দুহাতে জামা খামচে ধরে ধ্রুবকে এত জোরে নাড়া দিতে লাগল সে যে মাতাল ধ্রুবর মাথাটা লটপট করতে লাগল ঘাড়ের ওপর। বুঝি-বা ঝাঁকুনিতে খসে পড়ে। চিৎকার করে রেমি জিজ্ঞেস করতে লাগল, কী বললে? ঠিক করে বলো! স্পষ্ট করে বলো! বলো! নইলে তোমাকে আমি খুন করে ফেলব!
ঝাঁকুনির চোটে ধ্রুব কেমন ভ্যাবলা হয়ে গিয়েছিল। কথা বলতে পারছিল না। হাঁফাতে হাফাতে শুধু একবার অতি কষ্টে বলল, মাইরি! তোমার গায়ে তো সাংঘাতিক জোর!
রেমির রাগ তাতে আরও চড়ল। উত্তুঙ্গ সেই পিশাচ রাগ লুপ্ত করে দিল তার কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান। দুহাতে সে ধ্রুবর গলা টিপে ধরে বলল, বলো! স্পষ্ট করে বলো! কী করেছ তুমি? আমার পেটে সত্যিকারের বাচ্চা এসেছিল! তুমি আমাকে মিথ্যে করে বুঝিয়ে সেটা নষ্ট করেছ! বলল, ঠিক কি না!
ধ্রুব সভয়ে রেমির দিকে চেয়ে বলে, ঠিক।
ঠিক? —আর্তনাদ করে উঠে রেমি চেপে ধরল ধ্রুবর গলা। প্রাণপণে তার শ্বাসনালি অবরোধ করে বলল, তা হলে তুমিই-বা কেন বেঁচে থাকবে? খুনি! ছোটলোক! চণ্ডাল! তুমিই-বা কেন বেঁচে থাকবে? মরো! মরো! মরো!
আশ্চর্য এই, ধ্রুব নিজেকে বাঁচানোর জন্য একটা হাতও তুলল না। একটুও বাধা দিল না রেমিকে। রেমির প্রচণ্ড মুঠোর চাপে দম আটকে আসছিল তার। চোখ দুটো বড় বড়। কপালে রক্তোচ্ছাস। মুখটা হাঁ করা।
রেমি সম্ভবত মেরেই ফেলত ধ্রুবকে। যদি সে ধ্রুবর মুখের দিকে না তাকাত। যদি চোখ বুজে থাকত রেমি, তা হলে হয়তো পারত। কারণ সেই মুহূর্তে খুন করার মতোই একটা রাগ ভর করেছিল তার শরীরে। কিন্তু ধ্রুবর অসামান্য মুখশ্রীতে যে কষ্টের ছাপ ও মৃত্যুযন্ত্রণার ভয়াবহতা ফুটে উঠেছিল তার দিকে চেয়ে শিথিল হয়ে গেল রেমি। নিজের কাছে এক রহস্যময় অদ্ভুত প্রশ্ন রয়ে গেল তার। কেন কেন আমি এই খুনি এই পিশাচকে ভালবাসি? কেন ভালবাসি?
রেমির হাত থেকে মুক্ত ধ্রুব গড়িয়ে পড়ে গেল বিছানায়। একটা বীভৎস হেঁচকিব শব্দ উঠতে লাগল তার গলা দিয়ে। ঠোঁটের কোনা বেয়ে কষ ও ফেনা গড়াতে থাকে।
রেমি প্রথমটায় অবাক হয়ে চেয়ে থাকে ধ্রুবর দিকে। তারপর তার বুক জুড়ে দেখা দেয় ভয়। ও কি মরে যাবে? ও কি মরে যাচ্ছে? হায় হায় হায়। ওকে ছাড়া আমি বাঁচব কী করে?
পাগলের মতো রেমি তখন ঝাঁপিয়ে পড়ে ধ্রুবর ওপর, ওগো! তোমার কী হল? বলো না! পায়ে পড়ি, ওরকম কোরো না। কী হয়েছে তোমার? ওগো!
ধ্রুবর খাস চলছিল, জ্ঞান কিছুটা লুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকবে। তবে তার শরীর অত্যন্ত মজবুত। ভাল ভিতের ওপর তৈরি বাড়ি ভাঙতে সময় লাগে। অস্পষ্ট আধো চেতনার মধ্যেও সে বুঝল আতঙ্কিত রেমি যদি চেঁচায়, তা হলে লোক জানাজানি হবে। বিশ্রী এক পরিস্থিতির মুখে পড়ে যাবে রেমি। ধ্রুব অতি কষ্টে একখানা হাত একটু তুলে রেমির একখানা হাত ছুঁল। একটু মাথা নাড়ল। বোধহয় বোঝাতে চাইল, তার তেমন কিছু হয়নি।
হতবুদ্ধি রেমি এইটুকু দেখেই বুঝতে পারল, ধ্রুব হয়তো মরে যাচ্ছে না। সে দৌড়ে গেল বাথরুমে। জল এনে ছিটে দিতে লাগল ধুবর মুখে-চোখে। ফ্যান খুলে দিল মাথার ওপর। খুলে দিল। বুকের বোতাম।
অনেকক্ষণ ধরে কাশল ধ্রুব। গভীর শ্বাস টেনে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল। গলার ফরসা চামড়ায় তখনও লাল দগদগে হয়ে বসে আছে রেমির আঙুলের ছাপ।
ওঠার মতো অবস্থা তখনও তার নয়। বালিশে ক্লান্ত মাথা এলানো। ম্লান একটু হেসে বলল, পারলে না?
রেমি অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে ছিল ওর মুখের দিকে। বলল, কী পারলাম না?
আর একটুক্ষণ চেপে রাখলেই তো হত। পারলে না কেন?
রেমি উপুড় হয়ে পড়ল ধ্রুবর বুকে। দুহাত আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল, বোলো না! বোলো না! আমি রাক্ষুসি।
ধ্রুব সেই কান্নায় বাধা দিল না। চুপচাপ শুয়ে রইল। কিছুক্ষণ। তারপর ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল, একটু ব্র্যান্ডি দাও।
একটুও প্রতিবাদ করল না রেমি। উঠে কাঁদতে কাঁদতে, ফোঁপাতে ফোপাতেই আলমারি থেকে ব্র্যান্ডির বোতল বের করে গেলাসে ঢেলে জল মিশিয়ে ধ্রুবর হাঁ করা মুখে একটু একটু করে ঢেলে দিতে লাগল যত্ন করে। জীবনে এই প্রথম স্বামীকে মদ খাওয়াচ্ছে সে। তবে মদ হিসেবে নয়।
ধ্রুব গিলতে পারছিল না। গিলতে গিয়ে একবার বিষম খেল। পরের বার কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল অনেকটা। ফিসফিস করে বলল, পারছি না।
রেমি ওর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল সস্নেহে। জিজ্ঞেস করল, কষ্ট হচ্ছে?
ধ্রুব মাথা নেড়ে সেইরকম ফিসফিসে গলায় বলে, না। তেমন কিছু নয়।
আমি ডাক্তারকে খবর দেব।
না রেমি। ওসব কোরো না। কেউ যেন জানতে না পারে। একটা মাফলার বের করে আনো।
রেমি আনল।
ধ্রুব বলল, গলাটা ঢেকে দাও।
কেন গো?
দাও না।
তোমার কেমন লাগছে সত্যি করে বলো।
ভাল। গলাটায় একটু অস্বস্তি। ওটা কেটে যাবে।
ঠিক করে বলো। ঠিকই বলছি, রেমি। শোনো, কাউকে কিছু বোলো না। ডাক্তার ডেকো না।
রেমি বুঝল, ধ্রুব তাকেই বাঁচাতে চাইছে। আর কিছু নয়।
সেই রাতটা ধ্রুব খুব কাশল। গলাটা একটু ফুলে উঠেছিল লাল হয়ে। আর তেমন কিছু হল না। পরদিন ধ্রুবকে খুবই স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। সারারাত রেমি এক সেকেন্ডও ঘুমোয়নি। চিত্ৰাপিতের মতো বসে ধ্রুবর মুখখানার দিকে চেয়ে থেকেছে অপলকে। সারা রাত ধরে সে নিজেকে প্রশ্ন করেছে, কেন এই লোকটিকে ছাড়া আমি আর কিছু ভাবতে পারি না? কেন এই মানুষটিকে আমি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না! এই মাতাল, খুনি, নিষ্ঠুর, উদাসীন ও অপ্রকৃতিস্থ লোকটা কোন জাদুবলে আমাকে দখল করে আছে?
