শশী বলে, বরং পুলিশের ধারণা তো উলটোই। তারা বলে যে, আপনি আমাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
বলে নাকি?
বলে। রঙ্গমাসির ওপরে দারোগাবাবুর খুব রাগ।
জানি।–হেমকান্ত বিষণ্ণ গলায় বলেন, ওকেও ধরে আনতে চাইছে।
কথাটা শুনে শশী অবাক হল না। খানিকটা উদাস গলায় বলল, ধরতেই পারে। একদিন রঙ্গমাসি ধরা পড়বেনই। উনি ভীষণ বেপরোয়া।
তাই নাকি? দেখো শশী, ওকে ছেলেবেলা থেকে চিনি বটে, কিন্তু কী যে ওর চরিত্র তা আজও ভাল বুঝলাম না। অদ্ভুত মেয়ে।
শশী মাথা নাড়ল। তারপর বলল, কৃষ্ণ কেমন আছে?
ভালই। তোমার খুব ভক্ত হয়ে উঠেছিল কয়দিনে! তাই না?
হ্যাঁ। খুব স্পিরিটেড ছেলে আপনার।
হেমকান্ত আবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। ছেলেকে তিনি ইদানীং একটু কাছে ভিড়তে দিয়েছেন বটে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণকান্ত কেমন ছেলে তা তিনি খুব ভাল জানেন না।
শশী বলল, আপনার বাড়িতে আমার খুব ভাল কেটেছিল। জ্বরটা না হলে আরও ভাল কাটত।
সব ভাল যার শেষ ভাল। শেষ অবধি আর ভাল কাটল কই তোমার! ধরা পড়ে গেলে।
শশী মাথা নেড়ে বলে, ধরা পড়তেই হত। উপায় ছিল না। আমার ওপর কমান্ডারের অর্ডার ছিল সুইসাইড করার। তা আমি করিনি।
হেমকান্ত শিউরে উঠলেন।
শশী আপনমনেই বলল, মার মুখ মনে পড়ায় ভেবেছিলাম, একবার মাকে দেখে নিয়ে তারপর দূরে কোনও নির্জন জায়গায় গিয়ে সুইসাইড করব। যাতে আমার লাশ কেউ খুঁজে না পায়। মা যাতে ধরে নেয়, আমি নিরুদ্দেশ। কিন্তু হল না।
যেতে পারলে না মার কাছে?
না। অসুবিধে ছিল। কিন্তু সুইসাইডও করা হল না। প্রথম চোটে না করতে পারলে পরে নানারকম দুর্বলতা দেখা দেয়।
ওসব কথা ভেবো না, শশী। আমি ভাল উকিল দিয়েছি। সে তোমাকে খালাস করে আনবে।
পারবে?–শশী ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করে।
কেন পারবে না? তাকে সব বোলো।
শশী ঘাড় নাড়ল। কেমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল তাকে। জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সে বলল, আপনাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি। কিছু মনে করবেন না।
হেমকান্ত ধীর স্বরে বলেন, তোমার বয়সি এবং তোমার চেয়ে বড় ছেলে আমার আছে। কেউ স্বদেশি করেনি কখনও। কিন্তু এক-আধজন যদি করত তবে খুশি হতাম।
শশী বলল, আপনাদের বংশে তো স্বদেশির রক্ত আছেই।
হ্যাঁ। আমার ভাই ছিল।
শুনেছি। রঙ্গমাসি সব বলেছে।
হেমকান্ত জ্বরের ঘোরে কাঁপছিলেন। উঠলেন। অস্ফুট স্বরে বললেন, আসি।
ফেরার পথে সারা রাস্তায় হেমকান্ত আচ্ছন্নের মতো এলিয়ে রইলেন। বাড়িতে ফিরে নামতে যাবেন, একটা হাত তাঁকে ধরল।
মনু! আমার বড় জ্বর আসছে মনু!
জানি। খারাপ শরীর নিয়ে কোন রাজকার্যে গিয়েছিলে?
শশীর কাছে।
কেন? চলো, ওপরে চলো, এখন আর কথা নয়।
হেমকান্ত ওপরে উঠতে উঠতে হাঁফিয়ে গেলেন। বড় বড় শ্বাস পড়তে লাগল। বিছানায় শুয়ে এক আচ্ছন্নতার সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করতে করতে বললেন, ও বিশ্বাস করে না।
কী বিশ্বাস করে না?
ও গুজবটায় বিশ্বাস করে না।
কোন গুজব?
আমি যে ওকে ধরিয়ে দিয়েছি তা ও বিশ্বাস করে না।
ঠিক আছে। এখন চুপ করে শুয়ে থাকো।
তুমি ওকে আমার কথা কী বলেছে, মনু?
তোমার কথা! তোমার কথা বলতে যাব কেন? বলেছ।
রঙ্গময়ি লেপ দিয়ে হেমকান্তকে ঠেসে চেপে ঢাকা দিয়ে বলে, বেশ করেছি বলেছি। বলেছি আমার মাথা আর মুন্ডু।
কই, আমাকে তো আমার কথা বলো না!
বলার কিছু নেই বলে।
আমাকে তো কেবল বকো, ধমকাও।
বেশ করি।
মনু, আমি মরে যাব এবার? কত জ্বর বলো তো!
যত জ্বরই হোক, মরণ তোমার কাছে ঘেঁষুক তো একবার! চুপ করে থাকে। তোমার মনুর শরীরে এখনও প্রাণ আছে।
০২৪. রেমি মাথা ঠান্ডা রেখে
রেমি মাথা ঠান্ডা রেখে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, বাচ্চাটা যে তোমার নয় এরকম একটা কথা তুমি কি মনে করো?
ধ্রুব মাথা নাড়ল, কী জানি। হতে পারে।
আমি জানতে চাই এরকম ধারণা তোমার কেন হল!
ধারণা আমার নয়। আমি আজকাল তলিয়ে কিছু ভাবতেই পারি না।
তাহলে ধারণাটা কার?
ধ্রুব খাওয়া থামিয়ে পিছনে হেলান দিয়ে খুব অপ্রতিভ মুখে একটু হেসে বলল, এসব নিয়ে আকচা-আকচি কি এখনই করতে হবে? আমি ড্যাম টায়ার্ড।
টায়ার্ড আমিও। তোমাকে নিয়ে।
আমাকে ছেড়ে দাও না কেন? তোমার কি কোনও প্রেমিক নেই, আমাকে ছেড়ে দিয়ে যার কাছে ফিরে যেতে পারো?
না। আমরা সেরকম মানুষ নই।
তোমরা কীরকম মানুষ তাহলে? সর্বংসহা সতী সাধ্বী? মাইবি, এই সব টাইপ নিয়েই পুরুষদের যত ঝামেলা।
আমি এখনও তেমন ঝামেলা করিনি, কিন্তু করব! কথাটার জবাব দেবে?
ধ্রুব উঠে বেসিনে আঁচিয়ে এসে বলল, ঘরে চলো।
ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল ধ্রুব। তারপর সিগারেট ধরিয়ে বলল, কথাটা বেস বেবিয়ে গিয়েছিল সেদিন। যেতে দাও। আর হবে না।
ওটা কোনও এক্সপ্লানেশন নয়। কথাটা বোস বেরোয়ওনি। যদি কথাটাই বড় হত তাহলে তুমি আমাকে মিথ্যে বুঝিয়ে পেটের বাচ্চাটা নষ্ট করতে না। আরও কিছু আছে।
ধরো, ঠিক এই সময়ে আমি বাচ্চা চাইছিলাম না।
সেটা আমাকে বলতে পারতে। ডিসিশনটা আমরা দুজনে মিলেই নিতাম।
তুমি নিতে পারতে না রেমি। তুমি একটু সেকেলে টাইপের।
দেখো, আমার সঙ্গে এখন চালাকি কোরো না। আমার মন ভাল নেই। আমাকে নিয়ে খেলা পুতুলের মতো যা খুশি অনেক করেছ। ব্যাপারটা শেষ হওয়া দরকার।
ধ্রুব কি একটু ভয় পেল? হবেও-বা। তার মুখ-চোখে কিন্তু জলে-পড়া ভাব ফুটে উঠছিল।
ধ্রুব খানিকক্ষণ নীরবে সিগারেট টেনে গেল। তারপর হঠাৎ বলল, ওরকম ধারণার কথা কেউ মুখ ফুটে বলেনি। কিন্তু তবু এ বাড়ির বাতাস শুকলে কখনও কখনও তুমি মানুষের মনোভাব টের পাবে। অবশ্য খুব সেনসিটিভ নার্ভ থাকা দরকার।
