চুনী!
বলো।
সুফলা তোকে কিছু বলেছে?
হুঁ।
কী বলেছে?
এর মধ্যে কবে যেন নায়েবমশাই গিয়েছিলেন ওদের বাড়ি।
কথা পেড়ে এসেছে, না?
তাই তো বলো। কর্তাবাবু রাজেন মোক্তারকে ডেকে পাঠিয়েছে।
কবে আসবে বুড়োটা?
তা অত জানি না।
এ বিয়ে হবে না।
ইস!
ইস আবার কীসের?
আমার যদি ওরকম বর জুটত তাহলে আনন্দে নাচতাম।
আমি আর তুই কি সমান?
তা বলিনি। কিন্তু শচীনবাবু কী ভাল দেখতে বলো!
তেমন কিছু নয়।
এ শহরে ওর মতো সুন্দর আর কেউ নেই।
আছে। তুই গগনবাবুর ছেলেকে দেখেছিস?
কোকাবাবুর নাতি? দেখব না কেন? সেও অবশ্য সুন্দর।
শচীনের চেয়ে ঢের সুন্দর।
চুনী একটু দ্বিধার গলায় বলে, কেমন যেন একটু গোঁয়ার মতো আছে!
তার মানে?
একটু বেশি লম্বা-চওড়া।
পুরুষ মানুষ তো ওরকমই ভাল।
চুনী ফের একটু দ্বিধায় পড়ে। খুব ভয়ে-ভয়ে বলে, শরৎ কিন্তু তোক ভাল নয়।
শরৎ কী রে! শবৎবাবু বল।
ওই হল। শরৎবাবু নাকি-হি হি–
হাসছিস কেন?
মদ-টদ খায়, জানো?
তোকে কে বলল?
সবাই জানে।
আর কী করে?
বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলে।
সেটা কি খারাপ?
তা নয়। মেয়েমানুষের দোষ আছে।
বাজে কথা।
তোমার কি শরৎকে পছন্দ?
তাতে তোর কী?
না, কিছু না। আমার কাছে শচীনবাবুকে বেশি ভাল লাগে। বেশ নরম-সরম মানুষ।
খেটে খায়। খেটে খাওয়াটা কি খুব বড় কথা নাকি? ভীষণ গরিব ছিল ওরা।
জানি।
মনুপিসিই সব নষ্টের গোড়া। আপদ বিদেয় করার জন্য যা তা একটা ছেলেকে ধরে গলায় ঝুলিয়ে দিচ্ছে!
চুনী বিশাখার ভিতরকার গনগনে রাগের আঁচ টের পেয়ে ভয়ে চুপ করে গেল। এখন মতামত করতে যাওয়াটা ঠিক হবে না। পা ঘষা শেষ করে ঝাঝালো সরষের তেল হাতের তেলোয় নিয়ে বিশাখার কোমল সুন্দর হাত আর পায়ে মাখাতে লাগল সে। মহেন্দ্রর ঘানিতে রাই সরষে পিষে তৈরি করা তেল। কী মিষ্টি গন্ধ। যে তেলটি চুলে দেয় বিশাখা, যে সাবানটি মাখে তাদের গন্ধ চুনীকে পাগল করে দেয়। এই বাজকন্যার মতো সুন্দরী মেয়েটিকে সে বোজ ছোয়, এর দামি সাবান আর তেল তার হাতে লেগে থাকে, এসবই নিজের সৌভাগ্য বলে মনে করে চুনী। ভারী গৌরব বোধ করে। কিন্তু বিশাখার পছন্দ কি ভাল? শরৎকে সে চেনে। চেহারাটা খারাপ নয়, কিন্তু ভীষণ রাগী, বুনোলোক। আর শচীনবাবুর চেহারাটা কী মিষ্টি! কত লেখাপড়া জানে!
বিয়ের কথা ওঠার ফলেই বোধ হয় ইদানীং সুফলা খুব একটা আসে না।
বিশাখা জলে নামতে নামতে বলল, সুফলাকে একটা খবর দিস তো। ওর সঙ্গে কথা আছে।
চুনী বলল, দেব।
আজই কিন্তু। বলিস জরুরি দরকার।
বিকেলে সুফলা এল। জমিদারবাড়ির মেয়ের সঙ্গে দাদার বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে, এটা তাদের কাছেও খবরের মতো খবর। তার ওপর পাত্রী তার প্রাণের বন্ধু। সুফলার মুখে-চোখে একটা চাপা আনন্দ ডগমগ করছিল। চোখের দৃষ্টিতে একটু লজ্জা-লজ্জা ভাবও। এসেই বিশাখাকে জড়িয়ে ধরে বলল, কেমন আছিস? কদিনে রোগা হয়ে গেছিস কেন?
বিশাখার মুখটা খুব খুশি দেখাল না। গম্ভীর মুখে বলল, ছাদে চল, কথা আছে।
তাদের ছাদটি বিশাল। মাঠের মতো বড় সেই ছাদে অনেক রকম বসার জায়গা আছে। শ্বেতপাথরের আরামকেদারা, পাথরের বেদি। বড় বড় ফুলের টব আছে অনেকগুলো। আছে বড়ি আর আমসত্ত্ব রোদে দেওয়ার জন্য জালের ঘর, যাতে পাখি এসে না ঠোকরাতে পারে।
সাদা বেদিটার ওপর দুজন পা তুলে বসে।
মানুষের মুখের ওপর স্পষ্ট কথা বলতে বিশাখা কখনওই সংকোচ বোধ করে না। এমনকী দাদা-দিদিদের মুখের ওপরেও সে অনেক কথা বলে দেয়। শুধু বাবার প্রতি তার এক ধরনের সমীহ আছে।
বিশাখা সুফলার দিকে তাকিয়ে বলল, তোদর এখন অবস্থা বেশ ভাল হয়েছে, তাই না?
সুফলা একটু থতমত খেয়ে বলে, কীসের অবস্থা?
সংসারের অবস্থার কথা বলছি। ন্যাকা, বুঝিস না কিছু?
সুফলা একটু গম্ভীর হয়ে বলে, সংসারের খবর অত জানি না।
খুব জানিস। কদিন আগেও তো খেতে পেতিস না ভাল করে। চেয়ে-চিন্তে চলত।
সুফলা চঞ্চল হয়ে ওঠে। মুখে থমথমিয়ে ওঠে কান্না। বলে, এসব কথা কেন বলছিস?
বিশাখার খুব ভাল লাগতে থাকে। নিষ্ঠুরতার মধ্যে সে এক রকম তীব্র আনন্দ বোধ করে। বলে, আমার মার কাছ থেকেও কতদিন চাল পয়সা নিয়ে তবে তাদের চলত, মনে নেই?
সুফলা ফোস করে ওঠে, সেসব মা শোধ দিয়েছে।
তা দিতে পারে। তোরা এখন বেশ পয়সার মুখ দেখেছিস, না?
তা জেনে তোর কী হবে?
আমার জানা দরকার বলেই জিজ্ঞেস করছি। তোর বাবা আর দাদা কত টাকা রোজগার করে রে?
সুফলার চোখে জল চিকচিক করতে থাকে। আকস্মিক এই অপ্রিয় প্রসঙ্গে সে কথার খেই হারিয়ে ফেলে। জবাব দিতে পারে না। শুধু অস্থিরভাবে এদিক ওদিক চাইতে থাকে।
বিশাখা বলে, উকিল-মোক্তারদের খুব কাঁচা পয়সা হয় বলে শুনেছি। আমাদের জমিদারিটা কিনে নিতে পারিস তোরা? সে ক্ষমতা আছে?
সুফলার চোখে জল, ফোঁপানিতে কেঁপে কেঁপে উঠছে বুক। তবু খুব তেজের সঙ্গে বলল, অত দেমাক করিস না। তোদের জমিদারির অবস্থাও জানি।
কী জানিস?
অনেক জানি। আমার দাদা সব কাগজপত্র দেখেছে।
তাই নাকি? কী দেখেছে?
আমাদের জমিদারি নেই বলে তো আর না খেয়ে থাকি না। তোদের কদিন পরেই হাঁড়ির হাল হবে।
বিশাখার সুন্দর মুখটায় আক্রোশের হিংস্রতা দেখা দেয়। জমিদারির অবস্থা যে ভাল নয় এটা সেও শুনেছে। সে বলল, তোর দাদাকে মাইনে দিয়ে রাখছি তো আমরা, সেই ক্ষমতা তো এখনও আছে।
আমার দাদা কি তাদের চাকর?
তাছাড়া আর কী?
দাদাকে তো তোর বাবা হাতে-পায়ে ধরে সেধে জমিদারি দেখার কাজ দিয়েছে। অতই যদি দেমাক তবে দাদার সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ করার দরকার কী ছিল?
