কৃষ্ণকান্তর এইসব অনুশাসনকে তার বাপের বাড়ির লোক ভাল চোখে দেখেনি। অপমান হিসেবেও গায়ে মেখেছে। তাই এমনিতেই কেউ বড় একটা আসে না। তারা গরিব না হলেও টাকা পয়সা বা ক্ষমতায় কৃষ্ণকান্তর ধারেকাছেও নয়। সেই সংকোচ এবং ভয়ও কিছু দূরত্ব রচনা করে থাকবে। রাগ করে যে কয়েকদিন রেমি গিয়ে বাপের বাড়িতে ছিল তাইতেই বাবা মা বেশ চিন্তিত হয়ে উঠেছিল।
জয়ন্তকে দেখে রেমির বুক কেঁপে উঠল একটু। কোনও দুঃসংবাদ নয়তো!
কী রে? তুই!
জয়ন্ত ঠিক কিশোর ছেলেটি নেই। অল্প কয়দিনেই ধাঁ করে একটু লম্বা হয়ে গেছে। গালে সামান্য দাড়ি। গলার স্বর ভেঙে মোটা হয়ে গেছে। চোখে এসেছে তীক্ষ্ণ ও স্থির দৃষ্টি। পোশাকে আশাকে মেন মনোেযোগী নয়। একরাশ তেলহীন রুক্ষ চুল ঘাড় অবধি নেমেছে।
জয়ন্ত দিদির দিকে চেয়ে বলল, তোর সঙ্গে কথা ছিল।
আয়। বোস এসে। কী খাবি?
তোর বাড়িতে খাব! ও বাবা, তোর শ্বশুর টের পেলে—
যাঃ। আমার শ্বশুর কি হিরণ্যকশিপু নাকি? লোকেরা বড় বাড়িয়ে বলে ওঁর সম্পর্কে।
তুই একেবারে গেছিস।
তার মানে?
ওই বুড়ো তোকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছে। পারসোন্যালিটি বলে তোর আর কিছু নেই।
রেমি লজ্জা পেয়ে বলে, মোটেই নয়। বাইরে থেকে লোকটাকে ওরকম মনে হয়। আদর্শবাদীরা একটু তো কঠোর হবেই। কিন্তু মনটা ভীষণ ভাল।
কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী কেমন লোক তা পাবলিক জানে। তোকে অত ওকালতি করতে হবে না।
পাবলিক ছাই জানে।
জয়ন্ত একটু হেসে বলে, তোর শ্বশুর আদর্শবাদী ছিল আজ থেকে তিন যুগ আগে। এখন ওঁকে আদর্শবাদী বললে কথাটাকেই অপমান করা হয়।
রেমি একটু উষ্মর সঙ্গে বলে, আচ্ছা না হয় তাই হল। এবার কী খবর বল!
কোনও খবর-টবর নেই। আমি বাড়ির রিপ্রেজেনটিভ হয়ে আসিনি।
কোনও খারাপ খবর নেই তো!
আরে না। আমাদের নিয়ে তোকে অত দুশ্চিন্তা করতে হবে না। বরং তুই নিজেকে নিয়ে একটু ভাবলে আমাদের দুশ্চিন্তা যায়।
নিজেকে নিয়ে কী আবার ভাবব?
জয়ন্ত একটু চুপচাপ তার দিদির দিকে চেয়ে থেকে বলে, আমি বুঝতে পারছি না তুই তোর নিজের সিচুয়েশনটা সম্পর্কে কনশাস কি না।
কনশাস না হওয়ার কী?
আর ইউ হ্যাপি ইন দিস সেট আপ?
চলে তো যাচ্ছে।
আর ইউ হ্যাপি উইথ ধ্রুব চৌধুরী?
রেমি এবার রেগে গিয়ে বলে, তোর এত পাকা পাকা কথার দরকার কী বল তো! আমি হ্যাপি কি না সে আমি বুঝব।
দ্যাখ ছোড়দি, তোর যখন বিয়ে হয় তখন আমি মাইনর ছিলাম। মতামতের দাম ছিল না। তাছাড়া আমরা তত খোঁজ খবরও নিইনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তোর জন্য আমাদের একটু চিন্তা করা দরকার।
কেন, এতদিন বাদে চিন্তা করার মতো কী হল?
তুই আমাদের কাছে কিছুই বলিস না। কিন্তু আমাদের কানে অনেক কথা আসে।
কী এমন কথা! তোর জামাইবাবু মদ খায়, এই তো!
সেটাও একটা পয়েন্ট।
মদ খাওয়া এই পরিবারের ট্র্যাডিশন নয়। তোর জামাইবাবু খায় বটে, তবে আমার মনে হয় সেটা শুধু নেশা করার জন্য নয়।
তবে কীসের জন্য?
অন্য কারণ আছে। অত কথা তোর মতো পুঁচকের সঙ্গে বলতে পারি না।
আমি এখন আর তত পুঁচকে নই।
আমার কাছে পুঁচকেই। না হয় একটু দাড়ি গোঁফই উঠেছে, তাই বলে কি জ্যাঠামশাই হয়ে গেছিস নাকি?
উই আর অ্যাংশাস অ্যাবাউট য়ুওর ওয়েলফেয়ার।
কেন? হঠাৎ কী হয়েছে?
জামাইবাবুর বন্ধুবান্ধবদের তুই চিনিস?
রেমি একটু ভেবে নিয়ে বলল, না। দু-একজনের সঙ্গে এক-আধবার পরিচয় হয়েছিল। এ বাড়িতে বাইরের পুরুষরা চট করে ভিতরবাড়িতে আসতে পারে না। মেয়েদের স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ কবার নিয়মও নেই।
তার মানে জামাইবাবুর বন্ধুরা এ বাড়িতে আসে না!
না। কেন বল তো!
জয়ন্ত একটু হেসে বলে, জামাইবাবু তার বন্ধুদের এ বাড়িতে আনে না কেন তা জানিস? বন্ধুদের অধিকাংশই ভদ্রলোক নয়।
রেমি একটু থতিয়ে গেল। ধ্রুবর বন্ধুদের সে চেনে না। কাজেই জোর গলায় বলার মতো কিছু নেই। মিনমিন করে বলল, ভদ্রলোক নয় কী করে বুঝলি? তুই চিনিস তাদের?
চিনি। পান্ডা নামে জামাইবাবুর এক বন্ধু আছে। অধীর পান্ডা। নাম শুনেছিস?
বললাম তো, আমি ওর বন্ধুদের চিনি না।
অধীর পান্ডার এক বোন আছে। দুর্গা। খুব খারাপ মেয়ে। স্কুলে থাকতেই দুবার পালিয়ে গিয়েছিল।
রেমির বুক কাঁপতে থাকে। তার একবার ইচ্ছে করে জয়কে থামিয়ে দেয়। সে আর শুনতে চায় না। কিন্তু কৌতূহল এক অদ্ভুত জিনিস। নিজের সর্বনাশের ভয়কেও মানে না। রেমি অস্ফুট গলায় বলল, তার সঙ্গে কী?
সেই দুর্গার সঙ্গে জামাইবাবু ইদানীং ইনভলভড।
যাঃ হতেই পারে না।
সত্যি মিথ্যে জানি না। আমি নিজের চোখে কিছু দেখিনি। কিন্তু খুব রিলায়েবল সোর্চ থেকে খবরটা পেয়েছি।
কে বলেছে তার নাম বল।
নাম বললে তুই গিয়ে তোর শ্বশুরকে লাগাবি। তোর শ্বশুর কুরুক্ষেত্র করে ছাড়বে। পারিবারিক অশান্তি হবে।
আমি ওঁকে বলব না কথা দিচ্ছি।
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলে, তোর কথার দাম নেই ছোড়দি। কৃষ্ণকান্তর হিপনোটিজম তোকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। উনি কথাটা যেই শুনবেন সেই কথাটার সোর্স বের করার জন্য উঠে পড়ে লাগবেন।
আমি তোর নাম বলব না।
জয়ন্ত মৃদু হেসে বলে, আমার নাম বলতে পারিস। আমি ওকে ভয় পাই না। কিন্তু ইনফরমেশনটার সোর্স তো আমি নই। অন্য লোক। আর কে, তোদের আত্মীয়।
আমাদের আত্মীয়? কে রে?
বলেছি তো, নাম বলব না।
আমাকে কী করতে বলিস? চোখ কান খোলা রাখ। অত মজে থাকিস না।
