হেমকান্ত একটা মস্ত ডেক-চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসে আছেন। অবসর সময়ে বসে বইটইও বড় একটা পড়েন না। চুপচাপ বসে থাকেন। কাজ ছাড়া একটা লোক কী করে আয়ুর বিপুল সময় কাটায় তা শচীন ভেবেই পায় না।
হেমকান্ত একটু নড়ে বসে বললেন, এসো।
শচীন বসার পর হেমকান্ত জিজ্ঞেস করেন, কাগজপত্র সব দেখেছ?
সব দেখা হয়নি। তবে কাজ অনেকদূর এগিয়েছে।
কেমন বুঝছ?
শচীন বলল, আপনার দুই ভাই না থাকায় জমিদারিটা ভাগ হয়নি। তা সত্ত্বেও অবস্থা কেন এত খারাপ হল সেটাই প্রশ্ন।
হেমকান্ত বললেন, আমি আমার বউদিকে কিছু দিতে চেয়েছিলাম। সেটা কি সম্ভব?
দিতে চাইলে দেবেন। তাতে এমন কিছু ক্ষতি হবে না। তবে তদারকি দরকার।
হেমকান্ত মাথা নেড়ে বলেন, কে করবে? ছেলেরা কাছে থাকে না। আমার ওসব ভাল লাগে না। বেচে দিলে কীরকম দাম পাওয়া যাবে বলতে পারো?
বেচে দিতে চাইছেন?
রেখে কী হবে? নগদ টাকাটা ছেলেদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে কাশী-টাশী কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবছি।
শচীন চুপ করে রইল।
হেমকান্ত আবার জিজ্ঞেস করেন, কত দাম উঠবে বলে মনে হয়?
ঠিক এখনই বলা যাবে না। অ্যাসেসমেন্ট করাতে হবে। তবে যা মনে হয় দাম খুব খারাপ হবে না।
হেমকান্ত চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ বাদে বললেন, সংসার বড় খারাপ জায়গা। বুঝলে, আমি যে এত গা বাঁচিযে চলি তবু সংসারের ধুলোকাদা নিত্যদিন আমার গায়ে এসে লাগে।
শচীন একথার কী জবাব দেবে? এ তো বিক্ষুব্ধ মনের স্বভাবোক্তি। সে বড় জোর প্রতিধ্বনি করতে পারে। কিন্তু সেটা মিথ্যাচার হবে। সংসার সম্পর্কে অতটা তিক্ততা তার এখনও আসেনি।
হেমকান্ত শচীনের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, তোমার বাবাকে আমি একবার আসতে বলে পাঠিয়েছি। আমার খুব ইচ্ছে, তোমার সঙ্গে বিশাখার বিয়ে হোক। এ বিয়েতে তুমি রাজি?
শচীন মাথা হেঁট করে রইল। ভিতরটা দুলছে। বিশাখা যদি তার বউ হয় তবে খুবই খুশি হয় সে। কিন্তু কথাটা তো মুখ ফুটে বলা যায় না। উপরন্তু রঙ্গময়ির কথার মধ্যে একটু অন্যরকম আভাস পাওয়ায় কাজটা আরও শক্ত হয়েছে। কী জবাব সে দেবে?
হেমকান্ত বললেন, লজ্জা পেয়ো না। আমি সনাতনপন্থী বটে, কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকেই জানি পাত্র-পাত্রীর অমতে তাদের বিয়ে হওয়া উচিত নয়।
শচীন বুদ্ধিমান ছেলে। জবাবটা ঘুরিয়ে দিল। বলল, আপনি বাবার সঙ্গে কথা বুলুন।
তোমার তা হলে অমত নেই?
না।
আমার মেয়েটি বোধহয় দেখতে খারাপ নয়। তুমিও তাকে দেখে থাকবে। কিন্তু চেহারাই তো সব নয়। লেখাপড়া শেখেনি, ঘরবন্দি জীবন কাটিয়েছে। কাজেই মনটাও হয়তো একটু সংকীর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি মনে করি, উদারচেতা, চরিত্রবান পাত্রের হাতে পড়লে তার মনের পরিবর্তন ঘটতে দেরি হবে না।
শচীন এ বিষয়ে কী আর বলবে? চুপ করে রইল।
হেমকান্ত নিজেই আবার বলেন, আমার রক্ত তো ওর গায়ে আছে। তুমি অনেকক্ষণ পরিশ্রম করেছ। এবার এসো। গাড়িটা বরং তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসুক।
তার দরকার নেই। আমার সাইকেল আছে।
বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি করে দেব না রাখব, তা নির্ভর করছে তোমার মতামতের ওপর। আমার খুব ইচ্ছে, বিশাখার সঙ্গে তোমার বিয়ে হওয়ার পর এই এস্টেটের সবরকম ভার তুমিই নাও। ছেলেরা যদি কখনও আগ্রহী হয় ভাল। না হলে বরাবর তুমিই সব দেখবে, ভোগ করবে।
শচীন নিজের ভিতরে খানিকটা রক্তোচ্ছাস টের পেয়ে ধীরে ধীরে উঠল। একটু মাতাল-মাতাল লাগছিল তার।
বার বাড়িতে এসে সে অন্ধকারে তার সাইকেলে উঠে পড়ল।
শচীন লক্ষ করল না দোতলার বারান্দা থেকে একজোড়া চোখ খুব সর্পিল দৃষ্টিতে লক্ষ করছিল তাকে। বিশাখা।
বিশাখা জানে, আজ শচীন বাড়ি ফিরেই সুফলার কাছে বিকেলের বৃত্তান্ত শুনবে। বিয়েটা হয়তো তবু ভেঙে যাবে না। কিন্তু ধাক্কা খাবে। দ্বিধা দেখা দেবে, সন্দেহ আসবে।
একজন দাসী এসে খবর দিল, কর্তাবাবু ডাকছেন।
বিশাখার মুখটা শুকিয়ে গেল। কিন্তু বুক দুর দুর করল না। প্রকৃতপক্ষে ইদানীং তার ভয়-টয় কমে যাচ্ছে। বাবার প্রতি তার কিছু সমীহ ছিল। কিন্তু আজকাল আর ততটা নেই। বাবার কাণ্ডজ্ঞান সম্পর্কে তার সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তার দিদিদের দুজনেরই জমিদার বাড়িতে বিয়ে হয়নি বটে, কিন্তু যোগ্য ঘরে হয়েছে। শুধু তার বেলাতেই বাবা কেন যে হাঘরে একটা পরিবারকে বেছে বের করলেন তা কে জানে।
বিশাখা নীচের বৈঠকখানায় কুণ্ঠিত পায়ে ঢুকে বলল, আমাকে ডেকেছেন?
হেমকান্ত স্নেহের স্বরে বললেন, এসো। বোসো আমার কাছে।
বিশাখা ডেক-চেয়ারের পাশে একটা টুল টেনে এনে বসে।
হেমকান্ত হেসে বললেন, আর-একটু কাছে এসো। আমার মাথাটা একটু চুলকে দাও।
বিশাখা একটু অবাক হয়। জীবনেও বাবা তাকে বা আর কাউকে নিজের কোনওরকম সেবা করতে ডাকেননি। এই প্রথম।
বিশাখা একটু হাসল। বাবা খুব দূরের মানুষ। অচেনার এক অস্পষ্ট ঘেবাটোপে আবৃত। কখনওকখনও বাবাকে তার রক্তমাংসের মানুষ বলেই মনে হয় না। ব্যথা, বেদনা, ক্লৈব্য, আকাঙ্ক্ষা কিছুই যেন নেই। এ কেমন পাথরের মানুষ!
আজ সে বাবার মাথায় ঘন চুলের মধ্যে হাত ড়ুবিয়ে এক অদ্ভুত আনন্দ পেল। রক্ত যেন কথা বলে উঠল রক্তের সঙ্গে। সে যে এই মানুষেরই অভ্যন্তর থেকে জন্মলাভ করেছে সেই সত্য সামান্য এই স্পর্শে যেন উন্মােচিত হয়ে গেল।
সযত্নে সে বাবার চুলের গোড়ায় নরম আঙুলে চুলকে দিতে লাগল। হেমকান্ত আরামে চোখ বুজলেন। তারপর বললেন, পাকা চুল হয়েছে নাকি? মাথাটা খুব চুলকোয় আজকাল।
