বিশাখা একটু হাসল, বাবার মতিচ্ছন্ন হয়েছে বলে করেছে।
তাহলে আমাকে বলতে আসিস কেন? আমরা অত ল্যালা না। তোরাই ল্যালা। আজই আমি বাড়ি গিয়ে সব বলছি।
বলিস। আমি তাই চাই। কুঁজোর আবার চিত হয়ে শোবার সাধ! ইঃ!
ভারী তো তিন পয়সার জমিদারি, তাও খাজনা আদায় হয় না, ঠাটবাটই সার।
একথাও কি তোর দাদা বলেছে?
বলেছেই তো। জমিদারি রাখতে হলে তোর বাবাকেও ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে ধার করতে বেরোতে হবে।
বিশাখা বিভীষণ মুখে চুপ করে বসে রইল।
সুফলা কাঁদতে কাঁদতে এক ছুটে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নীচে।
আপনমনে বিশাখা একটু হাসে। বিয়েটা শেষ অবধি হবে না হয়তো। সুফলা গিয়ে বলবে। কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে।
ছাদ থেকে নেমে সে মুখে ভালমানুষি মাখিয়ে মনুপিসির কাছে চুল বাঁধতে বসল।
রঙ্গময়ি জিজ্ঞেস করে, সুফলা এসেছিল নাকি?
হুঁ।
রঙ্গময়ি চুপ করে থাকে। বোধ হয় ভয়ে।
বিশাখার বিষদাঁত একটু সুলসুল করে। বিষ ঢালার একটা জা.গা চাই তো! চুলের জট ছাড়ানোর বাঁকুনিতে মাথাটা পিছন দিকে হেলে যাচ্ছিল। মুখটা সামান্য বিব্রত। বলল, মোক্তারের মেয়ের খুব তেজ।
রঙ্গময়ি মন্তব্য করে না।
বিশাখা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, বলে কী জানো! বাবাকে নাকি খাজনার দায় মেটাতে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে বেরোতে হবে।
একথা বলল কেন?
কাঁচা পয়সা পাচ্ছে তো। ধরাকে সরা দেখছে।
কী থেকে কথাটা উঠল?
কী আবার? কথার পিঠে কথা।
মেয়েটার মুখ তত ভাল নয়।
সেই কথাই তো আমি তোমাকে বলি।
কী বলিস?
ওরা ভাল নয়।
রঙ্গময়ি মৃদু একটু হাসল। বলল, কী করে বুঝলি? শুধু সুফলার সঙ্গে ঝগড়া করলেই কি সব বোঝা যায়?
ঝগড়া আবার কীসের? ঝগড়া হয় সমানে-সমানে।
মানুষকে ছোট মনে করিস কেন? এই যে আমাকে পিসি বলে ডাকি, আমিও তো তোদের সমান নই। গরিব পুরুতের মেয়ে, পিসি না বলে নাম ধরে ডাকলেই তো পারিস তাহলে।
তোমার কথা আলাদা।
কিছুই আলাদা নয় রে। মানুষকে অত পর ভাবতে নেই।
তুমি একটু অদ্ভুত আছো পিসি। ওরা আমাদের সমান নয় সে কথাই বলেছি। নইলে সুফলা তো আমার বন্ধুই।
তুই সুফলার সঙ্গে কেন ঝগড়া করেছিস তা আমি জানি।
বিশাখা ঝামড়ে উঠে বলে, আমি মোটেই ঝগড়া করিনি। কেন করতে যাব? ওদের আমি মানুষ বলেই মনে করি না। ঝগড়া ও করেছে।
বিয়ের ব্যাপারে তোর মত নেই, সে কথা তোর বাবাকে না হয় আমি জানিয়ে দেব। তুই আর কিছু করতে যাস না।
বিশাখা চুপ করে রইল। কিন্তু তার মুখ-চোখ ফেটে পড়ছে অভ্যন্তরীণ রাগ ও উত্তেজনায়।
চমৎকার একটা খোঁপা করে চিরুনি গুঁজে দিল তাতে রঙ্গময়ি। আঙুলের নিপুণ চাপে খোঁপাটা ঠিকঠাক করে বসিয়ে দিল। তারপর বলল, এই তোর শেষ কথা তো!
কোনটা আবার শেষ কথা?
শচীনকে বিয়ে করবি না, এই তো?
ওকে করব কেন?
সেটাই ভাল করে জেনে গেলাম। তোর বাবাকে আজই বলব।
বিশাখার মুখ একটু বিবর্ণ হয়ে গেল। বলল, আমার কথা বলে বলবে নাকি পিসি?
তাহলে কার কথা বলব?
বাবা যে আমার ওপর রাগ করবে।
রাগ করবে কেন? তবে প্রস্তাবটা এক রকম হয়ে গেছে, সেটা ফিরিয়ে নিতে সম্মানে লাগবে। তবু আমি বলি মেয়েদের অমতে বিয়ে দেওয়া ভাল নয়।
বিশাখার সুর অনেক নরম হয়ে গেল। বলল, বাবাকে আমার কথা বোলো না।
তবে কী বলব?
বোলো তোমার পছন্দ নয়। তোমার কথা তো বাবা খুব শোনে।
রঙ্গময়ি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমাকে কেন নিমিত্তের ভাগী করতে চাস? এসবের মধ্যে আমি থাকতে চাই না। শচীনকে পছন্দ করেছিলাম আমিই।
শচীনকে তোমার কীসে পছন্দ বলো তো?
কী জানি, আমার হয়তো চোখ নেই।
নেই-ই তো পিসি। ও এমন একটা কী পাত্র?
ওকে তোর এত অপছন্দের কারণ কী বল দেখি! বলবি?
ওদের বাড়ি ভাল নয়। কেমন সব গরিব-গরিব স্বভাব।
রঙ্গময়ি হেসে ফেলল। আবার গম্ভীর হয়ে গেল।
বিশাখা হঠাৎ রঙ্গময়ির গলা জড়িয়ে ধরে বয়সোচিত আদুরে গলায় বলল, তুমি আমার ওপর রাগ করেছ পিসি?
রঙ্গময়ি মা-মরা এই বাচ্চাদের নিজের ছায়া দিয়ে তাপ দিয়ে বড় করেছে এতটা। তাই এই আদরে তার বুকের মধ্যে অভিমানের একটা তুফান উঠতে চাইছিল। কিন্তু রঙ্গময়ি জোর করে চাপা দিল সেটা।
বিশাখার থুতনিটা একটু নেড়ে দিয়ে বলল, না, আমার রাগ করতে নেই। আমি রাগ করলে যে ভূমিকম্প হয়ে যাবে। যা, খেলা কর গে।
বিশাখা আস্তে আস্তে উঠে বারবাড়ির দিকে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। জড়োসড়ো ভাব। শীত এখন যাই-যাই। বেলা চট করে পড়ে না। এখনও রোদ আছে।
ব্রহ্মপুত্রের দিকে অনেকগুলো কদম গাছ। মলিন চেহারা। তার ওপর পিঙ্গল আকাশ। চেয়ে ছিল বিশাখা।
একটা সাইকেল বড় রাস্তা থেকে বাঁক নিয়ে বাড়িতে ঢুকল।
বিশাখা ত্বরিৎপদে একটা থামের আড়ালে সরে যায়।
শচীন এল। রোজ এ সময়ে আসে। কাছারিবাড়িতে বসে কাগজপত্র দেখে। পরনে উকিলের পোশাক।
থামের আড়াল থেকে বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকে দেখতে লাগল বিশাখা।
» ০২৬. আচমকা একদিন দুপুরে
আচমকা একদিন দুপুরে জয়ন্ত এসে হাজির।
রেমি একটু অবাক হল। জয়ন্ত তার ছোট ভাই। কিন্তু তার বিয়ের পর থেকে এ বাড়িতে বাপের বাড়ির কেউ বড় একটা আসে না। কৃষ্ণকান্ত ঠারেঠোরে এটা জানিয়ে দিয়েছেন; বিয়ের পর মেয়েদের বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক যতটা ক্ষীণ হয় ততই ভাল। পালে-পার্বণে বা পারিবারিক বিয়ে উৎসবে একটু-আধটু দেখা হোক। ব্যস, তার বেশি নয়। মেয়েদের যতক্ষণ বাপের বাড়ির পিছুটান থাকে ততদিন শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক গাঢ় হয় না। আর সেই থেকেই আসে সংসারের অশান্তি। এ ব্যাপারটা রেমি মেনে নিয়েছে। তার বয়স অল্প হলেও বুদ্ধি বিবেচনা অপরিণত নয়। বাপের বাড়ির সঙ্গে এই আলগা সম্পর্কের যৌক্তিকতা সে বোঝে। আপাতনিষ্ঠুর হলেও আখেরে এতে ভালই হয়।
