এ এক রহস্য। এক অদ্ভুত জটিল রহস্য। ধ্রুবর ওপর যেরকম প্রচণ্ড রাগ ও ঘৃণা ক্ষণিকের জন্য। পাগল করে তুলেছিল তাকে, তেমনি ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর বুক ভাসিয়ে এল করুণা মায়া গভীর এক ভালবাসা। সেই দুকূল ছাপানো ভালবাসায় বয়ঃসন্ধির প্রথম প্রেমের মতো উন্মন চঞ্চল হল রেমি। কিন্তু হায়! যাকে নিয়ে তার এই ভালবাসা সেই অপ্রকৃতিস্থ পুরুষ আবার এঁটে দিল তার অভ্যন্তরের কপাট। রেমিকে যেন চেনেই না।
পরদিন গলায় মাফলার জড়িয়েই অফিসে বেরোল ধ্রুব। গভীর রাতে ফিরল মাতাল হয়ে।
দুদিন পর চলে গেল ব্যাঙ্গালোর অফিসের কাজে। রওনা হওয়ার আগে রেমি বলল, আমাকে নিয়ে যাও। কলকাতা বড় একঘেয়ে লাগছে।
আরে দূর! আমি যাচ্ছি হারিকেন ট্যুরে। কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকব। তোমার কি আর হোটেলে একা-একা বসে থাকতে ভাল লাগবে?
তবু তো চেঞ্জ!
আচ্ছা, পরের বার হবে।
আমাকে অ্যাভয়েড করছে?
ধ্রুব একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ঠিক তা নয়। তবে অনেক ঝামেলা আছে। আমরা ইচ্ছেমতো বউ নিয়ে বেড়াতে যেতে পারি না। শ্বশুরের পারমিশন নিতে হবে তোমাকে।
নিতে হলে নেব।
উনি দেবেন না।
কেন দেবেন না?
উনি আমাকে বিশ্বাস করেন না। দার্জিলিং-এ আমি কী কাণ্ড করেছিলাম মনে নেই?
মদ খাবে, এই তো? সে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।
আর যদি ফের মারপিট লাগে?
তা হলেও তো আমার সঙ্গে থাকা দরকার। তোমাকে দেখবে কে?
প্লিজ রেমি, চাপাচাপি কোরো না।
আমার সঙ্গ তোমার ভাল লাগে না?
ধ্রুব একটু হেসে বলল, কথাটা মিথ্যেও নয়। তোমার সঙ্গ বলে কথা নেই, আসলে আমি মেয়েদের বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারি না।
কেন পারো না?
রেগে যেয়ো না। গার্লস আর এ অফুল লট। তাদের এতরকম প্রবলেম থাকে।
আমি তোমাকে কখনও কোনও প্রবলেমের কথা বলি?
না। তবে তুমি নিজেই একটি জ্যান্ত প্রবলেম।
কীরকম?
ধ্রুব হাতঘড়ি দেখে বলল, অত সময় নেই রেমি। এ নিয়ে পরে কথা হবে।
রেমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলে, তুমি অনেক কথাই শুরু করে, কিন্তু শেষ করো না। মেয়েদের যদি তুমি অতই অপছন্দ করে তা হলে বিয়ে করেছিলে কেন?
একথার একটা পেটেন্ট জবাব আছে ধ্রুবর। সে বলে, বিয়ে আমি করিনি, বিয়ে আমাকে করানো হয়েছে। আমি মন্ত্র উচ্চারণ করিনি বিয়ের সময়। কিন্তু আজ ধ্রুব সে জবাব দিল না। বরং মুখে একটা অবাক ভাব ফুটিয়ে বলল, আমি বিয়ে না করলে তোমার বিয়ে হত কার সঙ্গে?
রেমি বলল, অনেক ভাল ছেলে ছিল। অনেক ব্রাইট, লাভিং, ব্রড-হার্টেড পাত্র জুটতে পারত।
তাই নাকি? তা হলে ম্যারেজেস আর মেড ইন হেভেন কথাটা সত্যি নয় বলছ?
মোটেই নয়।
আমার তো মনে হয় বিয়েটা বাস্তবিকই ভবিতব্য। আমি ছাড়া তোমার গতি ছিল না।
না, মোটেই না। আমি এ বিয়ে মানছি না।
ধ্রুব বড় বড় চোখে রেমির বিদ্রোহী চেহারাটার দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, সাব্বাস! এই তো চাই।
তার মানে? ইয়ার্কি করছ নাকি?
ধ্রুব দুহাত রেমির কাঁধে রেখে বলে, না রেমি, একটুও ইয়ার্কি নয়। শোনো, আমি বাস্তবিকই তোমাকে বিয়ে করিনি। অন্তত স্বেচ্ছায় নয়। তুমি কি আমাকে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছ?
রেমির চোখ ফেটে জল আসছিল। ফুসে উঠে বলল, তোমাকে চিনলে কখনও স্বেচ্ছায় বিয়ে করতাম না।
তোমার কোনও লাভার ছিল না?
না। কিন্তু তাতে কী?
ছিল। বলবে না। ঠিক আছে, শুনতে চাই না। তবে আমার মনে হয়, তোমার মতো সুন্দরী মেয়েদের লাভার না থাকাটাই অস্বাভাবিক।
রেমি ছিটকে সরে গিয়ে বলল, ঘোটলোক! ছুঁয়ো না আমাকে। তুমি ছুঁলে আমার ঘেন্না করে।
ধ্রুব হাসল। উদার গলায় বলল, আরে সিস্টার খুব রেগে যাচ্ছ। সেন্টুতে সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য কথাটা বলিনি মাইরি। আমি বলতে চাই, সত্যিই যদি কোনও লাভার থেকে থাকে তবে তার কাছেই তোমার ফিরে যাওয়া উচিত।
মুখে এল কথাটা তোমার? বলতে জিব সরল? ছিঃ!
আঃ, মাইরি! ফের তুমি সেন্টু হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু আদত কথাটা যদি বুঝতে! তুমি কি জানোনা বা এতদিনেও টের পাওনি যে, কৃষ্ণকান্তর বখে যাওয়া এক ছেলেকে আবার লাইনে আনার জন্য তোমার মতো একটি সুন্দরী মেয়েকে ভারচুয়ালি উৎসর্গ করা হয়েছে। ঠিক যেভাবে পাঁঠা বলি দেয়! পারছ বুঝতে?
রেমির নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছিল রাগে। বলল, হ্যাঁ। এখন আমার তা-ই মনে হয়। তোমার মতো একজন লম্পট মাতালের সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়ার পিছনে হয়তো ওইটাই কারণ।
তা হলে? —বলে ধ্রুব খুব বিজ্ঞের মতো হাসল, এই বিয়ের বিরুদ্ধে কি তোমার বিদ্রোহ করা উচিত নয় রেমি? উচিত নয় কি আদালতে গিয়ে আইনের আশ্রয় নেওয়া! বলো!
উচিত। নিশ্চয়ই উচিত।
তা হলে তাই করো রেমি। ভাঙো, ভাঙো এই পরিবারের ভিত। কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রাচীনপন্থী, প্রগতিবিরোধী, সংকীর্ণমনা, মতলববাজ ও কায়েমি স্বার্থের এই বাস্তুঘুঘুর প্রতিষ্ঠানটিকে উড়িয়ে দাও। পাবলিকলি অপমান করো কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীকে। লম্পট ধ্রুব চৌধুরীর মুখোশ খুলে দাও। কেন চুপ করে মেনে নিচ্ছো সব কিছু? এই পারিবারিক প্রতিষ্ঠানটির ভিত ভেঙে স্বাধীন ও মুক্ত হয়ে চলে যাও নিজের সত্যিকারের প্রেমিকের কাছে। জয়ি হও, মুক্ত হও, ঘৃণা করো আমাদের।
অভিনয়! পুরোটাই অভিনয়! কিন্তু তবু কী চমৎকার অভিনয়! ধ্রুব রওনা হয়ে যাওয়ার একঘণ্টা। বাদে রেমি বিছানায় বসে আনমনে আঙুল দিয়ে বিছানায় আঁকিবুকি করতে করতে আপনমনে হাসছিল, পাগল! একটা পাগল!
ফুল ফুটলে পতঙ্গ আসেই। সেই অর্থে রেমিরও কি প্রেমিক ছিল না দু-একজন? ছিল। দাদার বন্ধু মানিকদা। দারুণ চেহারা, ইঞ্জিনিয়ার। সন্তু নামে পাড়ার একটি বেকার ছেলে। দায়ে-দফায় এসে সব সময় হাজির হত। একজন অধ্যাপক ছিলেন চিন্ময় সান্যাল নামে। চমৎকার মানুষ। একটু নরম। হয়ে পড়েছিলেন তার প্রতি। রাস্তায় ঘাটে কতবার সপ্রশংস বা লোভী চোখ তাকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু প্রেম করার অবকাশ ঠিক পায়নি সে। বড্ড অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেল। তবে আজ তার মনে হয়, পৃথিবীর আর কোনও পুরুষ নয়, আর কেউ নয়, একজনকেই তার চাই। পুরোপুরি চাই। যে লোকটা তাকে এত অপমান করে নাকের ডগা দিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে গেল। তার প্রতি যার এত উপেক্ষা। এত উদাসীনতা। ওই পাগলকে সে একদিন বলবে, এসো, বিয়ে ভেঙে দিই। আমি কুমারী হয়ে যাই, তুমিও কৌমার্যে ফিরে যাও। তারপর আমার স্বয়ংবর হোক। কাকে মালা দেব জানো? আহাম্মক কোথাকার? বোঝো না?
