রেমি কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করল না। এমনকী জিনিসপত্র পর্যন্ত গোছাল না। হাতব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে ট্যাকসি ধরল। সোজা শ্বশুরবাড়ি কালীঘাট।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল সে।
ধ্রুব খুব রাত করল না। এমনকী মদ খেয়েও আসেনি। বেশ ক্লান্ত চেহারা। বোধহয় অফিসে খাটতে হয়েছে।
ঘরে ঢুকে থমকে গিয়ে বলল, আরে! আমি ভাবছি ওদিকে তুমি এ বাড়ির তলায় ডিনামাইট ফিট কবার জন্য গর্ত খুঁড়তে লেগেছ! আর তুমি নিজেই রিটার্ন পোস্টে ব্যাক করলে?
করলাম। তোমার কি একটু অসুবিধে হল?
আরে না। তুমি থাকলে একটু ঘেঁষাঘেঁষি হয় বটে, স্পেস কমে যায়, কিন্তু তাতে কী?
আমি থাকলে তোমার স্পেস কমে যায়?
তা একটু কমবারই তো কথা। এক ঘরে দুজন থাকলে।
শ্বশুরমশাই দোতলায় আমার ঘর ঠিক করে রেখেছেন, তা তো জানোই।
জানব না কেন! আমি বেশি মাতলামি করলে তুমি গিয়ে সেই ঘরে কত দিন থেকেও ছিলে।
এখন যদি পাকাপাকিভাবে ওপরেই থাকি?
থাকো। এ গুড ডিসিশন। ওয়াইজ।
তোমার সুবিধে হবে? সত্যিই হবে?
আঃ মাইরি! তুমি বহুত বকাবাজ আছে।
আজ তো মদ খাওনি, তবু ওরকম রকবাজের মতো কথা বলছ কেন?
একটু দিল্লাগি করছি।
তোমার ইয়ার্কি আমার ভাল লাগছে না। তুমি আমাকে সহ্য করতে পারো না কেন?
পারি না কে বলল? খুব পারি।
না পারো না।
বাপের বাড়িতে কী হল? ওখানেও খিচ লেগেছিল নাকি?
না। আমি নিজেই থাকতে পারিনি।
বিরহ নাকি!
হতে পারে।
তুমি খুব অদ্ভুত আছ। সেলফ-রেসপেক্ট নেই।
নেই। তুমি আমার খোঁজ নাওনি কেন?
নেওয়ার কথা ছিল বুঝি?
কথা ছিল না। তবু নিতে পারতে!
আমি ভাবলাম তুমি ওখানে গিয়ে বেশ আছে। খামোকা ঝামেলা মাচিয়ে লাভ কী?
না, তা ভাবোনি।
তবে কী ভেবেছি বলো তো অন্তর্যামী?
তুমি আমার কথা মোটেই ভাবোনি।
ধ্রুব খুব চিন্তিতভাবে নিজের মাথায় দুটো টোকা মেরে বলল, ভাবিনি। সত্যিই ভাবিনি নাকি? ঠিক জানো! না, এক-আধবার নিশ্চয়ই ভেবেছি।
ইয়ার্কি কোরো না। তুমি জানো, বাপের বাড়িতে মেয়েদের স্বামীর জন্য কতটা অপমান সইতে হয়?
কে অপমান করেছে তোমাকে?
তা শুনে আর কী হবে?
তবু বলো। ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।
কেউ আমাকে অপমান করেনি। করেছো তুমি।
আমি? আমি কী করলাম?
খোঁজ নাওনি। একবার যাওনি। শুধু তুমিই নও। এ বাড়ির কেউ খোঁজ করেনি।
তুমি কদিন হল গেছ?
তাও মনে নেই? চার দিন।
ওঃ চার দিন! আমি ভাবছিলাম, কাল-পরশুই একবার যাব।
উঃ মুখে আসেও সব মিথ্যে কথা!
না, সত্যিই একবার ভেবেছিলাম কিন্তু।
রেমি একটু হাসল। ম্লান হলেও হাসিটা তার বুক থেকেই উঠে এল। সাজানো নয়। মাথা নেড়ে সে বলল, জানি, সব জানি।
ধ্রুব তার মুখোমুখি বসে বলল, তবু আমার ওপর সত্যিকারের রাগ করতে পারছ না?
রেমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, পারছি। আমার সব রাগ এখন তো তোমারই ওপর। কিন্তু সে রাগেব তো কোনও দাম নেই।
কে বলল তো?
যে রাগের দাম দেয় তার ওপরেই রাগ করা যায়।
ধ্রুব মাথা নেড়ে বলল, মেয়েমানুষকে আমি ভাল চিনি না, বুঝলে! মাকে যদি পেতাম, বুঝতাম।
ওটা কোনও কথা হল না।
ওটাই কথা। তুমি বুঝবে না। ওটাই কথা।
ওটা তো অতীত। বহু দিন পার হয়ে গেছে।
ধ্রুব মাথা নাড়ে, অতীত হলে বেঁচে যেতাম। মা এখনও রোজ আমার মনে এসে হানা দেয়। না, কথাটা ঠিক হল না। মার সবটুকু নয়। শুধু একটা দৃশ্য। সারা গায়ে আগুন, তার মধ্যে মা–আমার ভীষণ ফরসা মা কালো থেকে আরও কালো হয়ে যাচ্ছে। বীভৎস!
রেমি সম্মোহিতের মতো চেয়ে থাকে। কতদিন নিজেকে নিয়েও একরকম দৃশ্য কল্পনা করেছে সে। কেরোসিন ঢেলে গায়ে আগুন দেবে, নয়তো গলায় ফাঁস আটকে ঝুলবে, বিষ খাবে।
ধ্রুবর মায়ের কথা খানিকটা শুনেছে রেমি। বেশি শুনতে চায়নি সে। তার মনে হয়েছে মায়ের ঘটনাটাকে ধ্রুব সুকৌশলে বাপের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে কাজে লাগাচ্ছে। শোক এত দীর্ঘস্থায়ি হয় না কখনও।
রেমি বলল, ওরকম একটা দৃশ্য এখন দেখতে তোমার কেমন লাগবে?
তার মানে?–ধ্রুব একটা কল্পনার স্তর থেকে নেমে এল।
যারা গেছে তারা তো গেছেই, যারা আছে তাদের ধরে রাখতে হবে তো!
ধ্রুব গম্ভীর হল। বলল, হুঁ।
আমি তোমাকে ভয় দেখাচ্ছিলাম না।
ধ্রুব জামাকাপড় পালটাতে লাগল। তারপর বলল, শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করেছ?
না।
উনি কদিন খুব দুশ্চিন্তা করছেন তোমার জন্য।
তাই বুঝি খোঁজ নেননি।
খোঁজ নিতে ওঁর সম্মানে লাগে হয়তো। বিশেষ করে পুত্রবধূর বাপের বাড়িতে। কিন্তু কথাটা বিশ্বাস করতে পারো। এ কয়দিন উনি ভাল করে খাননি, ভাল ঘুমোননি। শুনেছি আমার উদ্দেশে অজস্র কটুকাটব্যও করেছেন।
রেমি খুশি হয়ে বলল, তোমার দোষ কী?
ওঁর ধারণা আমার জন্যই তুমি রাগ করে বাপের বাড়ি গেছ। অথচ প্রকৃত ব্যাপারটা জানার কোনও উপায় নেই। অক্ষম আক্রোশে এই চারদিন উনি কনটিনিউয়াস ফ্রঁসেছেন।
রেমি উঠে পড়ল। বলল, যাই গিয়ে বলে আসি যে, আমি এসেছি।
ধ্রুব গম্ভীর হয়ে বলল, যাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো। উনিই সেই ভিলেন যিনি রক্তের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী। উনিই সেই খলচরিত্র যিনি তোমাব চরিত্রের ইন্টিগ্রিটিতে বিশ্বাস স্থাপন করতে পেরে সমীরকে কলকাতায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। উনিই সেই—
রেমি হাতজোড় করে বলল, দয়া করে চুপ করবে?
কেন বলো তো!
আমি সব জানি।
তবু মনে করিয়ে দিলাম। লোকটাকে যতটা শ্রদ্ধা করা উচিত নয় ততটা কোরো না।
আমি অত হিসেব জানি না। শুধু এটুকু জানি, সব সত্ত্বেও উনি আমাকে স্নেহ করেন।
