কে কিছু লোক সকালে তাকে খুন করবে তা বুঝতে পারছিল না জয়ন্ত। মাথা এখনও ঘুমের ধোঁয়াটে ভাবটা কাটিয়ে ওঠেনি। তার বাবা দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
মা তাকে প্রায় হাত ধরে টেনে ভিতরের ঘরে নিয়ে এল, যা করার উনি করছেন। তোকে যেতে হবে না।
বাইরের ছেলেটা তখন মুখ ভেঙিয়ে বলছে, বাড়ি নেই, না? বাড়ি নেই তোত কোথায় রাত কাটাতে গেছে? হাড়কাটা না সোনাগাছি? বেরোতে বলুন হারামিকে। ওর সঙ্গে আমাদের হিসেব নিকেশ আছে।
রেমির বাবা তার প্রেশারের ঊর্ধ্বগতি টের পাচ্ছেন। হাত পা কাঁপছে। মাথাটা ঘুরতেও লেগেছে হঠাৎ। বললেন, ও তো কোনও অন্যায় করেনি। কেন ওকে খুঁজছেন আপনারা?
অন্যায় করেনি মানে? আমাদের দোস্তের নামে ওর দিদির কাছে গিয়ে চুকলি খায়নি স্সালা? ক্যারেকটারলেস বলেনি? স্সালাকে এমনি যদি বের না করেন তবে বহুত খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু! আমরা ঘরে ঢুকে টেনে বের করব। কোনও শুয়োরের বাচ্চা আটকাতে পারবে না।
রেমির বাবা এত মুখোমুখি এরকম ঝঝ কখনও সহ্য করেননি। দরজাটা চেপে ধরে নিজেকে। দাড় করিয়ে রেখে কাতর স্বরে বললেন, ঠিক আছে যদি কিছু বলে থাকে, তবে আমি ওকে শাসন করব।
কীসের শাসন, মশাই? আপনি বাপ না ভেড়া? আপনার মতো ধ্বজভঙ্গ বাপ পারবে ওসব ছেলেকে শাসন করতে? ওসব বড়কা বড়কা বাত ছাড়ুন, জয়ন্তকে ছেড়ে দিন আমাদের হাতে। টাইট দিয়ে দিচ্ছি।
পাড়াটা প্রথমে ভড়কে গেলেও একেবারে নাকের ডগায় এরকম ঘটনা বেশিক্ষণ চললে মাতব্বররা হস্তক্ষেপ করেই থাকেন। জয়ন্তর বন্ধুবান্ধবও আছে। তবে এদের সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো কেউ নয়। তবু দু-চারজন লোক এগিয়ে এল।
কী হয়েছে ভাই? জয়ন্ত কী করেছে ভাই? আরে অত চটছেন কেন, আমরাও তো পাড়ার পাঁচজন আছি।
রেমির বাবা হঠাৎ ছেলেটাকে চিনতে পেরেছেন। তাঁর গুণধর জামাই ধ্রুবর বন্ধু। এইসব বন্ধুই এখন ধ্রুবকে চালায়, আর ধ্রুবও বোধহয় এই স্তরেই নেমে গেছে। বিয়ের দিন এই ছেলেটা দশটা ডেভিল চপ চেয়ে নিয়ে পাতে চটকে ফেলে গিয়েছিল, সব মনে পড়ছে তার।
পাড়ার লোকেদের উদ্দেশে ছোকরা একটা ছোট বক্তৃতা ঝাড়ল। সারমর্ম হল, তার দোস্ত অর্থাৎ এ বাড়ির জামাই একজন অত্যন্ত কারেক্টারগুলা লোক। সবাই তাকে চেনে। আর তারই আপন শালা সেই ভগ্নীপতিকে ক্যারেক্টারলেস বলেছে এবং ঘর ভাঙার জন্য চুকলি খেয়েছে। বলুন মশাইরা এটা কী ধরনের ভদ্রতা!
রেমির বাবা দরজাটা খোলা রেখেই ঘরের সোফায় এসে বসে পড়লেন। কান-টান বড্ড গরম। বুকে একটা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঘাম দিচ্ছে শরীরে।
ভিতরের ঘরে জয়ন্ত রুখে রুখে উঠছে, আ! ছাড়ো না মা, এটা আমাদের পাড়া। মাস্তানি করে চলে যাবে কাজটা অত সহজ নয়। আমাকে বেরোতে দাও।
মা অবশ্য তা দিল না। দড়াম করে একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরে ছোকরাটা তখনও বক্তৃতা চালিয়ে যাচ্ছে। জিপের অন্য লোকগুলো একদম পাথরের মতো চুপ। তারা বাকতাল্লা জানে না। কাজে নেমে পড়ার দরকার হলেই নেমে পড়বে।
পাড়ার মুরুব্বিরা বিস্তর বিনয়-টিনয় দেখালেন, জয়ন্তর হয়ে ক্ষমা চাইলেন।
ছেলেটা বলল, স্সালার মুরগির কলজে। বেরোল না। কিন্তু মশাই, আমরা শেষ ওয়ার্নিং দিয়ে যাচ্ছি, এরপর এরকম হলে লাশ ফেলে দিয়ে যাব।
রেমির বাবা মাথায় হাত চেপে বসে রইলেন। জামাই যেমন ছিল ছিল, কিন্তু কেলেঙ্কারির পর পাড়ার কারও জানতে আর বাকি রইল না তার জামাইটি সত্যিই কেমন। মন্ত্রীর ছেলে বলে তো আর লোকের মুখ চাপা থাকবে না।
জিপটা অবশেষে আবার স্টার্ট নিল এবং চলে গেল।
রেমির বাবা উঠে সদর দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।
রেমি খবরটা পেল দুপুর নাগাদ। টেলিফোনে। বাপের বাড়ির পাড়ার একটা চেনা ছেলে টেলিফোনে বলল, রেমিদি, যদি পারেন তো একবার চলে আসুন। মেলোমশাই খুব অসুস্থ।
অসুখ! কী হয়েছে? —রেমির বুক কেঁপে ওঠে।
মনে হচ্ছে হার্ট অ্যাটাক।
কখন হয়েছে?
আজ সকালে একটা দারুণ হাঙ্গামা হয়ে গেছে বাড়িতে। তারপর থেকেই শরীর খারাপ। দুপুরে খাওয়ার সময় বুকে ব্যথা উঠে যায়।
এখন? এখন কেমন?
ব্যথা হচ্ছে খুব। ডাক্তার এসেছে। আপনাকে খুঁজছেন কেবল।
এক্ষুনি যাচ্ছি। সকালে কীসের হাঙ্গামা হয়েছে?
ওঃ! সে এসে শুনবেন।
মারামারি নাকি?
না। জামাইবাবুর একদল বন্ধু এসেছিল জয়ন্তদাকে খুন করতে।
কী বলছিস যা তা?
বিশ্বাস করুন। জিপগাড়িতে জনা দশ-বারো গুন্ডা। সে কী চেঁচামেচি আর গালাগাল।
জয়ন্তকে মেরেছে?
না, মাসিমা আটকে রেখেছিলেন ঘরে।
কেন মারতে এসেছিল?
তা জানি না। আপনি পারলে চলে আসুন।
যাব তো ঠিকই। কিন্তু ব্যাপারটা কিছুই বুঝতে পারছি না।
এলেই সব শুনতে পাবেন।
রেমি ফোন রাখল। তারপর আবার ফোন তুলে ধ্রুবর অফিসে ডায়াল করল।
শোনো, বাবার হার্ট অ্যাটাক!
হার্ট অ্যাটাক! কখন হল?
দুপুরে। তুমি একবার যাবে না?
খুব সিরিয়াস কেস নাকি?
তা জানি না। এইমাত্র পাড়ার একটা ছেলে ফোন করেছিল। তোমার কয়েকজন বন্ধু নাকি আজ আমাদের বাড়িতে গিয়ে হামলা করেছে। জয়ন্তকে নাকি খুন করতে গিয়েছিল।
আমার বন্ধু?–ধ্রুবর গলায় রাজ্যের বিস্ময়।
বলল তে।
যাঃ, আবোল-তাবোল যে কী বলে!
সেই থেকেই নাকি বাবার হার্ট অ্যাটাক।
আমার যাওয়া দরকার বলছ? যাওয়া উচিত। ঠিক আছে। তুমি চলে যাও। আমি জরুরি একটা কাজ সেরে যাচ্ছি। জয়ন্তকে কি তুমি পছন্দ করো না?
সে কী? কুটুম মানুষ, অপছন্দের কী আছে? অ্যাকচুয়্যালি ওকে তো আমি এক-আধবারের বেশি দেখিওনি। পছন্দ বা অপছন্দ কোনওটাই করার প্রশ্ন ওঠে না।
