হেমকান্ত নিশ্চুপ বসে রইলেন। লোকে জানে, তিনি শশিভূষণকে ধরিয়ে দিয়েছেন। পুলিশের বিশ্বাস, তিনি শশিভূষণকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। বড় অদ্ভুত অবস্থা।
হেমকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। লোকের সঙ্গে তিনি কখনও ঝগড়া বা তর্ক করেনি। কী করে যুক্তি প্রয়োগ করতে হয় তাও তার অজানা। তার ওপর এক আতঙ্কে তার মন ও মাথা ছেয়ে আছে।
রামকান্ত বললেন, শশিভূষণের সঙ্গে দেখা করতে চান কেন?
একটু দরকার ছিল। কোনও অসুবিধে আছে?
হাসপাতাল থেকে এনে তাকে এখনও থানার হাজতেই রাখা হয়েছে। অসুবিধে আছে বই কী। তবে আপনার জন্য ব্যবস্থা করে দিতে পারি।
খুব ভাল হয় তা হলে।
আসুন।–বলে রামকান্ত উঠলেন। থানার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, রঙ্গময়ি আপনার কে হয়? কোনও আত্মীয়া নয় তো?
ঠিক তা নয়।
মেয়েটির প্রতি লক্ষ রাখবেন। ওর অ্যাকটিভিটি যথেষ্ট সন্দেহজনক।
রঙ্গময়ি কী করেছে?
সে আপনিও নিশ্চয়ই জানেন।
হেমকান্ত ভয় খেয়ে চুপ করে গেলেন। বোস কোনও কথা যদি বেরিয়ে যায়!
প্রথম দর্শনেই বোঝা গেল যে, শশিভূষণ বড় একটা যত্নে নেই। খুব রোগা হয়ে গেছে। সুকুমার মুখশ্রীতে একটা হাড় উঁচু লাবণ্যহীনতা। গালের কোমল দাড়ি রুক্ষ। চুল পিঙ্গল। মোটা কম্বলে গা ঢেকে বিছানায় বসে ছিল।
হেমকান্তকে দেখে হঠাৎ চিনতে পারল না। না চেনারই কথা। মাত্র একবারই পরস্পর দেখা হয়েছিল। তারপর জল ঘোলা হয়েছে কিছু কম নয়।
হেমকান্ত আত্মপরিচয় দিতেই কিন্তু শশিভূষণের মুখ ভীষণ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি উঠে এল বিছানা থেকে। আশ্চর্যের কথা, নিচু হয়ে গরাদের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে সে হেমকান্তর পায়ের ধুলো নেওয়ারও চেষ্টা করল।
হেমকান্ত পিছিয়ে গিয়ে বললেন, থাক থাক।
তার মনে হল, এরকম তেজি ও প্রাণভয়হীন যুবকের প্রণাম নেওয়াটা তার পক্ষে পাপ হবে।
সাগ্রহে শশিভূষণ জিজ্ঞেস করল, বাড়ির সবাই কেমন আছেন?
ভাল।
রঙ্গমাসি ভাল?
হ্যাঁ। তোমার জন্য খুব দুশ্চিন্তা করছে।
ওঁকে বলবেন, আমি ভাল আছি।
বলব। কিন্তু তুমি সত্যিই কেমন আছ?
শশিভূষণ হাসল। বলল, এখনও খারাপ কিছু লাগছে না।
এখানকার খাওয়া-দাওয়া?
জঘন্য। তবে আমার ওসব অভ্যাস আছে।
মারধোর করে না তো!
না না। এখনও ওগুলো শুরু হয়নি। শুনছি বরিশালে চালান দেবে। তখন কী হয় বলতে পারি না।
তোমার বাড়িতে একটা খবর দেব?
শশিভূষণ আবার শুকনো ঠোঁটে হাসে। ঠোঁট দুটো চড়চড়ে শুকনো। মামড়ি এবং রক্ত শুকিয়ে আছে। কষ্টেই হাসতে হয়। বলল, ওসব পুলিশ নিজের গরজেই করবে। আপনি ভাববেন না।
শোনো শশী, আমি তোমার জন্য উকিল লাগিয়েছি। তুমি তাকে যথাসাধ্য সাহায্য কোরো।
শশিভূষণ অবাক হয়ে বলে, আপনি উকিল লাগালেন কেন?
এমনি। তুমি আমার অতিথি ছিলে। পুলিশ তোমাকে সেই অবস্থায় ধরে এনেছে। আমার মনে হল তোমার জন্য কিছু করা আমার আতিথেয়তা হিসেবেই কর্তব্য।
শশী ম্লান হেসে বলল, যথেষ্টই করেছেন। রঙ্গমাসি দিনরাত আমার সেবা করেছেন। কয়েকদিন আরামের আশ্রয় জুটেছিল। আর কী চাই?
ওটুকু কিছুই নয়। তুমি তার চেয়ে ঢের বেশি কষ্ট করেছ। দেশের লোকের জন্যই করেছ। তোমার জন্য কিছু করতে পারলে আমার নিজেরই ভাল লাগবে।
শশী বলল, উকিল আমার বাবাও নিশ্চয়ই দেবেন।
তা তো জানি। তবে অধিকন্তু ন দোষায়। ভাল কথা, তুমি তোমার বাড়ির যে ঠিকানাটা দিয়েছিলে সেটা কি যথার্থ?
শশিভূষণ লজ্জার হাসি হেসে বলে, না। সত্যি ঠিকানা দেওয়ার নিয়ম নেই।
তোমার বাবা কী করেন?
ব্যাবসা।
তোমরা কি ধনী?
ধনী না হলেও বাবার অবস্থা খারাপ নয়।
তা হলে তুমি আদরেই মানুষ হয়েছ।
তা হয়েছি।
এখন যে এত কষ্ট তা সইছ কী করে?
মনটাকে শক্ত করে ফেললে আর কষ্ট থাকে না।
মনকে শক্ত করা কি সহজ কাজ, শশী?
তা নয়। খুব শক্ত কাজ। তবে অভ্যাস করে নিতে হয়েছিল।
তোমার এত কম বয়স, এত অভ্যাস করার সময় পেলে কবে?
শশিভূষণ একটু হাসল মাত্র।
হেমকান্ত গলা খাঁকারি দিলেন। শরীরটা ভাল নেই। মাথা ঝিমঝিম করছে। গায়ে জ্বরের সঞ্চার টের পাচ্ছেন। প্রবল শীত করছে। গরাদটা শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, একটা কথা।
বলুন।–সসম্ভ্রমে শশী বলে।
লোকে বলছে আমিই নাকি তোমাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি।
আপনি!–শশী আকাশ থেকে পড়ে।
লোকে তাই ভাবছে। একটা প্রচারও হচ্ছে।
কে একথা রটাল?
তা বলা শক্ত। তবে রটেছে। কথাটা কি তুমি বিশ্বাস করো?
শশী হতভম্বের মতো চেয়ে থেকে বলে, আপনি আমাকে ধরিয়ে দেবেন একথা কি বিশ্বাসযোগ্য?
তুমি বিশ্বাস করো না তো!
ওরকম কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। রঙ্গমাসির কাছে আপনার কথা কত শুনেছি!
আমার কথা! মনু মানে রঙ্গময়ি তোমাকে আমার কথা বলত নাকি?
বলত মানে! রঙ্গমাসি শুধু আপনার কথাই তো বলতেন।
আমার সম্পর্কে এত কী বলার থাকতে পারে তার?
ও বাবা, সে অনেক আছে। ওঁর কাছে বোধহয় আপনিই ভগবান।
হেমকান্ত ভীষণ অবাক হয়ে যান। রঙ্গময়ি তাঁর সম্পর্কে ভাল কথা বলে বেড়ায় তাহলে কিন্তু কী কথা?
একবার ইচ্ছে হল জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু লজ্জা করতে লাগল। নিজের প্রশংসা অন্যের মুখ থেকে টেনে বের করার প্রবণতা ভাল না।
হেমকান্ত একটা নিশ্চিন্তের শ্বাস ছেড়ে বলেন, তাহলে তুমি বিশ্বাস করো না। আমি স্বস্তির শ্বাস ফেললাম।
কারা এসব বলছে বলুন তো? তাদের চাবকানো দরকার।
লোকে নিন্দা করতে এবং শুনতে ভালবাসে। প্রায় সকলেই। কজনকে চাবকাবে? লাভ নেই।
