স্নেহ নয় ভাই, গাড্ডা। গভীর গাড্ডা।
হোক গে। আমি তো গাড্ডাই চাই। তুমি তো তাও দিতে পারোনি।
আমি আর উনি! মন্ত্রীর ভালবাসার দাম কত বেশি!
রেমি রাগ করে চলে গেল।
কিন্তু কৃষ্ণকান্ত তখনও ফেরেননি। কোথায় একটা সেতু উদ্বোধন করতে গেছেন। ফিরতে রাত হবে। নাও ফিবতে পারেন।
তবে কিছুক্ষণ রাইটার্সে ফোনে চেষ্টা করে জেলা শহরের সার্কিট হাউসের নম্বর জোগাড় করল রেমি।
কৃষ্ণকান্ত তার গলা শুনেই সোল্লাসে টেলিফোনে চেঁচিয়ে উঠলেন, ফিরেছ মা, ফিরেছ! বাঁচালে!
আপনি ফিরবেন না বাবা?
ঠিক ছিল, আজ আর ফিরব না। কিন্তু তুমি যখন ফিরেছ তখন আর কথা কী! এক্ষুনি রওনা হচ্ছি।
দুঘণ্টার মধ্যেই কৃষ্ণকান্ত ফিরলেন। দু-তিন ঘণ্টার মোটরদৌড়ের পরও তার মুখে হাসি উপচে পড়েছে। চোখ চিকমিক করছে আনন্দে।
রেমি বুঝল, এই আত্মম্ভরী কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিষ্ঠুর ও আত্মকেন্দ্রিক লোটার কাছ থেকেও তার মুক্তি নেই। স্নেহের মতো শক্ত বাঁধন আর কী আছে? খুনি ডাকাত বাপকেও তার মেয়েটা সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসে। রাত্রে রেমি যখন ফিরল তখন ধ্রুব বই পড়ছে। অদ্ভুত সব বই পড়ে সে। শক্ত বিষয়। খটোমটো।
বইটা এক টানে নিয়ে রেখে দেয় রেমি। বলে, এবার তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া।
ধ্রুব একটু হাসল। কী অদ্ভুত মাদক হাসি। রেমির পায়ের তলায় ভূমিকম্প হতে লাগল। বুক উথাল-পাথাল।
» ০২৫. মুখখানা অমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন
তোমার মুখখানা অমন শুকনো দেখাচ্ছে কেন?
কোথায় শুকনো?–বলে নিজের অজান্তে গালে একটু আঙুল বোলায় বিশাখা।
দেখাচ্ছে শুকনো-শুকনো৷ বলে একটু ইঙ্গিতময় হাসি হাসে চুনী, তোমার কিছু হল নাকি?
বিশাখা একটু লাল হয়। বলে, যাঃ।
আজ চলে, গাঙে গিয়ে খুব ড়ুবিয়ে স্নান করে আসি। কী সুন্দর টলটলে জল!
যেতে দেবে না। মনুপিসিকে তো চিনিস না!
কত মেয়ে তো করছে।
সকলের মতো কি আমরা? বললেই বলবে, ধিঙ্গি মেয়ে ড্যাং ড্যাং কবে সকলের নাকের ওপর দিয়ে নাইতে যায় নাকি? এ বাড়ির মান-সম্মান নেই?
তাহলে ঝিয়েরা কাপড় আড়াল করে নিয়ে যাক।
দূর! সে আমার লজ্জা করে। দুধারে চারজন কাপড় টান করে আড়াল করবে আর মাঝখান দিয়ে চোরের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে যাওয়া, ও আমার ভাল লাগে না।
চুনী একটু মন-খারাপ গলায় বলে, তোমাদের অনেক ঝঞ্ঝাট। এটা বারণ, সেটা বারণ।
বিশাখা রাগ করে বলে, বারণ তত বেশ। আমরা কি আর-সকলের মতো সস্তা নাকি?
কুলতলার নিবিড় ছায়ায় ঘাসের ওপর দুজন বসা। কিছু কড়ি চিত উপুড় হয়ে পড়ে আছে ঘাসে। চুনী সেগুলো গুছিয়ে তুলছে একটা পুঁতির কাজ করা থলিতে। কত খেলনা আর কত সুন্দর সুন্দর জিনিস এদের। মাঝে মাঝে চুনীর ইচ্ছে করে এক-আধটা জিনিস কাপড়ের আড়ালে নিয়ে চলে যায়। এরা টেরও পাবে না। কিন্তু টের পায় আর-একজন। সে হরি। হরিখুডোর যেন একশো জোড়া চোখ। চতুর্দিকে ঘুরছে আর হিসেব নিচ্ছে। একটা পানের বোঁটা পর্যন্ত ভাঙার উপায় নেই। চুনীর রাগ হয়। হরি এ বাড়ির চাকর ছাড়া আর কিছু তো নয়। তফাত শুধু এই যে, সে কর্তাবাবুর চাকর। তার জোরেই সে এ বাড়ির আর সব ঝি-চাকরকে দাবড়ায়। এমনকী জুতো মারে, ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করেও দেয়। তার ওপর কথা বলার লোক নেই। নতুন ঝি-চাকর রাখেও সেই। তার পছন্দ না হলে। এ বাড়িতে কাজ পাওয়ার উপায় নেই।
চুনী কড়িগুলো তুলে থলির মুখে লাল টুকটুকে দড়ির ফাঁস টেনে বন্ধ করে বলে, তোমার বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে জানো?
বিশাখা দুখানা বড় বড় চোখ চুনীর মুখে স্থিরভাবে স্থাপন করে বলে, তোকে কে বলল?
চুনী একটু ভয় খেয়ে বলে, শুনেছি। কেন, তুমি জানো না? রাজেনবাবুর ছেলে শচীনবাবু–সেই যে ভারী সুন্দর চেহারা!
সুন্দর না হাতি!
তোমার পছন্দ নয়?
ওকে পছন্দ হবে কেন?
তবে তোমার কাকে পর্যন্ত?
তা জেনে তোর কী হবে? তোর কাকে পছন্দ?
আমার! আমার আবার পছন্দের কী?
তবে আমার কথা তোকে বলব কেন?
চুনী হিহি করে হাসে। তারপর উঠে বলে, চলো, চান করি গে। আজ তোমার পায়ে ঝামা ঘষতে হবে। মনু ঠাকরুন বলে দিয়েছে।
বিশাখা নড়ল না। অলস আনমনে বসে চারদিককার ঝুরো ছায়ার দিকে চেয়ে কীরকম বিভোর হয়ে থাকে।
চুনী জানে সে বিশাখার সখী নয়, বন্ধুও নয়। সঙ্গী বটে, কিন্তু আসলে সে বিশাখার ঝি। কাজেই বেশি ঘটাতে সাহস পায় না সে। বিশাখা এমনিতে ঠান্ডা সুস্থির হলে কী হয়, রেগে গেলে কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে ছাড়ে। রাগ পুষে রাখে। তবুচুনী নিজের মতো করে বিশাখাকে ভালবাসে। অত রূপ, ভাল না বেসে পারা যায়?
এই যে ঘন দুপুর, শেষ শীতের কবোষ্ণ রোদে এক ঝিমঝিম নেশারু মাদকতা ছড়িয়ে রেখেছে। চারধারে তা বিশাখাকে টেনে নেয় বুকের মধ্যে। কুলতলার ঝুরো ছায়া আর চারদিককার গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে ফরসা চাদরের মতো টানটান বোদ তাকে এক অদ্ভুত পুরুষের স্বপ্ন দেখায়। সে পুরুষ সাধারণ নয়। অপাপবিদ্ধ, দুর্মর সাহসী, বিশ্বজয়ি সেই মানুষ বোধ হয় স্বপ্নেই বাস করে। তবু তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া বিশাখার উপায় কী?
অনেকক্ষণ আনমনে বসে থাকে বিশাখা। চুনী উসখুস করে। তার মাথায় উকুন কুটকুট করছে। পেটের মধ্যে নাচছে খিদের বাঁদর। বিশাখার মুখের থমথমে ভাব লক্ষ করে সে কিছু বলতে সাহস পায় না।
কিছুক্ষণ বাদে অবশ্য বিশাখা নড়ল। উঠল। একটা হাই তুলে বলল, চল যাই।
পুকুরঘাটে দাসী সব সাজিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তেলের বাটি, ঝামা, গামছা, কাপড়, সাবান। বিশাখা পৈঠায় বসে। চুনী সযত্নে তার পায়ে ঝামা ঘষতে থাকে। ঘষতে ঘষতে তারও রূপমুগ্ধতার বিভ্রম ঘটে। এত সুন্দর নিটোল পা, ঝামা ঘষার কোনও দরকার নেই। একটুও ফাটা নয়, ময়লা নয়। শুধু পুরনো আলতার দাগ। সেটা উঠে যাওয়ার পরও টুকটুকে লাল। দুখানি পা-কে যেন মা দুর্গার পা বলে মনে হয়। কী সুন্দর! ইচ্ছে করে পা দুখানায় ঠোঁট ঘষে, কপালে চেপে রাখে কিছুক্ষণ।
