বিশাখা মাথা নেড়ে বলে, না তো! আপনার মাথায় একটাও পাকা চুল নেই।
কী করে বুঝলে? খুঁজে তো আর দেখোনি!
কাল দেখে দেব। দুপুরে। কিন্তু অমনিও মাঝে মাঝে চুলের গোড়া চুলকোয়। খুসকি হয়েছে বোধ হয়।
তাও হতে পারে। তবে বয়সও হল, চুল পাকলেও বলার কিছু নেই।
হেমকান্ত কথাটা বলে একটু প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন। বিশাখার হাতের চুড়ির মৃদু শব্দ হচ্ছে।
হেমকান্ত বললেন, এবার তোমাদের একটা ব্যবস্থা করে ফেলতে পারলেই আমি নিশ্চিন্ত হই। বুঝলে, তোমার মা নেই, তার কর্তব্য তো আমাকেই করতে হবে।
বিশাখা কী বুঝল কে জানে, তবে তার চুড়ির শব্দ বেড়ে গেল।
হেমকান্ত বললেন, বয়সকালে মেয়েদের পাত্রস্থ করা অবশ্যই কর্তব্য। সে কাজে আর দেরি হওয়া উচিত নয়।
বিশাখা চুপ।
হেমকান্ত মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে রেখে বললেন, বিয়েতে আমি পাত্র ও পাত্রী দুজনেরই মতামতে বিশ্বাস করি। তবে মত দেবে খুব ভেবেচিন্তে, সব দিক বিবেচনা করে। বর্ণ, বংশ, বিদ্যা, চরিত্র, স্বাস্থ্য সব দিক দিয়েই বিচার করা দরকার। তোমার কোষ্ঠী আমি বিচার করতে পাঠিয়েছি। সেটার ফলাফলও জানতে হবে। যোটক বিচার সবার আগে।
বিশাখার ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে। মুখে রক্তোচ্ছ্বাস। বাবা কি এবার পাত্রর কথা তুলবেন?
হেমকান্ত তুললেন। আস্তে করে বললেন, পাত্রের জন্য আমি বেশি খোঁজাখুঁজি করিনি। শেষ অবধি সর্বত্রই ভাগ্য জয়ি হয়। মানুষ তার সাধ্যমতো বিচার-বিবেচনা করে বটে, তবু ভাগ্যের হাতেই পরিণতি। তুমি অবশ্য প্রশ্ন তুলতে পারো, আমি কেন কোনও জমিদার বাড়িতেই তোমার বিয়ের সম্বন্ধ করলাম না। তার কারণ আমি নিজে জমিদার। আমি জানি, জমিদারির আয় সম্পর্কে এখন আর নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। একটা সংকট চলছে। আমাদেরও চলছে। সেদিন কোকাবাবুদের নায়েবের কাছে শুনলাম, ওদেরও মহাল বিক্রি হবে। কারওই অবস্থা খুব ভাল যাচ্ছে না।
বিশাখা চুপ করে রইল। হাত কিছু শ্লথ।
হেমকান্ত বললেন, তাই আমি নিউ জেনারেশনের মধ্যে পাত্র খুঁজছিলাম। এমন পাত্র যে স্বনির্ভর, লড়াই করতে জানে, দুনিয়াটাকে চেনে। বুঝেছ?
বিশাখা হুঁ দিল।
হেমকান্ত খুশি হয়ে বললেন, আমি আর একটা জিনিসকেও খুব মূল্য দিই। চরিত্র। পুরুষ মানুষের ওটা বড়ই দরকার।
বিশাখা চুপ করে রইল। তবে মনে মনে খুশি হল না। সে তার বাবাকে জানে। চরিত্রবান হিসেবে একসময়ে তার খ্যাতি ছিল। এখন নেই। পুরুষ মানুষের চরিত্রটা কোনও স্থায়ি সত্য নয়। তা বদলায়।
হেমকান্ত বললেন, আমি রাজেনবাবুর ছেলে শচীনকে পাত্র হিসেবে স্থির করেছি। এখনও কথা দিইনি। তুমি একটু ভেবে আমাকে মতামত দিয়ো। আগেই বলেছি, আবার বলছি, অমত থাকলে আমার শত পছন্দ হলেও বিয়ে দেব না। নিজের মুখে যদি জানাতে লজ্জা পাও তো মনুকে বোলো।
বিশাখা শ্বাসটুকু পর্যন্ত ভাল করে ছাড়ছিল না।
হেমকান্ত বললেন, ছেলেটি কতদূর ভাল তা হয়তো এখনই বোঝা যাবে না। ঘর করলে বুঝতে পারবে। এখন যাও মা, আমার মাথা আর চুলকোতে হবে না।
বিশাখা ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ওপরে উঠে এল।
আজকাল কৃষ্ণকান্ত তাকে শচীরানি বলে খ্যাপায়। সে রাগে। কৃষ্ণকান্ত মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়া শেষ করে সদ্য ওপরে উঠে এসেছে। বইপত্র টেবিলে ঝড়াক করে ফেলে দিয়ে বলল, এই শচীরানি, গোছা তো!
বিশাখা আচমকা ঠাস করে তার গালে একটা চড় কষাল।
০২৮. বেলুন দিয়ে সাজানো একটা জিপগাড়ি
একদিন সকালবেলা বেলুন দিয়ে সাজানো একটা জিপগাড়ি ঘ্যাঁস করে এসে থামল রেমির বাপের বাড়ির সামনে। হুডখোলা জিপ। চারদিকে কয়েক ডজন গ্যাসবেলুন মাথা ভোলা দিয়ে আছে। গাড়িতে জনা কয়েক লোক ঠাসাঠাসি করে বসা। প্রত্যেকের চেহারাই খুনির মতো। চোখ লাল, মুখ গম্ভীর। তবে তারা সব চুপচাপ বসে সিগারেট টেনে যেতে লাগল।
জিপ থেকে নামল খাটো মজবুত চেহারার একটা ছেলে। পা কিছু টলটলায়মান। নেমেই টাল্লা খেয়ে পড়তে গিয়েও জিপের কান ধরে সামলে গেল। জামার বুকের চারটে বোতাম খোলা। কালো কারে বাঁধা একটা ধুকধুকি ঝুলছে গলায়।
নেমেই ছেলেটা চেঁচিয়ে বলল, এই স্সালা শুয়োরের বাচ্চা জয়ন্ত, বেরিয়ে আয় স্সালা! বেরিয়ে আয়! বাপের বিয়ে দেখাব আজ। বেরিয়ে আয় বাপ!
গোটা পাড়াটা এই চেঁচানিতে হতভম্ব হয়ে গেল। জানালা দরজা খুলে কয়েকটা মুখ উঁকি মেরেছিল। সভয়ে সরে গেল আবার। বাজারের যাত্রীরা সিটিয়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে জোর কদমে পেরিয়ে যেতে লাগল জায়গাটা।
আব্বে জয়ন্ত! এই সালা হারামির বাচ্চা! বেরিয়ে আয় বাপের ছেলে হয়ে থাকিস তো!–ছেলেটা তার ভরাট গমগমে গলায় চেঁচাতে থাকে।
রেমির বাবা সদর খুলে চৌকাটে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখে বললেন, কী হয়েছে? চেঁচাচ্ছেন কেন?
ছেলেটা বুক চিতিয়ে বলল, বেশ করব চেঁচাব। আপনার ছেলেকে বের করে দিন।
কেন, ও কী করেছে?
বহুত খারাপ কাজ করেছে। সেসব আমরা বুঝব। আগে বের করে দিন।
রেমির বাবার কেমন যেন ছেলেটাকে চেনা-চেনা লাগছিল। ধরতে পারছিলেন না। চেঁচামেচি এবং ঘটনার আকস্মিকতায় তার শরীরে বশও নেই। হাঁ করে ঘটনাটার অর্থ ধরার চেষ্টা করে বললেন, জয়ন্ত বাড়ি নেই।
জয়ন্ত বাড়িতেই ছিল এবং সামনের ঘরে। ঘুমোচ্ছিল। সে রোজই দেরিতে ওঠে। ঘুম খুবই গাঢ়। চেঁচামেচি শুনে উঠল এবং ব্যাপারটা বুঝতে একটু সময় নিল। তারপর দরজার দিকে এগোতে যেতেই কোথা থেকে তার মা এসে পথ আটকাল, সর্বনাশ! কোথায় যাচ্ছিস? ভিতরের ঘরে যা! যা শিগগির? ওরা খুনে।
