ধ্রুব চৌধুরী খুব চরিত্রবান লোক নয়।
রেমি এই দুঃসময়েও রেগে গেল। বলল, সে আমি বুঝবা কে কী বলেছে তা দিয়ে তো আর বিচার হবে না। মিথ্যে করেও তো রটাতে পারে।
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, তুই ইনকিওরেবল। কিছুতেই তোকে তোর মোহ থেকে বের করে আনা যাবে না। আমি এটা জানতাম। তবু তোর কাছে এসেছি কেন তা জানিস! জামাইবাবুর নামে কিছু রটলে সেটা আমাদেরও গায়ে লাগে। সেটা জামাইবাবুর জন্য নয়, তোর জন্য।
আমার কথা তোদের ভাবতে হবে না।
তুই আমাদের কথা ভাবিস না বলে কি আমরাও তোকে ভুলে যাব?
ভুলতে বলিনি। আমার মাথাটা এখন ঝা ঝা করছে। কী পান্ডা নামটা বললি?
অধীর পান্ডার বোন দুর্গা পান্ডা। অধীর ইজ এ পলিটিক্যাল লিডার। লেফটিস্ট।
তার সঙ্গে তোর জামাইবাবুর সম্পর্ক কী?
জামাইবাবুর কোনও পলিটিক্যাল কালার আছে বলে আমি জানি না। থাকলে লোকটা হয়তো মানুষ হত। অধীরের সঙ্গে জামাইবাবুর বন্ধুত্ব কলেজ থেকে। তবে এখন বন্ধুত্ব নেই। পাবলে অধীর ধ্রুব চৌধুরীর গলা নামিয়ে দেয়। দুর্গাকে নিয়ে জামাইবাবু ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছিল, জানিস?
রেমির পায়ে জোর ছিল না। থরথর করে কেঁপে বসে পড়ল বিছানায়। মুখ কেমন সাদা। চোখে বোবা শূন্যতা।
কী বলছিস?
ঠিকই বলছি। খবরটা শুনে তুই আপসেট হয়ে যাবি জানতাম। তবু তোর ভবিষ্যতের কথা ভেবে। বলতে বাধ্য হলাম।
ওর আর যে দোষই থাক, মেয়েমানুষের দোষ তো ছিল না।
ছিল না আবার কী! জমিদারদের রক্তেই ওসব বিষ থাকে। ফিউডালিজম যাবে কোথায়!
চুপ কর। তুই সব জেনে বসে আছিস, না?
আমরা কিছু জানার চেষ্টা করিনি। খবরটা আমাদের কানে অন্য লোকই পৌঁছে দিচ্ছে।
রেমি আনমনে অন্য দিকে চেয়ে বলল, তাই নাকি?
তুই সব ঘটনার একদম মাঝখানে থেকেও কোনও খোঁজ রাখিস না। বড্ড বোকা তুই। নিজের। স্বার্থ সম্পর্কে তোর আর একটু কনশাস হওয়া দরকার।
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখে অবশ্যম্ভাবী জলটুকু মুছে নিল আঁচলে। জয়ন্তর কথা তার যে খুব বিশ্বাস হচ্ছিল তা নয়। ধ্রুব মেয়েদের তেমন পাত্তা দেয় না কোনওদিনই। তবু যদি এই গুণ তার দেখা দিয়ে থাকে তবে আজ রেমির পায়ের নীচে সত্যিই জায়গা নেই।
জয়ন্ত বলল, সেকেলে মেয়েমানুষের মতো কাঁদছিস কেন? রুখে দাঁড়াতে পারিস না!
রুখে দাঁড়াব! কীভাবে?
লোকটার মুখের ওপর বলে দে, তোমার নামে এই সব রটেছে। সত্যি কি না বলো।
রেমি জবাব দিল না।
জয়ন্ত বলল, ব্যাপারটা শুধু লাম্পট্যেই শেষ হবে না। তোর শ্বশুর পলিটিকস করে, অধীরও পলিটিকস করে। অধীর স্মল ফ্রাই, কিন্তু একটা এলাকায় তার অনেক ফলোয়ার আছে। দু-চারটে মার্ডার ওদের কাছে কিছুই না। তোর শ্বশুর মন্ত্রী এবং পুলিশ তার হাতের মুঠোয় বলে এখনও জামাইবাবুর গায়ে হাত পড়েনি। কিন্তু এবার পড়বে।
ওকে ওরা মারবে?
মারাই তো স্বাভাবিক। দুর্গার মতো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা মানেই তো বিপদ ডেকে আনা।
দুর্গা যদি বাজে মেয়েই হয়ে থাকে তবে তার জামাইবাবুকেই শুধু দায়ি করবে কেন?
দুর্গা বাজে মেয়ে বটে, কিন্তু ওর রিসেন্টলি বিয়ে ঠিক হয়েছে। ঠিক এ সময়ে ওকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর যাওয়ায় সব ব্যাপারটাই গুবলেট হয়ে গেছে।
তোকে এত কথা কে বলল?
বললাম তো, নাম বলব না।
কেন বলবি না?
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, তোকে জানি ছোড়দি। তুই আর আমাদের লোক নোস, তুই এ বাড়িতে মাথা বিকিয়ে দিয়ে বসে আছিস। তোকে বলা যাবে না। তোর ভিতরে ফিউডাল সিস্টেম ঢুকিয়ে দিয়েছে এরা। এ বাড়ির ইজ্জত বাঁচাতে তুই সবাইকে ফাঁসিয়ে দিতে পারিস।
রেমি অবাক হয়ে বলে, কী সব যা তা বলছিস তখন থেকে?
বলছি তোর দুর্দশা দেখে। শো-কেসের পুতুল হয়ে রইলি। যা বোঝাচ্ছে তাই বুঝছিস। তোর ব্যক্তিত্ব নেই।
রেমি হঠাৎ জ্বলে উঠে বলল, ভাবিস না। যদি ঘটনাটা সত্যি হয় তবে তোর জামাইবাবুকে আমি ছেড়ে দেব না। আর যদি সত্যি না হয় তবে তোকেও ছেড়ে দেব না।
জয়ন্ত ম্লান একটু হাসল, জানি। পারলে আমাকে বোধহয় এখুনি কোতল করতিস। তবে বলছি শোন, কথাটা উড়ো কথা হলে তোকে বলতাম না।
জয়ন্ত চলে যাওয়ার পর অস্থির রেমি কতবার যে ঘর-বার করল তার সংখ্যা নেই। বাথরুমে ঢুকে স্নান করল। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। ছাদে গিয়ে পায়চারি করল। তারপর
অনেক ভেবেচিন্তে টেলিফোন করল ধ্রুবর অফিসে।
আমি রেমি বলছি।
বলো। কী খবর?
তুমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিবে আজ? জরুরি দরকার।
আজ যে পার্টি আছে সিস্টার।
দরকারটা ভীষণ জরুরি।
তা বুঝতে পারছি। একটু ঝেড়ে কাশো না! কী হয়েছে?
ফোনে বলা যায় না।
যায় না? সে কী? আমাকে তো কেউই কিছু বলতে বাকি রাখে না। প্রকাশ্যেই বলে। টেলিফোনে বলতে পারবে না কেন?
বলছি তো, বলা যাবে না। তুমি তাড়াতাড়ি এসো।
জয়ন্ত তোমাকে কিছু বলে গেছে নাকি? খুব সিরিয়াস কিছু? এবং আমাকে নিয়ে?
রেমি স্তম্ভিত হয়ে গেল। জয়ন্ত দুপুরে এসেছিল, খবরটা ওর জানার কথাই নয়। বিস্ময়টাকে নিজের ভিতরে ছিপি এঁটে রেখে রেমি বলল, সব খবরই বাখো তা হলে!
আরে ভাই, আমি রাখি না। তবে সিস্টেমটা চালু আছে। শালাবাবু কী বলে গেছে বলো তো?
অনেক কিছু। কথাগুলো সত্যি কি না জানতে চাই।
না শুনলে কী করে বলব সত্যি কি না।
অধীর পান্ডা নামে তোমার এক বন্ধু আছে?
আছে। আগে বন্ধু ছিল, এখন ঘোর শত্রু। আর কী জানতে চাও?
সে তোমার শত্রু হল কেন?
