তা কি শালাবাবু বলে যায়নি?
বলেছে। তবু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।
জ্বালালে সিস্টার। শুনে তোমার লাভ কী বলল তো!
তুমি কার সঙ্গে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিলে?
কারও সঙ্গে নয়। হিজ হিজ হুজ হুজ।
তার মানে?
তার মানে দুর্গার প্লেনের টিকিট সে নিজেই কেটেছিল। আমারটা কেটেছিল অফিস।
তোমরা একসঙ্গে গিয়েছিলে তো!
হ্যাঁ, তবে এয়ারপোর্ট অবধি।
তার মানে কী?
তার মানে দুর্গাকে এক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। দিয়েছি। শালাবাবু অন্যরকম ব্যাখ্যা দিয়েছে তো!
দিয়েছে। কিন্তু সেটা কি মিথ্যে?
না, না। আমি বরং বলি, ওটার বেসিসে তুমি একটা ডিভভার্সের মামলা আনো। আমি লড়ব না।
রেমি রেগে যেতে পারছিল না। তার উদ্বিগ্ন বুকে ধ্রুবর এইসব ইয়ার্কি এক ধরনের প্রলেপ দিচ্ছিল। সে বলল, ঠিক করে বলো।
আমি তো ঠিক করেই বলছি।
তোমরা একসঙ্গে ছিলে না?
দুর্গাকে তো তুমি চোখেও দেখোনি সিস্টার।
তাতে কী?
দেখলে বুঝতে ওর সঙ্গে থাকার চেয়ে একটা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে থাকাও ভাল।
তুমি ওকে কার কাছে পৌঁছে দিয়েছ?
ভেল-এর একজন ইঞ্জিনিয়ারের ডেরায়। ভাল ছেলে। ব্রাহ্মণ।
সে ওর কে হয়?
আমি তোমার কে হই?
স্বামী। আবার কে?
স্বামী কথাটা বড্ড ভারী। ফিউডালিজমের গন্ধ আছে। বর বরং বেটার।
ঠিক আছে। বর।
ওই ছেলেটাও দুর্গার তাই।
কী করে হল?
হয়ে গেল। প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।
ইয়ার্কি কোরো না।
তুমি যে আমার গুরুজন তা মাঝে মধ্যে ভুলে যাই।
গুরুজন নই, তবে এখন ব্যাপারটা সিরিয়াস। এ সময়ে ইয়ার্কি ভাল লাগে না।
গোটা জীবনটাই ইয়ার্কি সিস্টার। এ গ্রেট ইয়ার্কি অফ দি ক্রিয়েটার।
আমি ফিলজফি শুনতে চাই না। দুর্গার ব্যাপারটা বলো।
বললাম তো।
ওর বর ব্যাঙ্গালোরে কী করছিল?
বললাম তো চাকরি।
আহা তা জানতে চাইছি না। ওখানে ওর তো বিয়ে ঠিক ছিল না!
বিয়ে ঠিক না থাক, হৃদয়টা ছিল।
কী করে?
তুমি মাইরি একদম মগজ খেলাও না আজকাল। মরচে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেটার সঙ্গে দুর্গার আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল। এখানে বিয়ে ঠিক করেছিল অধীর। জোর করে। ছোঁড়াটাও ভাল নয়। তাই আমাকে ধরেছিল দুর্গা। আমি বেড়াল পার করে দিয়েছি।
দুর্গা তোমার সঙ্গে ফেরেনি তা হলে?
কোন দুঃখে? দিব্যি জমিয়ে বসে গেছে ব্যাঙ্গালোর।
সিঁদুর পরছে?
পরবে না কেন?
ঠিক আছে। ছাড়ছি। পরে কথা হবে।
শোনো সিস্টার।
বলো।
আমার কথা ফেস ভ্যালুতে বিশ্বাস করে নিয়ো না। ভাল করে তদন্ত করো।
করার দরকার আছে কি?
ডিভোর্সের চান্সটা ফসকাবে কেন ভাই?
আমি কি খুব ডিভোর্স চাই নাকি?
তুমি না চাও তোমার ভাই চাইতে পারে।
মোটেই নয়।
বোকা মেয়ে। ভাইটিকে তো চেনো না!
কেন? সে আবার কী করেছে?
কিছু করেনি এখনও। তবে করতে চাইছে।
কী করতে চাইছে?
লঙ্কাপুরী থেকে বন্দিনী সীতাকে উদ্ধার করতে চাইছে বোধহয়।
সীতা কি আমি?
আলবত। কৃষ্ণকান্তবাবু রাবণ।
আর তুমি?
আমি বোধহয় বিভীষণ। রামকে হেলপ করতে চাইছি।
আর দরকার নেই। আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধ্রুব বলে, ভুল করছ সিস্টার।
করলে বেশ করছি। তুমি বার বার সিস্টার বলবে না।
কেন, সম্পর্কটা তো প্রায় তাই।
মোটেই নয়। এসো আগে, তার পর দেখাব সম্পর্কটা কী!
০২৭. শচীন অনেকক্ষণ কাজ করল
শচীন অনেকক্ষণ কাজ করল। কাছারিঘরে মস্ত আলো জ্বেলে দিয়ে গেছে চাকর। কর্মচারীরা তটস্থ হয়ে অপেক্ষা করছে। একটা কারুকাজ করা তেপায়ায় ভারী রুপোর থালায় ঢাকা দেওয়া খাবার আর রুপোর গেলাসে জল অপেক্ষা করছে অনেকক্ষণ।
শচীন বুঝতে পারছে, জমিদারির অবস্থা খুব খারাপ নয়। কিন্তু ঠিকমতো তদারকি হয়নি বলে আদায়পত্র ভীষণ কম হচ্ছে কয়েকবছর। একটু চেষ্টা করলে এবং সতর্ক থাকলে সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে। কিন্তু কাজটা করবে কে? শচীন জানে, হেমকান্ত আপনভোলা লোক। বিষয়-আশয়ে মন নেই। তার ছেলেরা জমিদারিতে আগ্রহী নয়। জমিদারি হল ভাগের মা। হেমকান্তর সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে যে হিস্যা তারা পাবে তা লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই তারা অন্যান্য কাজ কারবারে নেমে পড়েছে।
শচীন আর-একটা ব্যাপারও বুঝতে পারছে। হেমকান্ত তাকে জামাই করতে চান সম্ভবত এই জমিদারি দেখাশোনা করার জন্যই। এ বাড়ির জামাই হয়ে বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনা করতে শচীনের আপত্তি নেই। বিশাখাকে সে বাল্যকাল থেকে দেখে আসছে। ভারী সুন্দর ফুলের মতো মেয়ে। মুখখানা মনে পড়লেই বুক তোলপাড় করে। শচীন অবশ্য খুব ভাবালু নয়। বরং বাস্তববাদী। কিন্তু পুরুষ তো! সুন্দরী মেয়ে দেখে কোন পুরুষের না বুক তোলপাড় হয়?
শচীন তাই খুব আগ্রহ আর নিষ্ঠার সঙ্গে হেমকান্তর জমিদারি জরিপ করছে। টাকার জন্য নয়, বিশাখার মুখ চেয়েই। এ বাড়ির মান-সম্মান রাখা তাবও কর্তব্য।
বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা দুনিয়াতেই একটা মন্দা চলছে। এ দেশের লোকের হাতে বিশেষ টাকা নই। নগদ টাকার টানাটানি থেকেই বোধহয় খাজনা আদায়েও মন্দা চলছে। উপরন্তু হেমকান্ত পাওনা আদায়ে পটু নন। গত বছর দুয়েকের মধ্যে কম করেও তিনটে মহাল হেমকান্ত প্রায় জলের পরে ছেড়ে দিয়েছেন। নতুন কোনও বন্দোবস্তও হয়নি। কয়েকটা মোকদ্দমা হেরে গেছেন তদবিরের অভাবে।
শচীন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
মুহুরি রাখাল বলল, শচীনবাবু, এখনও কিছু মুখে দিলেন না।
দিচ্ছি।–শচীন হাসিমুখেই বলে। তারপর আবার কাগজপত্রে ড়ুব দেয়। হেমকান্তর নায়েবমশাই বুড়ো মানুষ। রাতে চোখে ভাল দেখেন না বলে এ সময়টায় আসেনও না। একটা ছুটির দিনে এসে তার সঙ্গে সকালের দিকে বসা দরকার।
