তাই নাকি? কিন্তু আমি ওসব বুজরুকি শুনতে চাই না। আসল কথাটা বলো।
সেটাই বলার চেষ্টা করছি। ধারণাটা আমার নয়। অন্য কারও। কিন্তু ধারণাটা আমাদের ভিতরে ঠিকই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তুমি শিলিগুড়ি গেছ। সমীরও সেখানেই আছে। সমীর এবং তুমি তোমাদের দুজনের মধ্যে কী রিলেশন তা আমি জানি না। ইন্টারেস্টেডও নই। কিন্তু দেয়ার ইজ এ হামিং অ্যাবাউট ইট।
ছিঃ ছিঃ!
ব্যাপারটা হয়তো নিতান্তই ছিঃ ছিঃ। কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। শুনেছি তোমার শ্বশুর সমীরকে কলকাতায় ডেকে পাঠিয়েছিল। জরুরি কাজে। সে আসেনি।
তোমরা এত হীন?
তুমি আর কতটাই বা জানো? আমরা তার চেয়েও হীন। সেইজন্যই তোমাকে বলি, এ বাড়ির বনিয়াদ ভাঙতে থাকো। সব মুখোশ খুলে দাও।
আমার বাচ্চাটা যে তোমার নয় একথাটা কে প্রথম তোমাকে বলে?
ধ্রুব অবাক হয়। বলে, কেউ তো বলেনি!
তাহলে?
বললাম তো, কেউ মুখ ফুটে বলে না। কিন্তু সন্দেহের বীজ বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। আর বাতাসেই সব বার্তা সবাই জানতে পেরে যায়।
আমি ওসব বিশ্বাস করি না। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে একটা বাচ্চাকে খুন করা কি মানুষের কাজ, পিশাচের?
পিশাচের। এ ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে একমত।
যাতে কিছুতেই, কোনও রক্তৃপথেই এ পরিবারের রক্তে কোনও কলুষিত রক্ত ঢুকতে না পারে, সেই জন্য?
অবিকল তাই।
রেমির চোখ-মুখ অস্বাভাবিক তীক্ষ আর গনগনে হয়ে উঠছিল। তবে সে ধ্রুবকে আক্রমণ করল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, কিন্তু এ ঘানা আমি ঘটাব।
কী ঘটাবে?
তোমাদের রক্তের বিশুদ্ধতার শুচিবাই আমাকে ভাঙতেই হবে।
ধ্রুব উদাস গলায় বলে, ভাঙাই উচিত। ভাঙো।
আমি তোমার পারমিশান চাইনি।
চাওনি, তবু আমি দিলাম। এমনকী এ ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে কো-অপারেটও করতে পারি।
তার মানে?
আমি বলছি, তোমার এই ভেনচারে আমার সায় আছে। আমি হেলপও করতে পারি।
রেমি এই অদ্ভুত ও কিম্ভুত লোকটার দিকে হতবুদ্ধির মতো চেয়ে রইল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, তুমি কি বিশ্বাস করো যে, সমীরের সঙ্গে আমার সত্যিই কিছু হতে পারে? এটা কি সম্ভব?
ধ্রুব মৃদুস্বরে বলে, আমার মতামত চাইছ কেন?
তুমি আমার স্বামী, তোমার মতই আমার কাছে সবচেয়ে ইমপরট্যান্ট।
আমি নামকোবাস্তে স্বামী।
সে তো ঠিকই। তবু আমার জানা দরকার, কথাটা তুমি বিশ্বাস করো কি না।
ধ্রুব একটু সময় নিল। নিজের নখগুলোর দিকে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। তারপর একটা শ্বাস ফেলে বলল, অনেকক্ষণ ভ্যাজরং-ভ্যাজরং করছি। আর ভাল লাগছে না।
বলবে না? কথাটা আমার যে জানা ভীষণ দরকার।
কেন, আত্মহত্যাফত্যা করবে নাকি?
সেটা জানার পর ঠিক করব।
আজকাল এসব আকছার হয়। আত্মহত্যা-ফত্যা করে বোসো না। তাহলে তোমার শ্বশুরের পলিটিক্যাল কেরিয়ার ফিনিশ হয়ে যাবে।
রেমি ঠান্ডা মাথাতেই বলে, বলো।
ধ্রুব মাথা নাড়ল, না করি না।
সত্যি বলছ?
বলছি।
তাহলে? তাহলে বাচ্চাটা নষ্ট করলে কেন?
বহুত জেরা করছ ভাই।
একথাটার জবাব দাও।
শুধু একথার জবাব দিলেই হবে?
হবে।
আমার ধারণা তোমার প্রেগন্যান্সি সম্পর্কে কারও সন্দেহ হয়েছিল। সে চায় এই বংশের ধাবায় কোনও বরক্ত এসে যেন না মেশে। এবং তার সেই সন্দেহের সম্মান রাখতেই ঝামেলাটা করতে হয়েছিল।
তিনি কি শ্বশুরমশাই?
হতে পারে। তবে আমাকে কৃষ্ণকান্তবাবু এম এল এ এবং মাননীয় মন্ত্রী নিজের মুখে কিছু বলেননি। তবে সন্দেহটা এ বাড়ির বাতাসে জীবাণুর মতো সংক্রামিত হয়েছিল।
তোমাকে তো কেউ নিশ্চয়ই বলেছিল!
না। আমি টের পেয়েছিলাম।
এটা কি আমাকে বিশ্বাস করতে বলো?
বলি। আমি প্রয়োজনে মিথ্যে কথা বলি। অপ্রয়োজনে নয়।
আমি আজই তোমাদের বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছি।
উইশ ইউ গুড লাক। তৈরি হয়ে নাও।
রেমি উঠল এবং বাস্তবিকই একটা ছোট ব্যাগ গোছাতে লাগল।
ধ্রুব অলস চোখে ব্যাপারটা দেখতে দেখতে কয়েকবার হাই তুলল।
তারপর উঠে পোশাক পরে বেরিয়ে গেল।
কাউকেই কিছু বলল না রেমি। কারও অনুমতি নিল না। তার মাথা আর বুক জুড়ে একটা ঘৃণা রাগ আর ধিক্কারের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে কিছু সঠিক ভাবে চিন্তা করতে পারছে না। উচিত-অনুচিতে বোধ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
বাপের বাড়িতে এসে দুদিন প্রায় নির্বাক রইল রেমি। কারও প্রশ্নের জবাব দেয় না। কারও দিকে তাকায় না। শুধু গভীর রাতে বালিশে মুখ ঠেসে ধরে কেঁপে কেঁপে কাঁদে।
আশ্চর্য এই, তিন দিনেব মধ্যেও তার শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ খোঁজ করতে এল না। ব্যাপাবটা অস্বাভাবিক। রেমির বাপের বাড়ির সকলেই খানিকটা চিন্তিত উদ্বিগ্ন। কিন্তু রেমির মুখে কিছু না শুনে তারাও কৃষ্ণকান্ত বা ধ্রুবকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ভরসা পায় না। রেমির বাপের বাড়িতে ফোন নেই, থাকলেও ও বাড়ির থেকে কেউ খোঁজ করত কি না কে জানে।
চতুর্থ দিন অফিস থেকে ফিরে রেমির বাবা নিশ্চিন্ত গলায় বললেন, আজ কৃষ্ণকান্তবাবুর সেক্রেটারি আমার অফিসে ফোন করেছিলেন।
উদ্বিগ্ন রেমির মা বললেন, কী কথা হল?
এমনি। রেমি কেমন আছে জানতে চাইল।
আর কিছু বলল না?
না।
আমি তো মেয়ের ভাবগতিক ভাল বুঝছি না। ওরা বাঙাল মানুষ, মেয়ে বোধহয় মানিয়ে নিতে পারছে না।
শুধু বাঙাল নয়, জামাই বাবাজিও সুবিধের লোক নয়। এখন বুঝতে পারছি না বিয়েটা দিয়ে ঠিক কাজ করেছি কি না।
ছোট বাড়ি। পরিসর কম। সব কথাই রেমির কানে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে বিস্ফোরণ ঘটে। সে আর সব সহ্য করতে পারে, শুধু ধ্রুবর প্রসঙ্গটা বাদে। ওই একটা বিষয় নিয়ে কেউ কিছু বলুক তা সে সইতে পারে না।
