শচীন কাজ রেখে খাবারের ঢাকনা খুলল। বিশাল আকারের গোটা আষ্টেক মিষ্টি, কমলালেবু, ক্ষীর, নাড়ু, এক বাটি পায়েস। এত খেতে পারে নাকি কেউ! রোজই সে অর্ধেকের ওপর পাতে ফেলে রেখে যায়। কমিয়ে আনতে বললে কেউ গা করে না। অপচয় এদের গায়ে লাগে না বোধহয়। কিন্তু সে গরিব ঘরের ছেলে, তার লাগে।
বড় কষ্টে মানুষ হয়েছে তারা। শচীনের বাবার আইনের ব্যাবসা জমতে সময় লেগেছিল অনেক। সে যে বাড়ির জামাই হতে চলেছে সেই বাড়ির অনেক দাক্ষিণ্য তাদের এক সময় হাত পেতে নিতে হয়েছে।
শচীন সেসব ভোলনি।
খাওয়া শেষ করে কাগজপত্র গুছিয়ে রাখতে বলে শচীন ওঠে।
রাখাল বলে, একবার মনুদিদির সঙ্গে দেখা করে যাবেন। ঠাকুরবাডিতে আপনার জন্যই বসে আছেন।
শচীন অবাক হল না। মনুদিদি অর্থাৎ রঙ্গময়ির সঙ্গে তার বেশ সহজ সম্পর্ক। ইদানীং বিয়ের সম্বন্ধ হওয়াতে মনুদিদি প্রায়ই যায় তাদের বাড়িতে। বয়সে তার চেয়ে বেশি বড় নয়, তাই তাদের মধ্যে কিছু ঠাট্টা-ইয়ার্কিও হয়।
শচীন ঠাকুরমণ্ডপের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একবার বাড়ির দিকে চাইল। মস্ত বাড়ি। অনেক জানালা দরজা, বহু ঘর। কোথায় বিশাখা আছে কে জানে! বুকের মধ্যে একটা উদ্বেল রহস্যময় আনন্দ সে টের পায়। বিশাখা কি তাকে লক্ষ করে?
আরতি হয়ে গেছে। ঠাকুর মণ্ডপ জনশূন্য। সামনের বিশাল বারান্দায় একা রঙ্গময়ি বসে আছে। মুখখানা গম্ভীর। শচীনকে দেখে অবশ্য মুখে হাসি ফুটল। বলল, এসো।
শচীন জুতো খুলে বারান্দায় উঠে সিঁড়িতে পা রেখে বসল।
দু-চারজন এ সময়ে চরণামৃত আর ঠাকুরের আশীর্বাদি ফুল নিতে আসে। রঙ্গময়ি পাশে তামার কোষাকুষি আর পরাত নিয়ে বসা। অভ্যাসবশে একটু চরণামৃত দিল শচীনকে। তারপর বলল, এস্টেটের অবস্থা কি খুব খারাপ?
খুব নয়। তবে খারাপই। ঠিকমতো দেখাশোনা হচ্ছে না।
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, এরকমই তো হওয়ার কথা। কৃষ্ণর বাপের তো বিষয়ে মন নেই।
তা জানি।
এখন তুমি ভরসা। যদি একটু সামলে দিতে পারো।
শচীন হেসে বলল, আমি উকিল মানুষ। জমিদারির কী বুঝি? এসব সামলানোর জন্য পাকা লোক দরকার।
সে আর কোথায় পাওয়া যাবে? কৃষ্ণর বাপ তোমার ওপরেই নির্ভর করে আছে।
শচীন মাথা নিচু করে বলে, আমি যতটুকু সাধ্য করব।
কোরো। কৃষ্ণর বাপের পক্ষে কিছুই সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এমন মানুষ কাছা দিতে কোঁচা খুলে পড়ে। দায়-দায়িত্বও কিছু কম নয় মাথার ওপর। মেয়ের বিয়ে বাকি, একটা ছেলে এখনও মানুষ হয়নি। ঠাটবাটও তো রাখতে হয়।
তা তো ঠিকই। তবে এখনই খুব একটা দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আদায়টা ঠিকমতো করতে হবে। মাঝে মধ্যে ওঁর একটু মহালে যাওয়া উচিত। প্রজারা এতে খুশি হয়।
সে কি আর উনি যাবেন?
যেতে পারলে ভাল।
তুমি বুঝিয়ে বোলো। উনি তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
শচীন পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে দেখে নিল। রাত হয়েছে।
রঙ্গময়ি বলল, একটু বোসো। তোমার সঙ্গে আমার দু-একটা কথা আছে।
বলুন।
এখানে যদি তোমার বিয়ে হয় তা হলে কি রাজেনবাবু খুব বেশি দাবি-দাওয়া করবেন?
শচীন একটু অবাক হয়। এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কথা তার নয়। মাথাটা নামিয়ে বলল, বাবার সঙ্গেই এ নিয়ে কথা বলবেন।
সে তত বলবই। তবে তুমি নিজে তো এস্টেটের অবস্থা দেখতেই পাচ্ছো। উনি কতটা খরচ করতে পারবেন তার একটা আন্দাজও নিশ্চয়ই হয়েছে।
শচীন একটু হেসে মাথা নেড়ে বলে, মনুদি, এসব নিয়ে কথা বলতে আমি পারব না।
রঙ্গময়ি একটু চুপ করে থেকে বলে, আমার ভয় কী জানো? দাবি-দাওয়া বেশি হলে না আবার বিয়েটাই ভেঙে যায়।
শচীন খুব গম্ভীর মুখে নিজের হাতের তেলো দেখতে লাগল।
রঙ্গময়ি হঠাৎ বলে, কোকাবাবুর এক নাতি আছে। শরৎ। তাকে চেনো?
শরৎকে চিনব না কেন? আমার চেয়ে বয়সে কিছু ছোট। খুব চিনি।
কেমন ছেলে?
ভালই তো।
শুনি, ছেলেটার স্বভাব তেমন ভাল নয়।
কেন, খারাপ কীসের?
শুনেছি, মদ-টদ খায়।
সে জমিদারের ছেলেদের একটু ওসব দোষ থাকেই।
কই, এই বংশের কেউ তো খায়নি।
শচীন বলে, এ বাড়ি হয়তো অন্যরকম। হঠাৎ শরতের কথা উঠছে কেন?
রঙ্গময়ি কথাটার জবাব চট করে দিল না। সময় নিল। তারপর আস্তে করে বলল, শরতের সঙ্গে কি তোমার ঘনিষ্ঠতা আছে?
না। ওর দাদা আমার সঙ্গে পড়ত। কখনও কখনও ওদের বাড়িতে গেছি।
রঙ্গময়ি একটা শ্বাস ফেলে বলে, ও তরফ থেকেও বিশাখার সম্বন্ধ এসেছে। আমাদের কারও ইচ্ছে নেই অবশ্য।
শচীনের বুকের মধ্যে একটু দুরদুর করে উঠল। শরতের সঙ্গে বিশাখার বিয়ে? এ কি ভাবা যায়?
শচীনের মুখখানা ম্লান হয়ে গেল। শুধু বলল, ও।
তুমি কর্তার সঙ্গে দেখা করে যাও।
শচীন উঠে দাঁড়াল। অপমানে তার মুখ-চোখ গরম। গায়ে জ্বালা। যদিও সে জানে, রঙ্গময়ি তাকে অপমান করার জন্য কথাটা বলেনি! কিন্তু পণের কথাটাই বা উঠছে কেন! এরা কি শরতের কথাই ভাবছে তা হলে?
শচীন অন্ধকার বার বাড়ির মাঠটা পেরোতে পেরোতে খুব অন্যমনস্ক হয়ে গেল। বিয়ে তার অনেক আগেই হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করবে না বলে জিদ ধরায় হয়নি। এতদিন বাদে সে তৈরি হয়েছিল সংসারী হতে। বিশাখার সঙ্গে প্রস্তাব আসায় খুশি হয়েছিল সে। বড় সুন্দরী মেয়ে। সেই প্রস্তুত মনটাকে কি ভেঙে দেবে এরা?
ভারী দোলাচল তার মনের মধ্যে।
হেমকান্ত নীচের মন্ত বৈঠকখানায় বসে আছেন। নিষ্কর্মা পুরুষদের শচীন সহ্য করতে পারে না। কিন্তু হেমকান্ত সম্পর্কে তার একটু দুর্বলতা আছে। এ লোকটা নিষ্কর্মা বটে, কিন্তু এঁর হৃদয়ের রংটি শুভ্র। রঙ্গময়ির সঙ্গে এঁর প্রেম নিয়ে কিছু মুখরোচক গুজব বাজারে চালু আছে বটে, কিন্তু সেই গুজবও বুড়ো হয়ে মরতে চলল। এখন আর ও নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
