জানতাম?
এখন তো জানিস!
রেমি চোখের জল ফেলতে ফেলতেই মাথা নেড়ে বলল, না, এখনও জানি না। তবে মেয়েটাকে নিয়ে ও পালায়নি, একজনের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল।
হ্যাঁ, দারুণ মহৎ লোক তো। তোকে ও যা বোঝায় তাই জলের মতো বিশ্বাস করিস। তাই না? ওইটেই তোর দোষ। ধ্রুব চৌধুরী আজ যে কাণ্ড করেছে তাতে ওর ফাঁসি হওয়া উচিত।
আমি ওকে এমন কিছু বলিনি যাতে তোকে ওর বন্ধুরা মারতে আসবে।
এল তো! আর বন্ধুদের সব স্ট্যান্ডার্ড কী! সাতসকালেও ভকভক করে মদের গন্ধ বেরোচ্ছে মুখ থেকে। প্রত্যেকটার স্ট্যাম্পমারা খুনির চেহারা। জিপগাড়িতে আবার বেলুন লাগানো ছিল।
কাউকে চিনতে পেরেছিস?
না, আমি চিনব কী করে? ধ্রুব চৌধুরী যে সার্কেলে ঘোরে, কোনও ভদ্রলোক সেই সার্কেলে ঘুরতে পারে না।
রেমি চোখের জল মুছে থমথমে মুখে ভিতরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইল। জয়ন্ত ঘর থেকে জামাটা ছেড়ে এসে বলল, আমাদের অপমানে তোর আর কিছু যায় আসে না, জানি। মা বাবাও চাইছে তোর সঙ্গে সম্পর্ক আর না রাখতে। কথাটা শুনতে জুয়েল, কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল টুথ।
তোকে কি ওরা মেরেছে?
না, মা আমাকে আটকে রেখেছিল ঘরে। ওদের ফেস করেছিল বাবা। যা বলাব বাবাকেই বলেছে। সেসব কথা আমার মুখে আসবে না। বস্তির চেয়েও খারাপ ল্যাংগুয়েজ। পাড়ার লোকেরা এসে না পড়লে ওরা ঘরেও ঢুকত।
রেমি তেজি চোখে চেয়ে বলল, তুই কি ভাবিস এর পরেও আমি তোর জামাইবাবুর পক্ষ নেব?
নিবি কি না সেটা তোর পার্সোনাল অ্যাফেয়ার। না নিলেই বা কী করবি? হি ইজ এ হার্ড নাট টু ক্র্যাক। আর-একটা কথা, ও লোকটাকে জামাইবাবু-টাবু বলা আর পোষাবে না। আমি সব সম্পর্ক অস্বীকার করছি।
কর না। আমিও করছি।
জয়ন্ত একথায় একটু হাসল। বলল, অত সোজা নয় রে। তুই মুখে যাই বলিস ওই ধ্রুব চৌধুরী বা তার মিনিস্টার বাবা এসে সামনে দাঁড়ালেই তোর সব প্রতিরোধ ভেসে যাবে। তোর কাছে এখন ওদের ফলস গ্ল্যামারটাই বড়।
আমাকে তুই কী করতে বলিস?
কিছুই না। তুই ও বাড়িতে ফিরে যা। ধ্রুব চৌধুরীর ঘরই কর। আমাদের ভুলে যা।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
জয়ন্ত বেরিয়ে গেলে সে গেল মার কাছে। তার মা খুব সাধারণ মানুষ, তবে রাগী। এক সময়ে মায়ের কড়া শাসনে তারা মানুষ হয়েছে। আজও মাকে একটু ভয় পায় রেমি।
মা, আমি কী করব বলো তো?
রেমির মা ভিতরের ঘরে মুসুম্বি রস করছিলেন। স্বামী জাগলে খাওয়াবেন। রেমির দিকে চেয়ে বললেন, তোকে ধ্রুব কিছু বলেনি?
না, কী বলবে?
জয়ের ওপর ওর অত রাগ কেন তা কিছু বলেনি?
রাগ যে আছে তাও তো জানি না।
মা মুখ নামিয়ে বলে, বড় ঘরের শখ মিটে গেছে বাবা। কী ছোটনোক! এসব বন্ধু ও কোথা থেকে জোটাল? ওরা তোর বাড়িতেও তো যায়!
না, ওর কোনও বন্ধু বাড়িতে আসে না। আমি কি শ্বশুরমশাইকে ঘটনাটা বলব?
বলে কী লাভ? এক ঝাড়েরই তো বাঁশ।
রেমি মাথা নাড়ল, না মা, শ্বশুরমশাই অন্যরকম।
